📘 মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক সীমারেখা ও বিধিবিধান > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য বর্ণনায় ইহুদি-খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সকল কাফেরের সাথে ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি আয়াত পেশ করা হলো,
এক.
لَّا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُواْ مِنْهُمْ تُقَلَةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ
মুমিনরা যেন মুমিনদের ছেড়ে কাফেরদের বন্ধু না বানায়। যে-কেউ এ কাজ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোনোই সম্পর্ক নেই; তবে তোমরা যখন ওদের থেকে কিছুটা আত্মরক্ষা করতে চাও (তখনকার কথা ভিন্ন)। আর আল্লাহ তাঁর নিজের সম্বন্ধে তোমাদের সতর্ক করছেন এবং আল্লাহরই কাছে (তোমাদের) ফিরে যেতে হবে।(২)
মুসলমানদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করার একটি সুরত হলো, মুসলমানদের থেকে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করে কাফেরদেরকেই বন্ধুরূপে গ্রহণ করা। দ্বিতীয় সুরত হলো, মুসলমানের সাথে সাথে কাফেরকেও বন্ধু বানানো। উভয় ধরনের বন্ধুত্বই শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।(৩)
আয়াতের মধ্যে পাশাপাশি মুমিন ও কাফের শব্দ উল্লেখ করার দ্বারা এটিও স্পষ্ট যে, আয়াতে উল্লেখিত হুকুমের মূল ভিত্তি হলো ঈমান ও কুফরের মাঝে বিদ্যমান সংঘাত ও পরস্পরের বিপরীত অবস্থান। কারণ ঈমান-কুফর কখনো এক সাথে হতে পারে না। সুতরাং মুসলিম-কাফেরের মাঝে কীভাবে বন্ধুত্ব হতে পারে?
দুই.
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَرَىٰ أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴿
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধু বানিয়ো না। ওরা পরস্পর একে অন্যের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে-কেউ ওদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে ওদেরই মধ্যে (গণ্য) হবে। নিশ্চয় আল্লাহ জালেমদের হেদায়েত দান করেন না।(৪)
এ জাতীয় যেসব আয়াতে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি কেবল এই দুই শ্রেণির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যেহেতু নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ কুফর, তাই সর্বপ্রকার কাফেরের সাথে মিত্রতা ও বন্ধুত্ব করার ক্ষেত্রেও সমান নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। তা ছাড়া অন্যান্য আয়াতে ব্যাপকভাবে সকল কাফেরের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন.
تَرَى كَثِيرًا مِنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنفُسُهُمْ أَن سَخِطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ ﴿
তাদের অনেককে তুমি কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে দেখবে। নিঃসন্দেহে তারা নিজেদের জন্য যা অগ্রে পাঠিয়েছে তা নিকৃষ্ট। (আর তা হলো,) আল্লাহ তাদের ওপর ক্রোধান্বিত হয়েছেন। তারা চিরকাল শাস্তির মাঝে অবস্থান করবে। তারা যদি আল্লাহ, নবী এবং তার ওপর নাজিলকৃত কিতাবের ওপর ঈমান আনত, তাহলে তাদেরকে (কাফেরদেরকে) বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করত না। কিন্তু, (বাস্তবতা হলো) তাদের অনেকেই অবাধ্য।(৫)
প্রথম আয়াত দ্বারা এটি স্পষ্ট যে, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি ও জাহান্নামের আজাবের কারণ। এবং এও জানা গেল যে, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি কেবলই শেষ নবী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্যই নয়, বরং পূর্ববর্তী উম্মতের জন্যও ছিল। যেমন বনি ইসরাইল। আর অন্যান্য আসমানি বিধানের মতো আল্লাহর এই বিধানটিও তারা অমান্য করেছে। যার কারণে তারা আল্লাহর আজাবের পাত্র হয়েছে।
দ্বিতীয় আয়াতে ‘শর্ত’ ও ‘জাযা’(৬)-এর ব্যবহার থেকে স্পষ্ট যে, ঈমান ও কুফরের মাঝে বন্ধুত্ব সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি বিষয়। যা কখনোই একত্র হতে পারে না। সুতরাং, কোনো পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক রাখতে পারে না। কারও ক্ষেত্রে এমনটি দেখা গেলে বুঝে নিতে হবে যে, এটি তার ঈমানের দুর্বলতার নিদর্শন।
চার.
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا ءَابَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের পিতা ও ভাইদের বন্ধু বানিয়ো না যদি তারা ঈমানের মোকাবেলায় কুফরকে পছন্দ করে। আর তোমাদের মধ্যে যারা ওদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারাই অপরাধী। (৭)
ভাই এবং বাবা অত্যন্ত নিকটাত্মীয়। যদি এমন নিকটাত্মীয়ও কুফরে লিপ্ত থাকে, তাহলে উক্ত আয়াতে তাদের সাথে মিত্রতা ও বন্ধুত্ব করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের সাথে বন্ধুত্বকারীদেরকে জালেম আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এখানে কাফের আত্মীয়ের সাথে বন্ধুত্ব থেকে বেঁচে থাকতে নিছক পরামর্শ দেওয়া হয়নি বা তাকে শুধুই অনুত্তম আখ্যা দেওয়া হয়নি, বরং এমন কাজকে রীতিমতো নাজায়েয ও জুলুম সাব্যস্ত করা হয়েছে।
পাঁচ.
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّى وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَن تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِن كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَدًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَمْتُمْ وَمَن يَفْعَلْهُ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ.
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু বানিয়ো না যে, ওদের নিকট বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাবে, অথচ তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে ওরা তা অস্বীকার করেছে। ওরা রাসুলকে ও তোমাদের শুধু এ কারণে বহিষ্কার করে দিচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো। যদি তোমরা আমার পথে জিহাদ করার জন্য এবং আমার সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্যই বের হয়ে থাকো, (তবে ওদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ কীভাবে?) তোমরা গোপনে ওদের নিকট বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ আমি বেশ জানি-তোমরা যা গোপন করো ও যা প্রকাশ করো। আর তোমাদের মধ্যে যে এ কাজ করে, সে সরল পথ হারিয়ে ফেলেছে।(৮)
বোঝা গেল কাফের ও মুসলমানের মাঝে ঈমান-কুফরের মতো সংঘর্ষ থাকার পর তাদের মাঝে বাস্তবিক বন্ধুত্ব থাকা সম্ভব নয়। এও বোঝা গেল যে, কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা, তাদেরকে ভালোবাসা ও মিত্রতার সম্পর্ক রাখা অথবা মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় তাদের কাছে ফাঁস করে দেওয়া সরল পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণ।
ছয়.
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءَ وا مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ.
নিশ্চয় তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যখন তারা আপন সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, আমরা তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করো তাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। আমরা তোমাদের মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য প্রকাশ্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে, যে পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো।(৯)
এই আয়াত দ্বারা স্পষ্ট যে ঈমান-কুফর ও মুমিন-কাফেরের মাঝে দ্বন্দ্ব একটি সুস্পষ্ট বিষয়। আর এর নেপথ্যে ভৌগোলিক বা দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ নয়, বরং ঈমান-কুফরের মর্মই স্বয়ং এমন যে, এ দুটির মাঝে কোনো ধরনের সামঞ্জস্য সম্ভব নয়। এটিও প্রতীয়মান হলো, এই উত্তপ্ত সংঘাত ও বিদ্বেষ বন্ধ হওয়ার একমাত্র পথ কুফর ছেড়ে ঈমানের পথে ফিরে আসা। এবং তাদের সাথে এই শত্রুতা আর বিদ্বেষ ব্যক্তির কারণে নয়, বরং তার মাঝে নিহিত ‘কুফর’-এর খারাপ বৈশিষ্ট্যের কারণে। তাই যখনই ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্য তার থেকে শেষ হয়ে যাবে, বিদ্বেষ আর শত্রুতার হুকুম বাকি থাকবে না।
সাত.
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَبِسُوا مِنَ الْآخِرَةِ كَمَا يَبِسَ الْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَابِ الْقُبُورِ ﴿۱۳﴾
হে ঈমানদারগণ! এমন সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত। ওরা আখেরাত থেকে তেমনটাই নিরাশ হয়ে গেছে যেমনটা কবরবাসী কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে। (১০)
আয়াতের মূল মর্ম হলো কাফেরের সাথে মিত্রতা করা নিষিদ্ধ। তবে আল্লাহ তাআলার ক্রোধের উল্লেখ থাকার কারণে যে বিষয়টি অতিরিক্ত বুঝে আসে, তা হলো, কাফেরদের সাথে মিত্রতা করা আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে তাঁর ক্রোধে পর্যবসিত হওয়ার কারণ। আর বন্ধুত্বের বাস্তবিক দাবি হলো, বন্ধুর শত্রুর সাথে শত্রুতা রাখা। কাফেররা যেহেতু কুফরের কারণে আল্লাহর ক্রোধের অধিকারী হয়ে গেছে, এখন তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা রাখা বড় বিপজ্জনক এবং আল্লাহর মুহাব্বত থেকে বের হয়ে নিজের ওপরে তাঁর ক্রোধকে ডেকে আনার নামান্তর।
আট.
لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَلَوْ كَانُوا ءَابَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَبِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُوْلَبِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿۲۲﴾
আপনি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়কে এমন পাবেন না যে, তারা ওইসব লোকের সাথে বন্ধুত্ব করে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত, হোক না ওরা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই বা জ্ঞাতিগোষ্ঠী। ওই সকল লোকের অন্তরেই আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং নিজের রুহ (তথা অদৃশ্য ফয়েজ) দ্বারা তাদের সাহায্য করেছেন। তিনি তাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতসমূহে যার তলদেশে নহর প্রবাহিত, তারা তাতে অনন্তকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। ওরাই আল্লাহর দল। শুনে রাখো! আল্লাহর দলই সফলকাম হবে। (১১)
এই আয়াতে আরও ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসীরা কিছুতেই কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে না। কারণ এ দুটির মাঝে দূরত্ব এত বেশি যে, কিছুতেই এ দুটি এক হতে পারে না। সুতরাং ঈমানের দাবি হলো, কাফেররা যেহেতু নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর দুশমন, তাই তাদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখা। চাই কাফের তার যত নিকটাত্মীয়ই হোক না কেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ মুফাসসির আল্লামা বাগাবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৫১০ হি.) বলেন,
أخبر أن إيمان المؤمنين يفسد بموادة الكافرين وأن من كان مؤمنا لا يوالي من كفر، وإن كان من عشيرته.
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে সংবাদ দিচ্ছেন যে, মুমিনদের ঈমান কাফেরদের সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের দ্বারা নষ্ট হয়ে যায়। আর যে মুমিন হবে সে কাফেরের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে পারে না, তার নিকটাত্মীয় হলেও। (১২)
এই সংক্রান্ত কিছু হাদিস
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা ও কাজে উক্ত বিষয়ে পরিষ্কার বিবরণ দিয়ে গেছেন। এমনকি একাধিক বর্ণনায় মুসলমানদেরকে আগে বেড়ে ইহুদি-খ্রিষ্টানকে সালাম দিতে বারণ করেছেন। আর যদি কখনো চলার সময় রাস্তায় কোনো মুসলমান কাফেরের মুখোমুখি হয়, তখন যেন সে রাস্তার প্রশস্ত দিকে চলাচল করে, যাতে স্বাভাবিকভাবেই কাফের সংকীর্ণতায় ভোগে। সহিহ মুসলিমে এসেছে,
