📄 দার্শনিক ব্যক্তিত্ব
আমাদের স্কুলে নতুন এক ইসলাম শিক্ষা টিচার এসেছেন। নাম আব্দুল মাজিদ। স্যার অনেক লম্বা: ৬.২" হবে সম্ভবত। স্যারের দাড়িও ওই রকম লম্বা। স্যারের ক্লাস অনেক মজার, কথাবার্তা দারুণ। নতুন নতুন জিনিস শেখান।
ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইটি অবশ্য পড়ান না। প্রথম দিনই আমাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন—'তোমাদের কী ইসলাম পড়াব নাকি ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা?' তখন আমরাই বলেছিলাম ইসলাম পড়াতে। কিন্তু এবার তিনি ভয়ংকর একটি সিদ্ধান্ত আমাদের জানালেন—'তোমাদের প্রত্যেককে সামনে আসতে হবে এবং ইসলামের ওপর বক্তব্য রাখতে হবে। ইসলামের কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে। কুরআন, হাদিস, ইতিহাস, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাহলে দেখবে, অনেক কিছু শেখা হবে। ভুল হলে আমি ঠিক করে দেবো।'
তারিক আর আমার রোল তো পেছনে, কিন্তু সিনানের কী হবে? ওর রোল তিন! তার আবার আমার মতো সবার সামনে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গেলে পা কাঁপে। তারিকের অবশ্য কিছু কাঁপে না। তার আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, সাহস ভালোই আছে। সিনানকে অবশ্য দেখে নির্ভার মনে হচ্ছে।
যেহেতু রোল এক হিন্দু, তাই প্রথম বক্তা রোল দুই। এর বক্তব্য এক্কেবারে বাজে হলো। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বই থেকে মুখস্থ বুলি আওড়ে গেল শুধু। এবারে সিনানের পালা! তারিক আর আমি মুচকি মুচকি হাসছি। সিনান অবশ্য পুরো আত্মবিশ্বাস নিয়েই উঠে গেল, তেমনভাবেই বলা শুরু করল—
'বাদশাহ সাইফুদ্দউলার দরবার, সে সময়কার বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম এক আকর্ষণ। তিনি বুদ্ধিজীবীদের সকল ধরনের সুবিধাই দিচ্ছিলেন তখন। একদিন তার দরবারে বুদ্ধিজীবীদের আসর বসল। এমন সময় আবির্ভূত হলেন নতুন এক মানুষ; কালো জুব্বা পরা। সবাই তার সম্মানে দাঁড়ালেন, বাদশাহও। বাদশাহ তাকে বসতে বললেন।
ব্যক্তিটি প্রশ্ন করলেন— “আপনি আমার ব্যাপারে যা ধারণা রাখেন সে অনুযায়ী বসব, না নিজ যোগ্যতা অনুসারে বসব?”
বাদশাহ উত্তর দিলেন— “নিজ যোগ্যতা অনুসারেই বসুন।”
তিনি যেটা করলেন, বাদশাহকে সরিয়ে তার আসনে বসে পড়লেন! বাদশাহ তো মহাবিরক্ত। উজিরকে গোপন ভাষায় বললেন— “আমি এখন তাকে কিছু প্রশ্ন করব, সে যদি সেগুলোর উত্তর দিতে না পারে, তবে তাকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।”
দরবারে কেউ বাদশাহর কথাগুলো বুঝতে পারল না, তবে সেই ব্যক্তিটি ঠিকই উত্তর দিয়ে দিলেন। বাদশাহ তো অবাক! কাঁচুমাচু করে সে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি... আপনি এ ভাষাটি পারেন?”
“জি, আমি এই... ৭০টির মতো ভাষা পারি, মাত্র।”
পুরো দরবারে পিনপতন নীরবতা। সবাই একদৃষ্টিতে ব্যাটম্যানের মতো কালো জামা পরা সাদা মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। বাদশাহ উনাকে তার দক্ষতা দেখাতে বললেন। তিনি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শুরু করলেন। প্রথমে সকলে হাসতে থাকল; তারপর সবাই কাঁদতে লাগল। শেষে এমন সুর দিলেন যে, সকলে ঘুমিয়ে পড়ল!'
ওরে! সিনানের গল্পটা তো অস্থির। কিন্তু তার পা কাঁপছে না কেন? ব্যাপার কী?
আমরা চিল্লিয়ে উঠলাম। এরপর সিনান নেমে চলে এলো।
সিনান সিটে বসার পর স্যার বললেন—'তোমরা কি কেউ ধারণা করতে পারো, ব্যক্তিটা কে?'
উঠল সিনান।
'তিনি ক্লাসিক্যাল মুসলিম বিশ্বের একজন।'
কিছুক্ষণ আশেপাশে তাকালেন স্যার। তারপর বললেন—
'আসলে এখন পুরো বাংলাদেশের কোনো শিক্ষার্থী তার নাম বলতে পারবে না। কেন জানো? কারণ, তিনি মুসলিম বিশ্বের একজন স্কলার। তিনি যদি প্রাচীন গ্রিস বা আধুনিক পশ্চিমের কোনো স্কলার হতেন, তাহলে এটা হয়তো-বা কেউ না কেউ পেরে যেত। আল্লামা ইকবালের একটি কথা মনে পড়ে গেল— "বিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রকে আপাতদৃষ্টিতে জীবিত মনে হলেও আসলে সে মৃত। কারণ, সে পশ্চিমাদের কাছ থেকে শ্বাস-প্রশ্বাস ধার করে এনেছে।"'
'সিনান যার কথা বলছিল, তিনি আবু নাসর আল ফারাবি। দার্শনিক, মিউজিশিয়ান, লিঙ্গুইস্ট। সুন্দর বলেছ সিনান। ঘটনাটা লিপিবদ্ধ করেছেন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনুল খাল্লিকান। অবশ্য এটা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার কারণ আছে। আল ফারাবি ৭০টি ভাষা পারতেন—এটা ভুল। তিনি চার ভাষার বেশি পারতেন না।'
'এভাবে মিউজিক ব্যবহার করে ম্যাজিকও তো সম্ভব না।' বলল একজন।
'না, সেটা সম্ভব। মিউজিক অনেক মারাত্মক একটা জিনিস। অকারণে ইসলামের বেশিরভাগ উলামা একে হারাম বলেননি।'
'জি স্যার। কনসার্টে নিজেকে আটকে রাখা যায় না, বডি নিজে নিজেই লাফানো শুরু করে।' তারিক উত্তেজিত হয়ে বলল।
'আচ্ছা, সেদিকে না যাই। দেখি, পরে কে।'
'স্যার, স্যার, আল ফারাবি আলোচনা করে আজকে ক্লাসটা নিয়ে ফেলেন।' কয়েকজন বলে উঠল। রোল চার তো মরিয়া হয়ে চিল্লিয়েই উঠল!
'ও...' ঘড়ির দিকে তাকিয়ে— 'আচ্ছা নেওয়া যায়। আল ফারাবি ছিলেন মূলত দর্শনের মানুষ।'
স্যার বলতে থাকলেন— 'এখন, আল ফারাবির দর্শন...'
'স্যার, মিউজিকের ব্যাপারে যা শুনলাম, সংগীতবিজ্ঞানে তার কাজ নিয়ে যদি কিছু বলে নিতেন আগে।' পেছন থেকে একজন বলল।
'হুম...' কেশে নিলেন স্যার। 'আচ্ছা সংক্ষেপে কিছু বলি—
মিউজিকে তিনি খুব দক্ষ ছিলেন। কিতাব আল মুসিকা আল কাবির নামে বিশাল একটা বই লিখেছিলেন। তিনি রাবাব-এর উন্নতি করেন। বর্তমানের Violin বা বেহালার পূর্বসূরি এটা। আবার বীণা বা Harp-এর মতো তার-নির্ভর আরেকটা বাদ্যযন্ত্র বানান: কানুন নাম। পিচ, মূল স্বরসপ্তকসংক্রান্ত সুরকরণ (ইংরেজিতে Diatonic Tuning), মাইক্রোটোন বা Neutral Intervals নিয়ে ওই সময় লেখালিখি করেন। তিনি শারীরবৃত্তীয় শব্দবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন, যার কোনো নজির গ্রিকদের মাঝে পাওয়া যায় না। তিনি পরিমাপসংক্রান্ত মিউজিকের সাথে পরিচিত থাকায় মেজর থার্ড, যার কম্পাঙ্ক ৪ : ৫ আর মাইনর থার্ড, যার কম্পাঙ্ক ৫: ৬-কে সুরসংগতি হিসেবে চিনতে পারেন।'
সিনান কানে কানে বলল—'এইচএসসির ফিজিক্স বইয়ে পড়তে হবে এগুলো।'
'তার মিউজিকের বইগুলো আজ পর্যন্ত অ্যারাবিক মিউজিকে ব্যবহৃত হয়। পশ্চিমা মিউজিকে তার প্রভাব বিস্তীর্ণ। De Divisione Philosophiae, Gundisalvus-এর লেখা এই বইটিতে মিউজিক নিয়ে একটি অংশ আছে, যার বেশিরভাগ নেওয়া হয়েছে আল ফারাবির De Scientiis আর De Ortu Scientiarum নামক দুটি বই হতে। Vincent de Beauvais-এর De Musica ও Speculum Doctrinale নামের মিউজিকের দুটি গ্রন্থে বারবার অন্যান্যদের সাথে আল ফারাবির নাম নেওয়া হয়েছে। অবশ্য ফারাবি মিউজিককে এন্টারটেইনমেন্টের জন্য ব্যবহার করতেন না। এটাকে The science of harmonical proportion বলা হতো।'
'স্যার, আমাদের ফিজিক্স বইয়ে সুরযুক্ত শব্দ পড়ানো হয় তো।'
'হুম। অন্যান্য পশ্চিমা ব্যক্তিত্ব যেমন—রবার্ট কিলওয়ার্ডবি, অ্যালবার্ট দা গ্রেট, রাইমুন্ডো লুল, সাইমন টানস্টেড, অ্যাডাম ডি ফুল্ডা, থমাস অ্যাকুইনাস ইত্যাদি আল ফারাবির লেখা দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং ১৭ শতাব্দী পর্যন্ত পশ্চিমে আল ফারাবির বইগুলো আধিপত্য বজায় রেখেছিল। '
'ঠিক আছে তাহলে, আমরা এবার দর্শনে ফিরে আসি। যেটা বলছিলাম, সেটা হচ্ছে—আল ফারাবির দর্শনের আগে তোমাদের প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। তোমাদের আগে বুঝতে হবে—মুসলিম বিশ্বে দর্শন কীভাবে এলো।'
বলে স্যার বোর্ডে লিখলেন— ১. সাধারণ মানব আচরণ ২. ইসলাম অর্থাৎ কুরআন-হাদিস ৩. গ্রিক প্রভাব ৪. অন্যান্য প্রভাব
'দর্শন জিনিসটা মূলত কী? সাধারণ মানব চিন্তা-চেতনার একটা উন্নত রূপই দর্শন। চিন্তা করা সাধারণ মানব আচরণের বিরাট একটা অংশ। আর এখানে তোমরা দ্বিতীয় কারণটা দেখতে পাও। কুরআনে অনেক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন চিন্তা করতে। একাধিক শব্দ ব্যবহার হয়েছে এর জন্য : তা’লামুন, তাদাব্বুর, তাফাক্কুর। ইসলামিক ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা আলিমদের একজন ইমাম গাজালি বলেন— “কিছু জিনিসের ক্ষেত্রে শেষ ফলাফলে আসা সম্ভব না। আল্লাহ তায়ালা কিছু ক্ষেত্রে আমাদের কোনো উত্তর প্রদান করেননি। ইংরেজিতে learned ignorance বলে একে। কথা হচ্ছে—যদি সকল উত্তর আল্লাহ দিয়ে দিতেন, তাহলে তো আর পরীক্ষা থাকত না। তাহলে তো আমরা আর চিন্তা করতাম না; চিন্তা এক জায়গায় গিয়ে শেষ হতো। কিন্তু আল্লাহ চান যেন আমরা নিজেদের মস্তিষ্ক প্রয়োগ করি। যেন আমরা চিন্তা করতে থাকি।”
সাধারণত একটা জাতি যথেষ্ট সময় দাঁড়িয়ে থাকলেই জ্ঞানচর্চা শুরু করে। মুসলিমরাও তা-ই করেছিল। আরেকটা সাধারণ মানব বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—চিন্তা করা। যার এই ক্ষমতা আছে, তার চিন্তা করার জন্য বিষয় লাগবে। তারে ঠেকানো যাবে না। এমন কিছু লাগবেই, যা নিয়ে সে দিন-রাত পড়ে থাকবে।'
'They have to feed their brains' সিনানের আওয়াজ পেলাম। তার মুখ থেকে কেন বেরিয়েছে বুঝতে পারছি।
স্যারের কথায় মনোযোগ দিলাম— 'তোমরা পরবর্তীদের দিকে যদি তাকাও, যেমন : যদি গাজালির বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরসূরি ফাখরুদ্দিন রাজির দিকে তাকাও তাহলে দেখবে—তার চিন্তাধারায় এমন অনেক জিনিস আছে, যা আপাতভাবে মনে হবে অপ্রয়োজনীয়। তারা যা পেয়েছে, তা নিয়ে ভেবেছে। আর কোনোটাই অপ্রয়োজনীয় ছিল না অবশ্যই; আর কিছু হোক আর না হোক, দর্শন একজনের চিন্তাকে তীক্ষ্ণ বানায়। কেবল এই একটা কারণ থাকলেও এটা অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই যে গতকাল একটা কবিতা পড়লাম, পড়ে শোনাই তোমাদের।
স্যার ক্লাসে বইয়ের সাথে সব সময় একটা ডায়েরি নিয়ে ঢোকেন। খুলে পড়লেন—
'Pangur, white Pangur, How happy we are/Alone together, scholar and cat Each has his own work to do daily/For you it is hunting, for me study Your shining eye watches the wall/My feeble eyes fixed on a book You rejoice, when your claws entrap a mouse/I rejoice when my mind fathoms a problem Pleased with his own art, neither hinders another/ Thus we live together without tedium or envy.'
বিড়ালের নামটা আছে, তবে লেখকের নাম জানা নেই। দর্শন পড়া, দর্শন করার জন্য তার কাছে অতিরিক্ত কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য ছিল না। তার এটা ভালো লাগত, চিন্তা করা তার সাধারণ মানব আচরণ ছিল বলে তিনি করে গিয়েছেন। বই লিখে চলে গিয়েছেন, কিন্তু একটাবার নিজের নাম উল্লেখ করেননি!
