📄 ইরতেদাদ ও জানাদাকার বাস্তবতা
ধর্মের দিক থেকে মানুষ দুই প্রকার। মুসলমান ও কাফের। কাফেরদের মাঝে যদিও বিভিন্ন প্রকার ও দল রয়েছে, কিন্তু মূলগতভাবে তা দুই প্রকার। এক. আসলি কাফের। দুই. মুরতাদ। আসলি কাফের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যারা জীবনের শুরু থেকেই কাফের। আর মুরতাদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে ইসলামধর্ম ছেড়ে কাফের হয়েছে। এর কাছাকাছি আরেকটি প্রকার রয়েছে, যাকে জিন্দিক বলা হয়। এটা একটি অনারবি শব্দ। কতক আলেমের নিকট শব্দটির মূলধাতু হলো زنده। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ওই সকল লোক, যারা জীবনের চিরস্থায়িত্বের প্রবক্তা। অর্থাৎ কেয়ামত দিবসের অস্বীকারকারী। কিছু কিতাবে রয়েছে জানদাকা শব্দটির মূল হলো زند শব্দ। এটা মূলত মাজদেকিয়্যাহ ফিরকার বই। তার দিকে সম্পৃক্ত করে জিন্দিক বলা হয়। (১৫৬) পারিভাষিক অর্থে জিন্দিক কী এটা নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তার মধ্য থেকে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো-
📄 জানাদাকা ও জিন্দিকের পরিচয় ও মর্ম
আল্লামা আবু হিলাল আসকারি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৩৯৫ হি.) 'কুফর' ও 'ইলহাদ' (ইলহাদ জানদাকা শব্দের সমার্থবোধক বা কাছাকাছি অর্থেই ব্যবহার হয়) শব্দদ্বয়ের মাঝে পার্থক্য উল্লেখ করে লেখেন, কুফর শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। তার অনেকগুলো সুরত রয়েছে, যার মধ্যে একটা সুরত হলো ইলহাদ। আর ইলহাদের সারকথা হলো, নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কুফরি বিশ্বাস ও মতবাদের প্রবক্তা হওয়া।
أن الكفر اسم يقع على ضروب من الذنوب فمنها الشرك بالله ومنها الجحد للنبوة ومنها استحلال ما حرم الله وهو راجع إلى جحد النبوة وغير ذلك مما يطول الكلام فيه واصله التغطية والإلحاد اسم خص به اعتقاد نفي التقديم مع إظهار الإسلام وليس ذلك كفر الإلحاد ألا ترى أن اليهودي لا يسمى ملحدا وأن كان كافرا وكذلك النصراني وأصل الإلحاد الميل ومنه سمي اللحد لأنه يحفر في جانب القبر. (الفروق اللغوية، الباب الثامن عشر في الفرق بين الدين والملة والطاعة والعبادة والفرض والوجوب والحلال والمباح وما يجري مع ذلك)
কুফর শব্দের মূল অর্থ হলো 'লুকানো'। আর এই শব্দের প্রয়োগ বিভিন্ন গোনাহের ওপর হয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো আল্লাহর সাথে শিরিক করা, নবুয়তকে অস্বীকার করা, আল্লাহর নির্ধারণ করা হারামকে হালাল মনে করা—এটাও মূলত নবুয়তকে অস্বীকার করাই—ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরও অনেক অর্থেই ব্যবহার হয় যার বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই।
আর ইলহাদ হলো নিজেকে মুসলিম বলে প্রকাশ করে আল্লাহ অবিনশ্বর তা অস্বীকার করা। একে কুফরে ইলহাদ বলা হয় না। লক্ষ করে দেখুন, ইহুদি ও খ্রিস্টানকে মুলহিদ বলা হয় না, যদিও তারা কাফের। ইলহাদের মূল অর্থ হলো 'ঝোঁকা' আর লাহদি কবরকে এজন্যই লাহদি বলা হয়, কারণ তা কবরের এক কোনায় খোদা হয়। (১৫৭)
ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৬৭১ হি.) ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ থেকে জানদাকার একটি ব্যাখ্যা বর্ণনা করেন,
قال مالك رحمه الله : النفاق في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم هو الزندقة فينا اليوم، فيقتل الزنديق إذا شهد عليه بها دون استتابة، وهو أحد قولي الشافعي. قال مالك : وإنما كف رسول الله صلى الله عليه وسلم عن المنافقين ليبين لأمته أن الحاكم لا يحكم بعلمه، إذ لم يشهد على المنافقين. (الجامع لأحكام القرآن ٩٩١/١، تحت سورة البقرة : ٠١)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানায় যেটাকে নেফাক বলা হতো, আমাদের সময়ে সেটাকে জানদাকা বলা হয়। সুতরাং যদি তার বিপক্ষে কেউ সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাওবার সুযোগ ছাড়াই তাকে হত্যা করা হবে। ইমাম শাফেয়ির একটি বক্তব্যও এমন রয়েছে। মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের হত্যা করা থেকে বিরত ছিলেন উম্মতের সামনে এটা স্পষ্ট করার জন্য, যতক্ষণ সাক্ষী প্রতিষ্ঠিত না হবে, বিচারক তার জ্ঞানের ভিত্তিতেই ফয়সালা করবে না। (১৫৮)
ইমাম আহমাদ রহ.-এর বক্তব্য ও ইজতেহাদগুলোর নির্ভরযোগ্য ও প্রসিদ্ধ বর্ণনাকারী হলেন খাল্লাল রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৩১১ হি.)। তিনি ইমাম আহমাদ থেকে জানদাকার ব্যাখ্যা বর্ণনা করেন,
قال الخلال : أخبرني عصمة قال : حدثنا حnbal قال : سمعت أبا عبد الله يقول : فأما الزنادقة الذين ينتحلون الإسلام وهم على دين غير ذلك فإن رجع وإلا قتل. قال النبي صلى الله عليه وسلم : مَنْ بدل دينه فاقتلوه. فالحكم فيهم القتل إذا ترك الإسلام وكان ممن ولد على الفطرة. (الجامع لعلوم الإمام أحمد - الفقه - ٠٣٣/٢١، كتب الحدود، باب أحكام الزنادقة)
জিনদিক হলো যারা নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেয় অথচ তারা অন্যধর্মে বিশ্বাসী। যদি তারা তাওবা করে ফিরে আসে তাহলে ভালো, অন্যথায় তাদের হত্যা করা হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ইসলামধর্ম পরিবর্তন করবে তাকে হত্যা করো।' এজন্য তাদের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হলো হত্যা করা, যখন তারা ইসলাম ত্যাগ করবে। অথচ তারা জন্মগ্রহণ করেছিল স্বভাবজাত ধর্মের ওপর। (১৫৯)
হাম্বলি মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আল-মুগনি'-তে উল্লেখ রয়েছে,
والزنديق كالمرتد فيما ذكرنا والزنديق هو الذي يظهر الإسلام ويستسر بالكفر، وهو المنافق، كان يسمى في عصر النبي صلى الله عليه وسلم منافقا، ويسمى اليوم زنديقا. قال أحمد : مال الزنديق في بيت المال. (المغني لابن قدامة ٠٧٣/٦، كتاب الفرائض، مسألة أسلم قبل قسم ميراث موروثه المسلم)
জিন্দিক ও মুরতাদের বিধান একই। জিন্দিক বলা হয়, যারা নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেয় আর ভেতরে কুফর গোপন রাখে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানায় তাদেরকে মুনাফিক বলা হতো। আর বর্তমান সময়ে বলা হয় জিন্দিক। ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, জিন্দিকের সম্পদ বাইতুল মালে জমা করা হবে। (১৬০)
