📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 ব্যক্তিগত উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে পরিবার

📄 ব্যক্তিগত উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে পরিবার


শিশুরা প্রাকৃতিকভাবে উদ্যোগী ও চঞ্চল। তারা সব সময় ছোটোছুটির মধ্যে থাকে। তাদের এ বাধ্য-বিপত্তিহীন শারীরিক ও মানসিক চঞ্চলতাকে সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পিতা-মাতার উচিতো তাদের শারীরিক ও মানসিক কর্মকাতে অন্তর্ভুক্ত করা, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সাহায্য করবে। তবে অবশ্যই তাদের সাথে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। মনে রাখতে হবে, এটা কেবলই শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য।
শিশুদের ঘরের বাইরেও একটি সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা খেলাধুলা করবে এবং বিনোদন গ্রহণ করবে। এটা হতে পারে পার্কে হাঁটাচলা করা, তাদের সাথে ফুটবল খেলা কিংবা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। এ ছাড়াও বই পড়ে, ছবি আঁকাআঁকি দ্বারা তাদের মানসিক কার্যক্রম উৎসাহিত করা যেতে পারে।
সন্তানকে পরিবারের একজন মূল্যবান সদস্য হিসেবে পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাকে পরিবারের কিছু ছোটোখাটো কাজেও দিতে হবে। যেমন—
* তাদের নিজেদের রুমগুলো গুছিয়ে এবং পরিষ্কার করে রাখা
* খাবার গ্রহণের শেষে টেবিল পরিষ্কার রাখা
* তাদের অপরিকল্পিত জাযা-কাপড় নির্দিষ্ট স্থানে রাখা
* বাগান করার ক্ষেত্রে সাহায্য করা
* স্কুলের বইপত্র ও ড্রেসের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া
* গাড়ি পরিষ্কারে সাহায্য করা
* সময়মতো হোমওয়ার্কগুলো সম্পাদন করা
* দাদা-দাদি এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং
* বাবা-মায়ের গৃহস্থালি কাজে সাহায্য করা।
শিশুদের অহেতুক চাপের মধ্যে রাখা ও সকল কাজের উদ্দেশ্য নয়; বরং তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যকে সুনির্দিষ্ট করানো এবং পারিবারিক দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি সচেতন করাই মূল উদ্দেশ্য। শিশুরা যখন বাড়িতে বাবা-মায়ের কাজ থেকে ও সকল দায়িত্ব সম্পর্কে জানে, তখন তারা অন্যান্য শিশুর থেকে অনেক বেশি নিজেদের বিকশিত করতে পারে এবং তাদের শৈশবটাও হয় বর্ণাঢ্য।
তাদের মধ্যে যদি এমন কিছু দেখা যায়—যা ইসলাম ও মানবতার সাথে সাংঘর্ষিক, তবে সময় নিয়ে তাদের সঠিক ধারণা দিতে হবে। তাদের আদর ও সংবেদনশীলতার সাথে বোঝাতে হবে—‘তোমার এ ধারণাটি বা তোমার অভ্যাসটি ইসলামের এবং নৈতিক শালীনতার সাথে যায় না বা ইসলাম এটি সমর্থন করে না।’ পিতা-মাতা যখন সন্তানদের সাথে সময় কাটাবে, তখন এ সকল বিষয় বোঝানো অনেক সহজ হবে।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 সন্তানদের সাথে অর্থবহ সময় কাটানো

📄 সন্তানদের সাথে অর্থবহ সময় কাটানো


সারাদিন স্কুলে কাটানোর পরও কিছু শিশুর মধ্যে ক্লান্তি আসে না। ফলে তারা ঘুমোনোর আগেও কিছু বিরক্ত করতে পছন্দ করে। যদি অভিভাবকরা সন্তানদের এ সময়টুকু ভালো কোনো কাজে লাগাতে না পারে, তবে তারা টিভি দেখে অথবা কম্পিউটারে গেমস খেলে এ সময়টা অতিবাহিত করবে।
সব অভিভাবকই জীবিকা অর্জনের পেছনে অনেক ব্যস্ত সময় পার করেন। অনেকে আবার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকেন। ফলে অনেক বাবাই বাস্তবতার কারণে সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। সারাদিন উপার্জনের পেছনে ব্যস্ত সময় কাটানোর পর তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সন্তানদের খাওয়া-দাওয়া, স্কুলের জন্য তাকে প্রস্তুত করা,
