📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 মুলহিদ ও জিন্দিক বিষয়ে একটি সম্মিলিত ফাতাওয়া বিশ্লেষণ

📄 মুলহিদ ও জিন্দিক বিষয়ে একটি সম্মিলিত ফাতাওয়া বিশ্লেষণ


এটা স্পষ্ট থাকা দরকার যে, মুলহিদ ও জিন্দিকের সাথে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের যে বিধান এখানে বলা হয়েছে, এটাই হলো শরিয়তের মূল বিধান। এখন চাই রিদ্দা ও জানদাকায় একজন ব্যক্তি লিপ্ত হোক বা পুরো সমাজ, বিধান তাই হবে যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। আজ থেকে ৪৫ বছর পূর্বে জামিয়া ইসলামিয়া বানুরি টাউনের প্রধান মুফতি ওয়ালি হাসান খান টুনকি রহিমাহুল্লাহ 'আকাবারে মাজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুয়ত' থেকে প্রেরিত এক প্রশ্নের জবাবে বিস্তারিত একটি ফাতাওয়া লেখেন। যা সে সময়ের উপমহাদেশের নির্ভরযোগ্য সুপ্রসিদ্ধ আলেমদের কাছে পাঠানো হয়। অধিকাংশ আলেম ফাতাওয়াটিকে সত্যায়িত করেন এবং সঠিক বলে মত ব্যক্ত করেন। সেখানে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয় যে, কাদিয়ানিদের সাথে সবরকম লেনদেন করা নাজায়েজ।
কিছু ঘরানা থেকে এখন এই ফাতাওয়ার ওপর আপত্তি তোলা হচ্ছে যে, ফিকহের কিতাবে মুরতাদের সাথে সংশ্লিষ্ট যে বিধান রয়েছে তা থেকে সম্মিলিত ফাতাওয়া ভিন্ন এবং এই ফাতাওয়া ভুল। আর কিছু ঘরানা থেকে একটি ব্যাপক মূলনীতি এটাও বলা হচ্ছে যে, মুলহিদ ও জিন্দিকের সাথে সকল ধরনের সম্পর্ক—ব্যবসা, লেনদেন ইত্যাদি অকাট্য হারাম!
বাস্তবতা হলো, এই উভয় কথাই সঠিক নয়। বরং সঠিক কথা হলো তাই, যা আমরা ওপরে উল্লেখ করেছি। ব্যবসায়িক লেনদেনের বিষয়ে আমাদের হানাফি আলেমদের দুটি মত রয়েছে, এক বক্তব্যমতে এদের সকল হস্তক্ষেপ বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। আরেক মত অনুযায়ী তা স্থগিত থাকবে। কিন্তু তাদের সাথে লেনদেন—যা ওপরে উল্লেখ হয়েছে—সত্তাগতভাবে হারাম নয়। বরং আনুষঙ্গিক কারণে তাতে নিষেধাজ্ঞা এসে যায়। আর সে আনুষঙ্গিক বিষয়টি যত বৃদ্ধি পাবে, হুকুমের কঠোরতাও ততটাই বৃদ্ধি পাবে। সে ফাতাওয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করেই বলা আছে। অতিরিক্ত ফায়েদার জন্য উক্ত ফাতাওয়ার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এখানে নকল করছি।
প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি বা দল যদি কোনো নবুয়তের মিথ্যা দাবিদারের ওপর ঈমান আনে, তাহলে উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। তার কুফরির বিষয়টি কোনো ধরনের সন্দেহ ছাড়া সুনিশ্চিত। এ ছাড়া যদি তার ভেতরে নিম্নোক্ত কারণগুলোও বিদ্যমান থাকে-
১. তারা ইসলামের লেবাস পরে মুসলিমদের ঈমানের ওপর হামলা চালায় এবং পুরো মুসলিমজাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে।
২. মুসলিমদের শারীরিক, আর্থিক এবং সকলপ্রকার ক্ষতি করতে তারা দ্বিধা করে না।
৩. তাদের বস্তুগত শক্তি ও সম্পদের উন্নতি নির্ভর করে মুসলিমদের শোষণের ওপর, তাদের কলকারখানা ও ইন্ডাস্ট্রিগুলো মুসলমানদের দ্বারাই পরিচালিত হয়, তারা ইসলামি দেশের বড় বড় পদে উত্তীর্ণ হওয়ার এবং অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
৪. ইসলামবিরোধী বহিরাগত শক্তি; ইহুদি ও খ্রিষ্টান এবং ভারতের ইসলামবিদ্বেষী শাসকদের সাথে তাদের যোগসূত্র রয়েছে। মূলত তাদের উদ্দেশ্য হলো, ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পারস্পরিক সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া। বরং একটি ইসলামি রাজ্যকে বিদ্রোহের এবং বিপ্লবের ক্ষেত্রে ঝুঁকির সম্মুখীন করে দেওয়া।
৫. এই ফিতনা থেকে রাষ্ট্র ও ধর্মকে বাঁচানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে শাসক বা শাসকের তরফ থেকে কোনো প্রত্যাশা নেই এবং তাদের অপরাধের ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করা হবে বলেও আশা করা যায় না।
এ সকল পরিস্থিতিতে ফিতনা নির্মূল করতে হলে মুসলিমদের করণীয় কী? এবং এ ব্যাপারে শরয়ि জিম্মাদারিই-বা কী?
এ সকল পরিস্থিতিতে এমন দল বা ব্যক্তির অবৈধ আগ্রাসন দমন করতে নিম্নোক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া জায়েয বা আবশ্যক হবে? যেমন-
ক. মুসলিম উম্মাহ সে ব্যক্তি বা দলের সাথে ভাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করবে।
খ. তাদের সাথে সালাম-মোসাফাহা, ওঠাবসা, এমনকি বিয়েশাদিতেও অংশগ্রহণ করবে না। বরং সামাজিকভাবে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে।
গ. তাদের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন বৈধ হবে কি না?
ঘ. তাদের ফ্যাক্টরি থেকে কি পণ্য ক্রয় করা যাবে? নাকি পরিপূর্ণরূপে অর্থনৈতিক বয়কট করতে হবে?
ঙ. তাদের বিদ্যালয়, হোটেল এবং রিসোর্টগুলোতে যাওয়া বৈধ হবে কি না?
চ. তাদের সাথে কি সম্প্রীতি বজায় রাখা যাবে?
ছ. তাদের কলকারখানায় প্রস্তুতকৃত পণ্য ব্যবহার করা যাবে কি না? মোটকথা, তাদেরকে পরিপূর্ণরূপে সামাজিক বয়কট করা বৈধ নাকি অবৈধ? তাদেরকে সরল পথে আনার জন্য কি সকল মুসলমানের ওপর বয়কটের হুকুম আরোপ হবে? যেহেতু এ ছাড়া অন্য কোনো পন্থা বাকি নেই।
উত্তর: কুরআন, হাদিস ও উম্মতের অকাট্য ইজমা দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনো নবী আসবে না। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর প্রত্যেক নবুয়তের দাবিদার সুনিশ্চিত কাফের।
আর যারা নবুয়তের দাবিদারদের সত্য মনে করবে এবং তাদের অনুসরণীয় মনে করবে তারাও কাফের ও মুরতাদ হয়ে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। এই ধরনের লোকের কুফর ও ইরতেদাদের সাথে যদি প্রশ্নে উল্লেখিত কারণসমূহের কোনো একটি কারণও পাওয়া যায়, তাহলে কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহে ইসলামي অনুযায়ী এরা ইসলামي সহমর্মিতা পাওয়ারও উপযুক্ত নয়। মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব হলো এদের সাথে সবধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করা-কথা বলা, ওঠাবসা করা, লেনদেন করা ইত্যাদি ত্যাগ করা। এমন কোনো সম্পর্ক তাদের সাথে রাখা যার দ্বারা তাদের ইজ্জত-সম্মান প্রকাশ পায়, অথবা তাদের শক্তি ও প্রভাব অর্জন হয় তা মুসলমানদের জন্য জায়েয নেই। হারবি কাফের ও ইসলামের শত্রুদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নর বিষয়ে অসংখ্য আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। ফিকহে ইসলামিতে যার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
এই কথা স্পষ্ট জেনে রাখা দরকার যে, যে-সকল হারবি কাফের মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, মুসলমানদের কষ্ট দেয়, ইসলামي পরিভাষাগুলোকে বিকৃত করে ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা করে এবং বন্ধুরূপী শত্রু হয়ে মুসলমানদের সম্মিলিত শক্তির মাঝে ফাটল ধরানোর কাজ করে, ইসলাম তাদের সাথে কঠিন থেকে কঠিন আচরণের আদেশ দেয়। উত্তম আচরণের অনুমতি তো শুধু ওই সকল কাফেরের ক্ষেত্রে, যারা মুসলমানদের কষ্ট দেয় না ও হারবি নয়। অন্যথায় যুদ্ধরত কাফেরদের সাথে তো কঠোর আচরণের আদেশ রয়েছে।
ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কাফের তো বহু দূরের বিষয়, যদি মুসলমানের মধ্যেই কোনো নিকৃষ্ট পাপীর আবির্ভাব হয়, তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি সম্পর্ক ছিন্ন করা, কথাবার্তা, লেনদেন বন্ধ করে দিয়ে সর্বদিক থেকে তাকে একঘরে করে দেওয়ার আদেশও সুন্নত ও শরিয়তে রয়েছে।
এই বিষয়ে প্রথম দায়িত্ব ইসলামي রাষ্ট্রের ওপরই আসে, আর তা হলো, এমন ফিতনাবাজ মুরতাদদের ওপর শরিয়তের বিধান 'যারা ইসলামধর্ম ত্যাগ করবে তাদের হত্যা করো' কার্যকর করে শিকড়সহ উপড়ে ফেলে মুসলিম উম্মাহকে এই ফিতনা থেকে রক্ষা করা। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদিন বিশৃঙ্খলাকারী ফিতনাবাজ ও মুরতাদদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন তা কারও কাছে অজানা নয়। আর পরবর্তী মুসলিম শাসকরাও এই ফরজ দায়িত্বের বিষয়ে ছাড় দেয়নি।
কিন্তু যদি মুসলিম শাসকরা এ ধরনের লোকদেরকে প্রাপ্য শাস্তি না দেয় বা তাদের ব্যাপারে কোনো আশাও না থাকে, তাহলে এই ফরজ দায়িত্ব মুসলমানের ওপর আরোপিত হবে। তারা তাদের দায়িত্বের মধ্যে থেকে এই ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করবে। মোটকথা, বিদ্রোহ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নেফাকি, মুসলমানদের কষ্ট দেওয়া, মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা এবং মুরতাদ, যুদ্ধরত কাফের, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও হিন্দুদের সাথে জোট গঠন করার কারণে প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তি ও দলকে সবধরনের বয়কট করা শুধু জায়েজই নয়, বরং ওয়াজিব। যদি মুসলমানদের কোনো দল বা সমাজ এই ফিতনাকে দূর করার এই বয়কটে ত্রুটি করে, তাহলে তাদের আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। (১৮২)

টিকাঃ
১৮২. অলি হাসান খান টুনকি রহ.-এর ফাতাওয়ার এই অংশটুকু নেওয়া হয়েছে 'কাদিয়ানিয়ো কে সাত মুওয়ালাত', পৃষ্ঠা ৬৪-৮৩ থেকে। আরও দেখুন, ফাতাওয়ায়ে বাইয়িনাত, ১/২১৮-২৪১ এখানে যা উল্লেখ করা হয়েছে, এটা হজরতের ফাতাওয়ার প্রথম অংশ। পুরো ফাতাওয়া প্রায় ২০ পৃষ্ঠার। পরে এই ফাতাওয়া উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের কাছে প্রেরণ করা হয়। অধিকাংশ আলেম ও প্রতিষ্ঠানই এই ফাতাওয়ার সাথে একমত হন ও একে সত্যায়িত করেন। এই ফাতাওয়া এবং আলেমদের সত্যায়নসহ এক খণ্ডে স্বতন্ত্র বই আকারে প্রকাশ করে মারকাজে সিরিজিয়া, লাহোর। যার নাম দেওয়া হয় 'কাদিয়ানিয়ো কে মুকাম্মাল বায়ক্যাট প্যার মুত্তাফিকা ফাতাওয়া' (কাদিয়ানিদের পূর্ণ বয়কটবিষয়ক সম্মিলিত ফাতাওয়া)। (মুফতি উবাইদুর রহমান)

