📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 মুরতাদের ঋণের হুকুম

📄 মুরতাদের ঋণের হুকুম


যদি মুরতাদ ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা যায়, তাহলে সাহেবাইনের নিকট তার রেখে যাওয়া সমস্ত সম্পদ থেকে তা পরিশোধ করা হবে, চাই তা ইসলামে থাকা অবস্থার কামাই হোক বা মুরতাদ হওয়ার পরের। ইমাম আবু হানিফা থেকে এই বিষয়ে একাধিক বক্তব্য বর্ণনা করা হয়। একটি বর্ণনা হলো, মুসলমান থাকা অবস্থায় যে ঋণ তা সে অবস্থার কামাই থেকে পরিশোধ করা হবে। আর মুরতাদ অবস্থার ঋণ মুরতাদ অবস্থার কামাই দিয়ে পূরণ করা হবে। তবে গ্রহণযোগ্য বর্ণনা হলো, প্রথমত মুসলমান থাকা অবস্থার সম্পদ দিয়েই ঋণ আদায় করার চেষ্টা করা হবে। তবে ঋণ যদি এত বেশি হয় যা মুসলমান অবস্থার সম্পদ দিয়ে পূরণ সম্ভব না, তখন মুরতাদ অবস্থার সম্পদ দিয়ে ঋণ পূরণ করা হবে। (১৯০) আল-ইখতিয়ার গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে,
وحلـت الـديـون الـتـي عـلـيـه ونقلـت أكسابه في الإسلام إلى ورثته المسلمين، وأكساب الردة فيء (سم)، وتقضى ديون الإسلام من كسب الإسلام، وديون الردة من كسبها (سم)، فإن عاد مسلما فما وجده في يد وارثه من ماله أخذه. (الاختيار لتعليل المختار ٦٤١/٤ ، كتاب السير، فصل المرتد)
মুরতাদের মেয়াদী ঋণ তৎক্ষণাৎ আদায় করা হবে। ইসলাম অবস্থায় সে যা কামিয়েছে তা ওয়ারিসরা পাবে আর মুরতাদ অবস্থার সম্পদ 'মালে ফাই' বলে গণ্য হবে। মুসলমান থাকা অবস্থায় সে যে ঋণগ্রস্ত হয়েছিল তা মুসলমান অবস্থার সম্পদ থেকে আদায় করা হবে। আর মুরতাদ অবস্থারটা সে অবস্থার সম্পদ থেকে। মুরতাদ ব্যক্তি যদি পুনরায় ইসলাম কবুল করে দারুল হারব থেকে চলে আসে, তখন ওয়ারিসদের কাছে তার যে সম্পদ তখন থাকবে সে ফিরিয়ে নিতে পারবে। (১৯১)

টিকাঃ
১৯০. বাদায়েউস সানায়ে, ৭/১৩৯, কিতাবুস সিয়ার, বায়ানু আহকামিল মুরতাদ্দিন
১৯১. আল-ইখতিয়ার, ৪/১৪৭

