📄 পর্যালোচনা
যাইহোক, বাস্তবতা হলো এই আয়াত থেকে দলিল গ্রহণ করা ঠিক হবে না। কারণ-
প্রথমত : হজরতের উল্লেখিত এই আয়াতের সাথে পূর্বে বর্ণিত আয়াতগুলোর কোনো বৈপরীত্য নেই, যেখানে মৈত্রী স্থাপন, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। তা ছাড়া পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো দ্বীনি মাসলাহাত উদ্ধার করতে বা ক্ষতি দূর করার জন্য সৌজন্য দেখিয়ে সুসম্পর্ক (মুদারাত) রাখার সুযোগ আছে, এই সুযোগ স্বয়ং এ নসগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। আর যে আয়াতে ভালো ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা সুসম্পর্কেরই (মুদারাতেরই) অংশ। কাজেই এ দুপ্রকার আয়াতগুলোতে কোনো বৈপরীত্য নেই। 'ভালো আচরণের অনুমতি' আর 'বন্ধুত্বের নিষেধাজ্ঞা'-প্রত্যেকের ক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন এবং প্রত্যেক আয়াত আপন স্থানে সঠিক ও আমলযোগ্য। বিশেষ করে, সুরা মুমতাহিনার শুরু-শেষে এবং মাঝের আয়াতগুলোতে স্পষ্ট করেই কাফেরদের প্রতি বন্ধুত্ব ও হৃদ্যতা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে, যেন সুরাটির মূল অংশই হলো, মুসলমানরা কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালো সম্পর্ক রাখা থেকে বিরত থাকবে, তাদের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধন একেবারেই রাখবে না, কেননা ঈমান ও কুফরের কারণে উভয় দিকেই প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব রয়েছে।
যে-সকল মুফাসসিরের এই রুচি ছিল যে, তারা কোনো আয়াতের তাফসির করার পূর্বে শিরোনাম উল্লেখ করতেন, তারাও সুরা মুমতাহিনার ব্যাখ্যার শুরুতে ব্যাপক অর্থবোধক শিরোনামই ব্যবহার করেছেন-কাফেরদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ। উদাহরণস্বরূপ নিকট অতীতের প্রখ্যাত বুজুর্গ ও তাফসিরবিদ হজরত মাওলানা আহমাদ আলি লাহোরি রহিমাহুল্লাহ সুরা মুমতাহিনার পাদটীকায় শিরোনাম দেন ‘কাফেরদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ’।
আল্লামা বাইহাকি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ থেকে উদ্ধৃত করেছেন,
قال الشافعي رحمه الله : وكانت الصلة بالمال، والبر، والإقساط، ولين الكلام، والمراسلة، بحكم الله غير ما نهوا عنه من الولاية لمن نهوا عن ولايته، مع المظاهرة على المسلمين। وذلك : أنه أباح بر من لم يظاهر عليهم من المشركين، والإقساط إليهم، ولم يحرم ذلك إلى من أظهر عليهم، بل ذكر الذين ظاهروا عليهم، فنهاهم عن ولايتهم، وكانت الولاية : غير البر والإقساط। (أحكام القرآن للشافعي - جمع البيهقي - ط. دار الذخائر الطبعة : الأولى, ٩٣٤١ হিজরী - ١٠٢ মি.)