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 মুরতাদ হওয়ার বিধান

📄 মুরতাদ হওয়ার বিধান


এই বিষয়ে সকল মুসলমান একমত যে, (আল্লাহর কাছে পানাহ চাই) কোনো ব্যক্তি যদি ইসলামধর্ম ত্যাগ করে তাহলে তাকে হত্যা করা আবশ্যক হয়ে যায়। আমাদের নিকট এটার মুসতাহাব পদ্ধতি হলো, এমন ব্যক্তিকে প্রথমে বন্দي করা হবে এবং পুনরায় ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হবে। যদি তার মনে ইসলাম নিয়ে কোনো সংশয় থেকে থাকে, যার ফলে সে ইসলাম ত্যাগ করেছে, সেগুলো দূর করার চেষ্টা করা হবে। এতে যদি সে ইসলাম কবুল করে নেয় তাহলে উত্তম হবে। অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। এই বিধান শুধু মুরতাদ পুরুষের সাথে প্রযোজ্য। যদি ধর্মত্যাগী কোনো নারী হয়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে না, বরং বন্দي করে রাখা হবে। যতক্ষণ না সে পুনরায় ইসলাম কবুল করে নেয়। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আল-ইখতিয়ারে' বলা হয়েছে,
(وإذا ارتد المسلم والعياذ بالله ) عن الإسلام (يحبس ويعرض عليه الإسلام وتكشف شبهته، فإن أسلم وإلا قتل، أما حبسه وعرض الإسلام عليه فليس بواجب لأنه بلغته الدعوة؛ والكافر إذا بلغته الدعوة لا تجب أن تعاد عليه فهذا أولى، لكن يستحب ذلك لأن الظاهر إنما ارتد لشبهة دخلت عليه أو ضيم أصابه فيكشف ذلك عنه ليعود إلى الإسلام وهو أهون من القتل. (الاختيار لتعليل المختار ٥٤١/٤ , كتاب السير، فصل المرتد، ط. دار الكتب العلمية)
আল্লাহর পানাহ! যখন কোনো মুসলমান মুরতাদ হয়ে যাবে, তখন তাকে বন্দي করে তার সামনে ইসলাম পেশ করা হবে এবং তার সংশয় দূর করার চেষ্টা করা হবে, এতে যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে নেয় তাহলে ভালো, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর তাকে বন্দي করা বা তার সামনে ইসলাম পেশ করা ওয়াজিব নয়। কারণ তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে। যেখানে কাফেরের নিকট একবার দাওয়াত পৌঁছার পর দ্বিতীয়বার দাওয়াত দেওয়া ওয়াজিব নয়, সেখানে মুরতাদের ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়তা থাকবে না এটা স্পষ্টই। কিন্তু তাকে দাওয়াত দেওয়া মুসতাহাব, কেননা বাহ্যত তার ধর্মত্যাগের কারণ এটাই যে, তার অন্তরে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে অথবা সে কোনো নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তাই এখন তার সংশয় দূর করতে হবে, যাতে সে ইসলামে ফিরে আসে। আর এটা তাকে হত্যা করার চেয়ে সহজ। (১৮৩)
আরেক গ্রন্থ 'তুহফাতুল ফুকাহা'-তে রয়েছে,
وأما حكم أهل الردة فنقول لهم أحكام من ذلك أن الرجل المرتد يقتل لا محالة إذا لم يسلم ولا يسترق لكن المستحب أن يعرض عليه الإسلام أولا فإن أسلم وإلا فيقتل من ساعته إذا لم يطلب التأجيل فأما إذا طلب التأجيل إلى ثلاثة أيام لينظر في أمره فإنه يؤجل ولا يزاد عليه ولكن مشايخنا قالوا الأولى أن يؤجل ثلاثة أيام ويحبس ويعرض عليه الإسلام فإذا وقع اليأس فحينئذ يقتل فأما المرأة فلا تقتل عندنا. (تحفة الفقهاء ۸۰۳/۳ ، كتاب السير، باب أخذ الجزية، ط. دار الكتب العلمية)
আমাদের নিকট মুরতাদদের বিধান হলো, যদি পুরুষ হয় তাকে হত্যা করা হবে, এতে ভিন্ন কোনো অবকাশ নেই, যদি না সে ইসলাম গ্রহণ করে। তাকে গোলাম বানানো যাবে না। তবে মুসতাহাব হলো, তার সামনে ইসলাম পেশ করা হবে, যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তো ভালোই। আর যদি চিন্তাভাবনা করার জন্য সময় না চায়, তাহলে সাথে সাথে তাকে হত্যা করা হবে। আর যদি চিন্তা-ফিকির করার জন্য সময় চায়, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ তিন দিন সুযোগ দেওয়া হবে। আমাদের অনেক মাশায়েখের মত হলো, প্রথমে তিন দিন তাকে বন্দي করে রাখা হবে এবং তার সামনে ইসলাম পেশ করা হবে, আর যখন তার ইসলাম কবুল না করার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে, তখন আর দেরি না করে তাকে হত্যা করা হবে। আর মহিলার ক্ষেত্রে আমাদের মাজহাব হলো, তাকে হত্যা করা হবে না। (১৮৪)

