📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 প্যারেন্টিং পদ্ধতি

📄 প্যারেন্টিং পদ্ধতি


সচেতন পিতা-মাতার উচিত সন্তানদের জরুরি চাহিদা পূরণ করা; একই সঙ্গে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাও নিশ্চিত করা—যাতে তারা একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ছোটো বয়সে সন্তানের পেছনে সময়, শক্তি ও শ্রম বিনিয়োগ করলে পরবর্তী সময়ে তার ফলফলাফ পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা যায়, সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে মূলত তিন ধরনের প্যারেন্টিং পদ্ধতি রয়েছে—
১. কর্তৃত্বমূলক
২. স্বীকৃতিমূলক
৩. পরিশ্রুতপূর্ণ
১. কর্তৃত্বমূলক : এই পদ্ধতিতে পিতা-মাতা সন্তানদের নিজেদের ইচ্ছামতো চলতে দেন এবং নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের পারিবারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে অভিভাবকদের বেঁধে দেওয়া নিয়ম-নীতির মাধ্যমেই সন্তানদের যাচাই করা হয়। এখানে সন্তানের সৃষ্টিশীলতা ও ব্যক্তিগত পছন্দকে অগ্রাহ্য করা হয় না ঠিক, কিন্তু এগুলো খুব বেশি স্বীকৃতিও দেওয়া হয় না। শৈশবকাল থেকেই সামাজিক কায়দায় আরোপিত এই নিয়ম-নীতি সন্তানের ব্যক্তিত্বের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে; সেইসঙ্গে অন্য মানুষের সাথে তাদের ভবিষ্যৎ আচরণও এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।
সন্তান প্রতিপালনের এই পদ্ধতি ছোটোকালেই শিশুদের আনন্দের উপসর্গ নষ্ট করে ফেলে এবং তাদের ব্যক্তিত্বকেও দমন করে রাখে। ফলে শিশুরা পরিবারে নিজেদের মূল্যহীন ভাবতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং ভীত ও উদ্বিগ্ন অবস্থায় দিনাতিপাত করতে থাকে। সন্তানদের সাথে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি কিংবা শাস্তি প্রদান সাময়িকভাবে পিতা-মাতার আদেশ পালনে বাধ্য করলেও পরবর্তী সময়ে এটা শিশুদের দুর্বল আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলে; এমনকি তাদের সৃজনশীলতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও হ্রাস করে দেয়। গবেষণায় দেখা যায়, এই ধরনের আচরণ মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের ওপর বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অনেক পিতা-মাতা সন্তানদের ইচ্ছেমতো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এবং তার ওপর নিজের কর্তৃত্ব খাটানোর খায়েশে এই ধরনের পন্থা বেছে নেয়। নিজেদের হতাশা মেটানোর জন্যও তারা এই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, শিশুরা কারও অথবা ধৈর্যধারণ করার মতো কোনো বস্তু নয় অথবা রোবটসদৃশ কোনো বস্তুও নয়, যাদের ওপর নিজেদের মর্জি মোতাবেক অযৌক্তিক নির্দেশনা প্রদান করা যাবে। শিশুরাও মানুষ। তাই এই সীমা-পরিসীমার মধ্যে রেখেও তাদের ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই সমস্ত সীমা-পরিসীমার সঙ্গে যেন রূঢ়তা ও কাঠিন্যের পরিবর্তে মায়া-মমতার পরিমাণ বেশি থাকে।
২. স্বীকৃতিমূলক : এই পদ্ধতিতে পিতা-মাতা সন্তানদের নিজের ইচ্ছামতো চলতে দেন। তাদের ওপর কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেন না। অভিভাবক সন্তানদের নিকট কোনো কিছু দাবি করেন না। ফলে সন্তানরাই পরিবারের হর্তাকর্তা হয়ে যায়।
এটি সন্তান ও পিতা-মাতার সম্পর্কের অপরাধবোধের নানা সমস্যার কারণ। কারণ, নিজেদের জীবনেও পিতা-মাতার ভুল জীবন যাপন করার কারণে নিজেদের জীবনকে বৃহৎ অভিজ্ঞতার কাজে লাগিয়ে সন্তানদের দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের যথাযথ পরিচর্যা করা, যাতে তারা শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কোনোভাবেই তাদের নিজেদের খামখেয়ালিয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত না। সন্তানদের ওপর এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং আত্মহত্যারই পরিচারক। এমনটি করা হলে এই ধরনের সন্তানরা অপরিপক্ব ও স্বার্থপর হয়ে বেড়ে ওঠে। একইসাথে সামাজিক দায়িত্ব ও স্বাধীনতার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে হিমশিম খায়।
অনেক পিতা-মাতা সন্তান প্রতিপালনে নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন। আবার কেউ কেউ আছেন, সন্তানদের কোনো পরামর্শ বা বিধিনিষেধ দেওয়া হলে তারা আঘাতপ্রাপ্ত হবে অথবা তারা এই ভয়ে তারা এই ধরনের পদ্ধতি বেছে নেন।
মূলত সন্তান প্রতিপালনের ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণেই তারা এই পদ্ধতির আশ্রয় নেন। সন্তানকে ইচ্ছামতো চলতে দেওয়া কারণেই তারা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে একটি স্বস্তি প্রকাশ করে, কিন্তু এর মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। পিতা-মাতা যদি একজন পথপ্রদর্শক ও পরামর্শক হিসেবে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, তবে অবশ্যই তারা ভালোবাসা ও সম্মান পাবেন।
৩. পরিশ্রুতপূর্ণ : এই পদ্ধতি সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য উপায়। এখানে পিতা-মাতা কর্তব্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং তাদের বেঁধে দেওয়া সীমারেখা অনুযায়ী শিশুরা চলাফেরা করে। এই পদ্ধতি গড়ে উঠে সন্তান ও অভিভাবকের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা, পরামর্শ, নমনীয়তা ও সুসম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। সচেতন অভিভাবক সন্তানদের পরিচালনার ধরন বুদ্ধিবৃদ্ধিক উপায়ে, কোনো রকম উচ্চবাচ্য ছাড়াই। তারা সন্তানদের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সন্তানদের কাছে এর কারণ ব্যাখ্যা করেন। কোনো প্রকার চিৎকার-চ্যাঁচামেচি না করে তারা সন্তানদের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করান। সন্তানদের জন্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে তারা নিজের ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্য ও আত্মমর্যাদা প্রকাশের সুযোগ পায়। সন্তানরাও অবশেষে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করে, যাতে পিতা-মাতা সম্মান বজায় থাকে এবং ভালো সম্পর্কও সৃষ্টিতে প্রকাশিত হয়।