আরেক হাম্বলি ফকিহ আল্লামা মারদাবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৮৮৫ হি.) তার লিখিত 'আল-ইনসাফ' গ্রন্থে লেখেন,
الزنديق هو الذي يظهر الإسلام ويخفي الكفر، ويسمى منافقا في الصدر الأول. وأما من أظهر الخير، وأبطن الفسق، فكالزنديق في توبته، في قياس المذهب. قاله في «الفروع».(الإنصاف في معرفة الراجح من الخلاف ٩٣١/٧٢، كتاب الحدود، باب حكم المرتد)
জিন্দিক হলো যে নিজেকে মুসলিম পরিচয় দেয় আর ভেতরে কুফর গোপন রাখে। ইসলামের শুরু জামানায় এদেরকে মুনাফিক বলা হতো। আর যারা বাহ্যত কল্যাণ প্রকাশ করে নিজেদের ফিসককে গোপন করে, তাওবা কবুলের বিষয়ে সে মূলত জিন্দিকের মতোই। (১৬১)
আল্লামা বাহুতি হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১০৫১ হি.) লেখেন,
(وزنديق وهو المنافق) الذي يظهر الإسلام ويخفي الكفر. (شرح منتهى الإرادات ٣٥٥/٢ كتاب الفرائض ، باب ميراث أهل الملل)
জিন্দিক তো হলো মুনাফিক, যারা বাহ্যত নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করে আর অন্তরে কুফর লুকিয়ে রাখে। (১৬২)
শাফেয়ি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম ইবনে হাজার আসকালানি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৮৫২ হি.) জানদাকার বাস্তবতা, এর মূল মর্ম ও প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে লেখেন,
وكان بهرام جد كسرى تحيل على ماني حتى حضر عنده وأظهر له أنه قبل مقالته ثم قتله وقتل أصحابه وبقيت منهم بقايا اتبعوا مزدك المذكور وقام الإسلام والزنديق يطلق على من يعتقد ذلك وأظهر جماعة منهم الإسلام خشية القتل ومن ثم أطلق الاسم على كل من أسر الكفر وأظهر الإسلام حتى قال مالك الزندقة ما كان عليه المنافقون وكذا أطلق جماعة من الفقهاء الشافعية وغيرهم أن الزنديق هو الذي يظهر الإسلام ويخفي الكفر. (فتح الباري ١٧٢/٢١، كتاب الحدود، باب حكم المرتد والمرتدة)
কিসরার দাদা বাহরাম মানি নামক এক লোককে ধোঁকা দেয় এবং তাকে এই বিষয়ে আশ্বস্ত করে, আমি তোমার কথা মেনে নিয়েছি। এরপর মানি ও তার সকল সাথিকে হত্যা করে ফেলে। মানির সাথি যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা মাজদাক নামক আরেক ব্যক্তির অনুসরণ শুরু করে। এদের আকিদা-বিশ্বাস যারা লালন করে তাদের ওপর জিন্দিক শব্দের প্রয়োগ হয়। এদেরই একটি দল হত্যার ভয়ে নিজেদেরকে মুসলিম বলে পরিচয় দেয়। এরপর থেকে প্রত্যেক ওই ব্যক্তির ওপরই জিন্দিক শব্দের প্রয়োগ হতে থাকে, যারা নিজেদের কুফরকে গোপন করে বাহ্যত নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেয়। এমনকি ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'জিন্দিক হলো তাই যার ওপর প্রথম যুগের মুনাফিকরা ছিল।' তেমনইভাবে শাফেয়ি আইনজ্ঞদের একদল ও অন্যদের মত হলো, জিন্দিক ওই ব্যক্তিকে বলে, যে নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দেয় আর কুফরকে গোপন রাখে। (১৬৩)
ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ অন্য আরেক স্থানে বলেন,
الزنادقة الزنديق من لا يعتقد ملة وينكر الشرائع ويطلق على المنافق. (فتح الباري ٧٢١/١، الفصل الخامس في سياق ما في الكتاب من الألفاظ الغريبة على ترتيب الحروف مشروحا، فصل : زج)
জিন্দিক হলো যারা কোনো ধর্মেই বিশ্বাসী নয় এবং আসমানি বিধিবিধানকে অস্বীকার করে। এ শব্দের প্রয়োগ মুনাফিকের ওপরও হয়। (১৬৪)
হাফেজ ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৭২৮ হি.) লেখেন,
والزنديق : هو المنافق وإنما يقتله من يقتله إذا ظهر منه أنه يكتم النفاق قالوا : ولا تعلم توبته لأن غاية ما عنده أنه يظهر ما كان يظهر؛ وقد كان يظهر الإيمان وهو منافق؛ ولو قبلت توبة الزنادقة لم يكن سبيل إلى تقتيلهم والقرآن قد توعدهم بالتقتيل. (الإيمان لابن تيمية ص ۱۷۱، ومجموع الفتاوى ٥١٢/٧، كتاب الإيمان الكبير)
জিন্দিক মানিই হলো মুনাফিক। তাকে তখনই হত্যা করা হবে যখন এটা স্পষ্ট হবে যে, সে নেফাক গোপন করছে। ফকিহগণ বলেন, জিন্দিক তাওবা করেছে কি না এটা জানা যায় না। কেননা, সে তো ওই বিষয়টিই প্রকাশ করবে, এতদিন সে যা প্রকাশ করত। অথচ বাস্তবতা হলো সে ইসলাম প্রকাশ করত, কিন্তু ছিল মুনাফিক। এখন যদি তার তাওবা কবুল করে নেওয়া হয়, তাহলে তাকে হত্যার আর কোনো পথ থাকবে না। অথচ তাকে হত্যার ব্যাপারে কুরআনে ধমকি এসেছে।(১৬৫)
আল্লামা সুবকি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৭৫৬ হি.) লেখেন,
أما من لم تقم قرائن على صدقه وقد أتى به إلى القاضي الذي لا يعلم باطن حاله ولا ما في قلبه فهذه فيها شبه من مسالة الزنديق من جهة أن سبه دل على خبث باطنه، فهو كمن علم منه أنه يخفي الكفر ويظهر الإيمان، وهو الزنديق. (السيف المسلول على من سب الرسول ص ۷۰۲ ، الفصل الثاني : المسألة الأولى)
যে ব্যক্তির সততার ব্যাপারে কোনোরূপ প্রমাণ নেই আর তাকে বিচারকের দরবারে উপস্থিত করা হয়, যিনি তার অভ্যন্তরে কী আছে বা তার অন্তরে কী আছে তা জানতে পারবে না, তো এই বিষয়টি জিন্দিকের বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। এই দৃষ্টিতে যে, উক্ত ব্যক্তির গালি দেওয়া তার ভেতরের নিকৃষ্টতার প্রমাণ বহন করে। তাই সে ওই ব্যক্তির মতো হয়ে গেল, যার ব্যাপারে এটা জানা গিয়েছে যে, সে তার ভেতরের কুফরকে গোপন করে আর প্রকাশ্যে নিজেকে মুসলিম দাবি করে, আর এরাই হলো জিন্দিক।(১৬৬)
ইবনুল আরাবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৫৪৩ হি.) রচিত 'আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,
আলমাসআলাতুস সালিছাহ : কাওলুহু : {فَإِنْ يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَهُمْ} [আত-তাওবাহ : ٤٧] : ফিহি দলিলুন আলা তাওবাতিল কাফিরিল্লাযি ইউসিররুল কুফরা ওয়া ইউজহিরুল ঈমান, ওয়াহুয়াল্লাযি ইউসাম্মিহিল ফুকাআউজ জানদিক। (আহকামুল কুরআন ২/ ৫৪৫, সুরা আত-তাওবাহ : ৯২)
তৃতীয় বিষয় হলো, আল্লাহর বাণী, فَإِنْ يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَهُمْ. যদি তারা তাওবা করে, তাহলে তা তাদের জন্য উত্তম।