সম্পদের মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখা, সদাচরণ করা, ন্যায় আচরণ করা, কোমল কথা বলা এবং পত্র আদান-প্রদান করা, এগুলো বন্ধুত্বের নিষেধাজ্ঞার আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যারা শত্রুতা প্রকাশ করে না এবং সদাচরণ করে, তাদের প্রতি এই আয়াতে ভালো আচরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর যারা শত্রুতা প্রকাশ করে, তাদের প্রতি ভালো আচরণকে আয়াতে হারাম করা হয়নি। বরং এমন ব্যক্তিদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে, যারা কাফেরদেরকে মুসলিমদের বের করার জন্য সহায়তা করেছে, এজন্য তাদেরকে বন্ধু বানাতে নিষেধ করা হয়েছে আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক এবং সদাচার ও ইনসাফ এক জিনিস নয়। (২০৪)
মালেকি মাজহাবের ফকিহদের অন্যতম ইমাম কারাফي রহিমাহুল্লাহ তার ‘আল ফুরুক’ নামক গ্রন্থে এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় কায়েম করেছেন যে, সুরা মুমতাহিনার এই আয়াতে জিম্মিদের সাথে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যদিও অন্যান্য অনেক নসে তাদের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তো এই দুটি কথার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা কী যার দরুন একটি অনুমোদিত এবং অন্যটি নিষিদ্ধ? অতঃপর তিনি এ দুটির পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন। আল্লামা বাকুরি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৭০৭ হি.) এই কথাকে আরেকটু গুছিয়ে ও সংক্ষিপ্ত করে উল্লেখ করেন,
القاعدة الثالثة : ما الفرق بين البر والتودد. حتى أُمِرْنا ببرهم، ونُهينا عن التودد لهم؟ فنقول إنا لما عاهدناهم حسن بنا أن لا نضيعهم، وأن نلطف بهم، وأن نوقع معهم الأخلاق الجميلة لا خوفا منهم ولا تعظيما لهم، ثم نستحضر مع ذلك في قلوبنا عداوتهم لنا ولنبينا حتى لا نودهم ضرورة، ... ورُوي عن عمر رضي الله عنه أنه كان يقول في أهل الذمة : أعينوهم ولا تظلموهم، فظهر أن الاحسان إليهم لا يخالف بغضهم، وأن ودهم غير برهم. (ترتيب الفروق و اختصارها ٠٣٤/١، كتاب الجهاد ط. وزارة الأوقاف - الممكلة المغربية)
তৃতীয় মূলনীতি : সদাচরণ করা ও বন্ধু বানানোর মাঝে পার্থক্যটা কী যার দরুন আমরা তাদের সাথে সদাচরণ করার ব্যাপারে আদিষ্ট হই এবং বন্ধুত্ব গড়তে আমাদের নিষেধ করা হয়? এ ক্ষেত্রে আমি বলব, আমরা যখন তাদের সাথে চুক্তি করব, তখন আমাদের জন্য উচিত হলো, তাদের সাথে চুক্তিভঙ্গ না করা, তাদের প্রতি কোমল হওয়া এবং তাদের সাথে সুন্দর নৈতিকতার স্বাক্ষর রাখা-এটি তাদের ভয়ে বা তাদের প্রতি সম্মানের কারণে নয়। সাথে অন্তরে এই কথা সর্বদা উপস্থিত রাখতে হবে যে, তারা আমাদের নবীর প্রতি ও আমাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, যাতে তাদের সাথে কোনো অবস্থায় ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি না হয়।... উমর রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি জিম্মিদের ব্যাপারে বলতেন, 'তোমরা তাদের সহায়তা করো, তাদের ওপর অত্যাচার করো না।' অতএব বোধগম্য হলো যে, সদয় হওয়া ঘৃণা রাখার সাথে সাংঘর্ষিক নয় এবং ভালোবাসা ও উত্তম আচরণ এক নয়। (২০৫)
দ্বিতীয়ত: অনেক মুফাসসিরের মতে সুরা মুমতাহিনার এই আয়াতটি মানসুখ (রহিত) বা মাখসুস (নির্দিষ্ট), আর এর কারণ হচ্ছে অন্য আয়াতের সাথে বাহ্যত স্ববিরোধিতা, যদিও অধিকাংশ মুফাসসির এই আয়াতটিকে রহিত মনে করেন না, বরং মুহকাম (দ্ব্যর্থহীন) বলেই স্বীকৃতি দেন। কিন্তু এই স্ববিরোধিতার কারণে কতক মুফাসসিরের পক্ষ থেকে মানসুখ হওয়ার দাবি করা এ কথার প্রমাণ যে, এই আয়াত থেকে হজরত যে অর্থ নিয়েছেন তা নেওয়া ঠিক নয়।
