📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 জিম্মির অধিকার খর্ব করা সংক্রান্ত একটি কথা

📄 জিম্মির অধিকার খর্ব করা সংক্রান্ত একটি কথা


আল্লামা বিরকিবি রহিমাহুল্লাহ তার গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা ‘জালাউল কুলুব’-এর মধ্যে আলোচনা করেন যে, কাফের এবং জানোয়ারের অধিকার খর্ব করা এবং তার ওপর নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতা প্রদর্শন করা থেকে বিশেষভাবে বেঁচে থাকা জরুরি; কারণ সাধারণ নির্যাতিত মুসলমানদের ক্ষেত্রে তো এই সম্ভাবনা আছে যে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা জালেমের কিছু নেকি দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করে দেবেন এবং সে জালেমকে ক্ষমা করে দেবে। কিন্তু কাফের এবং জানোয়ারের ক্ষেত্রে তো নেকির কোনো কার্যকারিতা নেই, কাফের সে নেয়ামত ভোগ করতে পারবে না, ফলত এ ক্ষেত্রে মুসলিমদের হিসাব বহু কঠিন হবে যা অনেক ক্ষতির কারণ হবে। (১২১)
‘ফাতাওয়ায়ে নাওয়াজেল’ গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে,
الظلم على الذي أشد من الظلم للمسلم، لأنه من أهل النار، فلا يرجى عفوه. (فتاوى النوازل ص ۰۰۳، مسائل متفرقة)
মুসলমানের ওপর জুলুম করা থেকে কাফেরের ওপর জুলুম করা বেশি কঠোর হবে (কেয়ামতে)। কেননা জিম্মিরা জাহান্নামি হবে, ফলে (কেয়ামতের দিন সওয়াবের বিনিময়ে) তার থেকে ক্ষমা পাওয়ার কোনো আশাও থাকবে না। (১২২)

টিকাঃ
১২১. জালাউল কুলুব, পৃ. ২০
১২২. ফাতাওয়ায়ে নাওয়াজেল পৃ. ৩০০

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 জিম্মিদের স্বতন্ত্র পোশাক

📄 জিম্মিদের স্বতন্ত্র পোশাক


ইসলামি ভূখণ্ডে বসবাস করতে আগ্রহী কাফের ও মুসলমানদের মাঝে অবশ্যই কিছু পার্থক্যরেখা টেনে দেওয়া জরুরি। জীবনযাপনের যেকোনো বিষয়ে কিছু পার্থক্য থাকা জরুরি। এর অনেক যৌক্তিক কারণ রয়েছে। ইসলামি আইনের কিতাবসমূহে হজরত উমর ফারুক রা.-এর দিকে সম্পৃক্ত ‘শুরুতে উমরিয়্যাহ’ নামে জিম্মিদের সাথে একটি চুক্তির বিষয় উল্লেখ আছে। যেখানে কিছু ধারা এমন আছে যেগুলোতে স্পষ্টই মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝে পার্থক্যের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ইসলামি আইনজ্ঞগণ এই পার্থক্যের যৌক্তিকতার অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করেছেন। যেমন, মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানকে সালাম দেওয়া একটি সুন্নত। কিন্তু অমুসলিমদের আগে বেড়ে সালাম দেওয়া বৈধ নয়। মৃত মুসলমানের গোসল ও দাফনের নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে, তেমনই মৃত অমুসলিমেরও রয়েছে তাদের নিজেদের পদ্ধতি। এখন যদি কোনো পার্থক্যই না থাকে আর অনাকাঙ্ক্ষিত রাস্তায় কোনো অপরিচিত লাশ পাওয়া যায়, তাহলে তাকে কোন পদ্ধতিতে গোসল ও দাফন দেওয়া হবে—ইসলামি রীতিনীতি অনুযায়ী না অন্য কোনো ধর্মের? বর্ণিত