📄 আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা
‘ওহে বিশ্বাসীরা! তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ সুরা আত-তাহরীম: ৬
এই আয়াতটি মুসলিমদের ওপর আরোপিত আসমানি দায়িত্বের সারমর্ম বহন করে। একজন মুসলিমের নৈতিক ও আবাসিক কর্তব্য হলো—কাছের ব্যক্তিদের সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। সন্তানের সবচেয়ে কাছের ব্যক্তি এবং জিম্মাদার হলো পিতা-মাতা। জিম্মাদার হিসেবে পিতা-মাতার এই কর্তব্যকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব মুসলিম জীবনের অপরিহার্য অংশ। ইসলামের প্রকৃত অস্তিত্বকে যথাযথ ও স্বাভাবিক উপায়ে জারি রাখার জন্য প্রত্যেক পিতা-মাতার অবশ্য কর্তব্য হলো—সন্তানদের মাঝে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে তাদের মনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার অনুভূতি তৈরি করা।
বিভিন্ন বাস্তবিক কারণে অনেক পিতা-মাতার পক্ষে একাকী এমন কঠিন দায়িত্ব পালন করা সম্ভবপর হয় না। সেক্ষেত্রে সমাজের দায়িত্ব হলো—পরস্পরের মাঝে একটি যোগসূত্র (Network) তৈরি করা এবং সমাজের প্রত্যেকেই এই যোগসূত্রের আওতায় আনার চেষ্টা করা। অন্যান্য সমাজের ন্যায় মুসলিম সমাজেও কিছু ‘দুর্দশা’ পরিবার থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে সমাজের কর্তব্য হলো—এই সকল পরিবারকে সহায়তার জন্য পরিকল্পিত কাঠামো নির্মাণ করা। সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব প্রধানত পিতা-মাতার ওপরই বর্তায়। সেক্ষেত্রে পিতা-মাতা নিজ সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব পালন করল কি না, তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে সমাজের খুব বেশি কিছু করার নেই।
কুরআন বলে— ‘একজন অপরজনের বোঝা বহন করবে না এবং কারও ওপর সাম্রাজ্যতত্ত্ব বোঝা চাপানো হয় না।’
বস্তুত পরিবার, সমাজ ও মানবতার জন্য কাজ করা প্রত্যেক মানুষেরই কর্তব্য।
‘ওহে বিশ্বাসীরা! তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ সুরা আত-তাহরীম: ৬
এই আয়াতটি মুসলিমদের ওপর আরোপিত আসমানি দায়িত্বের সারমর্ম বহন করে। একজন মুসলিমের নৈতিক ও আবাসিক কর্তব্য হলো—কাছের ব্যক্তিদের সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। সন্তানের সবচেয়ে কাছের ব্যক্তি এবং জিম্মাদার হলো পিতা-মাতা। জিম্মাদার হিসেবে পিতা-মাতার এই কর্তব্যকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব মুসলিম জীবনের অপরিহার্য অংশ। ইসলামের প্রকৃত অস্তিত্বকে যথাযথ ও স্বাভাবিক উপায়ে জারি রাখার জন্য প্রত্যেক পিতা-মাতার অবশ্য কর্তব্য হলো—সন্তানদের মাঝে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে তাদের মনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার অনুভূতি তৈরি করা।
বিভিন্ন বাস্তবিক কারণে অনেক পিতা-মাতার পক্ষে একাকী এমন কঠিন দায়িত্ব পালন করা সম্ভবপর হয় না। সেক্ষেত্রে সমাজের দায়িত্ব হলো—পরস্পরের মাঝে একটি যোগসূত্র (Network) তৈরি করা এবং সমাজের প্রত্যেকেই এই যোগসূত্রের আওতায় আনার চেষ্টা করা। অন্যান্য সমাজের ন্যায় মুসলিম সমাজেও কিছু ‘দুর্দশা’ পরিবার থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে সমাজের কর্তব্য হলো—এই সকল পরিবারকে সহায়তার জন্য পরিকল্পিত কাঠামো নির্মাণ করা। সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব প্রধানত পিতা-মাতার ওপরই বর্তায়। সেক্ষেত্রে পিতা-মাতা নিজ সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব পালন করল কি না, তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে সমাজের খুব বেশি কিছু করার নেই।
কুরআন বলে— ‘একজন অপরজনের বোঝা বহন করবে না এবং কারও ওপর সাম্রাজ্যতত্ত্ব বোঝা চাপানো হয় না।’
বস্তুত পরিবার, সমাজ ও মানবতার জন্য কাজ করা প্রত্যেক মানুষেরই কর্তব্য।
📄 সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের দায়িত্ব
সন্তান আগমনের মুহূর্তে বাবা-মায়ের মন প্রবল আগ্রহ-উত্তীপনায় ভরপুর থাকে। তারা অগাধ ভালোবাসা ও আবেগ ঢেলে দিয়ে সন্তানের অতিরিক্ত যত্ন নিতে উন্মুক্ত হয়ে থাকে। সন্তান ও পিতা-মাতার মধ্যকার এই সম্পর্কই একটি পরিবারের মূল ভিত্তি। যখন এই সম্পর্ক খাঁটি ও দৃঢ় ভালোবাসায় রূপায়িত হয়, তখন তা ভাই-বোন, চাচা-চাচিসহ পরিবারের সবাইকে পারস্পরিক ভালোবাসার চাদরে আবৃত করে।
