📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 ইসলামি ভূখণ্ডে অমুসলিমদের উপাসনালয় তৈরির বিধান

📄 ইসলামি ভূখণ্ডে অমুসলিমদের উপাসনালয় তৈরির বিধান


ইসলামি ভূখণ্ডে অমুসলিমদের ইবাদতখানা, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি তৈরি করা জায়েয নেই। চাই তারা ইহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, অথবা যেকোনো ধরনের কাফেরই হোক না কেন। (৭৪) কেননা, এই সকল ইবাদতখানায় আল্লাহর সাথে শিরক করা হয়, ইসলামি দৃষ্টিতে এগুলো উপাসনালয় বলারও উপযুক্ততা রাখে না। ইসলামি শাসনের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য যেহেতু মুসলমানদের দ্বীন ও ঈমান রক্ষার সর্বাত্মক ব্যবস্থা করা এবং যেখানেই ঈমানের ওপর কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে সেগুলোকে সম্ভাব্য সকল উত্তম পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করে দূর করার ব্যবস্থা করা; সাথে অমুসলিম জিম্মিরা যেন মুসলমান ও ইসলামি অনুপম শিক্ষাকে সঠিকভাবে কাছে থেকে দেখার সুযোগ পায় এবং স্বেচ্ছায় ইসলাম ও মুসলমানকে বুঝতে পারে সেটা নিশ্চিত করা; এইজন্য ইসলামের শিয়ারগুলোকে বিজয়ী রাখা অত্যন্ত জরুরি। ইসলামি প্রতীকগুলোর সাথে কুফর ও শিরকের কেন্দ্রগুলোকে রাখার কোনো নৈতিক কারণ নেই। তাই ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠিত ভূখণ্ডে অমুসলিমদের উপাসনালয় তৈরির বিষয়টি কিছু ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।
ক. জাযিরাতুল আরবের (৭৫) মাঝে কোনো অমুসলিমের বসবাস করারই অধিকার নেই। তাই সেখানে তাদের উপাসনালয় তৈরির প্রশ্নই আসে না।
খ. জাযিরাতুল আরবের বাহিরে অন্যান্য ইসলামি ভূখণ্ডে অমুসলিমদের নতুন কোনো উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করা জায়েয নয়। হ্যাঁ, যদি কোনো পুরাতন উপাসনালয় থাকে, উদাহরণত, কোনো কুফরি ভূখণ্ড মুসলমানরা বিজয় করে নেয় আর সেখানে পূর্ব থেকেই অমুসলিমদের উপাসনালয় থেকে থাকে, এখন ইসলামي শাসনের অধীনে আসার পর জিম্মিদের বসতি সেখানে বেশি থাকে, তাহলে পুরাতন সে উপাসনালয়সমূহ মেরামত করা যাবে।
গ. উপরিউক্ত বিধান শহর ও গ্রাম সবখানেই প্রযোজ্য হবে। কিছু কিতাবে ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, গ্রামে যদি জিম্মিরা নতুন কোনো উপাসনালয় তৈরি করতে চায়, তাহলে সে সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অসংখ্য দলিলের বিপরীত হওয়ার কারণে এই বক্তব্যটিকে ফকিহগণ দুর্বল ও অপ্রাধান্যযোগ্য আখ্যায়িত করেছেন। আর যে-সকল ফকিহ এই বক্তব্যটিকে ইমাম আবু হানিফা থেকে প্রমাণিত মনে করেছেন, তারা এর একটি উপযোগী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, গ্রাম দ্বারা শুধুই জিম্মি বসবাস করে এমন গ্রাম উদ্দেশ্য, যেখানে ইসলামের প্রতীক বিজয়ী নয়। যাইহোক, এই বর্ণনা দিয়ে মুসলমানদের সাধারণ শহরে বা গ্রামে অমুসলিমদের উপাসনালয় তৈরির বিষয়ে দলিল পেশ করা সঠিক হবে না।
ঘ. যে-সকল জায়গায় উপাসনালয় মেরামতের অনুমতি রয়েছে সেখানে উদ্দেশ্য হলো, কাফেররা যদি নিজেদের ইবাদতখানা মেরামত করাতে চায়, তাহলে সে সুযোগ রয়েছে। মুসলিম শাসক তা থেকে তাদের বাধা দেবে না। কিন্তু ইসলামি শাসকের সেগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া বা সে কাজে সহযোগিতা করা জায়েয হবে না।
'তাবয়িনুল হাকায়েক' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,
قال رحمه الله (ولا تحدث بيعة ولا كنيسة في دارنا) لقوله عليه الصلاة والسلام لا خصاء في الإسلام ولا كنيسة ... والمراد بالنهي عن الكنيسة إحداثها، أي لا تحدث في دار الإسلام كنيسة في موضع لم تكن فيه وبيت النار كالكنيسة....