আছে, খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ একবার রাস্তা দিয়ে খুবই শানশওকতের সাথে অতিক্রম করা কিছু পথচারীকে দেখে আগে বেড়ে সালাম দিলেন। পাশে থাকা খাদেম বলল, মহামান্য খলিফা! আপনি কি জানেন এরা কারা? তিনি না-সূচক জবাব দিলে খাদেম বলল, এরা বনু তাগলিবের জিম্মি। এটা শুনে উমর বিন আবদুল আজিজ বললেন, জিম্মিদের উচিত চালচলনে কিছু পার্থক্য রাখা। যাতে এরকম ধোঁয়াশার সৃষ্টি না হয়।
ফকিহগণ জিম্মিদের পোশাকে পার্থক্য রাখার বিষয়টির কিছু কারণ ও উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছেন। যার মধ্যে মৌলিক কারণ দুটি—
১. বেশ কিছু বিধানে মুসলমান ও জিম্মিদের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। পোশাকের পার্থক্য এজন্য জরুরি যে, যেন ওই বিধানসমূহ পালনে কোনো ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি না হয়।
২. এর মধ্যে জিম্মিদের লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা রয়েছে। আর এটা এজন্য জরুরি যে, কুফরের মতো জঘন্য অন্যায় করার পরও তারা ইসলামি ভূখণ্ডে শান্তিতে বসবাস করছে। এখন তারা যদি দাপট ও প্রতাপের সাথে থাকে, তাহলে দুর্বল ঈমানের মুসলমানরা কুফরের দিকে ধাবিত হয়ে যাবে, অথবা কুফরের প্রতি ঘৃণা তাদের অন্তর থেকে দূর হয়ে যাবে, কিংবা কমে যাবে।
কিন্তু যে বিষয়টি বাহ্যত বুঝে আসে—
ক. পোশাকের এই পার্থক্যের মূল উদ্দেশ্য ও কারণ হলো যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি—উভয়ের বিধানগত পার্থক্যগুলো স্পষ্ট থাকা। হজরত উমর রা. কর্তৃক শর্তগুলো গভীর দৃষ্টিতে দেখলেও এই বিষয়টি আরও জোরালো হয়। এ ছাড়া অন্যান্য যে কারণগুলো উল্লেখ করা হয় সেগুলো মূল কারণ বা উদ্দেশ্য নয়। বরং সেগুলো হলো ফলাফল ও পরিণাম। হজরত উমর রা.-এর জিম্মিদের চুক্তির ধারাগুলো দেখলেও স্পষ্ট যে, সেখানে এতটুকু আছে যে, জিম্মিরা পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি বিষয়ে মুসলমানদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে পারবে না। আর তাতে শুধু উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে সাদৃশ্য সৃষ্টি না হওয়াই উদ্দেশ্য। লাঞ্ছনা বা অপদস্থতা উদ্দেশ্য নয়। (১২৩)
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ সে চুক্তির একটি ধারা উল্লেখ করেন,
وأن نلزم زينا حيثما كنا، وأن لا نتشبه بالمسلمين في لبس قلنسوة، ولا عمامة، ولا نعلين، ولا فرق شعر، ولا في مراكبهم، ولا نتكلم بكلامهم ولا نكتني بكناهم. وأن نجز مقادم رؤوسنا ولا نفرق نواصينا، ونشد الزنانير على أوساطنا. ولا ننقش خواتمنا بالعربية. (أحكام أهل الذمة ٣٧٢/٢، ذكر الشروط العمرية وأحكامها وموجباتها، ط. دار ابن حزم)
আমরা (জিম্মিরা) যেখানেই থাকি নিজেদের বিশেষ বেশভূষা আঁকড়ে ধরব। আর মুসলমানদের সাথে টুপি, পাগড়ি, জুতা, চুলে সিঁথি করা, যানবাহনে আরোহণে সাদৃশ্য রাখব না। আমরা তাদের মতো করে কথাও বলব না এবং তাদের মতো করে নিজেদের নামের উপাধিও রাখব না। আমরা মাথার সামনের অংশের চুল কেটে রাখব। আমরা পইতা বাঁধব এবং নিজেদের মোহরে আরবি ব্যবহার করব না। (১২৪)
