📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 কাফেরদের জন্য দোয়া করা

📄 কাফেরদের জন্য দোয়া করা


১. কোনো ব্যক্তি কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য মাগফেরাতের দোয়া করা জায়েয নয়, তাই সান্ত্বনা দেওয়ার কালে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা কাম্য। কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُوْلِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ.
নবী ও ঈমানদারদের পক্ষে মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা সংগত নয়, যদিও তারা আত্মীয়স্বজন হোক, যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তারা দোজখি। (৯৫)
আল-বাহরুর রায়েক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,
والحق أنه يكون عاصيا بالدعاء للكافر بالمغفرة غير عاص بالدعاء بالمغفرة لجميع المؤمنين. (البحر الرائق ٠٥٣/١، كتاب الصلاة، باب صفة الصلاة، آداب الصلاة)
সঠিক কথা হলো কাফেরদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করার দ্বারা ব্যক্তি গোনাহগার হবে। কিন্তু সমস্ত মুসলমানের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করার দ্বারা গোনাহগার হবে না। (৯৬)
আন-নাহরুল ফায়েক গ্রন্থে আরও উল্লেখ হয়েছে,
(ودعا) لنفسه ولأبويه المؤمنين والمؤمنات أما الدعاء للكافرين بالمغفرة فلا يجوز بل ادعى القرافي المالكي البهنسي أنه كفر. (النهر الفائق ٤٢٢/١، كتاب الصلاة، باب صفة الصلاة)
নিজের জন্য, নিজের মুসলিম পিতামাতার জন্য মাগফেরাতের দোয়া করা জায়েজ। আর কাফেরদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করা জায়েয নয়। বরং কারাফি আল-মালেকি রহিমাহুল্লাহ তো দাবি করেছেন যে, এটা (কাফেরদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করা) কুফর। (৯৭)
বাকি রইল জীবিত কাফেরদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করার বিধান। এই বিষয়ে ফকিহদের মাঝে মতানৈক্য দেখা যায়। কতক আহলে ইলমের মতে তা জায়েজ। 'আল-মুতাসার মিনাল মুখতাসার' কিতাবে উল্লেখ হয়েছে,
ومما يدل على جواز الاستغفار للمشرك مادام حيا قوله صلى الله عليه وسلم : اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون. (المعتصر من المختصر من مشكل الآثار ١٢١/١ ، كتاب الجنائز، باب في الاستغفار للمشرك)
জীবিত কাফেরের জন্য মাগফেরাতের দোয়া জায়েয হওয়ার দলিল হলো, যেমনটা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদযুদ্ধের সময় করেছেন- হে আল্লাহ আমার কওমকে ক্ষমা করে দেন, কেননা তারা জানে না। (৯৮)
আর কতকের মতে কুরআনে মাগফেরাতের দোয়া করতে যে নিষেধ করা হয়েছে তা ব্যাপক অর্থেই করা হয়েছে। তাই জীবিত ও মৃত সব কাফেরই এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে। ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ৬৭১ হি.) বলেন,
فإن الله لم يجعل للمؤمنين أن يستغفروا للمشركين فطلب الغفران للمشرك مما لا يجوز. فإن قيل : فقد صح أن النبي صلى الله عليه وسلم قال يوم أحد حين كسروا رباعيته وشجوا وجهه : (اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون) فكيف يجتمع هذا مع منع الله تعالى رسوله والمؤمنين من طلب المغفرة للمشركين. قيل له : إن ذلك القول من النبي صلى الله عليه وسلم إنما كان على سبيل الحكاية عمن تقدمه من الأنبياء والدليل عليه ما رواه مسلم عن عبد الله قال : كأني أنظر إلى النبي صلى الله عليه وسلم يحكي نبيا من الأنبياء ضربه قومه وهو يمسح الدم عن وجهه ويقول : (رب اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون). (الجامع لأحكام القرآن ৩7২/৮, تحت سورة التوبة الآية : 311)
অর্থাৎ, মুমিনদের জন্য কাফেরের মাগফেরাত চাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। (১৯)
কিন্তু বাহ্যত এটাই মনে হয় যে, যদি জীবিত কাফেরের জন্য তার কুফরি অবস্থায় মাগফেরাতের দোয়া করা হয়, তাহলে তা নাজায়েয হবে। তবে যদি এভাবে মাগফেরাত চাওয়া হয় যে, কাফেরের যেন সঠিক ধর্ম ইসলাম কবুলের তাওফিক হয়, তাহলে দোয়া করার সুযোগ আছে। এতে কোনো সমস্যা নেই। (১০০)
২. হেদায়েত ও সত্য দ্বীন গ্রহণের তাওফিক হয়, এজন্য দোয়া করা। এটা সম্পূর্ণ জায়েজ। বরং কেউ যদি ইখলাসের সাথে দোয়া করে, তাহলে সে অবশ্যই অনেক বড় একটি সওয়াবের কাজ করল। আর এটা হলো তাবলিগের একটি নীরব পদ্ধতি।
৩. দীর্ঘজীবন, নিরাপত্তার জন্য ও সুখশান্তির জন্য দোয়া করা। এখানেও মতানৈক্য রয়েছে। কারও নিকট জায়েয আর কারও নিকট নিষেধ। তবে মাসআলাটির মূল ভিত্তি এটাই মনে হয়, যে দোয়া করছে তার উদ্দেশ্য কী সেটা দেখতে হবে। যদি উদ্দেশ্য হয়, দীর্ঘজীবন পেলে এবং সুখশান্তিময় জীবন লাভ করলে কাফের ব্যক্তিটি ইসলাম গ্রহণ করবে, অথবা দীর্ঘজীবী হলে তার জিজিয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের উপকার হবে, এমন উদ্দেশ্য হলে এ ধরনের দোয়ায় কোনো সমস্যা নেই। আর যদি উদ্দেশ্য হয় কুফর নিয়ে সে দীর্ঘজীবী হোক, তাহলে স্পষ্টই এটা নিষিদ্ধ। 'তাবয়িনুল হাকায়েক' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,
ولو دعا له بالهدى جاز؛ لأنه عليه الصلاة والسلام قال اللهم أهد قومي فإنهم لا يعلمون، ولو دعا له بطول العمر قيل لا يجوز؛ لأن فيه التمادي على الكفر، وقيل يجوز؛ لأن في طول عمره نفعا للمسلمين بأداء الجزية فيكون دعاء لهم، وعلى هذا الاختلاف الدعاء له بالعافية. (تبيين الحقائق ٠٣/٦، كتاب الكراهية، فصل في البيع)
অর্থাৎ, কাফেরের জন্য হেদায়েতের দোয়া করা জায়েজ। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের হেদায়েতের দোয়া করেছেন। কাফেরদের দীর্ঘজীবী হওয়ার দোয়া করা জায়েয নয়, কেননা এতে কুফরের ওপর দীর্ঘজীবনের দোয়া হয়। আবার কেউ বলেছেন জায়েজ। কেননা কাফের দীর্ঘজীবী হলে সে জিজিয়া দেবে, এতে মুসলমানদের কল্যাণ। ফলে এখানে মুসলমানদের পক্ষেই দোয়া করা হচ্ছে। কাফেরের জন্য আরোগ্যের দোয়া করার ব্যাপারেও একই মতভেদ রয়েছে।(১০১)
'মিনহাতুস সুলুক' গ্রন্থে বদরুদ্দিন আইনি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৮৫৫ হি.) বলেন,
(ولو قال للذمي : أطال الله بقائك : لم يجز لأن فيه التمادي على الكفر (إلا إذا نوى به) أي بهذا الدعاء (إطالة بقائه لأجل أن يسلم، أو لمنفعة الجزية) لأن الدعاء فيهما لا يرجع إلى الذمي. (منحة السلوك في شرح تحفة الملوك ص ٤٥٣، كتاب الجهاد، الفصل الثاني)
জিম্মিকে এই কথা বলা, 'আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘজীবী করুক', জায়েয নেই। কেননা, এতে কুফরের ওপর দীর্ঘজীবিতা চাওয়া হয়। তবে যদি এই নিয়তে এই কথা বলা হয় যে, সে দীর্ঘজীবী হলে ইসলাম গ্রহণ করবে বা জিজিয়া আদায় করবে, তাহলে এই দুই সুরতে তা জায়েজ। কেননা এখানে জিম্মির জন্য দোয়া করা হচ্ছে না। (১০২)

টিকাঃ
৯৫. সুরা তাওবা: ১১৩
৯৬. আল-বাহরুর রায়েক, ১/৩৫০
৯৭. আন-নাহরুল ফায়েক, ১/২২৪
৯৮. আল-মুতাসার মিনাল মুখতাসার, ১/১২১
১০০. রিপ কালচার ও কিছু কথা: বর্তমানে আমাদের সমাজে বড় ভয়ংকর বিকৃত সংস্কৃতি চালু হয়েছে, যেটাকে বলা হয় 'রিপ কালচার'। বিভিন্ন অমুসলিম সেলেব্রেটি মারা গেলে তার মৃত্যুতে শোক জানানো হয় এবং তার জন্য ক্ষমাপার্থনা ও মৃত জীবনে সে যেন ভালো থাকে সে দোয়া করা হয়। এতে বেশ প্রচলিত একটি বাক্য হলো RIP (Rest in peace)। অর্থাৎ ওপারে ভালো থেকো। মুসলিম সন্তানরা এমন ব্যক্তির সম্পর্কে ওপারে ভালো থাকার দোয়া করছে, যে সারাজীবন মানুষের নৈতিকতা ধ্বংসের কাজ করে গেছে। এমন মানুষের ওপারে ভালোর দোয়া করছে, যে জীবনভর আখেরাতে অবিশ্বাস করে গেছে এবং মানুষকে সে অবিশ্বাসের দিকে আহ্বান করে গেছে। এর থেকে বড় আফসোসের বিষয় আর কী হতে পারে! এটা বড়ই দুঃখজনক। আমাদের সন্তানদের এ থেকে আমাদের বিরত রাখা, ইসলামের সঠিক জ্ঞান দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। এই মাসআলাসংক্রান্ত একটি আয়াত লেখক ওপরে পেশ করেছেন। এখানে আমরা এ সংক্রান্ত আরও একটি প্রসিদ্ধ আয়াত ও কয়েকজন ইমামের বক্তব্য দেখব। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ.
আর তাদের মধ্যে কারও মৃত্যু হলে আপনি কক্ষনো তার (জানাজার) নামাজ পড়বেন না এবং তার কবরের সামনে দাঁড়াবেনও না। তারা তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করেছে এবং নাফরমান অবস্থায়ই মারা গেছে। সুরা তাওবা: ৮৪ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট হাম্বলি ফকিহ আল্লামা বাহুতি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১০৫১ হি.) বলেন,
وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ، أن المراد عند أكثر المفسرين : القيام للدعاء والاستغفار. (كشاف القناع، كتاب الجنائز، شروط صلاة الجنازة)
কুরআনের বাণী, 'আপনি তার কবরের সামনে দাঁড়াবেন না', অধিকাংশ মুফাসসিরের নিকট এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, কাফেরদের জন্য দোয়া ও ক্ষমাপার্থনা করার জন্য দাঁড়াবেন না। কাশশাফুল কিনা, ৪/২৪২
সুরা তাওবার ১১৩ নম্বর আয়াতের (যে আয়াতটি মূল লেখক উল্লেখ করেছেন) ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি আল-মালেকি রহিমাহুল্লাহ বলেন, هذه الآية تضمنت قطع موالاة الكفار حيهم وميتهم فإن الله لم يجعل للمؤمنين أن يستغفروا للمشركين فطلب الغفران للمشرك مما لا يجوز. (تفسير القرطبي ٣٧٢/٧، تحت سورة التوبة : آية ۳۱۱، دار الكتب المصرية)
এই আয়াতের মর্মার্থই হলো কাফেরদের সাথে মৃত বা জীবিত সর্বাবস্থায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। সুতরাং কোনো মুশরিকের জন্য ক্ষমাপার্থনা করা নাজায়েজ। তাফসিরে কুরতুবি, ৮/২৭৩ হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম সারাখসি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৪৮৩ হি.) মৃত কাফেরের জন্য দোয়ার বিষয়ে লেখেন, وإذا اختلط موتى المسلمين بموتى الكفار فإن كانت الغلبة للمسلمين غسلوا وصلي عليهم إلا من عرف أنه كافر لأن الحكم للغلبة والمغلوب لا يظهر حكمه مع الغالب وإن كانت الغلبة لموتى الكفار لا يصلى عليهم إلا من عرف أنه مسلم بالسيما فإذا استويا لم يصل عليهم عندنا لأن الصلاة على الكفار منهي عنها. (المبسوط ٤٥/٢، كتاب الصلاة، باب الشهيد، دار الكتب العلمية)
