📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 সেটা জিবারিশ...

📄 সেটা জিবারিশ...


গুরুগম্ভীর একটা বিষয়ে আলোচনার জন্য আসরের নামাজের সময় সিনান আমাকে একটি নির্দিষ্ট মসজিদে ডেকেছে। গিয়ে দেখি—তারিকও আছে। নামাজ শেষে তাদের সাথে মিলিত হলাম।
তারিক বলল— 'হ্যাঁ সিনান, এবার শুরু কর।'
হাঁটতে হাঁটতে আমাদের আলাপ চলল।
সিনান বলল— 'জাবির ইবনে হাইয়ান...'
আমি উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম— 'অনেক দিন পরে।'
'আরমান, তুই ভইনিচ ম্যান্যুস্ক্রিপ্ট'-এর নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছিস, তাই না?'
'হুম।'
'সেখানে ব্যবহার করা ভাষাটার নাম মনে আছে?'
'আ... উম... জিবারিশ মনে হয়।'
'হ্যাঁ! এই জিবারিশ শব্দটার এটিমোলজি মানে উৎস জানিস? এটি এসেছে জাবির ইবনে হাইয়ানের ল্যাটিনাইজড নাম Geber থেকে।'
'কেন?' তারিকের প্রশ্ন।
'কারণ হচ্ছে—জাবির ইবনে হাইয়ান মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত মানুষ... স্যরি, ভুল হয়ে গিয়েছে—সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত নাম।'
'বুঝলাম না।'
'বোঝাচ্ছি। সমস্যাটা হচ্ছে— “জাবির ইবনে হাইয়ান" আর Geber—এ দুটো নাম নিয়ে। জিবার আর জাবির ইবনে হাইয়ান—এ দুটো নাম আছে ৩০০০ এরও বেশি বইয়ের নিচে। কিন্তু একজন মানুষ একা এত বেশি কীভাবে লিখতে পারেন? আবার অনেক ল্যাটিনাইজড বইয়ের মূল অ্যারাবিকটা পাওয়া যায় না। এজন্য অনেকে মনে করেন, সেগুলো কোনো ওয়েস্টার্ন রসায়নবিদদের লেখা। এটাকে Geber-Problem বলে। এ দাবিটার অবশ্য গুরুত্ব নেই। কেননা, অনুবাদের পর মূলত পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যেতেই পারে। যাহোক, মেইন পয়েন্টে আসি। জাবির ইবনে হাইয়ানের পরবর্তী মুসলিম কেমিস্টরা তাকে নিজেদের ওস্তাদ হিসেবে মেনে নেয় এবং অনেকেই তার নাম সুডোনিম বা ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করে। আমার মনে হয়, এজন্যই মূল সমস্যাটা হয়েছে। তবে জাবির ইবনে হাইয়ানের ২০০টির বেশি বই ছিল—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আরেক দল বলতে চায়, জাবির ইবনে হাইয়ান নামের কোনো মানুষই ছিল না। এগুলো ভিত্তিহীন কথা। এদের জবাব দিয়ে Holmyard বলেন—এটা নিশ্চিত, Geber ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ কেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ান ছাড়া আর কেউ নন। ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ার নোমানুল হক—যার মূল স্পেশালাইজেশন জাবির ইবনে হাইয়ান, তিনি নিজের বইয়ে জিনিসটা পুরোপুরি ক্লিয়ার করে দিয়েছেন। '
রাস্তায় অতিরিক্ত মানুষ। হাঁটতে খুব সমস্যা হচ্ছে। এমন সময় তারিক বলল— 'নারীরা ঘরে থাকলে আর কিছু হোক আর না হোক, রাস্তায় অন্তত ভিড় কিছুটা কমত!'
সিনান অবশ্য বলে চলেছে— 'একটা জিনিস লক্ষ কর, Hippocrates-এর নামে ৬০টি বই আছে। একটির ব্যাপারেও শতভাগ নিশ্চয়তা নেই, তা হিপোক্রেটিস লিখেছেন কি না। হিপোক্রেটিসকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করা হয় Hippocratic Oath-এর জন্য, যেটা হিপোক্রেটিস লিখেনইনি! আর জাবির ইবনে হাইয়ানের ক্ষেত্রে একটু থেকে একটু সন্দেহ পেলেই সেটাকে এক বিরাট ব্যাপার বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এসব ওরিয়েন্টালিস্ট বায়াস অত্যন্ত বিরক্তিকর।
১২-১৩ খ্রিষ্টাব্দে লেখকের নামের জায়গায় জিবারওয়ালা পাঁচটা ল্যাটিন বই পাওয়া গিয়েছিল। এগুলোর মূল অ্যারাবিক পাওয়া যায়নি। এ কারণে অনেকে প্যাঁচ লাগায়। কিন্তু তার নামে তো যে কেউ বই লিখতেই পারে—এ বলে জাবির ছিল না বলা কেমন স্টুপিডিটি।
'সব বুঝে গিয়েছি, এবার চল কিছু খেয়ে নিই।'
'কী বুঝেছিস? আমি তো এখনও মূল জিনিস বলিইনি।'
'কী! জিবারিশ শব্দটা কোথা থেকে এসেছে, সেটা বলছিলি না এতক্ষণ?'
'না।'
'তো!'
'আমি তো শুধু জাবির ইবনে হাইয়ানকে নিয়ে জটিলতার ব্যাকগ্রাউন্ড দিলাম মাত্র।'
তারিককে বলতে না দিয়ে সিনান বলতে থাকল—'বিভিন্ন অ্যালকেমিস্টের জাবির ইবনে হাইয়ানের নাম ব্যবহার করার আরেকটি কারণ হতে পারে, আসল অ্যালকেমি অনেক কম মানুষ প্র্যাকটিস করত। সঠিকত্বের মানুষ দুনিয়ায় অনেক কমই থাকে, বুঝেছিস? বেশিরভাগই তখন লোভে পড়ে বিভিন্ন জিনিস মিলিয়ে স্বর্ণ বানানোর চেষ্টায় মেতে ছিল। আসল মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে এটা খুবই কুৎসিত একটা ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। আবু বকর আল রাজি, ইবনে সিনা, আল কিন্দি, ইবনে খালদুনের মতো বড়ো বড়ো ব্যক্তিত্ব এটার মারাত্মক সমালোচনা করেন। এই প্র্যাকটিস অবশ্য মারা যায়নি: তা ১৮ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। স্যার আইজ্যাক নিউটন শেষ অ্যালকেমিস্টদের একজন, যারা বিভিন্ন জিনিস মিলিয়ে স্বর্ণ বানাতে চেষ্টা করেছিলেন। ১৮ শতকে এই প্র্যাকটিস গোপনে চলে যায়।
যাহোক, মুসলিমদের মধ্যে কিছু মানুষ গোপনে অ্যালকেমি প্র্যাকটিস করতেন। তারা এ সময় কাভার নেওয়ার জন্য জাবির ইবনে হাইয়ানের নাম ব্যবহার করেন। এ কারণে অনেক প্যাঁচ বেঁধেছে। কেননা, তারা অনেক উলটা-পালটা কাজ করেছে—যা জাবিরের নামে চলে এসেছে। এখন ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তা বাদ দিতে হচ্ছে। আবার অনেক সময় জাবির ইবনে হাইয়ানকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাবির ইবনে আফলাহর সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। দুজনের ল্যাটিন নাম একই।
জাবির ইবনে হাইয়ান স্বর্ণ তৈরি করতে পেরেছিলেন কি না—এ ব্যাপারে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কথা বলে, কিন্তু সেসবে যাব না। শুধু একটি কথা বলব।'
'তাড়াতাড়ি বল! খিদে পেয়েছে।'
'আরে এখনও মূল আলোচনা শুরুই হয়নি...'
'ইন্নালিল্লাহ!'
'এই তো আসছি...'
'মাইর খাবি এখন!'
সিনান হেসে দিয়ে আবার বলা শুরু করল— 'জাবির ইবনে হাইয়ানের রসায়ন গবেষণাগার কোথায়, সেটা কেউ জানত না। তার মৃত্যুর ২০০ বছর পর কুফায় একটা রাস্তার রিকন্সট্রাকশন চলছিল। এই সময় তার গবেষণাগার আবিষ্কৃত হয়। আর সেখানে একটা বিশাল স্বর্ণখণ্ডও পাওয়া যায়।'
'বাপ রে বাপ!' তারিক ও আমি সমস্বরে চিল্লিয়ে উঠলাম।
'হ্যাঁ। এবার তাহলে “জিবারিশ” কেন জাবির ইবনে হাইয়ানের ল্যাটিনাইজড নাম—তা ক্লিয়ার করি। মনে আছে, লাইব্রেরিতে তারিক জাবির ইবনে হাইয়ানের কৃত্রিম জীবন আবিষ্কারের চেষ্টার কথা বলেছিল? যার কারণে আমরা তাকে পাগল ভেবেছিলাম?'
'হ্যাঁ।' আমি হেসে বললাম।
'অনেকের মতে—এটা জাস্ট সুফিবাদী চিন্তা-ভাবনা। এজন্য বলা হয়, এটা গ্যেটের ফাউস্ট ও মেরি শেলির ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন-এর অনুপ্রেরণা। কিন্তু বাস্তবে কি ওসব কাল্পনিক চিন্তা-ভাবনা ছিল?'
সিনানের কথায় শরীর শিউরে উঠছে।
'এটা বলা সম্ভব না। অ্যালকেমি নিয়ে তার বেশিরভাগ লেখা বোঝা দুঃসাধ্য। সবই যেন ধাঁধা। বোঝা সম্ভব না বললেই চলে। এটা অবশ্য জাবির ইবনে হাইয়ান একা করেননি; মাসলামাহ আল মাজরিতি নামের আরেকজন আন্দালুসিয়ান অ্যালকেমিস্টও করেছিলেন। মূলত এটা প্রায় সকল বড়ো বড়ো অ্যালকেমিস্টদের স্টাইল। অনেকে মনে করেন, তারা জ্ঞানটা সবাইকে দিতে চাননি। শুধু তাদেরই দিতে চেয়েছেন, যারা অ্যালকেমির জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।
এজন্য তারা এমন ভাষা ব্যবহার করেছে। আরেকজন অ্যালকেমিস্ট আবুল কাসিম আল ইরাকি ব্যাখ্যা দিয়েছেন—নিজের আবিষ্কার অন্যের নামে চলে যেতে না দেওয়াটা জাস্ট নরমাল মানবীয় চরিত্র। মুসলিমদের আগেও ইতিহাসে এমনই দেখা গিয়েছে। এটা সত্য, বর্তমানে পেট্যান্টের ব্যবস্থা তার বলা ওই কারণটির ফলেই হয়েছে। আবার জাবির ইবনে হাইয়ানের শিক্ষক জাফর সাদিকও জাবির ইবনে হাইয়ানকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যেন অযোগ্য কারও হাতে জাবিরের লেখা না পড়ে। এ ছাড়াও আসলে বিজ্ঞানের বিভিন্ন জিনিস তো আর সাধারণ মানুষরা বোঝে না, সেগুলো দক্ষরাই বোঝে। তাহলে সাধারণ মানুষকে জানিয়েই-বা লাভ কী? তাই আবুল কাসিম ইরাকির মতে—অ্যালকেমিস্টদের লেখা এমন, যেগুলো সুদক্ষ অ্যালকেমিস্টরাই বুঝতে পারবে।
অনেকেই অ্যালকেমির নামে ভন্ডামি করত। অকাল্টিস্ট ছিল, তারপর অনেকে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে মানুষের টাকা খেত। জাবির ইবনে হাইয়ানের ওপর অকাল্টিজম বা জাদুর কোনো রকম অভিযোগ গ্রহণযোগ্য না। কিছু কাজকে অকাল্ট সায়েন্স বলা যেতে পারে, সেটা নেগেটিভ কিছু না; একটা নতুন টার্ম। ম্যাথিউ মেলভিন-কুশকি, যিনি মুসলিম বিশ্বে অকাল্টিজমের ওপর বর্তমানে সবচেয়ে বড়ো স্কলার, তিনি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ লিস্ট দেন মুসলিম অকাল্টিস্টদের। তিনি বলেন, জাবির ইবনে হাইয়ান অকাল্টিস্ট ছিলেন না। এমনকী গ্রিক অ্যালকেমির সাথেও জাবিরের অ্যালকেমি তুলনা করা যায় না। তিনি যা করতেন—তা এক্সপেরিমেন্টাল সায়েন্স। তিনি যে অ্যালকেমিক্যাল ট্রান্সমিউটেশন করতেন, তা কেবল বিভিন্ন বস্তুর পদার্থের গাণিতিক আনুপাতিক পরিবর্তন। বর্তমানে তো মানুষ সবকিছুকেই জাদু বানিয়ে দেয়। ফ্ল্যাট আর্থারদের ব্যাপারে তো জানিস।'
'জাবির ইবনে হাইয়ান ইর‍্যাশনাল অর্থাৎ অযৌক্তিক, আনসায়েন্টিফিক কিছু করেননি। তিনি খুব সিস্টেমেটিক ওয়েতে কাজটা করতেন। তিনি নিজেই সেসব অ্যালকেমিস্টের সমালোচনা করেছেন, যারা আন্দাজে বিভিন্ন জিনিস মিলিয়ে কোনোরূপ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়াই স্বর্ণ বানাতে চাইত। সুডো-জাবিবরা উলটা-পালটা কাজ করেছে, কিন্তু জাবির ইবনে হাইয়ানের কোনো বইয়ে ত্যাড়াব্যাকা কিছু নেই। অন্যদের কারণে মাঝে দিয়ে তার নাম খারাপ হয়। আর জিনিসটা অত্যাধিক সিম্পল। তিনি ইমাম জাফর সাদিকের স্টুডেন্ট—এমন পাগলামি করতে যাবেন কেন? আর যদি জাবির জাদুকর হতেন, তাহলে অসংখ্য অকাল্টিস্ট তার নামের আশ্রয় কেন নিত? জাবিরের নাম মুসলিম বিশ্বে পজিটিভলি নেওয়া হতো, এজন্যই অন্যরা অকাল্ট জিনিস করার সময় জাবিরের নাম ভাঙ্গিয়ে চলত।
এখন তারিক মুভি-টভি দেখে সাই-ফাই কিছু ভাবছে। কিন্তু সে রকম না। আল্লাহ যেভাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, জাবির ইবনে হাইয়ান চেষ্টা করেছিলেন সেখানে একটা প্যাটার্ন খুঁজতে। তার কাজ অনেকটা বর্তমানের Synthetic Biology-এর মধ্যে পড়ে যায়। তিনি ভেবেছিলেন, ল্যাবরেটরিতে জেনেটিক্যালি মডিফাইড জিনিস তৈরি করতে পারবেন। তার এ রকম কিছু থিওরেটিক্যাল বর্ণনা তুই পড়েছিলি তারিক। Futuristic Technology-এর একটা উদাহরণ বলা যায় তার কাজকে। তার সামগ্রিক কাজে মডার্ন কেমিস্টের অসংখ্য বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। যারা অন্যরকম বলে, তারা কোনোরকম অ্যানালাইসিস ছাড়াই সেসব বলে।
এখন তার তাকউইন থিওরিগুলো কাজের হোক আর না হোক, চিন্তা-ভাবনার মাত্রাটা ইন্টারেস্টিং। আর এটাও ক্লিয়ার করা উচিত হবে, এসব কেবল থিওরেটিক্যাল চিন্তা-ভাবনাই ছিল, তিনি এমন কোনো এক্সপেরিমেন্ট করতে যাননি। আর তার কাজে বারবার তিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয় আনেন। বর্তমানে সেক্যুলারলি যেমন এসবকে আল্লাহর বিরুদ্ধবাদী করে প্রকাশ করা হয়, কোনোভাবেই সে রকম না। এপিস্টেমোলজির মাঝে বিশাল ফারাক। শেষ কথা হচ্ছে, ঠিকভাবে বোঝাই যায় না—এখনও এসবের মূল অর্থ কী। ফাঁকা সুফিবাদী চিন্তাও হতে পারে, যেখানে সবকিছু সবকিছুর মধ্যে হারিয়ে যায়।'
'ইয়েস, আমি পাগল না!' তারিকের উল্লাস।
'ধারণা করা হয় এই আজব বইগুলোর অর্থ যারা বুঝবেন, শুধু তারাই জাবির ইবনে হাইয়ানের সকল কাজ জানবেন। জাবির ইবনে হাইয়ানের লেখা জিবারিশ; তো, এজন্যই জিবার থেকে জিবারিশ এসেছে।'
'সেই! খিদে আর নেই।'
'আর জাবির ইবনে হাইয়ানের কিছু অদ্ভুত আবিষ্কার আছে, যেগুলো বাস্তবেই ছিল, কোনো সন্দেহ নেই।'
'মানে, এগুলো অদ্ভুতভাবে অস্থির?'
'হ্যাঁ... বলতে পারিস। জাবির ইবনে হাইয়ান কাপড় ওয়াটারপ্রুফ করার জন্য একটা কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। ওই সময় মরিচারোধী লোহা তৈরি করেছিলেন, আয়রন পাইরাইট ব্যবহার করে স্বর্ণাক্ষরে লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। অন্ধকারে পড়া যায়, এমন এক ধরনের কালি আবিষ্কার করেছিলেন।'
'বাপ রে বাপ রে বাপ!'
'তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জারণের সময়ে ধাতুর ভর কমে। এক কেমিক্যাল অন্য কেমিক্যালের সাথে যুক্ত হলে মাইক্রোস্কোপিক লেভেলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার আদান-প্রদান হওয়ার কথাও বলেছেন। বুঝতে পারছিস? চিন্তা করতে পারিস? তিনি ইলেকট্রনের কথা বলছেন, ১২০০ বছর আগের সেই জাবির ইবনে হাইয়ান!'
'ওরে বাপ রে বাপ রে বাপ রে বাপ!'

টিকাঃ
১. Stephen Bax, 'The world's most mysterious book' online video, TED ed.
২. Philip K. Hitti p: 381
৩. Holmyard সে চারজনের একজন—যারা জাবির ইবনে হাইয়ানকে নিয়ে মূল কাজ করেছেন।
৪. S. Nomanul Haq, Names, Natures and Things: The Alchemist Jabir ibn Hayyan and His kitab al-ahjar (Book of Stones) (Kluwer Academic Publishers, 1994)
৫. 'Hippocrates' in Kara Rogers op. cit.
৬. বিস্তারিত জানতে পড়ুন—আহমাদ ইউসুফ আল হাসানের— a. A Critical Reassessment of the Geber Problem (in 3 parts) b. The Geber Problem: The Origin of Liber Fornacum c. Jabir's Latin Works and the Question of Geber (history-science-technology.com)
আর, মাত্র এতটুকু লেখা দিয়ে এই বিষয়টি কোনোভাবেই কাভার করা সম্ভব না। এই বিষয়টি খুবই বিতর্কিত ও জটিল। এর জন্য অবশ্যই আলাদা লেখার প্রয়োজন।
৭. Salah Zaimeche. 'The Advent of Experimental Chemistry' Muslim Heritage; Michael H. Morgan, p: 165
৮. মামুন ঘেরশ, "Alchemy Crash Course: "History of Science #10" online video Crash Course
৯. Salim Al-Hassani and Mohammed Abattouy, "The Advent of Scientific Chemistry: Muslim Heritage.
১০. Phillip K. Hitti. p. 680
১১. Michael H. Morgan, p: 162; Ehsan Masood, p: 157
১২. Ibn Khaldun, Muqaddimah: an Introduction to History, (Translated by Franz Rosenthal, Princeton University Press, 1967) p. 694.
১৩. Sonja Brentjes, p: 101; M. Shamsher Ali, p: 189
১৪. "The Lonely Alchemist" in J. al-Khalili, Pathfinders
১৫. M. Shamsher Ali op. cit.
১৬. "The Lonely Alchemist" in J. al-Khalili, Pathfinders
১৭. S. Nomanul Haq op. cit.
১৮. Michael H. Morgan, p: 163.
১৯. S. Sabreen Syeed, "The Mystic Who Created Modern Science Jabir ibn Hayyan" kn-ow.com.
২০. Michael H. Morgan, p: 164.
২১. "Chemistry" in 'School' in Salim al-Hassani op. cit.
২২. Michael H. Morgan, p: 164

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 বিজ্ঞানের ইতিহাস

📄 বিজ্ঞানের ইতিহাস


জুমার নামাজের পর তারিক, আমি ও সিনান তিনজনে মিলে আলোচনা করি। কিন্তু আজ তা হলো না। সিনান বলল—'আভনিশ তার বাসায় আমন্ত্রণ করেছে। তোরাও যাবি আমার সাথে।'
আমি কারণ জানতে চাইতে নিলাম, কিন্তু তারিক বাধা দিলো—'আমন্ত্রণ? নিমন্ত্রণ করল না কেন?'
আমরা হেসে দিলাম। অবশেষে বললাম—'কীসের জন্য যেতে বলেছে সে?'
'কী আর, তর্ক করবে?'
'ছেলে তো ব্রিলিয়ান্ট আছে, এতদিন গবেষণা করে আমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে হয়তো-বা।'
'চল দেখি, কী হয়।'
আমরা যথাসময়ে আভনিশের বাসায় উপস্থিত হলাম। আমাদের বসতে দিয়ে সে ভেতরে গেল। নিমন্ত্রণ করেনি ঠিক, তবে নেমন্তন্নের ব্যবস্থা করেছে। তার ছোটো ভাইকে দিয়ে চানাচুর, বিস্কুট ও কফি পাঠাল।
তারিক তাকে কাছে ডাকল—'এদিকে আসো তো দেখি... তোমার নাম কী?'
'আমি নির্ভীক।'
'ওরে! তোমাকে দেখে তো আমার ভয় করছে এখানে।'
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নির্ভীক লাফিয়ে উঠল—'ভাইয়া ভাইয়া। আমার একটা প্রশ্ন আছে।'
তারিক এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর প্রশ্ন করার অনুমতি দিলো।
'ভাইয়া, শয়তানের বউয়ের নাম কী?'
পড়ল তারিক বিপাকে! আমার কানের কাছে এসে বলল—'অদ্ভুত প্রশ্ন করে ছেলেটা। আভনিশের ভাই তার মতোই ত্যাড়াইল্লা। মান-সম্মান তো বাঁচাতে হবে ছোটো ভাইয়ের সামনে।'
সিনান বলল—'চেষ্টা কর তারিক, আমরা তোর সাথে নেই।'
কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল—'আমি তো জানি না... মানে... আমাকে তো দাওয়াত দেয়নি বিয়েতে!'
এরই মধ্যে আভনিশ এসে তার ভাইকে বকে ভেতরে পাঠিয়ে দিলো।
সিনান বলল—'এবার বল, যে কারণে ডেকেছিস।'
একটি কাগজ হাতে নিয়ে বসল আভনিশ। আজ তাহলে লম্বা চলবে...
'মুসলিমরা কত্ত বড়ো বাটপার! হিন্দুদের থেকে নাম্বার থিওরি মেরে দিয়ে নিজেরা কৃতিত্ব নিয়ে নিয়েছে।'
আভনিশের কথা শুনে তো তারিক হেসেই কুটি কুটি।
'হাসছিস কেন?' তাকে জিজ্ঞেস করলাম।
'মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমির বইয়ের নাম ছিল কিতাব আল হিসাব আল হিন্দি। মুসলিমরা তো হিন্দুদেরই ক্রেডিট দিচ্ছিল। পরে ইউরোপিয়ানরা মুসলিমদের নাম দিয়ে দিলে আমাদের কী দোষ!'
আভনিশ যে ভাব নিয়ে বলা শুরু করেছিল, তারিক তাকে একদম গুঁড়িয়ে দিলো।
সিনান বলল—'হ্যাঁ, তাকে ছাড়াও অন্যান্য মুসলিম গণিতবিদরা নিজেরাই হিন্দুদের ক্রেডিট দিচ্ছিলেন। পশ্চিমারাই ইসলামের নাম দেয়, আবার পশ্চিমারাই ইসলামকে গালাগালি করে!'
কী অপমান!
আভনিশ কথা ঘুরিয়ে ধরল— 'আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আকাশে ওড়ার ঘটনা পুরাই বানানো। তার মৃত্যুর ৭০০ বছর পর এটা লেখা হয়। তিনি বাস্তবে কখনো আকাশে ওড়েনইনি। আরমান ফিরমানেরটার মতো তারটাও মিথ।'
সিনান কিছুক্ষণ চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকল আভনিশের দিকে। তারপর বলল—'ইবনে সাঈদ মাগরিবি আর মারওয়ান ইবনে হাইয়ানের মতো ক্লাসিক্যাল স্কলারদের শক্ত রেফারেন্স আছে। তা ছাড়া স্প্যানিশ ইতিহাসের প্রধান মানুষ লেভাই প্রোভেঞ্চালও এটা উল্লেখ করেন। তিনি যে কয়েক মুহূর্ত না; বরং পাক্কা ১০ মিনিট আকাশে উড়ছিলেন—এটা একদম প্রতিষ্ঠিত। এত কিছুর পরও তুই বলছিস, এ ইতিহাস মিথ্যা?'
কিছুক্ষণ কাগজের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকার পর বলল—'কিন্তু তারপরও তাকে পথিকৃৎ বলা যায় না। কারণ, তার অনেক আগে চাইনিজ বিজ্ঞানীরা আকাশে উড়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।'
সিনান কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইল। তারপর গম্ভীরভাবে বলল—'আভনিশ! তুই বিজ্ঞানের ইতিহাস বুঝিস না। একটা জিনিস না বুঝলে সে ব্যাপারে কথা না বলাই ভালো। বিজ্ঞানের ইতিহাসে কৃতিত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা সরল রেখাংশ থাকতে হয়। রেখাংশের কোনো জায়গায় ভাঙা থাকলে এর আগের বিজ্ঞানীরা ক্রেডিট পান না। শুধু যে রেখাংশতে বর্তমান পর্যন্ত কোনোরকম ভাঙা চিহ্ন থাকবে না, সেই রেখাংশে থাকা বিজ্ঞানীরাই কৃতিত্ব পাবেন। X, a, b, c চারজন বিজ্ঞানী হলে যদি চারজনের মধ্যে কোনোরকম সম্পর্ক থাকে, তাহলে তারা প্রত্যেকেই কৃতিত্ব পাবেন। আর প্রথমজন হবেন পথিকৃৎ। ধর, যদি x-এর সাথে a-এর কানেকশন না থাকে, তাহলে x থাকবে ভাঙা চিহ্নের আগে, কৃতিত্বও সে পাবে না।
উদাহরণ দিই। মনে কর, মরিস ওয়ার্ড নামে একজন Starlite নামক একধরনের অসাধারণ পদার্থ আবিষ্কার করলেন। এটির প্রক্রিয়াকরণ জানার জন্য স্পেস এক্স, নাসাসহ বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান লেগে গেল। কিন্তু মরিস ওয়ার্ড পদার্থটির অপব্যবহারের আশঙ্কা করে এটি বানানোর প্রক্রিয়া প্রকাশ না করেই মারা গেলেন।
এখন ধর, তুই সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতায় অরিজিনালি এটা আবিষ্কার করলি। বিজ্ঞান মহলে তোর অনেক প্রশংসা হলো, অনেক অ্যাওয়ার্ড পেলি, পুরো বিশ্বে বিখ্যাত হলি। তুই মারা যাওয়ার ২০০ বছর পর একজন ইতিহাস লিখতে বসল। সেখানে সে লিখল—তুই না; বরং মরিস ওয়ার্ড স্টারলাইট প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। এভাবে তোকে বাদ দিয়ে আবিষ্কারকের জায়গায় তার নাম দিয়ে দেওয়া অন্যায়। তুই তো জানতি, মরিস ওয়ার্ড আগে এটা আবিষ্কার করেছিলেন। আর এটা আবার বানানো সম্ভব। আব্বাস ইবনে ফিরনাস তো চাইনিজদের ব্যাপারে জানতেনও না! তারপরও তিনি পথিকৃৎ না হন কীভাবে? তো বুঝতে পেরেছিস এবার, আভনিশ?'
আভনিশ উত্তর না দিয়ে বলল—'তুই আগেরবার বিজ্ঞানে ইসলামের সুমহান প্রভাব দেখাচ্ছিলি; অথচ ইসলামের কারণেই অবশেষে বিজ্ঞানের অধঃপতন হয়।'
'কই? কীভাবে?'
'এই যে, ইমাম গাজালি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে একটা বই লিখেছিলেন।'
'হুম, আবু হামিদ আল গাজালির কারণে ইসলামে বিজ্ঞানের অধঃপতন হয়— এই ধারণাকে জর্জ স্যালিবার মতো বড়ো স্কলারই উড়িয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া গাজালি তার আত্মজীবনীতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, ফায়লাসুফরা ধর্মতত্ত্ব আর অধিবিদ্যা নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করলেই যত সমস্যা শুরু হয়। অন্য কোনো ক্ষেত্রে তার আপত্তি নেই। তিনি আরও লিখেন, ইসলাম যে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধবাদী, স্পেসিফিকলি বললে গণিতের বিরুদ্ধবাদী—তা চিন্তা করা মারাত্মক ভুল। আর একটা বই লেখার কারণে যে শত শত মানুষের তৈরি করা সায়েন্টিফিক ট্র্যাডিশন নষ্ট হয়ে যাবে, এটা যে কমন সেন্সের সাথেও যায় না কোনো সময়—সেটা তুই ভালোই বুঝিস।'
এরপর সিনান হেসে দিয়ে বলল—'জর্জ স্যালিবা বলেন, “গাজালির পর মুসলিম বিশ্বে আসল জ্যোতির্বিদ্যার স্বর্ণযুগ শুরু হয় এবং সামগ্রিকভাবে আবিষ্কারের সত্যিকার স্বর্ণযুগ এরপরেই শুরু।” ইসলামি দর্শনের অথোরিটি পিটার অ্যাডামসন বলেন—“গাজালির সময় থেকেই দর্শনের আসল স্বর্ণযুগ শুরু হয়।" এবার?'
'মাইকেল এইচ হার্ট তার The Hundred বইয়ে নিউটনকে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছেন। তিনি তো ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান ছিলেন। কিন্তু কোনো খ্রিষ্টানকে কখনো দেখেছিস ধর্ম টেনে এনে তাকে নিয়ে গর্ব করতে? তোদের এত কেন?'
'আগেরবারের আলাপ থেকে তো তুই কিছু শিখলিই না। বিজ্ঞান সব সময় একটা প্যারাডাইমে কাজ করে। একে ভ্যালু ফ্রি ভাবা বোকামি। আর হ্যাঁ, তাকে ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্টিস্ট বলতে দেখেছি, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের হিন্দু সায়েন্টিস্ট বলতে দেখেছি। বাকি পড়ালেখা না করে সারাক্ষণ ফেসবুকে বসে থাকলে বুঝবি কীভাবে? আর বর্তমান বিজ্ঞানের সাথে কিছু লাগানো না হলেও এটা কক্ষনো ভ্যালু ফ্রি না। ম্যাটেরিয়ালিজম, পজিটিভিজম, হিস্টোরিসিজম বিভিন্ন প্যারাডাইমে তা কাজ করে। আর আমরা কাউকে নিয়ে গর্ব করি না। আমি অ্যারিস্টটল, ব্রহ্মগুপ্ত, আইনস্টাইন সকলের সেরা কাজের প্রশংসা করি, তার মানে কি এটা নাকি যে তাদের নিয়ে গর্ব করি?'
'তাহলে মুসলিমদের কাজ নিয়ে লাফাস ক্যান?'
'মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ মুসলিমরা করেনি; নন-মুসলিমরা করেছে। তারা লাফায় ক্যান?'
পালটা প্রশ্ন শুনে আভনিশ বিব্রত।
সিনান বলে চলল—'Work well done is acclaimed. And we are only being fair towards a particular civilization.'
আমি হেসে দিয়ে বললাম— 'আসলেই ব্যাটা! মুসলিমদের কাজ নিয়ে নন-মুসলিমরা প্রশংসা করলে প্রবলেম নেই, মুসলিমরা প্রশংসা করলেই গর্ব করা হয়ে যায়; আরও কত কত সমস্যা!'
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আভনিশ বলল—'আর যাই বলিস, মুসলিমদের মধ্য থেকে গত ১২০ বছরে মাত্র তিনজন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছে...'
সিনান এবারে ক্ষেপে গেল— 'মাত্র তিনজন মুসলিম বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছে— এর কোনো মানেই হয় না। ইসলামি স্বর্ণযুগে যদি বর্তমানের নোবেল প্রাইজের সমমানের কোনো অ্যাওয়ার্ড থাকত, তাহলে তার ৯৫% ই মুসলিমরা পেত। একই কথা ভারতীয় স্বর্ণযুগ, চায়নার স্বর্ণযুগ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও খাটে। এখন ইউরোপিয়ান স্বর্ণযুগ চলছে, তো তারা সব পাচ্ছে, এত শক খাওয়ার কী হলো এতে? ইসলামি স্বর্ণযুগে ইউরোপের অবস্থা যে কত খারাপ ছিল! ইতিহাসবিদ ভিক্টর রবিনসন বলেন—“ইউরোপের সবচেয়ে উঁচুশ্রেণির মানুষরাও নিজের নামটা পর্যন্ত লিখতে পারত না।” যেখানে ওই সময় এমন কোনো মুসলিম কৃষকও পাওয়া দুষ্কর ছিল—যে লিখতে বা পড়তে জানত না। বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থা কি এতটা খারাপ?'
প্রশ্বাস নিয়ে শান্ত হয়ে সিনান বলল— 'জর্জ সারটন বিজ্ঞানকে ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন— "এই গাড়ি গ্রিকরা চালিয়েছেন, রোমানরা চালিয়েছেন, সব ধরনের মানুষরাই চালিয়েছেন এবং কিছুদিন আগে চালিয়েছেন মুসলিমরা। এখন চালাচ্ছে ইহুদি আর খ্রিষ্টানরা।" গাড়ি একই, কিন্তু ভিন্ন চালক। এটা এমন গাড়ি—যা শুধু এগিয়ে যায়, কোনো সময় পেছনে ফিরে আসে না। তোর যদি বিজ্ঞানের ইতিহাসের কোনোরকম বুঝ থাকত, তাহলে তুই অমন কথা বলতি না।'
'তারপরও নিউটন আইনস্টাইন, তারাই তো মেইন বিজ্ঞানী, আমরা কি তাদের থেকে বেশি কাউকে সম্মান দিতে পারি?'
সিনান দীর্ঘশ্বাস ফেলল—'আভনিশ, বিজ্ঞানের ইতিহাসে মেইন বলতে কিছু নেই। বিজ্ঞানের ইতিহাস একটা তাসের ঘর। ওপর থেকে কতগুলো সরাবি, তেমন সমস্যা হবে না। কিন্তু নিচ থেকে কয়েকটা নিয়ে যাবি, সব ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে। তেমনই নিউটন, আইনস্টাইন না থাকলেও বেশি সমস্যা হতো না। জীবন চলত। ২০০-৩০০ বছর পর হলেও কেউ না কেউ তাদের জায়গা পূরণ করে দিত। কিন্তু নিচ থেকে অ্যারিস্টটল, টলেমি, ব্রহ্মগুপ্ত, ইবনুল হাইসামকে সরিয়ে দিবি, ভবিষ্যতের ইতিহাস আর লেখা হবে না। আর এখানে ইসলাম আলাদা গুরুত্ব পায়। ইসলাম প্রাচীন আর আধুনিক যুগের মাঝে যোগসূত্র। ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্টে ইসলামের আগের প্রায় সকল জ্ঞানকে অ্যারাবিকে রূপান্তর করে নেওয়া হয়। এভাবে এই তাসের ঘর ভেঙে পড়াকে, অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে রক্ষা করে মুসলিমরা।'
মাগরিবের আজান শোনা গেল।
'আচ্ছা আভনিশ, আজ আসি। পরেরবার মজা হবে ইনশাআল্লাহ।' অতঃপর মুচকি হাসি দিয়ে বলল সিনান— 'আর তুই যতই চেষ্টা করিস না কেন, কোনো লাভ নেই আভনিশ। পৃথিবীর ৫৬ জন লিডিং রিসার্চার স্বাক্ষর করেছেন, খ্রিষ্টান পশ্চিম ইসলামি বিশ্বের কাছে ঋণী। '
যাওয়ার সময় আমি চিন্তা করলাম: ইসলাম-বিদ্বেষীরা মনে করে, আমরা বোকা। আর আমরা জানি যে, তারা বোকা।

টিকাঃ
১. হাসান আল বসরি রাহিমাহুল্লাহকে একজন প্রশ্ন করলে তিনি এমন উত্তর দেন : Mohammad Akram Nadwi, ‘History of Islamic Sects' Al-Salam Institute.
২. D. E. Smith and L. C. Karpinski, p: 46; 'Medieval Science among the Arabians' in H. S. Williams and E. H. Williams, A History of Science (Harper and Brothers, 1904)
৩. Hank Green, 'The Weird Truth About Arabic Numerals' Online Video, SciShow; তবে হ্যাঙ্ক এই পয়েন্টটি মিস করেছেন যে, সংখ্যাগুলো লেখা ছিল অ্যারাবিকে। এজন্যই অ্যারাবিক নিউমারালস নামকরণ করা হয় প্রধান গুরুত্বটি ভাষায়। কারণ, সেখান থেকেই সংখ্যাগুলো এসেছে।
৪. আরও দেখুন: Asadullah Ali. 'The Structure of Scientific Productivity in Islamic Civilization: Orientalist Fables' Yaqeen Institute for Islamic Research, 2017. pp: 31-48.
৫. George Saliba, p: 21.
৬. W. Montgomery Watt, The Faith and Practice of al-Ghazali (London: George Allen and Unwin Ltd, 1952) p: 34-36.
৭. George Saliba, ch. 7; Peter Adamson and Richard C. Taylor, ed. The Cambridge Companion to Arabic Philosophy (Cambridge: Cambridge University Press, 2005), 6.
৮. Salim al-Hassani, 'Time and the Golden Age of Islam' Online Video, YouTube.
৯. Victor Robinson, The Story of Medicine p: 164 as cited in Hamza Tzortzis op. cit. 'Europe was dirty, Cordova built a thousand baths; Europe was covered with vermin. Cordova changed its undergarments daily; Europe lay in mud, Cordova's streets were paved; Europe's palaces had smoke-holes in the ceiling, Cordova's arabesques were exquisite; Europe's nobility could not sign its name, Cordova's children went to school: Europe's monks could not read the baptismal service, Cordova's teachers created a library...
১০. E. H. Wilds and K. V. Lottich, 'Foundations of Modern Education', (4th edition, Holt McDougal, 1970) as cited in Salim al-Hassani op. cit.
১১. George Sarton, Introduction to the History of Science op. cit. vol. 2, p: 109.
১২. George Saliba, p: 2.
১৩. Charles Burnett. 'Mont Saint-Michel or Toledo: Greek or Arabic Sources for Medieval European Culture' Muslim Heritage.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 ইবনুন নাফিসের কৃতিত্ব

📄 ইবনুন নাফিসের কৃতিত্ব


'তারিক, কী অবস্থা তোর?' নির্বাচনী পরীক্ষা আসন্ন। এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোচিং সেন্টার থেকে বাড়ি ফেরার পথিমধ্যে আমাদের কথোপকথন।
'আমার তো প্লাজমা অবস্থা।'
'মানে?'
'মানে না বুঝলে মুড়ি খা!'
'নির্বাচনী পরীক্ষার ভয়ে আমার তো যে অবস্থা, তুই কিছু পারিস না, তবু এত উৎফুল্ল থাকিস কীভাবে?'
'নির্বাচনী পরীক্ষার জ্বালা... কবে যে এটা শেষ হবে, আবার মুভি দেখা শুরু করতে পারব!'
এই সময়ে সিনান বলল—'কেন যে তোরা মুভি দেখোস। একটা তিন ঘণ্টার মুভি দেখে তুই যা শিখতে পারবি, দেড় ঘণ্টার একটা ডকুমেন্টারি দেখে তার ১০-১২ গুণ বেশি শিখতে পারবি।'
'কী লাভ এত কিছু শিখে? এত জ্ঞান অর্জন করার ফায়দা কী?'
'উদ্ভিদের প্রজনন প্রক্রিয়া যে আবিষ্কার করেছিল, সে যদি চিন্তা করত—“এটা করে কী লাভ”, তাহলে আজ আমরা জেনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যন্ত আসতে পারতাম না।'
তারিক কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল—'আচ্ছা, বায়োলজির কথা যখন তুলেই ফেলেছিস, তখন জীববিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানীরা কী করেছেন—সে সম্পর্কে কিছু বল।'
'সেক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয় ইবনুন নাফিসের কথা।'
'জানি, তিনি হৃৎপিণ্ডের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়াটি উদ্‌ঘাটন করেছেন।'
'ঠিক হৃৎপিণ্ডের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া না মূলত, শুধু ফুসফুসীয় সংবহন। যাহোক, প্রথমে বলে রাখছি, ওই সময়ে গ্যালেন আর ইবনে সিনার মতের বিপরীত কিছু বলা মানে ছিল পাগলামি। কেউ এমন কিছু করলেই পাবলিক ছি ছি করত। রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে, গ্যালেন আর ইবনে সিনার মত একই ছিল। তো এবার বুঝ, তাদের বিপরীতে গিয়ে কিছু বলার জন্য কত্ত সাহস দরকার। ইবনুন নাফিস উলটো আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাদের বিপরীতে লিখেছেন। এই আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে আসে? শেষের দিকে মনোযোগ দিয়ে শুনিস। যাহোক, ইবনুন নাফিস কিন্তু ছোটো হননি। তবে ইবনে আবি উসাইবিআ, ইবনুন নাফিসের সমকালীন হওয়ার পরও তার বিখ্যাত বিজ্ঞানের ইতিহাসের বইয়ে ইবনুন নাফিসকে রাখেননি। তার কাছে ইবনুন নাফিস ছিল মূর্খ!
গ্রিক ও ইসলামি সাম্রাজ্যে মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করা নিষিদ্ধ থাকায় গ্যালেন ও ইবনে সিনা ভুল বুঝেছেন। অবশ্য, ইসলামের কোনো আইনের বইয়ে এটাকে নিষিদ্ধ বলা হয়নি। ইবনুন নাফিস নিজেও লিখেন, মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ না করতে পারায় আমরা আরও উন্নতমানের তথ্য দিতে পারি না। বর্তমানে অবশ্য বিভিন্ন স্কলার বলেন, ইবনুন নাফিস গোপনে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন।
ইবনুন নাফিস তার শারহু তাশরিহিল-কানুন লি ইবনে সিনা বইয়ে রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি বর্ণনা করেন। গ্যালেনের মতে—ডান দিকের প্রকোষ্ঠে; মানে এখন যেটাকে নিলয় বা ventricle বলি, সেখানে রক্ত পরিশোধিত হয়ে বাম দিকের প্রকোষ্ঠে যাওয়া দরকার। তিনি বলেন, এটা অদৃশ্য পথের মাধ্যমে হয়। কিন্তু ইবনুন নাফিস বলেন—এ দুটার মাঝে আদান-প্রদানের কোনো পথ নেই।'
তারিক হাসা শুরু করে দিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম— 'কী হয়েছে?'
'গ্যালেন পথ আবিষ্কার করতে পারেনি বলে অদৃশ্য পথের কাহিনি বানিয়েছে।'
তারিকের কথা শুনে আমরাও হেসে উঠলাম।
সিনান চালিয়ে গেল—'ইবনুন নাফিস ভিন্নভাবে দেখিয়েছেন। ফুসফুসীয় ধমনি দিয়ে রক্ত হৃৎপিণ্ডের ডান ভেন্ট্রিকল থেকে ফুসফুসে যায়। তারপর পরিশোধিত হয়ে পালমোনারি শিরার মাধ্যমে পুনরায় হৃৎপিণ্ডের বাম ভেন্ট্রিকলে পৌঁছায়।'
'অসাধারণ ব্যাখ্যা!' আমি বললাম।
'বর্তমানের ব্যাখ্যা এর থেকে জটিল বটে, তবে মেইন জিনিস এটাই। এটা ছাড়া সম্পূর্ণ রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া বর্ণনা করা সম্ভব হতো না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইবনুন নাফিসের কাজ ইউরোপে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে। তার ইবনে সিনার ব্যাখ্যা গ্রন্থটি মুসলিম বিশ্বে ইবনে সিনার কানুন ফিত-তিব্ব-এর জায়গা দখল করে নেয়। এই বই লিখে ইবনুন নাফিস বিরাট ধনী হয়ে যান। কিন্তু পশ্চিমে এর প্রভাব কমই পড়েছে। ভালো কথা! ইবনুন নাফিসের কিন্তু কোনো ল্যাটিন নাম নেই।'
'কী বলিস! ইবনে সিনার বই তো ইউরোপে ২০ শতক পর্যন্ত চলেছে। ইবনুন নাফিসেরটার এই দুর্দশা কেন?'
'সেটা অনুবাদ করা হয়নি বলে। তবে তার রক্ত সঞ্চালন অংশটা আন্দ্রেয়া আল্পাগো অনুবাদ করেছিলেন। তিনি অ্যারাবিক জ্ঞান অর্জনের জন্য ৩০ বছর সিরিয়ায় কাটান।'
কথাটা বুকে গিয়ে বিঁধল। একজন নন-মুসলিম অ্যারাবিক শেখার জন্য ৩০ বছর নিজ গৃহ হতে দূরে কাটায়, আমরা মুসলিম হওয়ার পরও ঘরে বসে হলেও অ্যারাবিক শেখার কোনোরূপ ইচ্ছাই প্রদর্শন করি না। তা-ও তার ছিল সেক্যুলার কারণ, আর আমাদের কুরআন বোঝার কত বড়ো কারণ রয়েছে।
'তিনি বইটি ইউরোপে নিয়ে আসার পর থেকেই বিভিন্ন ইউরোপিয়ান বিজ্ঞানী পালমোনারি সারকুলেশনের বর্ণনা দিতে থাকেন।'
'তাহলে তো হয়েছেই, প্রমাণিত।'
'নাহ, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন ট্র্যান্সমিশন প্রমাণ করতে হলে তার রুট বর্ণনা করা লাগে। সুস্পষ্ট হলেও ইতিহাসবিদরা গ্রহণ করেন না। তারা Smoking Gun খোঁজে! এত বেশি কঠিন করাটা আসলে ভাল্লাগে না, তবে এটা ঠিক। স্ট্রিক্ট স্টাডি মেথডোলজি কারও ভালো না লাগলে তার নিয়তে সমস্যা আছে।
যাহোক, ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন : আন্দ্রেয়াস ভেসালিয়াস, মাইকেল সারভেটাস, মারসেলো মালপিগি, রিয়েল্ডো কলম্বো, হুয়ান ভালভারদে, আন্দ্রেয়া চেসালপিনো ইত্যাদি। এদের মধ্যে ভেসালিয়াস আর সারভেটাস অ্যারাবিকে ফ্লুয়েন্ট ছিলেন। উইলিয়াম হার্ভির কৃতিত্ব হলো, ইবনুন নাফিস শুধু ফুসফুস-হৃৎপিণ্ডতে রক্ত সঞ্চালন ব্যাখ্যা করেন, যেখানে হারভি পুরো রক্ত সঞ্চালনই ব্যাখ্যা করেন।
সারভেটাস যে ইবনুন নাফিসের থেকে নিয়েছিল, এটাতে তো সন্দেহ নেই। তার ওপর, উইলিয়াম হার্ভির বর্ণনা ইবনুন নাফিসের বর্ণনার সাথে মেলে। আল্পাগোর অনুবাদটা পাদুয়াতে ছিল। হারভি ১৫৯৭-তে পাদুয়ায় যান। তা ছাড়াও সেই সময়ে পাদুয়া ইউনিভার্সিটিতে অসংখ্য অটোমান মুসলিম পড়ত। সুতরাং লিঙ্ক আছে।
তো, ইবনুন নাফিসের এ আবিষ্কারটা খুবই তুচ্ছ মনে হয়, তাই না?'
'হ্যাঁ, অনেকটা।'
'শূন্যের ব্যবহার প্রতিষ্ঠা গণিতে যে রকম গুরুত্বপূর্ণ, ইবনুন নাফিসের ফুসফুস-ধমনির মধ্যবর্তী রক্ত সঞ্চালন আবিষ্কার আধুনিক মেডিসিনে তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। '
'কি!'
'হুম। জর্জ সারটন বলেন, ইবনুন নাফিসের ব্যাপারটা সত্য প্রমাণিত হলে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা বিজ্ঞানীদের একজনে পরিণত হবেন। এখন তা প্রমাণিত এবং এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই।
একই ক্ষেত্রে, তিনি উল্লেখ করেন—নিশ্চিতভাবেই ফুসফুসীয় ধমনি ও শিরার মাঝে সূক্ষ্ম সংযোগ থাকবে অর্থাৎ কৈশিক জালিকা। তিনি এটি অ্যাক্রেডিটেড বিজ্ঞানী মারসেলো মালপিগির ৩০০ বছর আগে বলেন।'
'Whoa! কৈশিক জালিকার কথাও বলে গিয়েছেন তিনি।'
'এখনও তো أخي, আরও অনেক কিছু বাকি।' মুচকি হেসে বলল সিনান।
'করোনারি ধমনি রক্ত সঞ্চালনে কী ভূমিকা রাখে, সেটাও ইবনুন নাফিস বের করে দিয়ে যান। এখানেও ইবনে সিনার কাজকে সংশোধন করেন তিনি। Trachoma নামক জীবাণু (Chlamydia trachomatis) দ্বারা সংক্রমিত একটা রোগ। এর ফলে চোখের পাতার পেছনের অংশ শক্ত হয়ে যায়। যার ফলে ব্যথা হয়, মারাত্মক আকার ধারণ করলে একজন অন্ধও হয়ে যেতে পারে। এই রোগের নিরাময়ের জন্য তিনি ওষুধ তৈরি করেন। মানবদেহের বিপাক ক্রিয়াও তিনিই প্রথম বর্ণনা করেন। আরমান, বল তো, মৌলবিপাক কাকে বলে?'
'সম্পূর্ণ বিশ্রামরত অবস্থায় আমাদের দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ দ্বারা ব্যবহৃত শক্তিকে মৌলবিপাক বলা হয়।' আমি গড়গড় করে মুখস্থ বললাম।
'বৃক্কের পাথর আর মূত্রথলির পাথরের মধ্যে ইবনুন নাফিসই প্রথম পার্থক্য করেন। এর চিকিৎসায়ও তিনি এমন পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। তিনি করোনারি সার্কুলেশনও ব্যাখ্যা করেছেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা কী আর সাধে তাকে সঞ্চালনমূলক শরীরবিদ্যার জনক বলে!” কন্টিনুইটি দ্যাখ। আব্দুল কাহির ভাই বলেছিলেন, ফখরুদ্দিন রাজি ইবনে সিনার মেডিকেল কাজের ওপর ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। ইবনুন নাফিস ফখরুদ্দিন রাজির কাজের ওপর বিল্ড করেন। মানে পুরাতনটা ব্যবহার না করে সবচেয়ে আপডেটেডটা ব্যবহার করেছেন।
ইবনুন নাফিস ইসলামের বড়ো আলিম ছিলেন। শাফিই ফিকহ আর হাদিসে ছিল তার মাস্টারি। বুখারি ও মুসলিমের ওপর তিনি ব্যাখ্যাও লিখেছেন, অনেক জায়গায় পড়ানো হয় তার কাজ। '
'কি রে ব্যাটা!' তারিক বলল—'তাহলে তো এটা উলামার মাঝে বিজ্ঞান কন্টিনুইটি হয়ে গেল।'
'হ্যাঁ আসলেই' আমি বললাম।
সিনান সামনে গেল—'তিনি লিখেন আর-রিসালাতুল কামিলিয়াহ ফিস-সিরাতিন নাবাউইয়াহ বা কিতাব ফাদিল ইবনে নাতিক। কারণ, নায়কের স্টোরি ফাদিল ইবনে নাতিক নামের একজন ন্যারেট করেন। হাই ইবনে ইয়াকজানের মতো একটা দর্শনভিত্তিক উপন্যাস। এটি ইউরোপে Theologus Autodidactus নাম ধারণ করে। অবশ্য এটি তেমন আলোচিত হয়নি। দুই বইয়ের লক্ষ্যে কিছুটা ভিন্নতা আছে। ইবনে তোফায়েল বলেছেন—যুক্তি ও ওহি শেষে একই জায়গায় আসে। ইবনুন নাফিস বলেন—যুক্তি ও ওহি একে অপরকে পূর্ণ করে, সমান্তরালভাবে দুটোই লাগে। কিন্তু একই রেজাল্টের ব্যাপারে তিনি কিছু লিখেননি। হ্যাঁ, প্রাথমিকভাবে অকলুষিত যুক্তি দিয়ে একজন আল্লাহকে পেতে পারে, এমনকী নবিকেও চিনতে পারে। তবে ধর্মের আরও গভীর বিষয়গুলো কেউ কখনো একা একা বুঝবে না। অথোরিটি ফলো করতে হবে। আরও লিখলে—ইবনে তোফায়েলও নিশ্চিতভাবে এটা বলতেন।'
'বাকিটা অন্যদিন বলিস, এবার পড়ে যা।'
'কি, মজা লাগছে না?'
'আগে যা বলেছিস, তার তুলনায় না।'
'ঠিক আছে। তবু কিছু মূল কথা বলে নিই। ইবনুন নাফিসের বইটা ইতিহাসের প্রথম ধর্মতাত্ত্বিক উপন্যাস। মানে Philosophical Theology টাইপের আরকি। এখানেও একটা নির্জন দ্বীপ আছে—যেখানে কামিল নামের এক ছেলের বাস। কামিল মানে তো জানিসই; Perfect। এখানে কামিল একজন খাঁটি মুসলিমের প্রতিনিধিত্ব করে। এর মাধ্যমে তিনি মুহাম্মাদ-এর জীবনের আর মুসলিম জাতির ইতিহাসের ঘটনা, তার নিজের জীবনকালে হওয়া মোঙ্গলদের আক্রমণ আর সে সময়ে মুসলিম শাসকদের অবস্থা বিমূর্ত চিন্তার মাধ্যমে দেখিয়েছেন। অবশেষে লিখেছেন, সবই আল্লাহর নির্দেশে হয়েছে। আর এর থেকে ভালো কিছু ঘটা সম্ভব ছিল না। আখিরাত আর আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণে তিনি তার বইতে যুক্তিভিত্তিক আর্গুমেন্ট দেন।
জাবির বিন হাইয়ানের চিন্তাধারা সায়েন্স ফিকশনের প্রথম চিহ্ন। এদিকে ইবনুন নাফিস তার বইয়ে ইসলাম অনুযায়ী শেষ জামানার দিনগুলোকে গল্পের মধ্যে যুক্তি দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করেন। তাই অনেকে তার বইকে ইতিহাসের প্রথম সায়েন্স ফিকশন বলে খেতাব দেন। বইটি বায়োলজি, জিওলজি, কসমোলজি সাথে দিয়ে ফিউচারোলজির মিশেল। বর্তমানের তরুণরা তো সায়েন্স ফিকশন ভালোবাসে। রবার্ট হাইনলাইন, আইজ্যাক আসিমভ, জাফর ইকবাল, হুমায়ুন আহমেদদের নিয়ে তাদের অনেক মাতামাতি। এই লেখকদের নিজের দক্ষতা অস্বীকার করছি না, কিন্তু এই সাহিত্যের ধরনের আবির্ভাব হয়েছিল মুসলিমদের কলমে।'
সিনানের বাসা চলে এলো— 'ইবনুন নাফিস মেডিসিনের ওপর ৮০ খণ্ডের এক বিশাল এনসাইক্লোপিডিয়া লিখতে শুরু করেছিলেন।'
'কি!' আমি অবাক হলাম।
তারিক বলল—'একটার পর একটা রেকর্ড ভাঙছে। প্রথমে মনে করেছিলাম, ইমাম তাবারি সবচেয়ে বড়ো বই লিখেছেন; পরে খবর পেলাম, মারওয়ান ইবনে হাইয়ান ইতিহাস লিখেছেন ৬০ খণ্ডে। এখন মেডিসিনের বই ৮০ খণ্ড। ইবনে আসাকিরের তারিখুল দিমাস্ক ৮০ খণ্ডে পাবলিশ হয়েছে। ইতিহাসের বই নাহয় বড়ো লেখা যায়, কিন্তু মেডিসিনের বই এত বড়ো কীভাবে?'
সিনান বলল—'মূলত তিনি ৩০০ খণ্ড করতে চেয়েছিলেন। তবে আগেই আল্লাহ তাঁকে নিয়ে যান। বইটির ২৮ খণ্ড বর্তমানে প্রকাশিত হয়েছে, আজও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বইটি ব্যবহার করেন। এই জাতের বই একজন লিখেছেন, এটাই সবচেয়ে বড়ো আশ্চর্য। দুঃখজনক, ইবনুন নাফিস এর সঠিক খ্যাতি পেলেন না। চিন্তা করে দেখ, এমন একটি জটিল বিষয়ে এমন একটা বই লিখতে কীরকম পরিশ্রম হয়ে থাকবে।'
'যা! বিশ্বাস হয় না। এত বড়ো বই একজনে কীভাবে লেখে আবার!'
'তুই বিশ্বাস করিস না, পাণ্ডুলিপি পড়ে আছে আলেপ্পো আর অক্সফোর্ডে!'
'মৃত্যুর আগে ইবনুন নাফিস তার বিশাল আলিশান বাড়ি আর লাইব্রেরি কালাউন হাসপাতালকে দান করে দেন।' গেটের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলে গেল সিনান।

টিকাঃ
১. Saeed Changizi Ashtiyani and Mohsen Shamsi. 'The Discoverer of Pulmonary Blood Circulation: Ibn Nafis or William Harvey?' Middle-East Journal of Scientific Research. 18:5 (2013), 562-568.
২. Emilie Savage-Smith. 'Attitudes Toward Dissection in Medieval Islam.' Oxford Journal. 50:1 (1955), 74.
৩. 'ইবনুন নাফিস' in আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 4.
৪. রক্ত সঞ্চালনের অংশ ‘ইবনুন নাফিস’ in আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 4.-হতে দেওয়া। আরও তথ্যের জন্য: John B. West. "Ibn al-Nafis, the Pulmonary Circulation, and The Islamic Golden Age" Muslim Heritage.
৫. মাজেদা বেগম ও অন্যান্য, জীববিজ্ঞান ২য় পত্র (কাজল ব্রাদার্স লিমিটেড, ২০১৯) পৃষ্ঠা: ১৮০-১৮১.
৬. Ehsan Masood p: 110
৭. স্মোকিং গান মানে অকাট্য প্রমাণ।
৮. Rabie el-Said Abdel-Halim. 'Contributions of Ibn Al-Nafis to the Progress of Medicine and Urology' Muslim Heritage.
৯. Michael H. Morgan p: 215
১০. J. Schacht, Ibn al-Nafis, Servetus and Colombo p: 317 336, in M. Shamsher Ali op. cit.
১১. Rabie el-Said Abdel-Halim. 'Contributions of Ibn al-Nafis to the Progress of Medicine and Urology' Muslim Heritage.
১২. Ghalioungui, P. 'Was Ibn al-Nafis unknown to the scholars of the European Renaissance?' (Clio medica, 1983) p. 38
১৩. Ekmeleddin Ihsanoglu. 'The History of Scientific Interaction' Muslim Heritage.
১৪. Michael H. Morgan p: 214
১৫. Marmaduke William Pickthall and Muhammad Asad, Islamic Culture (Islamic Culture Board. 1971)
১৬. John B. West. 'Ibn al-Nafis, the Pulmonary Circulation, and The Islamic Golden Age' Muslim Heritage.
১৭. Arman Zargaran. 'Avicenna or Ibn Nafis; who did mention to the role of coronary arteries in blood supply of the heart?' International Journal of Cardiology. 247 (2017), 47.
১৮. Emilie Savage Smith. 'Drug Therapy in Trachoma and its sequelae as presented by Ibn al-Nafis' Pharmacy in History. 14:3 (1972), pp: 95-110.
১৯. 'Metabolism: The Physiological Power-Generating Process' pulse.embs.org
২০. Rabie el-Said Abdel-Halim. 'Contributions of Ibn al-Nafis to the Progress of Medicine and Urology' Muslim Heritage.
২১. Ibid
২২. Ibid
২৩. Nahyan Fancy. 'Verification and Utility in the Arabic Commentaries on the Canon of Medicine: Examples from the Works of Fakhr al-Din al-Razi (d. 1210) and Ibn al-Nafis (d. 1288)' Journal of the History of Medicine and Allied Sciences. 75:4 (2020), pp. 361-382.
২৪. Sami Haddad and Amin A. Khairallah, 'A Forgotten Chapter in the History of the Circulation of Blood' Annals of Surgery. 104:1 (1936), 1-8.
২৫. John Freely, Light from the East: How the Science of Medieval Islam Helped to Shape the Western World. (I. B. Tauris. 2015)
২৬. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 4. c, vt 553
২৭. Dr. Abu Shadi al-Roubi (1982), 'Ibn Al-Nafis as a philosopher', Symposium on Ibn al-Nafis, Second International Conference on Islamic Medicine: Islamic Medical Organization, Kuwait; available at: http://www.islamset.com/isc/nafis/drroubi.html
২৮. 'Medical Knowledge' in 'Hospital' in Salim al-Hassani op. cit.
২৯. Charles Coulston Gillispie (edt), Dictionary of Scientific Biography (Scribner, 1978) pp. 602-06.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 সূর্যোদয়

📄 সূর্যোদয়


জুমার নামাজের পর আমাদের আলোচনার আয়োজন চলছে। অর্থাৎ কোনো এক বন্ধ দোকানের খোঁজ করছি আমরা। তার সামনে থাকা টুল-বেঞ্চিতে বসে আমাদের জ্ঞানের আড্ডা চলবে। অবশেষে এমন দোকান পেয়ে গেলাম।
বসার পর প্রথমেই তারিক বলল—'আজ তোদের এক অসাধারণ গল্প শোনাব—আল বেরুনির মৃত্যু।'
'টাইটেলটা তো চরম!' আমি বললাম।
'আল বেরুনির মৃত্যু বর্ণনাকারীর ভাষাতেই বলছি—
"আমি শুনতে পেলাম, আল বেরুনি মারা যাচ্ছে। তাকে শেষ একবার দেখার জন্য তাড়াহুড়ো করে তার বাসায় উপস্থিত হলাম। বোঝাই যাচ্ছিল, সে আর বেশি সময় থাকছে না। যখন আশেপাশের মানুষ আমার উপস্থিতির ব্যাপারে তাকে জানাল, তখন তিনি চোখ খুলে বললেন—তুমি কি অমুক? আমি হ্যাঁ বললাম। তিনি বললেন—শুনতে পেরেছি, তুমি ইসলামের উত্তরাধিকার আইনসংক্রান্ত একটি জটিল সমস্যার সমাধান জানো। তারপর তিনি একটি বিখ্যাত প্রশ্নের প্রতি ইঙ্গিত করলেন—যা পূর্বের ফকিহদের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। আমি বললাম—আবু রায়হান! এই সময়ে? আর আল বেরুনি উত্তর দিলেন—তোমার কি মনে হয় না, অজ্ঞ থেকে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে জেনে মৃত্যুবরণ করাই অধিক উত্তম? নিজ অন্তরে বেদনা নিয়ে আমি তাকে আমার সমাধান ব্যাখ্যা করলাম। তারপর তার থেকে বিদায় নিলাম। তার বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই ভেতর থেকে চিৎকার শুনতে পেলাম—আল বেরুনি মারা গেছেন।"'
আমি ও সিনান স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পর বললাম—‘আচ্ছা, একটা জিনিস অনেক দিন ধরে তোদের জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম—বাংলাদেশে ইসলামের প্রভাব কীরকম?’
সিনান বলল—‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে তো পড়েছিসই—মুসলিম শাসনামল ছিল বাংলার স্বর্ণযুগ।’
‘আর ইউরোপিয়ানদের?’
তারিক হাসতে হাসতে উত্তর দিলো—‘আর বলিস না। আমাদের দেশের জন্য তো তারা ছিল You're-a-pee-in!’
সিনান বলল—‘আবারও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই থেকেই ধারণা পাওয়া যাচ্ছে—ক্লাস সিক্স থেকেই তো ইংরেজরা কী করেছে আমাদের দেশে—তা দেখানো হচ্ছে।’
তারিক বলল—‘বুঝেছি আমি। তুই জুনিয়র স্কুলে থাকাকালে একটুও পড়ালেখা করতি না। তোর আউফাউ প্রশ্ন শেষ হয়েছে এখন? সিরিয়াস একটা জিনিস জানতে হবে আমার।’
‘তো বল না! তোর মুখ চেপে ধরে আছি নাকি আমি?’
‘আচ্ছা সিনান, ইসলামি স্বর্ণযুগের পতন হলো কীভাবে? ব্যাপারটা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিন ধরেই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজে বের করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু মেলাতে পারছি না।’
‘হুম, পতন নিয়ে অনেক ক্যাচাল।’ সিনান উত্তর দিলো—‘এমনিতে ইসলামি স্বর্ণযুগ ধরা হতো অষ্টম হতে ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত। জর্জ সার্টনও এমনই বলেন। কিন্তু তার মারা যাওয়ার মাত্র ২০ বছরের মধ্যেই এমন এমন তথ্য পাওয়া যায়, যার কারণে ইতিহাসবিদরা এই সময়কাল বাড়াতে বাধ্য হন। ২১ শতাব্দীতে এসে আধুনিক স্কলাররা একে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত বাড়ান। কিছু কিছু বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ একে ১৭শ শতাব্দী পর্যন্তও নিয়ে গিয়েছেন। আবার ডেভিড কিং বলেন—১৮শ শতাব্দীর শুরুর দিকেও ইরানে উচ্চমানের জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছিল।
ডেভিড কিং যেসব মাইন্ডব্লোইয়িং তথ্য দিয়েছেন, কী বলব। শুধু ইরানেই দুই লাখের বেশি ম্যানুস্ক্রিপ্ট পড়ে আছে—যেগুলো ঘাঁটা হয়নি। ১৯৯৯ সালে ডেভিড কিং গবেষণা করার জন্য সেখানে যান। তিনি সেখানে ৮০০০ ম্যানুস্ক্রিপ্ট নির্বাচন করেন গবেষণা করার জন্য। সেখানে গণিত আর জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে চারশতরও বেশি বই ছিল। তার মধ্যে অনেকগুলো এমন ছিল—যেগুলো হারিয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হতো। মুসলিমদের লেখা মোট ৫০ লাখ ম্যানুস্ক্রিপ্ট বর্তমানে পাওয়া যায়।'
'৫০ লাখ!' অজান্তেই আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল।
'কিছু স্কলারের মতে ৮০ লাখ। প্রশ্ন হচ্ছে, এর কতগুলো সম্পাদিত হয়েছে? সেগুলো গবেষণা করার পর আরও কী কী বের হবে, কে জানে!'
'আচ্ছা, পতনের মূল কারণটা কী?' তারিক জিজ্ঞেস করল।
'দাঁড়া, মাইন্ডব্লোইয়িং তথ্য এখনও শেষ হয়নি। এবার খবর দিচ্ছেন, জর্জ স্যালিবা। তিনি বলেন—১২শ হতে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত কোনোমতে রিসার্চ হয়েছে।'
তারিক বলল—'কোনোমতে মানে কী? ইবনুন নাফিস তো ১২শ শতকের পরে, বদিউজ্জামান জাজারিও পরে; কোনোমতে ঘাঁটাঘাঁটি করে এসব পেলে ভালোভাবে ঘেঁটে কী পাবে!'
সিনান মুচকি হাসি দিয়ে বলল— 'প্রফেসর স্যালিবা আরও বলেন, ১৬শ শতাব্দীর পর কোনো গবেষণাই হয়নি। আসলে পতন যে হতেই হবে, তেমন কোনো কথা নেই। সম্পূর্ণ গবেষণা শেষ হওয়া পর্যন্ত এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে যদি একটি কালচারের তুলনায় অন্য কালচারে বিজ্ঞান নিয়ে বেশি কাজ শুরু হয়, তখন এমনিই মনে হয় যে প্রথম বিশ্বে পতন ঘটেছে। মুসলিম বিশ্বের জন্য ব্যপারটা খুব সম্ভবত অমনই। আর দর্শনের ক্ষেত্রে মূলত ওই রকম পতন হয়ইনি। কথা হচ্ছে—পরবর্তীকালের মুসলিম দার্শনিকদের কোনোরকম প্রভাব পশ্চিমা দার্শনিকদের ওপর পড়েনি; যার কারণে অযাচিতভাবে ওরিয়েন্টালিস্টরা ধরে নেয়—মুসলিম বিশ্বের দর্শনে মাইমনিডিসের পর চরম ধস নেমেছে। না খুঁজেই তারা ভেবে নেয় যে—নেই।
ছোটোখাটো কিছু পয়েন্ট আলোচনা করি। এক. মোঙ্গল আক্রমণ, ক্রুসেড, স্পেন হারানো, মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল—মোটকথা যুদ্ধের পরিবেশে বিজ্ঞান হয় না। দুই. প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগ। মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন সময় অসংখ্য মানুষ মারা যায়। তিন. ভাষার পরিবর্তন। বিজ্ঞানের ভাষা আরবি ছিল। কিন্তু পরে তা পালটে যায়। তাই মুসলিমরা আপডেটেড কাজ পড়ে বাউন্স ব্যাক করতে পারেনি। চার. ইসলাম প্র্যাকটিস ছেড়ে দেওয়া। অনেকে এটাকে কুকথা বলবে, কিন্তু লজিক্যালিই এটা ঠিক। ইবনে খালদুন বলেন—“অপচয় শুধু একটা ইসলামবিরোধী কাজই নয়; বরং ইসলামি স্বর্ণযুগের পতনেরও বড়ো একটা কারণ।” আর যেহেতু ইসলামি প্যারাডাইমে কাজ হতো, তাই এটা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ হিসেবে থাকবে। ডোনাল্ড হিল আর আহমাদ ইউসুফ হাসানের মতো বড়ো বড়ো স্কলাররাও এই মত গ্রহণ করেন। পাঁচ. প্যাট্রোনেজ প্রবলেম। ইবনে খালদুনের মতে—ট্রেড রুটগুলো মোঙ্গলরা ধ্বংস করে দেয়। মুসলিমদের অর্থনীতিতে এটার খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। স্পেন থেকে মুসলিমদের বের করে দেওয়ার পরও অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর, টাকা ছাড়া বিজ্ঞান করা অসম্ভব। ইসলামের চাঁদের অধঃপতনের এগুলো কেবল কয়েকটা কারণ।'
'আচ্ছা!' তারিক এমনভাবে চিল্লিয়ে উঠল, যেন এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে গিয়েছে। 'তাহলে এই সময়ই ইসলামের পূর্ণ চন্দ্রের পতাকাকে অর্ধচন্দ্র বানিয়ে দেওয়া হয়।' তারপর দাঁত দেখাল।
সিনান বিরক্তির ভাব নিয়ে বলল—'ওয়াও তারিক! এত মাসে তোর চিন্তাধারার চমৎকার উন্নতি ঘটেছে।'
'আমি জানি।' তারিক মহাখুশি।
'আচ্ছা, আরও কিছু কথা বলি। মোঙ্গলদের তাণ্ডবের ব্যাপার তো জানা আছে। তারপর, লাইব্রেরিয়ান আমাদের বলেছিলেন, অসংখ্য লাইব্রেরির বই ধ্বংস করে দেওয়া হয়। লক্ষ করবি, এমন একজন মধ্যযুগীয় মুসলিম লেখকও নেই— মনে কর—১০০টার মতো কাজ করেছেন, যার সবগুলোই পাওয়া যায়।
সেটা নাহয় গেল। মুসলিমদের বিজ্ঞানকে উড়িয়ে দিয়ে স্পেনের খ্রিষ্টানরা কী করল? লাখ লাখ মুসলিমকে খুন আর আহত করে তাদের নিশ্চয়ই নিজেদের স্বর্ণযুগ প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল। প্রতিবেদন আছে, ১৫ শতকে স্পেনে ১০ লাখ ৫ হাজার বই পোড়ানো হয়। ইউরোপের প্রথম অ্যাস্ট্রনমিক্যাল অবজারভেটরি স্প্যানিশ মুসলিমদের তৈরি করা। কিন্তু যখন খ্রিষ্টানরা এটার দখল নিল, তারা বুঝল না—কী করবে এটা দিয়ে। অসাধারণ অবজারভেটরিটাকে ঘণ্টা বাজানোর টাওয়ারে পরিণত করে দেওয়া হলো!'
সিনান চালিয়ে গেল—'এত এত বই গায়েব করে দেওয়ার পর এখন যা জানছি, তাতেই শিহরন জাগে। সেসব বই থাকলে কী হতো—একবার চিন্তা করে দেখ। স্প্যানিশ ইতিহাসবিদ উলিক বার্ক বলেন—প্রতিষ্ঠানগুলো উজ্জ্বল ছিল মুসলিমদের শাসনে, মরে যায় যখন মুসলিমরা চলে যায়; আর ৪০০ বছরের আলো ও শিক্ষার পর আন্দালুসিয়া আবার পতিত হয় সেই খ্রিষ্টান শাসনের তলে, অজ্ঞতা ও বর্বরতার একটি অবস্থার মধ্যে।
১৭শ শতাব্দীর পর থেকে বিভিন্ন মুসলিম দেশ কলোনাইজ করা শুরু হয়। এই সময়ই সব মাটিতে মিশে যায়। ব্যক্তিগতভাবে এটাকে আমি সবচেয়ে বড়ো কারণ হিসেবে দেখি আপাতত।'
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর দীর্ঘশ্বাস ফেললাম—‘কী ইতিহাস ছিল রে অাখি, পৃথিবীতে সবচেয়ে ওপরে, সবচেয়ে বেশি ধনী ছিলাম আমরা। সেই স্পেনের পতনের পর সব শেষ হয়ে গেল!’
‘নাহ, তারপরও আমরাই সবচেয়ে বেশি ধনী ছিলাম। আফ্রিকায়, মালির মানসা মুসার কাছে বলতে গেলে অসীম পরিমাণে ধন-দৌলত ছিল। তিনি নিজে ইসলামের আলিম ছিলেন এবং অন্যদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য মালিতে খুব উন্নত সেন্টারও খুলেছিলেন।
এমনকী তার পরেও অটোমান সাম্রাজ্যে ইসলামের ভূমিগুলোতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ছিল। এরপর মাঝের ২০০ বছর হয়তো-বা আমাদের জন্য এত ভালো কাটেনি, কিন্তু এখন? আবারও আমাদের টাকার কোনো অভাব নেই। কাতার, সৌদি আরব, আরব আমিরাতের থেকে কতগুলো মানুষ আছে—যারা বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবের মালিক? নিজ দেশে যে বিশ্বমানের ইউনিভার্সিটি নেই—সেটা দেখবে না। এই হলো আজকের মুসলিমদের অবস্থা। এইখানেও পশ্চিমাদের নকল করতে গিয়ে সমস্যায় ভুগছে মুসলিমরা।'
তারিক বলল—'চোরা কপি! নকলের কাজও ঠিকমতো করে না এরা। শুধু বিনোদনের জগৎকে কপি মারে, শিক্ষার অংশকে কপি করার চিন্তা মাথায় আসে না। সেটাও নকল করে অবশ্য, কিন্তু ওই চোরা, ডাকাইত্যা কপি! ঠিকঠাক উন্নয়ন করতে পারে না।'
সিনান বলল—'ঠিক বলেছিস রে। একটি জিনিস দেখ, ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্টের সময় সকল বই না, শুধু নির্দিষ্টসংখ্যক বই অনুবাদ করাতে মুসলিমরা যে টাকা খরচ করে, তা বর্তমানের UK-এর মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের মোট বাজেটের দ্বিগুণ। সবচেয়ে সেরা মানের স্কলারদের বেতন ছিল বর্তমান সময়ের অ্যাথলিটদের বেতনের সমান।'
সিনানের কথাগুলো শুনে চোখ কপালে উঠে যাচ্ছে।
'আর এখন দেখ, মুসলিমরা শিক্ষায় খুবই কম টাকা ইনভেস্ট করে। ১৯৯০ সালের একটি হিসাবে দেখা গিয়েছিল, মুসলিম বিশ্বে GDP-এর ১%-এর অর্ধেকেরও কম বৈজ্ঞানিক গবেষণার পেছনে ব্যয় হয়। ধীরে ধীরে অবশ্য তা বাড়ছে। বিশাল উন্নয়ন লক্ষ করা যাচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ!
কলোনাইজেশনে ফিরে যাই চল। কলোনাইজেশনের ফলে কলোনাইজড মস্তিষ্কের অনেক মানুষ গড়ে ওঠে। আসলে এটা সব সময় তাদের প্ল্যান ছিল, যেন আঞ্চলিক মানুষদের নিজ চিন্তাধারায় এনে পাশ্চাত্যের দাস বানিয়ে রাখা যায়। বর্তমানে কলোনিয়াল পিরিয়ড নেই, কিন্তু কলোনিয়াল মস্তিষ্কের মানুষ রয়ে গেছে। কিছু উদাহরণ দেখবি? মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক তো বলতে গেলে তুর্কিতে ইসলামই ব্যান করে দেন। মিশরে আর ইরানেও মুহাম্মাদ আলি, জামাল আব্দুল নাসের আর রেজা শাহ পাহলভি মুসলিমদের ওপর অত্যাচার চালাতে থাকে। ইতিহাস থেকে কিছুই শিখল না তারা। ইসলামকে সরিয়ে বিজ্ঞান আনবে মনে করেছিল, অথচ আগের বিজ্ঞান ছিল ইসলামের কারণেই। শেষে ফল কী হলো? তারিকের মাথা!'
'আমি কী করলাম!'
'না মানে তোর মাথা থেকে সব সময় অসাধারণ সব লজিক বের হয় তো, সেজন্য বললাম। এই সময়ের মুসলিম সংস্কারকরা বেশিরভাগই চেয়েছে, পাশ্চাত্যের অনুসরণ করে মুসলিমদের ওপরে তুলতে। এখন পশ্চিমে যে টেকনোলজি আর যে ডেটা ডেভেলপ হয়েছে, সেসব আমাদের লাগবে। কিন্তু অত্যন্ত সাবধান থাকা উচিত ছিল, যেন তাদের ভাবধারাটা আমাদের মাঝে চলে না আসে। দুঃখজনকভাবে সেটাই হয়ে যায় উলটো।
এখন মুসলিম বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ পশ্চিম ছাড়া আর কিছু বোঝে না। দ্যাখ, মুসলিম বিশ্বের প্যারাডাইম অনুযায়ী এখানে শিক্ষা প্রয়োজন। জোর-জবরদস্তি করে অন্যটা চাপালে ফল ভালো হয় না। এই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা মুসলিমদের ধ্যানধারণার বিপরীত ছিল। যার কারণে দেখা যায় অসংখ্য সমস্যা। “নতুন বিশ্বের জন্য নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন” এই কথা যদি কেউ বলে, তাহলে সিম্পল জবাব হচ্ছে—মুসলিমরা নিজ ট্র্যাডিশন থেকে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা ডেভেলপ করবে। পশ্চিমকে কপি করা স্টুপিডিটি। মুসলিমদের নিজেদের কালচারাল আইডেন্টিটি অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন; সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা না।
সেক্যুলার ভাবধারার প্রতিষ্ঠা মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞানের পতনের অন্যতম কারণ ছিল। গোল্ডেন এইজে মাদরাসায় বিভিন্ন ইসলামি সাবজেক্টের সাথে সায়েন্স সব সময়ই পড়ানো হতো। আসলে ইসলামি ফ্রেমওয়ার্কে জ্ঞান অন্বেষণকে ঐশ্বরিক আদেশ আর মানব অস্তিত্বের অধিবিদ্যাগত বাস্তবতা হতে প্রাপ্ত নৈতিকতা থেকে আলাদা করা যায় না। সব ধরনের জ্ঞান একটা ইন্টেগ্রেটেড সিস্টেমের মাঝে পড়ানো হতো। কিন্তু সেক্যুলার সিস্টেম দুটোকে আলাদাভাবে দেখে। এটা পুরো একটা এপিস্টেমিক পরিবর্তন, যার সাথে মুসলিমরা কখনোই খাপ খাওয়াতে পারেনি।
মুসলিমদের মাঝে পাশ্চাত্যের ধ্যানধারণার দাস টাইপের মানুষরা তো আছেই। সাথে দিয়ে যারা ট্র্যাডিশনাল মুসলিম, তাদের ওপর পর্যন্ত কলোনিয়ালিজম ও ওরিয়েন্টালিজমের বাজে প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে অসংখ্য মুসলিম এসব দ্বারা প্রভাবিত, কিন্তু তারা সেটা বোঝেও না। একটা উদাহরণ দিই—
১৮৬৬ সালে ভারতীয় উলামার একটি গ্রুপ দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। দারুল উলুম দেওবন্দের কারিকুলাম দারস-ই নিজামির একটা রিফর্মড ভার্সন দ্বারা বিশালভাবে প্রভাবিত ছিল। এই দারস-ই নিজামি শিক্ষাধারার জন্য আমাদের ১৮শ শতকের স্কলার মুল্লাহ নিজামুদ্দিন সাহলাভিতে ফিরে যেতে হবে। দারস-ই নিজামির কারিকুলাম মূল শিক্ষা ধারায় ইঞ্জিনিয়ারিং, জ্যোতির্বিদ্যা, মেডিসিন অন্তর্ভুক্ত ছিল। ট্র্যাডিশনাল ইন্টেগ্রেটেড ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা। এই মূল কারিকুলামে থাকা এই উলুম আল মানকুল মানে মস্তিষ্কপ্রসূত জ্ঞানের প্রধান প্রধান অংশগুলো দেওবন্দি রিফর্মে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এই কাজটাকে জাস্টিফাই করার জন্য তারা বলে—যাদের মডার্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োজন আছে, তারা মাদরাসা সিস্টেমের বাইরের সেক্যুলার স্কুল-কলেজে গেলেই পারে। এই চিন্তাধারাই দেখিয়ে দেয়—কীভাবে মুসলিমরা নিজেরাই নিজেদের ট্র্যাডিশনাল কেন্দ্রীভূত জ্ঞানব্যবস্থাকে খণ্ড-বিখণ্ডে ভেঙে ফেলে কলোনিয়াল সিস্টেম থেকে আসা সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা ও চিন্তা-চেতনার বিজয়ের দ্বার খুলে দেয়!'
মন খারাপ হলো অনেক এসব জানতে পেরে। 'এসএসসি পর কী করবি সিনান?' জিজ্ঞেস করলাম।
'স্টাডি রিথিংক ও রি-অর্গানাইজ করব।'
'কীরকম?'
'আমার কাছে মনে হতে শুরু করেছে, নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য বা ইন্টেলেকচুয়াল ট্র্যাডিশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাটা বিশাল সমস্যা। তাই ১৪শ বছরে মুসলিমদের ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্টের সামগ্রিক ধারণা রাখা প্রয়োজন। আমার মনে হয় সেটা করতে পারলে অনেক প্রবলেম সলভ করা যাবে। সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞানের ইতিহাসও আবার স্টাডি প্রয়োজন।
আর মুসলিম বিজ্ঞানীদের ইতিহাস স্টাডির গুরুত্ব মেইনলি দুই দিক থেকে দেখি—আমাদের ইতিহাসে আমরা কী করেছি সেটা তুলে ধরা; নিজেদের জাতির জন্য তো গুরুত্বপূর্ণই, সাথে দিয়ে এর ফলে ইউরোসেন্ট্রিজম রিফিউট হবে। ইসলামি স্বর্ণযুগ নিয়ে অসংখ্য ভুল ধারণার ছড়াছড়ি আছে; এসব ঠিক করতে হবে। দ্বিতীয়টা হলো—বিজ্ঞানের সাথে ইসলামের সম্পর্ক কেমন ছিল, কীভাবে ছিল সেসব যাচাই করা। ক্লাসিক্যাল মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক চিন্তা-কাঠামো বোঝাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর তারপর আধুনিক দর্শন, ফিলোসফি অব সায়েন্সও জানা প্রয়োজন। কুরআন, সিরাহ স্টাডি তো আছেই। এসএসসির পর সব প্রায়োরিটাইজ করব। '
উঠে বাসার দিকে হাঁটা দিলাম তিনজনে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেখা-সাক্ষাৎ কমিয়ে দেবো। এসএসসির প্রস্তুতি নিতে হবে এখন। আলোচনার বদলে নিজেদের স্টাডিতে বেশি নজর দিতে হবে। আলাদা হয়ে যাওয়ার আগে সিনান বলে গেল—
'আর... যদি কোনো সময় মুসলিম বিজ্ঞানীদের কৃতিত্ব নিয়ে কোনো রকম সন্দেহ জাগে, শুধু আকাশের দিকে তাকাবি আর ভাববি, ওপরে যতগুলো তারা দেখতে পাচ্ছি, তার মধ্যে যতগুলোর নামকরণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই অ্যারাবিক। '

টিকাঃ
১. Abdus Salam, Islam and Science: Concordance or Conflict? UNESCO House, Paris, 27 April, 1984.
২. বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ২০১৭) p: 158.
৩. Muzaffar Iqbal, p: 124
৪. George Saliba, ch. 7.
৫. ড. এহসানুল করিম, মুসলিম ইতিহাসের ঘটনাপঞ্জি p: 57 ibid
৬. Peter Adamson, Golden Ages: The Later Traditions in Philosophy in the Islamic World op. cit.
৭. James E. McClellan and Harold Dorn (edt), Science and Technology in World History (John Hopkins University Press, 2006) p: 103-115; Ahmad Y. Hassan and Donald Routledge Hill, Islamic Technology: An Illustrated History; (Cambridge University Press, 1986) p: 282; আরও দেখুন: Armen Firman. The Fall of Science in Muslim Lands The Muslim Vibe.
৮. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 1, p: 461
৯. এইচ কামেন, দ্যা স্প্যানিশ ইনকুইজিশন, in ড. এহসানুল করিম, মুসলিম ইতিহাসের ঘটনাপঞ্জি (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ফেব্রুয়ারি ২০১৫) p: 61; Jonathan Lyons op. cit.
১০. Abu Zakariya, The Eternal Challenge: A Journey Through the Miraculous Qur'an (onereason, 2015) p: 93.
১১. John Green, 'Mansa Musa and Islam in Africa - Crash Course World History #16' online video, Crash Course.
১২. Firas al-Khateeb, Lost Islamic History. Op. cit.
১৩. Melvin Bragg, 'In Our Time Al-Kindi'. bbcnews.com. 28 June 2012; available at: http://www.bbc.co.uk/programmes/b01k2bv8
১৪. Karen Armstrong, Islam: A Short History op. cit.
১৫. 'Social Science and Economics' in 'The World' in Salim al- Hassani op. cit.
১৬. ফয়সাল মালিক, মাদরাসা, রিফর্ম ও মুসলিমদের জ্ঞানতাত্ত্বিক কলোনাইজেশন, অনুবাদ : আরমান ফিরমান, Medium, tinyurl.com/y5vgxdfx.
১৭. Amber Haque. "Psychology from Islamic Perspective: Contributions of Early Muslim Scholars and Challenges to Contemporary Muslim Psychologists' Journal of Religion and Health, Vol. 43, No. 4 (2004): 357-377.
১৮. John Walbridge, God and Logic in Islam: The Caliphate of Reason (Cambridge University Press, 2011) p: 99.
১৯. ফয়সাল মালিক op. cit.
২০. Sajid Muhammad Qasmi, Madrasa Education Framework (Delhi: MANAK Publications Pvt. Ltd, 2005) as cited in ফয়সাল মালিক
২১. Nidhal Guessoum. 'Islam and Science: The Next Phase of Debates' Zygon. 50:4 (2015).
২২. P. Kunitzsch, The Arabs and The Stars: Texts and Traditions on the Fixed Stars, and Their Influence in Medieval Europe (Variorum: Aldershot, 1989)

ফন্ট সাইজ
15px
17px