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 মুরতাদের হস্তক্ষেপে বিধান

📄 মুরতাদের হস্তক্ষেপে বিধান


মুরতাদের হস্তক্ষেপ চার প্রকারের।
১. ওই সকল হস্তক্ষেপ যা সর্বসম্মতিক্রমে কার্যকর হবে। সেগুলো হলো যার জন্য কোনো ধর্ম শর্ত নয়। যেমন তালাক।
২. ওই সকল হস্তক্ষেপ যা সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল। সেগুলো হলো যার জন্য আসমানي ধর্ম শর্ত। যেমন বিবাহ, জবাইকৃত পশু হালাল হওয়া।
৩. সে সমস্ত হস্তক্ষেপ যা সর্বসম্মতিক্রমে স্থগিত থাকবে। যেমন শিরকতে মুফাওয়াজা। (১৯২) কেননা শিরকতে মুফাওয়াজা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো উভয় শরিক সকল ধরনের অধিকারে সমান হওয়া। আর মুরতাদ অনেক অধিকারেই মুসলমানের সমান নয়।
৪. ওই সকল হস্তক্ষেপ যা কার্যকর হওয়া আর না হওয়ার বিষয়টি ফকিহদের মাঝে মতানৈক্যপূর্ণ। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া ইত্যাদি। ইমাম আবু হানিফার নিকট এ সকল হস্তক্ষেপ স্থগিত থাকবে। যদি ইসলাম কবুল করে তাহলে কার্যকর হবে, অন্যথায় নয়। আর সাহেবাইনের নিকট এ সকল হস্তক্ষেপ কার্যকর হবে। বাকি ইমাম মুহাম্মাদের নিকট এমন ব্যক্তির হুকুম মুমূর্ষু ব্যক্তির মতো। তার সকল হস্তক্ষেপ শুধু সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের মাঝে কার্যকর হবে। আর ইমাম আবু ইউসুফের নিকট স্বাভাবিক মানুষের মতো পুরো সম্পদের মাঝেই তার হস্তক্ষেপ কার্যকর হবে।
জামিউস সগির গ্রন্থে আছে,
مرتد أعتق أو وهب أو باع أو اشترى ثم أسلم جاز ما صنع وإن لحق أو مات على ردته بطل ذلك كله وقال أبو يوسف ومحمد (رحمهما الله) يجوز ما صنع في الوجهين وقال محمد رحمه الله هو في ذلك بمنزلة المريض. (الجامع الصغير ص ٦٠٤، كتاب السير، باب الارتداد و اللحاق بدار الإسلام، ط. دار الأيمان সেহারনপুর। وليرجع للاستزادة : الهداية في شرح بداية المبتدي، شرح السير الكبير، باب ما يوافق من أمر المرتدين ومالا يوقف من ذلك)
মুরতাদ যদি গোলাম আজাদ করে বা কোনো হাদিয়া দেয় অথবা কোনো ক্রয়-বিক্রয় করে, এ সকল লেনদেনের বিধান হলো, সে যদি ইসলাম কবুল করে তাহলে কার্যকর হবে। আর যদি এই অবস্থায় সে মারা যায় বা দারুল হারবে চলে যায়, তাহলে এসব হস্তক্ষেপ বাতিল বলে গণ্য হবে।(১৯৩)
ফায়েদা : এই মতানৈক্য মুরতাদ পুরুষের সাথে প্রযোজ্য। আল্লাহ না করুন, যদি কোনো নারী মুরতাদ হয়, তাহলে হানাফিদের নিকট যেহেতু তাকে হত্যা করা ওয়াজিব নয়, তাই তার এ সকল হস্তক্ষেপ কার্যকর হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১৯২. শিরকতে মুফাওয়াজা বলা হয়, এমন শিরকত যেখানে শরিকদের সবকিছুতেই একরকম হতে হয়, এমনকি উভয়ের ধর্মও এক হতে হয়।
১৯৩. আল-জামিউস সগির

