📄 তৃতীয় শর্ত : পরিহিত কাপড় পুরু হবে, স্বচ্ছ পাতলা হবে না
পরিহিত কাপড় পুরু ব্যতীত স্বচ্ছ পাতলা হলে পর্দা বাস্তবায়িত হবে না, আর স্বচ্ছ, পাতলা কাপড় মহিলাদের আকর্ষণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এ ব্যপারে নাবী ﷺ বলেছেন:
আমার উম্মতের শেষ সময়ে নারীগণ নগ্ন উলঙ্গ কাপড় পরিহিত হবে। তাদের মাথা হবে হেলে দুলে পড়া দুর্ভাগা উটের কুঁজের ন্যায়। অবশ্যই তারা অভিশপ্ত।
অন্য হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা আছে যে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ এত এত দূরত্ব হতে পাওয়া যায়। [তবরানী সাগীর ২৩২ পৃষ্ঠা, ইবনু আমর হতে সহীহ সানাদে এবং অন্য বর্ণনাটি মুসলিমের আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে।]
ইবনু 'আবদির বার বলেন: নাবী ﷺ ঐ সব নারীদের উদ্দেশ্য করেছেন যারা পাতলা কাপড় পরিধান করে এবং পর্দা করে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই হলো কাপড় পরিহিত নগ্ন নারী।
উম্মে আলকামা বিন আবী আলকামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাফসাহ বিনতে 'আবদির রহমান বিন আবী বাক্রকে দেখলাম 'আয়িশাহ (রাযি.)-এর ঘরে প্রবেশ করেছেন, তখন তার মাথার উপর পাতলা ওড়না ছিল। তা থেকে তার ললাট দেখা যাচ্ছিল। 'আয়িশাহ (রাযি.) তার উপর থেকে ওড়নাটি সরিয়ে দিয়ে বললেন, সূরা নূরে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা কি তুমি জান না? অতঃপর তিনি আর একটি ওড়না চেয়ে তাকে পরিধান করিয়ে দিলেন। (ইবনু সা'দ ৮/৪৬)
হিশাম বিন উরওয়াহ হতে বর্ণিত যে, মুনযির বিন যুবাইর ইরাক থেকে আসমাআ বিনতে আবী বাক্রের নিকট কিছু পুরোনো পাতলা মারবী ও কুহী কাপড় পাঠালেন। তখন তিনি অন্ধ ছিলেন। আসমাআ (রাযি.) কাপড় স্পর্শ করে দেখে বললেন, ধিক! তোমরা তার কাপড় ফেরত দিয়ে দাও। এটা মুনযিরের নিকট বেদনাদায়ক হলে তিনি বললেন, হে মা! এটা (রং প্রকাশ পায় এমন) স্বচ্ছ পাতলা নয়। তিনি বললেন, এটা যদি স্বচ্ছ না হয় তবে এটা (শরীরের আকৃতি প্রকাশ পায় এমন) নির্মল পাতলা। (ইবনু সা'দ ৮/১৮৪)
'আবদুল্লাহ বিন আবী সালামাহ হতে বর্ণিত যে, 'উমার (রাযি.) লোকেদেরকে কাপড় পরালেন, অতঃপর বললেন, এটা তোমাদের নারীরা পরবে না। এক ব্যক্তি বলল, হে আমীরুল মু'মিনীন! আমি আমার স্ত্রীকে তা পরিয়েছি এবং বাড়ীতে চলাফেরা করেছি, তা স্বচ্ছ মনে হয়নি। এ কথা শুনে 'উমার (রাযি.) বললেন, যদি স্বচ্ছ না হয় তবে তা নির্মল হবে (যা শরীরের কাঠামো ফুটিয়ে তুলবে)। (বাইহাকী ৪/২৩৪-২৩৫)
এ সমস্ত আসারে হাদীসে ইঙ্গিত করে যে, কাপড় স্বচ্ছ ও নির্মল পাতলা হলে তাদের নিকট তা বৈধ হবে না। এ কারণেই মা 'আয়িশাহ (রাযি.) বলেছেন: ওড়না হলো যা চামড়া ও চুলকে ঢেকে রাখে।
📄 চতুর্থ শর্ত : প্রশস্ত ঢিলা ঢালা পোষাক হওয়া এমন সংকীর্ণ না হওয়া, যাতে শরীরের কিছু বুঝা যায়
কাপড় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ফিতনা দূর হওয়া, আর এটা প্রশস্ত ঢিলা ঢালা পোষাক ব্যতীত অর্জিত হয় না। সংকীর্ণ পোষাক ও চামড়ার রং প্রকাশ পাওয়া শরীরের আকার বা অংশ বিশেষ বর্ণনা করে দেয় এবং পুরুষদের চোখে আকৃতি প্রকাশ করে দেয় এমন পোষাক পরা বৈধ নয়। আর এটাতে ফাসাদ সৃষ্টি হয়। অতএব পোষাক প্রশস্ত হওয়া ওয়াজিব। উসামাহ বিন যায়দ বলেছেন:
রসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে একটা গাঢ় ঘন কিবতী পোষাক পরিয়ে ছিলেন, যেটা তাঁকে দাহিয়া কালবী উপহার দিয়েছিলেন। অতঃপর সেটা আমি আমার স্ত্রীকে পরালাম। রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: তোমার কি হলো তুমি কিবতী পোষাকটি পরছ না? আমি বললাম, সেটা আমি আমার স্ত্রীকে পরিয়েছি। তিনি বললেন, তুমি তাকে নির্দেশ দাও সে যেন তার নিচে গিলালাহ (পেটিকোট বা অন্তর্বাস) লাগিয়ে নেয়। কেননা আমি তার হাড়ের আকার প্রকাশের ভয় করছি। (বাইহাকী সহীহ সানাদে)
নাবী ﷺ নারীকে কিবতী পোষাকের নিচে গিলালাহ নামক পোষাক পরিধান করতে বলেছেন শরীর প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার জন্য। আল্লামা শওকানী এ হাদীসের ব্যাখ্যার বলেছেন: হাদীস প্রমাণ করে যে, নারীর প্রতি কাপড় দ্বারা শরীর ঢেকে রাখা ওয়াজিব, কাপড়ের মাধ্যমে শরীরের বৈশিষ্ট প্রকাশ করা যাবে না।
'আয়িশাহ (রাযি.) বলেছেন, সলাতে মহিলাদের তিনটি কাপড় আবশ্যকীয়: ১. ব্লাউজ (কামিস), ২. বড় চাদর (জিলবাব), ৩. ওড়না (খিমার)। 'আয়িশাহ (রাযি.) দেহের নিম্ন অংশের বস্ত্র (লুঙ্গি) দিয়েও চাদর হিসাবে ব্যবহার করতেন। (ইবনু সা'দ ৮/৪৮-৪৯)
উম্মু জা'ফর বিনতে মুহাম্মাদ বিন জা'ফর হতে বর্ণিত যে, ফাতিমাহ বিনতে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: হে আসমাআ! মহিলাগণ যা করে তা আমি ঘৃণা করি। আর সেটা হলো মৃত মহিলাদের কাপড়ের উপর এমন পাতলা বস্তু পরানো হয় যার ফলে তার শরীরের আকার স্পষ্ট হয়ে যায়। আসমাআ বললেনঃ হে রসূলুল্লাহর কন্যা! আমি আপনাকে হাবাসায় (ইথিওপিয়া) দেখা একটি পদ্ধতি দেখাব। অতঃপর তিনি খেজুরের সতেজ ডাল নিয়ে তা ঝুকিয়ে তার ওপর কাপড় ফেললেন (খাঁচার মতো করে)। ফাতিমাহ (রাযি.) দেখে বললেন, এটা কত সুন্দর! আমি মারা গেলে তুমি ও 'আলী আমাকে এভাবেই গোসল দিয়ে পর্দা করবে।
নাবী ﷺ-এর কলিজার টুকরা ফাতিমা (রাযি.) মৃত নারীর শরীরের অবয়ব প্রকাশ হওয়াকে ঘৃণা করেছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে জীবিতদের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ। বর্তমান সময়ের মুসলিম নারীরা সংকীর্ণ কাপড় পরিধান করে যাতে তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ স্পষ্ট হয়ে যায়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও গুনাহের কাজ।
📄 পঞ্চম শর্ত : সুঘ্রাণ ও সুগন্ধি লাগিয়ে বের হতে পারবে না
বহু সংখ্যক হাদীস রয়েছে যাতে মহিলাদেরকে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সুগন্ধি মেখে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে।
১ম হাদীস: আবূ মূসা আশআরী (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যে কোন মহিলা আতর মেখে কোন সম্প্রদায়ের নিকট দিয়ে গমন করে আর তারা তার থেকে ঘ্রাণ পায় তবে সে মহিলা যিনাকারী। (নাসায়ী, আবূ দাউদ, তিরমিযী, হাকীম, আহমাদ)
২য় হাদীস: যায়নাব আস সাকাফিয়াহ হতে বর্ণিত যে, নাবী ﷺ বলেছেন: মহিলাদের কেউ মাসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলে সে যেন সুগন্ধি ব্যবহার না করে। (মুসলিম)
৩য় হাদীস: আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যে কোন মহিলা বাখুর (ধূপের সুগন্ধি) ব্যবহার করে সে আমাদের সাথে এশার সলাতে যেন উপস্থিত না হয়। (মুসলিম)