টিকাঃ
১৮৩. আল-ইখতিয়ার লি-তালিলিল মুখতার, ৪/১৪৫
১৮৪. তুহফাতুল ফুকাহা, ৩/৩০৮

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 মুরতাদের সম্পদ ও মালিকানার বস্তুর বিধান

📄 মুরতাদের সম্পদ ও মালিকানার বস্তুর বিধান


সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনটি মাসায়েল-
১. মুরতাদের সম্পদের বিধান।
২. মুরতাদের ওয়ারিস হওয়ার বিধান।
৩. মুরতাদের ঋণের হুকুম।
সম্পদের বিধানের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার রায় হলো, যেহেতু মুরতাদকে হত্যাই করে ফেলা হবে, তাই তার সকল সম্পদ থেকে তার মালিকানা বাতিল হয়ে যাবে। সে আর তার সম্পদের মালিক থাকবে না। তবে যেহেতু তার ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে এবং মুরতাদ অবস্থায় মৃত্যুরও সম্ভাবনা রয়েছে, তাই মালিকানা বাতিল হওয়ার বিষয়টি স্থগিত থাকবে। যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়, তাহলে পূর্বের মতোই সকল সম্পদের মালিক থেকে যাবে। আর যদি মুরতাদ অবস্থায় তাকে হত্যা করে ফেলা হয়, তাহলে তার সম্পদ ওয়ারিসদের হয়ে যাবে। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর নিকট শুধু মুরতাদ হওয়ার মাধ্যমেই তার মালিকানা বাতিল হবে না। যখন তাকে এই অপরাধে হত্যা করা হবে বা সে মুরতাদ হয়ে কোনো দারুল হারবে স্থায়ীভাবে চলে যাবে তখন বাতিল হবে। তুহফাতুল ফুকাহা গ্রন্থে রয়েছে,
ومنها حكم مال المرتد وتصرفاته قال أبو حنيفة إنه موقوف فإن مات أو قتل على ردته أو لحق بدار الحرب بطل جميع ذلك إلا أن يدعي ولد جارية له فيثبت نسبه وتصير الجارية أم ولد له، وإن أسلم صح ذلك كله لأن ماله موقوف عنده بين أن يصير لورثته من وقت الردة وبين أن يبقى له إذا أسلم فالتصرفات المبنية عليه كذلك، وعند أبي يوسف تصرفاته صحيحة مثل تصرف الصحيح، وعند محمد تصرفاته مثل تصرف المريض لا تصح تبرعاته إلا من الثلث لأن عندهما ملكه باق بعد الردة وإنما يزول بالموت والقتل وإلحاق بدار الحرب. (تحفة الفقهاء ۱۳/۳، كتاب السير، باب أخذ الجزية، ط. دار الكتب العلمية)
অর্থাৎ, ইমাম আবু হানিফার মতে, মুরতাদের সম্পদ ও সকল ধরনের হস্তক্ষেপ স্থগিত থাকবে। যদি মুরতাদ অবস্থায় তাকে হত্যা করা হয় অথবা সে দারুল হারবে চলে যায়, তাহলে এ সবকিছু বাতিল হয়ে যাবে। আর মুসলমান হলে মালিকানাও থাকবে এবং তার হস্তক্ষেপ কার্যকর হবে। ইমাম আবু ইউসুফের মতে একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতোই মুরতাদ ব্যক্তির সকল হস্তক্ষেপ কার্যকর হবে। আর ইমাম মুহাম্মাদের মতে এমন ব্যক্তির সম্পদ ও তার হস্তক্ষেপ মুমূর্ষু ব্যক্তির হুকুমে। অর্থাৎ তার সকল বিষয় সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের মধ্যেই কার্যকর হবে। মোটকথা, ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের নিকট মুরতাদ হওয়ার পরেও ব্যক্তির মালিকানা বাকি থাকবে। তবে এই অবস্থায় তাকে হত্যা করা হলে বা দারুল হারবে চলে গেলে মালিকানা বাতিল হয়ে যাবে। (১৮৫)

টিকাঃ
১৮৫. তুহফাতুল ফুকাহা, ৩/৩১০

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 মুরতাদের ওয়ারিশের হুকুম

📄 মুরতাদের ওয়ারিশের হুকুম


কোনো ব্যক্তি যদি মুরতাদ অবস্থায় মারা যায়, তাহলে তার সম্পদের দুটি অবস্থা হয়।
ক. ওই সকল সম্পদ যা সে ইসলামে থাকাবস্থায় কামাই করেছে। সর্বসম্মতিক্রমে এই সম্পদ মুরতাদের ওয়ারিসগণ পাবে।
খ. ওই সকল সম্পদ যা সে মুরতাদ অবস্থায় কামাই করেছে। এ নিয়ে ইমাম আবু হানিফা আর ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানিফার মতে এই সম্পদ 'মালে ফাই' (১৮৬) বলে গণ্য হবে। আর সাহেবাইনের নিকট এই সম্পদগুলোও ওয়ারিসরা পাবে। 'আল-জামিউস সগির' গ্রন্থে রয়েছে,
مُرْتَد لَهُ مَال اكْتَسبهُ فِي حَالَ الْإِسْلَام وَمَال اكْتَسبهُ فِي حَالَ الرَّدَّةِ فَأَسلم فَهُوَ لَهُ وَإِن لحق بدار الحَرْب أَو مَاتَ على ردته فَمَا كَانَ لَهُ حَالَ الْإِسْلَامِ فَهُوَ لَوَرِثَته وَمَا كَانَ فِي حَالَ الرَّدَّة فَهُوَ فَيْء وَقَالَ أَبُو يُوسُف وَمُحَمّد (رحمهما الله) جَميع ذَلِك لورثته. (الجامع الصغير ص ٦٠٤ ، كتاب السير، باب الارتداد و اللحاق بدار الإسلام، ط. دار الأيمان سهارنبور)
মুরতাদ ব্যক্তি মুসলমান থাকাবস্থায় অথবা মুরতাদ হয়ে যাওয়ার পর যে সম্পদ অর্জন করেছে, সবগুলোই তার মালিকানাধীন হবে, যদি সে ইসলাম কবুল করে নেয়। তবে মুরতাদ হওয়ার পর সে যদি কোনো দারুল হারবে চলে যায়, তাহলে মুসলমান থাকাবস্থায় যা কামিয়েছে তা ওয়ারিসরা পাবে আর মুরতাদ অবস্থায় যা কামিয়েছে তা 'মালে ফাই' বলে গণ্য হবে। এটা ইমাম আবু হানিফার মত। আর সাহেবাইনের (আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ) নিকট ব্যক্তির উভয় অবস্থার কামানো সব মালই তার ওয়ারিসরা পাবে। (১৮৭)
ইমাম মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ রচিত 'কিতাবুল আসল' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,
قلت : أرأيت الرجل إذا ارتد عن الإسلام فاكتسب مالا في ردته أيكون ميراثا بين ورثته؟ قال : لا، ولكن يكون فيئا في بيت المال. قلت : ولم؟ قال : لأنه اكتسبه وهو مرتد حلال دمه بمنزلة أهل الحرب. وقال أبو يوسف ومحمد : نرى أن ما اكتسبه في ردته ميراث لورثته، ونرى عتقه في ردته جائزا، ولا يكون شيء مما اكتسبه في دار الإسلام فيئا، إلا أن محمدا قال في ذلك : هو فيما أعتق أو باع أو اشترى بمنزلة المريض.... قلت : فإن أبى أن يسلم فقتله الإمام أيقسم ماله بين ورثته على فرائض الله تعالى؟ قال : نعم. قلت : فهل بلغك في هذا أثر؟ قال : نعم، بلغنا عن علي بن أبي طالب أنه قتل مرتدا وقسم ماله بين ورثته على فرائض الله تعالى. وبلغنا نحو من ذلك عن علي وعبد الله بن مسعود.
قلت : أرأيت الرجل إذا ارتد عن الإسلام هل تقسم ماله بين ورثته وهو مقيم في الدار قبل أن تقتله؟ قال : لا . قلت : فإن لحق بأرض الحرب ثم رفع ذلك إلى الإمام هل تقسم ماله بين ورثته؟ قال : نعم. قلت : وتعد هذا بمنزلته لو مات؟ قال : نعم. (الأصل ٥٩٤/٧ ، باب الأحكام في الارتداد عن الإسلام، تــ د محمد بوينوكالن)
অর্থাৎ, ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর নিকট মুরতাদ অবস্থায় অর্জিত সম্পদ 'মালে ফাই' বলে গণ্য হবে। তা ওয়ারিসদের মাঝে বণ্টন হবে না। কেননা ইরতেদাদের কারণে সে হত্যাযোগ্য হয়ে হারবিদের হুকুমে হয়ে গেছে। আর সাহেবাইনের নিকট ইরতেদাদ অবস্থায় অর্জিত সম্পদ ওয়ারিসদের মাঝে বণ্টন হবে। কেননা দারুল ইসলামে অর্জিত সম্পদ 'মালে ফাই' হয় না। তবে ইমাম মুহাম্মাদের নিকট মুরতাদ অবস্থায় নেককাজে খরচ করা, যেমন গোলাম আজাদ ইত্যাদিতে সে মুমূর্ষু ব্যক্তির হুকুমে হবে। অর্থাৎ, এ সকলকিছু তার এক-তৃতীয়াংশের মাঝেই কার্যকর হবে।... মুরতাদ দ্বিতীয়বার ইসলাম কবুল করা থেকে বিরত থাকার ফলে যদি ইমাম তাকে হত্যা করে, তাহলে তার মাল ওয়ারিসদের মাঝে ইসলাম অনুযায়ী বণ্টন হবে। এর দলিল হলো হজরত আলি রা.-এর আমল, তিনি এক মুরতাদকে হত্যা করে তার সম্পদ ইসলাম অনুযায়ী ওয়ারিসদের মাঝে বণ্টন করেছেন। তেমনইভাবে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকেও এমন বর্ণনা রয়েছে। হ্যাঁ, হত্যার পূর্বে যতক্ষণ সে দারুল ইসলামে আছে তার সম্পদ ওয়ারিসদের মাঝে বণ্টন করা হবে না। যদি মুরতাদ হয়ে সে কোনো দারুল হারবে চলে যায়, তাহলে সে মৃত ব্যক্তির হুকুমে চলে যাবে আর তার সম্পদ ওয়ারিসদের মাঝে বণ্টন করা হবে। (১৮৮)
আল-ইখতিয়ার গ্রন্থে রয়েছে,
ويزول ملكه عن أمواله زوالا مراعى، فإن أسلم عادت إلى حالها، وإن مات أو قتل أو لحق بدار الحرب وحكم بلحاقه عتق مدبروه وأمهات أولاده وحلت الديون التي عليه ونقلت أكسابه في الإسلام إلى ورثته المسلمين، وأكساب الردة فيء. (الاختيار لتعليل المختار ٦٤١/٤ ، كتاب السير، فصل المرتد)
মুরতাদের মালিকানা বিলুপ্ত হয়ে যাবে তবে তা রক্ষিত থাকবে। যদি সে ইসলাম কবুল করে, তাহলে তার মালিকানা পূর্বের মতো থাকবে। আর যদি মারা যায় বা তাকে হত্যা করা হয় অথবা সে কোনো দারুল হারবে চলে যায় এবং কাজির পক্ষ থেকে তাকে দারুল হারবে সম্পৃক্ত হওয়ার হুকুম লাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার ওপর যে মেয়াদী ঋণ ছিল তা তৎক্ষণাৎ আদায় করা হবে। ইসলাম অবস্থায় সে যা সম্পদ কামিয়েছে তা ওয়ারিসদের হয়ে যাবে আর মুরতাদ অবস্থায় যা কামিয়েছে তা 'মালে ফাই' বলে গণ্য হবে। (১৮৯)

টিকাঃ
১৮৬. কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার পরে যদি যুদ্ধ ছাড়াই তাদের সম্পদ হস্তগত হয়, তাহলে সেটাকে মালে ফাই বলা হয়। (আব্দুল্লাহ)
১৮৭. আল-জামিউস সগির, পৃ. ৪০৬
১৮৮. আল-আসল, ইমাম মুহাম্মদ, ৭/৪৯৫
১৮৯. আল-ইখতিয়ার, ৪/১৪৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00