📄 কাফেরদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক
অমুসলিমদের সাথে বেচাকেনা এবং লেনদেনের সম্পর্ক; এ ক্ষেত্রে মূলত মুসলিম ও কাফেরের মাঝে কোনো ব্যবধান নেই। মুসলিমদের সাথে যে ধরনের লেনদেন করা বৈধ সেগুলো কাফেরদের (মুসলিম ভূখণ্ডের জিম্মি) সাথেও করা যাবে; কারণ হাদিসের কিতাবগুলোতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের থেকে মদিনায় স্থানীয় ইহুদিদের সাথে বেচাকেনা, ভাড়া, আরিয়াত (ধার দেওয়া), ঋণ এবং বন্ধক ইত্যাদি লেনদেন সাব্যস্ত রয়েছে।
তবে এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ের প্রতি যত্নশীল হওয়া জরুরি-
ক. লেনদেনের আড়ালে স্বতন্ত্র বন্ধুত্ব, মুহাব্বত ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়া যাবে না; কারণ কুরআন-সুন্নাহর অসংখ্য নসের (টেক্সটের) মধ্যে এর পরিষ্কার নিষিদ্ধতা ঘোষণা করা হয়েছে, যার আলোচনা ইতিপূর্বে করা হয়েছে।
খ. এর মাধ্যমে মুসলিমদের দ্বীনি এবং পার্থিব কোনো ক্ষতি হতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অনুসরণীয় ব্যক্তি যদি তাদের সাথে বাধাহীন লেনদেন করে এবং এর কারণে এই আশঙ্কা হয় যে, এমন ব্যক্তির এসব কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ মুসলিমদের মন ও মগজ থেকে কুফর ও ইসলামের পার্থক্যরেখা উঠে যাবে, কিংবা 'মুসলিম-কাফের' পার্থক্যের যে চেতনা তা হালকা হয়ে যাবে, মানুষেরা শরিয়তের সীমারেখায় ভ্রুক্ষেপ না করেই লেনদেন শুরু করে দেবে। অথবা অনুসরণীয় ব্যক্তির এই সম্পর্ক ভিত্তি করে কাফের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মুসলিমদের মাঝে তাদের ধর্মীয় অথবা কোনো দুরভিসন্ধিমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়ে যাবে—উপরিউক্ত এমন কোনো সম্ভাবনার ব্যাপারে নিশ্চিত জানা গেলে বা প্রবল ধারণা তৈরি হলে জায়েয লেনদেন থেকেও কাফেরদের সাথে যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে।
শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১৩৩৯ হি.) লেখেন, কাফেরদের সাথে 'মুওয়ালাত' (বন্ধুত্ব) আর 'মুআমালাত' (লেনদেন) দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। কুরআনে মুওয়ালাত থেকে নিষেধ করা হয়েছে। মুওয়ালাতের বিষয়ে আমি বলব, হ্যাঁ, মর্মের বিবেচনায় মুআমালাত ও মুওয়ালাতের মাঝে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু মুওয়ালাত শব্দটি আভিধানিক অর্থের কারণে তার মর্মের মধ্যে নৈকট্যসংক্রান্ত এবং পারস্পরিক সাহায্যের যত সম্পর্ক রয়েছে সবগুলোকেই অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং প্রত্যেক ওই মুআমালা যার কারণে দুশমনের সাথে সম্পর্ক ও ঐক্য বৃদ্ধি পায়, তাদের সাথে শত্রুতার শক্তি বৃদ্ধি করে না, এমন সকল সম্পর্ক (যেমন সেনাবাহিনীর চাকরি ইত্যাদি) যা মুসলমানদের ধ্বংস এবং প্রতাপ ও শক্তিকে মিটিয়ে দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়, এমন সম্পর্ক যার কারণে শত্রুদের এই সুযোগ তৈরি হয় যে, তারা ভাবে মুসলমানরা আমাদের ওপর সন্তুষ্ট, এমন সকল সম্পর্ক যার ফলে তাদের সাথে ভালোবাসা ও প্রীতির প্রকাশ হয়, তা সরাসরি হোক বা মাধ্যমে হোক, এই সবটাই শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ মুওয়ালাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। সাহাবি হজরত হাতেব ইবনে আবি বালতাআ রা.-এর ঘটনা গভীরভাবে দেখলে এবং হজরত উমর ফারুক রা.-এর ঈমানি দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করলে এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ আর সৃষ্টি হবে না।(১৩২)
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াতে রয়েছে,
