📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 শ্রবণের নীতিমালা

📄 শ্রবণের নীতিমালা


শিশুরা কথা বলার সময় অযৌক্তিকভাবে কথা পুনরাবৃত্তি করে। মাঝেমধ্যে তারা এমন কথা বলে, যার পরিষ্কার কোনো অর্থ নেই। এভাবেই তারা অন্যদের সাথে মেলামেশা করতে শিখে। তাদের কথা শোনার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অধিক ধৈর্যের প্রয়োজন। নিষ্পত্তাদ্বারে কারও কোনো কিছু গ্রহণ করার দক্ষতা এক বড়ো গুণ। মানুষের মধ্যে অধিক কথার এবং কম শোনার প্রবণতা বেশি। তবে আমাদের দুই কান এবং এক মুখের পেছনের প্রজ্ঞাকে আচরণের মাধ্যমে প্রতিফলিত করতে হবে।
সক্রিয়ভাবে শ্রবণ করার অর্থ হলো—কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তা বোঝার চেষ্টা করা। আপনি যখন কারও কথা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারবেন, তখন সে অনুযায়ী কাজ করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে। অবুঝ সন্তানরা কোনো ধরনের সহমর্মিতা চাচ্ছে কি না, কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সাহায্য চাচ্ছে কি না, কারও আলিঙ্গন প্রত্যাশা করছে কি না অথবা কথা বলার জন্য কাউকে পাশে চাচ্ছে কি না, সেদিকে পিতা-মাতাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
পিতা-মাতা যখন সন্তানদের কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে, তখন তাদের মধ্যে এই ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়—পিতা-মাতার কাছে তাদের কথার কিছুটা হলেও মূল্য রয়েছে। এটি তাদের পিতা-মাতার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করারও শিক্ষা প্রদান করে। মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ। তিনি যখন কারও কথা শুনতেন, তখন পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শুনতেন। তিনি বাবার দিকে তাকিয়ে কথা শুনতেন এবং নিজ শরীরকে তাঁর দিক ফিরিয়ে নিতেন। এটি প্রকৃতপক্ষে শিশুদের অন্যদের মূল্যায়ন করার প্রশিক্ষণ দেয়। পাশাপাশি তা তাদের চারপাশের মানুষের সাথে আরও বেশি করে মেলামেশায় অত্যন্ত শুভ ফল দেয়।
উত্তর দেওয়ার সময় পিতা-মাতার কর্তব্য হলো—সন্তানদের সাথে সুন্দর উপায়ে অর্থপূর্ণ কথা বলা, যাতে তারা তা বুঝতে পারে। রাসূল ﷺ একজন মনোযোগী শ্রোতা এবং উত্তম বক্তা ছিলেন।
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন—
'রাসূল ﷺ এমন পরিষ্কারভাবে কথা বলতেন, যাতে শ্রোতারা তাঁর কথা পুরোপুরি বুঝতে পারতেন।' আবু দাউদ
ওই সমস্ত পরিবার সুখী হয় এবং কম হতাশায় ভোগে, যেখানে সবাই সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। কারণ, তখন পরিবারের সবার মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়, তারা প্রত্যেকে নিজেদের কথাগুলো উপস্থাপনা করতে পারে।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 সংযম

📄 সংযম


পিতা-মাতার দায়িত্ব হচ্ছে শিশুদের সাথে উপযোগী আচরণ করা এবং তাদের সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা। আমাদের কমবেশি তাৎক্ষণিক ফলাফলের আশা করা ঠিক নয়। কারণ, সন্তানদের লালন-পালন এক দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ। আমরা আল্লাহর ইচ্ছায় আখিরাতে যার ফলাফল প্রত্যাশা করি।
'আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না।' সূরা বাকারা : ২৮৬
আমাদের মুসলিমদের জীবনযাপনে অর্থ, সময় ও শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
'নিজের হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তাকে একেবারেই খোলাও ছেড়ে দিও না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অক্ষম হয়ে যাবে।' সূরা বনি ইসরাইল : ২৯
'তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং উভয় প্রান্তিকের মাঝামাঝি তাদের ব্যয় ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।' সূরা ফুরকান : ৬৭
রাসূল ﷺ বলেন—
'উত্তম আচরণ, স্থিরতা ও মধ্যমপন্থা নবুয়তের ২৫ ভাগের ২৯ ভাগ।' আবু দাউদ ও তিরমিযি
'রাসূল ﷺ-কে যখন দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি বিষয় পছন্দ করার কথা বলা হতো, তখন তিনি তুলনামূলক সহজটিকে বাছাই করে নিতেন; যতক্ষণ না সেটি অবৈধ কোনো কিছু হতো। নিষিদ্ধ কিছু হলে তিনি তা গ্রহণ করতেন না।' বুখারি