এই আয়াত ওই সকল কাফেরের তাওবা কবুল হওয়ার পক্ষে দলিল, যারা কুফর গোপন করে নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেয়। আর ফকিহরা এদেরকে জিন্দিক নামে নামকরণ করেছে। (১৬৭)
আল্লামা তাফতাজানি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ৭৯২ হি.) ‘শরহুল মাকাসেদ’ গ্রন্থে কাফেরের বিভিন্ন প্রকার এবং সেগুলোর মর্ম ও প্রয়োগ সম্পর্কে লেখেন,
ওয়াইন কানা ইয়াকুলু বিকাদামিদ দাহরি ওয়া ইসনাদুল হাওয়া দিসু ইলাইহি, খুসসা বিসমিদ দাহরি, ওয়াইন কানা লা ইউসবিতুল বারি তায়ালা, খুসসা বিসমিল মুয়াত্তিল, ওয়াইন কানা মাআ ইতিরফিহি বিনবুয়াতি ন্নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়া ইউজহিরু সাআইরুল ইসলামি বিবাতনি আকাঈদাহি হিয়া কুফরুন বিল ইত্তিফাক, খুসসা বিসমিজ জানদিক, ওয়াহুয়া ফিল আসল মানসুবুন ইলা «জান্দ», ইসমু কিতাবিন আজহারাহু মাজদাক ফি আইয়্যামি কিবাদ, ওয়া জায়ামা আন্নাহু তাবিলু কিতাবিল মাজুসি আল্লাযি জাআ বিহি জারা দাশতু আল্লাযি ইয়াজায়ামু আন্নাহু নাবিয়্যুহুম। (শারহুল মাকাসেদ ফি ইলমিল কালাম ২/ ৫৪৫)
যারা সময়কে অবিনশ্বর বলে বিশ্বাস করে, তাদেরকে দাহরিয়্যাহ বলা হয়। আর যারা আল্লাহর জন্য গুণবাচক বিষয়কে সাব্যস্ত না করে তাদেরকে মুয়াত্তিলা বলা হয়। আর যারা নবুয়তকে স্বীকার করে এবং ইসলামের শিয়ারগুলোও প্রকাশ করে, সাথে সাথে অন্তরে এমন বিশ্বাস লালন করে যেটা সর্বসম্মতিক্রমে কুফর, তাহলে তাদেরকে জিন্দিক বলা হবে। জিন্দিক মূলত زند নামক শব্দ থেকে, যা মূলত একটি কিতাবের নাম। তা মাজদাক নামক লোক কুব্বাদ নামক শাসকের সময়ে প্রকাশ করেছিল। সে ধারণা করত, এটা হলো অগ্নিপূজার ধর্মের প্রসিদ্ধ ‘জরথুস্ত্র’-এর কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যাকে অগ্নিপূজকরা নিজেদের ধারণামতে নবী মনে করত। (১৬৮)
মোল্লা আলি কারি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ১০১৪ হি.) লেখেন,
ওয়া ফিহি দলিলুন আলা আন্না মান উজহিরুল ইসলামা ওয়া আবতানাল কুফরা ইয়াকবিলু ইসলামাহু ফিজ যাহির,
وَذَهَبَ مَالِكُ إِلَى أَنَّهُ لَا تُقْبَلُ تَوْبَةُ الزِّنْدِيقِ، وَهُوَ مَنْ يُظْهِرُ الْإِسْلَامَ وَيُخْفِي الْكُفْرَ، وَيُعْلَمُ ذَلِكَ بِأَنْ يُقِرَّ أَوْ يَطَّلِعَ مِنْهُ عَلَى كُفْرِ كَانَ يُخْفِيهِ، فَقِيلَ : لَا تُقْبَلُ وَيُتَحَتَّمُ قَتْلُهُ، لَكِنَّهُ إِنْ صَدَقَ فِي تَوْبَتِهِ نَفَعَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَقِيلَ : يُقْبَلُ مِنْهُ مَرَّةً فَقَطْ، وَقِيلَ : مَا لَمْ يَكُنْ تَحْتَ السَّيْفِ، وَقِيلَ : مَا لَمْ يَكُنْ دَاعِيَةً لِلضَّلَالِ. (مرقاة المفاتيح، كتاب الإيمان)
আর এটা এই বিষয়ের দলিল যে, যারা প্রকাশ্যে নিজেদের মুসলিম দাবি করে আর অন্তরে কুফর গোপন করে, বাহ্যত তার ইসলামকে গ্রহণ করে নেওয়া হবে। ইমাম মালেক রহ.-এর মাজহাব হলো, জিন্দিকের তাওবা কবুল করা হবে না। আর তারা হলো, যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করে অথচ অন্তরে কুফর গোপন করে রাখে। আর তা জানা যাবে, হয় সে নিজে তা স্বীকার করবে অথবা তার এমন কোনো কুফরির বিষয়ে জানা যাবে যা সে গোপন করত।