يكره للمشهور المقتدى به الاختلاط إلى رجل من أهل الباطل والشر إلا بقدر الضرورة لأنه يعظم أمره بين أيدي الناس ولو كان رجلا لا يعرف يداريه ليدفع الظلم عن نفسه من غير إثم فلا بأس به كذا في الملتقط. (الفتاوى الهندية ٥/٦٤٣، كتاب الكراهية، الباب الرابع عشر في أهل الذمة والأحكام التي تعود إليهم)
অনুসরণীয় বিখ্যাত ব্যক্তির জন্য বিভ্রান্ত ও পাপাচারী লোকদের সাথে প্রয়জনের বেশি মেশা মাকরুহ, কারণ তার বিষয়টা মানুষের মাঝে বিরাট রূপ ধারণ করবে। আর যদি অপরিচিত কোনো ব্যক্তি হয়, যে নিজ দায় থেকে কোনো ধরনের গোনাহ ছাড়া এমন ব্যক্তির সাথে সুসম্পর্ক রাখে, সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই।(১৩৩)
'কোনো বৈধ বিষয় থেকে মানুষের মাঝে অবৈধ কোনো ভুল ধারণা বা আমল তৈরি হয়ে যাওয়া' বিষটিকে ফুকাহায়ে কেরাম খুব গুরুত্বের সাথে দেখেন এবং এর ওপর ভিত্তি করে অনেকগুলো শাখাগত মাসআলা উল্লেখ করেন, 'হেদায়া' গ্রন্থকার এই ধরনের একটি মাসআলা আলোচনা করেছেন,
قال : ويكره استخدام الخصيان؛ لأن الرغبة في استخدامهم حث الناس على هذا الصنيع وهو مثلة محرمة. (الهداية مع الفتح ٣٦/٠١، كتاب الكراهية، مسائل متفرقة)
অণ্ডকোষ কর্তনকারী খাসি লোকদের খেদমত নেওয়া মাকরুহ; কেননা তাদের থেকে খেদমত নেওয়া মানুষকে এই কর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, অথচ এটি হারাম দেহবিকৃতি ও হারাম।(১৩৪)
আল্লামা ইবনে মাওদুদ মাওসিলি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৬৮৩ হি.) বলেন,
( ويكره استخدام الخصيان) لأنه تحريض على الخصاء المنهي عنه لكونه مثلة. (الإختيار لتعليل المختار ٣٦١/٤ ، كتاب الكراهية، مسائل مختلفة)
অণ্ডকোষ কর্তনকারী লোকদের থেকে খেদমত নেওয়া মাকরুহ; কারণ এটি খাসি হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, যা দেহবিকৃতি হওয়ায় নিষিদ্ধ। (১৩৫)
এ থেকে বোঝা যায়, কোনো একটি কাজ স্বাভাবিক অবস্থায় যদিও জায়েয হয়, কিন্তু এর কারণে যদি সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে গোনাহ করার আকাঙ্ক্ষা ও দুঃসাহস জন্মায়, তাহলে এমন শঙ্কার কারণে জায়েয কাজও মাকরুহ হয়ে যায়।
গ. উক্ত লেনদেনের কারণে কাফেরদের কোনো অবৈধ বিষয়ের সমর্থন বা সাহায্যের দিক থাকতে পারবে না। তাই যে কাফের মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত আছে, তাদের নিকট অস্ত্র বিক্রি করা বৈধ নয়; কারণ এতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে একধরনের সহায়তা করা হয়।
শরহুস সিয়ারিল কাবিরে উল্লেখ রয়েছে,
وَلَا بَأْسَ بِأَنْ يَبيعَ المسلمون من المشركين ما بدا لهم من الطعام والثياب وغير ذلك، إلا السلاح والكراع والسبي سواء دخلوا إليهم بأمان أو بغير أمان. (شرح السير الكبير ص ٧٣٢١، باب هدية أهل الحرب)
মুসলিমরা মুশরিকদের নিকট খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি জাতীয় বস্তু বিক্রি করতে পারবে। তবে অস্ত্র, ঘোড়া (বাহন) এবং বন্দি ব্যক্তিকে বিক্রি করতে পারবে না। চাই সে আমান নিয়ে আসুক বা আমান ছাড়া আসুক।(১৩৬)
ঘ. লেনদেন কোনো হারাম বিষয়ের হতে পারবে না। 'উমদাতুল কারি'-তে উল্লেখ রয়েছে,
وَقَالَ الْمُهلب : كره أهل العلم ذَلِك إِلا للضَّرُورَة بِشَرْطَيْنِ : أَحدهما : أَن يكون عمله فيما يحل للمُسلم، وَالْآخر : أَن لَا يُعينه على مَا هُوَ ضَرَر على الْمُسلمين، وَقَالَ ابْنِ الْمُنير : اسْتَقَرَّتْ المذاهب على أن الصناع في حوانيتهم يجوز لهم الْعَمَل لأهل الذِّمَّةِ، وَلَا يعتد ذلك من الذلة، بخلاف أن يخدمه في منزله وبطريق التبعية له. (عمدة القاري ٤٩/٢١ ، كتاب الإجارة، باب هل يؤاجر الرجل نفسه من مشرك في أرض الحرب)