এই ধরনের পরিবারিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা সাধারণত সুখী ও আত্মবিশ্বাসী হয় এবং জীবনে আসন্ন সকল ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষতা অর্জন করতে শেখে। সামাজিকভাবে তারা দায়িত্বশীল, উদ্যমী ও নির্ভীক হয়। এই ধরনের সন্তানরা পিতা-মাতার অন্তরকে প্রশান্তির জোয়ার এনে দেয়, যা পিতা-মাতার জন্য এক বিরাট সম্পদ। রাসুল ﷺ বলেছেন— ‘এক মুমিন আরেক মুমিনের আয়না-স্বরূপ।’ আবু দাউদ
পিতা-মাতা নিঃসন্দেহে সন্তানদের জন্য আয়না-স্বরূপ। সন্তানরা পিতা-মাতাকে গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারে, তারা কতটুকু ভালোবাসা, সম্মান ও আস্থা অর্জনের যোগ্য। শিশুরা কেবল তখনই পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, যখন তারা অনুভব করে— পরিবারে তাদের মূল্যায়ন এবং পরিবারের মূল্যবান সদস্য হিসেবে তাদের বিবেচনা করা হচ্ছে।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 আত্মগঠনের সময়

📄 আত্মগঠনের সময়


বারো মাস বয়স থেকে শিশুর বোঝার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময় থেকেই শিশু জুতা পরিধান করা, নিজে নিজে হাঁটতে শেখার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে শেখে। একই সঙ্গে তারা মুখে কথা বলতে শেখে এবং তাদের চারপাশের বিশ্বকে উপলব্ধি করতে ব্যস্ত থাকে। এই সময়ে পিতা-মাতার উচিতও সার্বিকভাবে শিশুর আশেপাশে থাকা। কারণ, এই সময়ে পিতা-মাতাকে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে সার্বক্ষণিক সচেতন থাকতে হয় এবং শিশুর সাধারণ কৌতূহল মেটানোর জন্য যোগ্য সঙ্গী হতে হয়।
সন্তান ও পিতা-মাতার সম্পর্ক গতিশীল ও আদান-প্রদানমূলক। পিতা-মাতার কর্তৃত্ব হয়তো ছোটোকালেই সন্তানদের সাথে এই দৃঢ় সম্পর্ককে ভিত গড়ে তোলা। Toddler সন্তানদের প্রতিপালনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার মনোবিজ্ঞানী কিংবা শিক্ষাবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে স্বাভাবিকভাবে সন্তানের চাহিদা ও মানসিক অবস্থা বোঝার মতো দক্ষতা অর্জন জরুরি—যাতে সন্তানদের পরিচর্যা ও প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় বিকাশের পর্যায়গুলো বুঝলে তাদের চাহিদা বোঝা ও পূরণ করা সহজ হয়। সময়ের সাথে পাণ্ডিত্য দিয়ে শিশুদের দক্ষতা ও পৃথিবী সম্পর্কে জানানোরো বুদ্ধি পায়। তারা রপ্ত করতে থাকে— কীভাবে মানুষের সাথে চলাফেরা করতে হয় এবং অভ্যাস গঠন করতে হয়।
একটি শিশু বেড়ে ওঠার প্রায় পুরোটা সময় নানা ধরনের খেলাধুলার মধ্য দিয়েই কেটে যায়। দৌড়াদৌড়ি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, উঁচু জায়গায় ওঠা, এটা-ওটা ছুঁড়ে মারাসহ বিভিন্ন শারীরিক কার্যক্রম তাদের শরীর গঠনে সহযোগিতা করে। এগুলো করতে করতে তারা অনেক ধরনের কথাও শিখে যায়।
প্রতিটি শিশু আলাদা আলাদা প্রকৃতির। মজার ব্যাপার হলো—ছেলে ও মেয়ে শিশুরা ছোটোকাল থেকেই ভিন্ন ভিন্ন খেলাধুলা করে। ছেলে শিশুরা সাধারণত ঘরের বাইরে খেলার ছেলেদের সাথে খেলতে পছন্দ করে। তারা অপেক্ষাকৃত কঠিন বা শারীরিক পরিশ্রমের খেলা পছন্দ করে এবং খেলার মাধ্যমে অন্যকে পরাজিত করতে চায়। অন্যদিকে মেয়েরা ঘরোয়া ও কমজোর খেলায় অভ্যস্ত হয়। শিশুদের এই প্রকৃতিগত পার্থক্য খুবই চমৎকার!
খেলাধুলাকে ক্ষুদ্র বিষয় মনে হলেও এই মাধ্যমেই শিশুরা তাদের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে জানতে পারে। খেলাধুলার মাধ্যমেই তাদের মধ্যে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য চরিত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। শারীরিক পরিশ্রমের কারণে আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে যে সমস্ত খেলায় চিন্তাশক্তির ব্যবহার করতে হয়, তা শিশুদের সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী হতে সহায়তা করে। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়, বিশেষ করে নির্মল আবহাওয়ায় শিশুদের খেলার অনুমতি দেওয়া উচিত। এটা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শারীরিক কার্যক্রম ও বিনোদনের ওপর গুরুত্বারোপের ক্ষেত্রে রাসুল ﷺ এক চমৎকার উদাহরণ। বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হওয়ার পরও তিনি তাঁর স্ত্রী আয়িশা রা.-এর সাথে খেলাধুলা করতেন এবং শিশুদের খেলা দেখতে পছন্দ করতেন।
আকার-আকৃতিতে শিশুরা তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে, তবে খুব দ্রুত বেড়ে উঠে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের চেয়ে তাদের মগজ দ্রুত পরিপক্ক হয়। বিজ্ঞানী জনস গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ বছর বয়সে শিশুর মস্তিষ্ক বড়োদের মস্তিষ্কের তুলনায় দশ ভাগের নয় ভাগ পরিণত হয়; অথচ একই বয়সে তাদের শরীর পরিণত হয় বড়োদের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এই জন্য এই বয়সটা কুরআন মুখস্থ করার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সময়। অনেক প্রখ্যাত ইসলামি মনীষী ছোটো বয়সেই কুরআনের হাফেজ হয়েছেন।
মুখস্থশক্তি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। তবে শিশুরা এই বয়সে যে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করতে শেখে, তা হলো চিন্তাশক্তি। তাই তাদের শেখাতে হবে—কীভাবে সৃজনশীল হতে হয় ও মুক্ত মনে চিন্তা করতে হয়।
মুক্ত মনের ব্যাপারে চমৎকার একটি প্রবাদ রয়েছে— ‘তোমার মন একটি প্যারাশুটের মতো। এটা কেবল তখনই কাজ করে, যখন এটি খোলা হয়।’
সৃজনশীল চিন্তার অধিকারী ব্যক্তিরা এমন একটি উৎপাদনশীল ও গতিশীল সমাজ পরিচালনা করতে সক্ষম হয়, যেখানে সবাই নিজেদের কার্যক্ষমতাকে কাজে লাগায়ে পারে।
অনেক পিতা-মাতা সন্তানদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরাতে ভয়ে তাদের সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তায় বাধা প্রদান করে। তারা মনে করে, এই ধরনের স্বাধীন মানসিকতা ও সৃজনশীলতা ইসলামে বিরুদ্ধে; কিন্তু এই ধারণা সত্য নয়। মূলত সৃজনশীল চিন্তা শিখরে শেখায় নিজের মনকে চ্যালেঞ্জ করতে, মনের দিগন্ত বিস্তৃত করতে, বক্সের বাইরে চিন্তা করতে, নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে এবং সৃজনশীল আইডিয়া তৈরি করতে।
ছোটোটা বয়স থেকেই শিশুরা যেন সৃজনশীল চিন্তাশক্তি অর্জন করতে পারে, এমন কিছু পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলো—
• মেঘা ঘটাতে হয়—এমন ধাঁধা ও খেলায় শিশুদের অংশগ্রহণ করান।
• শিশুকে নিয়ে নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো; হতে পারে আত্মীয়স্বজনের বাসায় কিংবা বাইরের কোনো এলাকায়।
• শিশুকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যর ব্যাপারে চিন্তা করতে দিন।
• তাদের দৈনন্দিন রুটিনকে ভিন্ন উপায়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করুন। আপনি যে কাজগুলো নিয়মিত করছেন, সেগুলো কীভাবে ভিন্ন উপায়ে করা যায়—সে ব্যাপারে তাদের জিজ্ঞেস করুন।
• বিভিন্ন অবস্থার আলোকে তাকে কাল্পনিক গল্প বলতে বলুন।
• কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি করে—এমন বিভিন্ন ধরনের বই তাদের সামনে পড়ুন।
• দিনের বিভিন্ন কার্যক্রম, অনুভূতি ও চিন্তার ব্যাপারে তাদের সাথে আলাপ- আলোচনা করুন।
এটা খুবই আশ্চর্যজনক, খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে শিশু অসহায় অবস্থা থেকে একটি ছোটো মানুষে পরিণত হয়, যে কিনা নানান শব্দ, চিহ্ন ও তার দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবতে পারে, দু-একটা কথা বলতে শেখে, সৃষ্টিকর্তাকে কাজে লাগাতে পারে এবং যৌক্তিক চিন্তা করার সক্ষমতা অর্জন করে।

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 ভারসাম্যপূর্ণভাবে বেড়ে উঠার জন্য যা প্রয়োজন

📄 ভারসাম্যপূর্ণভাবে বেড়ে উঠার জন্য যা প্রয়োজন


পিতা-মাতা হিসেবে আমরা সন্তানদের জীবনে একটা শ্রেষ্ঠ গুণ এনে দিতে চাই। این উদ্দেশ্যে আমরা তাদের জন্য অর্থ কমিয়ে প্রায়, প্রাইভেট শিক্ষার ব্যবস্থা করি এবং আমরা ছোটোকালে যে জিনিস পাইনি, তা তাদের কিনে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু পিতা-মাতার পক্ষ থেকে সন্তানদের জন্য সর্বোত্তম উপহার হলো – তাদের এমন একটি জায়গা তৈরি করে দেওয়া, যা তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা এনে দেবে। এই জায়গা কাঁচি হলো – অন্তর ও আত্মার প্রশান্তি। এই প্রশান্তি আনার জন্য পিতা-মাতার কর্তব্য হলো – সন্তানদের শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতি নজর দেওয়া। পিতা-মাতা যখন এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে পূর্ণ মনোযোগী হবেন, কেবল তখনই তাদের এমন সন্তানে প্রত্যাশা করা সাজে, যে হবে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ও গতিশীল মানুষ। জীবনের ব্যাপারে তার থাকবে স্বচ্ছ ধারণা। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ অর্জনের ক্ষেত্রে সে হবে ভারসাম্যের প্রতীক।
জীবনের বিভিন্ন সমস্যা, দুর্দশা কিংবা হতাশা থেকে আমরা সব সময় সন্তানদের রক্ষা করতে পারব না। সব সময় তাদের জন্য মনের মতো করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারব না। তবে জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের সাথে মানিয়ে নেওয়ার যে দক্ষতা তাদের শিক্ষা দিয়েছি, তার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে পারি।
শিশুরা পিতা-মাতা ও আশপাশের মানুষদের দেখতে দেখতে বেড়ে ওঠে। এ সময় তারা যার ব্যক্তিত্বকে ইউনিক মনে, তার মতো করেই নিজের ব্যক্তিত্ব গঠন করে। তাই একটি শিশুর জীবনে বংশীয় প্রভাবের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রতিপালন, শারীরিক যত্ন, শিক্ষা, ভালোবাসা, পারিবারিক নিয়মকানুন ইত্যাদি বিষয় শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এবং এর ওপর ভিত্তি করেই তাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। সবশেষে পিতা-মাতা যত্নের দেখতে হবে, শিশুকে কাঙ্ক্ষিত মনে গড়ে তুলতে তারা নিজ সামর্থ্যের কতটুকু ঢেলে দিতে পেরেছে। এরপর বাকি অবস্থার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। অর্থাৎ নিজের যতটুকু করার তা সম্পন্ন করার পর ভরসা করতে হবে আল্লাহর ওপর।
এই উগ্রাধুনিক শিল্পোন্নত বিশ্বে মুসলিম শিশুরা স্বভাবের জয়জয়কার অবস্থার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছে। এই আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির অর্থ হলো আত্মকেন্দ্রিকতা, প্রতীয় কর্তৃত্বের প্রতি অবিশ্বাস এবং অসহ্য প্রতিযোগিতা। ভোগ ও প্রবৃত্তির অনুসরণই এখানে নৈতিকতার মানদণ্ড। পারিবারিক নিয়মানুবর্তিতার অভাব এবং শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তির অনুপস্থিতি তরুণদের অবাধ যৌন মেলামেশা, মাদকাসক্তি ও সহিংসতামুক্ত করে অপরাধে অভাব করে ফেলছে। পাশাপাশি তাদের নারী-পুরুষের নির্ধারিত দায়িত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ করে তুলছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া এই অবাধীনতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে, যার চোট এসে পড়েছে আমাদের ঘরেও।
সন্তানের অভিভাবক হিসেবেও সব সময় সামাজিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াকে হয়তো অযৌক্তিক মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো – এই সমাজেই আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠবে। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম পিতা-মাতা সন্তানদের মাঝে থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না, আবার এই জাহেলিয়াতের সাগরে তাদের নিমজ্জিতও করতে পারেন না। এই বিশাল সমুদ্রে তাদের পথ দেখানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো – তরুণ বয়সেই তাদের এমন জীবনে অভ্যস্ত করাতে হবে এবং এমন দক্ষতা শেখাতে হবে, যা সে প্রাজ্ঞবয়সে কাজে লাগাতে পারবে। একটি শিশুকে ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ –
জীবনের সূচনালগ্নে ইসলামি চেতনা জাগ্রত : এই নেতিবাচক আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো – শিশুদের জীবনের শুরুতেই ইসলামি চেতনার বীজ বপন করে দেওয়া। শিশুরা সাধারণত এক বছর বয়স থেকেই দুই-একটা করে কথা বলতে শেখে। দুই বছর বয়স তারা গড়ে প্রায় দুইশো শব্দ শিখে ফেলে। দুই বছর বয়সের পর তাদের এই উন্নতি আরও ত্বরান্বিত হয়। তখন তারা শব্দগুলো বুঝতে পারে এবং চিন্তা করতে শেখে। তাদের ভাষাগত দক্ষতা আরও বৃদ্ধি পায়, যখন তাদের চারপাশের সবাই তাদের সাথে শিশুসুলভ কথা বলে। তাই পিতা-মাতার উচিত শিশুদের সাথে ছোটো ছোটো বাক্যে অর্থপূর্ণ কথা বলা। তাদের সামনে ভালো মানের ছড়া আবৃত্তি করা, আকর্ষণীয় উপস্থাপনশৈলী ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ছোটো গল্প বলা এবং পারিবারিক বিভিন্ন ঘটনা বলা ইত্যাদিও শিশুর মাঝে শিশুকে আলোকিত করে এবং বিভিন্ন বিষয় শেখার ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহী করে তোলে।
শিশুরা সেই শব্দগুলো বেশি শেখে, যা তারা আশপাশের মানুষদের স্বাভাবিক কথাবার্তায় শোনে। সুতরাং প্রাজ্ঞবয়স্করা যদি একে অপরের অভিধান জানানোর ক্ষেত্রে সালামের ব্যবহার করে এবং কথাবার্তায় ইনশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ প্রভৃতি ফুদায়ার ব্যবহার করে, তাহলে শিশুরাও বড়োদের দেখাদেখি আপনা থেকেই এসব বাক্য শিখে যাবে। দেখা যাবে, যেখানে দরকার, সেখানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব বাক্য ব্যবহার করছে এবং তা কোনো রকম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই। একইভাবে পরিবারের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে যদি সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে শিশুরাও অবচেতন মনে এই সমস্ত বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।
সন্তানদের উপযুক্ত সঙ্গ দেওয়ার জন্য পিতা-মাতার উচিত তাদের বিভিন্ন বই পড়ে শোনানো। এই বইগুলো অবশ্যই তাদের বয়সোপযোগী হতে হবে। এতে শিশুদের জ্ঞানের দিগন্ত যেমন বিস্তৃত হয়, তেমনি তাদের মনে বইয়ের প্রতি স্থায়ী আকর্ষণও তৈরি হয়। বাজারের সাধারণ বইয়ের পাশাপাশি অনেক সুন্দর সুন্দর ইসলামিক বইও পাওয়া যায়, যেগুলোতে চমৎকার সব বিষয় আলোচিত হয়েছে। ইসলামি বই বলতে শুধু নবি-রাসুলদের গল্প কিংবা ইসলামের ইতিহাসের ছোটোখাটো বিষয় বোঝায় না; বরং বাজারে এমন অনেক বই রয়েছে, যেগুলোতে কোনো মুসলিম মনীষী কিংবা মুসলিম সভ্যতার ঘটনা নিয়ে লিখিত হয়েছে। সেগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। বাচ্চাদের সামনে এগুলো পড়া হলে এই সমস্ত বিষয়ের সাথে তারা ভালোভাবে পরিচিত হতে পারে।
সন্তানদের সক্ষমতা বুঝে উপদেশ : অনেক পিতা-মাতা অনভিজ্ঞতার কারণে অল্প বয়সেই সন্তানদের উচ্চতর পর্যায়ের দ্বীনি শিক্ষা দিতে চান। এক্ষেত্রে তারা সন্তানদের বয়সের ব্যাপারটা বিবেচনা করেন না। কিন্তু মনে রাখা দরকার, জীবনের অন্যান্য দক্ষতাগুলোর ন্যায় দ্বীনের উপলব্ধিও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পায়। তাই সন্তানদের বয়স এবং বোঝার সক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখেই তাদের আস্তে আস্তে ধারাবাহিকভাবে দ্বীন শেখাতে হবে।
নবি-রাসুলদের কাহিনি কিংবা ইসলামের ইতিহাসও অন্য কোনো ঘটনার ন্যায় সব সন্তানদেরই এই কথা বোঝাতে হবে – এগুলো বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা; কোনো সাজানো গল্প নয়। বর্তমানে বিনোদন জগতের পুরোটাই রূপকথার গল্প, উপন্যাসিক চরিত্র ও তথাকথিত মিডিয়া সেলিব্রেটিদের দখলে। সন্তানদের মধ্যে এই দুই ধরনের বিনোদনের মধ্যে পার্থক্য করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
সন্তানদের সামনে দ্বীনের কোনো বিষয় এমন কঠিনভাবে উপস্থাপন করা যাবে না, যাতে তারা ভুল বুঝে বসে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অভিভাবক সন্তানদের ভয় দেখানোর জন্য আল্লাহর ক্রোধ, শাস্তি এবং মানুষের খারাপ কর্ম নিয়ে রাক্ষসের মতো বিষয়গুলো তাদের সামনে ঘনঘন তুলে ধরেন। এতে শিশুদের মনে আল্লাহর ব্যাপারে অনাকাঙ্ক্ষিত ধারণা সৃষ্টি হয়। তারা মনে করে, আল্লাহ হচ্ছেন প্রতিশোধপরায়ণ ও শাস্তিদাতা, যাকে শুধু ভয়-ই করা যায় (আসতাগফিরুল্লাহ!)। কোমল অন্তর ও মন কেবল তখনই সবকিছু গ্রহণ করার জন্য তৈরি হয়, যখন তাদের ভয় ও লজ্জার পরিবর্তে ভালোবাসা ও দয়ার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়।
আচার-আচরণ ও অভ্যাস : সন্তানদের নিকট পক্ষ থেকে উত্তম আচরণ, উত্তম চরিত্র ও উত্তম শিক্ষার বাইরে বড়ো উপহার আর নেই। /'তিরমিজি
ইসলামি শিক্ষা শুধু শিশুদের সাজ ও রীতিনীতি শেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জীবনের সার্বিক বিষয় প্রতিটি পদক্ষেপেই বিস্তৃত। জীবনের প্রতিটি বিষয়ের জন্যই শিশুর ইসলামি চরিত্র শিক্ষা দিতে হবে। শিশুদের ইসলামি চরিত্র জন্মগত না করে শুধু ফিকাহর নিয়মকানুন ও কুরআন শুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ প্রদান করলে সে শিক্ষা অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। কারণ, একজন মুসলিমের চরিত্রই প্রশিক্ষণের প্রতিচ্ছবি ঘটায়। রাসুল তাঁর চরিত্রবান মানুষ তৈরির জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সচ্চরিত্র ও সুমহান মর্যাদার প্রতীক।