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 কঠিন আচরণের মোকাবিলা

📄 কঠিন আচরণের মোকাবিলা


পরিপূর্ণ ইসলামিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও পুরো সমাজের সাথে মানিয়ে নিতে শিশুদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়। কিশোর বয়সে ব্যবহারিক বা আচরণগত ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতেলেও নিজ পরিবারে কিন্তু আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। যে ধরনের সমস্যাই হোক না কেন, সন্তানদের সাথে শাসকসুলভ আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। মানসিক বা অন্যান্য কারণে তাদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ওপর ভিত্তি করে পিতা-মাতার উচিত সমস্যাগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা। যেমন:
* মাত্রা
* সময়কাল
* জেদ
সন্তানের আচরণগত সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করব—তা মূলত নির্ভর করে পরিস্থিতি, সন্তান-অভিভাবক সম্পর্ক এবং সন্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতার ওপর। কোনো সমস্যা দেখা দেওয়ার পর পিতা-মাতাকে অবশ্যই রাগান্বিত হওয়া, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং সন্তানদের অপবাদ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজেদের সমস্যা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে শিশুদের সাহায্য করতে হবে। যেকোনো অবস্থায় তাদের অসম্মান করা কিংবা আত্মসম্মানহীন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাসী সন্তানরা তাদের ভুলের ফলাফল সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকে। তারা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠে নিজেদের পুনর্গঠনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়।
কোনো শিশুর চালচিত্রের আচরণগত সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য অতিরিক্ত সহনশীলতা প্রয়োজন। কারণ, প্রত্যেক পিতা-মাতারই নিজের সন্তানের ব্যাপারে অনেক বেশি প্রত্যাশা থাকে। সন্তানদের আচরণগত কোনো সমস্যা দেখলে তারা হতাশাও হয়ে পড়েন। কিন্তু আমরা প্রায় ভুলে যাই—'মানুষ মাত্রই ভুল করে।' আমরা আমাদের প্রিয় সন্তানকে সবকিছুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখতে চাই, কিন্তু আমরা নিজেরাই সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে ব্যর্থ! এই ক্ষেত্রে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে।
সন্তানদের মাঝে কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত আচরণগত সমস্যা দেখা দিলে নিম্নোক্ত ছয়টি বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিত—

* শান্ত থাকা : কখনো চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করবেন না।
* আত্মবিশ্বাস : অভিভাবক হিসেবে আপনার মাঝে এই সমস্ত বিষয় মোকাবিলার সামর্থ্য রয়েছে—এই বিশ্বাস রাখুন।
* সংগতি : সন্তানরা যেন গ্রহণযোগ্য আচরণে অভ্যস্ত হওয়ার উপায় সম্পর্কে পরিষ্কার ও সংগতিপূর্ণ বার্তা পায়।
* স্বচ্ছতা : সন্তানদের ন্যায়-অন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আবেগকে স্থান দেবেন না। ন্যায়ের ব্যাপারে স্বচ্ছ ও আপসহীন থাকুন।
* নিয়ন্ত্রণ : কখনো রাগান্বিত হবেন না কিংবা জবরদস্তি করবেন না।
* যোগাযোগ : সন্তানের আচরণগত সমস্যা মোকাবিলায় ক্ষেত্রে আপনার জীবনসঙ্গী ও সন্তানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখুন।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 সংস্কৃতি ও মাতৃভাষা

📄 সংস্কৃতি ও মাতৃভাষা


ইসলামি পারিবারিক পরিবেশে সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। নিঃসন্দেহে ইসলামি নীতিমালা মুসলিম পরিবার পরিচালনার সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। সমাজ যতই সেক্যুলার বলুক না কেন, ইসলামে নিষিদ্ধ কোনো কিছুই মুসলিম পরিবারের জন্য সংগত নয়। মানুষের মাঝে পোশাক, ভাষা, খাদ্য ও সামাজিক প্রথার বৈচিত্র্যতাই মুসলিম উম্মাহর সৌন্দর্য। মৌলিক ইসলামি অনুশাসনই আমাদের বন্ধনকে মজবুত করে।
একটি ইসলামি পারিবারিক পরিবেশে পিতা-মাতার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার চর্চায় কোনো সমস্যা নেই। নিজস্ব সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলাতে ইসলাম কোনো আপত্তি তোলে না, যতক্ষণ না তা ইসলামি অনুশাসনের বাইরে যায়; বরং এটি বহুমাত্রিক সমাজের অপরিহার্য অঙ্গ। এটি এমন এক বৈচিত্র্যময় পরিবেশ তৈরি করে, যা মানবজাতিকে পূর্ণতা দেয়।
কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে আরবি ভাষার জ্ঞান অপরিহার্য। প্রত্যেক শিশুরই পবিত্র কুরআন বোঝার জন্য আরবি ভাষার ওপর প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করা উচিত। সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার অনেক ভূমিকা রয়েছে। আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার বিকল্প নেই। মাতৃভাষার মাধ্যমে সুগভীরভাবে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো সহজ হয়। মনে রাখতে হবে, মুসলিম সমাজে প্রত্যেকটি ভাষাই সম্মানীয়, ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ। ভাষা মূলত ইসলামি বার্তাই বহন করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00