মুহাল্লাব রহিমাহুল্লাহ বলেন, আহলে ইলমরা অমুসলিমদের সাথে লেনদেন দুই শর্তে জায়েয বলেছেন, এক. তার কাজটা এমন হতে হবে যেটি করা মুসলিমদের জন্য বৈধ। দুই. অমুসলিমদের এমন কাজের ক্ষেত্রে সহযোগিতা না করা, যে ক্ষেত্রে মুসলিমদের ক্ষতি হয়। ইবনে মুনির রহিমাহুল্লাহ বলেন, সকল মাজহাব একমত যে, মুসলিম কারিগর তার দোকানে জিম্মিদের কাজ করতে পারবে, এতে লাঞ্ছনা নেই। তবে সে (মুসলিম) তার (কাফেরের) গৃহে এবং অধীনস্থ হয়ে কাজ করার অনুমতি নেই।(১৩৭)
টিকাঃ
১৩২. খুতবাতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, পৃ. ৬৮
১৩৩. ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, ৫/৩৪৬
১৩৪. হেদায়া, ৪/৩৮০
১৩৫. আল-ইখতিয়ার লি-তালিল মুখতার, ৪/১৬৩
১৩৬. শরহুস সিয়ারিল কাবির, পৃ. ১২৩৭
১৩৭. উমদাতুল কারি, ১২/৯৪
📄 কাফেরদেরকে দেশের কোনো উচ্চ পদে নিযুক্ত করা
ইসলামি ভূখণ্ডে অমুসলিমদেরকে গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চতর বিষয়ে অংশীদার বানানো, তাদেরকে মুসলিমদের বিষয়ের কর্তৃত্বকারী ও সিদ্ধান্তদাতা বানানো জায়েয নেই। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّواْ مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ ٱلْبَغْضَآءُ مِنْ أَفْوَٰهِهِمْ وَمَا تُخْفِى صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ ٱلْـَٔايَـٰتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের লোকদের ছাড়া কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ো না। ওরা তোমাদের অনিষ্ট সাধনে কোনো ত্রুটি করে না। ওরা মনে-প্রাণে কামনা করে, তোমরা কষ্ট ভোগ করো। ওদের মুখ থেকে শত্রুতা প্রকাশ হয়ে পড়ে, আর ওদের অন্তর যা (অর্থাৎ যে শত্রুতা) গোপন রাখে, তা আরও গুরুতর। আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনাদি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলাম, যদি তোমরা বুদ্ধি রাখো।(১৩৮)
ইমাম জাসসাস রহিমাহুল্লাহ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন,
وفي هذه الآية دلالة على أنه لا تجوز الاستعانة بأهل الذمة في أمور المسلمين من العمالات والكتبة.(أحكام القرآن ٧٤/٢ ، باب الاستعانة بأهل الذمة، دار الكتب العلمية)
উক্ত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিমদের শাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন গভর্নর কেরানি ইত্যাদি পদে জিম্মিদের থেকে সাহায্য নেয়া জায়েয নেই।(১৩৯)
এরপর তিনি উল্লেখ করেন যে, আবু মুসা আশআরি রা. লেখায় পারদর্শী এক জিম্মি কাফেরকে তাঁর লেখার কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। উমর রা. এ ব্যাপারে জানতে পারলে তাকে (আবু মুসা আশআরি রা.) নিষেধ করে দেন, আর নিষেধ করার ক্ষেত্রে তিনি উক্ত আয়াতটি দলিল হিসাবে উল্লেখ করেন। এভাবে (আরেকটি ঘটনা রয়েছে যে,) কেউ একজন কোনো এক জিম্মি কাফের সম্পর্কে উমর রা.-এর কাছে সুপারিশ করল যে, সে তো বড় সংরক্ষক এবং দক্ষ লোক, সে এই কাজের জন্য যথেষ্ট যোগ্য। তখন উমর রা. তার কথা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, তাকে এই কাজে নিযুক্ত করা এই আয়াতের বিরোধী।
ওসকে রুমি বলেন, আমি উমর রা.-এর গোলাম ছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তুমি ইসলাম কবুল করলে আমি তোমাকে মুসলিমদের বিভিন্ন বিষয়ে কাজে লাগাব (কাফের থাকলে কাজে লাগাব না)। কারণ এটি কারও দৃষ্টিতেই সঠিক হবে না যে, আমি অমুসলিমকে মুসলিমদের দায়িত্বশীল ও সিদ্ধান্তদাতা বানাব। তখন আমি ইসলাম কবুল না করলে তিনি আমাকে তার মৃত্যু পর্যন্ত কোনো দায়িত্ব দেননি, বরং মৃত্যুর পূর্বে আমাকে স্বাধীন করে বলেন, যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারো।
আল্লামা কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ৬৭১ হি.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন,
نهى الله عز وجل المؤمنين بهذه الآية أن يتخذوا من الكفار واليهود وأهل الأهواء دخلاء وولجاء، يفاوضونهم في الآراء، ويسندون إليهم أمورهم. (تفسير القرطبي ٤/٨٧١، تحت سورة آل عمران : آية ٨١١)
আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতের মাধ্যমে কাফের ইহুদি ও বিদআতিদেরকে এমন ঘনিষ্ঠ ও আপনজন বানাতে নিষেধ করেছেন, যাদের সাথে বিভিন্ন মতামত বিনিময় করা হবে এবং যাদের কাছে মুসলিমদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছেড়ে দেওয়া হবে। (১৪০)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১১৭৬ হি.) 'ইজালাতুল খফা' গ্রন্থে 'শাসকের আবশ্যকীয় দায়িত্ব'-সংক্রান্ত অধ্যায়ে লেখেন, মুসলিম শাসকের জন্য এটাও একটি ওয়াজিব দায়িত্ব যে, মুসলমানদের কোনো দায়িত্ব বা পদ কোনো কাফেরকে নিযুক্ত করবেন না। হজরত উমর রা. এই বিষয়ে কঠোরতার সাথে নিষেধ করেছেন। (১৪১)
টিকাঃ
১৩৮. সুরা আলে ইমরান : ১১৮
১৩৯. আহকামুল কুরআন, ২/৪৭
১৪০. তাফসিরে কুরতুবি, ৪/১৭৮
১৪১. ইজালাতুল খফার উদ্ধৃতিতে আকায়েদে ইসলাম, পৃ. ২১৫
📄 একটি জরুরি সতর্কবার্তা
এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট কী? এবং তা কাদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে? এ নিয়ে মুফাসসিরদের বিভিন্ন মত রয়েছে, কেউ বলেছেন, আয়াতটি মূলত মদিনার ইহুদিদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের সাথে দুনিয়াবি বিষয়ে পরামর্শ করতেন এবং এ ধারণা রাখতেন যে, ধর্মের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা অন্তত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য দুনিয়াবি বিষয়ে আমাদের সাথে একনিষ্ঠ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের বাস্তব অবস্থা জানিয়ে মুসলিমদের নিষেধ করেছেন। কিছু মুফাসসির বলেন, আয়াতটি মুনাফিকদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, কারণ মুসলিমরা তাদের কথায় আস্থা রাখে এবং তাদের হিতৈষী মনে করে, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে ইত্যাদি।
মোটকথা, অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, গ্রহণযোগ্য মত হলো, আয়াতের বাণী ব্যাপক এবং এতে সকল কাফেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কাফেরকে-চাই সে ইহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু, মুশরিক অথবা নাস্তিক ইত্যাদি যাই হোক-মুসলমানদের কোনো বিষয়ের প্রধান হিসাবে নিয়োগ করা, অনুরূপ তাদের নিজস্ব কর্তৃত্ব তৈরি হয় ইসলামি দেশে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া শরিয়তে জায়েজ নেই। একইভাবে তাদেরকে মুসলিমদের ধর্মীয় কোনো কাজে নিযুক্ত করা, যেমন ফাতাওয়া প্রদান, বিচারকার্য পরিচালনা ইত্যাদি শরিয়তে নাজায়েজ। যদি অন্তরে কুফর রেখে কেউ তার কুফরকে ইসলামের চাদরে ঢেকে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, যেমনটি আমাদের মধ্যে কাদিয়ানি ও কুফরি আকিদা লালনকারী শিয়াদের অবস্থা, তাহলে তার বিধান কাফেরের চেয়েও কঠিন।
আল্লামা আলুসি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১২৭০ হি.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন,
والمعنى لا تَتَّخِذُوا الكافرين كاليهود والمنافقين أولياء وخواص من غير المؤمنين أو ممن لم تبلغ منزلته، منزلتكم في الشرف والديانة، والحكم عام وإن كان سبب النزول خاصا فإن اتخاذ المخالف وليا مظنة الفتنة والفساد.
আয়াতের অর্থ হলো, মুসলিমদের পরিবর্তে কাফেরদেরকে বন্ধু এবং অন্তরঙ্গ বানাবে না, সে ইহুদি হোক কিংবা মুনাফিক, অথবা এমনসব লোক যারা মর্যাদা ও দ্বীনদারির দিক থেকে তোমাদের পর্যায়ে পৌঁছেনি। এটি একটি ব্যাপক বিধান। যদিও উল্লেখিত আয়াতের প্রেক্ষাপট নির্দিষ্ট। কারণ বিরোধী ব্যক্তিকে বন্ধু বানালে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। (১৪২)
আল্লামা ফখরুদ্দিন রাজি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৬০৬ হি.) এই মতকে প্রাধান্য দিয়ে লেখেন,
وأما ما تمسكوا به من أن ما بعد الآية مختص بالمنافقين فهذا لا يمنع عموم أول الآية، فإنه ثبت في أصول الفقه أن أول الآية إذا كان عاما وآخرها إذا كان خاصا لم يكن خصوص آخر الآية مانعا من عموم أولها. (التفسير الكبير ۹۳۳/৮، تحت سورة آل عمران : آية (۸۱۱)
ফিকহের একটি স্বীকৃত মূলনীতি হলো, যদি আয়াতের প্রথম অংশ ব্যাপক হয় এবং শেষ অংশ নির্দিষ্ট হয়, তাহলে তা প্রথম অংশের ব্যাপকতার মাঝে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। (১৪৩)
প্রসিদ্ধ হানাফি আইনবেত্তা ইমাম কাসানি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৫৮৭ হি.) বিচারক পদসংক্রান্ত বিষয়ে লেখেন যে, ইসলামি শাসনে বিচারক হওয়ার জন্য শর্ত হলো, আকেল, বালেগ, মুসলমান ইত্যাদি হওয়া। এর কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন,
لأن القضاء من باب الولاية، بل هو أعظم الولايات، وهؤلاء ليست لهم أهلية أدنى الولايات - وهي الشهادة - فلأن لا يكون لهم أهلية أعلاها أولى. (بدائع الصنائع ۳/۷، کتاب آداب القضاء، فصل في بيان من يفترض عليه قبول تقليد القضاء)
বিচারকের পদ একটি কর্তৃত্বের বিষয়, বরং এটা অনেক বড় পর্যায়ের কর্তৃত্বের অন্তর্ভুক্ত আর জিম্মিদের যেহেতু কর্তৃত্বের নিম্নস্তর তথা মুসলিমদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ারই যোগ্যতা নেই, তাহলে বড় কর্তৃত্ব না থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্টই। (১৪৪)
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে-
ক. বিচার ও অন্যান্য শাসনসংক্রান্ত যে পদগুলো রয়েছে, সেগুলোতে পদাসীন ব্যক্তির তার অধীনস্থদের ওপর কর্তৃত্ব অর্জিত হয়।
খ. কাফেররা যেহেতু মুসলমানদের ওপর কোনোরকম কর্তৃত্ব রাখার অধিকার রাখে না, তাই তাদেরকে ইসলামি ভূখণ্ডে মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্ব হয় এমন কোনো পদ দেওয়া যাবে না। অথবা মুসলমানদের বিচারসংক্রান্ত কোনো কাজেও তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। (১৪৫)
টিকাঃ
১৪২. রুহুল মাআনি, ২/২৫৩
১৪৩. তাফসিরে কাবির, ৮/৩৩৯
১৪৪. বাদায়েউস সানায়ে, ৭/৩
১৪৫. ইবনে জামাআ রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৭৩৩ হি.) এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও চমৎকার বলেছেন,
