📄 মুওয়ালাত শব্দটি সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি
تولي ও موالات-এর মূলধাতু হলো ولي, এবং এই মূলধাতুটি আরবি ভাষায় একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। আল্লামা রাগিব আসফাহানি রহিমাহুল্লাহ এবং অন্য ভাষাবিদরা এর বিভিন্ন অর্থ করেছেন। আপত্তি ওঠে, যে নসগুলোতে ইহুদি ও খ্রিষ্টান কিংবা অন্য কাফেরদের সাথে تولي বা موالات নিষিদ্ধ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে কোন অর্থটি বোঝানো হয়েছে। তাদের বন্ধু ও প্রিয়তম বানানোও কি হারাম, না তাদের আস্থাভাজন বানানো এবং তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করা উদ্দেশ্য?
উম্মাহর জমহুর আলেমগণ এই নসগুলোর মধ্যে موالات শব্দের প্রথম অর্থটিকেই গ্রহণ করেছেন, বিপরীতে কিছু সামসময়িক আলেম এই মত প্রকাশ করেছেন যে, এই জাতীয় নসগুলো কাফেরদেরকে আস্থাভাজন বানানো বা مسلمانوں বিরুদ্ধে কাফেরদের সাহায্য ও সহযোগিতা করার নিষিদ্ধতা ঘোষণা দেওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। তাদেরকে বন্ধু বানানো বা তাদের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক রাখার নিষিদ্ধতা আয়াতের উদ্দেশ্য নয়। যেমনটি খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানي হাফিজাহুল্লাহ লিখেছেন, তাহলে এটিও লক্ষণীয় বিষয় যে, 'অলি' বানানো দ্বারা উদ্দেশ্য কী। একজন সাধারণ বন্ধুকে 'অলি' বলা হয় না। 'অলি' বলা হয় নিকটতম ব্যক্তিকে। যার সাথে এমন ঘনিষ্ঠতা রয়েছে যে, তার কাছে কোনো বিষয় গোপন রাখা হয় না। এজন্যই পিতা, দাদা ও প্রিয়জনদের 'অলি' বলা হয়, কাজেই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, مسلمانوں গোপনীয়তা যেন অমুসলিমদের কাছে না যায়, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আর এটা সুস্পষ্ট বিষয় যে, প্রত্যেক দেশেরই নিজেদের গোপনীয়তা এমনভাবে রক্ষা করা উচিত, যাতে শত্রুরা এ থেকে কোনো ফায়দা লুটাতে না পারে, এখানে স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। (২১১)
মিশরের প্রসিদ্ধ আলেম শায়েখ আবু যুহরা রহ.-ও তার তাফসির ও অন্যান্য কিছু গ্রন্থে موالات-এর প্রায় একই ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ আলেমের মতই গ্রহণযোগ্য এবং تولی 3 موالات কে এই অর্থের ওপর সীমাবদ্ধ মনে করা ভুল, যার কিছু কারণ নিম্নে উল্লেখ করা হয়েছে-
১. সালাফদের বুঝ অধিক গ্রহণযোগ্য এবং আস্থাযোগ্য। এই গ্রন্থের শুরুতে বহুসংখ্যক মুফাসসির ও ফকিহের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, যারা এই আয়াত থেকে 'কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক রাখা নিষেধ' এই অর্থ গ্রহণ করেছেন। বরং অনেকেই একে কবিরা گোনাহের তালিকায় যুক্ত করেছেন। হজরত মাওলানা খলিল আহমাদ সাহারানপুরি রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, যে موالات كفار (কাফেরদের বন্ধু বানানো) কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে হারাম, তার উদ্দেশ্য হলো বন্ধুত্ব। (২১২)
মাওলানা মুফতি কিফায়াতুল্লাহ রহ.-কে- يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَرَى أَوْلِيَاءَ. আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে লেখেন-
উত্তর : এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, তোমরা কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, এর অর্থ হলো কাফেরদের প্রতি বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা প্রকাশ করা নাজায়েয এবং হারাম। (২১৩)
২. বহু নসে বিভিন্ন আঙ্গিকে ঈমান এবং কাফেরদের বন্ধু বানানোর মাঝে সংগতি দেখানো হয়েছে, এই সংগতির মূল দাবি হলো, বন্ধু বানানোর নিষেধাজ্ঞা স্বয়ং ঈমানের দাবি আর এই দাবি ততদিন থাকবে, যতদিন কাফের ঈমান গ্রহণ না করবে। এর দ্বারা এই বিষয়ের প্রতিও ইঙ্গিত হয় যে, কাফেরদের সাথে موالات ও تولی নিষিদ্ধ হওয়ার মৌলিক কারণ কী? مسلمانوں গোপন রহস্য তাদের কাছে পৌঁছানো, নাকি মুসলমানের ঈমান ও ইসলামই কুফরের প্রতি ঘৃণা রাখার দাবি করে? এ ছাড়াও এ দিকটিও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কি শুধুই একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক মাসআলা, না শরিয়তের অন্য বিধানাবলির মতো এটিও একটি শরয়ि বিধান?