সন্তানদের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তোলার মূল শর্ত হলো – তাদের সব কাজের আদর্শ ও অসংখ্য নীতির শিক্ষা দেওয়া। এই ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে – সন্তানদের সর্বোচ্চ মনোযোগ ও নৈতিকতার মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা, যাতে একজন গর্বিত মুসলিম হিসেবে তারা ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। তারা যেন শুরু থেকেই ইসলাম ও সমসাময়িক বিষয়ের ওপর যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে পারে, সে ব্যাপারেও আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এই বিষয়টি সন্তানদের কিশোর ও যুবক বয়সে নীতি নির্ধারণে গিয়ে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সমাজের সকলের সাথে মিশে সহযোগিতা করে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করবে এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখার ক্ষেত্রেও তা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করবে। এটা বিশেষ সকল প্রকার মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যবোধ ও নৈতিকতা মানুষের উত্তম চরিত্র গঠন ও প্রকাশে সাহায্য করে। আপনি চরম মুহূর্ত অতিক্রম করেছেন – এমন পরিস্থিতিতেও যদি কাউকে কিছু বলার ক্ষেত্রে 'দোয়া করে' বা 'ধন্যবাদ' – এর মতো সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেন কিংবা করেও প্রশ্ন উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে অমায়িক ও আন্তরিকতার সাথে উত্তর দেন, তাহলে তা আপনার মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে উত্তমভাবে প্রকাশ করবে। মহৎ চরিত্র গঠিত হয় ক্ষমা ও কাজ, ভদ্রতা, উত্তম বচন, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, সহানুভূতি, স্পষ্টবাদিতা প্রবৃত্তির মাধ্যমে; যা কারও দুঃখের কারণ হয় না। ওই ব্যক্তিই মহৎ চরিত্রের অধিকারী, যে কঠিন পরিস্থিতিতেও দান করে এবং অপরের সেবাকে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। রাসুল (সা.)-এর চরিত্র তো অনুকরণীয় ছিল, সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করার জন্য তাঁর জীবনী অধ্যয়ন খুবই জরুরি। আমাদের কর্তব্য হলো – ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে এই ধরনের শিষ্টাচার রক্ষা করা, যাতে আমাদের সন্তানরা উত্তম চারিত্রিক ও গুণাবলির মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে পারে।
যেমনটি আগেই বলা হয়েছে, শিশুদের শিক্ষাদান প্রক্রিয়া গর্ভধারণের দিন থেকেই শুরু করা উচিত। শিশুর জীবনের প্রাথমিক বছরগুলো পরের বছর পর্যন্ত সময়ও তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে তাদের ওপর চারপাশে সংঘটিত যেকোনো কিছু গ্রহণ করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকে। ফলে এই সময়ে শেখা বিষয়গুলো তাদের অন্তরের দীর্ঘস্থায়ী ছাপ এঁকে দেয়। শিক্ষাদান একটি প্রাকৃতিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এখানে কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি করা উচিত না। তত্ত্বের চেয়ে উদাহরণের মাধ্যমে শেখাটা বেশি কার্যকর হয়। শিশুরা যখন পাঠ্যপুস্তকে কোনো জিনিস শেখে, কিন্তু বাস্তবে পিতা-মাতার ঠিক তার উল্টোটো করতে দেখে, তখন তারা সন্দেহ-সংশয়ে পড়ে এবং এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠে।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ হলো গতিশীল ও সক্রিয় প্রক্রিয়া। চেষ্টা ও ভালো মানুষের সাহচর্যের মাধ্যমে উত্তম মানবীয় গুণাবলির বিকাশ ঘটে। ইসলাম এমন এক সহজবোধ্য জীবনব্যবস্থা, জীবনের সকল ক্ষেত্রে যার পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা রয়েছে। এই সমস্ত দিকনির্দেশনা শিশুরা কেবল বড়োদের মাধ্যমেই জানতে পারে। তাই বড়োদের উচিতও এসব নির্দেশনা আস্তে আস্তে তাদের চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া; যাতে তারা সূচনালগ্ন থেকেই সব কর্মের চর্চা করতে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে। এক্ষেত্রে ভালো ফলাফলের জন্য সর্বোত্তম উপায় হলো – পিতা-মাতার পক্ষ থেকে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ। সতর্কতার সাথে এই ধারাবাহিকতার প্রথম পথ দেখানোর ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভূমিকা অপরিসীম। অতি উৎসাহ নিয়ে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের থেকে উন্নততর কিছু প্রত্যাশা করার আগে পিতা-মাতার উচিত তাদের পরিপূর্ণতা ও বয়সের বিষয়টি মাথায় রাখা।
প্রতিদান, নিয়মানুবর্তিতা ও আত্মমর্যাদা : সামাজিকভাবে দক্ষ হওয়ার সাথে সাথে ছেলেমেয়েদের মাঝে আত্মচেতনাও বৃদ্ধি পায়। এটি জীবনের এমন এক পর্যায়, যখন তাদের মধ্যে ভালো-মন্দের যথাযথ ধারণা সৃষ্টি করা জরুরি। এই সময় সফলতা অর্জনের খুব বেশি আকাঙ্ক্ষী করে তোলে, আবার ব্যর্থতা, সংশয় ও নিরাশায় নিমজ্জিত করে। পিতা-মাতার উচিতও সন্তানদের এই ধরনের মানসিক স্থিতির উত্থান-পতন থেকে রক্ষা করা। এবং পিতা-মাতার কর্তব্য হলো— সন্তানদের মানসিক স্থিরতা ও দুশ্চিন্তার জন্য নিজের শান্ত রাখা, তাদের বুঝতে শেখা এবং তাদের সামনে নিজেদের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা।
ছোট শিশুরা হচ্ছে ‘কাঁচামালের’ ন্যায়। পিতা-মাতা ও বড়োদের কর্তব্য হলো— তাদের ‘উত্তমমানের পণ্য’ হিসেবে তৈরি করা। শিশুদের নিয়মের মধ্যে বড়ো করা উচিত। কারণ, তারা তাদের চারপাশের সবকিছুর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। এর অর্থ হচ্ছে—তাদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করার আদব শিক্ষা দেওয়া। সন্তানদের এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে, যেন তাদের মধ্যে সৎ কর্মের পর আনন্দদায়ক অনুভূতি এবং মন্দ কর্মের পর অনুশোচনার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। ছোট্ট বয়সেই যদি এ ধরনের শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে তাদের পরবর্তী জীবনের কার্যক্রমে এর প্রতিফলন ঘটবে।
অনেকে মনে করে, শাস্তি প্রদান ও ধমকই শিশুদের নিয়মের মধ্যে রাখার একমাত্র উপায়। এই ধারণা সঠিক নয়। শিশুদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে সঠিক বিচার, ধারাবাহিকতা ও সুবিচারের দিক অবশ্যই নজর রাখতে হবে। সন্তানদের প্রতিপালনের সময় কিংবা তাদের শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়ার সময় তারা যেন পিতা-মাতা উভয়ের কাছ থেকে একই ধরনের শিক্ষা লাভ করে—এই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পিতা-মাতার কাছ থেকে ভিন্ন ধরনের আচরণ সন্তানদের মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি করে, যা তাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মধ্যে নিপতিত করে।
