📄 আল্লামা মুসা খান রহ. -এর তাত্ত্বিক
আল্লামা মুসা খান রুহানিবাজি রহিমাহুল্লাহ জিন্দিক বিষয়ে 'আত-তাহকিক ফিজ-জিন্দিক' নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। হজরতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের মতো এই কিতাবটিও অনেক তালাশ করে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হজরতের রচিত 'তাফসিরে বাইযাবি'র ব্যাখ্যাগ্রন্থের ভূমিকায় উক্ত কিতাবটির একটি সারসংক্ষেপ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিনি প্রথমে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্যক্তিদের থেকে জিন্দিক ও জানদাকার চারটি সংজ্ঞা প্রদান করেন, এরপর নিজের পক্ষ থেকে একটি সংজ্ঞা দেন যা অন্য সকল সংজ্ঞার তুলনায় অধিক ব্যাপক ও উপযোগী হয়েছে। তিনি লেখেন, আমার গবেষণামতে জিন্দিক বলা হয়, যে বাহ্যত নিজেকে তো মুসলমান দাবি করে, কিন্তু জবান ও কর্ম দ্বারা ইসলামের মূলনীতিসমূহের ও মুসলমানের ক্ষতি করতে থাকে। চাই সে অন্তরে কুফর রাখুক বা না রাখুক। (১৭৪)
জানদাকা ও জিন্দিকের বাস্তবতা ও মর্মসংক্রান্ত শরিয়তবিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হলো। এই সকল বক্তব্যের সারকথা হলো, জিন্দিকের পরিচয় নিয়ে শাস্ত্রজ্ঞদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে, যার সবগুলোর সারমর্ম হলো-
১. যারা কোনো ধর্মেরই প্রবক্তা নয় তাদেরকে জিন্দিক বলা হয়। কতক আহলে ইলম এদেরকে 'ইবাহি' বলেও ব্যক্ত করেছেন।
২. মুখে তো নিজেকে মুসলিম দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে কাফের। আর নিজের কুফরকে গোপন করে রাখে।
৩. মুনাফিককে জিন্দিক বলা হয়।
৪. ইসলামের নাম ব্যবহার করে, নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে ইসলামের পরিভাষাগুলোকে এমন অপব্যাখ্যা করা, যার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
৫. মুসলমান দাবি করা সত্ত্বেও ইসলামের মূলনীতিসমূহের ও মুসলমানদের ক্ষতি করতে থাকে।
উপরিউক্ত বক্তব্যগুলোয় বাহ্যত পার্থক্য দেখা গেলেও এই পার্থক্য তেমন ক্ষতিকর নয়। কেননা বাস্তবতা হলো ইলহাদ ও জানদাকার নির্দিষ্ট কোনো একটি রূপ নেই। এগুলোর রয়েছে অসংখ্য প্রকৃতি। একেক শতাব্দীতে এই ফিতনা একেকটি রূপে হাজির হয়েছে। সামগ্রিকভাবে জিন্দিক ওই ব্যক্তিকে বলা হয়, 'যে নিজের কোনো কুফরি বিশ্বাসকে ইসলাম বলে মনে করে এবং এই বিশ্বাস লালন করার পরেও নিজেকে মুসলমান দাবি করে।' জিন্দিক না সাধারণ কাফেরদের মতো ইসলাম ছেড়ে দেয়, আর না ইসলামের সকল জরুরিয়াতের বিশ্বাস ধারণ করে। উপরিউক্ত সকল সংজ্ঞাকেই এভাবে সামঞ্জস্য করা যেতে পারে।
টিকাঃ
১৭৪. ইসমারুত তাকমিল, ২/২৫৮
📄 জিন্দিক ও মুরতাদের মাঝে পার্থক্য
জিন্দিকের মুরতাদ হওয়া জরুরি নয়। বরং একজন ব্যক্তির মাঝে ইরতেদাদ ও জানদাকা দুটি একসাথে জমা হতে পারে। যেমন, একজন মুসলমান (নাউজুবিল্লাহ) কাদিয়ানি হয়ে গেল। এমনও হতে পারে, কেউ মুরতাদ হলো, কিন্তু সে জিন্দিক নয়, যেমন কেউ ইসলামধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান বা ইহুদি হয়ে গেল, অথবা কোনো ধর্মই গ্রহণ করল না। সুতরাং একজন কাদিয়ানি পারিভাষিকভাবে শুধুই মুরতাদ নয়, বরং একজন জিন্দিক।
এই পার্থক্য উভয় শব্দের মর্ম ও প্রয়োগের বিচারে। শরিয়তের দৃষ্টিতে উভয় সমান। যেমনইভাবে রিদ্দার পরিবেশের কারণে দ্বীনের ব্যাপারে ঘৃণা ও অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে যায়, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক বড় ক্ষতির বিষয়। জিন্দিকের বিষয়টিও তেমনই। বিশেষত যখন সে নিজের জানদাকা ইলহাদের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেয় ও উৎসাহিত করে, বরং যদি আরও গভীর থেকে বিষয়টি দেখা হয় তাহলে মুরতাদ থেকেও জিন্দিকের বিষয়টি আরও ভয়ংকর ও ক্ষতিকর বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা মুরতাদকে তো মানুষ মুরতাদ হিসাবেই চিহ্নিত করে ফেলে, যার ফলে তাকে ও তার চিন্তাকে ইসলাম ও সত্য বলে আর স্বীকৃতি দেয় না। আর এটা নিয়ে বাড়াবাড়িও করে না। অপরদিকে জিন্দিক ও মুলহিদ বলাই হয় ওই ব্যক্তিকে, যে নিজেকে বাহ্যত মুসলমান ও সঠিক বলে দাবি করে, আবার সাথে কুফরি বিশ্বাস ও চিন্তা লালন করে। আর এটা স্পষ্ট যে, মুরতাদের তুলনায় এমন ব্যক্তির জালে মানুষের ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি।
📄 সাধারণ কাফের ও মুরতাদের বিধানের মাঝে পার্থক্যের হেকমত
ইসলামি শরিয়তে সাধারণ কাফের ও মুরতাদের বিধান এক নয়। এই বিষয়ে সাধারণত একটি আপত্তি এই তোলা হয়, এই পার্থক্যের ভিত্তি কী? যেখানে উভয়ই কাফের, সেখানে বিধানগত পার্থক্য কেন? মুরতাদের হত্যার বিষয়টির আলোচনা উঠলে এই প্রশ্ন খুব চাউর হয় এবং একে বিশ্বাসের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক মনে করা হয়।
এই প্রশ্নগুলোর মৌলিক উত্তর হলো, একজন মুসলমান হিসাবে কুরআন-হাদিসের সকল শিক্ষাকে শর্তহীনভাবে মেনে নেওয়া আমার জন্য আবশ্যক। আর কুরআন ও হাদিসে কাফের ও মুরতাদের বিধান আলাদাভাবেই উল্লেখ হয়েছে। এইজন্য আমরাও পার্থক্যের কথা বলি। কুরআন-হাদিস আমাদের বিবেক অনুযায়ী হওয়া জরুরি নয়। এটাও জরুরি নয় যে, শরিয়তের প্রতিটি বিধানের কোনো বাহ্যত কারণ থাকবে আবার সেই কারণ আমাদের বিবেকপ্রসূত হবে। বরং ঈমানের দাবিই হলো যখন কোনো বিধান প্রমাণিত হবে, তখন কোনোরূপ আপত্তি ছাড়াই আমরা তা মেনে নেব।
📄 মুরতাদ হওয়ার হেকমত
এটাই হলো সকল আপত্তির মৌলিক জবাব। এ ছাড়া সাধারণ কাফের আর মুরতাদের বিধানের পার্থক্যের অন্যতম একটি হেকমত এটা বুঝে আসে যে, মুরতাদের সম্পর্ক একসময় ইসলামের সাথে ছিল। সে ইসলামধর্ম স্বীকার করত এবং তাকে নিজের ধর্ম জানত। কোনো বিষয়কে ধর্ম মানার অর্থই হলো তাকে জীবনের সবকিছু থেকে বেশি সম্মান করা। যার কারণে মানুষ নিজের জানমাল সবকিছু কুরবান করে দিতে পারে। এখন কোনো বিশ্বাসকে নিজের ধর্ম হিসাবে কবুল করে নেওয়ার পর তা ছেড়ে দিয়ে বিপরীত কোনো বিশ্বাস মেনে নেওয়ার একটি আবশ্যকীয় অর্থ এই দাঁড়ায় যে, সম্ভবত তার আগের ধর্মে কোনো দুর্বলতা রয়েছে। নাহলে যে ধর্মের জন্য সে জীবন দিতে প্রস্তুত তা কেন ছেড়ে দেবে!