আল্লামা কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৬৭১ হি.) লেখেন,
قَالَ ابْنُ زَيْدٍ : كَانَ هَذَا فِي أَوَّلِ الْإِسْلَامِ عِنْدَ الْمُوَادَعَةِ وَتَرْكِ الْأَمْرِ بِالْقِتَالِ ثُمَّ نُسِخَ. قَالَ قَتَادَةُ : نَسَخَتْهَا فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ [التوبة : ٥]. وَقِيلَ : كَانَ هَذَا الْحُكْمُ لِعِلَّةٍ وَهُوَ الصُّلْحُ، فَلَمَّا زَالَ الصُّلْحُ بِفَتْحِ مَكَّةَ نُسِخَ الْحُكْمُ وَبَقِيَ الرَّسْمُ يُتْلَى وَقِيلَ : هِيَ مَخْصُوصَةٌ فِي حُلَفَاءَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَنْ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ عَهْدُ لَمْ يَنْقُضْهُ، قَالَهُ الْحَسَنُ الْكَلْبِيُّ : هُمْ خُزَاعَةُ وَبَنُو الْحَارِثِ بْنُ عَبْدِ مَنَافٍ. وَقَالَهُ أَبُو صَالِحٍ، وَقَالَ : هُمْ خُزَاعَةُ. وَقَالَ مُجَاهِدُ : هِيَ مَخْصُوصَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا وَقِيلَ : يَعْنِي بِهِ النِّسَاءَ وَالصِّبْيَانَ لِأَنَّهُمْ مِمَّنْ لَا يُقَاتِلُ، فَأَذِنَ اللهُ فِي بِرِّهِمْ. حَكَاهُ بَعْضُ الْمُفَسِّرِينَ. وَقَالَ أَكْثَرُ أَهْلِ التَّأْوِيلِ : هِيَ مُحْكَمَةٌ.
ইবনে যায়েদ বলেন, এই বিধান ইসলামের শুরুযুগে যখন মুসলমানরা দুর্বল ছিল ও জিহাদের আয়াত নাজিল হয়নি, তখনকার। এরপর এটি রহিত হয়ে যায়। কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হুকুমটি (فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُم) (মুশরিকদের যেখানে পাবে হত্যা করবে) আয়াতের মাধ্যমে মানসুখ হয়ে যায়। আর কেউ কেউ বলেন, এই বিধানটি একটি কারণে হয়েছিল, তা হলো সন্ধিচুক্তি। অতঃপর যখন মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে সন্ধিচুক্তি শেষ হয়ে যায়, তখন এই বিধানটি রহিত হয়ে যায় এবং তার তেলাওয়াত বাকি থাকে। আবার কেউ বলেন, এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যে-সকল কাফের চুক্তি করেছে এবং তা ভঙ্গ করেনি, তাদের সাথেই নির্দিষ্ট।... মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, এটা তাদের জন্য ছিল যারা ঈমান এনেছে, তবে হিজরত করেনি। তবে অধিকাংশ মুফাসসির বলেছেন যে, এটি মুহকাম (যার হুকুম এখনো বলবৎ আছে) আয়াত, মানসুখ নয়। (২০৬)
তৃতীয়ত: সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিন বন্ধুত্বের নিষেধাজ্ঞার নসগুলো থেকে অনেক মাসআলা ও ঘটনায় দলিল গ্রহণ করেছেন, অথচ শরিয়তের কোনো বিধানের ব্যাপারে মানসুখ আয়াত থেকে দলিল গ্রহণ করা জায়েয নয়। অতএব সুরা মুমতাহিনার একটি আয়াতকে ভিত্তি করে সে সকল নসকে মানসুখ বলে দেওয়া ঠিক হবে না, যেগুলোতে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখার নিষিদ্ধতা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ : এটাও বিবেচনা করা প্রয়োজন যে, অসংখ্য নসের মধ্যে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব ও সখ্য রাখা নিষিদ্ধ হওয়ার যে বিধান উল্লেখ করা হয়েছে, বস্তুত সেগুলোর মৌলিক কারণ ও হেতু কী? কী এমন নেপথ্য কারণ ছিল যার দরুন এত গুরুত্বসহ কাফেরের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে এক দুটি নয়, অসংখ্য নসে হুকুম দেওয়া হয়েছে? তা ছাড়া সে কারণগুলো কেবল হারবি কাফেরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, নাকি জিম্মي কাফেরের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম?