কোনো কাজে পিতা-মাতার বিধিনিষেধ শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড়ো শাস্তি। এই জন্য শিশুদের ওপর কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তার কারণ তাদের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। এতে তারা বুঝতে পারবে, পিতা-মাতা তাদের অপছন্দ করার কারণে নয়; বরং তাদের আচরণকে ঠিক করার জন্যই এই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে শুধু মাত্রাতিরিক্ত অযোগ্যনীয় আচরণের ক্ষেত্রে সন্তানদের ওপর শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে; অন্যথায় সন্তানদের শাসনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সন্তান পরিবেশে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। বড়ো ধরনের শাস্তি তাদের সাময়িকভাবে কোনো কাজ থেকে বিরত রাখলেও তা কখনো আচরণগত মন্দ অভ্যাস কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে না। ভারী শাস্তি শিশুদের থেকে ভয় পাওয়ার অনুভূতি কেড়ে নেয়। এতে তারা ‘থোড়াই কেয়ার’ হয়ে ওঠে।
সবার সামনে শিশুদের লজ্জা দেওয়া কিংবা হেয় করা তাদের আত্মমর্যাদার ক্ষেত্রে হানিকর। কিছু প্রবাদ রয়েছে। যেমন : ‘সবার সামনে ভালোবাসুন’, ‘গোপনে সংশোধন করুন’ এই ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের মধ্যে এই বিশ্বাস জাগ্রত করতে হবে যে, শাস্তি দেওয়ার পরও পিতা-মাতা তাদের ভালোবাসে।
সন্তানের যেকোনো সফলতায় (তা যত ছোটোই হোক না কেন) পিতা-মাতা গর্ভবোধ করেন। সন্তানের যেকোনো অর্জনে সরাসরি ও খোলাখুলিভাবে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো কিছু অর্জনের পর তার
যথাযথ স্বীকৃতি তা আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে। পিতা-মাতা ও বড়োদের কাছ থেকে স্বাভাবিক প্রশংসামূলক বচন শিশুদের অন্তর নিজেদের সম্পর্কে ভালো অনুভূতি সৃষ্টি করে। তা তাদের আত্মবিশ্বাসকে পুনর্জাগরিত করার পাশাপাশি সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। ‘কঠিন পরিশ্রম করার পর সফল না হলেও কষ্ট পেয়ো না, তুমি ভবিষ্যতে ভালো করবে, ইনশাআল্লাহ’—পিতা-মাতার পক্ষ থেকে এই ধরনের আন্তরিক কথা এবং উৎসাহ শিশুদের আত্মমর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক। কারও আত্মবিশ্বাস হ্রাস করা খুবই সহজ; শুধু একটি নেতিবাচক চাহনি কিংবা কয়েকটি মন্তব্যই এর জন্য যথেষ্ট।
বড়োদের পক্ষ থেকে শিশুদের প্রতি বলা প্রত্যেকটি শব্দ দ্বারা খুব মনোযোগের সাথে শ্রবণ করে; যদিও বড়োরা এই সমস্ত শব্দ ঠাট্টাচ্ছলে উচ্চারণ করে। শিশুদের প্রশংসা ও শাসনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে সাবধান থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে উচ্চ আওয়াজে কথা না বলাই উত্তম। ছোটো কোনো ভুলের সংশোধনের জন্য শাস্তি প্রদান কিংবা ধমক দেওয়া কখনো উত্তম সমাধান নয়; বরং তাদের মধ্যে এই অনুভূতি তৈরি করতে হবে, এ ধরনের ভুল করার তাদের জন্য হানিকর এবং অমঙ্গলজনক।
অনেক পিতা-মাতা একটি সাধারণ ভুল করে থাকেন। তারা সন্তানের ভালো আচরণকে উপেক্ষা করে শুধু তাদের শাসনই করতে থাকেন। ভালো কাজের প্রশংসা না করে শুধু মন্দ আচরণের শাসন শিশুদের মূলত মন্দ কাজের দিকেই ধাবিত করে। সন্তানদের ভালো কর্মের স্বীকৃতি, প্রশংসা ও উৎসাহ দিতে হবে। এটা তাদের আচরণগত সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যে সময় শিশুদের অবশ্যই প্রশংসা করতে হবে। যেমন : তারা যখন অন্যদের প্রতি সততা, আন্তরিকতা, সম্মান, শিষ্টাচার, প্রদর্শন করে তখন।
শিশুদের শাসন করার উত্তম উপায়গুলো নিচে দেওয়া হলো—
* প্রশংসা কিংবা শাসন করার ক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করুন
* উপযুক্ত সময়ে প্রশংসা কিংবা শাসন করুন
* প্রশংসা করার ক্ষেত্রে সংগত আচরণ এবং সতর্ক হোন
* কাজের ধরন অনুযায়ী প্রশংসা এবং শাসন করুন
* প্রশংসা ও শাসনের যথাযথ কারণ তাদের অবহিত করুন
* প্রশংসা কিংবা শাসন কাজ করছে কি না, সেদিকে লক্ষ রাখুন
* শাসনের পরও সন্তানদের ভালোবাসা প্রদর্শন থেকে বিরত থাকবেন না।
এ বয়সে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় টয়লেট ট্রেনিং এবং ব্যবহারিক পরিচ্ছন্নতা : ইসলামে তাহিরাত (পরিচ্ছন্নতা) বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সালাত আদায়ের পূর্বশর্ত। জন্ম থেকেই শিশুদের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে পিতা-মাতাকে সচেতন হতে হবে। শিশুদের পরিধানের নিচের অংশ পরিবর্তনের সময় তাদের নিঃসংখ মুখে মোছার পরিবর্তে ধুয়ে ফেলাই উত্তম।
শিশু যখন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করতে শেখে, তখন থেকেই তাদের টয়লেট করার পদ্ধতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতা অর্জনের প্রক্রিয়া শেখাতে হবে। এই ব্যাপারে অনেক বই আছে—যেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে, যা শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
খাদ্য : একটি প্রবাদ রয়েছে—‘তুমি তা-ই, যা তুমি আহার করো।’ এই কথাটি একদম বাস্তব সত্য। পিতা-মাতা কর্তৃক দেওয়া জুনি থেকেকেই সন্তানের আহার এবং পানীয়ের দিকে লক্ষ করা। খাদ্য শুধু হালাল হলে চলবে না; সেটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদ্য কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। বড়ো হওয়ার সাথে সাথে শিশুদের হালাল-হারামের ব্যাপারে যথাযথ ধারণা দিতে হবে।
ব্যস্ততার সময় রেডিমেড খাদ্যসামগ্রী অনেক কাজে লাগাতে পারে। তবে খাঁটি উপাদান দিয়ে নিজ ঘরে তৈরি-কৃত খাদ্যের অনেক উপকার রয়েছে। পরিবারের সবাই যদি দিন অন্তত একবেলা একসঙ্গে বসে খেতে পারে এবং সবার সাথে ওই দিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারে, তাহলে পারিবারিক কল্পনা তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই ধরনের অভ্যাসের ফলে শিশুরা সবার সাথে একসঙ্গে বসে খাওয়ার শিষ্টাচার শিখতে পারবে। একই সঙ্গে এই ধরনের অনুশীলন পারিবারিক বন্ধনের এক উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। শিশুরা যেন তাদের পুরো শৈশবজুড়ে এই ধরনের কাজ অভ্যস্ত হয়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেক শিশু রয়েছে, যারা খেতে বসলে অস্বস্তি অনুভব করে, আবার অনেক ধীরে ধীরে খায়। তাদের জন্য সবার সাথে একসাথে বসে খাওয়াটা কার্যকর। কারণ, এতে তারা সবার মতো করে খেতে উৎসাহিত হয়, বিশেষ করে যখন তাদের সাথে তাদের সহোদররা খেতে বসে।
ক্রোধ ও হতাশা নিয়ন্ত্রণ : Toddler খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিরাট আকারের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। তারা এই সময় বাস্তব পৃথিবীর অনেক কিছুই বুঝতে পারে না এবং একই সঙ্গে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হিসিম খেয়ে হয়। যদি কোনো কারণে হতাশা, মানসিক অস্বস্তি ও রাগ তাদের গ্রাস করে, তখন তারা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে; হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে।
এই ধরনের মানসিক ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দুই ধরনের সমাধান রয়েছে এবং উভয় ধরনের সমাধান একই সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমে মানসিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ দূর করতে হবে। যে সকল শিশু প্রতিনিয়ত ভালোবাসা ও যত্নের মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং যাদের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করা হয়, তাদের মধ্যে সাধারণত মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
এইজন্য শিশুদের জন্য সুস্থ খাদ্য ও পানীয় নিশ্চিত করা, তারা যেন খুব বেশি ক্লান্ত, বিরক্ত, অতিরিক্ত আবেগি কিংবা শঙ্কিত না হয়—সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এর মাধ্যমে শিশুরা পিতা-মাতার ভালোবাসার যথাযথ প্রতিদান দেওয়ার উপায় সম্পর্কে জানতে পারে। পিতা-মাতা যদি সন্তানদের সামনে নিজেদের অনিয়ন্ত্রিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং তাদের সামনে চিৎকার-চ্যাঁচামেচির মতো খারাপ উদাহরণ তৈরি করেন, তাহলে ওই শিশুরাও এই সমস্ত কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পিতা-মাতার ধৈর্যহীনতা, অসহনশীলতা ও অস্থিরতা শিশুদের ওপর এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে শিশুরা ভীত হয়ে পড়ে এবং এদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ভুল ধারণা পায়।
সকলের জীবন একরকম নয়। সকল শিশু সন্তানই জীবনের প্রাথমিক বছরগুলোতে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভোগে। অনেক শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা বিশৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণ কিবা অযাচিত চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করতে পারে। সন্তানদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা তৈরি হলে পিতা-মাতার উচিত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এই সময় পিতা-মাতার কর্তব্য হলো নিজেদের শান্ত রাখা। কারণ, রাগ করার ফলে মানসিক অস্বস্তি আরও বেড়ে যায়। পরিস্থিতি এবং সন্তানদের বয়স ও পরিপক্কতার লেভেল অনুযায়ী পিতা-মাতা তাদের এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনবে অথবা এই ধরনের আচরণ মেনে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে আবেগের বহিঃপ্রকাশ করার অনুমতি দিতে পারেন। এক্ষেত্রে একটি আলিঙ্গন কিবা সান্ত্বনা অনেক ভালো কাজ দেয়।
শিশুরা প্রতিনিয়ত নানান কারণে আবেগয়ী হয়ে ওঠে। সুতরাং প্রাত্যহিক জীবনে এমন কতগুলো উপায় অবলম্বন করতে হবে, যা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এ ধরনের কিছু ভুল নিচে তুলে ধরা হলো—
* তাদের সামনে গল্প বলা, যেখানে আবেগের বিষয় আছে এই ধরনের ব্যাপারে তাদের সাথে আলোচনা করা।
* তারা যে ধরনের চিন্তা ঘটনার কারণে সমস্যা অনুভব করছে, তার সচিত্র ব্যাখ্যা প্রদান করা।
* খেলাধুলা করা। বিশেষ করে আউটডোরের খেলা আগ্রাসী মানসিকতা থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়।
* কারাতে কিংবা মার্শাল আর্ট শেখা যেতে পারে। এটা আবেগেক প্রশান্ত এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
টেলিভিশন ও কম্পিউটারের ব্যবহার : বেঁধে থাকার সংগ্রাম পিতা-মাতাকে ব্যস্ত রাখে। চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো উপার্জনের কাজে পিতা-মাতা ব্যস্ত থাকে। ফলে সময় খুবই দ্রুতগতিতে ছিনিয়ে চলে যায়। সন্তানদের সাথে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতিতে টেলিভিশন, কম্পিউটার ও মোবাইল শিশুদের সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা পালন করে। অনেক পিতা-মাতা মনে করে, এগুলো শিশুদের সুস্থ বিনোদন দেয়—যা তাদের দীর্ঘ সময় ধরে শান্ত রাখে।
টেলিভিশনে শিশুদের জন্য তৈরি অনুষ্ঠানে অনেক অশালীন পোশাক পরিহিত মডেলদের দেখানো হয়। অতিরিক্ত পপ মিউজিক, অশালীন নৃত্য, বড়োদের অসম্মান এবং খারাপ অর্থের অনেক কিছুই প্রোগ্রামে দেখানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের প্রোগ্রাম মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে।
প্রায় সবার নিকট টেলিভিশন এক অপরিহার্য বিষয়, যা আমাদের জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। এটি আমাদের মতামতকে প্রভাবিত করে, আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেয় এবং আমাদের ব্যক্তিত্ব তৈরি করে। টেলিভিশন শিশুদের বিনোদনে এবং শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু অংশ পূরণ করে। তবে এই ক্ষেত্রে সীমিত আকারে নির্দিষ্ট সময়ে টিভি দেখার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।¹