জ্ঞানী ও অনুসন্ধানী মানসিকতার মানুষদের কাছে কোনো ব্যক্তির এমন আচরণ তেমন প্রভাব সৃষ্টিকারী হবে না। কিন্তু জনসাধারণের জন্য এটা বড় ধরনের বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয় যে, একজনের দেখাদেখি অন্যরাও কোনো দুনিয়ার লোভে পড়ে ঈমান বিক্রি করে বসবে। ইসলাম ত্যাগকারী ব্যক্তি সমাজে যত গ্রহণযোগ্য হবে, ততই তার অনিষ্টতা সমাজকে গ্রাস করতে থাকবে। আর এটা শুধুই ধারণাপ্রসূত বক্তব্য নয়। বরং সমাজের একটি চরম বাস্তবতা। তা ছাড়া ইসলামের শত্রুপক্ষ অতীত ও বর্তমানে এগুলোকে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি কৌশল হিসাবে ব্যবহার করেছে। ইসলামের নেয়ামত থেকে মানুষদের বিরত রাখতে ইহুদিরা যে-কয়টি অপকৌশল ও চক্রান্ত করেছে তার মধ্যে এটা অন্যতম। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন,
وَقَالَت طَائِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ ءَامِنُوا بِالَّذِي أُنزِلَ عَلَى الَّذِينَ ءَامَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا ءَاخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ.
কিতাবিদের একদল অন্যদের বলছে, তোমরা দিনের শুরুতে তা মেনে নাও যা মুসলমানদের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, অতঃপর দিনের শেষে তা প্রত্যাখ্যান করো, হয়তো এতে মুসলমানরা স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে। (১৭৫)
এ থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, ইরতেদাদ মূলত ইসলামের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ। যদিও এই বিদ্রোহ বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহ নয়, কিন্তু ক্ষতির প্রভাবের দিক থেকে এটি সশস্ত্র বিদ্রোহের থেকেও বেশি ভয়ংকর। এর মাধ্যমে ইসলামের ব্যাপারে অন্তরে সংশয় তৈরি হয়। এজন্য পুরো দুনিয়ায় বিদ্রোহের শাস্তি যেমন মৃত্যুদণ্ড, বিদ্রোহী ব্যক্তি যদি নিজ থেকে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তো মাফ পায়, অন্যথায় তাকে হত্যা করে রাষ্ট্রকে এর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা হয়, তেমনই ইসলামধর্মেও ইরতেদাদের এটাই শাস্তি—হয়তো সে পুনরায় ইসলামধর্মে ফিরে আসবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। তবে ইসলামের মহানুভবতা হলো তার ওপর অতিরিক্ত এই অনুগ্রহ করা হবে যে, তাকে সাথে সাথে হত্যা করা হবে না, বরং প্রয়োজনানুযায়ী চিন্তা-ফিকির করার সময় দেওয়া হবে এবং ইসলামের ব্যাপারে কোনো সংশয়ের কারণে যদি সে ধর্ম ত্যাগ করে থাকে তাহলে তা দূর করার চেষ্টা করা হবে।
টিকাঃ
১৭৫. সুরা আলে ইমরান: ৭২