عن أبي هريرة؛ أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لا تبدؤوا اليهود ولا النصارى بالسلام. فإذا لقيتم أحدهم في طريق فاضطروه إلى أضيقه. (صحيح مسلم برقم : ٧٦১২، كتاب السلام، باب النهي عن ابتداء أهل الكتاب بالسلام)
হজরত আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আগে বেড়ে ইহুদি-খ্রিষ্টানকে সালাম দেবে না। যখন রাস্তায় তাদের কারও সাথে সাক্ষাৎ হয়, তখন তাকে রাস্তার সংকীর্ণ দিকে দিয়ে চলতে বাধ্য করো। (১৩)
সালাম মূলত শ্রদ্ধা-ভক্তি ও কল্যাণ কামনা জ্ঞাপক বক্তব্য। যার কারণে তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এমনইভাবে রাস্তায় জায়গা দেওয়া সম্মানের বিষয় যা করতে বারণ করা হয়েছে।
কাফের-মুসলমান পাশাপাশি বসবাস করার ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। আর সতর্ক করেছেন, এত নিকটে যেন বাস না করে, যাতে পরস্পরের বাড়ির আলো অন্যের দৃষ্টিতে পড়ে। এভাবে বলার কারণ হলো, আরবরা রাতে বাড়ির আঙিনায় আগুন প্রজ্বলিত করে রাখত। যেন রাতে কোনো মেহমান বা মুসাফিরের প্রয়োজন হলে কাজে লাগাতে পারে। সুনানে তিরমিজিতে রয়েছে,
عن جرير بن عبد الله أن رسول الله صلى الله عليه وسلم بعث سرية إلى خثعم فاعتصم ناس بالسجود، فأسرع فيهم القتل فبلغ ذلك النبي صلى الله عليه وسلم فأمر لهم بنصف العقل، وقال : أنا بريء من كل مسلم يقيم بين أظهر المشركين قالوا : يا رسول الله، ولم؟ قال : لا تراءى ناراهما. (جامع الترمذي برقم : ٤٠٦١، كتاب السير، باب ما جاء في كراهية المقام بين أظهر المشركين، ت بشار)
হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাসআম গোত্রের নিকট একটি যুদ্ধের জন্য বাহিনী প্রেরণ করেন।... এবং বলেন, আমি ওই সকল মুসলিমের থেকে দায় মুক্ত যারা মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কেন? উত্তরে বললেন, যাতে একে অপরের আগুন দেখতে না পারে। (১৪)
আরবদের সেই রীতি অনুসারে এই হাদিসের মর্ম হলো, মুসলমানরা যেন কাফেরদের আবাস থেকে এই পরিমাণ দূরে থাকে যেন উভয় আবাসের মাঝে কোনো বিশেষ সম্পর্ক না থাকে। কাফেরদের সাথে বসবাসের নিন্দায় এতটুকু পর্যন্ত বলেছেন, তাদের সাথে যে বসবাস করবে সে তাদের মধ্যে গণ্য হবে। সামুরা ইবনে জুনদুব রা. বর্ণনা করেন,
ﻭﺭﻭﻯ ﺳﻤﺮﺓ ﺑﻦ ﺟﻨﺪﺏ ﻋﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : ﻻ ﺗﺴﺎﻛﻨﻮﺍ ﺍﻟﻤﺸﺮﻛﻴﻦ ﻭﻻ ﺗﺠﺎﻣﻌﻮﻫﻢ، ﻓﻤﻦ ﺳﺎﻛﻨﻬﻢ ﺃﻭ ﺟﺎﻣﻌﻬﻢ ﻓﻬﻮ ﻣﺜﻠﻬﻢ . ‏( ﺟﺎﻣﻊ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ﺑﺮﻗﻢ : ٥٠٦١ ، ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺴﻴﺮ، ﺑﺎﺏ ﻣﺎ ﺟﺎﺀ ﻓﻲ ﻛﺮﺍﻫﻴﺔ ﺍﻟﻤﻘﺎﻡ ﺑﻴﻦ ﺃﻇﻬﺮ ﺍﻟﻤﺸﺮﻛﻴﻦ، ﺕ ﺑﺸﺎﺭ ‏)
মুশরিকদের সাথে বসবাস করো না। এবং তাদের সাথে ওঠাবসা করো না। যে তাদের সাথে বসবাস করে এবং তাদের সাথে ওঠাবসা করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত। (১৫)
এ সকল হাদিস দ্বারা স্পষ্ট যে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব, ভালোবাসার সম্পর্ক রাখা নিষিদ্ধ।
সংশ্লিষ্ট আরও কিছু বর্ণনা ও ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত
বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্ট যে ঈমানের দৃঢ় শিকল হলো আল্লাহ তাআলার জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহ তাআলার জন্য বিদ্বেষ পোষণ করা। এটি এমন এক কাজ যা না হলে আমল ও ইবাদতের পূর্ণ স্বাদ অনুভব হবে না। কোনো মুসলমানের ঈমান কেবল তখনই পূর্ণতা পায় যখন তার শত্রুতা-মিত্রতা কেবল আল্লাহ তাআলার বিধিনিষেধের অনুগামী হয়। আল্লাহর জন্যই কারও সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা আবার আল্লাহর জন্যই কারও থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করা হবে।
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে,
ﺃﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : ﻣﻦ ﺃﺣﺐ ﻟﻠﻪ ﻭﺃﺑﻐﺾ ﻟﻠﻪ ﻭﺃﻋﻄﻰ ﻟﻠﻪ ﻭﻣﻨﻊ ﻟﻠﻪ ﻓﻘﺪ ﺍﺳﺘﻜﻤﻞ ﺍﻹﻳﻤﺎﻥ . ﺳﻨﻦ ﺃﺑﻲ ﺩﺍﺅﺩ ﺑﺮﻗﻢ : ٩٧٦٤ ، ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺴﻨﺔ، ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺪﻟﻴﻞ ﻋﻠﻰ ﺯﻳﺎﺩﺓ ﺍﻹﻳﻤﺎﻥ ﻭﻧﻘﺼﺎﻧﻪ .
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য বিদ্বেষ রাখে, আল্লাহর জন্য দান করে এবং আল্লাহর জন্যই তা থেকে বিরত থাকে, তার ঈমানের পূর্ণতা লাভ হয়েছে। (১৬)
মুসান্নাফে ইবনে আবু শাইবাতে আছে,
ﻋﻦ ﻣﺠﺎﻫﺪ ﻗﺎﻝ : ﺃﻭﺛﻖ ﻋﺮﻯ ﺍﻹﻳﻤﺎﻥ ﺍﻟﺤﺐ ﻓﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﺒﻐﺾ ﻓﻴﻪ .
মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, ঈমানের মজবুত হাতল হলো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য বিদ্বেষ রাখা। (১৭)
কাফেরদের সাথে মিত্রতায় বড় ধরনের ফিতনার আশঙ্কা
ইমাম ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ সুরা আনফালের এক আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, মুসলমানরা পরস্পর ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে যেন সীমা রক্ষা করে চলে। কোনো মুসলমান অপর মুসলমান ভাই ব্যতীত কোনো কাফেরকে যেন বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। কারণ এটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ إِلَّا تَفْعَلُوهُ تَكُن فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ
আর যারা কাফের তারা একে অপরের বন্ধু। যদি তোমরা তা না করো, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও মহাবিপর্যয় ঘটবে। (১৮)
আল্লামা ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন,
ومعنى قوله إلا تفعلوه تكن فتنة في الأرض وفساد كبير أي إن لم تجانبوا المشركين وتوالوا المؤمنين وإلا وقعت فتنة في الناس وهو التباس الأمر واختلاط المؤمنين بالكافرين فيقع بين الناس فساد منتشر عريض طويل.
যদি তোমরা মুশরিকদের থেকে দূরত্ব অবলম্বন না করো এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন না করো, তাহলে মানুষের মাঝে ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। আর তা হলো, পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যাওয়া এবং মুমিন-কাফের একীভূত হয়ে যাওয়া। যার কারণে মানুষের মাঝে সুদীর্ঘ ও বিস্তৃত বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। (১৯)
জালেম ও কাফেরকে ঘৃণা করা আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাতের আকিদার অংশ
ইমাম তাহাবি রহিমাহুল্লাহ ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আহলুস সুন্নাহর আকিদাসমূহ একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকায় একত্র করেছেন। সেখানে মুমিনের প্রতি বন্ধুত্ব আর কাফেরের সাথে শত্রুতার আকিদাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইমাম তাহাবি বলেন,
ونحب أهل العدل والأمانة ونبغض أهل الجور والخيانة.