তার জাযা-কাপড় পরিষ্কার করাসহ যাবতীয় বিরিয়াদি মায়ের একাই দেখতে হয়। সন্তানকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা এবং অতিরিক্ত কাজ অনেক সময় তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে একসময় মনের অজান্তেই মা সন্তানকে বকা দিয়ে বসেন। মায়ের বকা খেয়ে শিশু নিজেকে একটি আবদ্ধ রুমের মধ্যে আটকে রেখে টিভি দেখে অথবা কম্পিউটারে গেমস খেলে।
আর যখন পিতা-মাতা উভয়েই চাকরি করে, তখন এর পরিণতি হয় আরও ভয়াবহ। এতে শৈশব শেষ দেখা যায়, শিশু তার জীবনের অধিকাংশ সময় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমেই কাটিয়েছে, যার কোনো পজেটিভ ফলাফল নেই। পিতা-মাতার মধ্যে বিভেদ থাকলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। এতে সন্তানের সাথে তাদের বন্ধন হয় দুর্বল এবং সন্তান পরবর্তী জীবনে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
সুতরাং সন্তানদের সাথে সময় কাটানো আগ্রহ হিসাবে নয়; বরং অতি জরুরি হিসাবে দেখতে হবে। পিতা-মাতার উচিত দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। শুধু ব্যয়বহুল কোনো প্রাইভেট স্কুল শিশুর জন্য শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কিনে আনতে পারে না। ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি অর্জন জীবনের সফলতা নয়। কী হবে এ জীবন দিয়ে, যদি শুধু ধন-সম্পদ অর্জনের পেছনেই জীবনের মূল্যবান সময়গুলো ব্যয় করি এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু তৈরি করতে না পারি?
সন্তানদের সাথে একটা উল্লেখযোগ্য সময় কাটাতে হবে, যা কখনো কখনো একান্ত ব্যক্তিগত হবে এবং সময়টুকু হবে বাবা-মায়েরা ভরা ও অর্থবহ। তাদের সাথে একসাথে বসে কিছু দেখা, খোঁশগল্প করা, বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মজা করা, তাদের হোমওয়ার্ক তৈরিকে সাহায্য করা ইত্যাদি। ছোটোখাটো পক্ষপেক্ষগুলো শিশুদের সাথে অভিভাবকদের বন্ধন সুদৃঢ় করে, বিশ্বাস ও ভালোবাসা বাড়ায়, আত্মিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।
আমাদের প্রিয়নবি মুহাম্মাদ ﷺ শিশুদের সঙ্গে শিশুর মতো আচরণ করার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি তাঁর চাচা আব্বাস রা.-এর তিন সন্তানকে নিয়ে একসাথে খেলতেন এবং তাঁর দিকে দৌড়ানোর জন্য বলতেন। তাঁরা তাঁর ওপর লাফাতেন এবং দৌড়াতেন, আর নবিজি তাদের বুকে নিয়ে চুমু খেতেন। যখন তাঁর দুই নাতি হাসান ও হুসাইন রা. তাঁর পিঠের ওপর উঠে খেলত, তখন মাঝে মাঝে তিনি তাঁর হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিতেন।
অনেক সময় অনেক কাজের ব্যস্ততার কারণে শিশুদের সাথে কোয়ালিটি টাইম ব্যয় করা সুদূরপরাহত হয়ে ওঠে না। এই জন্য সবার উচিত পারিবারিক কাজকর্মের একটা রুটিন করা এবং পারিবারিক নোটিশবোর্ডে লিখে রাখা। এতে লেখা থাকতে পারে পিতা-মাতার সাথে সন্তানদের বিভিন্ন কার্যক্রম, বাড়ির কাজ, নামাজের সময়, খাবার সময়, শোয়ার সময় ইত্যাদি। যখন সময়ের কাজ সময়মতো করা হবে, তখন এটাকে একটা দায়িত্ব বলেই মনে হবে।