‘মানুষ সামাজিক জীব’—বড়োদের এই বুলিটি মূল্যবান এক ধারণা বহন করে। এর অর্থ হলো—সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের মধ্যে এমন এক সম্পর্ক গড়ে ওঠা অপরিহার্য, যার ভিত্তিতে তারা পারস্পরিক কর্তব্য সম্পূর্ণরূপে পালন করতে পারে। মূলত সামাজিক সম্পর্ক সবার অন্তরে প্রশান্তি তৈরি করে। অন্যের অধিকার আদায়, মানুষকে সাহায্য করা এবং কোনো ধরনের বিনিময় ছাড়াই সমাজের সেবা করা নিঃসন্দেহে দ্বীনের অন্যতম কাজ। এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি আসে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মানুষ নিজের নিজের চাহিদা পূরণের জন্য স্বার্থপর জীবনযাপন করে। যে সমাজে প্রত্যেকেই নিজের ‘ভূমি’ নিয়ে মগ্ন থাকে, সে সমাজ থেকে মানবতা দূরে সরে যায়। এই ধরনের সমাজ অর্থাল্লিঙ্গা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পরিপূর্ণ। তারা এমন এক বস্তুবাদে অভ্যস্ত, যেখানে মানুষ একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এটা মূলত ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ধারণারই প্রসার ঘটায়। এর মাধ্যমে সমাজের সিংহভাগ মানুষের শ্রমের বিনিময়ে ক্ষুদ্র একটি অংশ ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এই ধরনের সমাজ কখনো প্রকৃত উন্নতি লাভ করতে পারে না। কারণ, এখানে প্রভাবশালী ধনীরা ক্ষমতার দাপটে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না। সমাজের অন্যান্য সদস্যরাও এই ‘স্ট্যাটাস’ অর্জনের জন্য নিজেদের বিক্রিয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অসংখ্য সামাজিক সমস্যা এই সমাজকে এমনভাবে পঙ্গু করে রাখে, তা একটি বিশৃঙ্খলপূর্ণ ভাগাড়ে পরিণত হয়। ফলে বাস্তবিক অর্থে এই সমাজে কোনো মানুষই সুখী হয় না।
ইসলাম মানুষের সৃজনশীলতা ও নতুনত্বকে উৎসাহিত করে, কিন্তু অধিকতর জোর দেয় সামাজিক দায়িত্বশীলতার দিকে। এটি মানুষকে তাৎক্ষণিক আত্মতৃপ্তির পরিবর্তে ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতাবোধের শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে যথোপযুক্ত উপায়ে সন্তান প্রতিপালনের অংশ হিসেবে সন্তানকে কেবল একজন ব্যক্তি হিসেবে না দেখে সমাজের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করাও শেখায়। যখন প্রত্যেকটি পরিবার নিজেদেরকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে, সকলের কল্যাণের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তখন এই সমাজ শ্রেষ্ঠতম সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়।
সন্তান আগমনের মুহূর্তে বাবা-মায়ের মন প্রবল আগ্রহ-উত্তীপনায় ভরপুর থাকে। তারা অগাধ ভালোবাসা ও আবেগ ঢেলে দিয়ে সন্তানের অতিরিক্ত যত্ন নিতে উন্মুক্ত হয়ে থাকে। সন্তান ও পিতা-মাতার মধ্যকার এই সম্পর্কই একটি পরিবারের মূল ভিত্তি। যখন এই সম্পর্ক খাঁটি ও দৃঢ় ভালোবাসায় রূপায়িত হয়, তখন তা ভাই-বোন, চাচা-চাচিসহ পরিবারের সবাইকে পারস্পরিক ভালোবাসার চাদরে আবৃত করে।
‘মানুষ সামাজিক জীব’—বড়োদের এই বুলিটি মূল্যবান এক ধারণা বহন করে। এর অর্থ হলো—সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের মধ্যে এমন এক সম্পর্ক গড়ে ওঠা অপরিহার্য, যার ভিত্তিতে তারা পারস্পরিক কর্তব্য সম্পূর্ণরূপে পালন করতে পারে। মূলত সামাজিক সম্পর্ক সবার অন্তরে প্রশান্তি তৈরি করে। অন্যের অধিকার আদায়, মানুষকে সাহায্য করা এবং কোনো ধরনের বিনিময় ছাড়াই সমাজের সেবা করা নিঃসন্দেহে দ্বীনের অন্যতম কাজ। এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি আসে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মানুষ নিজের নিজের চাহিদা পূরণের জন্য স্বার্থপর জীবনযাপন করে। যে সমাজে প্রত্যেকেই নিজের ‘ভূমি’ নিয়ে মগ্ন থাকে, সে সমাজ থেকে মানবতা দূরে সরে যায়। এই ধরনের সমাজ অর্থাল্লিঙ্গা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পরিপূর্ণ। তারা এমন এক বস্তুবাদে অভ্যস্ত, যেখানে মানুষ একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এটা মূলত ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ধারণারই প্রসার ঘটায়। এর মাধ্যমে সমাজের সিংহভাগ মানুষের শ্রমের বিনিময়ে ক্ষুদ্র একটি অংশ ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এই ধরনের সমাজ কখনো প্রকৃত উন্নতি লাভ করতে পারে না। কারণ, এখানে প্রভাবশালী ধনীরা ক্ষমতার দাপটে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না। সমাজের অন্যান্য সদস্যরাও এই ‘স্ট্যাটাস’ অর্জনের জন্য নিজেদের বিক্রিয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অসংখ্য সামাজিক সমস্যা এই সমাজকে এমনভাবে পঙ্গু করে রাখে, তা একটি বিশৃঙ্খলপূর্ণ ভাগাড়ে পরিণত হয়। ফলে বাস্তবিক অর্থে এই সমাজে কোনো মানুষই সুখী হয় না।
ইসলাম মানুষের সৃজনশীলতা ও নতুনত্বকে উৎসাহিত করে, কিন্তু অধিকতর জোর দেয় সামাজিক দায়িত্বশীলতার দিকে। এটি মানুষকে তাৎক্ষণিক আত্মতৃপ্তির পরিবর্তে ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতাবোধের শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে যথোপযুক্ত উপায়ে সন্তান প্রতিপালনের অংশ হিসেবে সন্তানকে কেবল একজন ব্যক্তি হিসেবে না দেখে সমাজের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করাও শেখায়। যখন প্রত্যেকটি পরিবার নিজেদেরকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে, সকলের কল্যাণের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তখন এই সমাজ শ্রেষ্ঠতম সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়।
📄 ইতিবাচক প্যারেন্টিং; একটি সৃজনশীল প্রচেষ্টা
বাগানের চারাগাছ আর স্কুলের (নার্সারি) শিশুর মধ্যে চমৎকার একটা মিল রয়েছে। চারাগাছের যথাযথ পরিচর্যা করা হলে তা একদিন ফুলে-ফলে পরিপূর্ণ রূপে রূপ নেয়। একইভাবে একটি শিশুর যথাযথ পরিচর্যা করা হলে সে ক্রমান্বয়ে একজন সফল ও ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে।
অঙ্কুর পরিচর্যার ক্ষেত্রে অবহেলা করলে তা যেমন অনেক ধরনের সমস্যা নিয়ে বড়ো হয়, ঠিক তেমনি কোনো শিশুর লালন-পালনে অবহেলা করা হলে সে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা, উচ্ছৃঙ্খলতা ও আত্ম-ধ্বংসাত্মক জীবনাবর্তের মধ্যে দিয়ে বড়ো হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নতমানের খাবার, পোশাক ও বাসস্থান প্রদান করার মাঝেই কেবল সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়; বরং সন্তানদের সহমর্মিতা প্রদান, তাদের সাথে বোঝাপড়া, মানসিক সাহায্য, তাদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি এবং তাদের এই পৃথিবীতে চলার মতো যোগাযোগসম্পন্ন করে গড়ে তোলাও সন্তান পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিতা-মাতার মূল দায়িত্ব হলো পরিবারের মধ্যে একটি শান্ত, নিরাপদ ও সন্তোষপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা, যা সন্তানদের মনে আত্মবিশ্বাসের জোগান এবং তাদের হৃদয় ভালোবাসায় ভরিয়ে দেবে—যাতে তারা এই ভালোবাসার আলোকাচ্ছন্নতা সমাজের অন্য মানুষদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে পারে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য যদি সৎ গুণাবলিসম্পন্ন হয়, তাহলে এর ফলাফল পুরো সমাজ ভোগ করে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব। তবে এটি কেবল একক পরিবারের প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন সমাজের প্রত্যেকের পরিবারের যৌথ প্রচেষ্টা।
দুর্ভাগ্যবশত অনেক পিতা-মাতা সন্তান প্রতিপালনে অনেক গা ছাড়াভাব। এ যেন ‘কারও জন্য করা’ বা ‘করতে হয়, তাই করে’। তারা সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বটিকে অনেকটা ‘আকস্মিক’ (Accidental) বলেই মনে করে। এর জন্য তাদের না থাকে কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা, না থাকে কোনো প্রস্তুতি। আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত এই দায়িত্বের গভীরতা ও গুরুত্বের ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণাই থাকে না। তারা সন্তানদের বহুমুখী চাহিদা পূরণ করে কি না, কিন্তু তাদের আধ্যাত্মিকতার তোঁয়াজ দিতে পারে না। ফলে যখন তারা কোনো সামাজিক কিংবা মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখন আত্মস্বীকৃতির তীব্র অভাব ও প্রয়োজন অনুভব করে। এই পর্যায়ে তারা আবেগতাড়িত হয়ে অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে এবং সন্তানদের দূরে ঠেলে দেয়। এটা কোনোভাবেই সন্তান প্রতিপালনের আদর্শ পদ্ধতি হতে পারে না; বরং আদর্শ পদ্ধতি ঠিক এর বিপরীত।