৪র্থ হাদীস: আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, একজন মহিলা তাঁর নিকট দিয়ে যাচ্ছিল আর তার থেকে তীব্র সুগন্ধির ঘ্রাণ আসছিল। তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দী! মাসজিদে যাওয়ার ইচ্ছা করেছেন? তিনি বললেন, হাঁ। আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) বললেন, আপনি ফিরে গিয়ে সুগন্ধি ধুয়ে ফেলুন। কেননা আমি রসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: যে কোন মহিলা সুগন্ধি মেখে মাসজিদে বের হয়, বাড়িতে ফিরে গিয়ে তা ধুয়ে ফেলা পর্যন্ত আল্লাহ তার সলাত কবুল করেন না। (বাইহাকী)
ইবনু দাকীকুল ঈদ বলেন: পুরুষের প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করার আশঙ্কায় মহিলাদের ওপর সুগন্ধি মেখে বাইরে যাওয়া হারাম করা হয়েছে। এটি যদি মাসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হয়, তবে বাজার বা জনসমাগমস্থলে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি কত বড় গুনাহের কাজ হবে তা সহজেই অনুমেয়। আল্লামা হাইতামী উল্লেখ করেছেন যে, মহিলাদের আতর মেখে সজ্জিত হয়ে বের হওয়া কবীরা গুনাহ, যদিও স্বামী তাকে অনুমতি দেয়।
📄 ষষ্ঠ শর্ত : পুরুষের পোষাকের সাদৃশ্য হতে পারবে না
বহু সংখ্যক সহীহ হাদীস বর্ণিত রয়েছে যাতে পুরুষের সাথে পোষাকে ও অন্যান্য বিষয়ে সাদৃশ্য গ্রহণকারী নারীদের ওপর লা'নাত করা হয়েছে।
১ম হাদীস: আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ নারীদের পোষাক পরিহিত পুরুষকে এবং পুরুষদের লেবাস পরিহিত নারীকে লা'নাত করেছেন। (আবূ দাউদ, ইবনু মাজাহ, হাকিম, আহমাদ)
২য় হাদীস: 'আবদুল্লাহ বিন আম্র (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, যে নারী পুরুষের সাথে এবং যে পুরুষ নারীর সাথে সাদৃশ্য করে তারা আমাদের দলভুক্ত নয়। (আহমাদ)
৩য় হাদীস: ইবনু 'আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী ﷺ মেয়েলী স্বভাবের পুরুষ এবং পুরুষবেশী নারীকে লা'নাত করেছেন। (বুখারী)
৪র্থ হাদীস: 'আবদুল্লাহ বিন 'উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: তিন প্রকারের ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাদের দিকে তাকাবেন না: (১) পিতা মাতার অবাধ্য ব্যক্তি, (২) পুরুষবেশী নারী এবং (৩) দাইয়ূস (যে পুরুষ তার পরিবারের অশ্লীলতা সহ্য করে)। (হাকিম, বাইহাকী, আহমাদ)
৫ম হাদীস: 'আয়িশাহ (রাযি.)-কে বলা হলো এক মহিলা (পুরুষের মতো) জুতা পরিধান করে? তিনি বললেন: রসূলুল্লাহ ﷺ পুরুষবেশী নারীদের লা'নাত করেছেন। (আবূ দাউদ)
ইমাম আহমাদ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, কোনো ব্যক্তি তার দাসীকে পুরুষের মতো আলখিল্লা বা জুতা পরাতে পারবে কি না। তিনি সাফ মানা করেছেন এবং বলেছেন এটি হারাম। ইমাম যাহাবী বলেন, যখন কোনো নারী পুরুষের পোশাক পরে, তবে সে আল্লাহর লা'নাতের উপযুক্ত হয় এবং তার স্বামী যদি এতে বাধা না দেয় তবে সেও সেই লা'নাতের অন্তর্ভুক্ত হয়। কারণ পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক এবং সে তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দায়ী।
নারীদের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পর্দা। কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে তাদের যে স্বাতন্ত্র্য দেওয়া হয়েছে, তা বজায় রাখা অপরিহার্য। নাবী ﷺ বলেছেন: “তোমরা আল্লাহর বান্দীদের আল্লাহর মাসজিদে যেতে বাধা দিও না, তবে তাদের ঘরই তাদের জন্য বেশি উত্তম।” অর্থাৎ নারীর শ্রেষ্ঠ স্থান হলো তার বাড়ি এবং তার শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার হলো পর্দা।