📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 জবাব

📄 জবাব


আসল বিষয়টি হলো, এটি আধুনিক সময়ের এমন একটি মৌলিক আপত্তি যা কেবল আলোচ্য মাসআলার ওপরই করা হচ্ছে এমন নয়, বরং এর পরিধি খুব প্রশস্ত ও বিস্তৃত। আপাত দেখতে নিষ্পাপ এই আপত্তি মেনে নেওয়া হলে ইসলামের অধিকাংশ বিধানকেই সংশোধন এবং সংযোজন করা জরুরি হয়ে পড়বে। আর তার পরিণতি হবে তাই, যা আজ আমরা ইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্মীয় ঐক্যের স্লোগানে দেখতে পাচ্ছি।
এই আপত্তির খণ্ডনে একটি মূলনীতি আলোচনাই এখানে যথেষ্ট মনে করছি। তা হলো, যে নসগুলোতে 'কাফেরদের প্রতি ভালোবাসা নিষিদ্ধ' হুকুম দেওয়া হয়েছে, সেখানে ( الذين آمنوا )যারা ঈমান এনেছে) ও المؤمنون )মুমিনগণ) ইত্যাদি শব্দসমূহ দিয়ে মুসলিমদের সম্বোধন করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট প্রকারের মুসলিম বা কাফেরের উল্লেখ সেগুলোতে নেই। বরং সব স্থানেই এমন ব্যাপক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা অর্থের দিক থেকে সকল প্রকারের মুসলিম ও কাফেরকে অন্তর্ভুক্ত করে। এ ছাড়া কুরআন-হাদিসের নসসমূহে সময় ও স্থানের কোনো শর্ত নেই। তাই এই বিধান সবসময় এবং সব স্থানে প্রযোজ্য।
উসুলে ফিকহের মূলনীতির আলোকেও এই সকল নস নির্দিষ্ট সময়ের সাথে শর্তযুক্ত (মুকাইয়াদ) নয়। বরং সময় ও স্থানের সকল শর্তমুক্ত। যাকে উসুলে ফিকহের পরিভাষায় 'মুতলাক' বলা হয়। আর মুতলাক নসের (শর্তহীন বর্ণিত নসসমূহের) বিধান হলো, সেগুলোকে শর্তমুক্তই রাখতে হবে। শরয়ি কোনো দলিল ছাড়া সেগুলোকে শর্তযুক্ত করার অধিকার কারও নেই। বরং শরয়ि দলিল ছাড়া নিজেদের মনমতো শরিয়তের শর্তহীন নসকে শর্তযুক্ত করা বা শর্তযুক্ত নসকে শর্তহীন করা শরিয়তপ্রণেতা ও বিধানদাতার অধিকার নিজের হাতে নেওয়ার নামান্তর। যা অসংখ্য বিদআতের শিকড়।
আরেকটি দিক হলো, নুসুসের মধ্যে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর সম্পর্ক রাখা নিষিদ্ধ হওয়ার আসল কারণ বলা হয়েছে 'কুফর', অন্য কোনো সাময়িক মাসলাহাত নয়। তাই যেখানে, যখনই এবং যার মধ্যে নিষেধের মূল কারণ 'কুফর' পাওয়া যাবে, সেখানেই এই বিধান হবে।
কিছু কিছু নস থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম ও ঈমানের একমাত্র দাবি হলো কুফর ও আহলে কুফরদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা পরিহার করা। অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি বাস্তব অর্থে ইসলাম এবং ঈমানের সৌভাগ্যে দীক্ষিত হয়, তাহলে সে কুফর ও আহলে কুফরদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। কুফর ও ঈমান বিপরীতমুখী দুই জিনিস, যেখানে একটির প্রতি ভালোবাসা অন্যটির প্রতি ঘৃণা জন্মায়।
সুরা মায়েদার ৮১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের একটি দোষের কথা এটাও উল্লেখ করেছেন যে, তারা কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
تَرَىٰ كَثِيرًا مِّنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنفُسُهُمْ أَن سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ.
আপনি ওদের অনেককে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখছেন। কতই- না নিকৃষ্ট সেই বস্তু, যা ওরা নিজেরা নিজেদের জন্য অগ্রে পাঠিয়েছে, তা হচ্ছে ওদের প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টি। আর ওরা আজাবে চিরকাল থাকবে।
ওরা যদি আল্লাহ ও নবীর প্রতি এবং যা নবীর প্রতি নাজিল করা হয়েছে তার প্রতি ঈমান রাখত, তবে কাফেরদের বন্ধু বানাত না; কিন্তু ওদের অনেকেই নাফরমান। (১৯৮)
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঈমানের দাবি হলো কাফেরদের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক না রাখা, বরং জরুরি হলো 'কুফর'-এই অপরাধের কারণে তার সাথে ঘৃণা ও সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেওয়া। যদি নির্দিষ্ট কাফেরদের ওপর হুকুমের মূল মানদণ্ড হতো, তাহলে বনি ইসরাইলকে এই হুকুম দেওয়া হতো না, হজরত ইবরাহিম আ. পুরো কুফফারগোষ্ঠীর সাথে বিদ্বেষ ও শত্রুতার ঘোষণা দিতেন না।
যদি 'সাময়িক বিবেচনাই' মাসআলার মূল কারণ হতো, তাহলে কোনো একটি নসে হলেও তা স্পষ্ট থাকত। এই সাময়িক বিবেচনা শেষ হওয়ার দ্বারা বিধানটিও রহিত হয়ে যেত। অথচ আমরা দেখতে পাই ইবরাহিম আ.-এর এই ঘোষণা,
إِنَّا بُرَءَ ؤُا مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ.
আমরা তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করো তাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। আমরা তোমাদের মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য প্রকাশ্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে, যে পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো। (১৯৯)
এর মাধ্যমে এটাই স্পষ্ট করতে চাচ্ছেন যে, কাফেরদের প্রতি আমাদের বিদ্বেষ ও শত্রুতা ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না তারা ঈমান কবুল করে। এর শেষ সীমা কোনো 'সাময়িক বিবেচনা' উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত নয়, বরং কুফরের অস্তিত্ব বিনাশ করাই এর শেষ সীমা। এটি একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, এই হুকুমের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে কুফর।

টিকাঃ
১৯৮. সুরা মায়েদা: ৮০-৮১
১৯৯. সুরা মুমতাহিনা: ৪

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 কুরআন-হাদিস থেকে দলিল পেশ করার ক্ষেত্রে উসুলে ফিকহের গুরুত্ব

📄 কুরআন-হাদিস থেকে দলিল পেশ করার ক্ষেত্রে উসুলে ফিকহের গুরুত্ব


কুরআন ও সুন্নাহর নসসমূহ থেকে উপকৃত হওয়ার নিরাপদ রাস্তা হলো উসুলে ফিকহের পূর্ণ অনুসরণ করে নিজের মতের পক্ষে কুরআন ও হাদিসকে দলিল হিসাবে পেশ করা। যদি এই বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, অথবা কার্যতক্ষেত্রে তাতে সচেতন না হওয়া যায়, তাহলে এর মাধ্যমে নিত্যনতুন বিকৃতির আবির্ভাব ঘটতেই থাকবে। আর বিকৃতির দরজা আরও প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর হবে। এর ফলে এই পবিত্র দ্বীন একটি খেলনার বস্তুতে পরিণত হবে। 'দ্বীনের বিকৃতি' থেকে বেঁচে থাকার নিরাপদ রাস্তা হলো উসুলে ফিকহের পূর্ণ অনুসরণ করে কুরআন-হাদিস থেকে দলিল পেশ করা ও বিধান আহরণ করা।

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 ব্যাপকভাবে বর্ণিত নসকে নির্দিষ্ট যুগের সাথে খাস করা

📄 ব্যাপকভাবে বর্ণিত নসকে নির্দিষ্ট যুগের সাথে খাস করা


যে-সকল নসে কাফেরদের সাথে ভালোবাসা ও মৈত্রীর সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে বা এ জাতীয় যত নস রয়েছে সবগুলোই 'আম' (ব্যাপক অর্থবোধক)। সেগুলোকে নির্দিষ্ট করে শুধু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের সাথে খাস করার পক্ষে মজবুত কোনো ভিত্তি নেই। নসের মধ্যে 'কাফের' শব্দ রয়েছে। যা একটি 'আম' শব্দ। যা তার সকল সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করবে, অর্থাৎ সকল যুগে যারাই কাফের বলে বিবেচিত হবে, তারাই এর অন্তর্ভুক্ত হবে। এখন কোন দলিলের ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট যুগের কাফেরকে এই আম হুকুম থেকে তাখসিস (নির্দিষ্টকরণ) করা হচ্ছে?
প্রসিদ্ধ কালামশাস্ত্রবিদ আল্লামা বাকিল্লানি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৪০৩ হি.) লেখেন,
فصل : القول في أنه لا يجوز تخصيص العام بعادة المخاطبين وإنما لم يجب ذلك، لأن الشرع لم يوضع فيما ورد به من تحليل وتحريم، وغير ذلك على عادة المكلفين، وإنما وضعه سبحانه على ما بينا من تديين عباده... ولا فرق بين أن تكون العادة المتقررة بينهم عادة شرعية أو مألوفة منهم بغير شرع. فإذا جاء الخطاب العام يمنع ذلك وجب منع جميعه.
وهذا نحو أن يقول : قد حرمت عليكم الطعام والشراب في يومكم هذا، أو يقول قد حرمت عليكم البيع، وهم معتادون لأكل طعام مخصوص وشرب شراب مخصوص وبيع أجناس مخصوصة. وعلى صفات مخصوصة. فليس لأحد أن يقول هذا الإطلاق محمول على ما عادتهم أكله وشربه وتبايعه لأجل أن الاسم عام مطلق. ويمكن أن يكون من مصلحتهم تحريم أكل شيء وشربه، مما هو عادة لهم بشرع متقدم أو عادة توافت على اعتيادها هممهم والحكم متعلق بقول صاحب الشرع ومقتضاه لا بعادتهم. (التقريب و الإرشاد (الصغير) ٣٥٢/٣، باب الكلام في فصول النهي وأحكامه)
এই পরিচ্ছেদটি এ আলোচনাসংক্রান্ত যে, সম্বোধিত ব্যক্তিদের আদত বা অভ্যাসের ভিত্তিতে (কুরআন-সুন্নাহর) কোনো আম (ব্যাপক) বক্তব্যকে খাস করা যাবে না। আর তা আবশ্যকও নয়। কেননা হালাল, হারাম বা অন্য যেসব বিধান শরীয়ত নির্ধারণ করেছে, সেসব ব্যাপারে মুকাল্লাফদের (যাদের ওপর শরিয়তের বিধিবিধান প্রযোজ্য হয় তাদের) আদত-অভ্যাসের ভিত্তিতে করেনি। বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজের পক্ষ থেকে তার বান্দাদেরকে দ্বীনের ওপরে ওঠানোর জন্য নির্ধারণ করেছেন, যেমনটা আমরা পূর্বে বলেছি... এ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যকার নির্ধারিত আদত-অভ্যাস চাই তা শরিয়তসম্মত হোক অথবা শরিয়ত ছাড়া তাদের নিজেদের মাঝে পরিচিত হোক, তাতে এই মূলনীতিতে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হবে না। সুতরাং যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সেসবের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে কোনো ব্যাপক সম্বোধন আসবে, তখন সকলেই তা মেনে নিতে হবে।
এটার উদাহরণ এভাবে দেওয়া যায় যে, (ধরে নেই) আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি তোমাদের ওপরে আজকের এই দিনে পানাহার হারাম করে দিলাম, অথবা বললেন, আমি তোমাদের ওপর ক্রয়-বিক্রয়কে হারাম করলাম, এমতাবস্থায় যে তারা বিশেষ খাবার খেতে, বিশেষ পানীয় পান করতে এবং বিশেষ কিছু জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় বিশেষ কিছু পদ্ধতিতে করতে অভ্যস্ত। তাহলে এ ক্ষেত্রে কারও জন্যই এমনটি বলার সুযোগ নেই যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞাটি তাদের পানাহার এবং ক্রয়-বিক্রয়ের অভ্যাসের ওপর প্রয়োগ হবে (অর্থাৎ সে নিষেধাজ্ঞা শুধু ওইসব জিনিসের সাথেই খাস হবে)। কেননা, এখানে শব্দগুলো মুতলাক (শর্তবিহীন) এবং আম (ব্যাপক)। এটা অসম্ভব নয় যে, পূর্ববর্তী শরীয়ত কিংবা অভ্যাস অনুযায়ী তারা যেসব পানাহারে অভ্যস্ত সেগুলো হারাম করার মাঝেই তাদের কল্যাণ। অতপর মূল হুকুম শরিয়তপ্রণেতার বক্তব্য ও সেই বক্তব্যের দাবি অনুযায়ী হবে, তাদের অভ্যাস অনুযায়ী হবে না। (২০০)

টিকাঃ
২০০. আত-তাকরিব ওয়াল-ইরশাদ, ৩/২৫৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00