ولا يجوز تولية الذي في شيء من ولايات المسلمين إلا في جباية الجزية من أهل الذمة أو جباية ما يؤخذ من تجارات المشركين. فأما ما يجبى من المسلمين من خراج أو عشر أو غير ذلك فلا يجوز تولية ( ٨٤ / ب) الذي فيه، ولا تولية شيء من أمور المسلمين، قال تعالى: {ولن يجعل الله للكافرين على المؤمنين سبيلا ومن ولى ذميا على مسلم فقد جعل له سبيلا عليه. وقال تعالى: {ولا تتخذوا اليهود والنصارى أولياء بعضهم أولياء بعض ومن يتولهم منكم فإنه منهم ، ولأن تولية الكافر على المسلم تتضمن إعلاءه عليه، وإعزازه بالولاية، وذلك مخالف للشريعة وقواعدها. وقال تعالى: {لا تتخذوا عدوى وعدوكم أولياء . ونسأل الله العافية في الدنيا والآخرة. تحرير الأحكام في تدبير الإسلام ص ٦٢٤ ، الباب العاشر في وضع الديوان وأقسام ديوان السلطان)
মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্ব হয় এমন কোনো পদে জিম্মিদের নিয়োগদান করা জায়েজ নেই। তবে জিম্মিদের থেকে জিজিয়া কর আদায় বা দারুল হরব থেকে আসা কাফের ব্যবসায়ীদের থেকে ব্যবসায়িক ট্যাক্স আদায়সংক্রান্ত পদগুলোতে তাদের নিয়োগে কোনো সমস্যা নেই। মুসলমানদের উশর, খারাজ ইত্যাদি বিভিন্ন রাজস্ব আদায়সংশ্লিষ্ট কোনো পদে কাফেরদের নিয়োগ দেওয়া জায়েজ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
ولن يجعل الله للكافرين على المؤمنين سبيلا. আল্লাহ মুমিনদের ওপর কাফেরদের কিছুতেই কর্তৃত্ব দেবেন না।
মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্ব হয় এমন কোনো পদে কোনো জিম্মিকে নিয়োগ দেওয়ার অর্থই হলো কাফেরকে মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্ব দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
ولا تتخذوا اليهود والنصارى أولياء بعضهم أولياء بعض ومن يتولهم منكم فإنه منهم.
তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধু/অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু/অভিভাবক। আর যে তাদেরকে বন্ধু/অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
একজন কাফেরকে মুসলমানের ওপর শাসনভার অর্পণ করা মানে তাকে মুসলমানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া এবং শাসনের মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করা। যা শরিয়ত ও তার মূলনীতিসমূহের সাথে সাংঘর্ষিক। তাহরিরুল আহকাম, পৃ. ৪২৬
📄 কাফেরের অধীনে চাকরি করা
কাফেরের অধীনে চাকরি করার বিধান হলো, যদি নিম্নোক্ত তিনটি শর্ত পাওয়া যায়, তাহলে জায়েজ, অন্যথায় জায়েয নয়।
প্রথম শর্ত : চাকরির প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং কর্মপদ্ধতি উভয়টিই শরিয়তসিদ্ধ হতে হবে। তাই যদি কোনো কাজের মূল উদ্দেশ্য বৈধ না হয়, বরং মুসলমানদের মধ্যে অশ্লীলতা ও নগ্নতা ছড়ানো অথবা এ ছাড়া অন্য কোনো আকিদা বা কর্মগত বিভ্রান্তি ছড়ানো উদ্দেশ্য হয়, এবং মুসলমানদেরকে কোনো অবৈধ বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করা বা তাদের মধ্যে ইসলামবিরোধী উপাদান তৈরি করা হয়, তাহলে এ ধরনের চাকরি করা জায়েয হবে না। এ ক্ষেত্রে সাহায্য-সহায়তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। তেমনইভাবে চাকরি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব বিধান পালনে বাধা না হতে হবে। এ কারণে যে চাকরিতে ফরজ নামাজ পড়া নিষিদ্ধ বা যেখানে দাড়ি কামানো আবশ্যক, সেসব কাজে নিযুক্ত হওয়া জায়েয নেই।
