📄 উপসংহার
বাস্তব কথা হলো, উল্লেখিত দুই প্রকার আয়াতের মধ্যে পারস্পরিক কোনো বৈপরীত্য নেই, যার কারণে একটি আয়াতকে মানসুখ বলার প্রয়োজন হবে। কারণ পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সখ্য ও বন্ধুত্ব রাখার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, আর এখানে সুরা মুমতাহিনার আয়াতে সততা ও ন্যায়ের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। সখ্য ও ভালোবাসা এক জিনিস, আর সততা ও ন্যায়বিচার অন্য জিনিস, প্রথমটির সম্পর্ক দিল ও আকলের সাথে, আর দ্বিতীয়টির সম্পর্ক বাহ্যিক আচরণ ও কর্মের সাথে। যখন দুটি বিষয়ের অর্থ ও প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা, তখন দ্বন্দ্ব, এরপর একটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত বা মানসুখ-এই বিতর্কে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
হাফেজ ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৮৫২ হি.)-ও উভয়প্রকার নসগুলোকে এমনভাবে একত্র করেছেন যে, এর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। এক স্থানে সখ্য ও ভালোবাসা রাখাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্য স্থানে উত্তম আচরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু ভালো ব্যবহার ও সুন্দর আচরণ করার জন্য সখ্য ও ভালোবাসা থাকা আবশ্যক নয়, তাই দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি লেখেন,
ثم البر والصلة والإحسان لا يستلزم التحابب والتوادد المنهي عنه في قوله تعالى لا تجد قوما يؤمنون بالله واليوم الآخر يوادون من حاد الله ورسوله الآية فإنها عامة في حق من قاتل ومن لم يقاتل والله أعلم. (فتح الباري ٣٣٢/٥، قوله باب الهدية للمشركين وقول الله تعالى لا ينهاكم الله عن الذين لم يقاتلوكم في الدين، ط. دار المعرفة)
ভালো ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা এবং সদয় হওয়ার কারণে সে সখ্য ও ভালোবাসা তৈরি হয় না, যে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ.
আপনি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়কে এমন পাবেন না যে, তারা ওইসব লোকের সাথে বন্ধুত্ব করে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত। (২০৭)
আয়াতটি সকল কাফেরের ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে এসেছে, যারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত বা লিপ্ত নয়। (২০৮)
এই আলোচনায় স্পষ্টভাবে এই দাবি করা হয়েছে যে, 'বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ' বিষয়ে যে- সমস্ত নস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো হারবি ও অহারবি সকল কাফেরের ক্ষেত্রেই অবতীর্ণ, কারণ হুকুমের ভিত্তি কাফেরের 'কুফর'। হারবি বা সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া নয়।
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৬০৬ হি.) লেখেন,
والمعنى : لا ينهاكم عن مبرة هؤلاء، وإنما ينهاكم عن تولي هؤلاء، وهذا رحمة لهم لشدتهم في العداوة، وقال أهل التأويل : هذه الآية تدل على جواز البر بين المشركين والمسلمين، وإن كانت الموالاة منقطعة. (مفاتيح الغيب ١٢٥/٩٢، ط. دار إحياء التراث)
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা আপনাকে কাফেরদের সাথে সদাচরণ করতে নিষেধ করেন না। তিনি নিষেধ করেন তাদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে। আর শত্রুতাতে তারা চরমপন্থী হলেও এটা মূলত তাদের জন্য রহমতস্বরূপ। মুফাসসিরগণ বলেন, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ হলেও আয়াতটি তাদের সাথে সদাচরণের অনুমতি দেয়। (২০৯)
কাজি সানাউল্লাহ পানিপথি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১২২৫ হি.)-ও একই বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, দুই ধরনের আয়াতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তাফসিরে মাজহারিতে উল্লেখ রয়েছে,
ومن هاهنا يظهر : أن المنهي عنه إنما هو موالاة أهل الحرب دون مبرتهم، يشرط أن لا يضرب المومنين وقد قال الله تعالى فى الأسارى من أهل الحرب : إما منا بعد وإما فداء، والمن نوع من البر... فَأُولئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ، ولا مفهوم لهذه الآية فإنه لا يجوز موالاة أهل الذمة أيضا لعموم قوله تعالى : لا تتخذوا عدوى وعدوكم اولياء، وقوله تعالى : لا تتخذوا اليهود والنصارى اولياء.
এ থেকে জানা যায় যে, নিষেধ হলো হারবিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, তাদের সাথে সদাচরণ করা ও সদয় হওয়া নিষিদ্ধ নয়। তবে শর্ত হলো এর কারণে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা হারবি বন্দিদের ব্যাপারে বলেন, 'তুমি চাইলে তাকে মুক্তিপণ না নিয়ে ছেড়ে দিতে পারো, কিংবা মুক্তিপণ নিয়েই ছেড়ে দাও।' আর মুক্তিপণ না নিয়ে ছেড়ে দেওয়া একধরনের সৎ ও সদয় ব্যবহার।... মুসলিমরা জিম্মিদের সাথেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারবে না, কারণ আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী ব্যাপক।
لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُم أَوْلِيَاءَ. তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।
এবং,
لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَرَى أَوْلِيَاءَ. তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। (২০)
টিকাঃ
২০৭. সুরা মুজাদালা: ২২
২০৮. ফাতহুল বারি, ৫/২৩৩
২০৯. তাফসিরে কাবির, ২৯/৫২১
২১০. তাফসিরে মাজহারি, ৯/২৬২