সবকিছু আগে ভাগেই করা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন হতে সময় নেয়। অনেক সময় পিতা-মাতা যখন কোনো প্রকার ক্ষেত্র প্রস্তুত ছাড়াই সন্তানদের ওপর হঠাৎ আইন জারি করে বসেন। এতে সন্তানরা ক্ষুব্ধ হয়। পিতা-মাতার উচিত আইন জারি করার আগে তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে সেই নিয়মের জন্য প্রস্তুত করা। ইসলামে আগে প্রস্তুত করতে উৎসাহিত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইসলামে সন্তানদের দশ বছর থেকে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু পিতা-মাতা সাত বছর থেকে তাদের নামাজের প্রতি উৎসাহিত করার আদেশ দিয়েছেন। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন—
‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর থেকে নামাজের আদেশ দাও এবং দশ বছর থেকে তাদের শাস্তি দাও (যদি নামাজ না পড়ে) এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।’ আবু দাউদ, আল হাকিম
একইভাবে, রোজার ব্যাপারে এবং কন্যাদের হিজাব বা পর্দার ব্যাপারে বালেগ হওয়ার আগে থেকেই আস্তে আস্তে চর্চা করানো বুদ্ধিমানের কাজ। আগে থেকে এগুলো অভ্যস্ত না হলে হঠাৎ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে হিতো বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইসলামে মানুষ মানসিক দৃঢ়জীবীবে ও সমাজজীবনে শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে। সুশৃঙ্খলিত ভালোবাসাতে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং আমাদের আরও ভালো মানুষ হবে। ইচ্ছার বিপরীত বা লোক দেখানো কাজ ইসলামে অর্থহীন। পিতা-মাতারই দায়িত্ব হলো কথা ও কাজের মাধ্যমে সন্তানদের উত্তম আচরণ শেখানো। মানুষের মতো মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা। তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শিক্ষা দেওয়া এবং মানার ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়া।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 ইসলামিক আদব

📄 ইসলামিক আদব


নির্দিষ্ট সময়ে কিছু আমল করার নাম ইসলাম নয়; বরং ইসলাম হচ্ছে জীবনের পূর্ণাঙ্গ একটা পদ্ধতি, যা একজন ব্যক্তিকে জীবনের প্রত্যেকটা ধাপে নিয়মিতভাবে পরিচালনা করবে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতেও সাহায্য করে।
কীভাবে খেতে হয়, কীভাবে পান করতে হয়, অন্য মানুষদের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়—সবই ইসলামে শেখায়। যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ ইসলামিক আদব মেনে চলে, তখন পুরো সমাজে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হয়। সে সমাজ অন্ধকারে বাতিঘরের ন্যায় ঝলঝল করে থাকে, তখন অন্যান্য সমাজ তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়।
একটা শিশুর খাওয়া ও পান করার আদব, খেলাধুলা, কথা বলা সবকিছুই তার পরিবারের পরিচয় বহন করে। একটি সুন্দর চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে কোনো কিছুকে নগন্য মনে করা যায় না। আবূ হাফস উমর ইবনে আবি সালামা রা. বলেন— ‘আমি রাসূল ﷺ-এর ঘরে বড়ো একটি শিশু ছিলাম। যখন আমি খেতে বসতাম, আমার বেখেয়াল হাত প্লেটের চারপাশ দিয়ে ঘুরত। রাসূল ﷺ বলতেন—“আল্লাহর নাম নিয়ে ডান হাতে শুরু করো এবং কাছ থেকে শুরু করো।” তখন থেকে তিনি আমাকে যেভাবে শিখিয়েছেন, সেভাবে আমি খাওয়া চেষ্টা করি।’ বুখারী ও মুসলিম
মুসলমানদের সমাজজীবনে আদব হচ্ছে আবশ্য। আদব ছাড়া মুসলিম সমাজ কল্পনাও করা যায় না। নবুয়ত পাওয়ার পর নবি করিম ﷺ-এর ব্যবহার ছিল চমৎকার। তিনি তাঁর আশপাশের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দরদি ছিলেন। তিনি খুব সুন্দর ও মোলায়েম ভাষায় কথা বলতেন এবং অন্যদের সাথে ভালো ব্যবহার করার শিক্ষা দিতেন। এর জন্য তিনি কোনো প্রকার বিনিময় গ্রহণ করতেন না। তাই সাধারণতা তাঁকে অনুসরণ করাই একজন মুসলমানের জীবনের সবচেয়ে বড়ো সফলতা।
ইসলামে আদবের যে অপরিহার্য উপাদানগুলো প্রতিটি অভিভাবকের শেখা এবং সন্তানদের শেখানো উচিত, তা হলো—
অভিভাবন: কীভাবে অন্য একজন মুসলিম বা অমুসলিমকে অভিবাদন জানাবে, কে প্রথমে কাকে সালাম দেবে এবং কীভাবে একজন সালামের জবাব দেবে ইত্যাদি বিষয়গুলো সন্তানদের উত্তম উপায়ে শেখানো উচিত।
অনুমতি: অন্য কারও রুমে কিংবা বাড়িতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কীভাবে অনুমতি দিতে হয়, তা বাচ্চাদের শেখাতে হবে।
কথা বলা: কীভাবে নিজ স্বরে কথা বলবে এবং বড়োদের ইজ্জতের সাথে সম্বোধন করবে। প্রতিদিন কথা বলার ক্ষেত্রে কোন কোন ভালো শব্দগুলো চয়ন করবে। কথা বলার সময় কোন পরিস্থিতিতে ইনশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ প্রভৃতি ইসলামিক শব্দগুলো চয়ন করবে।
অধিকার রক্ষা: যত ছোটোখাটো অধিকারই হোক কেন, অভিভাবকদের পূরণ করা কর্তব্য। সন্তানদের সাথে তাদের কখনোই এমন ওয়াদা করা উচিত নয়, যা তারা পূরণ করতে পারবেন না। এমনটি হলে তাদের মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে, যা সন্তানদের মিথ্যার দিকে উৎসাহিত করবে। সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে—কোনো বিষয়ে ওয়াদা করলে তা অবশ্যই পূরণ করতে হয়; তা যত ছোটোখাটো হোক না কেন।
সময়ানুবর্তিতা: অভিভাবকদের উচিত তাদের প্রত্যেকটা কাজ সময়মতো করা: তা হতে পারে সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নামাজ পড়া অথবা কোনো দাওয়াতও অংশগ্রহণ করা। এতে সন্তানরাও পিতা-মাতার সাথে সাথে তাদের কাজগুলো সময়মতো করার উৎসাহ পাবে।
খাওয়া ও পান করা: একটা পরিবারের জন্য এটা খুব ভালো অভ্যাস যে, প্রতি বেলা খাবারের শুরুতে ও শেষে দুয়া পাঠ করে খাবে। শুধু হালাল খাবারই নয়; বরং সুষম খাদ্য গ্রহণও অত্যন্ত হতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে—তারা কীভাবে খাবে এবং পান করবে। দাঁড়িয়ে বা রাস্তায় হেঁটে খাওয়া পরিহার করতে হবে।
ভালো আচরণ: দৃষ্টি নত রাখা, হাসি মুখে থাকা, হাঁটার ক্ষেত্রে নম্রতা ইত্যাদি; যখন অন্য কোনো ব্যক্তি মুখে থাকে, তখন একজনের সাথে ফিসফিস করে কথা না বলা, কোনো কিছু শেয়ার করা, অন্য কারও বিপদে হাসাহাসি না করাই একজন মুসলিমের চরিত্র। এই বিষয়গুলো সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে।
এর মধ্যে অনেক কিছু আছে, যা খুবই সহজ এবং আমরা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে তা খুব সহজেই আয়ত্ত করতে পারি।
পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: অনেক ইবাদতের প্রথম শর্ত হচ্ছে পবিত্রতা। যেমন: নামাজ, কুরআন স্পর্শ করা ইত্যাদি। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
'نِقْهَرُ مَيَّتَا مَهِّمَاهُ فِفْرَانَ وَلَا الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَطْهَارَ إِنَّ اللهَ يَشْغَلُ بِهِمْ خَيْرًا وَلَا يَمَسَّهَا'
নিশ্চয় এটা মহিমান্বিত কুরআন, যা আছে সুরক্ষিত কিতাবে। যারা সম্পূর্ণ পবিত্র, তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না।' সূরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯
আল্লাহ নিজে পবিত্র এবং তিনি শারীরিক ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতাকে ভালোবাসেন। 'আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তাদেরও, যারা নিজেদের পবিত্র রাখে।' সূরা বাকারা: ২২২
অজু পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম পদ্ধতি। রাসূল ﷺ বলেন—
'সালাত বেহেশতে চাবি আর অজু সালাতের চাবি।' তিরমিযি: ৪