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 জিন্দিকের বিধান

📄 জিন্দিকের বিধান


কোনো মুসলমান যদি জিন্দিক হয়ে যায়, তাহলে তার হুকুম ওটাই যা মুরতাদের হুকুম। পেছনে যা আলোচিত হয়েছে। কিন্তু যদি কোনো অমুসলিম জানদাকার পথ অবলম্বন করে, চাই সে হারবি হোক বা জিম্মي, তার কী হুকুম? আল্লামা ইবনে কামাল পাশা রহিমাহুল্লাহ এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তার বক্তব্যের খোলাসা হলো, যদি এমন ব্যক্তি নিজের জানদাকা ও ইলহাদের প্রতি দাওয়াত না দেয়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে না। এই ব্যক্তি হলো অনেকটা এমন, যে একটি কুফর থেকে অন্য আরেকটি কুফর গ্রহণ করেছে। যেমন কেউ খ্রিষ্টান বা মাজুসি ছিল, পরে সে হিন্দু অথবা ইহুদি হয়েছে। আর যদি সে তার এই জানদাকা আর ইলহাদের দিকে দাওয়াত দেয়, তাহলে তাকে হত্যা করা জরুরি। যদি গ্রেফতার করার পূর্বে সে নিজে থেকে তাওবা করে এবং জানদাকা থেকে ফিরে এসেছে এটার নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে, তাহলে এমন সুরতে তাকে হত্যা করা হবে না। 'ফাতাওয়ায়ে শামি'-তে উল্লেখ হয়েছে,
اعلم أنه لا يخلو، إما أن يكون معروفا داعيا إلى الضلال أو لا. والثاني ما ذكره صاحب الهداية في التجنيس من أنه على ثلاثة أوجه : إما أن يكون زنديقا من الأصل على الشرك، أو يكون مسلما فيتزندق، أو يكون ذميا فيتزندق، فالأول يترك على شركه إن كان من العجم، أي بخلاف مشرك العرب، فإنه لا يترك. والثاني يقتل إن لم يسلم لأنه مرتد. وفي الثالث يترك على حاله لأن الكفر ملة واحدة اهـ والأول أي المعروف الداعي لا يخلو من أن يئوب بالاختيار ويرجع عما فيه قبل أن يؤخذ أولا، والثاني يقتل دون الأول اه. (حاشية ابن عابدين ١٤٢/٤ ، كتاب الجهاد، باب المرتد، مطلب في الفرق بين الزنديق والمنافق والدهري والملحد)
জিন্দিকের দুই সূরত; হয় সে তার মতাদর্শের দিকে অন্যকে দাওয়াত দেয় অথবা দেয় না। নিজের জানদাকার মতাদর্শ অন্যের কাছে প্রচার করে না, এর আবার তিন সুরত হতে পারে। ১. জন্মগত মুশরিক থেকে জিন্দিক হয়েছে। ২. মুসলমান থেকে জিন্দিক হয়েছে। ৩. জিম্মي থেকে জিন্দিক হয়েছে। প্রথম সুরতে যদি সে অনারবি মুশরিক হয়, তাহলে তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে। যেহেতু আরবে মুশরিকদের হত্যা ছাড়া অন্য বিধান নেই। দ্বিতীয় প্রকারের জিন্দিক যেহেতু মূলত মুরতাদ, তাই সে ইসলাম গ্রহণ না করলে তাকে হত্যা করে ফেলা হবে। আর তৃতীয় প্রকারের জিন্দিককেও তার অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে। কেননা সকল কাফেরের বিধান একই। আর জিন্দিক যদি নিজ মতাদর্শের প্রচারক হয়, আর গ্রেফতারের পূর্বে নিজ ইচ্ছাতে তাওবা করে নেয়, তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে অন্যথায় হত্যা করা হবে। (১৯৪)
জিন্দিকের তাওবা কবুল হবে কি না এই নিয়ে হানাফি ফকিহদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। কাজي খান রহ.-সহ অন্যান্য ফকিহ এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন যে, যদি গ্রেফতারের পূর্বে সে তাওবা করে নেয়, তাহলে তার তাওবা কবুল করা হবে এবং হত্যার হুকুম বাতিল হয়ে যাবে। আর গ্রেফতারের পর তাওবা করলে দুনিয়ার বিবেচনায় তা গ্রহণযোগ্য হবে না, তাকে হত্যা করে ফেলতে হবে। আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বলা হয়েছে,
(و) كذا الكافر بسبب (الزندقة لا توبة له، وجعله في الفتح ظاهر المذهب، لكن في حظر الخانية الفتوى على أنه إذا أخذ الساحر أو الزنديق المعروف الداعي (قبل توبته) ثم تاب لم تقبل توبته ويقتل، ولو أخذ بعدها قبلت. (الدر المختار مع رد المحتار ١٤٢/٤، كتاب الجهاد، باب المرتد، مطلب في الفرق بين الزنديق والمنافق و الدهري والملحد)
যে ব্যক্তি জানদাকার মাধ্যমে কাফের হয় তার তাওবা কবুল হয় না। তবে ফাতাওয়ায়ে কাজيখানে উল্লেখ হয়েছে যে, ফাতাওয়া হলো এই কথার ওপরে যে, জিন্দিক যে নিজ মতাদর্শের প্রচার করে, যদি তাওবা করার পূর্বে গ্রেফতার হয়, তাহলে তার তাওবা কবুল করা হবে না। তাকে হত্যা করা হবে। আর যদি গ্রেফতারের পূর্বেই তাওবা করে নেয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। (১৯৫)