এই বিষয়ের সমস্ত দলিল, তার পটভূমি এবং সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফগণ সেগুলো থেকে যা বুঝে আমল করেছেন, এসব আলোচনা সামনে রাখলে স্পষ্ট হয় যে, এই বিধানের মৌলিক কারণ হলো কাফেরের 'কুফর'। কাফের ব্যক্তি মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা বা যুদ্ধে সহযোগী হওয়া হুকুমের ক্ষেত্রকে আরও কঠোর বানায়, তবে হুকুমের মূল কারণ (ইল্লত) 'হারব' (যুদ্ধ) নয়, বরং 'কুফর'।
'কাফের', 'কুফফার', 'শত্রু' এবং 'তাদের ওপর আল্লাহর গজব' ইত্যাদি শব্দ দ্বারা হুকুম প্রদান করা এই কথার নিদর্শন যে, তাদের কুফরই এই হুকুমের ভিত্তি। এর একটি অন্যতম দলিল এটাও যে, অধিকাংশ ইহুদি তখন হারবি ছিল না। বরং তাদের অনেকেই মদিনা ও তার আশপাশে চুক্তি করে বসবাস করত, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত ছিল। হজরত উমর রা. তার খেলাফতকালে বহু ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের নিষেধাজ্ঞার নসকে জিম্মিদের ওপর প্রয়োগ করেছিলেন।
চিন্তা করলে দেখা যাবে, আল্লাহ তাআলা, ইসলামধর্ম ও আহলে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার একমাত্র দাবি হলো কুফরি বিষয়াদি এবং আহলে কুফরের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা রাখা। কুফর ও ইসলাম, কাফের ও মুসলিম পরস্পর বিরোধী। অনুরূপ শয়তান আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য শত্রু। এখন কোনো একদিকে অন্তরের ঝোঁক অপরদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সমর্থক। কুফরের প্রতি ভালোবাসার অর্থ ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ, কুফরের প্রতি বন্ধুত্ব রাখা মানে হলো ইসলামের প্রতি শত্রুতা। অনুরূপ কাফেরের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের খারাবির সাথে এটিও অনেক সময় যুক্ত হয়ে যায়, তা একজন মুসলমানকে অপর মুসলমানের প্রতি ঘৃণা ও দূরত্বের কারণ হয়।
টিকাঃ
২০৪. আহকামুল কুরআন লিশ-শাফেয়ي, ২/১৯৩
২০৫. তারতিবুল ফুরুক ওয়াখতিসারুহা, ১/৪৩০
২০৬. তাফসিরে কুরতুবি, ১৮/৫৯
📄 উপসংহার
বাস্তব কথা হলো, উল্লেখিত দুই প্রকার আয়াতের মধ্যে পারস্পরিক কোনো বৈপরীত্য নেই, যার কারণে একটি আয়াতকে মানসুখ বলার প্রয়োজন হবে। কারণ পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সখ্য ও বন্ধুত্ব রাখার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, আর এখানে সুরা মুমতাহিনার আয়াতে সততা ও ন্যায়ের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। সখ্য ও ভালোবাসা এক জিনিস, আর সততা ও ন্যায়বিচার অন্য জিনিস, প্রথমটির সম্পর্ক দিল ও আকলের সাথে, আর দ্বিতীয়টির সম্পর্ক বাহ্যিক আচরণ ও কর্মের সাথে। যখন দুটি বিষয়ের অর্থ ও প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা, তখন দ্বন্দ্ব, এরপর একটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত বা মানসুখ-এই বিতর্কে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
হাফেজ ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৮৫২ হি.)-ও উভয়প্রকার নসগুলোকে এমনভাবে একত্র করেছেন যে, এর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। এক স্থানে সখ্য ও ভালোবাসা রাখাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্য স্থানে উত্তম আচরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু ভালো ব্যবহার ও সুন্দর আচরণ করার জন্য সখ্য ও ভালোবাসা থাকা আবশ্যক নয়, তাই দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি লেখেন,
ثم البر والصلة والإحسان لا يستلزم التحابب والتوادد المنهي عنه في قوله تعالى لا تجد قوما يؤمنون بالله واليوم الآخر يوادون من حاد الله ورسوله الآية فإنها عامة في حق من قاتل ومن لم يقاتل والله أعلم. (فتح الباري ٣٣٢/٥، قوله باب الهدية للمشركين وقول الله تعالى لا ينهاكم الله عن الذين لم يقاتلوكم في الدين، ط. دار المعرفة)
ভালো ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা এবং সদয় হওয়ার কারণে সে সখ্য ও ভালোবাসা তৈরি হয় না, যে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ.