খ. পার্থক্যের চিহ্নগুলো থাকার অর্থ এই নয় যে, তা জিম্মিদের ওপর জুলুম ও অত্যাচার। বরং মুসলমান ও অমুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মাঝে একটি পার্থক্যরেখা রাখা। যাতে প্রত্যেকের হক যথাযথভাবে আদায় করা যায়।
গ. আমাদের ফকিহগণ পার্থক্যের যে বিবরণগুলো দিয়েছেন ও যে-সকল চুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, বর্তমান সময়ে তার অনেকগুলোর ব্যাপক প্রচলন নেই। আর বর্তমানে পার্থক্যের জন্য সেগুলো যথেষ্টও নয়। যেমন, জিম্মিরা ঘোড়ায় চড়তে পারবে না, গাধায় বা খচ্চরে চড়বে। অথচ বর্তমানে পশুর যানবাহনের প্রচলন নেই। ফকিহদের বর্ণনার ভিন্নতা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, এই সকল বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে পার্থক্যের একটি সীমারেখা বজায় রাখা। আর সেই উদ্দেশ্য অর্জন স্থান, কাল ও সময়ভেদে বিভিন্ন হতে পারে। তবে সর্বাবস্থায় মূল উদ্দেশ্য পূর্ণ করা জরুরি।
(ويميز الذي عنا في الزي والمركب والسرج فلا يركب خيلا ولا يعمل بالسلاح ويظهر الكستيج ويركب سرجا كالإكاف إظهارا للصغار عليهم وصيانة لضعفة المسلمين يقينا لأن من هو ضعيف اليقين إذا رآهم يتقلبون في النعم والمسلمين في محنة وشدة يخاف أن يميل إلى دينهم وإليه وقعت الإشارة بقوله تعالى { ولولا أن يكون الناس أمة واحدة لجعلنا لمن يكفر بالرحمن لبيوتهم سقفا من فضة} [الزخرف : ٣٣] الآية وحكاية قارون مع الضعفة من قوم موسى عليه السلام معروفة ظاهرة ولأن المسلم يوقر والذي يحقر ويضيق عليه الطريق ولا يبدأ بالسلام فلو لم يكن له علامة يميز بها لما وقع التفرقة بينهما فيعامل معاملة المسلمين وأول من أخذ أهل الذمة بالعلامة عمر رضي الله عنه لكثرة الناس في أيامه فرأى أنه لم تقع التفرقة بين المسلم والكافر إلا بالعلامة. تبيين الحقائق، كتاب السير، باب العشر والخراج)
জিম্মিরা আমাদের থেকে পোশাক-আশাক, যানবাহন ও (ঘোড়ায় চড়ার) জিনের মাঝে পার্থক্য রাখবে। তারা ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতে পারবে না। অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না। (দড়ির তৈরি একজাতীয় বিশেষ) কোমরবন্ধনী প্রকাশ করতে হবে। পশুতে আরোহণের সময় এমন জিন ব্যবহার করবে যা খাটের মতো দেখতে। যেন তাদের হীনতা প্রকাশ পায় এবং দুর্বলচিত্তের মুসলমানদের রক্ষা হয়। কেননা এই দুর্বল ঈমানদাররা যখন কাফেরদের প্রফুল্ল ও বিলাসী জীবনযাপন দেখবে আর নিজেদের দরিদ্রতা আর কষ্ট দেখবে, তখন আশঙ্কা রয়েছে তাদের ধর্মের প্রতি এরা ঝুঁকে যাবে। আর আল্লাহ এই দিকে ইশারা করে বলেন,
وَلَوْلَا أَن يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَن يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِّن فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ.