সচেতন পিতা-মাতা অল্প বয়স থেকেই সন্তানদের সাথে আন্তরিকভাবে মেলামেশা করে। যেকোনো ধরনের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাদেরকে যোগ্য সঙ্গ দেয়। ফুলকুরির ন্যায় তাদের মাথায় পরশ বুলিয়ে দেয়। যখন সন্তান সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করে, তখন পরিবারকে তারা আন্তরিক, সমভাবাপন্ন ও সহায়ক হিসেবে পাশে পায়।
সন্তান প্রতিপালন আর দশটা সৃজনশীল প্রচেষ্টার মতোই একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। কিন্তু এটি সহজ হয়ে যায়, যখন পিতা-মাতা সন্তানদের পাটনার হিসেবে বিবেচনা করে। এমন পাটনার, যাদের সাথে মতদ্বন্দ্বে একসঙ্গে কাজ করা যায়। সচেতন পিতা-মাতা কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অগ্রিম পদক্ষেপ নেয় এবং সমস্যা জটিল আকার ধারণ করার আগেই সমাধানের ব্যবস্থা করে। সন্তানদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তারা রাশভারী ও কঠোর হওয়ার পরিবর্তে কোমল ও অমায়িক হয়। তাদের সাথে দূরত্ব তৈরির পরিবর্তে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে।
সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এর প্রতি রুষ্ট কোনো সদস্যের দ্বারা সমাজবিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই সন্তানদের সামাজিক করে গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি একজন অভিভাবক নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে; বাকি ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
বাগানের চারাগাছ আর স্কুলের (নার্সারি) শিশুর মধ্যে চমৎকার একটা মিল রয়েছে। চারাগাছের যথাযথ পরিচর্যা করা হলে তা একদিন ফুলে-ফলে পরিপূর্ণ রূপে রূপ নেয়। একইভাবে একটি শিশুর যথাযথ পরিচর্যা করা হলে সে ক্রমান্বয়ে একজন সফল ও ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে।
অঙ্কুর পরিচর্যার ক্ষেত্রে অবহেলা করলে তা যেমন অনেক ধরনের সমস্যা নিয়ে বড়ো হয়, ঠিক তেমনি কোনো শিশুর লালন-পালনে অবহেলা করা হলে সে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা, উচ্ছৃঙ্খলতা ও আত্ম-ধ্বংসাত্মক জীবনাবর্তের মধ্যে দিয়ে বড়ো হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নতমানের খাবার, পোশাক ও বাসস্থান প্রদান করার মাঝেই কেবল সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়; বরং সন্তানদের সহমর্মিতা প্রদান, তাদের সাথে বোঝাপড়া, মানসিক সাহায্য, তাদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি এবং তাদের এই পৃথিবীতে চলার মতো যোগাযোগসম্পন্ন করে গড়ে তোলাও সন্তান পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিতা-মাতার মূল দায়িত্ব হলো পরিবারের মধ্যে একটি শান্ত, নিরাপদ ও সন্তোষপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা, যা সন্তানদের মনে আত্মবিশ্বাসের জোগান এবং তাদের হৃদয় ভালোবাসায় ভরিয়ে দেবে—যাতে তারা এই ভালোবাসার আলোকাচ্ছন্নতা সমাজের অন্য মানুষদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে পারে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য যদি সৎ গুণাবলিসম্পন্ন হয়, তাহলে এর ফলাফল পুরো সমাজ ভোগ করে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব। তবে এটি কেবল একক পরিবারের প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন সমাজের প্রত্যেকের পরিবারের যৌথ প্রচেষ্টা।
দুর্ভাগ্যবশত অনেক পিতা-মাতা সন্তান প্রতিপালনে অনেক গা ছাড়াভাব। এ যেন ‘কারও জন্য করা’ বা ‘করতে হয়, তাই করে’। তারা সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বটিকে অনেকটা ‘আকস্মিক’ (Accidental) বলেই মনে করে। এর জন্য তাদের না থাকে কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা, না থাকে কোনো প্রস্তুতি। আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত এই দায়িত্বের গভীরতা ও গুরুত্বের ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণাই থাকে না। তারা সন্তানদের বহুমুখী চাহিদা পূরণ করে কি না, কিন্তু তাদের আধ্যাত্মিকতার তোঁয়াজ দিতে পারে না। ফলে যখন তারা কোনো সামাজিক কিংবা মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখন আত্মস্বীকৃতির তীব্র অভাব ও প্রয়োজন অনুভব করে। এই পর্যায়ে তারা আবেগতাড়িত হয়ে অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে এবং সন্তানদের দূরে ঠেলে দেয়। এটা কোনোভাবেই সন্তান প্রতিপালনের আদর্শ পদ্ধতি হতে পারে না; বরং আদর্শ পদ্ধতি ঠিক এর বিপরীত।
সচেতন পিতা-মাতা অল্প বয়স থেকেই সন্তানদের সাথে আন্তরিকভাবে মেলামেশা করে। যেকোনো ধরনের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাদেরকে যোগ্য সঙ্গ দেয়। ফুলকুরির ন্যায় তাদের মাথায় পরশ বুলিয়ে দেয়। যখন সন্তান সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করে, তখন পরিবারকে তারা আন্তরিক, সমভাবাপন্ন ও সহায়ক হিসেবে পাশে পায়।
সন্তান প্রতিপালন আর দশটা সৃজনশীল প্রচেষ্টার মতোই একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। কিন্তু এটি সহজ হয়ে যায়, যখন পিতা-মাতা সন্তানদের পাটনার হিসেবে বিবেচনা করে। এমন পাটনার, যাদের সাথে মতদ্বন্দ্বে একসঙ্গে কাজ করা যায়। সচেতন পিতা-মাতা কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অগ্রিম পদক্ষেপ নেয় এবং সমস্যা জটিল আকার ধারণ করার আগেই সমাধানের ব্যবস্থা করে। সন্তানদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তারা রাশভারী ও কঠোর হওয়ার পরিবর্তে কোমল ও অমায়িক হয়। তাদের সাথে দূরত্ব তৈরির পরিবর্তে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে।
সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এর প্রতি রুষ্ট কোনো সদস্যের দ্বারা সমাজবিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই সন্তানদের সামাজিক করে গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি একজন অভিভাবক নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে; বাকি ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
📄 দুর্বল প্যারেন্টিং-এর কারণ
যোগ্য সন্তান ও তদারকির মাধ্যমে সন্তানদের যথাযথভাবে প্রতিপালন করা এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য যোগ্য করে তোলার নাম সার্থক প্যারেন্টিং। এর বিপরীতটাই হলো দুর্বল প্যারেন্টিং। দুর্বল প্যারেন্টিং-এর কিছু কারণ রয়েছে—যেগুলোর ব্যাপারে প্রত্যেকের সচেতন থাকা জরুরি। যেমন:
• অজ্ঞতা : সন্তান প্রতিপালন সম্পর্কে অজ্ঞতা দুর্বল প্যারেন্টিং-এর প্রধান কারণ। অধিকাংশ পিতা-মাতাই সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না কিংবা জানলেও এই ব্যাপারে তাদের কোনো পরিষ্কার ধারণা থাকে না। অনেক পিতা-মাতা মনে করে, সন্তান আপনাআপনি সবকিছু শিখে নেবে এবং স্বাবলম্বী হবে।
• সন্তান ভূমিষ্ঠের পর সবকিছু যথাযথভাবে সম্ভব হবে এবং তারা নিজেরা থেকেই পিতা-মাতার পন্থা অনুসরণ করবে—এরুপ ধারণা পোষণ করার ফলাফল খুবই মারাত্মক। সন্তান প্রতিপালন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা জীবনের অন্য সকল গুরুত্বপূর্ণ দিকের মতোই সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিশ্রমের দাবি রাখে। এই বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো—সন্তানদের ভবিষ্যৎকে বিপদের মাঝে ফেলে দেওয়া।
• এর মানে আবার এই নয়, সন্তানদের উপযুক্ত উপায়ে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করতে হবে; বরং এর অর্থ হলো—পিতা-মাতাকে অবশ্যই মৌলিক দুটি বিষয় অর্জন করতে হবে:
• সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান লাভ করা, যাতে সন্তানদের আল্লাহর ইবাদতের জন্য সর্বোচ্চ উপায়ে গড়ে তোলা যায়।
• সমাজ ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করা, যাতে সন্তানদের আদর্শ নাগরিকরূপে এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপযুক্ত সদস্য হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
• আত্মতৃপ্তি : পিতা-মাতার অতিরিক্ত আত্মতৃপ্তির ফলে সন্তানরা বিপথে যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্যারেন্টিং প্রক্রিয়ার দুর্বল করে দেয়। পিতা-মাতা যখন শিশু সন্তানদের অসুস্থ সঙ্গ, মাদকাসক্তি এবং সমাজবিরোধী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার খবর শুনলে ভয়, তখন তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবে, ‘আমার সন্তান এগুলো করতেই পারে না!’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—বিপদ সকল জায়গায় ছড়িয়ে আছে এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এই সকল বিপদ আমাদের ঘরে এসেও হানা দিচ্ছে। তাই সন্তানদের উপযুক্ত বয়সে সকল ধরনের সম্ভাব্য বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে এবং এ ব্যাপারে একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে সন্তানদের সর্বদা সন্দেহের চোখে দেখাটা দেখতেও নিষেধ।
• উদাসীনতা : উদাসীনতার কারণে অনেক পিতা-মাতা সন্তানদের বিপথের দিকে ঠেলে দেয় অথবা তাদের যোগ্যরূপে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। পিতা-মাতাকে সন্তানের মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি, জীবনের প্রথম দিন থেকে তাদের মধ্যে বিভিন্ন গুণাবলির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। উদাসীন অভিভাবক সন্তানদের প্রয়োজনে ভালো সঙ্গও গ্রুমিংও করে এবং বিশ্বাস করে, তারা বড়ো হওয়ার পর নিজেরাই এসব সামলে নেবে। এই মানসিকতা সন্তানদের জন্য নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে।
প্রস্তাবিত হওয়ার সাথে সাথে সন্তানদের একটা ভালো-মন্দ চরিত্র আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়। যদি পিতা-মাতা শৈশবের থেকেই সন্তানের চরিত্র গঠনের ব্যাপারে সচেতন না হয়, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাদের চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা পিতা-মাতার পক্ষে আর সম্ভব হয় না। তাই সূচনালগ্ন থেকেই সন্তানের সার্বিক ব্যাপারে পিতা-মাতাকে সচেতন থাকতে হবে।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি: অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণেও অনেক সময় প্যারেন্টিং-এ দুর্বলতা তৈরি হয়। নতুন পিতা-মাতা মধ্যে অবধারিতভাবেই অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকে। কিন্তু এটাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করে বসে থাকার কিংবা ভুল করার সুযোগ নেই। কারণ, আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে এই ব্যাপারে জানার জন্য অসংখ্য তথ্য ও সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। নতুন পিতা-মাতা নিজেদের শৈশবকালে প্রতিপালিত হওয়ার স্মৃতি এবং সমাজের অন্যান্য অভিজ্ঞ অভিভাবকদের নিকট সন্তান প্রতিপালনের উপায় সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন। অভিজ্ঞতার অভাব কখনো যৌক্তিক অজুহাত হতে পারে না।
পূর্বসূরিদের অনুসৃত পদ্ধতির অনুসরণ: সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতি অবস্থান ও পরিবেশ ভেদে কিছুটা পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রে পুরাতনকে সর্বসাকুল্যে আঁকড়ে না ধরে যুগোপযোগী পদ্ধতি অবলম্বন জরুরি; অন্যথায় প্র্যাকটিসে প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। যদিও সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সকল মুসলিমের লক্ষ্য ও প্রেরণা একই দিকে নিবদ্ধ, তবুও আমরা যে সমাজে বসবাস করি, সে সমাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পদ্ধতির অনুসরণই শ্রেয়। বর্তমানে অনেক মুসলিম প্রবাসে অবস্থান করেন। সেখানকার অবস্থান ও পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক্ষেত্রে তাদের পুনর্বিন্যাসিত পদ্ধতি নতুন পরিবেশের প্রযোজ্য না-ও হতে পারে।
পারিবারিক বিপদ: দুর্ঘটনা, অভাব ও দুর্ভাগ্য কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই একটি পরিবারকে গ্রাস করে নিতে পারে, যা বেদনা এবং দীর্ঘস্থায়ী দুঃখের কারণ হতে পারে। যেকোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যা অভিভাবকদের ওপর কঠিন চাপ সৃষ্টি করে। কারও সাহায্য ছাড়া এই দায়িত্ব পালন খুবই কঠিন। এই ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব পুরো পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন, যেন সন্তানরা নিজেদের অবস্থান হারিয়ে না ফেলে এবং সন্তান প্রতিপালনের মতো কঠিন ও ভারী দায়িত্ব অসাধারণভাবেশত কেবল একজন অভিভাবকের কাঁধে না পড়ে।
জীবনের চাপ: আধুনিক জীবন হচ্ছে ইঁদুর দৌঁড়ের ন্যায়। আর্থিক ও ক্যারিয়ারসংক্রান্ত দায়িত্ব এবং সামাজিক ব্যস্ততার কারণে অনেক অভিভাবক দিশা হারিয়ে ফেলেন। একই সঙ্গে অনেকগুলো দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
দুঃজনকভাবে, বর্তমান সময়ে জীবনে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের কাছে সন্তানের আধ্যাত্মিক চাহিদাকে গৌণ মনে করা হচ্ছে। মানুষ সাধারণত নিজের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তার জন্য বিশেষ সময় বরাদ্দ রাখে। মানুষ সন্তান প্রতিপালনের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ করতে চায় না। এর অর্থ দাঁড়ায়—তারা সন্তান প্রতিপালনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না; অথচ সন্তান তার পিতা-মাতার নিকট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এটি এমন একটি মূল্যবান বিষয়, যা যাবতীয় বৈষয়িক সম্পদ ও ক্যারিয়ারের চেয়ে অধিক ফলপ্রসূ হয়ে আসতে সক্ষম। তাই সন্তানকে উপেক্ষা করে বাহ্যিক সম্পদকে গুরুত্ব দেওয়া বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।
যোগ্য সন্তান ও তদারকির মাধ্যমে সন্তানদের যথাযথভাবে প্রতিপালন করা এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য যোগ্য করে তোলার নাম সার্থক প্যারেন্টিং। এর বিপরীতটাই হলো দুর্বল প্যারেন্টিং। দুর্বল প্যারেন্টিং-এর কিছু কারণ রয়েছে—যেগুলোর ব্যাপারে প্রত্যেকের সচেতন থাকা জরুরি। যেমন:
• অজ্ঞতা : সন্তান প্রতিপালন সম্পর্কে অজ্ঞতা দুর্বল প্যারেন্টিং-এর প্রধান কারণ। অধিকাংশ পিতা-মাতাই সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না কিংবা জানলেও এই ব্যাপারে তাদের কোনো পরিষ্কার ধারণা থাকে না। অনেক পিতা-মাতা মনে করে, সন্তান আপনাআপনি সবকিছু শিখে নেবে এবং স্বাবলম্বী হবে।
• সন্তান ভূমিষ্ঠের পর সবকিছু যথাযথভাবে সম্ভব হবে এবং তারা নিজেরা থেকেই পিতা-মাতার পন্থা অনুসরণ করবে—এরুপ ধারণা পোষণ করার ফলাফল খুবই মারাত্মক। সন্তান প্রতিপালন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা জীবনের অন্য সকল গুরুত্বপূর্ণ দিকের মতোই সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিশ্রমের দাবি রাখে। এই বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো—সন্তানদের ভবিষ্যৎকে বিপদের মাঝে ফেলে দেওয়া।
• এর মানে আবার এই নয়, সন্তানদের উপযুক্ত উপায়ে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করতে হবে; বরং এর অর্থ হলো—পিতা-মাতাকে অবশ্যই মৌলিক দুটি বিষয় অর্জন করতে হবে:
• সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান লাভ করা, যাতে সন্তানদের আল্লাহর ইবাদতের জন্য সর্বোচ্চ উপায়ে গড়ে তোলা যায়।
• সমাজ ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করা, যাতে সন্তানদের আদর্শ নাগরিকরূপে এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপযুক্ত সদস্য হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
• আত্মতৃপ্তি : পিতা-মাতার অতিরিক্ত আত্মতৃপ্তির ফলে সন্তানরা বিপথে যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্যারেন্টিং প্রক্রিয়ার দুর্বল করে দেয়। পিতা-মাতা যখন শিশু সন্তানদের অসুস্থ সঙ্গ, মাদকাসক্তি এবং সমাজবিরোধী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার খবর শুনলে ভয়, তখন তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবে, ‘আমার সন্তান এগুলো করতেই পারে না!’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—বিপদ সকল জায়গায় ছড়িয়ে আছে এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এই সকল বিপদ আমাদের ঘরে এসেও হানা দিচ্ছে। তাই সন্তানদের উপযুক্ত বয়সে সকল ধরনের সম্ভাব্য বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে এবং এ ব্যাপারে একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে সন্তানদের সর্বদা সন্দেহের চোখে দেখাটা দেখতেও নিষেধ।
• উদাসীনতা : উদাসীনতার কারণে অনেক পিতা-মাতা সন্তানদের বিপথের দিকে ঠেলে দেয় অথবা তাদের যোগ্যরূপে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। পিতা-মাতাকে সন্তানের মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি, জীবনের প্রথম দিন থেকে তাদের মধ্যে বিভিন্ন গুণাবলির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। উদাসীন অভিভাবক সন্তানদের প্রয়োজনে ভালো সঙ্গও গ্রুমিংও করে এবং বিশ্বাস করে, তারা বড়ো হওয়ার পর নিজেরাই এসব সামলে নেবে। এই মানসিকতা সন্তানদের জন্য নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে।
প্রস্তাবিত হওয়ার সাথে সাথে সন্তানদের একটা ভালো-মন্দ চরিত্র আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়। যদি পিতা-মাতা শৈশবের থেকেই সন্তানের চরিত্র গঠনের ব্যাপারে সচেতন না হয়, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাদের চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা পিতা-মাতার পক্ষে আর সম্ভব হয় না। তাই সূচনালগ্ন থেকেই সন্তানের সার্বিক ব্যাপারে পিতা-মাতাকে সচেতন থাকতে হবে।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি: অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণেও অনেক সময় প্যারেন্টিং-এ দুর্বলতা তৈরি হয়। নতুন পিতা-মাতা মধ্যে অবধারিতভাবেই অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকে। কিন্তু এটাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করে বসে থাকার কিংবা ভুল করার সুযোগ নেই। কারণ, আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে এই ব্যাপারে জানার জন্য অসংখ্য তথ্য ও সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। নতুন পিতা-মাতা নিজেদের শৈশবকালে প্রতিপালিত হওয়ার স্মৃতি এবং সমাজের অন্যান্য অভিজ্ঞ অভিভাবকদের নিকট সন্তান প্রতিপালনের উপায় সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন। অভিজ্ঞতার অভাব কখনো যৌক্তিক অজুহাত হতে পারে না।
পূর্বসূরিদের অনুসৃত পদ্ধতির অনুসরণ: সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতি অবস্থান ও পরিবেশ ভেদে কিছুটা পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রে পুরাতনকে সর্বসাকুল্যে আঁকড়ে না ধরে যুগোপযোগী পদ্ধতি অবলম্বন জরুরি; অন্যথায় প্র্যাকটিসে প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। যদিও সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সকল মুসলিমের লক্ষ্য ও প্রেরণা একই দিকে নিবদ্ধ, তবুও আমরা যে সমাজে বসবাস করি, সে সমাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পদ্ধতির অনুসরণই শ্রেয়। বর্তমানে অনেক মুসলিম প্রবাসে অবস্থান করেন। সেখানকার অবস্থান ও পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক্ষেত্রে তাদের পুনর্বিন্যাসিত পদ্ধতি নতুন পরিবেশের প্রযোজ্য না-ও হতে পারে।
পারিবারিক বিপদ: দুর্ঘটনা, অভাব ও দুর্ভাগ্য কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই একটি পরিবারকে গ্রাস করে নিতে পারে, যা বেদনা এবং দীর্ঘস্থায়ী দুঃখের কারণ হতে পারে। যেকোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যা অভিভাবকদের ওপর কঠিন চাপ সৃষ্টি করে। কারও সাহায্য ছাড়া এই দায়িত্ব পালন খুবই কঠিন। এই ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব পুরো পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন, যেন সন্তানরা নিজেদের অবস্থান হারিয়ে না ফেলে এবং সন্তান প্রতিপালনের মতো কঠিন ও ভারী দায়িত্ব অসাধারণভাবেশত কেবল একজন অভিভাবকের কাঁধে না পড়ে।
জীবনের চাপ: আধুনিক জীবন হচ্ছে ইঁদুর দৌঁড়ের ন্যায়। আর্থিক ও ক্যারিয়ারসংক্রান্ত দায়িত্ব এবং সামাজিক ব্যস্ততার কারণে অনেক অভিভাবক দিশা হারিয়ে ফেলেন। একই সঙ্গে অনেকগুলো দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
দুঃজনকভাবে, বর্তমান সময়ে জীবনে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের কাছে সন্তানের আধ্যাত্মিক চাহিদাকে গৌণ মনে করা হচ্ছে। মানুষ সাধারণত নিজের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তার জন্য বিশেষ সময় বরাদ্দ রাখে। মানুষ সন্তান প্রতিপালনের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ করতে চায় না। এর অর্থ দাঁড়ায়—তারা সন্তান প্রতিপালনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না; অথচ সন্তান তার পিতা-মাতার নিকট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এটি এমন একটি মূল্যবান বিষয়, যা যাবতীয় বৈষয়িক সম্পদ ও ক্যারিয়ারের চেয়ে অধিক ফলপ্রসূ হয়ে আসতে সক্ষম। তাই সন্তানকে উপেক্ষা করে বাহ্যিক সম্পদকে গুরুত্ব দেওয়া বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।