📄 অমুসলিম দেশে যাওয়ার শরয়ি বিধান
ইসলামি দেশগুলোর অবস্থা এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এতে পার্থক্য হবে। তাই মূল বিধান এভাবে ব্যাখ্যার সাথে হবে—
১. যদি কোনো ব্যক্তির অন্তরে কাফের অথবা কুফরি শাসন কিংবা কাফের সমাজ ও জীবনব্যবস্থার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থাকে এবং এই চেতনায় উদ্যত হয়ে সেখানে গিয়ে বসবাস করে, তাহলে এটি শরিয়তে হারাম হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এই জিনিসগুলোর প্রতি মুহাব্বত এবং মুসলিম বা ইসলামি ব্যবস্থা অথবা প্রকৃতপক্ষে ইসলামি সমাজের চেয়ে ওপরের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া এমন একটি অপরাধ, যার পরে ঈমান ও ইসলাম নিরাপদ থাকা কঠিন। (১৫৪)
২. কাফের রাষ্ট্রে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলমানদের সংশোধন ও পথপ্রদর্শনের জন্য সেখানে যাওয়া বা বসবাস করা শুধু জায়েজই নয়, বরং বিরাট প্রতিদান ও সওয়াব অর্জনের কারণও বটে। শর্ত হলো, এ কাজ করার সামর্থ্য থাকতে হবে এবং সেখানকার ফিতনা ও অনিষ্টতার সাথে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকতে হবে। তবে এমন গুণ আর কতজনের মাঝেই থাকে! এ কারনেই আলেম ও বুজুর্গদের পূর্ণ সাহচর্য অর্জন না করে এমন পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা রয়েছে যে, অন্যের ইসলাহের নিয়তের উত্তম চেতনা নিয়ে সেখানে গিয়ে নিজের আকিদা-বিশ্বাস ও আমলের মাঝে বিভিন্ন গোমরাহির শিকার হয়ে যাবে!
৩. বাধ্য হয়ে সেখানে যাওয়া। যেমন, কোনো ব্যক্তি ইসলামি দেশের বাসিন্দা, কিন্তু সে বিনা কারণে এখানে নির্যাতিত হচ্ছে, তার জানমাল, সম্মান ও মর্যাদা লঙ্ঘন করা হয়েছে, আর এখানে বসবাস করা অবস্থায় এর কোনো কার্যকরী সমাধান সে পাচ্ছে না। অথবা কেউ নিজের ও তার পরিবারের জীবিকা ও খরচের জন্য চিন্তিত এবং ইসলামি দেশে থেকে কোনো জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারছে না, যার মাধ্যমে সে নিজে এবং তার পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাবে। এমনসব বাধ্যতার শিকার হয়ে সে কাফের দেশে যেতে চায়।
তার হুকুম হলো, এ ধরনের বাধ্যবাধকতার কারণে কাফের দেশে যাওয়া বৈধ, তবে এর জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো পালন করা আবশ্যক-
এক. সে দেশটি এমন হতে হবে, যেখানে মুসলমান তার ধর্মীয় কাজকর্ম ও দায়িত্ব নির্বিঘ্নে করতে পারে, এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ হতে কোনো বিধিনিষেধ থাকতে পারবে না। কাফের দেশগুলোর মধ্যেও 'কম ক্ষতি গ্রহণের' মূলনীতি অনুযায়ী এমন দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যেখানে ফিতনা ও ফাসাদ তুলনামূলক কম। তাই দ্বীনের বিষয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে জরুরত পুরা হলে সেগুলোকেই প্রাধান্য দেবে।
দুই. কাফেরদের সাথে মুহাব্বত ও ভালোবাসার সম্পর্ক একেবারেই রাখা যাবে না। তবে একেবারে বাধ্য হলে ভালো সম্পর্ক রেখে চলার অবকাশ রয়েছে, যার সীমানা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে গত হয়েছে।
তিন. তাদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে না।
চার. কুফরি শাসনের সাথে অন্তরের ভালোবাসা রাখবে না। বরং এই সমস্ত জিনিসের প্রতি ঘৃণা রাখবে এবং কর্মগত দিক থেকে যথাসম্ভব তাদের থেকে দূরে থাকবে।
পাঁচ. পরিবারের প্রতি সম্পূর্ণ এবং কঠোর নজরদারি রাখবে। তাদের সেখানে বসবাস করা সম্পূর্ণরূপে হারাম হিসাবে গণ্য হবে। এই বিষয়টি এমন সুস্পষ্ট যে, এর জন্য কোনো দলিল পেশ করার প্রয়োজন নেই।
বসবাসের জন্যও উপরিউক্ত শর্তগুলো প্রযোজ্য। (১৫৫)
টিকাঃ
১৫৪. মুফতি তাকি উসমানি দা. বা. লেখেন, (১) কোনো ব্যক্তি যদি লোকসমাজে সম্মানিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কিংবা অন্য মুসলমানের ওপর নিজের বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে অমুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করে কিংবা (২) দারুল কুফরের নাগরিকত্ব ও জাতীয়তাকে দারুল ইসলামের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে তাকে শ্রেষ্ঠ ও উন্নত মনে করে তাদের ন্যাশনালিটি গ্রহণ করে থাকে অথবা (৩) তার পার্থিব জীবনের থাকা-খাওয়া ও চালচলনে তাদের নীতি গ্রহণ করে বাহ্যিক জীবনে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করার জন্য এবং তাদের ন্যায় হওয়ার জন্য বসবাস করে থাকে, তাহলে এ জাতীয় যেকোনো উদ্দেশ্য নিয়ে অমুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করা সম্পূর্ণরূপে হারাম হিসাবে গণ্য হবে। এই বিষয়টি এমন সুস্পষ্ট যে, এর জন্য কোনো দলিল পেশ করার প্রয়োজন নেই। ফিকহি মাকালাত, ১/২৪৮, মুফতি তাইয়েব হোসাইন অনূদিত, বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স (আব্দুল্লাহ)
১৫৫. মুফতি উবাইদুর রহমান সাহেব লেখেন, মিশরের প্রসিদ্ধ মুফতি শায়েখ আতিয়্যাহ সকর রহিমাহুল্লাহ 'অমুসলিম দেশে ব্যবসার জন্য যাওয়া' সংক্রান্ত একটি ফাতাওয়া জারি করেন। সে ফাতাওয়াটি সামনে রাখলে আমাদের বলা বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে উপকারী হবে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন,
الهجرة من مكان إلى مكان آخر من أجل الكسب الحلال لامانع منها مطلقا، وقد هاجر المسلمون من جزيرة العرب وغيرها لنشر الإسلام وابتغاء الرزق فى مناطق عديدة من العالم، ولا يزال المسلمون يهاجرون من أوطانهم إلى أوطان أخرى من أجل ذلك قال تعالى { ومن يهاجر في سبيل الله يجد في الأرض مراغما كثيرا وسعة} [النساء : ٠٠١] فامشوا في مناكبها وكلوا من رزقه} [الملك : ٥١] .
والشرط فى هذه الهجرة أن يأمن المهاجر على عقيدته وشرفه ويتمتع بحريته وكرامته في حدود الدين، أما إذا خاف أن يفتن فى دينه عقيدة وسلوكا حرم عليه أن يهاجر إلى هذا البلد أو يستقر فيه وعليه أن يهاجر إلى بلد آخر يجد فيه الأمان، فإذا ضاقت به السبل عاد إلى وطنه قانعا بالرزق القليل ليحافظ على دينه، ومن الممكن جدا أن يخدم وطنه وأمته بوسائل كثيرة إذا فكر وقدر واكتشف واستفاد من خيرات الأرض التي لا ينضب معينها أبدا فهى نعم المورد لكل من أقبل عليها بالفكر والعمل.
فالوجود في البلاد غير الإسلامية مرهون بالأمن على الدين وعدمه... قال المحققون من العلماء : إذا وجد المسلم أن وجوده فى دار الكفر يفيد المسلمين الموجودين فى دار الإسلام أو المسلمين الموجودين في دار الكفر الجاليات بمثل تعليمهم وقضاء مصالحهم، أو يفيد الإسلام نفسه بنشر مبادئه والرد على الشبه الموجهة إليه كان وجوده في هذا المجتمع أفضل من تركه، ويتطلب ذلك أن يكون قوى الإيمان والشخصية والنفوذ حتى يمكنه أن يقوم بهذه المهمة. ফাতাওয়া দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ ৩/৩৭১, (আহকামুল মুতাফাররিকাত, ফাসলুত্ তিউয়রুল মুহাজিরা)