সকল মানুষ একই মতাবলম্বী হয়ে যাবে, এই আশঙ্কা যদি না থাকত, তবে যারা রহমানকে অস্বীকার করে আমি তাদেরকে তাদের ঘরের জন্য দিয়ে দিতাম রুপার ছাদ এবং রুপার সিঁড়ি, যার ওপর তারা আরোহণ করত। (১২৫)
মুসা আ.-এর দুর্বল ঈমানের অধিকারী উম্মতের কারুনের সাথে ঘটা ঘটনা এই বিষয়ে বেশ প্রসিদ্ধ। আর এজন্যই মুসলমানদের সম্মান করা হবে এবং অমুসলিমদের অবজ্ঞা করা হবে। তাদেরকে আগে বেড়ে সালাম দেওয়া হবে না। তাদের রাস্তা সংকীর্ণ করে দেওয়া হবে। আর যদি জিম্মিদের মাঝে এমন কোনো আলামত বা চিহ্ন না থাকে, যার মাঝে তাদেরকে মুসলিম থেকে পার্থক্য করা যায়, তাহলে তাদের সাথেও মুসলমানদের মতোই আচরণ করা হয়ে যাবে। প্রথমে জিম্মিদেরকে আলাদা চিহ্ন ধারণ করার আদেশ হজরত উমর রা. দিয়েছেন। কেননা, তার জামানায় লোকজনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং নির্দিষ্ট চিহ্ন ছাড়া মুসলিম এবং কাফেরের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করা যাচ্ছিল না। (১২৬)
আল্লামা শিলবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১০২১ হি.) লেখেন,
وحاصل هذا أن أهل الذمة لما كانوا مخالطين لأهل الإسلام فلا بد مما يتميز به المسلم من الكافر كي لا يعامل معاملة المسلم من التوقير والإجلال وذلك لا يجوز وإذ وجب التمييز وجب أن يكون فيه صغار لا إعزاز لأن إذلالهم واجب بغير أذى من ضرب أو صفع بلا سبب يكون منه بل المراد اتصافه بهيئة وضيعة وكذا لو أمروا بالكستيجات. اهـ كمال. (حاشية الشلبي على التبيين، كتاب السير، باب العشر والخراج)
মোটকথা, জিম্মিরা যখন মুসলমানদের সাথে একত্রে বসবাস করবে, তখন মুসলমান আর কাফেরের মাঝে পার্থক্য থাকা জরুরি। যাতে তাদেরকে মুসলমানদের মতো সম্মান না করা হয়। কেননা তা নাজায়েজ। আর যখন পার্থক্য জরুরি তখন এই পার্থক্যের মাঝে হীনতা ও অপদস্থতা থাকা আবশ্যক। কেননা, তাদেরকে কোনোরূপ কষ্ট দেওয়া ছাড়া হীনতার সাথে রাখা আবশ্যক। কেননা, তাদেরকে লাঞ্ছিত করা আবশ্যক। তবে আঘাত করা, থাপ্পড় দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া যাবে না। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাদের বেশভূষা ও চালচলন নিম্নমানের হওয়া। এমনইভাবে তাদের কোমরে (নিম্নমানের) কোমরবন্ধ পরতে বলার নির্দেশ দেওয়াটাও (এর অন্তর্ভুক্ত)। (১২৭)
আল্লামা ইবনে মাজাহ বুখারি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ৬১৬ হি.) লেখেন,
ولأنهم من أهل الصغار، والمسلمون من أهل العز، فيجب إظهار المخالفة في الزي، والهيئة ليقع التمييز بيننا وبينهم، فلا يذل المسلم، ولا يعز الكافر، ولأنا نهينا عن بدايتهم بالسلام والتحية. قال الله تعالى : {لا تتخذوا عدوي إلى قوله : {تلقون إليهم بالمودة (الممتحنة : (۱)، فلا بد من علانية يعرفهم كيلا يحسبهم مسلمين، فيبدأهم بالتحية، ويمنعون عن ركوب الفرس؛ لأنه من باب العز، وهم من أهل الصغار، فيمنعون عنه إلا إذا وقعت الحاجة إلى ذلك بأن استعان بهم الإمام في المحاربة، والذب عن المسلمين، هكذا ذكر شيخ الإسلام. (المحيط البرهاني، كتاب الخراج، فصل في المتفرقات)
জিম্মিরা হলো অসম্মানিত আর মুসলমানরা হলো সম্মানিত। তাই উভয়ের মাঝে পোশাক-পরিচ্ছদে পার্থক্য প্রকাশ করা আবশ্যক। যাতে উভয়ের পার্থক্য স্পষ্ট থাকে। ফলে মুসলিমকে হীন করা হবে না এবং কাফেরকে সম্মান করা হবে না। আর তা এই কারণে যে, আমাদের তাদেরকে প্রথমে সালাম দিতে ও দোয়া করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা মুমতাহিনার প্রথম আয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন। তাই এমন স্পষ্ট আলামত তাদের মাঝে থাকা জরুরি যাতে তাদের মুসলমান মনে করে প্রথমে সালাম না দেওয়া হয়। তাদেরকে ঘোড়ায় আরোহণ করতে নিষেধ করা হবে, কেননা এটাও একটা সম্মানের বিষয়, অথচ জিম্মিরা হলো অপদস্থ সম্প্রদায়। তবে কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে, যেমন মুসলিম খলিফা বা শাসক মুসলমানের প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধে তাদের সহযোগিতা নিয়েছে, তখন তারা ঘোড়ায় আরোহণ করতে পারবে। (১২৮)
ইমাম কাসানি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৫৮৭ হি.) বলেন,
(وأما) بيان ما يؤخذ به أهل الذمة، وما يتعرض له وما لا يتعرض فنقول - وبالله التوفيق : إن أهل الذمة يؤخذون بإظهار علامات يعرفون بها، ولا يتركون يتشبهون بالمسلمين في لباسهم ومركبهم وهيئتهم... والأصل فيه ما روي أن عمر بن عبد العزيز رحمه الله مر على رجال ركوب ذوي هيئة فظنهم مسلمين فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ، فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِهِ : أَصْلَحَكَ اللهُ، تَدْرِي مَنْ هَؤُلَاءِ؟ فَقَالَ : مَنْ هُمْ؟ فَقَالَ : هَؤُلَاءِ نَصَارَى بَنِي تَغْلِبَ فَلَمَّا أَتَى مَنْزِلَهُ أَمَرَ أَنْ يُنَادِيَ فِي النَّاسِ أَنْ لَا يَبْقَى نَصْرَانِيٌّ إِلَّا عَقَدَ نَاصِيَتَهُ، وَرَكِبَ الْإِكَافَ.
وَلَمْ يُنْقَلْ أَنَّهُ أَنْكَرَ عَلَيْهِ أَحَدٌ فَيَكُونُ كَالْإِجْمَاعِ، وَلِأَنَّ السَّلَامَ مِنْ شَعَائِرِ الْإِسْلَامِ فَيَحْتَاجُ الْمُسْلِمُونَ إِلَى إِظْهَارِ هَذِهِ الشَّعَائِرِ عِنْدَ الِالْتِقَاءِ، وَلَا يُمْكِنُهُمْ ذَلِكَ إِلَّا بِتَمْيِيزِ أَهْلِ الذِّمَّةِ بِالْعَلَامَةِ، وَلِأَنَّ فِي إِظْهَارِ هَذِهِ الْعَلَامَاتِ إِظْهَارَ آثَارِ الذِّلَّةِ عَلَيْهِمْ، وَفِيهِ صِيَانَةُ عَقَائِدِ ضَعَفَةِ الْمُسْلِمِينَ عَنِ التَّغْيِيرِ عَلَى مَا قَالَ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى {وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ} [الزُّخْرُفِ : ٣٣]. (بَدَائِعُ الصَّنَائِعِ ٣١١/٧، كِتَابُ السَّيْرِ، فَصْلٌ فِي بَيَانِ مَا يَعْتَرِضُ مِنَ الْأَسْبَابِ الْمُحَرَّمَةِ لِلْقِتَالِ)
অবশ্যই জিম্মিদের এমন আলামত ও চিহ্ন ধারণ করার জন্য বাধ্য করা হবে, যার মাধ্যমে তাদের আলাদা পরিচয় স্পষ্ট হয়। তারা মুসলমানদের বেশভূষা, যানবাহন ও আকার-আকৃতি ধারণ করলে তাদেরকে তা থেকে বিরত রাখা হবে। ...এ ক্ষেত্রে (একটি) মৌলিক দলিল হলো, উমর বিন আবদুল আজিজ রহ.-এর ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, একবার তিনি রাস্তা দিয়ে একদল আরোহী লোকের আকৃতি দেখে মুসলিম মনে করে আগ বেড়ে সালাম দেন। তার সাথে থাকা একজন বললেন, আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করে দিক! আপনি কি জানেন এরা কারা? উমর বিন আবদুল আজিজ বললেন, এরা কারা ছিল? সাথে থাকা লোকটি বলল, এরা বনু তাগলিবের খ্রিষ্টান। উমর বিন আবদুল আজিজ এই ঘটনার পর নিজ অবস্থানে ফিরে এসে ফরমান জারি করেন, আজ থেকে সকল খ্রিষ্টান যেন বাধ্যতামূলকভাবে মাথার সামনের ঝুঁটি বেঁধে রাখে এবং গাধায় আরোহণ করে।