পরিবারের বাইরে ব্যস্ত সময় পার করে—এমন পিতা-মাতার ছোটো সন্তানরা সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে টিভি দেখতে অভ্যস্ত। এই অভ্যাস তাদের সম্পর্ককে অন্যের সাথে মেলামেশা করা, চিন্তাশক্তি অর্জন এবং সৃজনশীলতা থেকে দূরে রাখে, অবরুদ্ধ করছে এবং রাতে এবং তাদের একাগ্রতা নষ্ট করে ফেলে। পাশাপাশি এই ধরনের অভ্যাস তাদের চিন্তাভাবনা করে তোলে এবং চোখ ব্যথা অন্যান্য নানান ধরনের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে।
শিশুরা স্বভাবতই শারীরিক ও সামাজিকতাবে সক্রিয় হয়। তারা খেলাধুলা করতে ও এবং অপরের সাথে মেলামেশায় আগ্রহী। গবেষণায় দেখা যায়—শিশুর যখন কোনো কিছু করার থাকে না কিংবা তারা যখন বিষণ্ণতা অনুভব করে, ঠিক তখনই তারা টেলিভিকশনের শরণাপন্ন হয়। পিতা-মাতা কর্তব্য হচ্ছে—শিশুসন্তানকে সময় দেওয়ার জন্য এবং তাদের সাথে সুশীল কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য দ্রুতসই সময় নির্ধারণ করা। এর মানে এই নয়, পিতা-মাতা তাদের অন্য সকল কাজ বাদ দিয়ে শুধু এই কাজটিই করবে। ছোট্ট শিশুরা শুধু মায়ের সাথে রান্নাঘরে বসে মায়ের রান্না দেখতেও কিংবা চামচ ও পাছিল দিয়ে খেলতেও পারলেই খুশি। বড়ো শিশুরা রান্নাঘরের টেবিলে কোনো কিছু আঁকতেও কিংবা ছোটো ছোটো এবং ঝুঁকাহীন কাজে মাকে সাহায্য করার মাধ্যমে খুশি থাকতে পারে।
ক্রমবর্ধমান গেম ও অ্যাপস-এ পরিপূর্ণ কম্পিউটার, ট্যাবলেট ও স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বিয়েতে ছোটো শিশুদের দেখা যায়, তারা নিজেদের মোবাইল থেকে গান-বাজনা শুরু করে দেয়। আমাদের সন্তানরা কীভাবে বড়োদের সাথে মেলামেশা এবং অন্যদের সাথে কথা বলার আদব শিখবে? তারা যদি সামাজিক আদব, শিষ্টাচার সম্পর্কে না জানে, তাহলে তারা কীভাবে বৃহৎ সমাজের অংশ হয়ে থাকতে পারবে? মুসলিম পরিবারে এই ধরনের ডিভাইটস কিছু শিক্ষাগত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে, কিন্তু তা কখনো মানুষের সাথে মেলামেশার বিরুদ্ধে হতে পারে না।

টিকাঃ
¹ টিভি প্রোগ্রামসমূহে কখনোই ইসলামি শিষ্টাচার, হালাল-হারাম লক্ষ করা হয় না। পবিত্র লঙ্ঘন টিভি প্রোগ্রামের প্রধান সংকট। এমনকী ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলাকালীন বিরতিতেও বিজ্ঞাপনের সুরতি দৃষ্টে ধৈর্যচ্যুত হয়। তাই ওসবের প্রতিও বাবা-মা অনেক বিরক্ত হন। একারণে টিভি দেখা অনুচিত। অনলাইনে পবিত্র ভিডিও দেখা যায় না—সম্পাদক

📘 মুসলিম প্যারেন্টিং > 📄 স্কুলপূর্ব সময়ে চাইল্ডকেয়ারে রাখা

📄 স্কুলপূর্ব সময়ে চাইল্ডকেয়ারে রাখা


অধিকাংশ দেশেই পাঁচ-ছয় বছরের আগে শিশুদের ফুলটাইম শিক্ষার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে না।
যে সব পিতা-মাতা সন্তানের সাথে ঘরে অবস্থান করে, তাদের জন্য কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক সিলেবাসের প্রয়োজন নেই। তবে সচেতন পিতা-মাতা ছোটোকালে থেকেই নিজ ঘরে সন্তানদের শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ রাখে। তারা সন্তানদের বয়স ও পরিপক্কতা অনুযায়ী তাদের সাথে আচরণ করে, যাতে করে স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজ ঘর একটি আদর্শিক পরিচর্যাকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুরা ওই সকল ব্যক্তির পরিচর্যা থেকে বেশি উপকার লাভ করতে পারে, যারা তাদের পৃথিবীর অন্য সকলের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। নিরাপদ ও ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশেই উপযুক্ত সময়সূচি অর্জন করা সম্ভব হয়।
শিশুরা যখন তিন বছর কিংবা চার বছর বয়সের কাছাকাছি সময়ো উপনীত হয়, তখন অভিভাবকরা ছোটো সন্তানদের সপ্তাহে কিছু সময়ের জন্য নার্সারি স্কুল (কিংবা প্রি-স্কুলে) পাঠানোর চিন্তা করতে পারেন। এটি তাদের স্কুল রুটিনে অভ্যস্ত হতে সাহায্য করবে।
যে সকল নারী সন্তান জন্মদানের চেয়ে ফুলটাইম বাইরে কাজ করাকে বেশি প্রাধান্য দেন, তারা একপর্যায়ে হতাশায় ভোগেন। মানসিক যন্ত্রণা এবং মা হয়ে ঘরে অবস্থান করার মতো সামাজিক জীবনে উপভোগের অভাবই তাদের হতাশার মূল কারণ। তারা তখন নিজেদের আয়-উপার্জনের অর্থহীনতা এবং স্বাধীনতার অভাব অনুভব করতে থাকেন। এই সবকিছুই যৌক্তিক ও স্বাভাবিক অনুভূতি। পারতপক্ষে, মাতৃত্ব একটি সম্মান; একই সঙ্গে এক বিরাট সুযোগ। সবাই এই সুযোগ পায় না। শৈশবকালের প্রাথমিক বছরগুলো খুব দ্রুতই কেটে যায়। তাই সন্তান স্কুল যাওয়ার বয়সে উপনীত হওয়ার পর মা চাইলে পুনরায় বাইরে পুরোদ্যমে কাজ করতে পারেন।
নতুন সন্তানের আগমন অতিরিক্ত আর্থিক চাপের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। ইসলাম পুরুষের ওপর পরিবারের আর্থিক উপার্জনের দায়িত্ব অর্পণ করে। এই সময় মায়ের দায়িত্ব হচ্ছে, যত বেশি সম্ভব ঘরে অবস্থান এবং নিজ সন্তানদের দেখভাল করা। এ সময়ে বিলাসিতাপূর্ণ আয়েশ পূরণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। ঘরে অবস্থানকারী মায়ের যত্নে থেকে সাধারণ জীবনযাপনের মধ্যেও শিশুরা অনেক ভালো থাকতে পারে।
মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য উভয়ের বাইরে কাজ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এই ক্ষেত্রে এমন কিছু উপায় রয়েছে, যার ফলে সন্তানদের কোনো ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতিতে মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়। পিতা-মাতা যেকোনো একজন পার্ট-টাইম অথবা তাদের উভয়জন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের-সুবিধাজনক সময়ে ঘরে অবস্থান করতে পারেন। তা ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সমস্যা যেমন : দাদা-দাদি কিংবা অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবের কাছে নিজ সন্তানের দায়িত্ব দেওয়া যায়, যা সম্পূর্ণ পারিবারিক এবং ইসলামিক পরিবেশে সন্তানদের দেখভাল করার জন্য অগ্রহি প্রকাশ করে। এই ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অপরিহার্য কর্তব্য হলো—বাসায় যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ সন্তানদের সাথে সার্থক ও উপভোগ্য সময় কাটানো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00