চাকরি ছাড়াও মুসলমানদের জন্য কাফের পিতামাতাকেও শরিয়ত কর্তৃক কোনো অনৈতিক কাজে সাহায্য করা জায়েয নেই। সুতরাং পিতামাতা যদি কাফের হয় আর তারা নিজেদের উপাসনালয়ে যাওয়ার জন্য ছেলের কাছে সাহায্য চায়, তাহলে মুসলিম ছেলের জন্য এ ক্ষেত্রে সাহায্য করা জায়েয নেই। তেমনইভাবে কাফের পিতামাতা যদি মুসলিম সন্তানের কাছে মদ তৈরির জন্য পাত্রের দাবি করে, তাহলে মুসলমান সন্তানের জন্য পিতামাতার এমন আবদার পূরণ করা জায়েয নেই।
'ফাতাওয়ায়ে কাজিখানে' উল্লেখ রয়েছে,
مسلم به أم ذمية أو أب ذمي، ليس للمسلم أن يقود إلى البيعة وله أن يقوده من البيعة إلى منزله، وهذا كما لا يحل للمسلم حمل الخمر إلى الخل للتخليل ولكن يحمل الخل إلى الخمر، ولا يحمل الجيفة إلى الهرة، وله أن يحمل الهرة إلى الجيفة. (فتاوى قاضي خان ۱۷۳/۳، فصل في أهل الذمة وما يؤخذ منهم من الجزية في كل سنة وما يفعل بهم)
একজন মুসলিমের যদি জিম্মি মা কিংবা জিম্মি বাবা থাকে, তাহলে এমন মুসলিমের জন্য তার পিতা বা মাতাকে গির্জায় নিয়ে যাওয়া বৈধ নয়, তবে তার জন্য গির্জা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা জায়েজ আছে। এই মাসআলাটি ওই মাসআলার মতোই যে, মুসলিমের জন্য সিরকা বানানোর উদ্দেশ্যে সিরকার কাছে মদ বহন করে নেওয়া বৈধ নয়, কিন্তু সিরকাকে মদের কাছে বহন করে নিয়ে যাওয়া বৈধ। এমনইভাবে বিড়ালের কাছে মৃত প্রাণী বহন করে নিয়ে যেতে পারবে না, কিন্তু বিড়ালকে মৃত প্রাণীর কাছে নিয়ে যেতে পারবে। (অর্থাৎ, মৃত প্রাণী যদি আপনি বহন করেন তাহলে সরাসরি হারাম জিনিস আপনি বহন করে নিয়ে গেলেন। আর বিড়ালটাকে মৃত প্রাণীর সামনে গিয়ে ছেড়ে দিলে আপনি কোন হারাম জিনিস গ্রহণ করলেন না।) (১৪৬)
'তাকমিলায়ে বাহরুর রায়েকে' উল্লেখ হয়েছে,
ولا يسقي أباه الكافر خمرا ولا يناوله القدح ويأخذه منه ولا يذهب به إلى البيعة، ويرده منها. تكملة البحر الرائق ،٧٠٢/٨ ، كتاب الكراهية، فصل في الأكل والشرب)
কাফের পিতাকে মদ খাওয়ানো মুসলিম সন্তানের জন্য জায়েয নেই। এবং তাদেরকে মদের গ্লাস এগিয়ে দেওয়াও যাবে না। তবে তাদের হাত থেকে পাত্র নেওয়া যাবে। তাদের উপাসনালয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না, তবে সেখান থেকে নিয়ে আসা যাবে। (১৪৭)
দ্বিতীয় শর্ত: এতে ইসলাম ও মুসলমানদের মানহানি বা ক্ষতি থাকতে পারবে না।
তৃতীয় শর্ত: তৃতীয় শর্তটি মূলত সেটিই যা এর আগে বহুবার বলা হয়েছে, অর্থাৎ এর কারণে তার প্রতি মুহাব্বত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যেন না থাকে।
যদি কোনো চাকরিতে যুক্ত থাকার ফলে মুসলিমদের অন্তরে কুফর ও কাফেরদের প্রতি মুহাব্বত জাগে, তাহলে সে চাকরি করা জায়েজ নয়।
টিকাঃ
১৪৬. ফাতাওয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৭২
১৪৭. আল-বাহরুর রায়েক, ৮/২০৭