قال رحمه الله ( ويعاد المنهدم من الكنائس والبيع القديمة) لأنه جرى التوارث من لدن رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى يومنا هذا بترك الكنائس في أمصار المسلمين، ولا يقوم البناء دائما، فكان دليلا على جواز الإعادة، ولأن الإمام لما أقرهم عهد إليهم الإعادة، لأن الأبنية لا تبقى دائما، ولا يمكنون من نقلها إلى موضع آخر، لأنه إحداث في ذلك الموضع في الحقيقة، والصومعة بمنزلة الكنيسة، لأنها تبنى للتخلي للعبادة كالكنيسة، بخلاف موضع الصلاة في البيت، لأنه تبع للسكنى، وهذا في الأمصار دون القرى، لأن الأمصار هي التي تقام فيها شعائر الإسلام، فلا يعارض بإظهار ما يخالفها، ولهذا يمنعون من بيع الخمر والخنازير وضرب الناقوس خارج الكنيسة في الأمصار لما قلنا، ولا يمنعون من ذلك في قرية لا تقام فيها الجمع والحدود، وإن كان فيها عدد كثير لأن شعائر الإسلام فيها غير ظاهرة، وقيل : يمنعون في كل موضع لم تشع فيه شعائرهم، لأن في القرى بعض الشعائر فلا تعارض بإظهار ما يخالفها من شعائر الكفر، والمروي عن أبي حنيفة، كان في قرى الكوفة لأن أكثر أهلها أهل الذمة، وفي أرض العرب يمنعون من ذلك كله ولا يدخلون فيها الخمر والخنازير، ويمنعون من اتخاذها المشركون مسكنا لما روي عن ابن عباس رضي الله عنهما «أنه عليه الصلاة والسلام قال في مرضه الذي مات فيه : أخرجوا المشركين من جزيرة العرب رواه أحمد والبخاري ومسلم، وعن عمر رضي الله عنه أنه سمع رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول لأخرجن اليهود والنصارى من جزيرة العرب حتى لا أدع فيها إلا مسلما رواه أحمد ومسلم والترمذي وصححه، وعن عائشة رضي الله عنها أنها قالت آخر ما عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم أن قال «لا يترك بجزيرة العرب دينان». وعن أبي عبيدة بن الجراح أنه قال آخر ما تكلم به رسول الله صلى الله عليه وسلم أخرجوا يهود أهل الحجاز وأهل نجران من جزيرة العرب رواهما أحمد، وأجلى عمر اليهود والنصارى من أرض الحجاز فيما رواه البخاري. (تبيين الحقائق ۹۷۲/۳، كتاب السير، باب العشر والخراج، فصل في الجزية)
ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের উপাসনালয় আমাদের ভূখণ্ডে (দারুল ইসলামে) নতুন তৈরি করতে দেওয়া হবে না। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'ইসলামে পুরুষের জন্য অণ্ডকোষ কর্তন করা এবং (ইসলামের ভূমিতে) গির্জা তৈরি করা বৈধ নয়।' গির্জা তৈরির নিষেধাজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, 'নতুন তৈরি করা যাবে না।' অর্থাৎ ইসলামি ভূখণ্ডে পূর্বে ছিল না এমন কোনো স্থানে নতুন গির্জা তৈরি করা যাবে না। অগ্নিপূজকদের উপাসনালয়ের হুকুমও গির্জার মতোই। যে পুরাতন গির্জাগুলো ভেঙে যাবে, সেগুলোকে মেরামত ও নতুন করে তৈরি করা যাবে। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আজ পর্যন্ত এটাই মুসলমানদের কর্মপন্থা ছিল, পুরাতন গির্জাগুলোকে তারা অক্ষত রেখেছেন। যেহেতু ভবন সর্বদা ঠিক থাকে না (তাতে নির্মাণজনিত বিভিন্ন ত্রুটি তৈরি হয়), তাই এটা এ কথার দলিল যে, গির্জার ভবন পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করতে দেওয়া হবে। কেননা যখন মুসলিম শাসক গির্জাগুলোকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছেন, এর অর্থ তিনি এই অনুমতিও দিয়েছেন যে এগুলোর পুনর্নির্মাণ করা যাবে।(৭৬)
তবে গির্জা এক স্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যাবে না। কেননা তা মূলত নতুন নির্মাণের অন্তর্ভুক্ত। (আর ইসলামি ভূখণ্ডে নতুন গির্জা নির্মাণ জায়েয নেই।) পাদরির আশ্রম বা মঠ গির্জার হুকুমে। কেননা সেগুলো মূলত গির্জার মতোই উপাসনার জন্য তৈরি করা হয়। তবে ঘরের কোণে ব্যক্তিগত উপাসনালয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানের হুকুম ভিন্ন। কেননা তা মূলত ঘরেরই অনুগামী হয়। (তাই অমুসলিমরা যেমন নিজেদের জন্য নতুন ঘর তৈরি করতে পারবে, তেমনই ঘরের সাথে ব্যক্তিগত উপাসনালয়ও তৈরি করতে পারবে)।... ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ থেকে গ্রামে উপাসনালয় তৈরির যে বক্তব্যটি বলা হয়, তা হলো কুফার ওই গ্রামের বিষয়ে, যেখানে অধিকাংশ অধিবাসী জিম্মি।
জাযিরাতুল আরবের মাঝে ওপরের সবকিছু থেকেই নিষেধ করা হবে, কাফেররা সেখানে মদ বা শূকর নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। মুশরিকরা সেখানে বসবাসের জন্য থাকতে পারবে না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে বলেছেন, 'মুশরিকদের আরবের ভূখণ্ড থেকে বের করে দাও।' ইমাম আহমাদ, বুখারি ও মুসলিম রহিমাহুল্লাহ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হজরত উমর রা. বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'অবশ্যই আমি পুরো আরবের ভূখণ্ড থেকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানকে বের করে দেবো। শুধু মুসলমানদেরকেই এখানে (অধিবাসী হিসাবে) রাখব।' হাদিসটি ইমাম আহমাদ, মুসলিম ও তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ অসিয়ত এটা ছিল যে, 'আরবের ভূখণ্ডে দুই ধর্মকে রাখা যাবে না।' হজরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ যে কথাটি বলেছেন তা হলো, 'মদিনা ও নাজরানের ইহুদিদের আরব থেকে বের করে দাও।' শেষোক্ত দুটি হাদিস ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। সহিহ বুখারির বর্ণনানুযায়ী হজরত উমর রা. তার শাসনামলে আরব থেকে সকল ইহুদি ও খ্রিষ্টানকে বের করে দিয়েছেন।(৭৭)
'আদ-দুররুল মুখতার' গ্রন্থে রয়েছে,
(ولا) يجوز أن (يحدث بيعة، ولا كنيسة ولا صومعة، ولا بيت نار، ولا مقبرة) ولا صنما حاوي (في دار الإسلام) ولو قرية في المختار فتح. (ويعاد المنهدم) أي لا ما هدمه الإمام، بل ما انهدم أشباه في آخر الدعاء برفع الطاعون.
দারুল ইসলামে ইহুদিদের উপাসনালয়, গির্জা, পাদরিদের মঠ, অগ্নিপূজকদের উপাসনালয়, অমুসলিমদের কবরস্থান এবং মূর্তি বানানো জায়েয নেই। অগ্রাধিকারযোগ্য বক্তব্য হলো, শহরের মতো গ্রামেও এগুলো করা যাবে না। পুরাতন উপাসনালয় যেগুলো ভেঙে গেছে, সেগুলোর নবনির্মাণ করা যাবে। অর্থাৎ, যেগুলো দুর্যোগে নিজে থেকেই ভেঙে গেছে। মুসলিম শাসক যেগুলো ভেঙেছে সেগুলোর পুনর্নির্মাণ করা যাবে না।
শামি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১২৫৮ হি.) এই কথার ব্যাখ্যায় লেখেন,
مطلب لا يجوز إحداث كنيسة في القرى ومن أفتى بالجواز فهو مخطئ ويحجر عليه قوله ولو قرية في المختار) نقل تصحيحه في الفتح عن شرح شمس الأئمة السرخسي في الإجارات ثم قال : إنه المختار، وفي الوهبانية إنه الصحيح من المذهب الذي عليه المحققون إلى أن قال : فقد علم أنه لا يحل الإفتاء بالإحداث في القرى لأحد من أهل زمامنا بعدما ذكرنا من التصحيح والاختيار للفتوى وأخذ عامة المشايخ ولا يلتفت إلى فتوى من أفتى بما يخالف هذا، ولا يحل العمل به ولا الأخذ بفتواه، ويحجر عليه في الفتوى ويمنع لأن ذلك منه مجرد إتباع هوى النفس وهو حرام لأنه ليس له قوة الترجيح، لو كان الكلام مطلقا فكيف مع وجود النقل بالترجيح والفتوى فتنبه لذلك، والله الموفق. مطلب تهدم الكنائس من جزيرة العرب ولا يمكنون من سكناها قال في النهر : والخلاف في غير جزيرة العرب، أما هي فيمنعون من قراها أيضا لخبر لا يجتمع دينان في جزيرة العرب» . اهـ قلت : الكلام في الإحداث مع أن أرض العرب لا تقر فيها كنيسة ولو قديمة فضلا عن إحداثها لأنهم لا يمكنون من السكنى بها للحديث المذكور كما يأتي وقد بسطه في الفتح وشرح السير الكبير وتقدم تحديد جزيرة العرب أول الباب المار. (رد المحتار، كتاب الجهاد، فصل في الجزية، مطلب في أحكام الكنائس)
'গ্রহণযোগ্য মত হলো গ্রাম হলেও করা যাবে না', 'ফাতহুল কাদির' গ্রন্থে ইমাম সারাখসির উদ্ধৃতিতে এই মতটির বিশুদ্ধতা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর ইবনুল হুমাম রহিমাহুল্লাহ বলেন, এটাই গ্রহণযোগ্য মত। 'ওয়াহবানিয়্যাহ' গ্রন্থে রয়েছে, এটাই হলো সঠিক মাজহাব। মুহাক্কিকগণ এই মতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। তিনি তো এটাও বলেছেন যে, অধিকাংশ আলেম এই মতটিই গ্রহণ করেছেন এবং একেই বিশুদ্ধ মাজহাব বলে উল্লেখ করেছেন, এরপর আর বর্তমান সময়ের কোনো আলেমের জন্য দারুল ইসলামের গ্রামগুলোতে নতুন করে অমুসলিমদের উপাসনালয় বানানো জায়েজের ফাতাওয়া দেওয়া বৈধ হবে না। কেউ যদি এখন এর বিপরীত মতের ফাতাওয়া দেয়, তাহলে তার ওপর আমল করা বা তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ নেই। যে এমন ফাতাওয়া দেবে তার ফাতাওয়ার ওপর আমল করা বৈধ হবে না এবং এমন ব্যক্তিকে ফাতাওয়া দেওয়ার কাজ থেকে বিরত রাখা হবে। কেননা সে শুধু প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ে এমন ফাতাওয়া দিয়ে থাকবে। আর প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ে ফতোয়া দেওয়া হারাম। কারণ, যদি প্রাধান্য দেওয়া ছাড়া স্বাভাবিকভাবেই এই মতটি উল্লেখ করা হতো, তবুও এমন ব্যক্তির তারজিহ দেওয়ার মতো যোগ্যতা নেই। তাহলে ফুকাহায়ে কেরামের স্পষ্ট তারজিহ ও ফতোয়া থাকার পরেও তার ফতোয়া কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সুতরাং, এ ব্যাপারটিতে সতর্ক থাকো। আর আল্লাহ তাআলাই তাওফিকদাতা...
'আন-নাহরুল ফায়েক' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, এই ইখতেলাফ আরবের ভূমির ক্ষেত্রে নয়। সেখানে গ্রামেও গির্জা বানানো জায়েয নেই। হাদিসে উল্লেখ আছে, দুই ধর্ম আরবের ভূমিতে একসাথে হতে পারবে না। শামি রহিমাহুল্লাহ বলেন, ওপরে যে ইখতেলাফ তা মূলত নতুন গির্জা বানানোর ক্ষেত্রে। আর আরবের ভূমিতে তো গির্জা ইত্যাদি অক্ষত রাখাই জায়েয নেই, চাই তা পুরাতনই হোক কেন, তাহলে সেখানে নতুন গির্জা তৈরির তো প্রশ্নই ওঠে না। কেননা পূর্বে হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে যে, কাফেররা আরবের ভূমিতে থাকতে পারবে না। (৭৮)
ইমাম শামি রহিমাহুল্লাহ অপর এক জায়গায় লেখেন,
ذكر الشرنبلالي في رسالة في أحكام الكنائس عن الإمام السبكي أن معنى قولهم لا نمنعهم من الترميم ليس المراد أنه جائز نأمرهم به بل بمعنى نتركهم وما يدينون فهو من جملة المعاصي التي يقرون عليها كشرب الخمر ونحوه ولا نقول : إن ذلك جائز لهم، فلا يحل للسلطان ولا للقاضي أن يقول لهم افعلوا ذلك ولا أن يعينهم عليه، ولا يحل لأحد من المسلمين أن يعمل لهم فيه، ولا يخفى ظهوره وموافقته لقواعدنا. (رد المحتار، كتاب الجهاد، فصل في الجزية، مطلب في أحكام الكنائس)
ইমাম শুরুনবুলালি রহিমাহুল্লাহ অমুসলিমদের উপাসনালয়ের বিধানসংক্রান্ত যে পুস্তিকা রচনা করেছেন তাতে সুবকি রহিমাহুল্লাহ থেকে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন, 'পুরাতন গির্জা নতুন করে নির্মাণে নিষেধ করা হবে না'- এটার উদ্দেশ্য এই নয় যে, এই কাজটি একটি জায়েয কাজ, যার আদেশ আমরা তাদের করব। এটার উদ্দেশ্য হলো, আমরা তাদেরকে তাদের ধর্মমত অনুযায়ী চলতে ছেড়ে দিচ্ছি। মদ ইত্যাদি খাওয়ার মতোই এটাও একটি গোনাহের কাজ। আমরা এটা বলব না যে, এগুলো তাদের জন্য জায়েয ও নৈতিক। সুতরাং কোনো মুসলিম শাসক বা বিচারপতির জন্য অমুসলিমদের পুরাতন গির্জা পুনর্নির্মাণের আদেশ করা এবং তাতে সহযোগিতা করা জায়েয হবে না। কোনো মুসলমানের জন্য সেখানে কাজ করা জায়েয হবে না। আর এটা একদমই স্পষ্ট বিষয়, যাতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। আর ইমাম সুবকির এই বক্তব্য আমাদের মাজহাবের মূলনীতির সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।(৭৯)
ইমাম মাওয়ারদি রহিমাহুল্লাহ ইসলামي শাসননীতি সংক্রান্ত 'আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ' গ্রন্থে লেখেন,
ولا يجوز أن يحدثوا في دار الإسلام بيعة ولا كنيسة، فإن أحدثوها هدمت عليهم، ويجوز أن يبنوا ما استهدم من بيعهم وكنائسهم العتيقة. (الأحكام السلطانية ص ٧٢٢ ، الباب الثالث عشر : في وضع الجزية والخراج)
দারুল ইসলাম-ইসলামি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত অঞ্চলে অমুসলিমদের উপাসনালয় নতুন করে তৈরি করা জায়েয নেই। যদি তারা নতুন নির্মাণ করে, তাহলে তা ভেঙে ফেলতে হবে। তবে পুরাতন উপাসনালয় ভেঙে গেলে তার পুনর্নির্মাণ করা যাবে।(৮০)

টিকাঃ
৭৪. যেমন কাদিয়ানি বা গোঁড়া রাফেজিদের মসজিদের নামে নিজেদের ইবাদতখানা, বাহায়ি বা হিজবুত তাওহিদের কোনো ধর্মশালা ইত্যাদি। (আব্দুল্লাহ)
৭৫. জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপের সীমানা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বৃহৎ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। উত্তরে: ইরাক এবং জর্ডান। উত্তর-পূর্বে: কুয়েত। পূর্বে: কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন (যা সউদি আরবের সাথে কিং ফাহদ সেতু দ্বারা সংযুক্ত)। দক্ষিণে: ইয়েমেন। দক্ষিণ-পূর্বে : ওমান। পশ্চিমে: লোহিত সাগর। (আব্দুল্লাহ)
৭৬. পুরাতন গির্জা পুনর্নির্মাণের বিষয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য। এক. পুরাতন গির্জা যদি কোনো দুর্যোগে ভেঙে যায় বা পুরাতন হয়ে তার অবকাঠামো ধসে পড়ে, তাহলে তার পুনর্নির্মাণ করা যাবে। কিন্তু যদি মুসলিম শাসক তা কোনো কারণে ভেঙে ফেলে বা বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেটা পুনর্নির্মাণ করা জায়েয নেই। কেউ যদি এমনটা করে তাহলে সে মুসলিম শাসককে ছোট করল, ইসলামের বদলে কুফরকে সাহায্য করল। তাই তাকে এর জন্য শাস্তি দেওয়া হবে। শামি রহিমাহুল্লাহ লেখেন,
(قوله أشباه) حيث قال في فائدة نقل السبكي الإجماع على أن الكنيسة إذا هدمت ولو بغير وجه لا يجوز إعادتها ذكره السيوطي في حسن المحاضرة. قلت : يستنبط منه أها إذا قفلت، لا تفتح ولو بغير وجه كما وقع ذلك في عصرنا بالقاهرة في كنيسة بحارة زويلة قفلها الشيخ محمد بن إلياس قاضي القضاة، فلم تفتح إلى الآن حتى ورد الأمر السلطاني بفتحها فلم يتجاسر حاكم على فتحها، ولا ينافي ما نقله السبكي قول أصحابنا يعاد المنهدم لأن الكلام فيما هدمه الإمام لا فيما تهدم فليتأمل. اهـ قال الخير الرملي في حواشي البحر أقول : كلام السبكي عام فيما هدمه الإمام وغيره في كلام الأشباه يخص الأول. والذي يظهر ترجيحه العموم لأن العلة فيما يظهر أن في إعادتها بعد هدم المسلمين استحفافا بهم، وبالإسلام وإخمادا لهم وكسرا لشوكتهم، ونصرا للكفر وأهله غاية الأمر أن فيه افتياتا على الإمام فيلزم فاعله التعزير. (رد المحتار، كتاب الجهاد، فصل في الجزية، مطلب إذا هدمت الكنيسة ولو بغير وجه لا تجوز إعادتها)
দুই. পুরাতন গির্জা পুনর্নির্মাণের সময় ঠিক ততটুকুই নির্মাণ করতে পারবে, যা পূর্বে ছিল। পূর্বের অবকাঠামো থেকে বাড়ানো যাবে না, বা আরও জাঁকজমক করে করা যাবে না। আল্লামা শিলবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১০২১ হি.) লেখেন,
وقوله القديمة أي على قدر البناء الأول ويمنع من الزيادة على البناء الأول. (تبيين الحقائق مع حاشية الشلبي، كتاب السير، باب العشر والخراج، فصل في الجزية ) 'পুরাতন উপাসনালয় তৈরিতে বাধা দেওয়া হবে না' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, প্রথম অবকাঠামোর যে পরিমাণ ছিল তা। প্রথম অবকাঠামো থেকে বড় করে নির্মাণে বাধা দেওয়া হবে। (আব্দুল্লাহ)
৭৭. তাবয়িনুল হাকায়েক ৩/২৭৯
৭৮. ফাতাওয়ায়ে শামি ৪/২০২
৭৯. ফাতাওয়ায়ে শামি ৪/২০৪
৮০. আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২২৭

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 আরব ভূখণ্ডে অমুসলিমদের বসবাস

📄 আরব ভূখণ্ডে অমুসলিমদের বসবাস


আরব ভূখণ্ডে কোনো কাফেরকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়া জায়েয নেই। বেশ কিছু হাদিসে কাফেরদের জাযিরাতুল আরব থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। তাই আরবের পুরো ভূখণ্ডে কোনো কাফেরকে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সেই কাফের শ্রমিক বা মজদুর হিসাবে হোক কিংবা মালিক ও মনিব হিসাবে থাকুক, কোনো অবস্থাতেই হুকুমের মধ্যে কোনো পরিবর্তন ও পার্থক্য আসবে না। সেখানে তাদের জন্য সর্বাবস্থায় স্থায়ী বসবাস নিষিদ্ধ। প্রত্যেক মুসলমান এই বিষয়ে আদিষ্ট যে, আরবের এই নির্দিষ্ট ভূমিকে অমুসলিমদের বসবাস থেকে পবিত্র রাখতে নিজের সাধ্যমতো ভূমিকা রাখবে। ফকিহগণ এটাও লিখেছেন যে, আরবের ভূমিতে কোনো অমুসলিমের জিম্মي হয়ে থাকারও অনুমতি নেই। আর যদি স্থায়ী বসবাসের জন্য না হয়, বরং ব্যবসা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অমুসলিমরা সেখানে আসতে চায় এবং তাতে দ্বীনের কল্যাণবিরোধী কিছু না থাকে, তাহলে শাসকদের জন্য সাময়িকভাবে তাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সহিহ বুখারিতে হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, বৃহস্পতিবার যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসুস্থতা ও মৃত্যযন্ত্রণা বেড়ে গেল, তখন তিনি তিনটি বিষয়ে উম্মতকে অসিয়ত করে যান। যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ছিল,
أخرجوا المشركين من جزيرة العرب.
(صحيح البخاري برقم : ۸۸۸۲ كتاب الجزية والموادعة، باب إخراج اليهود من جزيرة العرب)
মুশরিকদের জাযিরাতুল আরব (আরব উপদ্বীপ) থেকে বের করে দাও।
'শরহুস সিয়ারিল কাবির' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,
وليس ينبغي أن يترك في أرض العرب كنيسة ولا بيعة ولا بيت نار في شيء من الأمصار والقرى، وكذلك لا ينبغي أن يظهر فيها بيع الخمر والخنزير بحال من الأحوال. لأن هذا كله يبنى على سكنى أهل الذمة فيها، وهم لا يمكنون من استدامة السكنى في أرض العرب كرامة لرسول الله صلى الله عليه وآله وسلم، فإنه موضع ولادته ومنشئه، وإلى ذلك أشار رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم بقوله : «لا يجتمع في أرض العرب دينان... وإذا دخلها مشرك تاجرا على أن يتجر ويرجع إلى بلاده لم يمنع من ذلك، وإنما يمنع من أن يطيل فيها المكث حتى يتخذ فيها مسكنا... حتى إذا أراد رجل من أهل الذمة أن ينزل أرض العرب، مثل المدينة ومكة والطائف والربذة ووادي القرى، فإنه يمنع من ذلك.... وقد بينا أن أرض العرب من عذيب إلى مكة طولا ومن عدن أبين إلى أقصى حجر باليمن بمهرة عرضا. (شرح السير الكبير، كتاب سهمان الخيل والرجالة في الغنائم باب ما لا يكون لأهل الحرب من إحداث الكنائس والبيع وبيع الخمور)
আরবের কোনো জমিন, চাই তা শহর হোক বা গ্রাম, সেখানে কোনো গির্জা, অগ্নিপূজকদের উপাসনালয় রাখা জায়েয হবে না। তেমনইভাবে সেখানে কোনো অবস্থাতেই প্রকাশ্যে শূকর ও মদ ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে না। কেননা মদ ও শূকর জিম্মিদের বসবাসের ওপর ভিত্তি করেই রাখতে দেওয়া হয়। আর তাদের সেখানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নেই। (এর একটি কারণ তো হলো) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মান বজায় রাখা, কেননা তিনি এই জমিনে বড় হয়েছেন ও এখানেই বেড়ে উঠেছেন। (আরেকটি কারণ হলো) এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদিসে বিষয়টি বলে গিয়েছেন, 'আরবের জমিনে দুই ধর্ম একত্র হবে না।' ...কোনো অমুসলিম যদি সেখানে ব্যবসার জন্য আসে এবং আবার নিজ দেশে ফিরে যায়, তাহলে তাকে বাধা দেওয়া হবে না। তবে যদি দীর্ঘসময় অবস্থান করে যে, এখানেই আবাস গেড়ে বসে, তাহলে তাকে নিষেধ করা হবে। ...এমনকি কোনো জিম্মي যদি আরবের ভূমিতে, যেমন মক্কা, মদিনা, তায়েফ, ওয়াদিউল কুরা ইত্যাদি জায়গায় এসে জিম্মা চুক্তির মাধ্যমে বসবাস করতে চায়, তাহলেও তাকে সে অনুমতি দেওয়া হবে না। আরবের ভূখণ্ডের সীমানা হলো দৈর্ঘ্যে জাহিদ থেকে নিয়ে মক্কা পর্যন্ত আর প্রস্থে আদমে আবিয়ান থেকে নিয়ে ইয়েমেনের মারা নামক স্থানের সর্বশেষ পাথর পর্যন্ত।(৮১)

টিকাঃ
৮১. শরহুস সিয়ারিল কাবির, ১/১৫৪১

📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 কাফেরদের মসজিদে প্রবেশের বিধান

📄 কাফেরদের মসজিদে প্রবেশের বিধান


কাফেরদের জন্য মুসলমানদের মসজিদে প্রবেশের অধিকার রয়েছে কি না, এই বিষয়ে মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।
ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আরও বেশ কিছু আলেমের মত হলো, কাফেররা মুসলমানদের মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে না। মুসলমানদের দায়িত্ব হলো, কাফেরদের মসজিদে প্রবেশ থেকে দূরে রাখবে। অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা ও অন্য ইমামদের মত হলো, কাফেরদের মসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ নয়। তবে মসজিদে প্রবেশে তাদেরকে মসজিদের পূর্ণ আদব ও সম্মানের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে এবং কোনো রকম বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা না থাকতে হবে। হানাফি ফকিহ ইমাম কাসানি রহিমাহুল্লাহ লেখেন,
ولا بأس بدخول أهل الذمة المساجد عندنا وقال مالك رحمه الله والشافعي لا يحل لهم دخول المسجد الحرام. (بدائع الصنائع ٨٢١/٥، کتاب الاستحسان، ط. دار الكتب العلمية)
আমাদের হানাফি উলামায়ে কেরামের নিকট জিম্মিদের মসজিদে প্রবেশে কোনো সমস্যা নেই। ইমাম মালেক ও শাফেয়ি বলেন, জিম্মিদের মসজিদে হারামে প্রবেশ বৈধ নয়। (৮২)

টিকাঃ
৮২. বাদায়েউস সানায়ে, ৫/১২৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00