কতক আলেমের নিকট জিন্দিকের তাওবা কবুল হবে না এবং এদেরকে সুনিশ্চিত হত্যা করতে হবে। তবে সে যদি অন্তর থেকেই তাওবা করে থাকে, তাহলে তা আখেরাতে কাজে আসবে। আবার কতক আলেমের নিকট, একবার তার তাওবা কবুল হবে। আর কারও নিকট গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তার তাওবা কবুল হবে। আর কতক মত দিয়েছেন, যদি গোমরাহির দিকে আহ্বান না করে থাকে তাহলে তাওবা কবুল হবে (অন্যথায় নয়)। (১৬৯)
মোল্লা আলি কারي রহিমাহুল্লাহ তার আরেক গ্রন্থ 'শরহুশ শিফা'-তে জিন্দিকের বিভিন্ন সংজ্ঞা উল্লেখ করে লেখেন,
وقال ابن قرقول الزنادقة من لا تعتقد ملة من الملل المعروفة ثم استعمل في كل من عطل الأديان وأنكر الشرائع وفيمن أظهر الإسلام وأسر غيره وقال الرافعي هو الذي يظهر الإسلام ويخفي الكفر والأصح عند الشافعية أنه الذي لا ينتحل دينا وقيل هو المباحي الذي لا يتدين بدين ولا ينتمي إلى شريعة ولا يؤمن بالبعث والنشور. (شرح الشفا ٢٩٣/٢ ، القسم الرابع، الباب الأول في بيان ما هو في حقه صلى الله تعالى عليه وسلم سب أو نقص من تعريض أو نص)
ইবনে করকুল বলেন, জিন্দিকরা হলো ওই সকল ব্যক্তি যারা প্রচলিত কোনো ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতঃপর এই শব্দটি প্রত্যেক ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে থাকল, যারা সকল ধর্মকেই অকার্যকর মনে করে, সকল আসমানি বিধিবিধানকে অস্বীকার করে আর নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে ভেতরে কুফরি লালন করে। শাফেয়ি মাজহাবের আলেম রাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যারা মুখে ইসলামের দাবি করে আর অন্তরে কুফর গোপন রাখে তারা হলো জিন্দিক'। তবে শাফেয়িদের নিকট অধিক সঠিক বক্তব্য হলো, জিন্দিক ওই ব্যক্তি যে কোনো ধর্মই মানে না। আর কারও কারও মতে জিন্দিক হলো, যারা ইবাহي মতের অনুসারী। আর ইবাহي হলো, যারা কোনো ধর্মেরই অনুসরণ করে না, আসমানي কোনো আইনকে মেনে নেয় না এবং পুনরুত্থান ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না।(১৭০)
আবদুল হক দেহলবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১০৫২ হি.) লেখেন,
والمراد بالزنديق كل ملحد في الدين لا دين له والمنكر للآخرة والربوبية والدين جملة، وقيل : هو المبطن المظهر للإسلام في الظاهر كالمنافق. (لمعات التنقيح في شرح مشكاة المصابيح ٣٣٢/١، كتاب الإيمان، الفصل الأول)
জিন্দিক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেক ওই মুলহিদ, যে কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করে না, আখেরাত, আল্লাহর রুবিবিয়্যাত ও ধর্মকে পূর্ণভাবে অস্বীকার করে। আর কারও কারও মতে, জিন্দিক হলো ওই ব্যক্তি যে মুনাফিকের মতো অন্তরে কুফর গোপন করে মুখে ইসলামের দাবি করে। (১৭১)
আল্লামা কাশ্মীরি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১৩৫৩ হি.) লেখেন,