আমরা কুরআন-হাদিস থেকে অজুপ্রীতি ও বাহ্যিক পবিত্রতার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারি, যা ঈমানের বড়ো একটি অংশ এবং এটা একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাবিত করে।
শারীরিক পবিত্রতার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি সর্বদা নজর দিতে হবে—
* গোসল শারীরিক পবিত্রতা অর্জনের প্রধান মাধ্যম। গোসল ফরজের কারণ এবং ফরজ গোসলের পদ্ধতি বাচ্চারা একটু বড়ো হওয়ার সাথে সাথেই শেখাতে হবে। বাচ্চাদের যদি শুক্রবার সকালে গোসল দেওয়া হয়, তবে তা অনেক ভালো। এতে শুধু কীভাবে গোসল করতে হয় তা-ই শেখাবে না; বরং জুমার দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে তারা জানতে পারবে।
* অজু পবিত্রতা অর্জনের দ্বিতীয় পদ্ধতি। সর্বদা অজু অবস্থায় থাকা খুবই ফজিলতপূর্ণ একটি কাজ। এটা দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে মনে আধ্যাত্মিক শক্তি জোগায়। জীবনের শুরুতেই সন্তানদের অজুর নিয়ম শিক্ষা এবং অজু অবস্থায় থাকতে উৎসাহ দিতে হবে। এক্ষেত্রে পানির পর্যাপ্ত ব্যবহার ও অপচয় রোধে তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়াও জরুরি।
* হাতের নখ থাকবে ছোটো ও পরিষ্কার। ছেলে বাচ্চাদের চুল ছোটো করে কাটাতে হবে। আর ছেলেমেয়ে সবার চুল পরিষ্কার রাখার শিক্ষা দিতে হবে। নিয়মিত ব্রাশ করার অভ্যাস গড়তে হবে। বাচ্চাদের সব সময় পরিষ্কার কাপড় পরানো অভিভাবকদের কর্তব্য।
বাড়ির পরিবেশ বাচ্চাদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। তাই বাড়ির পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রাখতে হবে। যে বাড়িতে খাবারের জিনিস থাকে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকে, ময়লা জামা-কাপড়ের বাক্স জায়গামতো থাকে না এবং কাগজপত্র যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, সে বাড়ি কখনো সুন্দরভাবে বসবাস কিংবা ইবাদত-বন্দেগির জন্য যথোপযুক্ত নয়। এটা বলার সুযোগ নেই, বাড়িরঘরের সবকিছু গুছিয়ে রাখা সব সময় মায়ের দায়িত্ব। একটি পরিবারে গুছিয়ে রাখা পরিবারের সকল সদস্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
লজ্জা : লজ্জা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লজ্জা মানুষের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্যও বটে। সৃষ্টির প্রথম মানুষদ্বয় নিজেদের শরীর আবৃত করার মাধ্যমে তাঁদের সহজাত প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ করেছিলেন। নিচের হাদিসগুলোতে লজ্জা সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে—
'ঈমানের ৭০টিরও বেশি শাখা রয়েছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে লজ্জা।' সহিহ বুখারি
'অশ্লীলতা সবকিছুকে বিকৃত করে, আর হায়া বা লজ্জা সবকিছুকে আকর্ষণ করে।' তিরমিযি
লজ্জাহীনতা সমাজ খুব দ্রুত যৌনতাচার ছড়ায়। তাই আমাদের উচিত সন্তানদের ঘর থেকেই লজ্জা বা হায়া সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। কিছু পন্থা আছে, যেগুলোর মাধ্যমে আমরা সন্তানদের হায়া বা লজ্জাবোধ শেখাতে পারি—
* ১০ বছর বয়সেই সন্তানদের বিছানা আলাদা করে দিন। আর যৌবনে পা দিলেই ছেলে ও মেয়ের জন্য আলাদা বেডরুমের ব্যবস্থা করতে হবে।
* পরিবারের সকল সদস্যকে আরেকজনের রুমে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে অনুমতি নিয়ে প্রবেশের শিক্ষা দিতে হবে।