হজরত উমর বিন আবদুল আজিজের এই হুকুমের ওপর কেউ আপত্তি জানায়নি। সে হিসাবে এটা একধরনের ইজমা (ঐকমত্যপূর্ণ মাসআলা)।
আর তা এজন্যও যে, সালাম ইসলামের একটি শিয়ার বা প্রতীক। মুসলমানরা পরস্পর মিলিত হলে এই শিয়ার প্রকাশ করে থাকে। জিম্মিদের কোনো চিহ্নের মাধ্যমে পার্থক্য করা না গেলে মুসলমানদের জন্য এই শিয়ার প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের আলামতগুলো প্রকাশের দ্বারা জিম্মিদের হীনতাও প্রকাশ করা যায়। তাতে দুর্বল ঈমানের অধিকারী মুমিনদের ঈমান-আকিদা রক্ষা করা যায়। যেমনটা আল্লাহ বলেছেন,
وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِّن فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ.
সকল মানুষ একই মতাবলম্বী হয়ে যাবে, এই আশঙ্কা যদি না থাকত, তবে যারা রহমানকে অস্বীকার করে আমি তাদেরকে তাদের ঘরের জন্য দিয়ে দিতাম রুপার ছাদ এবং রুপার সিঁড়ি, যার ওপর তারা আরোহণ করত। (১২৯), (১৩০)
ইমাম শামি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১২৫২ হি.) ফাতহুল কাদির গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে লেখেন,
حاصله : أنهم لما كانوا مخالطين أهل الإسلام، فلا بد من تمييزهم عنا كي لا يعامل معاملة المسلم من التوقير والإجلال، وذلك لا يجوز وربما يموت أحدهم فجأة في الطريق ولا يعرف فيصلى عليه، وإذا وجب التمييز وجب أن يكون بما فيه صغار لا إعزاز لأن إذلالهم لازم بغير أذى من ضرب أو صفع بلا سبب يكون منه بل المراد اتصافه بهيئة وضيعة فتح. (رد المحتار، كتاب الجهاد، مطلب في تمييز أهل الذمة في الملبس)
সারকথা হলো, যখন জিম্মিরা মুসলমানদের সাথে একত্রে থাকবে, তখন তাদের জন্য কিছু পার্থক্য থাকা জরুরি। যাতে তাদেরকে মুসলমানদের মতো ইজ্জত ও সম্মান না করা হয়। কখনো হঠাৎ যদি তাদের কারও মৃত্যু হয়ে যায়, আর এই সম্ভাবনা থাকে যে তার পরিচয় না পাওয়া যাওয়ার কারণে মুসলমানরা তার জানাজা পড়ে ফেলবে! পার্থক্য যখন আবশ্যকই, তখন এমন কিছু দিয়েই পার্থক্য হতে হবে, যেখানে তাদের হীনতা প্রকাশ হয়, সম্মান প্রকাশ না হয়। কেননা তাদেরকে কোনোরূপ কষ্ট দেওয়া ছাড়া হীনতার সাথে রাখা জরুরি। মোটকথা, উদ্দেশ্য হলো, জিম্মিদের নির্দিষ্ট বেশভূষাই ধারণ করতে হবে। (১৩১)

টিকাঃ
১২৩. এখানে সম্মানিত লেখক যা বলেছেন সে ব্যাপারে যথেষ্ট আপত্তির সুযোগ রয়েছে। বাস্তবতা হলো এসব বিধিবিধানের দ্বারা কাফেরদের লাঞ্ছনা ও অপদস্থতাও উদ্দেশ্য। তারা কুফরির কারণে সম্মানের উপযুক্ত নয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দলিল হলো কুরআনে কারিম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُواْ الْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ.
কিতাবিদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না এবং শেষদিবসের প্রতিও নয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা-কিছু হারাম করেছেন তাকে হারাম মনে করে না এবং সত্য দ্বীনকে নিজের দ্বীন বলে স্বীকার করে না, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, যাবৎ না তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিজিয়া আদায় করে। সুরা তাওবা: ২৯
এই আয়াতের 'তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিজিয়া আদায় করে' এই অংশের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
وهم صاغرون أي ذليلون حقيرون مهانون فلهذا لا يجوز إعزاز أهل الذمة ولا رفعهم على المسلمين بل هم أذلاء صغرة أشقياء كما جاء في صحيح مسلم عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : لا تبدءوا اليهود والنصارى بالسلام وإذا لقيتم أحدهم في طريق فاضطروه إلى أضيقه ولهذا اشترط عليهم أمير المؤمنين عمر بن الخطاب رضي الله عنه تلك الشروط المعروفة في إذلالهم وتصغيرهم وتحقيرهم.... تفسير القرآن العظيم - ابن كثير (٧٤/١)
অর্থাৎ, তারা এমতাবস্থায় (জিজিয়া আদায় করবে যে তারা) অপদস্থ, লাঞ্ছিত ও অপমানিত থাকবে। এজন্য জিম্মিদেরকে সম্মান করা জায়েজ নেই। মুসলিমদের ওপরে তাদেরকে মর্যাদা দেওয়াও জায়েয নেই। বরং তারা অপদস্থ ও লাঞ্ছিত থাকবে... আর এই (লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করার) উদ্দেশ্যেই উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সেই প্রসিদ্ধ শর্তগুলো আরোপ করেছিলেন...। তাফসিরে ইবনে কাসির, ১০/৪৭
প্রিয় পাঠক, এই কিতাবেই আপনি দেখতে পাবেন, ইমাম ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, জিম্মিদের জন্য এ সকল বিধান তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করার জন্যই। তবে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করার অর্থ তাদেরকে জুলুম করা নয় এবং সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং কুফরের কারণে তার প্রাপ্যটুকুই দেওয়া হচ্ছে। হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, লেখক স্বয়ং যে-সকল সূত্র উল্লেখ করেছেন সেগুলোতেও সুস্পষ্টভাবে জিম্মিদেরকে লাঞ্ছনা করার উদ্দেশ্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আবার মুসলিম ও জিম্মিদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের উদ্দেশ্যেই এসব বিধান বিধিবদ্ধ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং, উভয়টাই কারণ। এখানে শুধু একটি বক্তব্য উল্লেখ করছি। বাকি বক্তব্যগুলো লক্ষ করলেই পাঠক বুঝতে পারবেন বিষয়টি।
لأن إذلالهم واجب بغير أذى من ضرب أو صفع بلا سبب يكون منه بل المراد اتصافه بهيئة وضيعة وكذا لو أمروا بالكستيجات. اهـ كمال. (حاشية الشلبي على التبيين، كتاب السير، باب العشر والخراج)
কেননা, তাদেরকে লাঞ্ছিত করা আবশ্যক। তবে আঘাত করা, থাপ্পড় দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া যাবে না। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাদের বেশভূষা ও চালচলন নিম্নমানের হওয়া। এমনইভাবে তাদের কোমরে (নিম্নমানের) কোমরবন্ধ পরতে বলার নির্দেশ দেওয়াটাও (এর অন্তর্ভুক্ত)। তাবয়িনুল হাকায়েক (সম্পাদক)
১২৪. আহকামু আহলিয যিম্মাহ, ২/২৭৩
১২৫. সুরা যুখরুফ: ৩৩
১২৬. তাবয়িনুল হাকায়েক ৩/২৮০
১২৭. হাশিয়াতুশ শিলবি আলাত তাবয়িন, ৩/২৮০
১২৮. আল-মুহিতুল বুরহানি, ৩/৩৫৮
১২৯. সুরা যুখরুফ: ৩৩
১৩০. বাদায়েউস সানায়ে, ৭/১১৩
১৩১. ফাতাওয়ায়ে শামি, ২/২০৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00