والزنديق من يحرف في معاني الألفاظ، مع إبقاء ألفاظ الإسلام كهذا اللعين في القاديان، يدعي أنه يؤمن بختم النبوة، ثم يخترع له معنى من عنده يصلح له بعده الختم دليلا على فتح باب النبوة، فهذا هو الزندقة حقا، أي التغيير في المصاديق، وتبديل المعاني على خلاف ما عرفت عند أهل الشرع، وصرفها إلى أهوائه مع إبقاء اللفظ على ظاهره، والعياذ بالله. (فيض الباري ١٠٤/٦، كتاب استتابة المرتدين والمعاندين وقتالهم باب حكم المرتد والمرتدة)
জিন্দিক হলো যারা ইসলামের পরিভাষাগুলো ঠিক রেখে তার অর্থ ও মর্মের মাঝে বিকৃতি করে। যেমন এই অভিশপ্ত কাদিয়ানিরা। তারা দাবি করে যে, তারা খতমে নবুয়তে বিশ্বাসী। অতঃপর নিজেদের পক্ষ থেকে তার এমন মর্ম উদঘাটন করে যার মাধ্যমে নবুয়তের দরজা খোলা আছে এটা প্রমাণিত হয়। নিঃসন্দেহে এটা জানদাকা। অর্থাৎ পরিভাষার মর্ম ও প্রয়োগক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন সাধন করা, যা শরিয়তের ধারক উলামায়ে কেরামের কাছে পরিচিত নয়। আর শব্দের বাহ্যিক অর্থ ঠিক রেখে মর্মকে নিজেদের মনমতো নির্ধারণ করা।(১৭২)
টিকাঃ
১৫৬. আল্লামা ইবনে কামাল পাশা রহিমাহুল্লাহ জিন্দিক শব্দের মূল নিয়ে একটি স্বতন্ত্র রিসালা লেখেন تصحیح لفظ الزنديق وتوضيح معناه الدقيق নামে। আগ্রহীগণ বিস্তারিত জানতে তা দেখে নিতে পারেন। রিসালাটি মাজমুয়ে রাসায়েলে ইবনে কামাল পাশার পঞ্চম খণ্ডে রয়েছে। (উবাইদুর রহমান)
১৫৭. আল-ফুরুকুল লুগাবিয়্যাহ পৃ. ২১৮
১৫৮. তাফসিরে কুরতুবি, ১/১৯৯
১৫৯. আল-জামি লি-উলুমিল ইমাম আহমাদ, ১২/৩৩০
১৬০. আল-মুগনি, ৬/৩৭০
১৬১. আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজিহ মিনাল খিলাফ, ১০/৩৩৪
১৬২. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, ২/৫৫৩
১৬৩. ফাতহুল বারি, ১২/২৭১
১৬৪. ফাতহুল বারি, ১/১২৮
১৬৫. আল-ঈমান, পৃ. ১৭১
১৬৬. আস-সাইফুল মাসলুল আলা মান সাব্বার রাসুল, পৃ. ২০৬
১৬৭. আহকামুল কুরআন, ২/৫৪৫
১৬৮. শরহুল মাকাসেদ, ২/২৬৯
১৬৯. মিরকাতুল মাফাতিহ, ১/৮১
১৭০. শরহুশ শিফা, ২/৩৯২
১৭১. লামআতুন তানকিহ, ১/২৩৩
১৭২. ফাইজুল বারি, ৬/৪০১
📄 হযরত ইদরিস কাচ্ছালবি রহ. -এর তাহকিক
হজরত ইদরিস কান্ধলবি রহিমাহুল্লাহ কাদিয়ানিদের ফিতনার খণ্ডনে 'আহসানুল বায়ান فی তাহকিকি মাসআলাতিল কুফরি ওয়াল-ঈমান' নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। যা 'মুসলমান কৌন আউর কাফের কৌন' নামে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি জানদাকা সম্পর্কে লেখেন, যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে ও অন্তরে ইসলামকে অস্বীকার করে সে কাফের। আর যে বাহ্যত ইসলামকে স্বীকার করে আর অন্তরে অস্বীকার করে, সে হলো মুনাফিক। আর যে অন্তর দিয়ে তো ইসলামকে স্বীকার করে, কিন্তু জরুরিয়াতে দ্বীনের মধ্যে এমন ব্যাখ্যা করে যার দ্বারা শরিয়তের মূল বাস্তবতা ও উদ্দেশ্য পালটে যায়, তাকে শরিয়তের পরিভাষায় মুলহিদ ও জিন্দিক বলা হবে। ইসলামে মুনাফিকের বিধান কাফের থেকেও কঠিন, আর ইলহাদ ও জানদাকা মূলত নিফাকেরই সর্বোচ্চ প্রকার। মুনাফিক যেমনইভাবে ধোঁকার মাধ্যমে তাদের কার্যসিদ্ধি করে, তেমনই মুলহিদ ও জিন্দিকও নিজেদের কুফরি বিশ্বাসকে ভ্রান্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামের আকৃতিতে ধোঁকা দিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। যেন মানুষেরা ইসলামের নামে ধোঁকা খেয়ে তাদের ভেতরের কুফরকে গ্রহণ করে নেয়। (১৭৩)
টিকাঃ
১৭৩. আহসানুল বায়ান ফি তাহকিকি মাসায়েলিল কুফরি ওয়াল-ঈমান, পৃ. ২৯
📄 আল্লামা মুসা খান রহ. -এর তাত্ত্বিক
আল্লামা মুসা খান রুহানিবাজি রহিমাহুল্লাহ জিন্দিক বিষয়ে 'আত-তাহকিক ফিজ-জিন্দিক' নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। হজরতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের মতো এই কিতাবটিও অনেক তালাশ করে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হজরতের রচিত 'তাফসিরে বাইযাবি'র ব্যাখ্যাগ্রন্থের ভূমিকায় উক্ত কিতাবটির একটি সারসংক্ষেপ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিনি প্রথমে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্যক্তিদের থেকে জিন্দিক ও জানদাকার চারটি সংজ্ঞা প্রদান করেন, এরপর নিজের পক্ষ থেকে একটি সংজ্ঞা দেন যা অন্য সকল সংজ্ঞার তুলনায় অধিক ব্যাপক ও উপযোগী হয়েছে। তিনি লেখেন, আমার গবেষণামতে জিন্দিক বলা হয়, যে বাহ্যত নিজেকে তো মুসলমান দাবি করে, কিন্তু জবান ও কর্ম দ্বারা ইসলামের মূলনীতিসমূহের ও মুসলমানের ক্ষতি করতে থাকে। চাই সে অন্তরে কুফর রাখুক বা না রাখুক। (১৭৪)
জানদাকা ও জিন্দিকের বাস্তবতা ও মর্মসংক্রান্ত শরিয়তবিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হলো। এই সকল বক্তব্যের সারকথা হলো, জিন্দিকের পরিচয় নিয়ে শাস্ত্রজ্ঞদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে, যার সবগুলোর সারমর্ম হলো-
১. যারা কোনো ধর্মেরই প্রবক্তা নয় তাদেরকে জিন্দিক বলা হয়। কতক আহলে ইলম এদেরকে 'ইবাহি' বলেও ব্যক্ত করেছেন।
২. মুখে তো নিজেকে মুসলিম দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে কাফের। আর নিজের কুফরকে গোপন করে রাখে।
৩. মুনাফিককে জিন্দিক বলা হয়।
৪. ইসলামের নাম ব্যবহার করে, নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে ইসলামের পরিভাষাগুলোকে এমন অপব্যাখ্যা করা, যার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
৫. মুসলমান দাবি করা সত্ত্বেও ইসলামের মূলনীতিসমূহের ও মুসলমানদের ক্ষতি করতে থাকে।
উপরিউক্ত বক্তব্যগুলোয় বাহ্যত পার্থক্য দেখা গেলেও এই পার্থক্য তেমন ক্ষতিকর নয়। কেননা বাস্তবতা হলো ইলহাদ ও জানদাকার নির্দিষ্ট কোনো একটি রূপ নেই। এগুলোর রয়েছে অসংখ্য প্রকৃতি। একেক শতাব্দীতে এই ফিতনা একেকটি রূপে হাজির হয়েছে। সামগ্রিকভাবে জিন্দিক ওই ব্যক্তিকে বলা হয়, 'যে নিজের কোনো কুফরি বিশ্বাসকে ইসলাম বলে মনে করে এবং এই বিশ্বাস লালন করার পরেও নিজেকে মুসলমান দাবি করে।' জিন্দিক না সাধারণ কাফেরদের মতো ইসলাম ছেড়ে দেয়, আর না ইসলামের সকল জরুরিয়াতের বিশ্বাস ধারণ করে। উপরিউক্ত সকল সংজ্ঞাকেই এভাবে সামঞ্জস্য করা যেতে পারে।
টিকাঃ
১৭৪. ইসমারুত তাকমিল, ২/২৫৮