৩. সুরা মুজাদালাসহ আরো অন্য নসগুলোতে সরাসরি মাওয়াদ্দাত (ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব রাখা) শব্দ উল্লেখ করেই তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ মুয়াদ্দাত (মাওয়াদ্দাত) শব্দটি বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার অর্থে ব্যবহৃত হয়।
لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَلَوْ كَانُوا ءَابَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَبِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُوْلَبِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبُ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
আপনি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়কে এমন পাবেন না যে, তারা ওইসব লোকের সাথে বন্ধুত্ব করে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত, হোক না ওরা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই বা জাতি-গোষ্ঠী। এমন লোকদেরই অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং নিজের রুহ (তথা অদৃশ্য ফয়েজ) দ্বারা তাদের সাহায্য করেছেন। তিনি তাদের এমন উদ্যানরাজিতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নহর প্রবাহিত, তারা তাতে অনন্তকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। শুনে রাখো! আল্লাহর দলই সফলকাম হবে। (২১৪)
৪. অনুরূপভাবে কিছু কিছু নসের মধ্যে মুওয়ালাত শব্দ নেই, বরং কাফেরদের দিকে ঝুঁকে পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। যা সাধারণত বন্ধুত্ব ও ভালোবাসাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ.
এবং তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তা হলে তোমাদের স্পর্শ করবে আগুন। এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো সাহায্যকারী হবে না। অতঃপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। (২১৫)
৫. কয়েকটি নসের মধ্যে মুওয়ালাত শব্দটি এমন কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে 'মুওয়ালাত'-এর অর্থ গোপন তথ্য সরবরাহ করা বা হারবি কাফেরের সাথে খাস, এই অর্থ গ্রহণ করা কঠিন এবং এটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবতা বিবর্জিত। যেমন শয়তান সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُتِبَ عَلَيْهِ أَنَّهُ مَن تَوَلَّاهُ فَأَنَّهُ يُضِلُّهُ، وَيَهْدِيهِ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ.
যার ব্যাপারে এ কথা লিখে দেওয়া হয়েছে—যে ওকে বন্ধু বানাবে, তাকে সে গোমরাহ করবে এবং তাকে দোজখের আজাবের দিকে নিয়ে যাবে। (২১৬)
টিকাঃ
২১১. মুসলমানো আওর গায়রে মুসলিমো কে দরমিয়ান রওয়াবেত, পৃ. ৩৮
২১২. ফাতাওয়া মাযাহিরুল উলুম, পৃ. ২৪৯
২১৩. কিফায়াতুল মুফতি, ১১/১২৩, ইদারাতুল ফারুক, করাচি
২১৪. সুরা মুজাদালা : ২২
২১৫. সুরা হুদ : ১১৩
২১৬. সুরা হজ: ৪
📄 শেষ কিছু নিবেদন
১। অমুসলিমদের সাথে مسلمانوں সম্পর্কের ধরন কেমন হবে? এই বিষয়ে শরিয়তের দিকনির্দেশনা কী? এটি বর্তমান সময়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ হওয়ার মতো জরুরি একটি মাসআলা।
২. কুফরের অনেক প্রকার রয়েছে। কেউ জন্মগত কাফের আর কেউ ইসলামের নেয়ামত পাওয়ার পর কুফর গ্রহণ করে নেয়। কুফরের আরেকটি প্রকার হলো, যে নিজেকে কাফের বলে, অথবা কাফের না বললেও নিজের অবস্থানকে ইসলাম বা মুসলিম বলে দাবি করে না। এর বিপরীত হলো নিজের কুফরকে ইসলাম বলে চালিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে জোরাজুরি করা। এই দৃষ্টিতে কুফরের অসংখ্য প্রকার হয় এবং প্রতি প্রকারের কাফেরের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রও একরকম নয়, বরং প্রতিটির বিশ্লেষণ রয়েছে যা এই কিতাবে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করা হয়েছে।
৩। শরিয়ত ও সুস্থ বিবেকের দৃষ্টিতে কুফর নিজেই একটি অপরাধ আর কাফের একজন অপরাধী। বস্তুবাদের এই যুগে মানুষ এটাকে যে নামে ও শিরোনামেই ব্যক্ত করুক অথবা যে রং ও ঢঙেই উপস্থাপন করুক, শরিয়তের দৃষ্টিতে কুফর সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং সবচেয়ে জঘণ্য অপরাধ এবং অসংখ্য অপরাধের গোড়া। দুনিয়ার সকল আইনেই অপরাধী ও নিরপরাধ নির্ণয়ের নিজস্ব মাপকাঠি ও প্রয়োগক্ষেত্র রয়েছে। সে বিবেচনায় অপরাধী ও নিরপরাধীর সাথে আচরণে পার্থক্য করা হয়। সকলের সাথে সমান আচরণ করা হয় না। ইসলামেও কাফের ও মুসলমানের সাথে একরকম আচরণ রাখা হয়নি। বড় আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমানে মানুষ চুরি, ডাকাতি, জিনা ও গুম-খুনকে অপরাধ মনে করে কিন্তু এটাকে অপরাধই মনে করে না। অথচ কুফর হলো এই সকল অপরাধ থেকেও আরও বড় অন্যায় ও সকল অপরাধের মূল!
৪। মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্ক নিয়ে যারা লিখেছে, তাদের পদস্খলনের দুটি বড় কারণ রয়েছে—
ক. শরিয়তের নুসুস ও ফুকাহায়ে কেরামের গবেষণার ব্যাপারে উদাসীনতা। অনেক আলেম তো এই বিষয়ে লেখার সময় শরিয়তের টেক্সটের দিকেও তেমন ভ্রুক্ষেপ করেন না। অথবা এক-দুটি বিক্ষিপ্ত ও আংশিক নস সামনে রেখে লিখে ফেলেন। জানি না কোন উদ্দেশ্যে তারা এই কাজটি করেন। যাইহোক, এটা অনেক বড় ভুল এবং বহু পথভ্রষ্টতার রাস্তা। সঠিক পদ্ধতি তো হলো, শরিয়তের সকল নসকে সামনে রেখে দ্বীনের মূলনীতির অধীনে থেকে মাসআলা সমাধানের চিন্তাভাবনা করা।
কিছু মানুষ তো এমন আছে শরিয়তের নস তো সামনে রাখে, কিন্তু ফুকাহায়ে কেরামের গবেষণার সাথে উদাসীনতার পরিচয় দেয় ও সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। এটাও একটি ভুল পদ্ধতি এবং বহু পদস্খলনের কারণ। যার মাঝে ইজতেহাদ করার কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা ও উপযুক্ততা না থাকে— বর্তমানে সে অবস্থাই বিরাজমান— তাদের জন্য ফুকাহায়ে কেরামের গবেষণা ও সিদ্ধান্তের বাহিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা এ ছাড়া মাসআলার সঠিক সমাধান ও প্রকৃত শরয়ि বিধান পর্যন্ত পৌঁছা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
খ. এই মাসআলায় অসংখ্য ভুল ও পদস্খলনের দ্বিতীয় কারণ হলো কুফরকে অপরাধ মনে না করা। অথচ কুফরই হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ।