📘 মুসলিম নারীর পর্দা 📄 চেহারা পর্দা করার বিধান

📄 চেহারা পর্দা করার বিধান


আজকের দিনের বহুসংখ্যক আলিম এ মতের দিকে গিয়েছেন যে, নারীর চেহারা সতরের অন্তর্ভুক্ত। তাই নারী চেহারা প্রকাশ করতে পারবে না। বরং প্রকাশ করা হারাম। তাদের কথা প্রত্যাখ্যানের জন্য এ আলোচনাই যথেষ্ট।

জেনে রাখা দরকার যে, চেহারা ও দু' কব্জি পর্দা করার সুন্নাতের ভিত্তি রয়েছে। নাবী ﷺ-এর কথা দ্বারা সংবাদ এসেছে যে, “মুহরিম নারী নিকাব পরবে না এবং হাতমোজা পরবে না।” (বুখারী)। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, এটা প্রমাণ করে যে নিকাব এবং হাতমোজা সাধারণ মহিলাদের নিকট খুবই পরিচিত ছিল যা দ্বারা তারা চেহারা ও হাত ঢেকে রাখত।

এ ব্যাপারে কিছু হাদীস নিম্নরূপ:
১. 'আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার বিধান নাযিলের পর সাওদাহ (রাযি.) প্রকৃতির প্রয়োজনে বের হলেন। 'উমার (রাযি.) তাকে দেখে চিনে ফেললেন। তখন নাবী ﷺ বললেন, তোমাদের প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
২. ইফকের ঘটনার সময় মা 'আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, সফওয়ান বিন মুয়াত্তাল আমাকে দেখে চিনতে পারল কারণ সে আমাকে পর্দার বিধানের পূর্বে দেখেছিল। তখন আমি আমার চেহারা চাদর দিয়ে ঢেকে নিলাম।
৩. ইহরাম অবস্থায় 'আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, আমাদের পাশ দিয়ে যখন আরোহীরা যেত তখন আমরা মাথার ওপর থেকে চাদর চেহারার ওপর ঝুলিয়ে দিতাম, তারা চলে গেলে আবার সরিয়ে নিতাম।
৪. আসমাআ বিনতে আবী বাক্র (রাযি.) বলেন, আমরা পুরুষদের সামনে আমাদের চেহারা ঢেকে রাখতাম।

এ সকল প্রমাণ দ্বারা বুঝা যায় যে, নাবী ﷺ-এর পত্নীগণ এবং সাহাবী মহিলাগণ সাধারণ অবস্থায়ও চেহারা ঢেকে রাখতেন, যা একটি উত্তম ও প্রশংসনীয় কাজ। তবে এটি সলাতের বা হজ্জের ইহরামের মতো কোনো বিশেষ অবস্থায় ফরয বা আবশ্যিক করা হয়নি, বরং সাধারণ পর্দার অংশ হিসেবে একে গ্রহণ করা হয়েছে। হাফসাহ বিনতে সীরীন বৃদ্ধ বয়সেও চাদর দ্বারা চেহারা ঢেকে রাখতেন এবং একে ‘তাকওয়া’ বা ‘পরিচ্ছন্নতা’র অংশ মনে করতেন।

সুতরাং, বোরকা বা নিকাব দ্বারা চেহারা আবৃত করা শরী'আত সম্মত ও প্রশংসনীয়। যারা এটি করবে তারা উত্তম কাজ করবে, আর যারা শুধু চেহারা ও হাত খোলা রেখে বাকি শরীর পর্দা করবে তাদের কোনো গুনাহ হবে না।

📘 মুসলিম নারীর পর্দা 📄 দ্বিতীয় শর্ত : সাজ-সজ্জায় সজ্জিত না হওয়া

📄 দ্বিতীয় শর্ত : সাজ-সজ্জায় সজ্জিত না হওয়া


মহান আল্লাহ সূরা নূরে বলেছেন: “তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” (সূরা নূর ৩১)। এ আয়াত মহিলাদের সৌন্দর্যের দিকে যখন পুরুষদের দৃষ্টি পড়ে তখন তাদের আবৃত করার প্রকাশ্য সকল কাপড়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। মহান আল্লাহ আরও বলেন, “তোমরা তোমাদের বাড়ীতে অবস্থান করবে মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না।” (সূরা আহযাব ৩৩)।

নাবী ﷺ বলেছেন: তিন প্রকার ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না—১) যে জামা'আত ত্যাগ করেছে, ২) যে গোলাম পলায়ন করেছে এবং ৩) ঐ স্ত্রী যার স্বামী অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাকে যথেষ্ট ভরণপোষণ দিয়ে গেছে, কিন্তু এরপরও সে বাইরে সৌন্দর্য প্রদর্শন (তাবারুজ) করে বেড়ায়।

তাবারুজ বলতে বোঝায় নারী তার সৌন্দর্যকে এমনভাবে প্রকাশ করা যা দ্বারা সে পুরুষদের প্রলুব্ধ করে। জিলবাব বা চাদরের উদ্দেশ্যই হলো নারীর রূপ ঢেকে রাখা। যদি জিলবাব নিজেই কারুকার্যখচিত বা আকর্ষণীয় হয়, তবে তা পর্দার উদ্দেশ্য ব্যাহত করে। ইমাম যাহাবী বলেন, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় রঙিন কাপড়, রেশম বা স্বর্ণালঙ্কার প্রকাশ করা অভিশপ্ত কাজ।

নাবী ﷺ মহিলাদের থেকে বাইয়াত নেয়ার সময় অন্যতম শর্ত দিতেন যে—তারা যেন জাহিলী যুগের মতো নিজেদের সাজ-সজ্জা প্রদর্শন না করে। 'আবদুল্লাহ বিন আম্র (রাযি.) বলেন, উমাইমাহ বিনতে রুকাইকাহ যখন বাইয়াত নিতে এলেন, নাবী ﷺ তাকে বললেন: “আমি তোমার বাইয়াত নিচ্ছি যে... তুমি জাহিলী যুগের ন্যায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।”

📘 মুসলিম নারীর পর্দা 📄 তৃতীয় শর্ত : পরিহিত কাপড় পুরু হবে, স্বচ্ছ পাতলা হবে না

📄 তৃতীয় শর্ত : পরিহিত কাপড় পুরু হবে, স্বচ্ছ পাতলা হবে না


পরিহিত কাপড় পুরু ব্যতীত স্বচ্ছ পাতলা হলে পর্দা বাস্তবায়িত হবে না, আর স্বচ্ছ, পাতলা কাপড় মহিলাদের আকর্ষণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এ ব্যপারে নাবী ﷺ বলেছেন:
আমার উম্মতের শেষ সময়ে নারীগণ নগ্ন উলঙ্গ কাপড় পরিহিত হবে। তাদের মাথা হবে হেলে দুলে পড়া দুর্ভাগা উটের কুঁজের ন্যায়। অবশ্যই তারা অভিশপ্ত।

অন্য হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা আছে যে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ এত এত দূরত্ব হতে পাওয়া যায়। [তবরানী সাগীর ২৩২ পৃষ্ঠা, ইবনু আমর হতে সহীহ সানাদে এবং অন্য বর্ণনাটি মুসলিমের আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে।]

ইবনু 'আবদির বার বলেন: নাবী ﷺ ঐ সব নারীদের উদ্দেশ্য করেছেন যারা পাতলা কাপড় পরিধান করে এবং পর্দা করে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই হলো কাপড় পরিহিত নগ্ন নারী।

উম্মে আলকামা বিন আবী আলকামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাফসাহ বিনতে 'আবদির রহমান বিন আবী বাক্রকে দেখলাম 'আয়িশাহ (রাযি.)-এর ঘরে প্রবেশ করেছেন, তখন তার মাথার উপর পাতলা ওড়না ছিল। তা থেকে তার ললাট দেখা যাচ্ছিল। 'আয়িশাহ (রাযি.) তার উপর থেকে ওড়নাটি সরিয়ে দিয়ে বললেন, সূরা নূরে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা কি তুমি জান না? অতঃপর তিনি আর একটি ওড়না চেয়ে তাকে পরিধান করিয়ে দিলেন। (ইবনু সা'দ ৮/৪৬)

হিশাম বিন উরওয়াহ হতে বর্ণিত যে, মুনযির বিন যুবাইর ইরাক থেকে আসমাআ বিনতে আবী বাক্রের নিকট কিছু পুরোনো পাতলা মারবী ও কুহী কাপড় পাঠালেন। তখন তিনি অন্ধ ছিলেন। আসমাআ (রাযি.) কাপড় স্পর্শ করে দেখে বললেন, ধিক! তোমরা তার কাপড় ফেরত দিয়ে দাও। এটা মুনযিরের নিকট বেদনাদায়ক হলে তিনি বললেন, হে মা! এটা (রং প্রকাশ পায় এমন) স্বচ্ছ পাতলা নয়। তিনি বললেন, এটা যদি স্বচ্ছ না হয় তবে এটা (শরীরের আকৃতি প্রকাশ পায় এমন) নির্মল পাতলা। (ইবনু সা'দ ৮/১৮৪)

'আবদুল্লাহ বিন আবী সালামাহ হতে বর্ণিত যে, 'উমার (রাযি.) লোকেদেরকে কাপড় পরালেন, অতঃপর বললেন, এটা তোমাদের নারীরা পরবে না। এক ব্যক্তি বলল, হে আমীরুল মু'মিনীন! আমি আমার স্ত্রীকে তা পরিয়েছি এবং বাড়ীতে চলাফেরা করেছি, তা স্বচ্ছ মনে হয়নি। এ কথা শুনে 'উমার (রাযি.) বললেন, যদি স্বচ্ছ না হয় তবে তা নির্মল হবে (যা শরীরের কাঠামো ফুটিয়ে তুলবে)। (বাইহাকী ৪/২৩৪-২৩৫)

এ সমস্ত আসারে হাদীসে ইঙ্গিত করে যে, কাপড় স্বচ্ছ ও নির্মল পাতলা হলে তাদের নিকট তা বৈধ হবে না। এ কারণেই মা 'আয়িশাহ (রাযি.) বলেছেন: ওড়না হলো যা চামড়া ও চুলকে ঢেকে রাখে।

📘 মুসলিম নারীর পর্দা 📄 চতুর্থ শর্ত : প্রশস্ত ঢিলা ঢালা পোষাক হওয়া এমন সংকীর্ণ না হওয়া, যাতে শরীরের কিছু বুঝা যায়

📄 চতুর্থ শর্ত : প্রশস্ত ঢিলা ঢালা পোষাক হওয়া এমন সংকীর্ণ না হওয়া, যাতে শরীরের কিছু বুঝা যায়


কাপড় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ফিতনা দূর হওয়া, আর এটা প্রশস্ত ঢিলা ঢালা পোষাক ব্যতীত অর্জিত হয় না। সংকীর্ণ পোষাক ও চামড়ার রং প্রকাশ পাওয়া শরীরের আকার বা অংশ বিশেষ বর্ণনা করে দেয় এবং পুরুষদের চোখে আকৃতি প্রকাশ করে দেয় এমন পোষাক পরা বৈধ নয়। আর এটাতে ফাসাদ সৃষ্টি হয়। অতএব পোষাক প্রশস্ত হওয়া ওয়াজিব। উসামাহ বিন যায়দ বলেছেন:
রসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে একটা গাঢ় ঘন কিবতী পোষাক পরিয়ে ছিলেন, যেটা তাঁকে দাহিয়া কালবী উপহার দিয়েছিলেন। অতঃপর সেটা আমি আমার স্ত্রীকে পরালাম। রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: তোমার কি হলো তুমি কিবতী পোষাকটি পরছ না? আমি বললাম, সেটা আমি আমার স্ত্রীকে পরিয়েছি। তিনি বললেন, তুমি তাকে নির্দেশ দাও সে যেন তার নিচে গিলালাহ (পেটিকোট বা অন্তর্বাস) লাগিয়ে নেয়। কেননা আমি তার হাড়ের আকার প্রকাশের ভয় করছি। (বাইহাকী সহীহ সানাদে)

নাবী ﷺ নারীকে কিবতী পোষাকের নিচে গিলালাহ নামক পোষাক পরিধান করতে বলেছেন শরীর প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার জন্য। আল্লামা শওকানী এ হাদীসের ব্যাখ্যার বলেছেন: হাদীস প্রমাণ করে যে, নারীর প্রতি কাপড় দ্বারা শরীর ঢেকে রাখা ওয়াজিব, কাপড়ের মাধ্যমে শরীরের বৈশিষ্ট প্রকাশ করা যাবে না।

'আয়িশাহ (রাযি.) বলেছেন, সলাতে মহিলাদের তিনটি কাপড় আবশ্যকীয়: ১. ব্লাউজ (কামিস), ২. বড় চাদর (জিলবাব), ৩. ওড়না (খিমার)। 'আয়িশাহ (রাযি.) দেহের নিম্ন অংশের বস্ত্র (লুঙ্গি) দিয়েও চাদর হিসাবে ব্যবহার করতেন। (ইবনু সা'দ ৮/৪৮-৪৯)

উম্মু জা'ফর বিনতে মুহাম্মাদ বিন জা'ফর হতে বর্ণিত যে, ফাতিমাহ বিনতে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: হে আসমাআ! মহিলাগণ যা করে তা আমি ঘৃণা করি। আর সেটা হলো মৃত মহিলাদের কাপড়ের উপর এমন পাতলা বস্তু পরানো হয় যার ফলে তার শরীরের আকার স্পষ্ট হয়ে যায়। আসমাআ বললেনঃ হে রসূলুল্লাহর কন্যা! আমি আপনাকে হাবাসায় (ইথিওপিয়া) দেখা একটি পদ্ধতি দেখাব। অতঃপর তিনি খেজুরের সতেজ ডাল নিয়ে তা ঝুকিয়ে তার ওপর কাপড় ফেললেন (খাঁচার মতো করে)। ফাতিমাহ (রাযি.) দেখে বললেন, এটা কত সুন্দর! আমি মারা গেলে তুমি ও 'আলী আমাকে এভাবেই গোসল দিয়ে পর্দা করবে।

নাবী ﷺ-এর কলিজার টুকরা ফাতিমা (রাযি.) মৃত নারীর শরীরের অবয়ব প্রকাশ হওয়াকে ঘৃণা করেছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে জীবিতদের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ। বর্তমান সময়ের মুসলিম নারীরা সংকীর্ণ কাপড় পরিধান করে যাতে তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ স্পষ্ট হয়ে যায়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও গুনাহের কাজ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px