📄 হযরত ইদরিস কাচ্ছালবি রহ. -এর তাহকিক
হজরত ইদরিস কান্ধলবি রহিমাহুল্লাহ কাদিয়ানিদের ফিতনার খণ্ডনে 'আহসানুল বায়ান فی তাহকিকি মাসআলাতিল কুফরি ওয়াল-ঈমান' নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। যা 'মুসলমান কৌন আউর কাফের কৌন' নামে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি জানদাকা সম্পর্কে লেখেন, যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে ও অন্তরে ইসলামকে অস্বীকার করে সে কাফের। আর যে বাহ্যত ইসলামকে স্বীকার করে আর অন্তরে অস্বীকার করে, সে হলো মুনাফিক। আর যে অন্তর দিয়ে তো ইসলামকে স্বীকার করে, কিন্তু জরুরিয়াতে দ্বীনের মধ্যে এমন ব্যাখ্যা করে যার দ্বারা শরিয়তের মূল বাস্তবতা ও উদ্দেশ্য পালটে যায়, তাকে শরিয়তের পরিভাষায় মুলহিদ ও জিন্দিক বলা হবে। ইসলামে মুনাফিকের বিধান কাফের থেকেও কঠিন, আর ইলহাদ ও জানদাকা মূলত নিফাকেরই সর্বোচ্চ প্রকার। মুনাফিক যেমনইভাবে ধোঁকার মাধ্যমে তাদের কার্যসিদ্ধি করে, তেমনই মুলহিদ ও জিন্দিকও নিজেদের কুফরি বিশ্বাসকে ভ্রান্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামের আকৃতিতে ধোঁকা দিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। যেন মানুষেরা ইসলামের নামে ধোঁকা খেয়ে তাদের ভেতরের কুফরকে গ্রহণ করে নেয়। (১৭৩)
টিকাঃ
১৭৩. আহসানুল বায়ান ফি তাহকিকি মাসায়েলিল কুফরি ওয়াল-ঈমান, পৃ. ২৯
📄 আল্লামা মুসা খান রহ. -এর তাত্ত্বিক
আল্লামা মুসা খান রুহানিবাজি রহিমাহুল্লাহ জিন্দিক বিষয়ে 'আত-তাহকিক ফিজ-জিন্দিক' নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। হজরতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের মতো এই কিতাবটিও অনেক তালাশ করে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হজরতের রচিত 'তাফসিরে বাইযাবি'র ব্যাখ্যাগ্রন্থের ভূমিকায় উক্ত কিতাবটির একটি সারসংক্ষেপ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিনি প্রথমে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্যক্তিদের থেকে জিন্দিক ও জানদাকার চারটি সংজ্ঞা প্রদান করেন, এরপর নিজের পক্ষ থেকে একটি সংজ্ঞা দেন যা অন্য সকল সংজ্ঞার তুলনায় অধিক ব্যাপক ও উপযোগী হয়েছে। তিনি লেখেন, আমার গবেষণামতে জিন্দিক বলা হয়, যে বাহ্যত নিজেকে তো মুসলমান দাবি করে, কিন্তু জবান ও কর্ম দ্বারা ইসলামের মূলনীতিসমূহের ও মুসলমানের ক্ষতি করতে থাকে। চাই সে অন্তরে কুফর রাখুক বা না রাখুক। (১৭৪)
জানদাকা ও জিন্দিকের বাস্তবতা ও মর্মসংক্রান্ত শরিয়তবিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হলো। এই সকল বক্তব্যের সারকথা হলো, জিন্দিকের পরিচয় নিয়ে শাস্ত্রজ্ঞদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে, যার সবগুলোর সারমর্ম হলো-
১. যারা কোনো ধর্মেরই প্রবক্তা নয় তাদেরকে জিন্দিক বলা হয়। কতক আহলে ইলম এদেরকে 'ইবাহি' বলেও ব্যক্ত করেছেন।
২. মুখে তো নিজেকে মুসলিম দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে কাফের। আর নিজের কুফরকে গোপন করে রাখে।
৩. মুনাফিককে জিন্দিক বলা হয়।
৪. ইসলামের নাম ব্যবহার করে, নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে ইসলামের পরিভাষাগুলোকে এমন অপব্যাখ্যা করা, যার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
৫. মুসলমান দাবি করা সত্ত্বেও ইসলামের মূলনীতিসমূহের ও মুসলমানদের ক্ষতি করতে থাকে।
উপরিউক্ত বক্তব্যগুলোয় বাহ্যত পার্থক্য দেখা গেলেও এই পার্থক্য তেমন ক্ষতিকর নয়। কেননা বাস্তবতা হলো ইলহাদ ও জানদাকার নির্দিষ্ট কোনো একটি রূপ নেই। এগুলোর রয়েছে অসংখ্য প্রকৃতি। একেক শতাব্দীতে এই ফিতনা একেকটি রূপে হাজির হয়েছে। সামগ্রিকভাবে জিন্দিক ওই ব্যক্তিকে বলা হয়, 'যে নিজের কোনো কুফরি বিশ্বাসকে ইসলাম বলে মনে করে এবং এই বিশ্বাস লালন করার পরেও নিজেকে মুসলমান দাবি করে।' জিন্দিক না সাধারণ কাফেরদের মতো ইসলাম ছেড়ে দেয়, আর না ইসলামের সকল জরুরিয়াতের বিশ্বাস ধারণ করে। উপরিউক্ত সকল সংজ্ঞাকেই এভাবে সামঞ্জস্য করা যেতে পারে।
টিকাঃ
১৭৪. ইসমারুত তাকমিল, ২/২৫৮
📄 জিন্দিক ও মুরতাদের মাঝে পার্থক্য
জিন্দিকের মুরতাদ হওয়া জরুরি নয়। বরং একজন ব্যক্তির মাঝে ইরতেদাদ ও জানদাকা দুটি একসাথে জমা হতে পারে। যেমন, একজন মুসলমান (নাউজুবিল্লাহ) কাদিয়ানি হয়ে গেল। এমনও হতে পারে, কেউ মুরতাদ হলো, কিন্তু সে জিন্দিক নয়, যেমন কেউ ইসলামধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান বা ইহুদি হয়ে গেল, অথবা কোনো ধর্মই গ্রহণ করল না। সুতরাং একজন কাদিয়ানি পারিভাষিকভাবে শুধুই মুরতাদ নয়, বরং একজন জিন্দিক।
এই পার্থক্য উভয় শব্দের মর্ম ও প্রয়োগের বিচারে। শরিয়তের দৃষ্টিতে উভয় সমান। যেমনইভাবে রিদ্দার পরিবেশের কারণে দ্বীনের ব্যাপারে ঘৃণা ও অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে যায়, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক বড় ক্ষতির বিষয়। জিন্দিকের বিষয়টিও তেমনই। বিশেষত যখন সে নিজের জানদাকা ইলহাদের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেয় ও উৎসাহিত করে, বরং যদি আরও গভীর থেকে বিষয়টি দেখা হয় তাহলে মুরতাদ থেকেও জিন্দিকের বিষয়টি আরও ভয়ংকর ও ক্ষতিকর বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা মুরতাদকে তো মানুষ মুরতাদ হিসাবেই চিহ্নিত করে ফেলে, যার ফলে তাকে ও তার চিন্তাকে ইসলাম ও সত্য বলে আর স্বীকৃতি দেয় না। আর এটা নিয়ে বাড়াবাড়িও করে না। অপরদিকে জিন্দিক ও মুলহিদ বলাই হয় ওই ব্যক্তিকে, যে নিজেকে বাহ্যত মুসলমান ও সঠিক বলে দাবি করে, আবার সাথে কুফরি বিশ্বাস ও চিন্তা লালন করে। আর এটা স্পষ্ট যে, মুরতাদের তুলনায় এমন ব্যক্তির জালে মানুষের ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি।
📄 সাধারণ কাফের ও মুরতাদের বিধানের মাঝে পার্থক্যের হেকমত
ইসলামি শরিয়তে সাধারণ কাফের ও মুরতাদের বিধান এক নয়। এই বিষয়ে সাধারণত একটি আপত্তি এই তোলা হয়, এই পার্থক্যের ভিত্তি কী? যেখানে উভয়ই কাফের, সেখানে বিধানগত পার্থক্য কেন? মুরতাদের হত্যার বিষয়টির আলোচনা উঠলে এই প্রশ্ন খুব চাউর হয় এবং একে বিশ্বাসের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক মনে করা হয়।
এই প্রশ্নগুলোর মৌলিক উত্তর হলো, একজন মুসলমান হিসাবে কুরআন-হাদিসের সকল শিক্ষাকে শর্তহীনভাবে মেনে নেওয়া আমার জন্য আবশ্যক। আর কুরআন ও হাদিসে কাফের ও মুরতাদের বিধান আলাদাভাবেই উল্লেখ হয়েছে। এইজন্য আমরাও পার্থক্যের কথা বলি। কুরআন-হাদিস আমাদের বিবেক অনুযায়ী হওয়া জরুরি নয়। এটাও জরুরি নয় যে, শরিয়তের প্রতিটি বিধানের কোনো বাহ্যত কারণ থাকবে আবার সেই কারণ আমাদের বিবেকপ্রসূত হবে। বরং ঈমানের দাবিই হলো যখন কোনো বিধান প্রমাণিত হবে, তখন কোনোরূপ আপত্তি ছাড়াই আমরা তা মেনে নেব।