আপনি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়কে এমন পাবেন না যে, তারা ওইসব লোকের সাথে বন্ধুত্ব করে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত। (২০৭)
আয়াতটি সকল কাফেরের ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে এসেছে, যারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত বা লিপ্ত নয়। (২০৮)
এই আলোচনায় স্পষ্টভাবে এই দাবি করা হয়েছে যে, 'বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ' বিষয়ে যে- সমস্ত নস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো হারবি ও অহারবি সকল কাফেরের ক্ষেত্রেই অবতীর্ণ, কারণ হুকুমের ভিত্তি কাফেরের 'কুফর'। হারবি বা সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া নয়।
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৬০৬ হি.) লেখেন,
والمعنى : لا ينهاكم عن مبرة هؤلاء، وإنما ينهاكم عن تولي هؤلاء، وهذا رحمة لهم لشدتهم في العداوة، وقال أهل التأويل : هذه الآية تدل على جواز البر بين المشركين والمسلمين، وإن كانت الموالاة منقطعة. (مفاتيح الغيب ١٢٥/٩٢، ط. دار إحياء التراث)
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা আপনাকে কাফেরদের সাথে সদাচরণ করতে নিষেধ করেন না। তিনি নিষেধ করেন তাদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে। আর শত্রুতাতে তারা চরমপন্থী হলেও এটা মূলত তাদের জন্য রহমতস্বরূপ। মুফাসসিরগণ বলেন, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ হলেও আয়াতটি তাদের সাথে সদাচরণের অনুমতি দেয়। (২০৯)
কাজি সানাউল্লাহ পানিপথি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১২২৫ হি.)-ও একই বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, দুই ধরনের আয়াতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তাফসিরে মাজহারিতে উল্লেখ রয়েছে,
ومن هاهنا يظهر : أن المنهي عنه إنما هو موالاة أهل الحرب دون مبرتهم، يشرط أن لا يضرب المومنين وقد قال الله تعالى فى الأسارى من أهل الحرب : إما منا بعد وإما فداء، والمن نوع من البر... فَأُولئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ، ولا مفهوم لهذه الآية فإنه لا يجوز موالاة أهل الذمة أيضا لعموم قوله تعالى : لا تتخذوا عدوى وعدوكم اولياء، وقوله تعالى : لا تتخذوا اليهود والنصارى اولياء.
এ থেকে জানা যায় যে, নিষেধ হলো হারবিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, তাদের সাথে সদাচরণ করা ও সদয় হওয়া নিষিদ্ধ নয়। তবে শর্ত হলো এর কারণে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা হারবি বন্দিদের ব্যাপারে বলেন, 'তুমি চাইলে তাকে মুক্তিপণ না নিয়ে ছেড়ে দিতে পারো, কিংবা মুক্তিপণ নিয়েই ছেড়ে দাও।' আর মুক্তিপণ না নিয়ে ছেড়ে দেওয়া একধরনের সৎ ও সদয় ব্যবহার।... মুসলিমরা জিম্মিদের সাথেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারবে না, কারণ আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী ব্যাপক।
لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُم أَوْلِيَاءَ. তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।
এবং,
لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَرَى أَوْلِيَاءَ. তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। (২০)
টিকাঃ
২০৭. সুরা মুজাদালা: ২২
২০৮. ফাতহুল বারি, ৫/২৩৩
২০৯. তাফসিরে কাবির, ২৯/৫২১
২১০. তাফসিরে মাজহারি, ৯/২৬২