টিকাঃ
১৯৪. ফাতাওয়ায়ে শামি, ৪/২৪১
১৯৫. ফাতাওয়ায়ে শাম, ৪/২৪১

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 আধুনিক ইলহাদ ও জানাদাকা

📄 আধুনিক ইলহাদ ও জানাদাকা


বর্তমান জামানায় ইলহাদ ও জানদাকার তুফান চলছে যা শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না! নিত্যদিন নতুন নতুন ফিতনা ও রংবেরঙের পথভ্রষ্টতা সমাজে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ এগুলো দ্রুত শেষ করে দিন। আমিন। বড় দুঃখজনক বিষয় হলো, অতীতের তুলনায় বর্তমানে ইলহাদ ও জানদাকার আসবাব ও উপকরণ ও সেগুলোর উপযোগী পরিবেশ অনেক বেশি। যার কারণে অসংখ্য রূপে সেগুলো প্রকাশিত হচ্ছে। মৌলিকভাবে ইলহাদ ও জানদাকার দুটি বাহ্যিক সুরত রয়েছে। এক. দ্বীনের আকৃতি ধারণ করা জানদাকা। দুই. দুনিয়ার শিরোনামে ছড়ানো জানদাকা।
প্রথম সুরত কাদিয়ানি, আগাখানি, রাফেজি, মুনকিরিনে হাদিস ইত্যাদি দলগুলোর রূপে প্রকাশ হয়। এরা নিজেদের কাজগুলোকে ইসলামের নামে প্রকাশ করে, কিন্তু কুফরি বিশ্বাস ও মতবাদ নিজেদের মাঝে পোষণ করে। নিজেদের খুব জোরেশোরে মুসলমান বলে প্রকাশ করে। সাথে দ্বীনের বহু অকাট্য বিষয় অস্বীকার করে। আবার মানুষকেও নিজেদের এই সকল গোমরাহি ও কুফরের জালে ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। উম্মতের একটি বড় অংশ এদের ফিতনার জালে আটকা পড়ে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গোমরাহির অতল সমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছে।
আর দ্বিতীয় সুরত যা দুনিয়ার শিরোনামে প্রকাশ হয়। সেটা হলো ইসলামের বিপরীত বিভিন্ন জীবনব্যবস্থাকে নিজেদের জন্য বেছে নেয় এবং সেগুলোকে অনেকটা ধর্মের মতোই গ্রহণ করে থাকে। এই মতাদর্শের ফিতনা বোঝার জন্য আবুল হাসান আলি নদবির ছোট্ট পুস্তিকা (ردة ولا أبا بكر) (চারদিকে রিদ্দাহের ফিতনা, নেই কোনো আবু বকর) পড়া যেতে পারে। যার উর্দু অনুবাদও রয়েছে। (১৯৬)
মনে রাখা দরকার, সাধারণ কুফর থেকেও উম্মাহর জন্য জানদাকা বেশি ক্ষতিকর। কেননা তা আস্তিনের ভেতরে থেকে মুসলিমদের মাঝে দ্বীনের নামে কুফর ছড়িয়ে দেয়। ইসলামের নামে তাদের পথভ্রষ্টতা প্রচার করতে থাকে, যার কারণে ইসলামের ঐক্যের মাঝে ফাটল সৃষ্টি হয়। তাদের কথার ধোঁকায় পড়ে কত মুসলমান মনের অজান্তেই ইসলামের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে তা আল্লাহই ভালো জানেন! কিন্তু একজন সাধারণ কাফেরের দ্বারা এমন ক্ষতি হয় না। এজন্য উম্মতের রাহবারগণের ও কল্যাণকামীদের উচিত এ সকল জিন্দিক থেকে নিশ্চিন্ত না হয়ে যাওয়া, বরং তাদের ব্যাপারে যে শরয়ि বিধান আছে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে যাওয়া। আর যেখানে তা সম্ভব নয়, সেখানে এই গোমরাহি থেকে উম্মাহর ঈমানের সম্পদ বাঁচানোর জন্য নিজেদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে যাওয়া।

টিকাঃ
১৯৬. বইটির চমৎকার বাংলা অনুবাদ করেছেন শ্রদ্ধেয় মাওলানা হাসান আজিজ হাফিজাহুল্লাহ 'ধর্মহীনতার ভয়াল স্রোত; নেই কোনো আবু বকর' নামে। প্রকাশ করেছে সঞ্জীবন প্রকাশনী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00