অনেকে আবার যুক্তি আর ঐশী বাণীর মাঝে অমিলকে দর্শনের উত্থানের মূল কারণ হিসেবে দেখেছেন। আমি বলব, মূল কারণগুলোর একটা। অবশ্যই মূল কারণগুলোর একটা। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ হিউম্যান রিজনিং-এর সাথে অসাধারণ রেভেলেশন বা ওহির পথের বিযুক্তি ঘটে। আস্তে আস্তে এটা অনেক বড়ো হয়ে যায়। আর মুসলিম বিশ্বে সব সময়ই এই সংঘাতটা একটা মূল আলোচ্য বিষয় ছিল। দর্শনের চর্চার উত্থানের পেছনে অনেক বড়ো একটা কারণ।
ঠিক আছে, এবার আমরা সাধারণ শাসক আচরণে আসি। নিজেদের সাম্রাজ্যে দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান নিয়ে আসাটা গর্বের ব্যাপার। কিন্তু বই আনলেই তো হবে না, অন্যান্য জাতির সামনে ভাব বজায় রাখতে হলে স্কলারও লাগবে। তাই স্টাডিকে উৎসাহিত করা হতো। আর এত এত বই কালেক্ট করার পর ভাবুক মানুষরা কি বসে থাকবে? আলাদা বেশি কিছুর প্রয়োজন পড়ত না, স্কলারিক লোকেরা এমনিতেই আসত।
আমরা এখন গ্রিক প্রভাব নিয়ে কথা বলব। ইসলামের প্রথম দার্শনিক ধরা হয় আল কিন্দিকে। আগে তার দুটো উক্তি উল্লেখ করি।' স্যার ডায়েরির পাতা উলটালেন—
"দর্শন প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয়। যদি প্রয়োজনীয় হতো তাহলে এটা স্টাডি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই। যদি অপ্রয়োজনীয় হয়, তবে কথাটা জাস্টিফাই করতে হবে আর ডেমনস্ট্রেশন দ্বারা এটা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু Justification, Demonstration—এগুলো দর্শনের অংশ। যার স্টাডি থেকে সরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
সত্য যেখান থেকেই আসুক না কেন, তা গ্রহণ করতে আমাদের শঙ্কাবোধ করা উচিত না, তা উপলব্ধ করা উচিত। যদিও এমন হয়, এটা অন্যান্য জাতি থেকে আসছে।"
শুরুতেই বলেছিলাম, সাধারণ চিন্তার কিছুটা উন্নত রূপই দর্শন। প্রথম পয়েন্ট সেদিকে যায়। আর দ্বিতীয়টা দিয়ে আল কিন্দি মূলত বোঝাচ্ছেন—মুসলিমদের গ্রিকদের থেকে জ্ঞান নেওয়ার ক্ষেত্রে সংকোচ করা উচিত না।
মুসলিমদের ওপর গ্রিক দর্শনের বিস্তর প্রভাব পড়ে। এমনকী অ্যারিস্টটলের কথা অনেক দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখত। আবার বলছি, অনেক ধর্মতাত্ত্বিক পর্যন্ত দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলের কথা মুহাম্মাদ-এর কথার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখত। এমনকী অনেকে অ্যারিস্টটলের নামের শেষে "রাহিমাহুল্লাহ" পর্যন্ত লাগিয়ে দিত! গ্রিক প্রভাব কেবল দর্শন ও ধর্মতত্ত্বতে না; বরং সামগ্রিকভাবে ইসলামের ওপর প্রভাব ফেলে। এমনকী আজ পর্যন্ত ফিকহ অর্থাৎ ইসলামি আইন-কানুন পড়তে গেলে গ্রিক লজিক জানা লাগে।
অন্যান্য জায়গারও কিছু প্রভাব পড়ে, বিশেষ করে ফারসি ও ভারতীয় চিন্তা-চেতনার।
'গ্রিক প্রভাব এত বেশি কেন স্যার?' একজন জিজ্ঞেস করল।
'ভালো প্রশ্ন। মুসলিম বিশ্বে অসংখ্য খ্রিষ্টান অনুবাদক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক কাজ করতেন। ভৌগোলিকভাবেও আশেপাশে খ্রিষ্টবিশ্ব ছিল। খ্রিষ্টান দার্শনিকরা গ্রিক দর্শন, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেখালিখি করত। রাজদরবারে মুসলিমদের সাথে বিতর্ক করত। এটা মূল কারণ।
সাধারণ ন্যারেটিভে গ্রিক প্রভাবকে মুসলিম বিশ্বে দর্শনচর্চার মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়, সেটা ইউরোসেন্ট্রিক বায়াস থেকে আসে। ব্যাপারটা এমন যেন গ্রিকের জায়গায় আরবি পরিভাষা বসানো ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি।
কিছু মুসলিম আবার দাবি করে, পুরোটাই ইসলামি ভাবধারা থেকে উঠে আসে। এ-ও ভুল। এ পর্যন্ত স্টাডি থেকে যা পাচ্ছি, গ্রিক প্রভাব ও ইসলামি ভাবধারা— উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইসলামি ভাবধারাই বড়ো কারণ।
বেশি পরিমাণে গ্রিক দর্শন ভৌগোলিক কারণে মুসলিমদের হাতে আসে। সে সময়ের জন্য মুসলিমরা ধরে নেয়, এটাই সর্বোচ্চ দার্শনিক চিন্তাধারা। আশেপাশে খ্রিষ্টবিশ্ব না থেকে যদি চীন থাকত, তাহলে চীনা দর্শনই মুসলিমদের ওপর মূল প্রভাব ফেলত। গ্রিক দর্শন অপরিহার্য না। এটাকে মূল কোনো কারণ হিসেবে দেখাটা ভুল। এটা জরুরি না।
অন্যদিকে মুসলিমদের চিন্তাজগতে প্রথম আলো আসে কুরআন থেকে। মুসলিম শিশুকে সবার আগে কুরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। এই ইসলামি পরিবেশ একজনের চেতনা গড়ে তোলে।
যখন কোনো বই গ্রিক থেকে আরবিতে অনূদিত হতো, ইসলাম অনুযায়ী অনেক কিছু পালটে ফেলা হতো। ইসলামি ভাবধারার মাধ্যমে এই পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন বিষয় উঠে আসত। এই ওরিয়েন্টালিস্ট দাবি—এক ভাষা থেকে দর্শনতত্ত্ব অন্য ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে একই অর্থ বহন করবে তা কোনোভাবেই ডিফেন্ড করা যায় না।
ইসলামি ভাবধারা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা ছাড়া মুসলিম বিশ্বে দর্শন কখনোই দাঁড়াত না। কুরআন, হাদিস, ইসলামি ধ্যানধারণা থেকে অসংখ্য দার্শনিক চিন্তা উঠে আসে। '
'স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল।' তারিক হাত তুলল।
'হুম, বলো।'
'মাথা ঘোরাচ্ছে। কুরআন থেকেই যদি প্রাথমিকভাবে চিন্তাধারা শুরু হয়, তাহলে কুরআন ছেড়ে গ্রিক দর্শনে যাওয়ার প্রয়োজনটা কী ছিল?'
'অত্যন্ত ভালো প্রশ্ন তারিক।' স্যার খুশি হলেন। আসলেই, প্রশ্ন ভালো হয়েছে। এমনিতে তো অবাক হতাম। তবে কয়েক দিন আগে ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে ও কিছু কথা বলেছিল, তাই আর চমৎকৃত হলাম না।
'দেখ, ইসলাম সামগ্রিকভাবে প্রভাব রাখে। দার্শনিকরা সব সময় চেষ্টা করত ইসলামের সাথে গ্রিক দর্শনের মেলবন্ধনের। কিন্তু কথা হচ্ছে—গ্রিক দর্শনের গুরুত্ব এত বেশি কেন? কুরআনের ওপর তাদাব্বুর করলে কি হতো না?'
'এখানে কয়েকটা কারণ দেওয়া যায়। আমি একটা বলব কেবল।' স্যার একবার ঘড়ির দিকে তাকালেন।
'কথা হচ্ছে, আমরা সব সময় পার্টিকুলার বা জুযই জিনিসটাই দেখি, ইউনিভার্সাল বা কুল্লিটা দেখি না। চোখের সামনে যেটা আছে, সংকীর্ণভাবে যা আমাদের কাছে আসে, তা-ই আমরা বাস্তব ধরে নিই। এটা নিয়ে গভীরতর চিন্তা করে মর্ম পর্যন্ত যেতে পারি না। কোনো কিছু সামগ্রিকভাবে দেখার অভ্যাসটা আমাদের নেই। আর এখানে দর্শন তোমার মস্তিষ্ককে উন্নত করে। তুমি সামগ্রিক চিত্রটা বুঝতে শেখো।
দেখ, মুসলিম বিশ্বে সব সময়ই চুলোচুলির একটা পরিবেশ ছিল। দার্শনিকরা নিজে থেকে এবং পরবর্তী সময়ে ধর্মতাত্ত্বিকরাই সিদ্ধান্ত নেয়—মুসলিমদের বাঁচাতে দর্শন প্রয়োজন।
কুরআন-হাদিস দিয়ে হচ্ছিল না; কুরআন আনলে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হতো, হাদিস আনলে সঠিকত্বের জন্য আরও কঠিন নীতিমালা দিয়ে হাদিস অস্বীকার করা হতো। এমন কিছু প্রয়োজন ছিল, যেখানে চাইলেই কিছু একটা করা যেত না। যা মানব মস্তিষ্ককে অচল রাখবে; যদি না একজন সেটার সঠিক প্রয়োগ করে। অর্থাৎ যুক্তির প্রয়োগ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
ইমাম গাজালি তার জীবনের এককালে বলে বসেন—“যে লজিক বোঝে না, তার থেকে দ্বীনের কোনো জ্ঞান নেওয়া যাবে না।” এর জন্য তিনি অনেক সমালোচিত, কিন্তু যদি আমরা কন্টেক্সচুয়ালাইজ করি, পরিবেশটা বুঝি—মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ এত বেড়ে গিয়েছিল—গাজালির পূর্বসূরি, আবু বকর বাকিল্লানি ১০ম শতকে লিখছিলেন— “কিয়ামতের সময় এসে গেছে।” আর দুনিয়া তখন মোঙ্গলদের দেখেওনি! সে রকম পরিস্থিতিতে ইমাম গাজালিকে এমন একটা নীতিতে যেতে হয়েছিল, সেটা কালের দাবি ছিল। আর তারপর থেকে সব সময়ই ছিল এবং আছে।
এটা এমন না, অন্তরের বিষক্রিয়ার জন্য মানুষ দর্শনে এসেছিল; বরং প্রথমে চিন্তার কৌতূহলের জন্য এসেছিল। আর পরে এটা মারাত্মক প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। তো, এরপর দার্শনিকরা ধর্মতাত্ত্বিকদের সহায়তা করতে চায় দর্শন দিয়ে, আর ধর্মতাত্ত্বিকরা সাড়া দিয়ে চলে আসে দর্শনের ভেতর। গাজালির পরে আমার মনে হয় না, বৃহত্তর অর্থে মুসলিম বিশ্বে দর্শন বা ধর্মতত্ত্ব বলতে আলাদা কিছু ছিল। যেটা ছিল, সেটা হচ্ছে—Philosophical theology বা দার্শনিক ধর্মতত্ত্ব।
যাহোক, এর নেগেটিভ প্রভাবও ছিল। বেশিরভাগ মনে করে, দর্শন এনে এখানে বিভেদের অসুস্থতাকে ঠিক করতে হবে। অন্যদিকে কিছু মানুষ ধরে নেয়, ধর্মের মানুষদের মাঝে এত মারামারি, তাই ধর্মে উত্তর থাকতে পারে না।
কুরআনে যদি সত্য থাকত, তবে কুরআন নিয়ে এত বিদ্বেষাত্মক বিভেদ দেখা যেত না। তারা ধর্ম বাদ দিয়ে সেক্যুলার দর্শনের দিকে যায়। ইখওয়ানুস সাফা নামে দার্শনিকদের একটা সংঘ ছিল। তারা বলেছিল— “আসল দার্শনিক সব সময় ধর্মভীরু হয়; যারা মনমতো চলে, তারা কখনো দার্শনিক না; বরং মুতাফালাসিফা—ভন্ড দার্শনিক।”
তাহলে এবার আমরা আল ফারাবির দিকে যাব। তবে দর্শনের প্রশংসা যেহেতু করেছি, নেগেটিভ পার্টটাও হালকা করে বলা প্রয়োজন।
দর্শন অনেক ক্ষতিকরও হতে পারে। আর এসব দর্শন-বিরোধিতাকারীদের বলার প্রয়োজন নেই, দর্শনের মানুষরাই বলে থাকে। ফারাবির আগের দার্শনিক আল জাহিজ বলেন—“দর্শন অত্যন্ত ভয়ংকর একটা জিনিস।” আল ফারাবি নিজে বলেছেন—“যে নিজ থেকে দর্শন পড়ে না, তাকে দর্শনের ব্যাপারে কোনো কিছু বলতে যাওয়া উচিত না।” ১০ম শতকের দার্শনিক আবু হাইয়ান তাওহিদি বলেন—“দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের কাজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া না; এর কাজ প্রশ্ন বৃদ্ধি করা।”
প্রথমে যেমন বললাম, প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে চিন্তা শেষ হয়ে যাবে। দর্শন এজন্যই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এটা একজনকে চিন্তা করতে বাধ্য করে। কিন্তু দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের আরেকটা মূল কাজ কনফিউশন বা সন্দেহ সৃষ্টি করা। এটাও অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। দর্শন একজনকে পাস্পেক্টিভ দেয়। বুঝতে দেয় যে, এক বিষয়ের অনেক দিক থাকতে পারে, অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আর একজনকে শেখায় যে—সে-ও ভুল হতে পারে। সন্দেহের ওপরে যখন একজন উঠে আসে, তখন খুবই ভালো একটা অনুভূতি হয়। মুসলিমদের ক্ষেত্রে ঈমান শক্ত হয়। একজন ক্লিয়ারলি ভাবতে পারে। কিন্তু এটা ঝুঁকিপূর্ণ পথ। মুসলিম স্পেনের বিখ্যাত আলিম ইবনে হাজম বলেন—“জটিল ধরনের জ্ঞান তীব্র ওষুধের ন্যায়, যা শক্তদের মানায় ও দুর্বলদের নিঃশেষ করে দেয়। অনুরূপভাবে জটিল জ্ঞান বলিষ্ঠ মস্তিষ্ককে উন্নত করে এবং তাকে সব ধরনের খারাপ হতে দূরে রাখে। কিন্তু মধ্যম মস্তিষ্ককে শ্রান্ত করে তোলে।" এই কথাটা একদম পারফেক্ট। ফিলোসফি স্টাডি করার আগে নিজের যোগ্যতা বুঝতে হবে; তোমার মস্তিষ্ক শক্ত থাকলে এটা তোমাকে সেরা মানুষ বানাতে পারে, কিন্তু দুর্বল থাকলে তুমি শেষ হয়ে যেতে পারো। ইসলামে দৃঢ় বিশ্বাস বা ইয়াকিন নিয়ে একজন নিশ্চিত না থাকলে এখানে আসা উচিত না। আরও সময় নিয়ে ২-৩ বছর ইসলামের অন্যান্য মৌলিক জিনিস স্টাডি করে তারপর আসা উচিত।'
'স্যার, আপনার কোনো সমস্যা হয়েছিল?' ডান দিক থেকে প্রশ্ন এলো।
'না, আলহামদুলিল্লাহ হয়নি। কারণ, এ পথে আসার আগে চার বছর কুরআন ও আত্মশুদ্ধি নিয়ে ছিলাম। যখন একজন কম ঝুঁকির কোনো ফিল্ডে কিছুটা গভীর স্টাডি করে নেয়, তখন কীভাবে পড়তে হয়—সে ব্যাপারে তার ধারণা তৈরি হয়ে যায়। সাধারণভাবে উপদেশ দিই, একটা পুরো তাফসির পড়া ছাড়া এবং সিরাত বোঝা ছাড়া একজনের দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব পড়তে যাওয়া উচিত না। অবশ্য এটা কতটুকু কার্যকর, তা নিশ্চিত বলতে পারছি না। আমার ক্ষেত্রে কাজ হয়েছিল তাই বলছি; সবাই তো আর এক রকম হয় না। তবে পার্সোনালি মনে করি, এ দুটো করার পর একজন যেকোনো বই-ই পড়তে পারবে।'
ঘণ্টা পড়ে গেল। 'ওহ! ফারাবিকে নিয়ে কথা বলা গেল না। আচ্ছা, তার অবদান নিয়ে কিছু কথা বলি পরের টিচার আসা পর্যন্ত; তার দর্শন নিয়ে নাহয় অন্যদিন কথা হবে।
ইসলামে গ্রিক দর্শনের সমন্বয় শুরু করেন আল কিন্দি। উন্নতিকরণ হয় আল ফারাবির দ্বারা এবং পারফেকশন পায় ইবনে সিনার হাতে। আল ফারাবির টাইটেল—The Second Teacher, প্রথম শিক্ষক অ্যারিস্টটল। কেননা, মুসলিমদের জন্য তিনি গ্রিক দর্শন গুছিয়ে বর্ণনা করেছেন। তিনি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম বিজ্ঞানকে শ্রেণিবিন্যস্ত করেন। দর্শন গ্রিস থেকে কীভাবে মুসলিম সাম্রাজ্যে ভ্রমণ করে তার ইতিহাস রচনা করেন। শূন্যস্থান বা Vacuum-এর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা চালান। তার রিসালা আল খালা বইয়ে এর কথা আছে।
Islamic Geometric Design বলতে গেলে আলাদা একটা সাবজেক্ট। এ নিয়ে আল ফারাবির চমৎকার একটা বই আছে। ভাষার অলংকার বিজ্ঞানে তার কাজের জন্য ড. ফুয়াদ হাদ্দাদ তাকে আধুনিক লিঙ্গুইস্টদের সাথে তুলনা করেন।
এপিস্টেমোলজি বা জ্ঞানতত্ত্বে ফারাবির কাজ দেখে অভিভূত হয়ে ড. আম্মার আল-তালবি তাকে এপিস্টেমোলজির আসল জনক বলেন। আল ফারাবি বলেছিলেন— "যে মহান আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও মূল কারণ, তার পরিচয় লাভই দর্শনচর্চার উদ্দেশ্য।" আল ফারাবি গ্রিক দর্শন থেকে বিশালভাবে প্রভাবিত হলেও তার দর্শন মূলত ইসলামি ভাবধারা দ্বারা আবৃত ছিল। বাংলাদেশের একজন দর্শন গবেষকের কিছু অ্যাসপেক্ট তার বইয়ে দেখিয়েছেন।
আর দর্শনে আল ফারাবি বলতে গেলে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, কান্ট, বার্গস, হারবার্ট স্পেন্সার, রুসো All in one।'
স্যার যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তারিক বলল—'স্যার, আপনি আমাদের বোঝানোর সময় একদম আমাদের মতোই হয়ে যান, অত্যন্ত ভালো লাগে স্যার।'
শুনে মুচকি হাসলেন স্যার— 'আসলে তারিক, স্কুল শিক্ষকদের তেমনই হওয়া উচিত।'
টিফিন টাইমে তারিক বলল—'ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে সেই একটা বই পড়েছিলাম। কার্ল শারিফ আল তোবগুইয়ের Ibn Taymiyya on Reason and Revelation। সেটা অনেকটা Philosophical theology টাইপেরই ছিল। এই বিষয়ে আমি সিরিয়াসলি ইন্টারেস্টেড।'
সিনান বলল—'আমিও ঢুকব ভাবছি।'
পাশে দিয়ে আমি একজন, যে কিছু বোঝে না!
টিকাঃ
১. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. খণ্ড ৩, পৃ: ৬৫৯.
২. 'al-Farabi' in K.J. Ahmad, Hundred Great Muslims (Library of Islam, 1987)
৩. Salim al-Hassani op. cit. p:48
৪. Michael H. Morgan p: 240
৫. K. J. Ahmad p: 267
৬. George Sarton, vol. 1, p: 628; ইসলাম ও মিউজিক নিয়ে জানতে পড়ুন : আহমাদ মুসা জিবরিল, মিউজিক: শয়তানের সুর (ঢাকা: সমর্পণ প্রকাশন, ২০২০);
সংক্ষেপে অন্য কিছু মতের জন্য: আবু মুয়াবিয়াহ ইসমাইল কামদার, হালাল বিনোদন (ঢাকা: পার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স, ২০১৭); Academic: Omar Farahat 'Listening to Music and the Interplay of Law and Morality in Medieval Sunni Thought' Academia.
৭. K. J. Ahmad, p: 267.
৮. Ibrahim Kalin, Reason and Rationality in the Qur'an (Kalam Research and Media, 2015); Paul L. Heck, ch. 3.
৯. Majid Fakhry, Islamic Philosophy A Beginner's Guide (Oneworld Publications, 2011), p: 91; Salim al-Hassani op. cit. ch. 1.
১০. Paul L. Heck op. cit; Mohammad Akram Nadwi, 'Qiyas, Ijma' and Ijtihad' Al-Salam Institute; Mohammad Akram Nadwi, 'Introduction to Logic' Al-Salam Institute;
১১. Seyyed Hossein Nasr and Oliver Leaman, History of Islamic Philosophy (Routledge, 2008)
১২. Paul Heck, 71ff.
১৩. Phillip K. Hitti p: 371
১৪. Seyyed Hossain Nasr, Science and Civilization op. cit. p: 60-61.
১৫. George Saliba, Islamic Science and Making of European Renaissance (The MIT Press, 2007) p: 7
১৬. M. Shamsher Ali op. cit. p: 102
১৭. Karen Armstrong, A History of God op. cit. p: 208-209 Ehsan Masood, Science and Islam op. cit; Eric Broug, Islamic Geometric Design (Thames and Hudson, 2013); Eric Broug. 'The Complex Geometry of Islamic Design' online video, TED ed. দেখুন।
১৮. মুহাম্মদ শাহজাহান, আল ফারাবির দার্শনিক চিন্তাধারা (বুক্স ফেয়ার, ২০১৮) p: 53.
১৯. Ammar Al-Talbi. 'Al-Farabi's Doctrine of Education: Between Philosophy and Sociological Theory' Muslim Heritage.
২০. মুহাম্মদ শাহজাহান, p: 87.
২১. মুহাম্মদ শাহজাহান, আল ফারাবির দার্শনিক চিন্তাধারা (বুক্স ফেয়ার, ২০১৮); ড. মুহাম্মদ শাহজাহান তার ডক্টরাল থিসিস করেছিলেন আল ফারাবির ওপর। আল ফারাবির ওপর তার একাধিক রিসার্চ পেপার আছে।
📄 গাণিতিক মুসলিম
আমরা তিনজন যথারীতি ক্লাসের মধ্যে বসে আছি।
'আচ্ছা সিনান, মুসলিম গণিতবিদদের নিয়ে তো অনেক হাঁকডাক শুনেছি, তাদের নিয়ে তো বললি না কোনো সময় কিছু।'
তারিক বলল— 'মুসলিম জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও অনেক হাঁকডাক শোনা যায়।'
এবার সিনান বলল—'হ্যাঁ, অন্যান্য যেকোনো টাইপের বিজ্ঞানের চেয়ে জ্যোতির্বিদ্যায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের সংখ্যা বেশি। তবে আজ গণিত নিয়েই বলি...'
'গণিত তাহলে... সেই গণিত, আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা!'
'হা হা!' আমি লাফিয়ে উঠলাম।
'প্রথম দেখাতেই ভালোবাসা হয়ে যায় তার সাথে।'
বাম পাশে থাকা রনি বলল—'তো ফেল মারিস কেন গণিতে বারবার?'
'ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয়।'
'বাহ, কী অন্যরকম ভালোবাসা তোর! গণিত—এমন অপূর্ব ভালোবাসা আর কোথায় দেখতে পাওয়া যাবে?'
'আরে... আমার মতো চোখে জল, মাথায় চিন্তা, কপালে ভাঁজ, মনে ভাবনা, বুকে বেদনা, অন্তরে ভয়, গায়ে কাপড়, পায়ে জুতা, কাঁধে ব্যাগ কোথায় পাবি তুই?'
তারিকের লম্বা ডায়লগের কারণে সিনানের কথা শোনার আর সময় থাকল না। টিফিন টাইম!
'ভাইয়েরা আর ভাইয়েরা! তাহলে অবশেষে আমরা মুসলিম গণিতবিদদের নিয়ে জানতে যাচ্ছি...'
'তুই চুপ থাক।' তারিককে চুপ করাল সিনান—'মুসলিম বিশ্বে গণিতের অসাধারণ যাত্রা শুরু হয় মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমির হাত ধরে। গ্রিকরা জ্যামিতিতে অসাধারণ দক্ষতা দেখালেও বীজগণিতকে তা থেকে আলাদা করতে পারেননি। এই কাজটিই করে দেখান মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমি একা। তিনি সব ধরনের কাজে বীজগণিতের প্রয়োগ হাতেনাতে দেখিয়ে দেন। গ্রিকরা বীজগণিতকে আলাদা করতে না পারায় অনেক কাজে সমস্যায় ভুগতেন। কিন্তু মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমি সকল সমস্যাকে ঘুমাতে পাঠালেন।
শুধু তা-ই নয়; তিনি নিয়ে এলেন হিন্দু-আরাবিক সংখ্যা। ভারতীয় আর ব্যাবিলনীয়রা নাম্বারের ব্যবহার সম্বন্ধে জানত। তবে মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমির হাতে তথ্য কোথা থেকে এলো, তা জানা মুশকিল। যাহোক, নাম্বারের ব্যাপারটা মুসলিমদের মধ্যে সবার আগে অবশ্য জেনেছিলেন আবু ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি। তবে মূল কাজ মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমিই করেছিলেন। মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমির "আরবি সংখ্যা" নিয়ে আসার ব্যাপারটা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি।' সিনান খাতা বের করে একটি অঙ্ক করল : ১২৩(১১) = ১৩৫৩
'অঙ্কটা খুবই সহজ, তাই না? মাথায়ই করে ফেলা যায়। কী বলিস, রনি?'
'হুম।'
'একই অঙ্ক রোমান সংখ্যায় কর—CXXIII(XI)। কর দেখি মাথায়।'
'এটা তো খাতায়ও করতে পারব না!'
'বুঝলি তাহলে গুরুত্ব? তার বই আল জাবর ওয়াল মুকাবালা থেকে Algebra নামটার উৎপত্তি। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত গণিত শিক্ষা দেওয়ার এক অভিনব ডায়ালগ ছিল : Dixit Algoritmi অর্থাৎ যেমন বলেন আল খাওয়ারিজমি।'
'ওয়াও!'
'মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমির বইয়ে সরলসহ সমীকরণ এবং দ্বিঘাতসহ সমীকরণ সমাধানের নমুনা পাওয়া যায়। এর ছয় ধরনের সমাধান দেন তিনি। তাঁর বইয়েই ইতিহাসে সর্বপ্রথম এমন সমস্যার সমাধান দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ধাপে ধাপে যৌক্তিক উপায়ে গণিত করতেন। পরে এ পদ্ধতি অ্যালগরিদম নাম পায়, যা আল খাওয়ারিজমির ল্যাটিন নাম থেকে আসে। সুতরাং আল খাওয়ারিজমি কম্পিউটারের দাদা। কারণ, অ্যালগরিদম ছাড়া কোনো কম্পিউটার থাকত না। অ্যারাবিক সংখ্যাগুলো এখন পর্যন্ত অ্যারাবিক ভাষার সংখ্যার মতো দেখতে।'
'লিখে দেখাচ্ছি।' সিনানের হাত থেকে তারিক খাতা নিয়ে গেল।
ভালোই অ্যারাবিক লিখছে দেখছি। কী আজব! তারিকের মতো ফাউল ছেলেরা অ্যারাবিক শিখে ফেলছে আর আমি পারছি না!
'হে গণিত পাগলা! তোমার হাতের লেখা এত খারাপ কেন?' রনি বলল।
'হালালপুত! হাতে কলম থাকলে বুঝতি, লেখা সুন্দর না কেন।'
'কিন্তু মিল তো পাচ্ছি না?'
সিনান মাঝে দিয়ে বলল—'মূলত আন্দালুস থেকে ইউরোপে নিউমারালগুলো যায়। এগুলোকে গুবার নিউমারাল বলে। সেখানে কীভাবে লিখা হতো তা দেখাই।' এবার সিনান লিখল—
সংস্কৃত—পূর্বের অ্যারাবিক—পশ্চিমা অ্যারাবিক—বর্তমানের ডেসিমাল পদ্ধতি
'তাহলে আমরা স্পষ্ট মিল দেখতে পাচ্ছি। আমরা বীজগণিতে অজ্ঞাত রাশির জন্য x ব্যবহার করি। আল খাওয়ারিজমি ব্যবহার করতেন “শাই”। অ্যারাবিতে শাই মানে বস্তু বা Thing।'
'তাহলে সামনে আগাই...'
'কেন! তুই তো এখন অনেক কিছুই বলিসনি আল খাওয়ারিজমির ব্যাপারে।'
তারিক বলল—'যেমন আল খাওয়ারিজমি যখন মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছিলেন ইউরোপিয়ানরা তখন হাঁ করে তাকিয়ে থাকত আকাশের দিকে...'
'হ্যাঁ, সেসব বলা যেত। কিন্তু আজকের বিষয়বস্তু তো আল খাওয়ারিজমি না; সেটা গণিত।'
'আচ্ছা, হ্যাঁ।'
'তো, আল কারাজি আমাদের পরিচিত করে তোলেন সূচক সম্পৃক্ত গণিতের সাথে। মানে x, x², x³, ... এবং 1/x, 1/x², 1/x³ ধরনের সংখ্যাগুলোর সাথে। লিওনার্ড অয়লারের ওপর পরোক্ষভাবে আল কারাজির প্রভাব আছে। আবু কামিল ৮-এর ঘাত পর্যন্ত উঠে যান। এটাও ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। ফিবোনাচ্চি বা Leonardo of Pisa আবু কামিলের কাছ থেকে ২৯টি উদাহরণ ধার করেন। এমনকী কিছু গাণিতিক সমস্যা হুবহু কপি করেন তিনি। বর্তমান সময়ে যে পদ্ধতিতে ভগ্নাংশ লেখা হয়, সেই স্টাইল উদ্ভাবন করেন আবু কামিল। তিনি আরবিতে প্রথম ডট ব্যবহার করে শূন্য বোঝানো শুরু করেন। এটিই এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। আবুল হাসান উকলিদিসি...'
তারিক বাধা দিলো—'What a name! এখানে তো অ্যারাবিক নামই ল্যাটিনের মতো আজগুবি।'
'উকলিদিসি মানে Euclidean। যাহোক, আবুল হাসান উকলিদিসি দশমিক সংখ্যার ব্যবহার আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠা করেন। '
'এটাও তো এক মাইন্ডব্লোয়িং আবিষ্কার।' আমি বললাম।
'হুম, কাঁপানো আবিষ্কার। বহুপদীর বর্গমূল বের করার জন্য আল সামাওয়াল একটি পদ্ধতি বের করেন, সেটি বর্তমান Ruffini-Horner Method নামে পরিচিত। Thabit Numbers নামে সাবিত বিন কুররা-এর নামে একধরনের নাম্বারই আছে! ইবনে হাইম ধনাত্মক ও ঋণাত্মক নাম্বার নিয়ে আসেন। আরেক যুগান্তকারী কাজ। ইবনুল হাইসামের কাজে আধুনিক ক্যালকুলাসের সুস্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। সাবিত বিন কুররা বিখ্যাত Chessboard Problem-এর সমাধান করেন। ইবনুল হাইসামের একটি উপপাদ্য আছে—যা এই ১৯৯৭ সালে সমাধান করা গিয়েছে। এটি Alhazen's problem নামে পরিচিত।
ত্রিকোণমিতির Sine, Cosine, Tangent, Cotangent, Cosecant, Secant-এর ছয়টির পাঁচটিই মুসলিমদের আবিষ্কার। সাইনও অবশ্য মুসলিমরাই প্রতিষ্ঠা করেন। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ত্রিকোণমিতি পুরাই মুসলিমদের বিজ্ঞান। এক্ষেত্রে একটি বড়ো নাম হলো আল বাত্তানি। তিনি প্রথম Sin, Tan ও Cos, Tan-এর মধ্যে সম্পর্ক দেখান। আল বাত্তানি যেখানে ছেড়ে দেন, সেখান থেকে উঠিয়ে নেন আবুল ওয়াফা। Sin (A+B) = Sin A. Cos B + Cos A. Sin B সূত্রটি দেন আবুল ওয়াফা। মানে, দুটি কোণের সাইনের সমষ্টি ওই দুটি কোণের সাইন ও কোসাইন দিয়ে আলাদাভাবে দেখানো যেতে পারে। আরও অনেক সূত্র দিয়েছেন তিনি... '
'ভাই, আর সূত্র মারিস না। আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে!' রনি আর সহ্য করতে পারল না।
'আচ্ছা ঠিক আছে। জামশিদ আল কাশি, পাই-এর যে মান বের করেন, তা তার আগের সব বের করা মানের চেয়ে বেশি ছিল। তিনি ১৭ দশমিক স্থান পর্যন্ত চলে যান।'
তারিক বলল—'এ! ক্যালকুলেটর দিয়ে আমি আরও অনেক বেশি বের করতে পারি।'
'তখন তো আর ক্যালকুলেটর ছিল না আবাল। সাইনের মান বের করার জন্য আল কাশি Iterative method আবিষ্কার করেন। কোসাইনের সূত্র আবিষ্কারের কৃতিত্ব তার। একে আল কাশির উপপাদ্যও বলে। তার নামে আরও ত্রিকোণমিতিক উপপাদ্য আছে। ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে প্রথম কিউবিক ইকুয়েশন সমাধান করেন আবু আবদুল্লাহ আল মাহানি।
সাধারণ সাইনের সূত্র আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় ইবনে মুআজ আল জায়্যানিকে। আবার বৃত্তীয় সাইনের সূত্র আবিষ্কারের কৃতিত্ব একেকজন একেক মানুষদের দেন। যেমন : আবু মাহমুদ খুজান্দি, নাসিরুদ্দিন আল তুসি, আবু নাসর মানসুর; সাথে আবার আবুল ওয়াফা বুজজানিও আছেন।
অনেক তোদের মতো ত্যাড়াইল্লাদের ধারণা, গণিত কেবল পশ্চিমারাই ডেভেলপ করেছে। কিন্তু ১৬ শতাব্দীর গণিত বইগুলো তো আরবদেরই কপি ছিল! লিওনার্ডো পিসানো বা ফিবোনাচ্চি—যাকে মধ্যযুগের সেরা গণিতবিদ ধরা হয়, তিনি তো অ্যারাবিক শিক্ষাব্যবস্থাতেই পড়ালেখা করেছেন। উমর খাইয়াম তো গণিতবিদ হিসেবে ছিলেন অনন্য। ক্যালকুলাসের ভিত্তি তার হাতেই রচিত হয়েছিল। ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানে তার কাজ ছিল বিস্ময়কর।
আর গণিতের প্রয়োগ? ভূগোল থেকে শুরু করে আর্কিটেকচার, ব্যবসা, উত্তরাধিকার আইন—সবখানেই মুসলিমরা গণিতকে অপরিহার্য করে তুলেছিলেন। কিবলার দিক নির্ণয়ের জন্য যে গোলকীয় ত্রিকোণমিতি বা Spherical Trigonometry প্রয়োজন হতো, তা মুসলিমদের হাতেই পূর্ণতা পায়। '
সিনান থামল। টিফিন পিরিয়ড শেষ হওয়ার বেল বাজল।
টিকাঃ
১. George Sarton, vol. 1, p: 563.
২. Ehsan Masood, p: 139.
৩. Phillip K. Hitti, p: 379.
৪. Ehsan Masood, p: 141-142.
৫. Salim al-Hassani op. cit. p: 65.
৬. Phillip K. Hitti, p: 380.
৭. Salim al-Hassani op. cit. p: 66-67.
৮. John J. O'Connor and Edmund F. Robertson. 'Abu Kamil Shuja ibn Aslam' MacTutor History of Mathematics archive, University of St Andrews.
৯. Salim al-Hassani op. cit. p: 89.
১০. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 387.
১১. Salim al-Hassani op. cit. p: 68.
১২. Salim al-Hassani op. cit. p: 82.
১৩. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 405.
১৪. Ehsan Masood, p: 145.
১৫. Salim al-Hassani op. cit. p: 85.
১৬. গুগলে সার্চের মাধ্যমেই জানতে পারবেন।
১৭. Jonathan Lyons, The House of Wisdom.
১৮. 'Trigonometry' in 'School' in Salim al-Hassani op. cit.
১৯. M. Shamsher Ali op. cit. p: 68.
২০. M. Shamsher Ali op. cit. p: 70.
২১. আরও জানতে পূর্বোক্ত রেফারেন্স দ্রষ্টব্য।
২২. 'Mathematics' in 'School' in Salim al-Hassani op. cit.
২৩. 'Trigonometry' in 'School' in Salim al-Hassani op. cit.
২৪. John J. O'Connor and Edmund F. Robertson. 'Ghiyath al-Din Jamshid Mas'ud al-Kashi' MacTutor History of Mathematics archive, University of St Andrews.
২৫. M. Shamsher Ali op. cit. p: 66.
২৬. Sin A/a = Sin B/b = Sin C/c (যেখানে a, b ও c ত্রিভুজের বাহুর দৈর্ঘ্য এবং A, B ও C তাদের বিপরীত কোণ)
২৭. http://www-history.mcs.st-andrews.ac.uk/Biographies/Al- Jayyani.html
২৮. Helaine Selin (edt), Mathematics Across Cultures: The History of Non-western Mathematics (Springer, 2000) pp. 137-157.
২৯. Helaine Selin (edt), Mathematics Across Cultures: The History of Non-western Mathematics (Springer, 2000) pp. 137-157.
৩০. Albrecht Heeffer, 'Humanist Repudiation of Eastern Influences in Early Modern Mathematics' Centre for Logic and Philosophy of Science, Ghent University.
৩১. Bertrand Russell, History of Western Philosophy (New York: Simon and Schuster, 1945) p: 424. তবে আসলে তিনি কবি ছিলেন না। দেখুন: আরমান ফিরমান, 'উমর খৈয়াম কি কবি ছিলেন?' Medium.
৩২. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 6 p: 197.
৩৩. Ehsan Masood p: 145.
৩৪. Joseph Needham, Science and Civilization in China p: 134; in M. Shamsher Ali op. cit. p: 87.
৩৫. M. Shamsher Ali op. cit. p: 87.
৩৬. Ehsan Masood p: 146.
৩৭. David King. 'From Petra back to Makka From "Pibla" back to Qibla' Muslim Heritage.
📄 মুসলিম বিজ্ঞানীদের ধর্মবিশ্বাস কেমন ছিল
আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়ের নাম আভনিশ, আভনিশ সরকার। একসময় ভালো বন্ধু ছিল। ক্লাস সিক্স থেকে তেমন কথা বলে না। সেভেন থেকে একদম পাত্তাই দেয় না। পার্থক্যটা কী, কোনো সময় বুঝে উঠতে পারিনি। সে সময় কী হয়ে গেল তার, কী কারণে বন্ধুত্ব শেষ করে দিলো। কিছু ভালো দক্ষতাসম্পন্ন ছেলেদের বড়ো হলে কীসের রোগে ধরে—তা কখনোই বুঝতে পারিনি।
আজ চতুর্থ ক্লাসের পর ছুটি হয়ে যাওয়ার কথা। যথারীতি হয়ে গেল। কিন্তু স্যার চলে যাওয়ার পর আভনিশ এসে আমাদের বেঞ্চের সামনে দাঁড়াল—'সিনান, ভালো প্রতিভাধর ছেলে ছিলি। কী ইসলামের ইতিহাস পড়ে সময় নষ্ট করছিস, সাথে দিয়ে আছে রোবট আর তারিকের মতো কিছু রাস্তার পোলাপান! নিজের সময় সব বরবাদ করছিস।'
আভনিশের কথা শুনে তারিক জ্বলে যাচ্ছে। শুধু কালো বলে চেহারার লাল আভার পরিস্ফুটন হচ্ছে না। আমি রাগ না করলেও কষ্ট পেলাম।
সিনান আড়চোখে দাঁতভাঙা জবাব দিলো—'সালিহ আলাইহিস সালাম-কেও তার আশপাশের মানুষরা এই কথাই বলত। দেখেছিস, আল্লাহ আগের থেকেই জানতেন, তুই এমন কথা বলবি। সেজন্য তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন। আর ধন্যবাদ, তোর মতো মূর্খ মানুষদের কাছে গালি খেলেই আমি সৎ পথে আছি। এটা একটা নিদর্শন।'
ওরে মাইর! আভনিশ আমাদের যা বলে আঘাত করেছিল, সিনানেরটা তো তার থেকেও বেশি কড়া।
আভনিশ বাইরে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শান্তভাবে বলল— 'অশিক্ষিত বলছিস কাকে? রোল ১ কে, পাঁচ বছর ধরে?'
'তোর স্কুল রেজাল্ট, তোর সার্টিফিকেট কোনো শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ না। শিক্ষা বলতে বোঝাচ্ছি শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব আর বই পড়া প্রবন্ধে যা বোঝানো হয়েছে তা। দুবছর ধরে তো ফার্স্ট হওয়ার জন্য পড়ছিস, শেখার জন্যেও পড়ে দেখ দু-একবার।'
সিনানের আঘাত আভনিশ গায়ে মাখল না। ব্রিলিয়ান্টদের মধ্যে ডিবেট দেখার মজাই আলাদা। কী অসাধারণভাবে নিজেদের ব্রেইন, নিজেদের জিহ্বা কন্ট্রোল করে তারা! কী চমৎকারভাবে নিজেদের ইমোশন নিয়ন্ত্রণ করে!
আভনিশ মেইন পয়েন্টে এলো— 'এসব বিজ্ঞানীদের নিয়ে গর্ব করার মানে কী আমার বুঝে আসে না। সেসব বিজ্ঞানী আদতে মুসলিম ছিল কী ছিল না, তাও গর্বকারীদের জানা থাকে না। কেউ একজন অবদান রাখতে পারলেই তাকে নিয়ে লাফানো শুরু করে দেয়। যেমন—সাবিত ইবনে কুররা, হুনাইন ইবনে ইসহাক, কুস্তা ইবনে লুকা—কেউই মুসলিম ছিল না। ইবনে সিনা নামে মুসলিম হলেও প্র্যাকটিস করত কই!'
সিনানের দিকে তাকালাম। কেন সে চুপ করে আছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। ইতোমধ্যে ভালোসংখ্যক দর্শকও জমে গিয়েছে।
'আবার আরেকজন আছেন আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে জাকারিয়া আল রাজি। কেমিস্ট্রি আর মেডিসিন, দুটি ক্ষেত্রেই কাঁপিয়ে দিয়েছেন। ৪-৫টা বিষয়ের জনক বলা চলে। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও এই অন্ধবিশ্বাসে পড়ে থাকেননি; হয়ে গেলেন অ্যাপোস্টেট। মুসলিমদের পবিত্র গ্রন্থ, তাদের নবি— কোনো কিছুকেই গালাগালি করতে ছাড়েননি। তারপরও এসব আত্মমর্যাদাহীন মানুষরা তাকে নিয়ে গর্ব করে আকাশ ফাটিয়ে দেয়। তারপর আবার এসব মুসলিমরাই ঘুরেফিরে আমাকে এসে বলে মূর্খ।'
আভনিশ যদিও অ্যারোগেন্ট, কিন্তু তার টেকনিক খুবই ভালো। আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে নিজের মাথা না খুইয়ে অপেক্ষা করে সঠিক সময় আসার। তখন প্রতিপক্ষের মগজ বের করে আনে। দুঃখজনক কথা হচ্ছে, সে নন-মুসলিম হওয়ার পরও এমন কন্ট্রোল দেখাচ্ছে; আর তারিক, আমি, আমরা মুসলিম হওয়ার পরও ক্ষেপে গিয়ে একদম সব হারিয়ে বসে থাকি।
'হয়েছে তোর?' সিনান বলল।
'হুম।'
'তো এবার আমি বলি?'
সিনান লম্বা চালাল—'আবু বকর রাজির ব্যাপারটি খুবই অস্পষ্ট করা হয়েছে। আল বেরুনি তাকে নিয়ে ভালো কাজ করেছেন। ইসলাম নিয়ে আবু বকর হাজির জঘন্য কথাবার্তা অনেকাংশে আসে আবু হাতিম আল রাজি নামের একজন থেকে। তিনি আবু বকর রাজির বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। তার ওপর ছিলেন ইসমাইলি। ইসমাইলিরা তাদের সাথে বিতর্ককারীদের খুন পর্যন্ত করত। আবু বকর রাজি ইসমাইলিদের পছন্দ করতেন না এবং তাদের সমালোচনাও করেছেন হুলুস্থুল। তাই নাসির খসরু, শাহরাস্তানি ইত্যাদি ক্লাসিক্যাল স্কলাররা মনে করেন, আবু হাতিম রাজির লেখাগুলো বিশ্বাসযোগ্য না। বর্তমান সময়ের সেরা সেরা স্কলাররাও এমন মত দেন।
কায়রো ইউনিভার্সিটির আব্দুল লতিফ বলেন, আবু হাতিম রাজি আর হামিদুদ্দিন কারমানি ভুলভাবে আবু বকর রাজির চিন্তাধারা উপস্থাপন করেন। পিটার অ্যাডামসন বলেন, তারা ইচ্ছা করেই এমন করেছেন। বরং আবু বকর রাজি শুধু নবুয়তের প্রমাণে অলৌকিক জিনিসের ব্যবহার, আর অবতারবাদের বিরোধিতা করছিলেন। এগুলোয় কোনো সমস্যা নেই। ইমাম গাজালি পর্যন্ত এর বিরোধিতা করেছেন। দ্বিতীয়টার ব্যাপারে তো সব উলামাই একমত। আর মূলত আবু হাতিম রাজি যে তার বইয়ে আবু বকর রাজিকেই টার্গেট করে লিখেছেন, সেটা প্রমাণিত না। তিনি নাম না নিয়ে বরং “মুলহিদ” বলে সিগনিফাই করেছেন। তার লেখায় যথেষ্ট দিক আছে—যা দেখে মনে হয়, এখানে আবু বকর রাজিকে নিয়ে কথা বলছেন না।
এমনকী ইমাম ফাখরুদ্দিন রাজি বর্ণনা করেছেন, আবু বকর রাজি নিজের মত প্রমাণের জন্য কুরআন এবং নবিদের কথার ব্যবহার করেছেন। তা ছাড়া তিনি তার আল তিব্ব আর-রুহানি বইয়ের শুরুতেই যুক্তির মতো একটি চমৎকার জিনিস মানুষদের দান করার জন্য আল্লাহর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ধর্মবিদ্বেষীরা সাধারণত এমন করে না। আবু বকর রাজির অনেক মুতাজিলি ও আশআরিদের সাথে সংঘাত ছিল, কিন্তু জীবনেও কেউ তাকে ইসলামবিরোধী— বা এগিয়ে গিয়ে মুলহিদ বলেনি। যে বলেছে, সে ইসমাইলি শিয়া!
নিরপেক্ষ থাকব। পল ক্রাউস আর সারাহ স্ট্রমসা, আবু হাতিম রাজির বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। আর ইবনে সিনাও আবু বকর রাজির ব্যাপারে বলেছেন, তার মূত্র পরীক্ষা নিয়েই লেগে থাকা উচিত ছিল। যা পারে না, (অর্থাৎ অধিবিদ্যা) তা করতে গিয়েছে কোন দুঃখে! কিন্তু রাজির ওপর অভিযোগ আনায় অনেক ওরিয়েন্টালিস্ট যে মূল বই ব্যবহার করেন, সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলভাবে অনূদিত। তার ওপর সঠিকভাবে যদি অনূদিত হতোও, তবু খুব সম্ভবত রাজি সেটা লিখেননি।
দ্বিতীয় যে বই ব্যবহার করা হয়, সেটা আল বেরুনির লিস্টেই নেই—এমন অবস্থা! ইসলাম নিয়ে তার দুটো বই আছে—ফি উজ্জব দাওয়াত আল নাবি আলা মান নাকারা বি আল নুবুওয়াত ও ফি আন্না লি আল ইনসান খালিকান মুতকিনান হাকিমান : এই দুটি কনসিডারেশনে আনলে পুরোপুরি প্রমাণিত হয়ে যায়— আল রাজি কোনোভাবেই অধর্মীয় মানুষ ছিলেন না; বরং ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম বিজ্ঞানী। প্রথমটা নবি-অস্বীকারকারীদের প্রতি ইসলামি দাওয়াত নিয়ে আর পরেরটা আল্লাহকে নিয়ে লেখা বই। কিন্তু এই দুই কাজ কেউ কনসিডারেশনে আনে না! যারা দাবি করে—আবু বকর রাজি “মুক্তমনা” ছিলেন, তারা এমন বইয়ের রেফারেন্স দেন—যেটা আবু বকর রাজি লিখেনইনি! ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা আলিমদের একজন, শামসুদ্দিন জাহাবি তার প্রশংসা করেন। তোর কী মনে হয় তাহলে, আভনিশ?'
'তাকে মুসলিম বানানোর জন্য তোরা কিছু প্রমাণ বানিয়ে নিয়েছিস আর কি।'
'পিটার অ্যাডামসন তো বলছেন, আবু হাতিম রাজি তাকে ভিলিফাই করেছেন, তিনি তো আর মুসলিম না! আবার হ্যাঙ্ক গ্রিনের মতে, আবু বকর রাজি “যা খুশি তা” করলেও ইসলামি নববি চিকিৎসা সম্বন্ধেও লিখেছেন। তিনি কুরআনে বর্ণিত তথ্য হতেও চিকিৎসা পদ্ধতি বের করার চেষ্টা করেছিলেন।'
আভনিশ কিছু বলল না। সিনান মানসিক চড় লাগাল— 'অবশ্য তার মুসলিম হওয়া না হওয়া দিয়ে কিছুই যায় আসে না; তার সাফল্যের ক্রেডিট শেষ পর্যন্ত ইসলামেই আসে।' এবার আমি না; আশপাশের সকলে সিনানের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
আভনিশ কিছুটা জোরেই বলল— 'মানে কী!'
'প্রাক ইসলাম আরবে বিজ্ঞানের বোম ফাটেনি কেন আর ইসলাম আসার পরই-বা এত্ত উঁচু স্থানে বিজ্ঞান চলে গেল কীভাবে?'
'কী আর, প্রাক ইসলাম যুগে আরবে এত টাকা ছিল না।'
'কই, আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, উসমান ইবনে আফফান এবং আরও অনেকে তো তখনও অনেক ধনী ছিলেন।'
'তো কী হয়েছে! তাদের মাথায় বিজ্ঞানের পেছনে ইনভেস্ট করার বুদ্ধি ছিল না।'
'এই তো লাইনে এসেছিস! তো ইসলাম আসার পর আরবদের মাথায় এই বুদ্ধি এলো কোথা থেকে?'
তাদের মাথায় বুদ্ধি কীভাবে এলো, তা চিন্তা করতে করতে আভনিশ নিজের মাথা চুলকাল। কিছুই বলতে পারছে না— 'তুই কী বলতে চাচ্ছিস, সোজা করে বল।'
'দেখ, ইসলাম বিজ্ঞানের একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। জর্জ সারটনকে তো চিনিস? তিনিও এই মতে সমর্থন দেন। বিজ্ঞান সব সময় একটা প্যারাডাইমের মাঝে কাজ করে, আর মুসলিম বিশ্বে সেটা ছিল ইসলাম। এটা অনেক বড়ো একটা ব্যাপার। ওই সময় এমন মানুষ পাওয়া কঠিন ছিল, যে জ্ঞান অর্জন করত না। এখন অন্তত আমাদের দেশে তেমন কোনো পরিবেশই নেই। এ রকম পরিবেশ বানানোর জন্য বিভিন্ন সংস্থা ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু পারছে না।
ইসলাম এই পরিবেশ বানিয়ে দিয়েছিল। আর এর ফলেই একের পর এক বিজ্ঞানী বের হয়ে আসছিল। উদাহরণ দিই। দেখ, আমরা সবাই একটা ভালো কলেজে ভর্তি হতে চাই, কেন? পড়ালেখা তো নিজের কাছে, তাই না? তবুও আমরা ভালো কলেজে ভর্তি হতে চাই। সেখানে পড়ালেখার একটি উন্নত পরিবেশ আছে, শহরের সবচেয়ে সেরা সেরা শিক্ষার্থী থাকে সেখানে। এটা পড়ালেখায় সহায়তা করে। তো, ওই সময়ে যখন একজন দেখছে চারপাশে হুলুস্থুলভাবে বিজ্ঞান করা হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একজন মানুষ এতে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
তখন মুসলিমরা ইসলামের পথে কাজ করতে চাইত, এজন্য আরও কমিটমেন্টের সাথে কাজ করত। ইসলাম বিভিন্নভাবে বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত করত। এখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিভিন্ন সংস্থা যা করতে পারছে না, ইসলাম দিয়ে আল্লাহ তা নিমিষেই করে দেন। তার ওপর বিজ্ঞানীদের আলিমদের সমান সম্মান দেওয়া হতো। আমার আর্গুমেন্ট হলো—ইসলাম না থাকলে এসব বিজ্ঞানীদের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। আবু বকর রাজি, হুনাইন ইবনে ইসহাক, সাবিত বিন কুররা এমনকী ইহুদিদের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক মুসা ইবনে মাইমুন বা Maimonides-ও ইসলামের কাছে ঋণী। এমনই ঋণী—ইসলাম না থাকলে তাকেও কেউ চিনত না; সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়া তো দূরে থাক।
দেখ, সাধারণত তাদের “মুসলিম” বলতে মুসলিম জাতির মধ্যে গণ্য করা হয়। মানে তারা যদি মুসলিম সাম্রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং ইসলামি ঐতিহ্যের ধারক হন, তাহলে তাকে মুসলিম জাতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এমন মুসলিম বোঝাতে ব্যবহার করা হয় ছোটো হাতের m (muslim)। সরাসরি অবশ্য ধর্মগতভাবে মুসলিম বোঝাতে ইংরেজিতে বড়ো হাতের M (Muslim) ব্যবহার করা হয়। আর অর্থগতভাবে বলা হয় না, তবে “মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিক”-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিম্পল জিনিস। অর্থগতভাবে মুসলিম হোক আর না হোক, তারা মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।'
আশেপাশের দর্শকদের দিকে তাকিয়ে— 'তবে ভেতরে ঢুকলে কিছুটা জটিলতা আছে।'
আবার আভনিশের দিকে— 'কিন্তু তারা শুধু ইসলামি কালচারের মধ্যেই ছিলেন না; বরং ইসলাম থেকেই সরাসরি প্রভাবিত; বিশালভাবে।'
'কীভাবে! তুই এটি প্রমাণ করতে পারবি?'
'পারলে কি মেনে নিবি ইসলামের কারণে বিজ্ঞানীরা সাফল্য অর্জন করেছিলেন?'
আভনিশ ইতস্তত করল। তারপর বলল— 'আচ্ছা ঠিক আছে।'
'ওকে, আগামীকাল দেখা হবে তাহলে।'
***
পরদিন সিনান এসে আভনিশকে কয়েক পৃষ্ঠার একটা চিঠি দিলো। আমরা তো কৌতূহলে ফেটে পড়ছি। কিন্তু বোম মেরেও সিনানের মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারলাম না। একদম ছুটির সময় সে আভনিশকে গিয়ে বলল—
'তো বুঝেছিস, আভনিশ? কার ধর্মবিশ্বাস কী রকম— তা দিয়ে কিছুই যায় আসে না। ক্রেডিট ঘুরেফিরে ইসলামের কাছে আসে। তাই ইতিহাসবিদরা ইসলামিক সায়েন্স, ইসলামিক ফিলোসফি, ইসলামিক হিস্ট্রির বইয়ে সাবিত ইবনে কুররা, মাইমনিডিস, হুনাইন ইবনে ইসহাকদের রাখলে তাতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।'
আভনিশ কিছু না বলে ব্যাগ নিয়ে চলে গেল।
হতবিহ্বল এই আমরা তখন আভনিশের ফেলে যাওয়া কাগজের গুচ্ছ তুলে পড়ার সুযোগ পেলাম।
প্রথমে প্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে ৭৫০টির মতো আয়াত রয়েছে। এসব বিশেষভাবে প্রভাবিত করে মুসলিম বিজ্ঞানীদের। কিছু উদাহরণ পর্যালোচনা করি—
আল ইমরান (১৯০) : 'যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নভোমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে...' (জ্যোতির্বিজ্ঞান বা Astronomy)
আনআম (৯৭) : 'তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন, যেন তার দ্বারা স্থলের ও সমুদ্রের অন্ধকারে তোমরা পথ পাও।' (Astrolabe তৈরির অনুপ্রেরণা)
নাহল (১১) : 'নিঃসন্দেহে এর মধ্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য, যারা নিজেদের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে।' (দর্শন বা Philosophy)
ইউনুস (৫) : 'তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার মনজিল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যেন তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।' (গণিত বা Mathematics)
রাদ (৪) : 'পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূখণ্ড, এতে আছে আঙুর বাগান, শস্যক্ষেত্র, একাধিক শিরাবিশিষ্ট অথবা এক শিরাবিশিষ্ট খেজুরবৃক্ষ সিঞ্চিত একই পানিতে এবং ফল হিসেবে তাদের কিছুকে কিছুর ওপর আমি শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি...' (জীববিজ্ঞান বা Botany)
আনকাবুত (২০) : 'বলো, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং অনুধাবন করো—কীভাবে তিনি সৃষ্টি শুরু করেছেন!' (ভূগোল বা Geography)
হাদিদ (২৫) : 'আমি লৌহ অবতীর্ণ করেছি, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ...' (বলবিদ্যা বা Mechanics)
নাহল (৬৪) : 'তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ করো।' (পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা Scientific Method)
এছাড়াও কুরআনে বারবার বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হচ্ছে—'তোমরা কি চিন্তা করো না?' 'এতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য—যারা চিন্তা করে' ১৬ ইত্যাদি।
হাদিস: হাদিসের ক্ষেত্রে, বিশেষত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জ্ঞান অর্জনের জন্য যেসব দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তার জন্য বিজ্ঞানীরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
Cosmetology: 'আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন।' (মুসলিম : ১৬৬)
Beneficial Science: 'মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমলের সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমলের সওয়াব বন্ধ হয় না। এক, সাদাকায়ে জারিয়া। দুই, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে।' (আবু দাউদ : ২৮৮০)
ভূগোল বা Geography: 'যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেবেন।' (রিয়াদুস সালেহিন : ১৩৮২)
ওষুধ বা Medicine: 'প্রত্যেক রোগের জন্য ওষুধ আছে...' (হাদিস সম্ভার : ১২৩৩) এখানে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। আরও অসংখ্য হাদিস আছে—যার দ্বারা বিজ্ঞানীরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
স্বীকারোক্তি: ইয়াকুত আল হামাউইর মুজামুল বুলদান এক অসাধারণ জিওগ্রাফিক্যাল বই। এটি আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। তার ভূমিকায় তিনি লিখেন, কুরআন থেকে এই কাজ করতে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য, তার বাবা-মা গ্রিক। তিনি পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমি লিখেন, তার কাজের অনুপ্রেরণা এই চিন্তা থেকে এসেছে—যারা তার থেকে শিখবে, তারা আল্লাহর কাছে তার জন্য দুআ করবে।
ইসমাইল আল জাজারির ধার্মিকতা তার কাজ হতে স্পষ্টত ফুটে ওঠে। ইবনুন নাফিস তো নিজেই আলিম ছিলেন। আল জাহিজও একজন আলিম ছিলেন এবং সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কুরআনের তিন ধরনের অলৌকিকতা নিয়ে কাজ করেছেন। ক্বাদি ইয়াদ তার আশ-শিফা কিতাবে একটি ফিকহি বিষয়ে আল জাহিজকে ফলো করেছেন। ইবনুল হাইসামও ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন।
আল কিন্দি গভীরভাবে কুরআনের লেখা পর্যবেক্ষণ করেন, যার মাধ্যমে তিনি ক্রিপ্টোগ্রাফি-এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
ইবনে সিনার মতে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক। কেননা, অন্যান্য দার্শনিকের বেলায় তাদের কথার সত্যতা প্রমাণ সম্ভব নয়, কিন্তু মুহাম্মাদ-এর বেলায় সে নিশ্চয়তা আছে। কেননা, তার কথা আসছে সরাসরি আল্লাহ থেকে। ইবনে সিনা দার্শনিকভাবে, বর্তমানের ভাষায় বললে বৈজ্ঞানিকভাবে দৈহিক পুনরুত্থান (Bodily Resurrection) প্রমাণে অপারগ হন। তারপরও তিনি এতে বিশ্বাস করেন—কেবল নবিজি বলেছেন এই কারণে (সামি'না ওয়া আত'না নীতি)।
আলি ইবনে রাব্বান আল তাবারি সেরা একজন ফিজিশিয়ান ছিলেন। তার ফিরদাউস আল হিকমা এক মূল্যবান বই। তিনি বলেন, খ্রিষ্টান থাকা অবস্থায় তার দাদা তাকে বলছিল—শব্দ-অলংকরণ খুবই স্বাভাবিক একটা জিনিস, যা সবাই করতে পারে। ধর্মগ্রন্থে এমন কিছু থাকলেই তাকে সত্য বলে গ্রহণ করতে নেই। কিন্তু আলি আল তাবারি কুরআন পড়ার পর বুঝলেন, এটি কোনো মানুষের শব্দ-অলংকরণ না। এর মতো আর কোনো বই নেই। তিনি এমন কিছু আরবি, ফারসি, ভারতীয় বা গ্রিক কোনো বইয়ে পাননি। আবার তিনি জানতে পারলেন, এই বই নাকি এক উম্মি লিখেছেন! তিনি নিশ্চিত হলেন—এটি সত্য গ্রন্থ এবং এটি আল্লাহ থেকে প্রেরণকৃত। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।
ঘটনা: গণিতের বিশাল উন্নতি সাধিত হয়েছিল ইসলামি উত্তরাধিকারের অঙ্ক বা ইলমূল ফারাইদ এবং জাকাতের অঙ্ক করে করে। সালাতের সময়, কিবলার দিক নির্ণয়ের জন্য অনেক যন্ত্র তৈরি হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা একেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তার ওপর কুরআন-সুন্নাহতে মহাকাশের বিভিন্ন বর্ণনা থাকায় ইসলামের বিজ্ঞানে জ্যোতির্বিদদের সংখ্যা অন্য সব ধরনের বিজ্ঞান হতে বেশি। প্রত্যেক মুসলিমকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল জ্ঞান অর্জন করতে আর সে জ্ঞানকে কাজে পরিণত করতে, যেন তা সমাজের উন্নতি ঘটায়। সকল বিষয়ের বিজ্ঞানীগণ তাদের কাজ করাকে একধরনের ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করতেন। ভূতত্ত্ব নিয়ে যত ধরনের সেরা মানের কাজ পাওয়া যায়, সবগুলোতেই ইসলাম আর কুরআনের বিরাট প্রভাব স্পষ্ট।
সালাতের সময় নির্ধারণের জন্য বিজ্ঞানের নতুন শাখাই সৃষ্টি হয় 'ইলমুল মিকাত'। ইসলামি মাস হয় চাঁদের হিসাবে। এটির সঠিক হিসাব থাকা জরুরি রমজান ও অন্যান্য কারণে। বিভিন্ন বিজ্ঞানী এ সমস্যা সমাধানে উঠেপড়ে লেগে যান। এই সময়ে সাবিত বিন কুররা এক অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এটি নির্ণয়ের জন্য। এবার বুঝ, ইসলামের প্রভাব এতই বেশি ছিল, নন-মুসলিমরা পর্যন্ত ইসলামের কাজ করে দিচ্ছিল!
গ্রিক বা ইন্ডিয়ান বিজ্ঞানে ত্রিকোণমিতিক অনুপাত বলতে কিছু ছিল না; শুধু সাইন বাদে। সালাতের সময় বের করতে গিয়ে মুসলিমরা সেটি আবিষ্কার করেন। আসরের সালাতের সময় বের করা অন্য সালাতগুলোর তুলনায় কঠিন ছিল। তো এই সমস্যা সমাধানের জন্য মুসলিমরা নতুন নতুন প্যারামিটার আবিষ্কার করেন— সৌর অয়নবৃত্তের বাঁক বা Inclination of the ecliptic, সৌর অপভূ এর গতি, অয়নচলনের হার, সূর্যের কেন্দ্রীয় দূরত্ব, নতুন সৌর সমীকরণ।
সিনান হেসে দিয়ে বলল—'এখন আমরা যদি একটু খেয়াল করি, এগুলো হলো আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মৌলিক প্যারামিটারসমূহ! মুসলিমরা শুধু আসরের নামাজের সময় বের করতে গিয়ে কী করে ফেলেছে, দেখ একবার!'
বর্তমান সময়ের স্কলারদের বর্ণনা:
দেখ, মূলত জ্ঞানীমহলে এমন কোনো ডিবেট নেই—সেখানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের ওপর ইসলামের বিশাল প্রভাবের কথা স্বীকৃত যে, ইসলামের কারণেই মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে যায়। রিচার্ড ডকিন্সের বন্ধু, ব্রিটিশ হিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বার্ট্রান্ড রাসেল এককালে যার প্রেসিডেন্ট ছিলেন তার সাবেক প্রেসিডেন্ট, নাস্তিক বিজ্ঞানী জিম আল খালিলি মাইকেল ফ্যারাডে অ্যাওয়ার্ড জেতার পর স্পিচে বলেন— 'ইসলামই ছিল তৎকালীন বিজ্ঞানের উচ্চতায় পৌঁছার মূল কারণ।' ফ্র্যাঞ্জ রোজেন্থাল বলেন— 'ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো প্যারাডাইমে মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞান-সচল থাকত না।' এখানে আর মাত্র একটি উক্তিই বর্ণিত হচ্ছে। ব্যাপারটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে ইমানুয়েল ডুচ-এর কথায়—
'কুরআন হচ্ছে সেই বই—যার সহায়তায় আরবরা ইউরোপে আসে রাজার বেশে। তারা মানবতার মশাল তুলে ধরে যখন অন্ধকার চারপাশ ঘেরাও করে রেখেছিল; মৃত প্রজ্ঞা ও জ্ঞান পুনর্জীবিত করে তোলে; দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আর বাদ্যের সোনালি আর্ট পশ্চিমকে শেখায় আর পূর্বকেও শেখায়, আধুনিক বিজ্ঞানের অভ্যুদয় ঘটায় আর গ্রানাডার পতনের জন্য সর্বকাল আমাদের চোখে অশ্রু রেখে যায়। '
আমি আর তারিক একরকম খামচাখামচি করে পড়লাম। কাগজ কতগুলোর জন্য পারলে একজন আরেকজনকে মেরে ফেলি! আমাদের ভয়ংকর প্রতিরূপ দেখে আশেপাশের আর কারও পড়তে যাওয়ার সাহস হলো না। পড়া শেষে অন্যদের দিয়ে এবং সিনানকে নিয়ে বের হলাম।
টিকাঃ
১. কুরআন ১১ : ৬২
২. S. H. Nasr and M. Aminrazavi (edt), An Anthology of Philosophy in Persia (I.B. Tauris publishers, 2008) vol. 1, p: 411
৩. Abdul Latif Muhammad al-Abd, Al-tibb al-rūhānī li Abū Bakr al-Rāzī (Cairo: Maktabat al-Nahda al-Misriyya, 1978); John Marenbon, The Oxford Handbook of Medieval Philosophy (Oxford University Press, 2012) pp. 69–70.
৪. Abu Bakr al-Razi, al-Tibb ar-Ruhani (Translated by Arthur J. Arberry, London: 1950)
৫. M. M. Sharif op. cit.
৬. Sarah Stroumsa, Free Thinkers of Medieval Islam: Ibn Al Rawandi, Abu Bakr al-Razi, and Their Impact on Islamic Thought (Leiden: Brill, 2016), 121-129. স্ট্রমসার কাজ অবশ্য ক্রাউসের ওপরই ভিত্তি করা।
৭. https://bit.ly/39EIOJX; https://bit.ly/3jTNsbI
৮. Hank Green, 'Ancient & Medieval Medicine Crash Course History of Science #9' online video, Crash Course.
৯. Muhammad Abdul Jabbar Beg. 'The Origins of Islamic Science' Muslim Heritage.
১০. 'বিজ্ঞানের ইতিহাস' দ্রষ্টব্য
১১. আল কুরআনুল কারিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন); Qur'an: A Short Journey (onereason publishing) ব্যবহৃত হয়েছে।
১২. Hamza A. Tzortzis. “Embryology in the Qur'an' HamzaTzortzis.com.
১৩. বিশেষ দ্রষ্টব্য : একজনের এটা বোঝা উচিত যে, এখানে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা দিয়ে কুরআনের আয়াতগুলোর ইনটেন্ডেড মিনিং বোঝানো হয়নি। কেবল মুসলিম বিজ্ঞানীদের ওপর কীরূপ প্রভাব পড়েছে—তা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
১৪. Caner Taslaman, The Qur'an: The Unchallengeable Miracle. দেখুন আরও আয়াতের জন্য। হাদিস iHadis apps থেকে
১৫. আরও কয়েকটির জন্য দেখুন : Zaghlul el-Naggar, Treasures in the Sunnah: a Scientific Approach (al-Falah Foundation, 2004)
১৬. Muzaffar Iqbal, p: 39
১৭. Ibid
১৮. Muzaffar Iqbal, p: 42
১৯. Bassam Saeh, The Miraculous Language of the Qur'an: Evidence of Divine Origin (International Institute of Islamic Thought, 2015) pp. 7-9.
২০. Qadi Iyad, Muhammad: Messenger of Allah (ash-Shifa) (Tr. Aisha Abdarrahman Bewley. Revised. Diwan Press Ltd., 2011) ch. 3, section 3.
২১. Jim al-Khalili op. cit.
২২. 'Global Communication' in 'The World' in Salim al-Hassani op. cit.
২৩. Karen Armstrong, p: 216.
২৪. Morteza Hoseinzadeh. 'The Methodology of Ibn Sina in Acquisition of Religious Knowledge' International Journal of Humanities and Cultural Studies, June 2016. pp: 105-113.
২৫. Abdul Aleem. 'Ijaz-ul-Qur'an' in Marmaduke Pickthall (edt), Islamic Culture: The Hyderabad Quarterly Review. 7 (1933), pp. 215-238. p. 222.
২৬. Muzaffar Iqbal (Chapter 3) দেখুন বিস্তারিত জানার জন্য। এ ছাড়াও অসংখ্য বইয়ে এর বর্ণনা দেওয়া আছে।
২৭. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit. p: 587
২৮. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit. pp. 587-593
২৯. Muzaffar Iqbal, p: 41.
৩০. Muzaffar Iqbal, p: 58.
৩১. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit.p: 595.
৩২. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit.: 594
৩৩. George Saliba, 'How the Asr Prayer led to Modern Astronomy' online video, YouTube.
৩৪. D. E. Smith and L. C. Karpinski, The Hindu-Arabic Numerals (Ginn and Company Publishers, 1911)
৩৫. Jim al-Khalili, 'The House of Wisdom and the legacy of Arabic Science' online video, YouTube; J. al-Khalili, Pathfinders.
৩৬. Fuat Sezgin, p: 5.
৩৭. Emanuel Oscar Menaham Deutsch, 'Islam,' in Lady Emily Strangford (edt), Literary Remains of the Late Emanuel Deutsch with a Brief Memoir (New York: Henry Holt and Company, 1874) p. 123.
৩৮. আরও দেখুন: Arman Firman, 'Influence of Islam on Science' Medium
📄 বিজ্ঞানে আলিমগণ
ফেসবুকে কোনো এক ভাইয়ের সাথে নাকি সিনানের কথা হয়েছে। তিনি দেখা করতে বলেছিলেন। এমনিতেও বই কিনতে আমাদের আন্দরকিল্লা যেতেই হতো। তো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার সাথেও দেখা করে ফেলি। আমরা তিনজন আন্দরকিল্লায় পৌঁছালাম।
মসজিদ লাইব্রেরিতে ভাইটির সাথে দেখা হওয়ার কথা। তিনি নাকি মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে কিছু কথা বলবেন। আমরা লাইব্রেরিতে ঢুকলাম। তিনি একটি চেয়ারে বসে ইসলামের আলিমদের নিয়ে লেখা আদিল সালাহির একটি বই পড়ছিলেন। সিনানকে তার দিকে গিয়ে মুসাফাহা করতে দেখে তা বুঝলাম। গৌর বর্ণের চেহারায় ড. সাঈদ রামাদান আল বুতির মতো দাড়ি, চোখগুলো সাদা। শান্ত স্বভাবের মনে হয় দেখে। তিনি বললেন—'আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি আব্দুল কাহির।'
'ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমি তারিক, আপনি ভালো আছেন?'
'আলহামদুলিল্লাহ! ভাইয়া, তোমার নাম কী?'
'আরমান।'
'বসো। সিনানের সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, তোমরা মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করো। আর এ বিষয়ে তোমাদের প্রচুর আগ্রহ। সিনান আমাকে তোমাদের লাইব্রেরির চমৎকার ঘটনাটি বলল। তা শুনে লাইব্রেরিয়ানের সাথে দেখা করার ইচ্ছাও জেগেছে। আর তোমাদের মতো কম বয়সি ছেলেদের এমন একটা বিষয় নিয়ে আগ্রহী দেখেও খুব ভালো লাগল। যাহোক, আমি আজ তোমাদের ইসলামের আলিমদের বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি নিয়ে কিছু কথা বলব।'
'আলি ইবনে হাজমকে চেনো তোমরা?'
যথারীতি তারিক লাফিয়ে উঠল— 'হ্যাঁ হ্যাঁ! উনার কিতাব আখলাক ওয়া সিয়ার বইটার ইংরেজি অনুবাদ দেখেছিলাম।'
'কিন্তু পড়িসনি।' গুঁতা মারলাম।
'না... পড়া হয়নি'—বলে লজ্জা পাওয়া মুচকি হাসি দিলো তারিক।
সিনান আর আমি হেসে উঠলাম।
'আচ্ছা সমস্যা নেই। Comparative Religious Studies-এর নাম শুনেছ?'
'অবশ্যই!'
'হ্যাঁ, বাংলাদেশে তো এটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যাহোক, আলি ইবনে হাজম এটার জনক। তিনি খুবই বিখ্যাত একজন আলিম। আন্দালুসের ইতিহাসের সবচেয়ে খাঁটি চিন্তাবিদদের একজন। ইসলামে উনার লেভেলের যৌক্তিক চিন্তক নেই বললেই চলে। তার সাথে তুলনা করা যায় ইবনে তাইমিয়াকে। তার জীবদ্দশায় মানুষরা বলত— "ইবনে হাজমের জিহ্বা আর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের তরবারি ভাই ভাই।" লেভাই প্রোভেঞ্চাল স্প্যানিশ ইতিহাসের অথোরিটি। লেভাই প্রোভেঞ্চালের একজন স্টুডেন্ট রজার আর্নালদেজ তিনি ডক্টরাল থিসিস করেছেন ইবনে হাজমের ওপর। অনেকে ইবনে হাজমকে দেকার্তের সাথে তুলনা করেন। ইবনে হাজমের মতে, যখন স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, তখনই ভুল হয়। সত্যের অনুসন্ধানে স্মৃতিশক্তির ভূমিকা পরে দেকার্ত আলোচনা করেন। কিন্তু সম্ভবত তুলনাটা করা উচিত ছিল প্যাসকেলের সাথে। ইবনে হাজমের মতো প্যাসকেলও তার বই Les Pensées-এ নিজের চিন্তাগুলোকে সাজাতে চেষ্টা করেছেন।'
'নামের অর্থটা...' সিনান বলতে নিল।
'Thoughts' সাথে সাথে বললেন আব্দুল কাহির ভাই, 'তো... প্রতিটি ভাবনা যেন একটি ফাংশন আর প্রতিটি ফাংশন থেকে একটি একটি আইডিয়া বের হয়; প্রত্যেকটি ভাবনা একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত। '
তোমরা পাঠ্যবইয়ে পড়েছ নিশ্চয়ই—গতিশীল আর স্থিতিশীল বস্তু আছে, কিন্তু কোনো গতিই পরম নয়, পরম নয় কোনো স্থিতি? ইবনে হাজমের বিজ্ঞানচিন্তায়ও এই আইডিয়া পাওয়া যায়। আবার বিভিন্ন শব্দ নির্দিষ্ট মাধ্যমে নির্দিষ্ট গতিতে চলার কথাও তিনি বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবী ভূ-গোলক আকৃতির আর এর জন্য তিনি যৌক্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তিনি অবশ্য অনেক ভুল জিনিসেও বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানের ব্যাপারে।
যাহোক, সময় আর শূন্যস্থান নিয়ে ইমানুয়েল কান্ট যে কাজ করেছিলেন, তা আগেই দেখা যায় ইবনে হাজমের লেখায়। যেখানে বলা হয়—শূন্যস্থান ও সময় আমাদের বোধের মাঝে পাওয়া যায় কেবল, ম্যাটেরিয়াল এক্সিস্টেন্স বা বস্তুগত অস্তিত্ব নেই।
তার একটা বই আছে তাওক আল হামামা বা Ring of the Dove। বইটি তিনি এত সুন্দর ভাষায় লিখেছেন, প্রায় সব ইউরোপিয়ান ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছে।
আসলে জানো কী, ইবনে হাজমকে নিয়ে অনেক কম কাজ হয়েছে। তার বেশিরভাগ বই ইংলিশে অনুবাদ হয়নি। অবশ্য ফ্রেঞ্চ আর স্প্যানিশ ভাষায় অনেক অনুবাদ পাওয়া যায়। এমনকী ইউনেস্কো নিজ উদ্যোগেও ইবনে হাজমের বই ফ্রেঞ্চে অনুবাদ করিয়েছে। যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, ইবনে হাজমের বেশিরভাগ কাজের ওপর আদতে গবেষণা করা হয়নি। ২০১৩ সালে অবশ্য অনেকজন স্কলার মিলে ৮০০ পৃষ্ঠার একটা বই পাবলিশ করেছেন। আস্তে-ধীরে কাজ এগোচ্ছে। '
আব্দুল কাহির ভাই ২য় স্কলারের আলোচনায় গেলেন— 'ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওজিয়্যাহ। নাম তো শুনেছ মনে হয়?'
'শুনেছি মানে!' আমি উত্তেজিত।
'তিনি আলি ইবনে হাজমের চেয়ে অনেক বেশি বিখ্যাত আর তার অনেক কাজের ওপরই গবেষণা হয়েছে। গ্যালেন আর অ্যারিস্টটলের ভ্রূণবিদ্যার সাথে তার দ্বিমত ছিল। তিনি কুরআন আর বিভিন্ন হাদিস ব্যবহার করে বলেন— "পুরুষ আর মহিলার অবশ্যই আলাদা বীর্য আছে।" এই জায়গায় অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মহিলাদের অমন কিছু আসে না। এর জায়গায় সম্ভবত ঋতুস্রাব জাতীয় অন্য কোনো ধরনের ফ্লুইড আসে। গ্যালেন শুধু পুরুষ বীর্যের ওপর গুরুত্ব দেন।
কিন্তু ইবনুল কাইয়্যিম লজিক দেন, এমন হলে সন্তান কোনোমতেই মায়ের গঠন অর্জন করতে পারত না। এখানে আসলে শুক্রাণু আর ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে জাইগোট গঠনের বিষয়টা আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু তখনও এই জিনিসগুলোরও উদ্ঘাটন হয়নি, সেগুলোর আলাদা নামও দেওয়া হয়নি।
ইবনুল কাইয়্যিমের তিব্ব আল নববি বা Medicine of The Prophet খুবই সেলিব্রেটেড একটি বই। এই বইয়ে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন হাদিসের মেডিকেল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ওই সময়ের সেরা সেরা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তার সময় তিব্ব আল নববি একটা আলাদা লেখার বিষয়ই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অন্যান্য লেখকরা শুধু হাদিসই বর্ণনা করতেন, আর কিছু লিখতেন না। ইবনুল কাইয়্যিম এসে হাদিসের বর্ণনাগুলোকে সে সময়ের বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি তার মিফতাহ দার আস-সাদাহ বইয়ে অ্যাস্ট্রলজি, অ্যালকেমির সমালোচনা করেছেন। এ সমালোচনার বেশিরভাগ অবশ্য ইবনে সিনা থেকে ধার করা। কিছু জিনিস অন্যান্য বিজ্ঞানী, যেমন—ইবনুল হাইসাম থেকেও নেওয়া হয়েছে। তবে কয়েকটা সেরা পয়েন্ট ইবনুল কাইয়্যিম নিজ হতেও লিখেছেন। সাবধানতা অবলম্বন জরুরি, তিনি কেবল অকাল্ট পার্টের সমালোচনা করেছেন, এক্সপেরিমেন্টাল পার্টের না। তিনি বইয়ে সেসব মানুষদের সমালোচনা করেছেন, যারা নিজেদের ঈমান বাঁচানোর কথা বলে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সত্যকে এড়িয়ে যায়। তাদের, যারা পৃথিবীর কক্ষপথের আকৃতির রাউন্ডনেস, চাঁদের আলো সূর্য থেকে রিফ্লেক্টেড ইত্যাদি প্রমাণিত জিনিস ধর্মের নাম দিয়ে জানতে চায় না। দ্বীনের ক্ষতি করে এসবের মাধ্যমে গোঁড়া মানুষগুলো। '
'খাইসে ভাই!'
আলোচনা তৃতীয় স্কলারে গেল— 'ফাখর আদ-দ্বীন আল রাজি। তার বিশাল একটা তাফসির আছে—মাফাতিহ আল গাইব। সাধারণভাবে তাফসির আল কাবির নামে পরিচিত।'
'মানে বড়ো তাফসির?' সিনান বলল।
'হুম। অবশ্য একে The Great Tafsir বলা হয়; বড়ো তাফসির না। তাকে ইসলামের ষষ্ঠ মুজাদ্দিদ ধরেন অনেকে। ইসলাম, বিজ্ঞান, দর্শন—এ তিনটি নিয়েই তার পারফেক্ট নলেজ ছিল। তিনটার ক্ষেত্রেই তিনি বিশাল প্রভাব ফেলেন।
ওই সময়কার বিজ্ঞান আর দর্শনের ওপর মাস্টারি ছিল তার। তিনি অত্যন্ত যুক্তিবাদী ছিলেন। আর যুক্তিকে অধিক প্রাধান্য দিয়েই তাফসির রচনা করেছেন অন্যান্যদের থেকে আলাদা হয়ে। তার পরবর্তী সকল মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকদের জন্য ফখরুদ্দিন আর-রাজির ধর্মতত্ত্ব একটা স্থায়ী ঐতিহ্য হয়ে ওঠে।
এবার চলো বিজ্ঞানে আসি। তিনি একটি মেডিকেল এনসাইক্লোপিডিয়া লিখেছিলেন আল তিব্ব আল কাবির নামে। শেষ করে যেতে পারেননি অবশ্য। তিনি ইবনে সিনা আর আবু বকর আল রাজির মেডিকেল বইগুলোর ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। এটা দেখেই বোঝা যায়, তার মেডিকেল জ্ঞান এক-দুটো বই পড়ে আসেনি; তিনি তা ভালোভাবেই স্টাডি করেছিলেন। সব সময় ঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে পারার জন্য তিনি খুব বিখ্যাত ছিলেন।
রাজি বলেন— "আমাদের বোধের জন্য এই মহাবিশ্ব অতিরিক্ত জটিল। যথেষ্ট মাধ্যম নেই সঠিক পর্যবেক্ষণের। তাই সে সময়ে না দেখা জিনিসসমূহ; যার বেশিরভাগই জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত—তাদের ব্যাপারে বেশিরভাগ জানাশোনাই কেবল আপাত ধারণা।” সে সময় যে সঠিক বুঝের জন্য যথেষ্ট ইকুইপমেন্ট ও ফর্মুলা ছিল না, তা রাজি বুঝতে পেরেছিলেন। এর কারণে সাবধান থাকতে হতো, যা পাওয়া যাচ্ছে—তাকে আল্টিমেট সত্য ধরা যেত না।
ভূগোল ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে তার একাধিক কিতাব আছে। এ ছাড়াও তার একটা বৈজ্ঞানিক বিশ্বকোষ আছে—জামি আল উলুম। ফার্মাকোলজি, অ্যারিথম্যাটিক, অ্যালজেব্রা, অপটিক্স ইত্যাদি বহু বিষয়ের আলোচনা আছে এখানে। বিজ্ঞানের মোট ৪০টি সাবজেক্ট নিয়ে লিখেছেন। বিভিন্ন পশুর অসুখ, বিশেষ করে গবাদি পশুর অসুখ আর চিকিৎসার কথা আছে। অনেকে বলেন, তিনি ভেটেরিনারি সায়েন্সের পথিকৃৎ। বিজ্ঞানকে তিনি ৬০ ভাগে শ্রেণিবিভক্ত করেছিলেন। তার হাদায়িক বইটির মধ্যে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি টলেমির জিওসেন্ট্রিক সৌরজগৎ মডেলের সমালোচনা করেন।
কুরআনে বারবার "আলামিন” শব্দটি এসেছে। এটা দেখে তিনি বলেন, মহাবিশ্বে আরও অসংখ্য গ্রহ আছে। গ্রহ একটাই—এই ধারণার শক্ত সমালোচনা করেন তিনি। মাল্টিভার্সের পসিবিলিটি নিয়েও স্পেকুলেট করেছিলেন। তিনি শূন্যস্থানের অস্তিত্বের কথা এনে বলেন, মহাবিশ্ব অসীম বিস্তৃত। আর তার দর্শন? পিটার অ্যাডামসন উনার ব্যাপারে বলেন—তার দর্শন ১২ শতকের জন্য ছিলই না! মানে ১২ শতকের মানুষদের বোঝার যোগ্যতা ছিল না তার দর্শনের। তার দর্শন হচ্ছে ২১ শতকের দার্শনিকদের জন্য। এখনকার মানুষরা তার দর্শন বুঝবে! '
'আরে কী বলেন!' সিনানের ঠোঁটে মুচকি হাসি।
'গণিত মুসলিম বিশ্বে সব সময়ই অত্যধিক গুরুত্ব পেত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল পর্যন্ত শিশুকালে গণিত পড়েছিলেন। গাজালির কারণে মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্কের অনেক পরিবর্তন হয়, তাই পরবর্তী সময়ে আমরা একই সঙ্গে বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে পারদর্শী অনেক মানুষ দেখতে পাই।
আল রাজি; একজনকে ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি। তারপর আশআরি ধারায় সাইয়্যিদ শারিফ আল জুরজানি আছেন। একই সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক ও জ্যোতির্বিদ। একই রকম আলি কুশজি। কুশজি অবশ্য আরও রিজিড অ্যাস্ট্রনমার ছিলেন। তিনি ১৫ শতকে যুগান্তকারী কাজ করেছিলেন। আগে যেমন বললাম, আল রাজি বলেছিলেন—জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় ব্যাপার-স্যাপারগুলোর বাস্তবে অস্তিত্ব নেই।
কুশজির আগের শতকের আশআরি ধর্মতাত্ত্বিক আদুদ উদ্দিন ইজিও একই কথা লিখেন। ইজিও কিন্তু জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পারদর্শী ছিলেন, তবে জুরজানি ও ইজির মতো জ্যোতির্বিদ বলা ভুল হবে। গাজালি ও রাজির অনুসরণে তিনি সায়েন্টিফিক অ্যান্টি-রিয়ালিস্ট। কিন্তু জুরজানি ও কুশজি আশআরি ধারার মধ্যেই সায়েন্টিফিক রিয়ালিস্ট এবং দুজনেই ইজির সমালোচনা করেছেন। যাহোক, কুশজি বলতে চাচ্ছিলেন, অনেক ক্ষেত্রে মিল আছে। গ্রিকদের ফলো করলে পৃথিবী স্থির। কিন্তু সূত্রসমূহ অনুসরণ করা হলে মনে হবে—পৃথিবী ঘুরছে, তা চলমান। কিন্তু এটা গ্রহণ করা হতো না। আর এই টাইপের কিছু অমিল “জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই" বলার পেছনে কারণ ছিল।
যখন গ্রিক বাঁধাধরা নিয়ম থেকে কুশজি বেরিয়ে গেলেন, বলতে চাইলেন—বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক আছে। তিনি বললেন, পৃথিবী ঘুরছে—যা কোপার্নিকাসের কাজের একটা প্রিকার্সর। এখানে লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে—দার্শনিক ধর্মতত্ত্ব কীভাবে একজনকে অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করে তোলে। পরবর্তী সময়ে কুশজি গ্রিক অন্ধবিশ্বাস থেকে মুসলিমদের মুক্ত করার জন্য অনেক লেখালিখি করেন। তিনি বুঝতে সক্ষম হন, সকল সায়েন্টিফিক ডিসিপ্লিনকে অ্যারিস্টটলিয়ান ফিজিক্স ও মেটাফিজিক্স থেকে মুক্ত করতে হবে।
ইমাম জাফর আস-সাদিক ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কেমিস্টদের একজন; জাবির ইবনে হাইয়ানের টিচার। জাবির ইবনে হাইয়ানের ৫০টির মতো বইয়ের মধ্যে জাফর আস-সাদিকের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। ভাষা নিয়ে ইবনে তাইমিয়ার কাজ ভিটগেনস্টাইনের সাথে তুলনা করা হয়।
খাওয়ারিজমি তার অ্যালজেব্রা নিয়ে যে প্রথম বই লিখেছিলেন, সেটাতে জরিপ, ব্যবসায়িক লেনদেন আর উত্তরাধিকারসূত্রের বিভিন্ন অঙ্ক ছিল। সেখানে তিনি ইমাম আবু হানিফা থেকে নেওয়া নিয়ম ব্যবহার করেছিলেন। এটা হানাফি মাজহাব প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখে। যাওয়ার আগে তোমাদের একটা ধাক্কা দিয়ে যেতে চাই। আবুল ফিদা ইবনে কাসিরকে চেনো?'
'হ্যাঁ, তিনি অনেক বড়ো আলিম।' আমি বললাম।
তারিক বলল—'তিনি একটা সেরা তাফসির আর ইতিহাস বই লিখেছেন। সারা পৃথিবীতে ব্যবহৃত হয়।'
'মূলত তিনি অনেক ফিল্ডে কাজ করেছেন। আর যে ফিল্ডেই কাজ করেছেন, সেখানেই সব উড়িয়ে দিয়েছেন।' সিনানের উক্তি।
আব্দুল কাহির ভাই বললেন—'তিনি একজন সফল জিওগ্রাফারও ছিলেন। রবার্ট বয়েল তার জিওগ্রাফিক্যাল কাজ পড়েছিলেন আর তিনি ইবনে কাসিরের থেকে প্রভাবিত। জন গ্রিভস, জন ওয়ালিসের মতো বড়ো বড়ো নামের কাছেও তিনি অনুপ্রেরণা। তার বই পশ্চিমে বিরাট প্রভাব ফেলে এবং তার নাম সেখানে খুব সম্মানিত ছিল। তার ভূগোল বইয়ে অনেক নতুন নতুন ফ্যাক্ট ছিল। পরবর্তী সময়ের মুসলিম ভূগোলবিদরা ইবনে কাসিরকে অনুসরণ করেছেন। ১৭ শতাব্দীতে তার বই ইউরোপে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রয়্যাল সোসাইটির সকলেই তার ব্যাপারে জানত।
১৬ শতকের ভূগোলবিদ John Dee ইবনে কাসিরের একটা রেকর্ডের ব্যাপারে বলেছেন—“A record worthy to be printed in gold।” মজার ব্যাপার, ইসলামের কাজে তাকে ইবনে কাসির ডাকা হয় আর বিজ্ঞানের কাজে আবুল ফিদা! যাহোক, মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাজকে সম্মান দেখিয়ে চাঁদের ২৪টি গর্ত বা ক্রেটারের নামকরণ তাদের নামে করা হয়েছে। আবুল ফিদা ইবনে কাসিরের ভূগোলে করা কাজকে সম্মান দেখিয়ে তার নামে চাঁদের একটি ক্রেটারের নামকরণ করা হয়েছে। '
'আরে কী বলেন!' সিনানের ঠোঁটে মুচকি হাসি।
আব্দুল কাহির ভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন—'দেখ, তারা ছিলেন ইসলামের আলিম। আর এখানে যাদের কথা বলেছি, প্রত্যেকেই ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠদের মধ্যে। তাদের মূল কাজ ছিল ইসলাম নিয়ে আর এজন্য ইসলামের ওপর লেখা তাদের বই নিয়েই গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানের ওপর করা তাদের বিভিন্ন কাজ নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি। যদি করা হয়, তাহলে আমরা অবশ্যই আরও অনেক কিছু জানতে পারব। আবার, অনেকের কাজ হারিয়ে গিয়েছে। যেমন: ইবনে হাজমের ৪০০ বইয়ের মধ্যে এখন শুধু ৪০টি বই পাওয়া যায়। ইসলাম বিজ্ঞানের এমনই এক পরিবেশ বানিয়ে দিয়েছিল, বিজ্ঞান করা খুবই সাধারণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়। উপরন্তু সেই সময় ইসলামের বিজ্ঞানসমূহ ও প্রোফেন বিজ্ঞানসমূহকে আলাদা চোখে দেখা হতো না। আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল কাদির আল ফাসিকে চেনো?'
'না।'
'চেনার কথা না। তিনি একজন মালিকি ফাকিহ; আন্দালুসের। তিনি বড়ো কোনো নাম না। কিন্তু তবুও চিকিৎসাবিদ্যা আর জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে কাজ করেছেন। তার বই ল্যাটিনেও অনুবাদ হয়েছে। বর্তমানে যেমন বিজ্ঞান স্টাডি ও ধর্ম স্টাডিকে আলাদা করা হয়, ক্লাসিক্যাল মুসলিম বিশ্বে সে রকম কিছু ছিল না। স্টাডি ছিল ইন্টেগ্রেটেড অর্থাৎ একীভূত। তাই বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব সব একসাথে স্টাডি হতো। সংঘর্ষ বলতে কিছু ছিল না। বর্তমানে অনেকে ওয়েস্টার্ন সেক্যুলার এডুকেশনের সমালোচনা করছেন আর বলছেন, ক্লাসিক্যাল ইসলামিক সিস্টেমটা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।'
আব্দুল কাহির ভাই দাঁড়ালেন। 'আজ তাহলে আসি। আল্লাহ চাইলে আবার দেখা হবে। সালাম।'
প্রস্থান করলেন।
'জোস অাখি, পুরা জোস।' তারিকের মুখে এক গর্বভরা হাসি।
বের হলাম। ঘরে গিয়ে পড়তে বসতে হবে।
টিকাঃ
১. Joseph A. Kechichian. 'A Mind of His Own' Gulf News; P. K. Hitti, History of the Arabs op. cit. p: 558. Jim al-Khalili, Pathfinders op. cit.
২. Mohammad Akram Nadwi, 'Ijma', Qiyas and Ijtihad' part 2, al-Salam Institute.
৩. J. R. Strayer (edt.), Dictionary of the Middle Ages (New York: Charles Scribner's Sons, 1985) Vol 6, p: 117
৪. R. Arnaldez, 'Grammaire et Theologie chez Ibn Hazm de Cordoue' (Doctoral Thesis. Paris: Librairie Philosophique J. Vrin, 1956) at p. 106. In Salim al-Hassani and Salah Zaimeche. 'Ibn Hazm's Philosophy and Thoughts on Science' Muslim Heritage.
৫. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol 4, p: 516
৬. Salim al-Hassani and Salah Zaimeche. 'Ibn Hazm's Philosophy and Thoughts on Science' Muslim Heritage.
৭. ibid
৮. Salim al-Hassani and Salah Zaimeche. 'Ibn Hazm's Philosophy and Thoughts on Science' Muslim Heritage.
৯. Abdi O. Shuriye and Abdulazeez Femi Salami, 'Scientific Contributions of ibn Hazm' International Journal of Arab Culture Management and Sustainable Development, January 2011.
১০. 'Ibn Hazm' in 'The Zahirite School' in 'Zahirism' in A History of Muslim Philosophy Op. cit.
১১. Joseph R. Strayer op. cit.
১২. Camilla Adang, Maribel Fierro, Sabine Schmidtke, Ibn Hazm of Cordoba: The Life and Works of a Controversial Thinker (Brill, 2013)
১৩. N. Tomiche: Epitre Morale, Collection UNESCO, Beirut, 1961 As cited in [7]
১৪. Hamza Tzortzis, 'Embryology in the Qur'an' (iERA Research) p: 15-16; available at: https://bit.ly/2ymu6ZA
১৫. Irmeli Perho. 'Ibn Qayyim al-Jawziyyah's Contribution to the Prophet's Medicine,' in A Scholar in the Shadow: Essays in the Legal and Theological Thought of Ibn Qayyim al-Jawziyyah, ed. Caterina Bori and Livnat Holtzman (Rome: Istituto per l'Oriente C.A. Nallino, 2010) pp: 183-202.
১৬. John W. Livingston. 'Ibn al-Qayyim al-Jawziyyah: A Fourteenth Century Defense Against Astrological Divination and Alchemical Transmutation' Journal of the American Oriental Society. 91 (1971).
১৭. Ibn al-Qayyim. Miftah Dar al-Sa'adah (Mecca: Dar Alam al- Fawa'id, 2010) vol. 3, p. 1417-1418; as cited in Nazir Khan and Yasir Qadhi, 'Human Origins: Theological Conclusions and Empirical Limitations' Yaqeen Institute for Islamic Research.
১৮. 'Fakhr al-Din ar-Razi' in M.M. Sharif, ed. A History of Muslim Philosophy vol. 1
১৯. Sonja Brentjes, Teaching and Learning the Sciences in Islamicate Societies (800-1700) (Brepolis, 2018) p: 212.
২০. Tariq Jaffer op. cit.
২১. 'Fakhr al-Din ar-Razi' in M.M. Sharif (edt), A History of Muslim Philosophy, vol. 1.
২২. Ozgur Koca, Islam, Causality and Freedom: from the Medieval Era to the Modern Era (Cambridge: Cambridge University Press, 2020), pp: 81.
২৩. Adi Setia. 'Fakhr Al-Din Al-Razi on Physics and the Nature of the Physical World: A Preliminary Survey' Islam & Science. 2:2 (2004), pp. 161-180.
২৪. Seyyed Hossain Nasr, Science and Civilization, p: 62
২৫. Adi Setia. 'Fakhr Al-Din Al-Razi on Physics and the Nature of the Physical World: A Preliminary Survey' Islam & Science. 2:2 (2004), pp. 161-180.
২৬. Peter Adamson. 'For the Sake of Argument: Fakhr al-Din al- Razi' in Philosophy in the Islamic World op. cit.
২৭. Arun Bala. 'Did Medieval Islamic Theology Subvert Science?" Muslim Heritage.
২৮. Hans Daiber, 'God versus Causality: Al-Ghazali's Solution and its Historical Background' in Islam and Rationality: The Impact of al-Ghazali. Papers Collected on His 900th Anniversary ed. Georges Tamer (Leiden: Brill, 2015), 1: 20. দুটো ট্র্যান্সমিশন দেখিয়েছি: আরমান ফিরমান, 'আবু হামিদ আল গাজালি-ব্লেইস প্যাসকেল' বুদ্ধিবৃত্তিক চৌর্যবৃত্তি. পর্ব ৮. Medium: tinyurl.com/intellectualtheft8; আরমান ফিরমান. 'আবু হামিদ আল গাজালি রেনে দেকার্ত' বুদ্ধিবৃত্তিক চৌর্যবৃত্তি পর্ব ১০. Medium: tinyurl.com/intellectualtheft10; এ ব্যাপারে আরও জানতে পড়ুন : আরমান ফিরমান, 'আশআরি আকিদার কারণে কি মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান চর্চায় সমস্যা হয়?'
২৯. John John O'Connor and Edmund F. Robertson. 'Abu Mansur ibn Tahir al-Baghdadi' MacTutor History of Mathematics archive, University of St Andrews.
৩০. Christopher Melchert, Ahmad ibn Hanbal (Makers of the Muslim World. Oxford: Oneworld Academic, 2006)
৩১. F. Jamil Ragep. 'Freeing Astronomy from Philosophy: An Aspect of Islamic Influence on Science' Osiris 16 (2001), pp: 49-71. কিছুটা বিস্তারিত—আরমান ফিরমান, 'আশআরি আকিদার কারণে কি মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান চর্চায় সমস্যা হয়?'-আর্টিকেলে লিখেছি।
৩২. Adil Salahi. “Imam Jaafar As-Sadiq' Muslim Heritage.
৩৩. Abdul Rahman Mustafa. 'Ibn Taymiyyah & Wittgenstein on Language' The Muslim World. 108 (2018), 465-491.
৩৪. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit. p: 579
৩৫. Salim al-Hassani op. cit. p: 311.
৩৬. Salah Zaimeche. 'The Impact of Islamic Science and Learning on England' Muslim Heritage.
৩৭. 'Travellers and Explorers' in 'The World' in Salim al-Hassani op. cit.
৩৮. Dr. Rim Turkmani. 'Arabic Roots of the Scientific Revolution' Muslim Heritage.
৩৯. Fuat Sezgin, vol. 1, p: 99.
৪০. 'Illustrious Names in the Heavens - Arabic and Islamic Names of the Moon Craters' Muslim Heritage.
৪১. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol: 1, p: 657