আমরা ন্যায়নিষ্ঠ ও ইনসাফকারীদের ভালোবাসি আর অপরাধী ও খেয়ানতকারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি।(২০)
বলাবাহুল্য, অপরাধ, জুলুম ও খেয়ানতের বড় একটি বহিঃপ্রকাশই হলো কুফরি গ্রহণ করা। আমাদের সালাফদের আকিদার কিতাবসমূহে এই মাসআলাটির অন্তর্ভুক্তি দ্বারা বিষয়টি তাদের নিকটও কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার কিছুটা আঁচ করা যায়।
অত্যাচারী ও পাপিষ্ঠকে ভালোবাসা কবিরা গোনাহ
অত্যাচারী ও ফাসেক ব্যক্তির সাথে ভালোবাসা ও মুহাব্বত রাখাকে উলামায়ে কেরাম কবিরা গোনাহের তালিকাভুক্ত করেছেন। কবিরা গোনাহসংক্রান্ত গ্রন্থাদির মধ্যে বিস্তর ও বিশদ আলোচনাসমৃদ্ধ গ্রন্থ হলো আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামি (মৃত্যু: ৯৭৪ হি.) রচিত 'আয-যাওয়াজের আন-ইকতিরাফিল কবায়ের' নামক গ্রন্থটি। লেখক উক্ত গ্রন্থে মানুষের জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় ৪৬৭টি কবিরা গোনাহের উল্লেখ করেছেন। সে তালিকার ৫৪ ও ৫৫ নম্বরে জালেম ও ফাসেকের (প্রকাশ্যে গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তির) সাথে বন্ধুত্ব রাখা ও সৎ লোকদের সাথে বিদ্বেষ রাখার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
الكبيرة الرابعة والخامسة والخمسون : محبة الظلمة أو الفسقة بأي نوع كان فسقهم، وبغض الصالحين.
একটি কবিরা হলো, অত্যাচারী ও যেকোনো ধরনের পাপিষ্ঠের প্রতি ভালোবাসা রাখা আর নেককার ব্যক্তিদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা।(২১)
বিস্তারিত জানতে বইটি অবশ্যপাঠ্য। ইবনে হাজার হাইতামির পর আল্লামা বিরকিবি আল-হানাফি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৯৮১ হি.) এ বিষয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণসহ 'আত-তারিকাতুল মুহাম্মাদিয়া' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেখেনে 'অন্তর'-এর সাথে সংশ্লিষ্ট গোনাহের আলোচনায় ৪১ নম্বরে তিনি উল্লেখ করেন,
(حب الفسقة والركون إلى الظلمة ) ( قال الله تعالى ولا تركنوا إلى الذين ظلموا} [هود : ٣١١] أخرج الإمام أبو داود عن عبد الله بن بريدة، عن أبيه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : «لا تقولوا للمنافق : سيد، فإنه إن يك سيدا فقد أسخطتم ربكم عز وجل، وضده البغض في الله تعالى لكل عاص لعصيانه، لا سيما المبتدعين و الظلمة لكون معصيتهم متعدية، فلا بد من إظهار البغض لهم، إن لم يخف بخلاف غيرهما من العصاة.
'ফাসেকদের ভালোবাসা ও জালেমদের পক্ষ নেওয়া'। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না'। ইমাম আবু দাউদ রহিমাহুল্লাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইরশাদ বর্ণনা করেন, তোমরা মুনাফিককে নেতা বলো না। কেননা সে যদি নেতা হয়, তাহলে তো তোমরা তোমাদের রবকে ক্রোধান্বিত করলে। এর বিপরীত হলো আল্লাহর জন্য কোনো গোনাহগারকে তার গোনাহের কারণে ঘৃণা করা। বিশেষত বিদআতি ও জালেম লোকদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা। কেননা তাদের গোনাহ অন্যকে আক্রান্ত করে। তাই আবশ্যক হলো তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা, যদি কোনো ভয়ের আশঙ্কা না থাকে। (২২)
পূর্বোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট যে, যে-সকল পাপিষ্ঠের পাপকর্ম সংক্রামক, তাদের প্রতি কেবল আন্তরিক ঘৃণা পোষণ করাই যথেষ্ট নয়। বরং প্রয়োজনের সময় (হেকমত ও মাসলাহাত বিবেচনায় রেখে) সেই ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করাও জরুরি। তবে কখনো ধর্মীয় কোনো স্বার্থে তা প্রকাশ না করারও অনুমতি রয়েছে। 'মুদারাত'- সংক্রান্ত আলোচনায় আরও বিস্তারিত আসবে ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২. সুরা আলে ইমরান: ২৮
৩. লেখক এখানে যতগুলো আয়াত পেশ করবেন, তাতে লেখকের মূল উদ্দেশ্য হলো 'কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব'-এর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তুলে ধরা। تولي বা ولاية-এর অন্য যে অর্থগুলো আছে তা ইনকার করা লেখকের উদ্দেশ্য নয়। এই সংক্রান্ত আয়াতগুলো অধ্যয়নকালে ইমাম মাতুরিদি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ৩৩৩ হি.)-এর মূলনীতিটি মনে রাখলে আয়াতের মর্ম বোঝা সহজ হবে। তিনি লেখেন,
ثم الولاية التي نهانا عنها تخرج على وجوه أحدها : المودة والمحبة، أي : لا تودوهم ولا تحبوهم. والثاني : ألا نتخذهم موضع سرنا وبطانتنا كقوله : (لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً ...) الآية. والثالث : ولاية الطاعة لهم، أي : لا تطيعوهم؛ كقوله : ( إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ) الآية، وقوله : (إِنَّ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ)، نهانا أن نحبهم ونودهم، ونهانا أيضًا- أن نتخذهم موضع سرنا، ونفشي إليهم سرائرنا، ونهانا أن نطيعهم فيما يدعوننا إليه ويسرون - والله أعلم - للخلاف الذي بيننا وبينهم في الدين.
আল্লাহ তাআলা আয়াতে কাফেরদের ওলি বানাতে যে নিষেধ করেছেন তার কয়েকটি দিক হতে পারে। ১. ভালোবাসা ও হৃদ্যতা রাখা। ২. অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা। ৩. তাদের আনুগত্য করার মাধ্যমে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা বা তাদেরকে অভিভাবক বানানো। আল্লাহ তাআলা এই তিনটি বিষয় থেকেই আমাদের নিষেধ করেছেন। কেননা তাদের ও আমাদের মাঝে ধর্মীয় যে পার্থক্য রয়েছে তার কারণে। তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ: ৫/৩২২ (আব্দুল্লাহ)
৪. সুরা মায়িদা : ৫১
৫. সুরা মায়িদা : ৮১
৬. শর্ত ও জাযা হলো আরবি ব্যাকরণের দুটি বিশেষ পরিভাষা। এ জাতীয় বাক্যে প্রথমে শর্ত আসে এবং এরপরে জাযা আসে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, প্রথমটি হলে পরেরটি হবে, আর প্রথমটি না হলে পরেরটি হবে না। অর্থাৎ প্রথম কাজটি পরের কাজের জন্য শর্ত। এখানেও ঠিক এই বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে। তারা যদি ঈমান আনত, তাহলে কাফেরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানাত না। সুতরাং, ঈমান থাকলে কাফেরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানানো সম্ভব নয়। তবে বন্ধু বানানোর কোন স্তর কুফর এবং কোন স্তর হারাম সেটা ভিন্ন ব্যাপার। তবে এটা সর্বাবস্থাতেই ঈমানের তাকাজার বিপরীত। (সম্পাদক)
৭. সুরা তাওবা: ২৩
৮. সুরা মুমতাহিনা : ১
৯. সুরা মুমতাহিনা : ৪
১০. সুরা মুমতাহিনা: ১৩
১১. সুরা মুজাদালা: ২২
১২. তাফসিরে বাগাবি: ৫/৫০
১৩. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৬৭
১৪. জামে তিরমিজি, হাদিস ১৬০৫, ১৬০৪; সুনানে আবি দাউদ, হাদিস ২৬৪৫ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম জাসসাস রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৩২১ হি.) বলেন,
أنه لا يحل لمسلم أن يسكن بلاد المشركين فيكون معهم بقدر ما يرى كل واحد منهم نار صاحبه، وكان الكسائي يقول : العرب تقول : داري تنظر إلى دار فلان، ودورنا تناظر.
কোনো মুসলমানের জন্য কাফেরদের ভূখণ্ডের এত নিকটে বসবাস করা জায়েয নেই, যাতে একজনের বাড়ির আগুন অপরজন দেখতে পারে। শরহু মুশকিলিল আসার, ৮/২৭৬ ইমাম খাত্তাবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৩৮৮ হি.) 'মায়ালিমুস সুনান' (২/২৭২) গ্রন্থে বলেন,
في معناه ثلاثة وجوه، قيل : معناه لا يستوي حكمهما ، وقيل : معناه أن الله فرق بين داري الإسلام والكفر، فلا يجوز لمسلم أن يساكن الكفار في بلادهم، حتى إذا أوقدوا نارًا كان منهم بحيث يرى نارهم، ويرون ناره إذا أوقدت، وقيل : معناه لا يتسم المسلم بسمة المشرك ولا يشبه به في هديه وشكله.
হাদিসের তিনটি অর্থ হতে পারে। ১. হুকুমের ক্ষেত্রে মুসলিম আর মুশরিক সমকক্ষ হতে পারে না। ২. আল্লাহ তাআলা দারুল ইসলাম ও দারুল কুফরকে পৃথক করে দিয়েছেন। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্য কাফেরদের সাথে একত্রে এমনভাবে বসবাস করা জায়েজ নেই যে, তারা যখন চুলায় আগুন জ্বালাবে তখন মুসলিম তা দেখতে পাবে, আবার মুসলিম আগুন জ্বালালে তারা তা দেখতে পাবে। ৩. মুসলমানরা যেন কাফেরের বেশভূষা ও জীবনপদ্ধতির সাদৃশ্য অবলম্বন না করে। দেখুন, বাজলুল মাজহুদ, খলিল আহমাদ সাহারানপুরি রহ., ৯/২৪০ (অমুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসের বিধান সামনে বিস্তারিত আসছে, পৃ. ১০২) (আব্দুল্লাহ)
১৫. জামে তিরমিজি, হাদিস ১৬০৫
১৬. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬৮১
১৭. মুসান্নাফে ইবনে আবু শাইবা, ৬/১৭০ এই বক্তব্যটি সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আবু শাইবা ও ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ তাদের সনদে বারা ইবনে আজেব থেকে রেওয়ায়েত করেন, أوثق عرى الإيمان الحب في الله والبغض في الله (المصنف برقم : ٩٥٠١٣، مسند أحمد برقم : ٤٢٥٨١)
ঈমানের মজবুত হাতল হলো আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্য ঘৃণা করা। শায়েখ আওয়ামা দা. বা. এই হাদিসের ব্যাপারে লেখেন, فالحديث صحيح بهذه الشواهد. হাদিসটি সহিহ।
মুসান্নাফে ইবনে আবু শাইবা, ১৫/৬২০ (আব্দুল্লাহ)
১৮. সুরা আনফাল : ৭৩
১৯. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আনফাল ৪/৯৮
২০. আকিদাতুত তাহাবি, পৃ. ৮০
২১. আয-যাওয়াজির আন ইকতিরাফিল কাবাইর, ১/১৮৩
২২. আত-তারিকাতুল মুহাম্মাদিয়‍্যাহ, পৃ. ৩১৮, আল-মাকতাবাতুল হাক্কানিয়্যাহ, পেশাওয়ার

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00