* পরিবারের সদস্যদের উচিত একে অপরের সামনে কাপড় পরিধান কিংবা খোলা থেকে বিরত থাকা। পরিবারের সকলের জন্য পোশাক পরিধানের নীতিমালা প্রয়োজন। পরিবারের সবাই যদি মাহরাম হয়, তাদের ক্ষেত্রে পর্দার বিধান কার্যকর নয়। তবে সবাই যেন নিজের সতরের থেকে পোশাক পরে-এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
* সাত বছরের ওপরের শিশুরা যেন একসঙ্গে গোসল না করে, যদিও তারা সমলিঙ্গের হয়।
* কারও সাথে অশ্লীল আলোচনা থেকে যেন বিরত থাকে। কোনো ধরনের অশ্লীল মুভি কিংবা প্রোগ্রাম দেখায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হবে। বর্তমান সময়ে সকল প্রকার মিউজিকের বিশাল এক অংশ শালীনতা থেকে বহু দূরে। কোনো মুসলিম পরিবারে যেন এই ধরনের মিউজিকের অনুমতি না থাকে, সাইয়েদকে খেয়াল রাখতে হবে।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 শ্রবণের নীতিমালা

📄 শ্রবণের নীতিমালা


শিশুরা কথা বলার সময় অযৌক্তিকভাবে কথা পুনরাবৃত্তি করে। মাঝেমধ্যে তারা এমন কথা বলে, যার পরিষ্কার কোনো অর্থ নেই। এভাবেই তারা অন্যদের সাথে মেলামেশা করতে শিখে। তাদের কথা শোনার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অধিক ধৈর্যের প্রয়োজন। নিষ্পত্তাদ্বারে কারও কোনো কিছু গ্রহণ করার দক্ষতা এক বড়ো গুণ। মানুষের মধ্যে অধিক কথার এবং কম শোনার প্রবণতা বেশি। তবে আমাদের দুই কান এবং এক মুখের পেছনের প্রজ্ঞাকে আচরণের মাধ্যমে প্রতিফলিত করতে হবে।
সক্রিয়ভাবে শ্রবণ করার অর্থ হলো—কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তা বোঝার চেষ্টা করা। আপনি যখন কারও কথা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারবেন, তখন সে অনুযায়ী কাজ করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে। অবুঝ সন্তানরা কোনো ধরনের সহমর্মিতা চাচ্ছে কি না, কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সাহায্য চাচ্ছে কি না, কারও আলিঙ্গন প্রত্যাশা করছে কি না অথবা কথা বলার জন্য কাউকে পাশে চাচ্ছে কি না, সেদিকে পিতা-মাতাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
পিতা-মাতা যখন সন্তানদের কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে, তখন তাদের মধ্যে এই ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়—পিতা-মাতার কাছে তাদের কথার কিছুটা হলেও মূল্য রয়েছে। এটি তাদের পিতা-মাতার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করারও শিক্ষা প্রদান করে। মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ। তিনি যখন কারও কথা শুনতেন, তখন পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শুনতেন। তিনি বাবার দিকে তাকিয়ে কথা শুনতেন এবং নিজ শরীরকে তাঁর দিক ফিরিয়ে নিতেন। এটি প্রকৃতপক্ষে শিশুদের অন্যদের মূল্যায়ন করার প্রশিক্ষণ দেয়। পাশাপাশি তা তাদের চারপাশের মানুষের সাথে আরও বেশি করে মেলামেশায় অত্যন্ত শুভ ফল দেয়।
উত্তর দেওয়ার সময় পিতা-মাতার কর্তব্য হলো—সন্তানদের সাথে সুন্দর উপায়ে অর্থপূর্ণ কথা বলা, যাতে তারা তা বুঝতে পারে। রাসূল ﷺ একজন মনোযোগী শ্রোতা এবং উত্তম বক্তা ছিলেন।
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন—
'রাসূল ﷺ এমন পরিষ্কারভাবে কথা বলতেন, যাতে শ্রোতারা তাঁর কথা পুরোপুরি বুঝতে পারতেন।' আবু দাউদ
ওই সমস্ত পরিবার সুখী হয় এবং কম হতাশায় ভোগে, যেখানে সবাই সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। কারণ, তখন পরিবারের সবার মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়, তারা প্রত্যেকে নিজেদের কথাগুলো উপস্থাপনা করতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00