📄 অত্যাচারী ও পাপিষ্ঠকে ভালোবাসা কবিরা গোনাহ
অত্যাচারী ও ফাসেক ব্যক্তির সাথে ভালোবাসা ও মুহাব্বত রাখাকে উলামায়ে কেরাম কবিরা গোনাহের তালিকাভুক্ত করেছেন। কবিরা গোনাহসংক্রান্ত গ্রন্থাদির মধ্যে বিস্তর ও বিশদ আলোচনাসমৃদ্ধ গ্রন্থ হলো আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামি (মৃত্যু: ৯৭৪ হি.) রচিত 'আয-যাওয়াজের আন-ইকতিরাফিল কবায়ের' নামক গ্রন্থটি। লেখক উক্ত গ্রন্থে মানুষের জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় ৪৬৭টি কবিরা গোনাহের উল্লেখ করেছেন। সে তালিকার ৫৪ ও ৫৫ নম্বরে জালেম ও ফাসেকের (প্রকাশ্যে গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তির) সাথে বন্ধুত্ব রাখা ও সৎ লোকদের সাথে বিদ্বেষ রাখার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
الكبيرة الرابعة والخامسة والخمسون : محبة الظلمة أو الفسقة بأي نوع كان فسقهم، وبغض الصالحين.
একটি কবিরা হলো, অত্যাচারী ও যেকোনো ধরনের পাপিষ্ঠের প্রতি ভালোবাসা রাখা আর নেককার ব্যক্তিদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা।(২১)
বিস্তারিত জানতে বইটি অবশ্যপাঠ্য। ইবনে হাজার হাইতামির পর আল্লামা বিরকিবি আল-হানাফি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৯৮১ হি.) এ বিষয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণসহ 'আত-তারিকাতুল মুহাম্মাদিয়া' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেখেনে 'অন্তর'-এর সাথে সংশ্লিষ্ট গোনাহের আলোচনায় ৪১ নম্বরে তিনি উল্লেখ করেন,
(حب الفسقة والركون إلى الظلمة ) ( قال الله تعالى ولا تركنوا إلى الذين ظلموا} [هود : ٣١١] أخرج الإمام أبو داود عن عبد الله بن بريدة، عن أبيه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : «لا تقولوا للمنافق : سيد، فإنه إن يك سيدا فقد أسخطتم ربكم عز وجل، وضده البغض في الله تعالى لكل عاص لعصيانه، لا سيما المبتدعين و الظلمة لكون معصيتهم متعدية، فلا بد من إظهار البغض لهم، إن لم يخف بخلاف غيرهما من العصاة.
'ফাসেকদের ভালোবাসা ও জালেমদের পক্ষ নেওয়া'। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না'। ইমাম আবু দাউদ রহিমাহুল্লাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইরশাদ বর্ণনা করেন, তোমরা মুনাফিককে নেতা বলো না। কেননা সে যদি নেতা হয়, তাহলে তো তোমরা তোমাদের রবকে ক্রোধান্বিত করলে। এর বিপরীত হলো আল্লাহর জন্য কোনো গোনাহগারকে তার গোনাহের কারণে ঘৃণা করা। বিশেষত বিদআতি ও জালেম লোকদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা। কেননা তাদের গোনাহ অন্যকে আক্রান্ত করে। তাই আবশ্যক হলো তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা, যদি কোনো ভয়ের আশঙ্কা না থাকে। (২২)
পূর্বোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট যে, যে-সকল পাপিষ্ঠের পাপকর্ম সংক্রাকম, তাদের প্রতি কেবল আন্তরিক ঘৃণা পোষণ করাই যথেষ্ট নয়। বরং প্রয়োজনের সময় (হেকমত ও মাসলাহাত বিবেচনায় রেখে) সেই ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করাও জরুরি। তবে কখনো ধর্মীয় কোনো স্বার্থে তা প্রকাশ না করারও অনুমতি রয়েছে। 'মুদারাত'- সংক্রান্ত আলোচনায় আরও বিস্তারিত আসবে ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
২১. আয-যাওয়াজির আন ইকতিরাফিল কাবাইর, ১/১৮৩
২২. আত-তারিকাতুল মুহাম্মাদিয়্যাহ, পৃ. ৩১৮, আল-মাকতাবাতুল হাক্কানিয়্যাহ, পেশাওয়ার
📄 কাফেরের সাথে সম্পর্কের বিভিন্ন দিক ও তার শরয়ি বিধান
কাফেরদের সাথে ভালোবাসা ও মুহাব্বতের সম্পর্ক রাখার বিধিবিধানসংক্রান্ত আলোচনার বিভিন্ন শৈলী রয়েছে। কোনো বক্তব্যে সরাসরি নিষেধাজ্ঞাসূচক শব্দ রয়েছে। কোথাও নিন্দা করা হয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে যারা কাফেরদেরকে ভালোবাসে তারা তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। উসুলে ফিকহের দৃষ্টিতে সবগুলোই নিষেধাজ্ঞাসূচক শৈলী। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কোনো কাজ থেকে বারণ করা। এ জাতীয় সব বক্তব্যকে সামনে রেখে উলামায়ে কেরাম কাফেরের সাথে ভালোবাসা ও মৈত্রীসম্পর্ক স্থাপনকে নাজায়েয বলে ঘোষণা করেছেন। আর নিজেরাও এর ওপর পূর্ণ আমল করেছেন। সাথে, কারও থেকে এই বিষয়ে ত্রুটি হলে তাদেরকে সতর্ক ও সংশোধন করেছেন। তারা তাদের রচনায় এই সংক্রান্ত বিধিবিধানকে ইলমি ও ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন। যার কারণে সামগ্রিকভাবে এই মাসআলায় উলামায়ে কেরাম সকলেই একমত।
তবে কাফেরের সাথে সবধরনের লেনদেন ও সম্পর্ক নিষিদ্ধ নয়। এমনইভাবে সবধরনের সম্পর্ক বৈধও নয়। বরং সম্পর্কের বিভিন্ন ধরন ও প্রকৃতি রয়েছে। কিছু আছে বৈধ সম্পর্ক আর কিছু আছে অবৈধ। আবার অবৈধ সম্পর্কেরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কিছু কিছু স্পষ্ট কুফরের কারণ আর কিছু তো অবৈধ বটে, কিন্তু তার ভিত্তিতে কাউকে কাফের আখ্যা দেওয়া যায় না। এমনইভাবে বৈধ সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শর্ত ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে।
এখন কোন ধরনের সম্পর্কের কী হুকুম? আলোচনার সহজবোধ্যতা ও সরল উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে কাফেরদের সাথে সম্পর্ককে নিম্নোক্ত তিন ভাগে বিভক্ত করছি,
১. ধর্মীয় সম্পর্ক।
২. সামাজিক সম্পর্ক।
২. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক।