📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 বিবর্তনবাদ ও মুসলিম বিজ্ঞানীগণ

📄 বিবর্তনবাদ ও মুসলিম বিজ্ঞানীগণ


প্রি-টেস্ট। 'বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়' পরীক্ষা। রোলের তারতম্য থাকায় আমাদের ও সিনানের রুম আলাদা। হলে গিয়ে দেখি, রনি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। 'কি রে রনি, কী হয়েছে তোর?'
'গত দেড় বছর যে কী পড়েছি! বই খুলে কিছু চিনতে পারছি না।'
পেছন থেকে তারিক লাফিয়ে উঠল—'পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে!' ২৯টি বহুনির্বাচনী দাগিয়ে ফেলেছি, একটি বুঝতে পারছি না। কাউকে জিজ্ঞেস করব? যদিও এটা অনুচিত, কিন্তু না পেরে করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কাকে জিজ্ঞেস করা যায়? বিশ্বাসও নেই, ভুল বলে দেয় নাকি! জানি, তারিক কোনো কাজের না, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য বলে তাকেই জিজ্ঞেস করলাম। সে কিছুক্ষণ মাথা চুলকে বলল—'সমস্যা নেই, চারটাই দাগিয়ে দে, একটা হয়ে যাবে।'
পরীক্ষা শেষে তারিককে জিজ্ঞেস করলাম— 'কত অ্যানসার করেছিস?'
উত্তর দিলো—'কত অ্যানসার করেছি তা জানতে চাই না!'
পরেরদিন যেহেতু বন্ধ আছে, তাই আমরা তিনজন সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিকালে বের হওয়ার। আসর নামাজ আদায় করে তাদের সাথে মিলিত হলাম। 'সিনান, তোকে অনেকদিন ধরে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম। বিবর্তনের ব্যাপারটা কী রে? মুসলিম বিজ্ঞানীরা দেখছি এর সাথে সংশ্লিষ্ট।'
তারিক বলল—'অনেক আগেই তো মনে হয় বিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন জাতিতে কল্পনা-জল্পনা হয়ে এসেছে।'
'হ্যাঁ।' সিনান বলল। 'গ্রিক বা চায়নাতেও দেখা যায়, তবে সেগুলো বর্তমান কোনো বিবর্তন বা কোনোটিই না। বিভিন্ন চিন্তা ভাবনার ধোঁয়াটে ধারণা কেবল।'
'আমার সন্দেহ হলো মুসলিমদের বর্ণনায়, তবে মুসলিমদের বর্ণনা মডার্ন বিবর্তনের মতোই ছিল।' আমি বললাম।
এরই উলটো হলো। তারিক আর সিনান আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
'নাসিরুদ্দিন তুসি বলেছিলেন যেসব প্রাণী দ্রুত নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে, তারা লম্বা দৌড়ে টিকে থাকতে পারে। তিনি মিউটেশনের কথা বলছেন, যা ডারউইনকেও ছাড়িয়ে যায়। ২০ শতকের এভোল্যুশনারি থিংকিং-এ চলে গেছেন তিনি।
ইবনে খালদুন, তিনি তো সরাসরিই বলে দেন— বাঁদর ও মানুষের অ্যানসেস্টর বা পূর্বপুরুষ একই। ইবনে তোফায়েলের ব্যাপারে তো তুই স্টাডি করেছিস, তার হাতের এই চমৎকার জিনিসটা মিস করে গেলি কীভাবে? তার বইয়ের শুরুতেই তো তিনি বলেছেন— অজৈব পদার্থ থেকে জৈব পদার্থ এসেছে। মানে তিনি Abiogenesis-এর কথা বলছেন। ইমাম রাগিব আল ইসফাহানি পর্যন্ত লিখেছেন বিবর্তন নিয়ে। আল মাসুদি বলেছেন বিবর্তন নিয়ে, ইবনে বাজ্জা লিখেছেন।'
'ডারউইনের সময়কার বিজ্ঞানী জন উইলিয়াম ড্রেপার বলেছেন—বিবর্তন হচ্ছে মুসলিমদের বিজ্ঞান। তার বইয়ে তিনি লিখেন—আমাদের আজকের এই বিবর্তন পড়ানো হতো তাদের, মানে মুসলিমদের বিদ্যালয়ে। আহমাদ আল নিজামি আল আরুদি, আল বেরুনি, আল জাহিজ, ইবনে মাসকাওয়াইহ, ইবনে খালদুন, ইখওয়ান আল সাফা, মুহাম্মাদ আল নাকশাবিসহ অনেক বিজ্ঞানী ডারউইনের অনেক আগেই তার থিওরির বিভিন্ন দিক বাতলে দেন। কারও কারও বর্ণনা বেশি জটিল, কারোটা এক্কেবারে সাধারণ। এদের মধ্যে ইবনে মাসকাওয়াইহর বর্ণনা বাইরে থেকে দেখতে একদম ডারউইনেরটার মতো।
জীবের ওপর প্রকৃতির প্রভাব নিয়ে সবার আগে আলোচনা করেছেন আল জাহিজ। ৩৫০টা পশুর ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এগুলোকে চার ভাগে ভাগ করেছেন তিনি। জালালুদ্দিন রুমির বিশ্ববিখ্যাত মসনবি-তে একটা ক্রম আছে এ রকম—খনিজ থেকে উদ্ভিদ, উদ্ভিদ থেকে পশু, পশু থেকে মানুষ। কবি আল-মাআরির মধ্যে পাওয়া যায়। বোঝাই যাচ্ছে, মুসলিম বিজ্ঞানীরা বায়োলজিক্যাল ইভোল্যুশনের প্রতিষ্ঠাতা। আল বেরুনির বর্ণনা নিয়ে তো J. Z. Wilczynski একটা বই-ই লিখে ফেলেছেন On the Presumed Darwinism of al-Biruni Eight Hundred Years before Darwin। এখন, আল বেরুনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের ব্যাপারটা বর্ণনা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক পরের প্যারাতেই তিনি তার এই বিলোকন প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু ওটা আসলে ঠিক ছিল!''
তবে আর সবকিছু যদি বাদও দিই, আল জাহিজ একাই একশো। বিবর্তন নিয়ে তার বর্ণনা মাথা ঘুরিয়ে দেয়। তিনি যা বলেছিলেন, তা বর্তমানের আধুনিক বিবর্তনতত্ত্বের মৌলিক জিনিসগুলোর সাথে অনেকাংশেই মেলে। প্রাণীদের মিউটাবিলিটি, পশু ভ্রূণতত্ত্ব, অ্যাডাপ্টেশন, পশু মনস্তত্ত্ব নিয়ে অনেক লেখালিখি করেছেন। অনেক কিছুই অবশ্য ভুল হতে পারে এবং না-ও মিলতে পারে, তবে সেটা সমস্যা না। কারণ, ১২০০ বছর আগের একজন মানুষের কাছ থেকে যে আমরা এত ওপরের লেভেলের কথাবার্তা আশা করি না, তাই না?
মূলত ডারউইনের এই ১৫০ বছর আগের থিওরি পড়ে এক সম্মানিত একাডেমিক তো হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় না, আল জাহিজের ব্যাপারে জানলে তিনি তাকে নিয়ে হাসতেন। কারণ, তার সময়ের তুলনায় তার কথাগুলো অসাধারণ লেভেলের। তার কাছে যদি আরও ডেটা থাকত বা যদি ডারউইনের সময়কার মানুষ হতেন, তাহলে ডারউইনের চেয়ে অনেক উন্নত থিওরি দিতেন। ওটা নিয়ে কেউ হাসত না। বিভিন্ন প্রাণীর ব্যাপারে তার জ্ঞান যে কত তীক্ষ্ণ ছিল, সেটা তার লেখা থেকে সহজেই বোঝা যায়।'
'তাহলে এমন হতে পারে না যে ডারউইন, ওয়ালেস বা বিবর্তনের পশ্চিমা প্রবক্তাদের কেউ মুসলিম বিজ্ঞানীদের থেকে অনুপ্রাণিত?' উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল তারিক।
'না, এমন ট্র্যান্সমিশন পাওয়া যায়নি। অনেকে বলেন, ডারউইন নাকি কেমব্রিজে অ্যারাবিক পড়েছেন। এর কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। অবশ্য ড. হামিদুল্লাহ বলেছেন, ডারউইন নাকি আরবি টিচারদের কাছে অনেকগুলো চিঠি পাঠিয়েছিলেন। অবশ্য এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কিছু পাইনি। এমন কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।'
সিনান পুরোটা সময় চুপ থাকল। পরের দিন বিকেলে কল দিয়ে সিনান আমাদের ডাকল।
'আরমান! ভালো গবেষণা করেছিস, তবে তা বৃথা যাচ্ছে। তুই একটা বিশাল চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে গিয়েছিস।'
'হ্যাঁ।' আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আবার বললাম— 'আমি তো রেফারেন্স দিয়েই সব উল্লেখ করেছি, নাকি?'
'বোঝাচ্ছি। নাসিরুদ্দিন তুসি নিয়ে তুই আজারবাইজানি ওয়েবসাইট একটাতে এটা পড়েছিস নাকি?'
'হ্যাঁ, রেফারেন্স দেওয়া ছিল তো সেখানে।'
'তুই তো দেখি রেফারেন্স ফ্যান্টাসিতে ভুগছিস। রেফারেন্স হচ্ছে অথেন্টিসিটির প্রথম ধাপ, শেষ না। কোনো তথ্যভিত্তিক লেখায় রেফারেন্স না থাকলে সেটা দেখার কোনো মানেই হয় না। রেফারেন্স দিলে তখন পড়া যায়। কেননা, তখন লেখকের লেভেল বোঝা যায়। সে কতটুকু স্টাডি করেছে, সে ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়। আর চেক করার বিষয়টাও আছে। তো এটা অথেন্টিসিটির শেষ ধাপ না; প্রথম ধাপ। যাইহোক, সেখানে তুসির আখলাক আল নাসিরির রেফারেন্স দেওয়া। কিন্তু তুই যদি সেটা দেখিস, তুসি সে রকম কিছুই লিখেননি। সেখানে যা বলা আছে—তা ভূতত্ত্ব নিয়ে ইবনে সিনার কাজের সাথে মেলে, আর অ্যালকেমি নিয়ে জাবির ইবনে হাইয়ানের কাজের সাথে মেলে।
ইবনে সিনার আইডিয়াটা হচ্ছে—পানি শিলীভূত হতে পারে। আর জাবির ইবনে হাইয়ানেরটা হচ্ছে—গাণিতিক আনুপাতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এক বস্তুকে আরেক বস্তুতে রূপান্তর করা যেতে পারে। তার প্র্যাক্টিসের বাইরে চিন্তা-ভাবনা নিয়ে টানলে বেশি হলে জেনেটিক্যালি মডিফাইড উদ্ভিদ আনা যায়, তবে বিবর্তনের এক্কেবারেই কিছু নাই এখানে। তুসির এই লেখা যদি বিবর্তন বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে জাবির ইবনে হাইয়ানকে ছেড়েছে কেন—সেটাই বুঝতে পারছি না আসলে!'
হেসে দিলো সিনান।
'তুই যে ড্রেপারের কথা বললি, তার History of Conflict Between Science and Religion বইটা বাঁশ খেতে খেতে বাঁশবাগান হয়ে গেছে। তার থেকে তথ্য নিতে গেলে সব সময়ই স্কেপটিক্যাল থাকতে হবে। যাহোক, ইবনে খালদুনে যাই। ইবনে খালদুন যে হেডিংয়ের অধীনে কথাগুলো লিখেছেন, সেটা হলো— The Real Meaning of Prophecy। স্বাভাবিকভাবেই এই হেডিং-এ কি বিবর্তন নিয়ে কথা বলার কথা? ডিকন্টেক্সচুয়ালাইজ করা হয়েছে। তিনি মূলত গ্রিকদের Scalae Naturae অনুসরণ করছিলেন।
পরে বলছি এ নিয়ে, দাঁড়া। ইবনে তোফায়েলের যেটা বললি: প্রথম কথা হচ্ছে—তোর কি সিম্পল আক্কেলে খাটে না যে, ইবনে তোফায়েল নিয়ে তোদের এত কিছু আমি বললে এটাও বলব? না বললে নিশ্চিতভাবে কোনো সমস্যা আছে দেখে বলিনি? দ্যাখ, যা বুঝি—ইবনে তোফায়েল কুরআনে বর্ণিত মানব তৈরির জন্য যেসব উপাদান দেওয়া আছে, সেসব মিলিয়ে একটা স্টোরি আর্ক তৈরি করেছেন কেবল।
আর দ্বিতীয়টা দ্যাখ, রাজকুমারী বাবুকে নিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। আগেরটা সাধারণ ধ্যানধারণায় অবাস্তব, পরেরটাও কিন্তু অবাস্তব। বাবুকে ভাসিয়ে দিলে সে সাগরের মাঝখানের দ্বীপে গিয়ে পৌঁছাবে কী করে? উপন্যাস সেটআপ করার জন্য লজিক্যাল কিছু পাননি, তাই তিনি অনেক কিছু ভাবছিলেন; তখন এ দুটো লিখে দিলেন। নাহলে বর্তমানে কেউ বলত যে, ক্র্যাশ ল্যান্ডিংয়ের সময় বাঁচানোর জন্য বাবা-মা হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দিয়েছে। তখন কিছু পাননি, প্রথমটা কুরআন পড়ে তার মাথায় এসেছে, আর ইন্টারেস্টিং হতে পারে ভেবে তিনি লিখে দিয়েছেন। আর তিনি এতই কম লিখেছেন, এটা টানা বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছুই না। এমনিতেও Abiogenesis, ইভোল্যুশন থেকে আলাদা বিষয়। আলাদাভাবে Abiogenesis-এর ব্যাপারে বললেও এটা ফাঁকা কথা। '
'মুসলিম বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে মূল আলোচিত লোকেরা ইবনে মাসকাওয়াইহ, ইবনে খালদুন, আল জাহিজ, ইখওয়ান আল সাফা আর জালালুদ্দিন রুমি। প্রথমে জালালুদ্দিন রুমিকে দিয়ে শুরু করছি। ইংরেজিতে রুমির পাঠক হুলুস্থুল রকম বেড়ে যায় কোলম্যান বার্কসের প্রচেষ্টায়; যিনি ফারসি পারেনও না। তিনি কী করেছেন, জানিস? জালালুদ্দিন রুমির লেখায় যত ধরনের ইসলামি টার্ম ছিল, সব সরিয়ে দিয়েছেন। ঈমানকে বানিয়ে দিয়েছেন Rightdoing আর কুফরকে বানিয়ে দিয়েছেন Wrongdoing। তো তার মসনবি অনুবাদ দেখার আর কোনো মানে হয় না। তারপর রুমির যে কবিতাটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা বুঝতে হলে একটি ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ আর আরবি অনুবাদ দেখতে হয়। তখন গিয়ে বোঝা যায়, তিনি এখানে দেহ নিয়ে কিছু বলছেন না; আত্মিক অবস্থা বোঝাচ্ছেন। মানে, আমরা খারাপ মানুষ বোঝাতে বলি—তারা আর মানুষ নেই; পশু হয়ে গিয়েছে। এর মানে কি আমরা বোঝাই—তারা বায়োলজিক্যালি মানুষ থেকে পশু হয়ে গিয়েছে? একদম না! জালালুদ্দিন রুমির বর্ণনা ঠিক এমনই—যাকে বস্তুবাদীরা বিবর্তন ব্যাখ্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছে, বাস্তবে তিনি আধ্যাত্মিক অবস্থা বোঝাচ্ছেন।'
'তাহলে বাকিগুলোর ব্যাপারে কী বলবি?'
'ইখওয়ান আল সাফা, ইবনে খালদুন আর ইবনে মাসকাওয়াইহর লেখা কন্টেক্সটের বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে। আবার তাদের লেখা সঠিকভাবে বোঝার চেষ্টাও করা হয়নি। ভুল অনুবাদ করা হয়েছে। আমরা যে কথাটা বলি—খারাপ কাজ করতে করতে মানুষ পশুর চেয়েও অধম হয়ে যায়, আর ভালো করলে ফেরেশতাদের ওপরে স্থান পায়। তারা যা বলেছিলেন—তা কিছুটা এমন।
এটা হলো গ্রিক Scalae naturae—The great chain of being। ধাপে ধাপে যোগ্যতা বৃদ্ধির ক্রম দেখানোর একটা আইডিয়া : জড় বস্তু > পশু > মানুষ > ফেরেশতা ইত্যাদি। এটি ওই দার্শনিকদের দর্শন। Low level থেকে High level-এর পারফেকশনের একটা ক্রম।
এটা জৈবিক কোনো ক্রম না; বরং মেটাফিজিক্যাল ক্রম। Natural selection, Variation, Heredity, Differential Reproduction—এগুলো মিললে কেউ বলতে পারবে যে, বিবর্তন নিয়ে কথা হচ্ছে। ইখওয়ান আল সাফার ক্ষেত্রে গ্রেট চেইন ছাড়াও একটা চিন্তা আছে। অবশ্য এর সাথেই সমান্তরালে যায়, কানেক্টেড। নিওপ্লেটোনিক চিন্তায় আল্লাহর সাথে আধ্যাত্মিকভাবে মানুষের সম্বন্ধের একটা প্রসেস : বিবর্তনের প্রসেস না। স্পিরিচুয়াল, অন্টোলজিক্যাল; বায়োলজিক্যাল না।'
'বুঝলাম, কিন্তু আল জাহিজ? উনি তো জুওলজিস্ট।' আমার শেষ মরিয়া চেষ্টা।
'আরে বাবা! আসছি তো ওই প্রসঙ্গে। আল জাহিজ অবশ্যই ঘাঘু জুওলজিস্ট ছিলেন। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক সত্য উদ্‌ঘাটন করেছেন, কিন্তু কখনোই তিনি বিবর্তন নিয়ে কিছু বলেননি। তার লেখাগুলোকেও কন্টেক্সটের বাইরে আনা হয়েছে। তিনি মূলত দেখাতে চাচ্ছিলেন, আল্লাহর সৃষ্টি কত অসাধারণ। প্রত্যেকটা জীবের কোনো না কোনো রকম সাহায্যের প্রয়োজন হয়, কিন্তু আল্লাহর কোনো সাহায্য লাগে না। তিনি কত্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ! এভাবে তিনি জুওলজি ব্যবহার করে আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখাচ্ছিলেন শুধু, আর কিছু না।
তবে সায়েন্সে আল জাহিজের অসাধারণ দিক হলো—তিনি Survival of the Fittest-এর ব্যাপারগুলো ধরতে পেরেছিলেন। Natural Selection-এর কিছুটাও তার মধ্যে দেখা যায়। অবশ্য এটা এত শক্ত না; ভুল হওয়ার সম্ভবনাই বেশি। খাদ্যজাল আর খাদ্য শৃঙ্খল তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন। বিভিন্ন প্রাণীর ও পরিবেশের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বুঝতে পারেন আল জাহিজ। তিনি মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণীর বৈশিষ্ট্য, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ—এসবের তুলনা করেছেন, কিন্তু কক্ষনো বলেননি, একটা থেকে আরেকটা এসেছে বা আসতে পারে। '
'আল বেরুনির মাঝে বিবর্তনের কিছু নেই, ন্যাচারাল সিলেকশন দেখা যায় কিছুটা। কিন্তু তুই যেমন বলেছিলি, তিনি নিজেই সেটা বাতিল করেছেন। তিনি কিছুটা সোশিওলজিক্যাল দিক থেকে বলছেন, বায়োলজিক্যাল না। আর বায়োলজিক্যাল পার্ট কিছুটা থাকলেও মূলত তার বর্ণনা অনুযায়ী প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজাতি তৈরির পথ বন্ধ করে খুলে দেয় না, উলটো ব্যাপার। নিজামি আরুদি, আল নাকশাবি, ইবনে বাজ্জা, আল মাসুদি—প্রত্যেকে গ্রেট চেইন অফ বিয়িং নিয়ে লিখেছেন: ইমাম রাগিব বাদে। তিনি তো কেবল কুরআনে মানব সৃষ্টি নিয়ে যা বলা হয়েছে—তা লিখেছেন: একটা জিনিসও অ্যাড করেননি। যত কিছু পড়েছি, তার মধ্যে এটা সবচেয়ে বেশি রেডিক্যুলাস, বোকামিপূর্ণ ছিল। শেষ কথা হচ্ছে, প্রজাতি সময়ের সাথে পালটায়—এ রকম একজনও বলেনি।
দ্যাখ, তখন স্কলাররা লিখত গ্রেট চেইন অফ বিয়িং-এর ভাবধারায়। বর্তমানে যারা তার কাজ পড়ে, তারা দেখে মডার্ন ইভোল্যুশনারি ভাবধারায়। পারসপেক্টিভ পুরো চেইঞ্জ! সমস্যা তৈরি হওয়ার প্রথম কারণ। দ্বিতীয়ত, যারা মডার্নিস্ট, তারা চায়—যেভাবে হোক, যেভাবে সম্ভব, ইসলামের সবকিছুকে বৃহত্তর ওয়েস্টার্ন চিন্তাধারার সাথে মেলাতে।
মডার্নিস্ট মুসলিমরা যখন দেখতে পেল, মুসলিম বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে হাজার বছর আগেই বিভিন্ন জিনিস বলে দিয়ে গিয়েছে, তখন তারা বিবর্তন নিয়েও এমন কিছু পাওয়ার জন্য তড়বড় করতে লাগল। বিবর্তনের সাথে মেলানো যায়—এমন প্রত্যেকটা জিনিসকে বিকৃত করে খাঁটি বিবর্তন বলে চালিয়ে দিতে থাকল। ক্রিটিক্যাল পর্যবেক্ষণ, কন্টেক্সচুয়ালাইজেশন—সব নীতি হাওয়া হয়ে গেল। ইচ্ছাকৃতভাবে পিক অ্যান্ড চুজ করে যেখান থেকে পারে, লাইন বের করে নিজেদের সুবিধামতো বিবর্তন বানিয়ে চালিয়ে দিলো। তিন নম্বর টাইপ হচ্ছে—নস্টালজিক সহজ-সরল মুসলিম যারা বলতে চায়, সবকিছু মুসলিমরা করেছে। আমাদের ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নেব, ইন্সপিরেশন নেব, কিন্তু নস্টালজিক হয়ে লাভ নেই। ইমোশনাল না; বরং র‍্যাশনাল হয়ে এগিয়ে যেতে হবে এখানে।
দ্যাখ, যখন বিভিন্ন আর্টিকেল পড়ছিলাম এসব নিয়ে, তখন স্পষ্ট মনে হয়, জিনিসগুলো মিলছে না। যদি গ্রেট চেইন অফ বিয়িং জানা থাকে, কন্টেক্সটের বাইরে থাকা কোটেশনগুলোকে ইউজ করে বিবর্তন বানানো যে বিশাল স্ট্রেচ— তা বোঝা যায়। আর এখানে তুসি অ্যারিস্টটেলিয়ান, ইখওয়ান আল সাফা নিওপ্লেটোনিস্ট, বেরুনি লিখেছেন সোশিওলজিক্যাল ভিউ থেকে, ইবনে খালদুন লিখেছেন নবুয়ত নিয়ে; অন্যদিকে রুমি, মাআররি—এরা কবিতা লিখছেন; কবিতা! কী থেকে নিয়ে যে কী বানিয়ে দেয়...'
আমি আর কিছু বলতে পারছি না। এসব নিম্নমানের জিনিস বিশ্বাস করেছি ভেবে মাথা-টাথা খারাপ লাগছে। তারিক বলল—'জাস্ট ফুড ফর থট। দ্যাখ, ইবনে সিনার মেডিসিন নিয়ে মনেস আবু আসাব ও অন্যান্যরা মিলে একটা বই লিখেছেন। সেখানে ভূমিকায় তারা বলেছেন, আগে ইবনে সিনার কাজগুলো ঠিকভাবে অনুবাদ হয়নি বলে মডার্ন মেডিসিনের সাথে মিল পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখন তারা ঠিকভাবে অনুবাদ করেছেন বলে বোঝা যাচ্ছে, ইবনে সিনার মেডিসিন বর্তমানেও মডার্ন মেডিসিনের সাথে মিলে অত্যন্ত কার্যকর। যদি এমন হয়, মূলত এইসব স্কলারদের কাজগুলোও ঠিকভাবে অনুবাদ করলে মডার্ন ইভোল্যুশনের সাথে মিলবে, নিম্নমানের অনুবাদের জন্য বোঝা যাচ্ছে না?'
'না, এটা হয় না। তারা পুরোপুরি ভিন্ন ফ্রেমওয়ার্কে লিখছিল। অ্যারিস্টটেলিয়ান, নিওপ্ল্যাটনিক, স্পিরিচুয়াল নির্দিষ্ট করে বললে গ্রেট চেইন অফ বিয়িং মাথায় রেখে। অনুবাদে সমস্যা হতে পারে লাইন, প্যাসেজের ক্ষেত্রে; সম্পূর্ণ ভাবধারা কখনো অনুবাদের জন্য পালটে যাবে না। ইবনে সিনা রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে লিখছিলেন, মডার্ন মেডিসিনের উদ্দেশ্যও রোগ নিরাময়। একই ভাবধারা। আর তোর উদাহরণও ঠিক হয়নি। ইবনে সিনা নিয়ে বইটি মেডিসিন যেন মানুষের কাজে লাগে, আর মডার্ন মেডিসিন রিফাইন করা যায় সেই উদ্দেশ্যে মডার্ন মেডিসিনের সাথে মিলিয়ে আউটডেটেড টার্মিনোলজিগুলো ইনটেনশনালি মডার্ন মেডিক্যাল থটের সাথে মিলিয়ে রেন্ডার বা রূপান্তর করা হয়েছে। বিবর্তনের এমন কিছু করা হচ্ছে না যে, "মডার্ন লেন্সে দেখলে কেমন হয়”; বরং দাবি করা হচ্ছে—সেই সময়ে স্কলাররা নির্দিষ্টভাবে মডার্ন ইভোল্যুশনকেই বুঝেছেন আর বুঝিয়েছেন। গেট ইট?'
'হুম। আরেকটা যদি এমন হয়, ভবিষ্যতে কোনো রিসার্চার প্রমাণ করে দেখিয়ে দেন—এরাই অন্য কোনো জায়গায় বা অন্য কোনো বিজ্ঞানী-দার্শনিক আসলেই বায়োলজিক্যাল ইভোল্যুশন নিয়ে লিখেছেন, তখন কী হবে?'
'কী হবে? কিছু হবে না?'
'কেন কিছু হবে? আমি যেটা বলছি, আজ পর্যন্ত যাদের নিয়ে বলা হয়েছে আর হচ্ছে, তারা কেউ-ই বিবর্তন নিয়ে বলেননি। এর সবই ভুল। হ্যাঁ, যদি কেউ দেখাতে পারে এমন—সেটা তো খুবই ইন্টারেস্টিং। কিন্তু এতক্ষণ যে এত কিছু ক্লিয়ার করলাম, সামনে কেউ কিছু নিয়ে এলে অবশ্যই অত্যন্ত সাবধান থাকতে হবে। তবে এমন মানসিকতা যে ক্লাসিক্যাল পিরিয়ডের কোনো মুসলিম একটা কথা বললেই সেটা ঠিক—খুবই খারাপ। সেই সময়ের মানুষরা কি ভুল করতে পারে না? অবশ্যই পারে। ঠিক বলতে পারে, ভুল বলতে পারে। আমাদের স্ক্রিপচারালি দেখতে হবে, র‍্যাশনালি দেখতে হবে, কোনো কিছু বর্তমানে থাকা ডেটা অনুযায়ী ঠিক কি না। শুধু আগে কোনো মুসলিম বিজ্ঞানী বা দার্শনিকের ইভোল্যুশন নিয়ে লেখা দেখে কেউ যদি এটাকে ওহি ধরে বিশ্বাস করে ফেলে, তাইলে তো সেটা স্টুপিডিটি।'
'বিভিন্ন মুসলিম বিজ্ঞানের ইতিহাসের রেফারেন্সে বিবর্তনের ব্যাপারটা দেওয়া হয়েছে। অনেক পপুলার বই-পুস্তকে আছে, ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে অনেক ভালো মানের বিশেষজ্ঞরা—যারা সাধারণত বিজ্ঞানের ইতিহাস স্টাডি করেন না, তারাও ভুল বুঝছেন। ২০ শতকের অনেক সেরা কিছু মুসলিম ব্যক্তিত্বরাও এই ভুল ধারণায় নিমজ্জিত হয়েছেন। বাংলাদেশেও ঢুকে গিয়েছে জিনিসটা।'
শেষে আমাকে নসিহত করল— 'বাসায় যা তাহলে। সাবধানে স্টাডি করিস, এক-দুটো জিনিস পড়েই সিদ্ধান্ত নিস না। গভীর স্টাডি সেরে নিস ডেফিনিটিভলি কিছু বলার আগে।'

টিকাঃ
১. Paul S. Braterman. 'Islamic Foreshadowing of Evolution' Muslim Heritage.
২. Amina H. Malik, Janine M. Ziermann and Rui Diogo. 'An Untold Story in Biology: The Historical Continuity of Evolutionary Ideas from the 8th Century to Darwin's Time" Journal of Biological Education. 52 (2017).
৩. Ibid
৪. Dr. Muhammad Sultan Shah 'Pre-Darwinian Muslim Scholars Views on Evolution' University of the Punjab.
৫. M. Shamsher Ali op. cit.
৬. Muhammad Sultan Shah. 'Pre-Darwinian Muslim Scholars Views on Evolution'
৭. William Draper, p: 64a
৮. M. Shamsher Ali op. cit. p: 332.
৯. M. Shamsher Ali op. cit. p: 323; Ehsan Masood p: 183.
১০. Jalal Al-Din Rumi. 'I Died as a Mineral.' Consolatio. Accessed March 21, 2019. http://www.consolatio.com/2005/04/i_died_as_a_min.html.
১১. '...parts (of Darwin's Origin of Species) I laughed at till my sides were almost sore...' সাইফুর রহমান, 'ডারউইনিজম-এর ব্যবচ্ছেদ' পর্ব ৩. Shottokothon.
১২. M. Shamsher Ali op. cit. p: 353-54
১৩. Paul S. Braterman. 'Islamic Foreshadowing of Evolution'
১৪. Paul S. Braterman op. cit.
১৫. Shoaib Ahmed Malik. 'Old Texts, New Masks: A Critical Review of Misreading Evolution onto Historical Islamic Texts' Zygon. 54:2 (2019); Amina H. Malik, Janine M. Ziermann and Rui Diogo. 'An Untold Story in Biology'; Ibn Tufail, The Improvement of Human Reason: Exhibited in the Life of Hai Ebn Yokdhan (Hayy ibn Yaqzan) (Translated by Simon Ockley. New York: Frederick A. Stokes Company Publishers, 1708)
১৬. Abdelhaq M Hamza. 'Manufacturing Imposture: The View on the Theory of Evolution through the Prism of Islam and Science' The Muslim 500, 2019. p: 230
১৭. ibid
১৮. Seyyed Hossain Nasr, An Introduction to Islamic Cosmological Doctrines (Revised. Thames and Hudson Ltd, 1978); Shoaib Ahmed Malik. 'Old Texts, New Masks'
১৯. Paul L. Heck, Skepticism in Classical Islam op. cit.
২০. Shoaib Ahmed Malik. 'Old Texts, New Masks'
২১. Abdelhaq M Hamza op. cit.
২২. Al-Jahiz, Kitab al-Hayawan, iv: 68, in Paul S. Braterman. 'Islamic Foreshadowing of Evolution' Muslim Heritage.
২৩. Paul S. Braterman op. cit.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 নারী

📄 নারী


'No one really feels the path I seek and No one's going to care as much as me and, No one seems to know our history, and Stories are told for the world to see!'
শুয়ে আছি আর ডায়েরির পাতা উলটাচ্ছি। যখন ছোটো ছিলাম, তখন বড়ো ভাইয়ের বন্ধু আমাকে কিছু বই গিফট দিয়েছিলেন। 'আজব শিশু'; ইবনে তোফায়েলের বইয়ের বাচ্চা ভার্সন, 'জ্ঞান পাগলা এক বুড়ো'; ইবনে খালদুনকে নিয়ে লেখা একটি বই ইত্যাদি। সাথে দিয়েছিলেন ডায়েরিটি। ক্লাস এইট পর্যন্ত খুব যতনে রেখে দিয়েছিলাম তাকের ওপর। তারপর চিন্তা করলাম, ডায়েরি এভাবে ফেলে রাখলে তো দেওয়ার উদ্দেশ্যই বৃথা! তারপর থেকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতে শুরু করলাম।
পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে একটা ঘটনা দেখতে পেলাম। মনে পড়ল, J.S.C পরীক্ষার দুদিন বাকি, আর আমি আমার ভাইয়ের ভার্সিটিতে অ্যারাবিক ক্লাস করছি! যখন ক্লাস এইটে ছিলাম, তখন আমার ভাই সিনিয়র অ্যারাবিক কোর্সে আমাকে নিয়ে যেত। জেএসসি পরীক্ষার দুদিন আগে সেখানে যাওয়া পাগলামি ঠেকতে পারে, কিন্তু সেটিই ছিল কোর্সের সেরা ক্লাস।
রিডিং ক্লাস। আমি বসে বসে খাতায় আঁকিবুঁকি করছি। স্যার এলেন। পড়ানো শুরু হলো। আমি অবশ্য তখনও ছবি আঁকতে ব্যস্ত। কারণ, আমাকে পড়া ধরা হবে না, আমি অতিথি। প্যাসেজ ছিল আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর ওপর। স্যার প্যাসেজ পড়ে পড়ে বাংলায় বুঝিয়ে দিলেন এবং সাথে নিয়ে এলেন আরও অনেক ফ্যাক্ট। আয়িশা-কে সুপারস্টারের মতো মনে হচ্ছে।
স্যারের কল এলো, কথা বলা শেষে বললেন—'পরবর্তী স্যার আসছেন না; কিছু আলাপ করবেন, না চলে যাবেন?'
'আয়িশা বিদ্বান মহিলা ছিলেন, শিক্ষকতা করতেন, পলিটিক্স নিয়ে ধারণা ছিল এবং চিকিৎসা নিয়েও তো জানতেন।' রহিম স্যার বললেন।
এখানে অনেক বড়ো বড়ো মানুষ ক্লাস করতে আসেন। রহিম স্যার কোনো এক স্কুলের যেন প্রিন্সিপাল। চিন্তা করতে কেমন যেন আজব লাগে : ক্লাস এইটের স্টুডেন্ট একটি বড়ো স্কুলের প্রিন্সিপালের সঙ্গে বসে ক্লাস করছে!
রহিম স্যার আবারও বললেন—'কিন্তু এখন দেখেন, আধুনিক নামধারী বিভিন্ন মানুষ এমন কথা বলে, যেন মুসলিম হলে, পর্দা করে চললে কিছুই করা সম্ভব না!'
আলাপ জমে উঠল। আমাদের এই ক্লাসগুলোতে সব সময়ই এমনিতে মূল ক্লাস শেষে ১০-১২ মিনিট আলোচনা হয়ে থাকে। আমার ভাই বলল—'হ্যাঁ, মনে হয় যেন জ্ঞান হিজাবের কাপড়ে গিয়ে আটকে যায়, মগজে আর ঢুকতে পারে না।'
স্যার মাথা নাড়িয়ে বললেন— 'হুম, আপনাদের কথা ঠিক। আসলে আগেকার নারীরা আলোতে আবদ্ধ ছিলেন—যেখানে বর্তমানের নারীরা অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চলেন দেখি ইতিহাস কী বলে।'
আঁকিবুঁকি বন্ধ করে প্রস্তুত হয়ে বসলাম।
'প্রথম যেটা ক্লিয়ার করা প্রয়োজন, শারীরিক ভিন্নতার জন্য নারী-পুরুষের মাঝে ইসলাম অনেক পার্থক্য করে, কিন্তু জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। এখানে সবার সমান দায়িত্ব। পুরুষেরও জ্ঞান অর্জন করতে হবে, নারীরও।'
'একটা কথা স্যার।' আমার ভাই বলল—'বর্তমানে তো স্যার ঘরে বসেই অনলাইনে সব ধরনের পড়ালেখা করা যায়। বেশিরভাগ যারা বাইরে যেতে চায়, তারা কিন্তু জ্ঞান অর্জনের জন্য তা চায় না।'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, ভালো পয়েন্ট। নিয়ত বিকৃত মূলত বেশিরভাগেরই। কিন্তু সারাক্ষণ ঘরে থাকা তো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। মাহরামের সাথে মাঝেমধ্যে বাইরে যাওয়া উচিত।'
তারা যখন এই আলোচনা করছে, তখন আমি ভাবছিলাম—আমি তো পুরুষ হওয়ার পরও সারাক্ষণ ঘরে থাকি পড়ালেখার জন্য। পরিবার কোথাও ঘুরতে যেতে চাইলেও যাই না স্টাডির জন্য! এদের এত কী, ঘরে বসে স্টাডি করতে পারে না সারাক্ষণ!
স্যার বলা শুরু করলেন—
'আয়িশা-কে নিয়ে যেহেতু কথা হচ্ছিল, তিনি কিন্তু শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে জানতেন এমন না; মেডিসিন ও সার্জারিতেও দক্ষ ছিলেন। আরেকজন সাহাবি ছিলেন; আল শিফা বিনতে আবদুল্লাহ। তিনি পিঁপড়ার কামড়ের ভিন্ন ধরনের শিফা বের করেছিলেন। এতে খুশি হয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অন্যদের এটি শেখাতে বলেন। তার নাম কিন্তু আল শিফা ছিল না। তার চরম দক্ষতার জন্য মানুষ তাকে টাইটেল দিয়েছিল।
মুসলিম নারীরা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত টাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানানোতে ব্যয় করতেন। এদের মধ্যে আছেন ফাতিমা আল ফিহরি, মারইয়াম আল ফিহরি, দাইফা খাতুন, বারাকাত খাতুন, ফাতিমা বিনত কানিবাই আল উমারি। আরও অনেকে আছে, কিন্তু বেশিরভাগের নাম পাওয়া যায় না। অমুকের স্ত্রী, তমুকের মা বলে বইসমূহে উল্লেখ থাকে। এ ব্যাপারে আরও পরে বলছি।
'স্যার, ফাতিমা আল ফিহরির ব্যাপারে বলা হয়, তিনি ইতিহাসের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছেন।'
'হ্যাঁ, তবে প্রাইমারি টেক্সটে এমন কিছু পাওয়া যায় না। মানে অন্ততপক্ষে আমি পাইনি। ইবনে আবি জার, ইবনে খালদুন কেবল বলেছেন—তিনি একটা মসজিদ বানিয়েছিলেন। তারা এটা উল্লেখ করেছেন, ফিহরি নিজ হাতে মসজিদ বানানোতে কাজ করেছেন, তবে শিক্ষার ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি। এখন সাধারণভাবে ক্লাসিক্যাল মুসলিম বিশ্বে মসজিদের সাথে সব সময় মাদরাসা থাকত; কুরআন-হাদিসের সাথে মেডিসিন, দর্শন পড়ানো হতো। এটাই সিস্টেম ছিল। সুতরাং ফিহরি একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানিয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে অন্যরা ইউনিভার্সিটিতে পরিণত করে—এমন বলা সেফ। অবশ্য প্রাইমারি টেক্সট হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক, আর অসংখ্য পাণ্ডুলিপি এখনও পাবলিশ হয়নি। তাই ভবিষ্যতের রিসার্চে অন্যকিছু আসতেও পারে, তবে প্রমাণিত হওয়ার আগে বলা যাচ্ছে না আরকি।'
ঠিক আছে তাহলে। আমরা মক্কায় Zubaida water spring দেখতে পাব। এটির নামকরণ হয়েছে জাফর আল মানসুরের কন্যা জুবাইদার নামে। তিনি অসংখ্য স্থাপনা করেছিলেন। বাগদাদ-মক্কা হাইওয়ে তিনি বানিয়েছিলেন। তার স্বামী, অর্থাৎ হারুনুর রশিদের পকেট খালি করে দিচ্ছিলেন তিনি। এজন্য প্রায় তাদের ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছিল! ওই সময় তিনি হাইওয়ের নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে সার্ভিস সেন্টার স্থাপন করেছিলেন।
কর্ডোভার লাবনা ওই সময়ের সবচেয়ে কঠিন ধরনের অঙ্কগুলো সহজেই করতে পারতেন। তিনি জটিল বীজগণিতে পারদর্শী ছিলেন। সুতাইতা বিনত হুসেইন আল মাহামালি বিভিন্ন ইসলামি বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব ও গণিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি অন্যান্য গণিতবিদদের উত্থাপিত বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যাগুলোর সমাধান দেন। তিনি পাটিগণিতে খুব পারদর্শী ছিলেন। ইসলামের আলিমদের মধ্যে আল্লামা ইবনে কাসির, ইবনুল খাতিব বাগদাদি, ইবনুল কাইয়্যিম জাওজিয়্যাহ তার প্রশংসা করেছেন। তিনি তখন শরিয়াহ কোর্টে এক্সপার্ট উইটনেস ছিলেন। যারা এক্সপার্ট উইটনেস থাকত, তারা বৈজ্ঞানিকভাবে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে সাক্ষীর সত্যতা যাচাই করত।
স্যার বলতে থাকলেন—'মারয়াম জিনানি নামক একজন পাওয়া যায়, যিনি কেমিস্ট্রি নিয়ে কাজ করতেন। তবে এর বেশি তার কাজের ব্যাপারে আর কিছু জানা যায় না। মারইয়াম আল আস্তুরলাবি অ্যাস্ট্রোলেব বানাতেন। একে বলা হয় আগেকার কম্পিউটার।
রুফাইদা আল আসলামিয়‍্যাহ ওই সময় মেডিসিন কোর্স করাতেন। মেডিসিনের ক্ষেত্রে মুসলিম নারীরা অনেক এগিয়ে ছিল। মধ্যযুগে আরব, সিরিয়া, ইরাক, মিশরে অসংখ্য বিখ্যাত নারী চিকিৎসক ছিলেন। বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী আল জাহরাউই নারীদের বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যাপারে কথা বলেছিলেন, নারীদের বিজ্ঞান সাধনায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন। নারী শিক্ষার ব্যাপারে দার্শনিক ইবনে রুশদও মুখ খোলেন। তিনি বলেন— “বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমদের দুর্বলতা ও দরিদ্রতার মূল কারণ নারীদের শিক্ষা হতে বঞ্চিত করা। কেননা, মা শিক্ষিত না হলে সন্তান শিক্ষিত হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।”
আমরা যদি ইসলামের আলিমাদের দেখি, তাহলে অসংখ্য প্রতিভাধর নারী দেখতে পাই। এ নিয়ে মোহাম্মদ আকরাম নদভি—আমার বন্ধু মানুষ—৪৩ খণ্ডে একটি জীবনীকোষ লিখেছেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করুন, ৪৩ খণ্ড! ১০০০০ আলিমার বর্ণনা রয়েছে ওখানে। সংখ্যাটার দিকে আরেকবার তাকান। ইসলাম জ্ঞান অর্জনের সুযোগ না দিলে এটি কীভাবে সম্ভব হলো? ইসলামকে বাদ দিয়ে অন্যান্য সব জাতির জ্ঞানী-গুণী নারীদের নিয়ে যদি বই লেখা হয়, তবে কখনোই এত বড়ো বই লেখা সম্ভব হবে না। কিছু উদাহরণ দিই। বিনতে আলি আল মিনশার ৮০০০-এর বেশি বই সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমন রিপোর্ট পর্যন্ত আছে—একজন নারী ফিকহ নিয়ে ৬০ খণ্ডের বই লিখেছিলেন, তবে দুঃখজনকভাবে তা হারিয়ে গিয়েছে।
ইসলামের ইতিহাসের সেরা সেরা উলামা একাধিক নারী শিক্ষকের নিকট পড়েছেন। কয়েকজনেরটা লিখে দিচ্ছি।' স্যার বোর্ডে লিখলেন—
আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আল নাজ্জার: ৪০০
ইবনু হাজম: ৭০
ইবনে আসাকির: ৮০
ইবনুল জাওজি: ৩
আবু তাহির সিলাফি: ২০+
শামসুদ্দিন সাখাবি : ৬৮
ইবনে হাজার আসকালানি : ৫৩
তাজুদ্দিন সুবকি: ১৯
জালালুদ্দিন সুযুতি: ৩৩
আবু সাদ আল সামআনি : ৬৯
যাদের নাম মনে পড়ল বললাম। এ ছাড়াও ইবনে তাইমিয়া, জারকাশি, ইবনে রজব ও অসংখ্য বিখ্যাত উলামার নারী শিক্ষক ছিল। ইবনে হাজার একজনের কথা বলেন—জাইনাব বিনতু কুতুবুদ্দিন। তার ইজাজাসমূহ বহন করতে একটি আস্ত উট লাগত!
আমি হাঁ করে স্যারের দিকে তাকিয়ে...
'ইবনে হাজার তার একজন শাইখা, মারইয়াম আল আজরিয়‍্যার একটি মুজাম সংকলন করে পাবলিশ করেন। বইয়ের নাম মুজাম আল শাইখা মারইয়াম। ব্যাপারটা কি অবাক করা নয়? ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা স্কলারদের একজন এবং পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে স্কলারলি ব্যক্তিত্বদের একজনের কাছে এক নারীর দেওয়া লেকচার এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তিনি সেসব সংকলন করে বই প্রকাশ করেছেন।
'হারেম বলতে লোকে বোঝে—যেখানে খলিফার স্ত্রী আর দাসীরা থাকেন। কিন্তু এটাই কি সব? হারেম ছিল মুসলিম রাষ্ট্রের Statistics center। খলিফার স্ত্রী আর দাসীরা চরম গাণিতিক দক্ষতা দেখিয়ে রাজ্যের হিসাব সংরক্ষণ করতেন। এমনকী মরক্কোর হারেমের স্ত্রীদের যদি জিজ্ঞেস করা হতো যে রাষ্ট্রের উত্তর দিকের গ্রামে আজ কয়টি মুরগির ডিম ফোটানো হয়েছে, তারা সেটিও বলে দিতেন!'
'স্যার।'
'হুম, বলো।'
'এসব তো অনেকে ফেমিনিজমের জন্য ব্যবহার করে।'
'ফেমিনিজমের সাথে এর সম্পর্ক বুঝতে পারছি না।'
'মানে স্যার, অনেকে বলে এর মানে হচ্ছে—ক্লাসিক্যাল মুসলিম বিশ্বে নারীদের অনেক অধিকার দেওয়া হতো।'
'ফেমিনিজম নিয়ে বেশি কিছু জানি না, কিন্তু এটা তো একটা আন্দোলন, নাকি? সম্পূর্ণ ইসলামের ইতিহাসে এমন একটি আন্দোলনের উদাহরণ পাওয়া যায় না। কেউ যদি এসব ব্যবহার করে আন্দোলনকে জাস্টিফাই করতে চায়, তবে সেটা কখনো ঠিক হবে না। তবে এটা সত্য কথা, ইসলাম নারীদের যে অধিকার দেয়, বেশিরভাগ জায়গায় মুসলিমরা তা দেয় না। এখন প্রাপ্য অধিকারগুলো চাওয়াকে যদি ফেমিনিজম বলা হয়, তবে সেটা দুঃখজনক। মধ্যযুগে কাফির ইউরোপিয়ান ইসলামবিদ্বেষীরা এই বলে মুহাম্মাদ-এর সমালোচনা করত—তিনি নারীদের বেশি অধিকার দিয়ে দিয়েছেন! কেউ যদি বলে—নারীদের স্টাডি করতে দেওয়া যাবে না, তবে সেটা ইসলামের উসুলেরই বিরুদ্ধে চলে যায়। হাদিসে স্পষ্ট সকলের ওপর জ্ঞান অর্জন ফরজ বলা হয়েছে।
ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ টার্কিশ ফ্যাশন অনুযায়ী মুসলিমদের মতো পোশাক পরে থাকতেন। এটাকেই তিনি সর্বাধুনিক কালচার মনে করতেন। এমনকী তিনি অন্যান্য খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের চেয়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে বেশি বিশ্বাস করতেন। সিগমান্ড ফ্রয়েডের ভাগ্নে তার দর্শন ব্যবহার করে বিশাল অর্থে নারীদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে “প্রক্রিয়াজাত” করা শুরু করে। আর বিভিন্ন মুসলিম দেশে যেহেতু পশ্চিমকে কপি করা হচ্ছে, তাই সেইসঙ্গে তারা পশ্চিমের সমস্যাগুলোও নিয়ে চলে আসছে। ইংল্যান্ডে নারীদের চাকরি করতে দেওয়ার বড়ো কারণ হলো—সরকার যেন এক পরিবার থেকে অধিক ট্যাক্স নিতে পারে।
ট্রটুলা নামের এক মহিলা বিজ্ঞানী ছিলেন ইতালিতে। বলা হয়ে থাকে, তিনি ওই সময়ের সমগ্র পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের একজন ছিলেন। নারীদের রোগ নিয়ে করা তার কাজ এখনও পাওয়া যায়। তবে হ্যাঁ, তার অস্তিত্ব নিশ্চিত না। হয়তো-বা এমন কেউই ছিল না এবং এসব শুধুই গল্প। কিন্তু এখানে হেনরি উইলিয়ামস বলেন—“মুসলিমরা না থাকলে মহিলা বিজ্ঞানী তো দূরে থাক, কোনো সময় মহিলা বিজ্ঞানী নিয়ে এমন কল্পকাহিনিও রচিত হতো না ইউরোপে!”
শিক্ষিত ইউরোপিয়ানরা পর্যন্ত মুসলিম মহিলাদের মতো নারীর খোঁজে ছিল একসময়। এটা জানেন আপনারা? ১৭শ শতক ছিল সেই সময়। নারীদের উগ্রবাদে তখন ইউরোপে এক আতঙ্কজনক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, সমাজ ভেঙে পড়ছিল। নারীরা বারবার তাদের স্বামীদের সাথে প্রতারণা করত। খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা পর্যন্ত এই সময় মুসলিম নারীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। পশ্চিমের পুরুষরা এই সময় একরকম জোর করেই নিজেদের নারীদের মুসলিমদের মতো বানাতে চাইত। মাসিঞ্জার নামক একজন লেখক একটি গল্পে একটি দৃশ্য দেখান।
একজন মুসলিম রানি তার ব্রিটিশ অ্যাম্বাসেডরকে বলছিল—ব্রিটেনে নারীরা কত ভালো থাকে, যা খুশি তা-ই করতে পারে। ব্রিটিশ লোকটা উলটো রানিকে বোঝায়—মুসলিমরাই আসলে ভালো, ব্রিটেনে তো নারীরা নষ্ট হয়ে যায়। সমাজ ধ্বংস হয়ে পড়ে। মুসলিম নারীরা ছিল আইডল। আর সকলে চাইত, যেন খ্রিষ্টান বিশ্বের নারীরা তাদের অনুসরণ করে। ১৭শ শতকের জর্জ স্যান্ডিস বলেন—“ইউরোপে নারীরা কোনো সময় সুখী না। এটা চাই, ওটা চাই; এমন প্রয়োজন, তেমন প্রয়োজন। অন্যদিকে মুসলিম নারীরা নিজেদের নারীসুলভ দায়িত্ব পালন করেই সুখী।"
যাহোক, পরবর্তী সময়ে যখন নারীদের মর্যাদা বেচে দিয়ে বিপুল অর্থ কামাইয়ের সুযোগ এলো, তখন সকলে সমাজ সংস্কারের কথা ভুলে গেল। ইসলাম নারীদের মর্যাদা রক্ষায় তৎপর থাকায় আগে যারা ইসলামের নারীদের প্রশংসা করেছিল, তারাই ইসলামের সমালোচনা শুরু করল। এটাই বাস্তবতা।
এখানে আপনাদের যা কিছু বললাম, তা কিন্তু মুসলিম নারীদের নিয়ে গবেষণা করে এসে বলিনি। মুসলিম স্কলারদের নিয়ে পড়ালেখা করতে গিয়ে মাঝখানে মাঝখানে এসব উঠে এসেছে। আরও কিছু সমস্যা আছে। অনেক মুসলিম পরিবার চাইত না যে তাদের স্ত্রী বা মেয়েদের নাম পাবলিশ হোক। মুসলিম নারীরা দেখা গিয়েছে অনেক সময়ই ছদ্মনাম হিসেবে পুরুষ নাম ব্যবহার করতেন। আবার অনেক ম্যানুস্ক্রিপ্টে নাম থাকে না এবং এসব কোনো নারীর লেখা হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। আবার কিছু ক্ষেত্রে বই বিক্রি করার সময় বিক্রেতা নাম কেটে দেন নিজ স্বার্থে। মুসলিম নারী স্কলারদের নিয়ে যে স্বল্পই কাজ হয়েছে—তা সহজেই বোঝা যায়। আল বেরুনি এক জায়গায় লিখেছিলেন—তিনি রায়হানার কাছে ঋণী। এই রায়হানার প্রতি তিনি একটা বইও উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু এই রায়হানার ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না। এই সাবজেক্টে বেশি ভালো মানের বই পাবেনও না, এক-দুটি ছাড়া। এমনকী বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলিম নারীদের নিয়ে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে, তা এক হাতে গোনা যায়।'
ডায়েরিটা পাশে রেখে তারাভরা আকাশ... স্যরি... প্লেন সাদা কালারের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম ভাবুক দৃষ্টিতে। এতদিন ধরে কীসব শুনলাম, এখন কী জানছি।
উঠে গেলাম। তারিক ও সিনানকে গিয়ে এসব বলতে হবে।

টিকাঃ
১. Salim al-Hassani, ‘Time and the Golden Age of Islam’ online video, YouTube; ডা. শামসুল আরেফীন, ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২.০ (ঢাকা : সমর্পণ প্রকাশন, ২০২০), পৃষ্ঠা ১৩৯; Salim al-Hassani, 1001 Inventions op. cit.
২. Salim al-Hassani. ‘Woman of Science in Muslim Heritage.’ YouTube. https://www.youtube.com/watch?v=wEaIBgWA--4
৩. Salim al-Hassani. ‘Early Women of Science, Technology, Medicine and Management’ Muslim Heritage.
৪. Mohammad Akram Nadwi, al-Muhaddithat (Interface Publications, 2007) vol. 1, p: 112
৫. Salim al-Hassani. ‘Woman of Science in Muslim Heritage.’ YouTube. March 26, 2014. Accessed July 21, 2019. https://www. youtube.com/watch?v=wEaIBgWA--4
৬. Salim al-Hassani. ‘Early Women of Science, Technology, Medicine and Management’ Muslim Heritage.
৭. Salim al-Hassani op. cit.
৮. Salim al-Hassani, 'Early Women of Science, Technology, Medicine and Management Muslim Heritage.'
৯. Suad Joseph, Encyclopedia of Women in Islamic Cultures (Brill 2003) vol. 1, p. 8.
১০. Suad Joseph, 360.
১১. Suad Joseph, 400.
১২. Suad Joseph, 40.
১৩. Suad Joseph, 41.
১৪. Jonathan Berkey, "Women and Islamic education in the Mamluk period' in Nikki R. Keddie and Beth Baron (edt), Women in Middle Eastern history: Shifting Boundaries in Sex and Gender (New Haven 1992) p: 143-157; Muhammad Akram Nadwi, al- Muhaddithat: Notes for a Talk on the Women Scholars of Hadith. Available at: http://www.interfacepublications.com/images/pdf/AKRAM_Article2.pdf; ডা. শামসুল আরেফীন ১৪৬।
১৫. Mohsen Haredy, 'Women Scholars of Hadith: A Case Study of the Eighth/Fourteenth-Century Mu'jam al-Shaykha Maryam' in Sebastian Günther (edt), Knowledge and Education in Classical Islam: Religious Learning between Continuity and Change (Leiden: Brill, 2020) p: 911.
১৬. Ibid
১৭. Salim al-Hassani, 'Woman of Science in Muslim Heritage'. YouTube. March 26, 2014. Accessed July 21, 2019. https://www. youtube.com/watch?v=wEalBgWA--4
১৮. Mohammad Akram Nadwi, p: xvi
১৯. Suad Joseph, 42. Karen Armstrong, Muhammad: A Biography of the Prophet (London: Phoenix, Paperback Edition 2001) p: 39.
২০. Nabil I. Matar, 'Renaissance England and the Turban.' Op. cit.
২১. Salim al-Hassani. 'Woman of Science in Muslim Heritage'. YouTube. March 26, 2014. Accessed July 21, 2019. https://www. youtube.com/watch?v=wEalBgWA--4
২২. ibid
২৩. 'Medieval Science among the Arabians' in H. S. Williams and E. H. Williams, A History of Science (Harper and Brothers, 1904)
২৪. Nabil I. Matar, ‘Renaissance England and the Turban,’ in David Blanks (edt), Images of the Other Europe and the Muslim World Before 1700 (Cairo: Cairo Press, 1997).
২৫. Nabil Matar, ‘The Representation of Muslim Women in Renaissance England,’ available at https://booksc.xyz/book/ 9789726 838b1f
২৬. Ibid
২৭. Ibid
২৮. Nabil Matar, ‘The Representation of Muslim Women in Renaissance England, p: 52.
২৯. Ibid, 51.
৩০. Ibid, 54.
৩১. Salim al-Hassani. ‘Woman of Science in Muslim Heritage.’ YouTube, March 26, 2014. Accessed July 21, 2019. https://www. youtube.com/watch?v=wEalBgWA-4
৩২. Carla Power, If the Oceans were Ink: An Unlikely Friendship and a Journey to the Heart of the Qur’an (New York: Henry Holt and Company, 2015).
৩৩. A-T. Tymieniecka (edt), Timing and Temporality in Islamic Philosophy and Phenomenology of Life (Springer, 2007) p: 267.
৩৪. Suad Joseph, 358.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 সেটা জিবারিশ...

📄 সেটা জিবারিশ...


গুরুগম্ভীর একটা বিষয়ে আলোচনার জন্য আসরের নামাজের সময় সিনান আমাকে একটি নির্দিষ্ট মসজিদে ডেকেছে। গিয়ে দেখি—তারিকও আছে। নামাজ শেষে তাদের সাথে মিলিত হলাম।
তারিক বলল— 'হ্যাঁ সিনান, এবার শুরু কর।'
হাঁটতে হাঁটতে আমাদের আলাপ চলল।
সিনান বলল— 'জাবির ইবনে হাইয়ান...'
আমি উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম— 'অনেক দিন পরে।'
'আরমান, তুই ভইনিচ ম্যান্যুস্ক্রিপ্ট'-এর নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছিস, তাই না?'
'হুম।'
'সেখানে ব্যবহার করা ভাষাটার নাম মনে আছে?'
'আ... উম... জিবারিশ মনে হয়।'
'হ্যাঁ! এই জিবারিশ শব্দটার এটিমোলজি মানে উৎস জানিস? এটি এসেছে জাবির ইবনে হাইয়ানের ল্যাটিনাইজড নাম Geber থেকে।'
'কেন?' তারিকের প্রশ্ন।
'কারণ হচ্ছে—জাবির ইবনে হাইয়ান মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত মানুষ... স্যরি, ভুল হয়ে গিয়েছে—সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত নাম।'
'বুঝলাম না।'
'বোঝাচ্ছি। সমস্যাটা হচ্ছে— “জাবির ইবনে হাইয়ান" আর Geber—এ দুটো নাম নিয়ে। জিবার আর জাবির ইবনে হাইয়ান—এ দুটো নাম আছে ৩০০০ এরও বেশি বইয়ের নিচে। কিন্তু একজন মানুষ একা এত বেশি কীভাবে লিখতে পারেন? আবার অনেক ল্যাটিনাইজড বইয়ের মূল অ্যারাবিকটা পাওয়া যায় না। এজন্য অনেকে মনে করেন, সেগুলো কোনো ওয়েস্টার্ন রসায়নবিদদের লেখা। এটাকে Geber-Problem বলে। এ দাবিটার অবশ্য গুরুত্ব নেই। কেননা, অনুবাদের পর মূলত পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যেতেই পারে। যাহোক, মেইন পয়েন্টে আসি। জাবির ইবনে হাইয়ানের পরবর্তী মুসলিম কেমিস্টরা তাকে নিজেদের ওস্তাদ হিসেবে মেনে নেয় এবং অনেকেই তার নাম সুডোনিম বা ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করে। আমার মনে হয়, এজন্যই মূল সমস্যাটা হয়েছে। তবে জাবির ইবনে হাইয়ানের ২০০টির বেশি বই ছিল—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আরেক দল বলতে চায়, জাবির ইবনে হাইয়ান নামের কোনো মানুষই ছিল না। এগুলো ভিত্তিহীন কথা। এদের জবাব দিয়ে Holmyard বলেন—এটা নিশ্চিত, Geber ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ কেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ান ছাড়া আর কেউ নন। ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ার নোমানুল হক—যার মূল স্পেশালাইজেশন জাবির ইবনে হাইয়ান, তিনি নিজের বইয়ে জিনিসটা পুরোপুরি ক্লিয়ার করে দিয়েছেন। '
রাস্তায় অতিরিক্ত মানুষ। হাঁটতে খুব সমস্যা হচ্ছে। এমন সময় তারিক বলল— 'নারীরা ঘরে থাকলে আর কিছু হোক আর না হোক, রাস্তায় অন্তত ভিড় কিছুটা কমত!'
সিনান অবশ্য বলে চলেছে— 'একটা জিনিস লক্ষ কর, Hippocrates-এর নামে ৬০টি বই আছে। একটির ব্যাপারেও শতভাগ নিশ্চয়তা নেই, তা হিপোক্রেটিস লিখেছেন কি না। হিপোক্রেটিসকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করা হয় Hippocratic Oath-এর জন্য, যেটা হিপোক্রেটিস লিখেনইনি! আর জাবির ইবনে হাইয়ানের ক্ষেত্রে একটু থেকে একটু সন্দেহ পেলেই সেটাকে এক বিরাট ব্যাপার বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এসব ওরিয়েন্টালিস্ট বায়াস অত্যন্ত বিরক্তিকর।
১২-১৩ খ্রিষ্টাব্দে লেখকের নামের জায়গায় জিবারওয়ালা পাঁচটা ল্যাটিন বই পাওয়া গিয়েছিল। এগুলোর মূল অ্যারাবিক পাওয়া যায়নি। এ কারণে অনেকে প্যাঁচ লাগায়। কিন্তু তার নামে তো যে কেউ বই লিখতেই পারে—এ বলে জাবির ছিল না বলা কেমন স্টুপিডিটি।
'সব বুঝে গিয়েছি, এবার চল কিছু খেয়ে নিই।'
'কী বুঝেছিস? আমি তো এখনও মূল জিনিস বলিইনি।'
'কী! জিবারিশ শব্দটা কোথা থেকে এসেছে, সেটা বলছিলি না এতক্ষণ?'
'না।'
'তো!'
'আমি তো শুধু জাবির ইবনে হাইয়ানকে নিয়ে জটিলতার ব্যাকগ্রাউন্ড দিলাম মাত্র।'
তারিককে বলতে না দিয়ে সিনান বলতে থাকল—'বিভিন্ন অ্যালকেমিস্টের জাবির ইবনে হাইয়ানের নাম ব্যবহার করার আরেকটি কারণ হতে পারে, আসল অ্যালকেমি অনেক কম মানুষ প্র্যাকটিস করত। সঠিকত্বের মানুষ দুনিয়ায় অনেক কমই থাকে, বুঝেছিস? বেশিরভাগই তখন লোভে পড়ে বিভিন্ন জিনিস মিলিয়ে স্বর্ণ বানানোর চেষ্টায় মেতে ছিল। আসল মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে এটা খুবই কুৎসিত একটা ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। আবু বকর আল রাজি, ইবনে সিনা, আল কিন্দি, ইবনে খালদুনের মতো বড়ো বড়ো ব্যক্তিত্ব এটার মারাত্মক সমালোচনা করেন। এই প্র্যাকটিস অবশ্য মারা যায়নি: তা ১৮ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। স্যার আইজ্যাক নিউটন শেষ অ্যালকেমিস্টদের একজন, যারা বিভিন্ন জিনিস মিলিয়ে স্বর্ণ বানাতে চেষ্টা করেছিলেন। ১৮ শতকে এই প্র্যাকটিস গোপনে চলে যায়।
যাহোক, মুসলিমদের মধ্যে কিছু মানুষ গোপনে অ্যালকেমি প্র্যাকটিস করতেন। তারা এ সময় কাভার নেওয়ার জন্য জাবির ইবনে হাইয়ানের নাম ব্যবহার করেন। এ কারণে অনেক প্যাঁচ বেঁধেছে। কেননা, তারা অনেক উলটা-পালটা কাজ করেছে—যা জাবিরের নামে চলে এসেছে। এখন ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তা বাদ দিতে হচ্ছে। আবার অনেক সময় জাবির ইবনে হাইয়ানকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাবির ইবনে আফলাহর সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। দুজনের ল্যাটিন নাম একই।
জাবির ইবনে হাইয়ান স্বর্ণ তৈরি করতে পেরেছিলেন কি না—এ ব্যাপারে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কথা বলে, কিন্তু সেসবে যাব না। শুধু একটি কথা বলব।'
'তাড়াতাড়ি বল! খিদে পেয়েছে।'
'আরে এখনও মূল আলোচনা শুরুই হয়নি...'
'ইন্নালিল্লাহ!'
'এই তো আসছি...'
'মাইর খাবি এখন!'
সিনান হেসে দিয়ে আবার বলা শুরু করল— 'জাবির ইবনে হাইয়ানের রসায়ন গবেষণাগার কোথায়, সেটা কেউ জানত না। তার মৃত্যুর ২০০ বছর পর কুফায় একটা রাস্তার রিকন্সট্রাকশন চলছিল। এই সময় তার গবেষণাগার আবিষ্কৃত হয়। আর সেখানে একটা বিশাল স্বর্ণখণ্ডও পাওয়া যায়।'
'বাপ রে বাপ!' তারিক ও আমি সমস্বরে চিল্লিয়ে উঠলাম।
'হ্যাঁ। এবার তাহলে “জিবারিশ” কেন জাবির ইবনে হাইয়ানের ল্যাটিনাইজড নাম—তা ক্লিয়ার করি। মনে আছে, লাইব্রেরিতে তারিক জাবির ইবনে হাইয়ানের কৃত্রিম জীবন আবিষ্কারের চেষ্টার কথা বলেছিল? যার কারণে আমরা তাকে পাগল ভেবেছিলাম?'
'হ্যাঁ।' আমি হেসে বললাম।
'অনেকের মতে—এটা জাস্ট সুফিবাদী চিন্তা-ভাবনা। এজন্য বলা হয়, এটা গ্যেটের ফাউস্ট ও মেরি শেলির ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন-এর অনুপ্রেরণা। কিন্তু বাস্তবে কি ওসব কাল্পনিক চিন্তা-ভাবনা ছিল?'
সিনানের কথায় শরীর শিউরে উঠছে।
'এটা বলা সম্ভব না। অ্যালকেমি নিয়ে তার বেশিরভাগ লেখা বোঝা দুঃসাধ্য। সবই যেন ধাঁধা। বোঝা সম্ভব না বললেই চলে। এটা অবশ্য জাবির ইবনে হাইয়ান একা করেননি; মাসলামাহ আল মাজরিতি নামের আরেকজন আন্দালুসিয়ান অ্যালকেমিস্টও করেছিলেন। মূলত এটা প্রায় সকল বড়ো বড়ো অ্যালকেমিস্টদের স্টাইল। অনেকে মনে করেন, তারা জ্ঞানটা সবাইকে দিতে চাননি। শুধু তাদেরই দিতে চেয়েছেন, যারা অ্যালকেমির জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।
এজন্য তারা এমন ভাষা ব্যবহার করেছে। আরেকজন অ্যালকেমিস্ট আবুল কাসিম আল ইরাকি ব্যাখ্যা দিয়েছেন—নিজের আবিষ্কার অন্যের নামে চলে যেতে না দেওয়াটা জাস্ট নরমাল মানবীয় চরিত্র। মুসলিমদের আগেও ইতিহাসে এমনই দেখা গিয়েছে। এটা সত্য, বর্তমানে পেট্যান্টের ব্যবস্থা তার বলা ওই কারণটির ফলেই হয়েছে। আবার জাবির ইবনে হাইয়ানের শিক্ষক জাফর সাদিকও জাবির ইবনে হাইয়ানকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যেন অযোগ্য কারও হাতে জাবিরের লেখা না পড়ে। এ ছাড়াও আসলে বিজ্ঞানের বিভিন্ন জিনিস তো আর সাধারণ মানুষরা বোঝে না, সেগুলো দক্ষরাই বোঝে। তাহলে সাধারণ মানুষকে জানিয়েই-বা লাভ কী? তাই আবুল কাসিম ইরাকির মতে—অ্যালকেমিস্টদের লেখা এমন, যেগুলো সুদক্ষ অ্যালকেমিস্টরাই বুঝতে পারবে।
অনেকেই অ্যালকেমির নামে ভন্ডামি করত। অকাল্টিস্ট ছিল, তারপর অনেকে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে মানুষের টাকা খেত। জাবির ইবনে হাইয়ানের ওপর অকাল্টিজম বা জাদুর কোনো রকম অভিযোগ গ্রহণযোগ্য না। কিছু কাজকে অকাল্ট সায়েন্স বলা যেতে পারে, সেটা নেগেটিভ কিছু না; একটা নতুন টার্ম। ম্যাথিউ মেলভিন-কুশকি, যিনি মুসলিম বিশ্বে অকাল্টিজমের ওপর বর্তমানে সবচেয়ে বড়ো স্কলার, তিনি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ লিস্ট দেন মুসলিম অকাল্টিস্টদের। তিনি বলেন, জাবির ইবনে হাইয়ান অকাল্টিস্ট ছিলেন না। এমনকী গ্রিক অ্যালকেমির সাথেও জাবিরের অ্যালকেমি তুলনা করা যায় না। তিনি যা করতেন—তা এক্সপেরিমেন্টাল সায়েন্স। তিনি যে অ্যালকেমিক্যাল ট্রান্সমিউটেশন করতেন, তা কেবল বিভিন্ন বস্তুর পদার্থের গাণিতিক আনুপাতিক পরিবর্তন। বর্তমানে তো মানুষ সবকিছুকেই জাদু বানিয়ে দেয়। ফ্ল্যাট আর্থারদের ব্যাপারে তো জানিস।'
'জাবির ইবনে হাইয়ান ইর‍্যাশনাল অর্থাৎ অযৌক্তিক, আনসায়েন্টিফিক কিছু করেননি। তিনি খুব সিস্টেমেটিক ওয়েতে কাজটা করতেন। তিনি নিজেই সেসব অ্যালকেমিস্টের সমালোচনা করেছেন, যারা আন্দাজে বিভিন্ন জিনিস মিলিয়ে কোনোরূপ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়াই স্বর্ণ বানাতে চাইত। সুডো-জাবিবরা উলটা-পালটা কাজ করেছে, কিন্তু জাবির ইবনে হাইয়ানের কোনো বইয়ে ত্যাড়াব্যাকা কিছু নেই। অন্যদের কারণে মাঝে দিয়ে তার নাম খারাপ হয়। আর জিনিসটা অত্যাধিক সিম্পল। তিনি ইমাম জাফর সাদিকের স্টুডেন্ট—এমন পাগলামি করতে যাবেন কেন? আর যদি জাবির জাদুকর হতেন, তাহলে অসংখ্য অকাল্টিস্ট তার নামের আশ্রয় কেন নিত? জাবিরের নাম মুসলিম বিশ্বে পজিটিভলি নেওয়া হতো, এজন্যই অন্যরা অকাল্ট জিনিস করার সময় জাবিরের নাম ভাঙ্গিয়ে চলত।
এখন তারিক মুভি-টভি দেখে সাই-ফাই কিছু ভাবছে। কিন্তু সে রকম না। আল্লাহ যেভাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, জাবির ইবনে হাইয়ান চেষ্টা করেছিলেন সেখানে একটা প্যাটার্ন খুঁজতে। তার কাজ অনেকটা বর্তমানের Synthetic Biology-এর মধ্যে পড়ে যায়। তিনি ভেবেছিলেন, ল্যাবরেটরিতে জেনেটিক্যালি মডিফাইড জিনিস তৈরি করতে পারবেন। তার এ রকম কিছু থিওরেটিক্যাল বর্ণনা তুই পড়েছিলি তারিক। Futuristic Technology-এর একটা উদাহরণ বলা যায় তার কাজকে। তার সামগ্রিক কাজে মডার্ন কেমিস্টের অসংখ্য বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। যারা অন্যরকম বলে, তারা কোনোরকম অ্যানালাইসিস ছাড়াই সেসব বলে।
এখন তার তাকউইন থিওরিগুলো কাজের হোক আর না হোক, চিন্তা-ভাবনার মাত্রাটা ইন্টারেস্টিং। আর এটাও ক্লিয়ার করা উচিত হবে, এসব কেবল থিওরেটিক্যাল চিন্তা-ভাবনাই ছিল, তিনি এমন কোনো এক্সপেরিমেন্ট করতে যাননি। আর তার কাজে বারবার তিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয় আনেন। বর্তমানে সেক্যুলারলি যেমন এসবকে আল্লাহর বিরুদ্ধবাদী করে প্রকাশ করা হয়, কোনোভাবেই সে রকম না। এপিস্টেমোলজির মাঝে বিশাল ফারাক। শেষ কথা হচ্ছে, ঠিকভাবে বোঝাই যায় না—এখনও এসবের মূল অর্থ কী। ফাঁকা সুফিবাদী চিন্তাও হতে পারে, যেখানে সবকিছু সবকিছুর মধ্যে হারিয়ে যায়।'
'ইয়েস, আমি পাগল না!' তারিকের উল্লাস।
'ধারণা করা হয় এই আজব বইগুলোর অর্থ যারা বুঝবেন, শুধু তারাই জাবির ইবনে হাইয়ানের সকল কাজ জানবেন। জাবির ইবনে হাইয়ানের লেখা জিবারিশ; তো, এজন্যই জিবার থেকে জিবারিশ এসেছে।'
'সেই! খিদে আর নেই।'
'আর জাবির ইবনে হাইয়ানের কিছু অদ্ভুত আবিষ্কার আছে, যেগুলো বাস্তবেই ছিল, কোনো সন্দেহ নেই।'
'মানে, এগুলো অদ্ভুতভাবে অস্থির?'
'হ্যাঁ... বলতে পারিস। জাবির ইবনে হাইয়ান কাপড় ওয়াটারপ্রুফ করার জন্য একটা কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। ওই সময় মরিচারোধী লোহা তৈরি করেছিলেন, আয়রন পাইরাইট ব্যবহার করে স্বর্ণাক্ষরে লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। অন্ধকারে পড়া যায়, এমন এক ধরনের কালি আবিষ্কার করেছিলেন।'
'বাপ রে বাপ রে বাপ!'
'তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জারণের সময়ে ধাতুর ভর কমে। এক কেমিক্যাল অন্য কেমিক্যালের সাথে যুক্ত হলে মাইক্রোস্কোপিক লেভেলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার আদান-প্রদান হওয়ার কথাও বলেছেন। বুঝতে পারছিস? চিন্তা করতে পারিস? তিনি ইলেকট্রনের কথা বলছেন, ১২০০ বছর আগের সেই জাবির ইবনে হাইয়ান!'
'ওরে বাপ রে বাপ রে বাপ রে বাপ!'

টিকাঃ
১. Stephen Bax, 'The world's most mysterious book' online video, TED ed.
২. Philip K. Hitti p: 381
৩. Holmyard সে চারজনের একজন—যারা জাবির ইবনে হাইয়ানকে নিয়ে মূল কাজ করেছেন।
৪. S. Nomanul Haq, Names, Natures and Things: The Alchemist Jabir ibn Hayyan and His kitab al-ahjar (Book of Stones) (Kluwer Academic Publishers, 1994)
৫. 'Hippocrates' in Kara Rogers op. cit.
৬. বিস্তারিত জানতে পড়ুন—আহমাদ ইউসুফ আল হাসানের— a. A Critical Reassessment of the Geber Problem (in 3 parts) b. The Geber Problem: The Origin of Liber Fornacum c. Jabir's Latin Works and the Question of Geber (history-science-technology.com)
আর, মাত্র এতটুকু লেখা দিয়ে এই বিষয়টি কোনোভাবেই কাভার করা সম্ভব না। এই বিষয়টি খুবই বিতর্কিত ও জটিল। এর জন্য অবশ্যই আলাদা লেখার প্রয়োজন।
৭. Salah Zaimeche. 'The Advent of Experimental Chemistry' Muslim Heritage; Michael H. Morgan, p: 165
৮. মামুন ঘেরশ, "Alchemy Crash Course: "History of Science #10" online video Crash Course
৯. Salim Al-Hassani and Mohammed Abattouy, "The Advent of Scientific Chemistry: Muslim Heritage.
১০. Phillip K. Hitti. p. 680
১১. Michael H. Morgan, p: 162; Ehsan Masood, p: 157
১২. Ibn Khaldun, Muqaddimah: an Introduction to History, (Translated by Franz Rosenthal, Princeton University Press, 1967) p. 694.
১৩. Sonja Brentjes, p: 101; M. Shamsher Ali, p: 189
১৪. "The Lonely Alchemist" in J. al-Khalili, Pathfinders
১৫. M. Shamsher Ali op. cit.
১৬. "The Lonely Alchemist" in J. al-Khalili, Pathfinders
১৭. S. Nomanul Haq op. cit.
১৮. Michael H. Morgan, p: 163.
১৯. S. Sabreen Syeed, "The Mystic Who Created Modern Science Jabir ibn Hayyan" kn-ow.com.
২০. Michael H. Morgan, p: 164.
২১. "Chemistry" in 'School' in Salim al-Hassani op. cit.
২২. Michael H. Morgan, p: 164

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 বিজ্ঞানের ইতিহাস

📄 বিজ্ঞানের ইতিহাস


জুমার নামাজের পর তারিক, আমি ও সিনান তিনজনে মিলে আলোচনা করি। কিন্তু আজ তা হলো না। সিনান বলল—'আভনিশ তার বাসায় আমন্ত্রণ করেছে। তোরাও যাবি আমার সাথে।'
আমি কারণ জানতে চাইতে নিলাম, কিন্তু তারিক বাধা দিলো—'আমন্ত্রণ? নিমন্ত্রণ করল না কেন?'
আমরা হেসে দিলাম। অবশেষে বললাম—'কীসের জন্য যেতে বলেছে সে?'
'কী আর, তর্ক করবে?'
'ছেলে তো ব্রিলিয়ান্ট আছে, এতদিন গবেষণা করে আমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে হয়তো-বা।'
'চল দেখি, কী হয়।'
আমরা যথাসময়ে আভনিশের বাসায় উপস্থিত হলাম। আমাদের বসতে দিয়ে সে ভেতরে গেল। নিমন্ত্রণ করেনি ঠিক, তবে নেমন্তন্নের ব্যবস্থা করেছে। তার ছোটো ভাইকে দিয়ে চানাচুর, বিস্কুট ও কফি পাঠাল।
তারিক তাকে কাছে ডাকল—'এদিকে আসো তো দেখি... তোমার নাম কী?'
'আমি নির্ভীক।'
'ওরে! তোমাকে দেখে তো আমার ভয় করছে এখানে।'
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নির্ভীক লাফিয়ে উঠল—'ভাইয়া ভাইয়া। আমার একটা প্রশ্ন আছে।'
তারিক এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর প্রশ্ন করার অনুমতি দিলো।
'ভাইয়া, শয়তানের বউয়ের নাম কী?'
পড়ল তারিক বিপাকে! আমার কানের কাছে এসে বলল—'অদ্ভুত প্রশ্ন করে ছেলেটা। আভনিশের ভাই তার মতোই ত্যাড়াইল্লা। মান-সম্মান তো বাঁচাতে হবে ছোটো ভাইয়ের সামনে।'
সিনান বলল—'চেষ্টা কর তারিক, আমরা তোর সাথে নেই।'
কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল—'আমি তো জানি না... মানে... আমাকে তো দাওয়াত দেয়নি বিয়েতে!'
এরই মধ্যে আভনিশ এসে তার ভাইকে বকে ভেতরে পাঠিয়ে দিলো।
সিনান বলল—'এবার বল, যে কারণে ডেকেছিস।'
একটি কাগজ হাতে নিয়ে বসল আভনিশ। আজ তাহলে লম্বা চলবে...
'মুসলিমরা কত্ত বড়ো বাটপার! হিন্দুদের থেকে নাম্বার থিওরি মেরে দিয়ে নিজেরা কৃতিত্ব নিয়ে নিয়েছে।'
আভনিশের কথা শুনে তো তারিক হেসেই কুটি কুটি।
'হাসছিস কেন?' তাকে জিজ্ঞেস করলাম।
'মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমির বইয়ের নাম ছিল কিতাব আল হিসাব আল হিন্দি। মুসলিমরা তো হিন্দুদেরই ক্রেডিট দিচ্ছিল। পরে ইউরোপিয়ানরা মুসলিমদের নাম দিয়ে দিলে আমাদের কী দোষ!'
আভনিশ যে ভাব নিয়ে বলা শুরু করেছিল, তারিক তাকে একদম গুঁড়িয়ে দিলো।
সিনান বলল—'হ্যাঁ, তাকে ছাড়াও অন্যান্য মুসলিম গণিতবিদরা নিজেরাই হিন্দুদের ক্রেডিট দিচ্ছিলেন। পশ্চিমারাই ইসলামের নাম দেয়, আবার পশ্চিমারাই ইসলামকে গালাগালি করে!'
কী অপমান!
আভনিশ কথা ঘুরিয়ে ধরল— 'আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আকাশে ওড়ার ঘটনা পুরাই বানানো। তার মৃত্যুর ৭০০ বছর পর এটা লেখা হয়। তিনি বাস্তবে কখনো আকাশে ওড়েনইনি। আরমান ফিরমানেরটার মতো তারটাও মিথ।'
সিনান কিছুক্ষণ চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকল আভনিশের দিকে। তারপর বলল—'ইবনে সাঈদ মাগরিবি আর মারওয়ান ইবনে হাইয়ানের মতো ক্লাসিক্যাল স্কলারদের শক্ত রেফারেন্স আছে। তা ছাড়া স্প্যানিশ ইতিহাসের প্রধান মানুষ লেভাই প্রোভেঞ্চালও এটা উল্লেখ করেন। তিনি যে কয়েক মুহূর্ত না; বরং পাক্কা ১০ মিনিট আকাশে উড়ছিলেন—এটা একদম প্রতিষ্ঠিত। এত কিছুর পরও তুই বলছিস, এ ইতিহাস মিথ্যা?'
কিছুক্ষণ কাগজের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকার পর বলল—'কিন্তু তারপরও তাকে পথিকৃৎ বলা যায় না। কারণ, তার অনেক আগে চাইনিজ বিজ্ঞানীরা আকাশে উড়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।'
সিনান কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইল। তারপর গম্ভীরভাবে বলল—'আভনিশ! তুই বিজ্ঞানের ইতিহাস বুঝিস না। একটা জিনিস না বুঝলে সে ব্যাপারে কথা না বলাই ভালো। বিজ্ঞানের ইতিহাসে কৃতিত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা সরল রেখাংশ থাকতে হয়। রেখাংশের কোনো জায়গায় ভাঙা থাকলে এর আগের বিজ্ঞানীরা ক্রেডিট পান না। শুধু যে রেখাংশতে বর্তমান পর্যন্ত কোনোরকম ভাঙা চিহ্ন থাকবে না, সেই রেখাংশে থাকা বিজ্ঞানীরাই কৃতিত্ব পাবেন। X, a, b, c চারজন বিজ্ঞানী হলে যদি চারজনের মধ্যে কোনোরকম সম্পর্ক থাকে, তাহলে তারা প্রত্যেকেই কৃতিত্ব পাবেন। আর প্রথমজন হবেন পথিকৃৎ। ধর, যদি x-এর সাথে a-এর কানেকশন না থাকে, তাহলে x থাকবে ভাঙা চিহ্নের আগে, কৃতিত্বও সে পাবে না।
উদাহরণ দিই। মনে কর, মরিস ওয়ার্ড নামে একজন Starlite নামক একধরনের অসাধারণ পদার্থ আবিষ্কার করলেন। এটির প্রক্রিয়াকরণ জানার জন্য স্পেস এক্স, নাসাসহ বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান লেগে গেল। কিন্তু মরিস ওয়ার্ড পদার্থটির অপব্যবহারের আশঙ্কা করে এটি বানানোর প্রক্রিয়া প্রকাশ না করেই মারা গেলেন।
এখন ধর, তুই সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতায় অরিজিনালি এটা আবিষ্কার করলি। বিজ্ঞান মহলে তোর অনেক প্রশংসা হলো, অনেক অ্যাওয়ার্ড পেলি, পুরো বিশ্বে বিখ্যাত হলি। তুই মারা যাওয়ার ২০০ বছর পর একজন ইতিহাস লিখতে বসল। সেখানে সে লিখল—তুই না; বরং মরিস ওয়ার্ড স্টারলাইট প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। এভাবে তোকে বাদ দিয়ে আবিষ্কারকের জায়গায় তার নাম দিয়ে দেওয়া অন্যায়। তুই তো জানতি, মরিস ওয়ার্ড আগে এটা আবিষ্কার করেছিলেন। আর এটা আবার বানানো সম্ভব। আব্বাস ইবনে ফিরনাস তো চাইনিজদের ব্যাপারে জানতেনও না! তারপরও তিনি পথিকৃৎ না হন কীভাবে? তো বুঝতে পেরেছিস এবার, আভনিশ?'
আভনিশ উত্তর না দিয়ে বলল—'তুই আগেরবার বিজ্ঞানে ইসলামের সুমহান প্রভাব দেখাচ্ছিলি; অথচ ইসলামের কারণেই অবশেষে বিজ্ঞানের অধঃপতন হয়।'
'কই? কীভাবে?'
'এই যে, ইমাম গাজালি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে একটা বই লিখেছিলেন।'
'হুম, আবু হামিদ আল গাজালির কারণে ইসলামে বিজ্ঞানের অধঃপতন হয়— এই ধারণাকে জর্জ স্যালিবার মতো বড়ো স্কলারই উড়িয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া গাজালি তার আত্মজীবনীতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, ফায়লাসুফরা ধর্মতত্ত্ব আর অধিবিদ্যা নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করলেই যত সমস্যা শুরু হয়। অন্য কোনো ক্ষেত্রে তার আপত্তি নেই। তিনি আরও লিখেন, ইসলাম যে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধবাদী, স্পেসিফিকলি বললে গণিতের বিরুদ্ধবাদী—তা চিন্তা করা মারাত্মক ভুল। আর একটা বই লেখার কারণে যে শত শত মানুষের তৈরি করা সায়েন্টিফিক ট্র্যাডিশন নষ্ট হয়ে যাবে, এটা যে কমন সেন্সের সাথেও যায় না কোনো সময়—সেটা তুই ভালোই বুঝিস।'
এরপর সিনান হেসে দিয়ে বলল—'জর্জ স্যালিবা বলেন, “গাজালির পর মুসলিম বিশ্বে আসল জ্যোতির্বিদ্যার স্বর্ণযুগ শুরু হয় এবং সামগ্রিকভাবে আবিষ্কারের সত্যিকার স্বর্ণযুগ এরপরেই শুরু।” ইসলামি দর্শনের অথোরিটি পিটার অ্যাডামসন বলেন—“গাজালির সময় থেকেই দর্শনের আসল স্বর্ণযুগ শুরু হয়।" এবার?'
'মাইকেল এইচ হার্ট তার The Hundred বইয়ে নিউটনকে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছেন। তিনি তো ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান ছিলেন। কিন্তু কোনো খ্রিষ্টানকে কখনো দেখেছিস ধর্ম টেনে এনে তাকে নিয়ে গর্ব করতে? তোদের এত কেন?'
'আগেরবারের আলাপ থেকে তো তুই কিছু শিখলিই না। বিজ্ঞান সব সময় একটা প্যারাডাইমে কাজ করে। একে ভ্যালু ফ্রি ভাবা বোকামি। আর হ্যাঁ, তাকে ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্টিস্ট বলতে দেখেছি, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের হিন্দু সায়েন্টিস্ট বলতে দেখেছি। বাকি পড়ালেখা না করে সারাক্ষণ ফেসবুকে বসে থাকলে বুঝবি কীভাবে? আর বর্তমান বিজ্ঞানের সাথে কিছু লাগানো না হলেও এটা কক্ষনো ভ্যালু ফ্রি না। ম্যাটেরিয়ালিজম, পজিটিভিজম, হিস্টোরিসিজম বিভিন্ন প্যারাডাইমে তা কাজ করে। আর আমরা কাউকে নিয়ে গর্ব করি না। আমি অ্যারিস্টটল, ব্রহ্মগুপ্ত, আইনস্টাইন সকলের সেরা কাজের প্রশংসা করি, তার মানে কি এটা নাকি যে তাদের নিয়ে গর্ব করি?'
'তাহলে মুসলিমদের কাজ নিয়ে লাফাস ক্যান?'
'মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ মুসলিমরা করেনি; নন-মুসলিমরা করেছে। তারা লাফায় ক্যান?'
পালটা প্রশ্ন শুনে আভনিশ বিব্রত।
সিনান বলে চলল—'Work well done is acclaimed. And we are only being fair towards a particular civilization.'
আমি হেসে দিয়ে বললাম— 'আসলেই ব্যাটা! মুসলিমদের কাজ নিয়ে নন-মুসলিমরা প্রশংসা করলে প্রবলেম নেই, মুসলিমরা প্রশংসা করলেই গর্ব করা হয়ে যায়; আরও কত কত সমস্যা!'
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আভনিশ বলল—'আর যাই বলিস, মুসলিমদের মধ্য থেকে গত ১২০ বছরে মাত্র তিনজন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছে...'
সিনান এবারে ক্ষেপে গেল— 'মাত্র তিনজন মুসলিম বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছে— এর কোনো মানেই হয় না। ইসলামি স্বর্ণযুগে যদি বর্তমানের নোবেল প্রাইজের সমমানের কোনো অ্যাওয়ার্ড থাকত, তাহলে তার ৯৫% ই মুসলিমরা পেত। একই কথা ভারতীয় স্বর্ণযুগ, চায়নার স্বর্ণযুগ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও খাটে। এখন ইউরোপিয়ান স্বর্ণযুগ চলছে, তো তারা সব পাচ্ছে, এত শক খাওয়ার কী হলো এতে? ইসলামি স্বর্ণযুগে ইউরোপের অবস্থা যে কত খারাপ ছিল! ইতিহাসবিদ ভিক্টর রবিনসন বলেন—“ইউরোপের সবচেয়ে উঁচুশ্রেণির মানুষরাও নিজের নামটা পর্যন্ত লিখতে পারত না।” যেখানে ওই সময় এমন কোনো মুসলিম কৃষকও পাওয়া দুষ্কর ছিল—যে লিখতে বা পড়তে জানত না। বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থা কি এতটা খারাপ?'
প্রশ্বাস নিয়ে শান্ত হয়ে সিনান বলল— 'জর্জ সারটন বিজ্ঞানকে ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন— "এই গাড়ি গ্রিকরা চালিয়েছেন, রোমানরা চালিয়েছেন, সব ধরনের মানুষরাই চালিয়েছেন এবং কিছুদিন আগে চালিয়েছেন মুসলিমরা। এখন চালাচ্ছে ইহুদি আর খ্রিষ্টানরা।" গাড়ি একই, কিন্তু ভিন্ন চালক। এটা এমন গাড়ি—যা শুধু এগিয়ে যায়, কোনো সময় পেছনে ফিরে আসে না। তোর যদি বিজ্ঞানের ইতিহাসের কোনোরকম বুঝ থাকত, তাহলে তুই অমন কথা বলতি না।'
'তারপরও নিউটন আইনস্টাইন, তারাই তো মেইন বিজ্ঞানী, আমরা কি তাদের থেকে বেশি কাউকে সম্মান দিতে পারি?'
সিনান দীর্ঘশ্বাস ফেলল—'আভনিশ, বিজ্ঞানের ইতিহাসে মেইন বলতে কিছু নেই। বিজ্ঞানের ইতিহাস একটা তাসের ঘর। ওপর থেকে কতগুলো সরাবি, তেমন সমস্যা হবে না। কিন্তু নিচ থেকে কয়েকটা নিয়ে যাবি, সব ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে। তেমনই নিউটন, আইনস্টাইন না থাকলেও বেশি সমস্যা হতো না। জীবন চলত। ২০০-৩০০ বছর পর হলেও কেউ না কেউ তাদের জায়গা পূরণ করে দিত। কিন্তু নিচ থেকে অ্যারিস্টটল, টলেমি, ব্রহ্মগুপ্ত, ইবনুল হাইসামকে সরিয়ে দিবি, ভবিষ্যতের ইতিহাস আর লেখা হবে না। আর এখানে ইসলাম আলাদা গুরুত্ব পায়। ইসলাম প্রাচীন আর আধুনিক যুগের মাঝে যোগসূত্র। ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্টে ইসলামের আগের প্রায় সকল জ্ঞানকে অ্যারাবিকে রূপান্তর করে নেওয়া হয়। এভাবে এই তাসের ঘর ভেঙে পড়াকে, অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে রক্ষা করে মুসলিমরা।'
মাগরিবের আজান শোনা গেল।
'আচ্ছা আভনিশ, আজ আসি। পরেরবার মজা হবে ইনশাআল্লাহ।' অতঃপর মুচকি হাসি দিয়ে বলল সিনান— 'আর তুই যতই চেষ্টা করিস না কেন, কোনো লাভ নেই আভনিশ। পৃথিবীর ৫৬ জন লিডিং রিসার্চার স্বাক্ষর করেছেন, খ্রিষ্টান পশ্চিম ইসলামি বিশ্বের কাছে ঋণী। '
যাওয়ার সময় আমি চিন্তা করলাম: ইসলাম-বিদ্বেষীরা মনে করে, আমরা বোকা। আর আমরা জানি যে, তারা বোকা।

টিকাঃ
১. হাসান আল বসরি রাহিমাহুল্লাহকে একজন প্রশ্ন করলে তিনি এমন উত্তর দেন : Mohammad Akram Nadwi, ‘History of Islamic Sects' Al-Salam Institute.
২. D. E. Smith and L. C. Karpinski, p: 46; 'Medieval Science among the Arabians' in H. S. Williams and E. H. Williams, A History of Science (Harper and Brothers, 1904)
৩. Hank Green, 'The Weird Truth About Arabic Numerals' Online Video, SciShow; তবে হ্যাঙ্ক এই পয়েন্টটি মিস করেছেন যে, সংখ্যাগুলো লেখা ছিল অ্যারাবিকে। এজন্যই অ্যারাবিক নিউমারালস নামকরণ করা হয় প্রধান গুরুত্বটি ভাষায়। কারণ, সেখান থেকেই সংখ্যাগুলো এসেছে।
৪. আরও দেখুন: Asadullah Ali. 'The Structure of Scientific Productivity in Islamic Civilization: Orientalist Fables' Yaqeen Institute for Islamic Research, 2017. pp: 31-48.
৫. George Saliba, p: 21.
৬. W. Montgomery Watt, The Faith and Practice of al-Ghazali (London: George Allen and Unwin Ltd, 1952) p: 34-36.
৭. George Saliba, ch. 7; Peter Adamson and Richard C. Taylor, ed. The Cambridge Companion to Arabic Philosophy (Cambridge: Cambridge University Press, 2005), 6.
৮. Salim al-Hassani, 'Time and the Golden Age of Islam' Online Video, YouTube.
৯. Victor Robinson, The Story of Medicine p: 164 as cited in Hamza Tzortzis op. cit. 'Europe was dirty, Cordova built a thousand baths; Europe was covered with vermin. Cordova changed its undergarments daily; Europe lay in mud, Cordova's streets were paved; Europe's palaces had smoke-holes in the ceiling, Cordova's arabesques were exquisite; Europe's nobility could not sign its name, Cordova's children went to school: Europe's monks could not read the baptismal service, Cordova's teachers created a library...
১০. E. H. Wilds and K. V. Lottich, 'Foundations of Modern Education', (4th edition, Holt McDougal, 1970) as cited in Salim al-Hassani op. cit.
১১. George Sarton, Introduction to the History of Science op. cit. vol. 2, p: 109.
১২. George Saliba, p: 2.
১৩. Charles Burnett. 'Mont Saint-Michel or Toledo: Greek or Arabic Sources for Medieval European Culture' Muslim Heritage.

ফন্ট সাইজ
15px
17px