...আমাদের নিকট কাফেরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা নিষেধ। আল-মাবসুত, ২/৫৪ একটি সংশয় ও তার জবাব: যখন কোনো স্পষ্ট কাফের বা দ্বীনবিদ্বেষী মৃত্যুবরণ করে আর কিছু মানুষ 'ওপারে ভালো থাকবেন' এমন আবেগঘন বক্তব্য দিতে থাকে, তখন আলেম-উলামা ও দ্বীনদার শ্রেণি 'এমন কাজ করা ইসলামে নাজায়েজ, কাফেরের প্রতি এভাবে ভালোবাসা প্রকাশ ঈমানের জন্য ক্ষতিকর' বলে সতর্ক করে, তখন একদল সেকুলার রাম-বাম আর ঈমানহীন বুদ্ধিজীবী অথবা অজ্ঞ মুসলিমদের খুবই আবেগতাড়িত সুরে বলতে দেখা যায়, 'সে কাফের হলেও একজন মানুষ তো! একজন মানুষের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা কেন সমস্যা! কেন একজন মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে এভাবে বলা হবে, সে জাহান্নামি! ধর্ম কি এভাবে অমানবিকতা শিক্ষা দেয়!'
সেকুলার আর লিবারেল নফসের পূজারি বুদ্ধিজীবীদের এই বক্তব্যে অনেক মুসলমানই বিভ্রান্ত হয়! তারাও তাদের সাথে সুর মিলায়। অথচ একটু ভালো করে লক্ষ করলেই দেখা যায়, 'মানবতা' বলে চিৎকার দিয়ে ভালোবাসার যে মাপকাঠি ঠিক করে তারা ইসলামের স্পষ্ট বিধানকে পেছনে টেলে দিচ্ছে, মানবতা নামক এই মাপকাঠি শুধুই ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। সময়ে সময়ে এই সেকু-লিবারেলদের এই মানবতা নামক মিথ্যা মাপকাঠির চেহারা থেকে পর্দা খসে পড়ে। একটি ছোট্ট উদাহরণ দেখা যাক। কিছুদিন পূর্বে (১৪ আগস্ট ২০২৩ খ্রি.) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আল্লামা সাঈদী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তখন এ দেশের শাহবাগী, জাতীয়তাবাদী, লিবারেল ও সেকুলার লোকেরা আনন্দে-উল্লাসে ফেটে পড়ে! শুধুই কি উল্লাস! বরং তার মৃত্যুতে কেউ শোক প্রকাশ করলে তার সাথে ঘৃণ্য আচরণ করতেও এরা দ্বিধাবোধ করেনি। আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুতে (এমন আরও অসংখ্য ঘটনায়) তারা কিন্তু মানবিকতার বয়ান নিয়ে হাজির হচ্ছে না। সাঈদীকে একজন মানুষ হিসাবে তারা কল্পনা করতে পারছে না! তারা মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর ঘৃণার কিন্তু আরেকটি মূল্যবোধ ও মাপকাঠি নিয়ে আসছে, তা হলো একাত্তরের রাজাকার! অর্থাৎ একজন মানুষ মানুষ হওয়ার পরেও যখন তাকে রাজাকার বলে ধরে নেওয়া হবে, জীবদ্দশায় তো তাকে ভালোবাসার প্রশ্নই ওঠে না, মৃত্যুবরণ করার পরেও তাকে ঘৃণা করতে হবে, তার প্রতি সামান্য ভালোবাসা দেখানো দেশের সাথে গাদ্দারির শামিল বলে ধর্তব্য হবে! তার অপকর্মগুলো মানুষকে স্পষ্ট করতে হবে, যেন মানুষ তাকে ভালো না বাসে। এমনকি এই বিষয়ে ন্যূনতম কোনো ছাড় নেই।
এতে স্পষ্টই যে, সেকুলাঙ্গার আর জাতীয়তাবাদীদের নিকট একজন মানুষ মানুষ হওয়ার পরেও তাকে ভালোবাসা ও ঘৃণার ভিন্ন মাপকাঠি রয়েছে। আর তাতে তাদের রয়েছে জিরো টলারেন্স! এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই! এই হলো মানুষের বানানো মাপকাঠির দ্বিচারিতা ও ধোঁকাবাজি।
জি, ঠিক এমনই ইসলামেরও রয়েছে মানুষ মানুষ হওয়ার পরেও তাকে ভালোবাসা ও ঘৃণা করার ভিন্ন একটি মাপকাঠি। আর তা হলো ঈমান-কুফর। একজন মানুষের ব্যাপারে যখন এটা প্রমাণিত হবে যে সে মুসলিম, এতটুকুই যথেষ্ট তার প্রতি আমার ভালোবাসা থাকার। অপরদিকে কারও ব্যাপারে যদি এটা প্রমাণিত হয় যে সে কাফের, এতটুকুই যথেষ্ট সে মানুষ হিসাবে যেমনই হোক তাকে ঘৃণা করার, তাকে শত্রু বিবেচনা করার। যেখানে কোনো দ্বিচারিতা নেই, নেই কোনো ধোঁকাবাজি।
যখন দুটি মতাদর্শেরই মানুষকে ভালোবাসা আর ঘৃণার আলাদা মূল্যবোধ আর মূল্যায়নের মাপকাঠি আছে, সেখানে ইসলামেরটা উগ্রতা আর সেকুলার-লিবারেলেরটা মানবতা! এটা কি দ্বিচারিতা নয়! এটা কি ধোঁকাবাজি নয়! (আব্দুল্লাহ)
১০১. তাবয়িনুল হাকায়েক, ৬/৩০
১০২. মিনহাতুস সুলুক, পৃ. ৩৫৪

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 কাফেরের সালাম দেওয়া

📄 কাফেরের সালাম দেওয়া


সালাম মূলত একটি ব্যাপক অর্থবোধক একটি দোয়া। মুহাব্বত ও সম্মান প্রকাশেরও একটি বড় মাধ্যম। আর কাফেররা এই দুটির কোনোটিরই অধিকার রাখে না। তাই অমুসলিমকে প্রথমে আগে বেড়ে সালাম দেওয়া মাকরুহ। তবে সে যদি সালাম দেয়, তাহলে মুসলমানরা শুধু 'ওয়া আলাইকা' (তোমার ওপরও) এতটুকুই বলবে। ইমাম কাসানি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৫৮৭ হি.) বলেন,
ويكره الابتداء بالتسليم على اليهودي والنصراني لأن السلام اسم لكل بر وخير ولا يجوز مثل هذا الدعاء للكافر إلا أنه إذا سلم لا بأس بالرد عليه مجازاة له ولكن لا يزيد على قوله وعليك لما روي عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه قال «إن اليهود إذا سلم عليكم أحدهم فإنما يقول السام عليكم فقولوا وعليك». (بدائع الصنائع ٨٢١/٥، کتاب الاستحسان)
ইহুদি ও খ্রিষ্টানকে প্রথমেই সালাম দেওয়া মাকরুহ। কেননা সালাম সকল নেকি ও কল্যাণের দোয়ার নাম। আর কাফেরদের জন্য এমন দোয়া করা জায়েয নেই। তবে কাফের সালাম দিলে তার জবাব দেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। তবে জবাবে শুধুই 'ওয়া আলাইকা' বলতে হবে, এর বেশি নয়। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কোনো ইহুদি সালাম দিলে সে বলে, আসসামু আলাইকুম (অর্থ: তোমাদের ওপর ধ্বংস আসুক)। তখন তোমরা বলবে, ওয়া আলাইকা (অর্থ: তোমাদের ওপরও)। (১০৩)

টিকাঃ
১০৩. বাদায়েউস সানায়ে, ৫/১২৮

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 কাফেরের অর্থ দিয়ে সাহায্য করা

📄 কাফেরের অর্থ দিয়ে সাহায্য করা


জাকাত শুধু মুসলমানকেই দেওয়া যাবে, যারা জাকাত খাওয়ার উপযুক্ত। কোনো কাফেরকে জাকাত দেওয়া বৈধ নয়। তবে জাকাত ছাড়া অন্যান্য যত সদকা রয়েছে, তা ওয়াজিব সদকাই হোক না কেন, তা যেমন মুসলমানদের দেওয়া জায়েজ, তেমনই জিম্মি কাফেরদের দেওয়াও জায়েজ। আর হারবি কাফেরকে কোনো ধরনের সদকা দেওয়া জায়েয নেই। কেননা তাদের সাথে উত্তম আচরণ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তাবয়িনুল হাকায়েক গ্রন্থে রয়েছে,
( وصح غيرها ) أي صح دفع غير الزكاة من الصدقات إلى الذي كصدقة الفطر والكفارات وقال أبو يوسف والشافعي لا يجوز ... والحربي خارج بالنص. (تبيين الحقائق ۰۰۳/۱، كتاب الزكاة، باب المصرف)
জাকাত ব্যতীত অন্যান্য সদকা কাফেরদের দেওয়া জায়েজ। যেমন সদকাতুল ফিতর, বিভিন্ন কাফফারা। ইমাম আবু ইউসুফ ও শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ এটাকে নাজায়েয বলেছেন। আর হারবি কাফেরের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে তারা এই হুকুমের বাহিরে থাকবে। (অর্থাৎ তাদেরকে কোনো ধরনের সদকার টাকাও দেওয়া যাবে না।) (১০৪)
'হিদায়া' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,
ولا يجوز أن يدفع الزكاة إلى ذمي... ويدفع إليه ما سوى ذلك من الصدقة. (الهداية، كتاب الزكاة، باب من يجوز دفع الصدقة إليه ومن لا يجوز)
কোনো জিম্মিকে জাকাত দেওয়া জায়েয নেই। তবে অন্যান্য সদকা দেওয়া যাবে। (১০৫)

টিকাঃ
১০৪. তাবয়িনুল হাকায়েক, ১/৩০০
১০৫. হিদায়া, ১/১১১

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 কাফেরের গিবত করা

📄 কাফেরের গিবত করা


কাফের দুই প্রকার। এক. জিম্মি। দুই. হারবি। জিম্মি হলো ওই সমস্ত কাফের যারা ইসলামি ভূখণ্ডে জিজিয়া-কর দিয়ে ইসলামি আইনের অধীনে থাকতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। আর হারবি হলো যারা কুফরি রাষ্ট্রে বসবাস করে। জিম্মি কাফেরের গিবত করা নাজায়েজ। কেননা তার জানমাল ও ইজ্জত সকল বিষয় তেমনই নিরাপদ যেমন মুসলমানের জানমাল ও ইজ্জত। তবে হারবি কাফেরের গিবত হারাম নয়। কেননা, কুফরি অবলম্বন ও কুফরি ভূখণ্ডে বসবাসের কারণে তার জানমালের যেখানে নিরাপত্তা নেই, সেখানে তার ইজ্জত কীভাবে নিরাপদ হবে!
তবে এখানে মনে রাখতে হবে, হারবি কাফেরের গিবতে যদি কোনো উল্লেখযোগ্য ফায়েদা না থাকে, তাহলে তা থেকেও বিরত থাকা চাই। কেননা, এক তো হলো, এতে সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্যই হলো সে অনর্থক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। দ্বিতীয়ত, গিবত অন্যান্য অভ্যাসের মতোই মানুষের স্বভাবের সাথে মিশে যায়। একবার মানুষের নফস গিবতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক কঠিন।
নাহরুল ফায়েক গ্রন্থে রয়েছে,
لا خفاء في منع غيبة الذمي. (النهر الفائق ٨٤٤/٣، كتاب البيوع، باب البيع الفاسد)
জিম্মিদের গিবত করা নাজায়েয এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।(১০৬)
ইবনে হাজার হাইতামি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৯৭৪ হি.) লেখেন,
وسئل الغزالي في فتاويه عن غيبة الكافر. فقال : هي في حق المسلم محذورة لثلاث علل : الإيذاء وتنقيص خلق الله، فإن الله خالق لأفعال العباد، وتضييع الوقت بما لا يعني. قال : والأولى تقتضي التحريم، والثانية الكراهة، والثالثة خلاف الأولى. وأما الذي فكالمسلم فيما يرجع إلى المنع من الإيذاء؛ لأن الشرع عصم عرضه ودمه وماله... وأما الحربي فليس بمحرم على الأولى ويكره على الثانية والثالثة. (الزواجر في اقتراف الكبائر ۷۲/۲، كتاب النكاح، الكبيرة الثامنة والتاسعة والأربعون بعد المائتين الغيبة والسكوت عليها)
ইমাম গাজালি রহ.-কে কাফেরদের গিবত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, মুসলমানদের ব্যাপারে গিবত করা তিন কারণে নিষিদ্ধ। এক. কষ্ট দেওয়া। দুই. আল্লাহর সৃষ্টির দোষ তালাশ করে তার সম্মানকে খাটো করা। কেননা আল্লাহই তো বান্দার সকল কাজের স্রষ্টা। তিন. অনর্থক কাজে সময় অপচয় করা। প্রথম কারণটি পাওয়া গেলে গিবত হারাম হবে। দ্বিতীয় কারণ পাওয়া গেলে মাকরুহ আর তৃতীয় কারণ পাওয়া গেলে অনুত্তম হবে। জিম্মিদের কষ্ট দেওয়া মুসলমানদের মতোই হারাম। কেননা, ইসলাম তাদের জীবনকে তেমনই নিরাপত্তা দিয়েছে, যেমন মুসলমানের জীবনকে দিয়েছে। হারবি কাফেরদের গিবত প্রথম প্রকারের কারণে হারাম হবে না। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকারের কারণে মাকরুহ হবে।(১০৭)
হজরত আবদুল হাই লাখনবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১৩০৬ হি.) ‘গিবাত কিয়া হ্যায়' এই নামে গিবত বিষয়ে সকলের জন্য উপকারী চমৎকার একটি কিতাব রচনা করেন। সেখানে লেখেন, দ্বিতীয় হলো জিম্মির গিবত করা। জিম্মি বলা হয় ওই সকল কাফেরকে, যারা দারুল ইসলামে অধীনস্থ হয়ে বসবাস করে। এই গিবতও হারাম। কেননা, যখন কাফের মুসলমানদের অধীনস্থ হয়ে গেল তখন তারও জানমাল ও ইজ্জত মুসলমানদের মতোই নিরাপদ ধরা হবে। তৃতীয় হলো হারবি কাফেরের গিবত। অর্থাৎ যে-সকল কাফের ইসলামি রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করেনি। ফিকহের কিতাব থেকে যা বোঝা যায় তা হলো, তাদের গিবত করা হারাম নয়। (১০৮)
গিবত নাজায়েয হওয়ার একটি অন্যতম কারণ হলো গিবতের মাধ্যমে ব্যক্তির ইজ্জতকে নষ্ট করা হয়। আর কাফেরদের গিবতের অনুমতি দ্বারা তাদের ইজ্জত রক্ষার বিষয়টিও অনুমেয়।

টিকাঃ
১০৬. আন-নাহরুল ফায়েক, ৩/৪৪৮
১০৭. আয-যাওজের আন ইকতিরাফিল কাবায়ের, ২/২৭
১০৮. গিবাত কিয়া হ্যায়, পৃ. ১৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00