📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 The Physicist: ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী

📄 The Physicist: ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী


'আচ্ছা তারিক, তোর ফেসবুক আইডির নাম Tarik Tariq ক্যান রে?'
বসে আছি সিনানের বাড়ির ছাদের ওপর। সিনান কোনো এক রিসার্চ পেপার পড়ছিল, আমাদের পাঠিয়ে দিয়ে বলল, একটু পরে আসবে।
'আসলে... বানানটা Tarik হবে নাকি Tariq হবে— সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না বলে দুটোই লিখে দিয়েছি!'
গরমের মধ্যে তারিকের নরম জোকে মজা পেলাম না। বাতাসও নেই তেমন, কাক কতগুলো চেঁচাচ্ছে। অবশেষে দেখলাম সিনান আসছে। হাতে ছোটো একটা নোটবুক।
সিনানের এ রকম অনেক নোটবুক আছে। অনেক বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করে, চিন্তা-ভাবনা করে। যখন সেরা কিছু পায় বা চরম কোনো আইডিয়া আসে মাথায়, তখন কোনো এক ছোটো নোটবুকে লিখে রাখে। হামিদুদ্দিন ফারাহির মতন। বাকিটা আশা করি সে নিজের জীবনের কাজ সমাপ্ত করে যেতে পারবে।
'এসেছিস তাহলে? তাড়াতাড়ি কর! 1001 Inventions and the World of Ibn al-Haytham দেখার পর ইবনুল হাইসামের ব্যাপারে ফ্যাক্টগুলো জানার খুব ইচ্ছা হচ্ছে।'
বলতে শুরু করল সিনান— 'হাসান আল হাইসাম খুব জনপ্রিয় বিজ্ঞানী।'
'মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমি মারা গিয়েছেন অনেক দিন হলো। লোকে তো কাভালিয়েরি, লিউয়েনহয়েক, দেকার্ত, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও সবার গুণ গান গেয়েই যাচ্ছে!'
'তারিক জিজ্ঞেস করল—'এই জনপ্রিয়তার কারণ কী?'
'কারণ তো অাখি, একটু পরই জানতে পারবি।'
'ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী!' তারিক ধাক্কা খেল।
'হুম। তিনিই আসল পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক। আমাদের ফিজিক্স বইয়ে তো রজার বেকনের নাম লেখা। মূলত সব জায়গায় তার নাম থাকে। একদম ভুল। রজার বেকন সর্বপ্রথম এটি ইউরোপে আনেন, ইতিহাসে না। তারপর আবার তার এটার ওপর নিজের প্র্যাকটিস রং চড়িয়ে বলা হয়েছে। এই বিকৃত ইতিহাসটা দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়। মুসলিমদের মধ্যে ইবনুল হাইসামই প্রথম গ্রিকদের পুরাপুরি রিজেক্ট করেন। প্রত্যেকটা বৈজ্ঞানিক কাজের কঠোরভাবে পরীক্ষা করার কাজ ইবনুল হাইসামই প্রথম করেন। এর আগে অনেক গ্রিক এ ব্যাপারে জানত, তবে তারা তা প্র্যাকটিস করত না। নিজের মত কীভাবে প্রমাণ করতে হবে—সবাই এটা নিয়েই ব্যস্ত ছিল।
সাধারণভাবে উনিশ শতকের আগে বিজ্ঞান বলতে কিছু ছিল না। তার আগে সায়েন্স ছিল মূলত প্রাকৃতিক দর্শন। তখন এমন অনেক জিনিসকেই বিজ্ঞান বলা হতো, যা আমরা বর্তমানে কখনোই বিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি দেবো না। ইবনুল হাইসাম মূলত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির শুরুটা করেছিলেন। বর্তমানে অসংখ্য পদ্ধতি আছে। একেক বিষয়ে একেক পদ্ধতি। আমরা একে পরীক্ষামূলক পদ্ধতি বলি। বিজ্ঞানে অনেক ক্ষেত্রে এক্সপেরিমেন্ট করাও যায় না। যেমন—তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান। তবে ইবনুল হাইসামের সাথে এক্সপেরিমেন্টাল ও ইনডাক্টিভ মেথোড বিজ্ঞানে প্রয়োগ শুরু হয়। যার জন্য তাকে প্রথম বিজ্ঞানী বলে দাবি করা হয়।
বেকনে ফিরে আসি। রজার বেকন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কৃতিত্ব ইবনুল হাইসামকে না দিয়ে দিয়েছেন পিটার পেরেগ্রিনাসকে। এর অবশ্য কারণ ছিল। ইবনুল হাইসামকে কৃতিত্ব দিলে খ্রিষ্টান সমাজে গ্রহণযোগ্যতা হারানোর সম্ভাবনা ছিল। বেকন অবশ্য পরে আরবি আর আরবি বিজ্ঞানের জ্ঞানকে সত্য জ্ঞানের একমাত্র পথ বলে স্বীকার করেছিলেন। তার ওপর ইসলামি প্রভাব নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে। কয়েক দিন আগে স্কুলে ম্যান্ডোনেটের কথা বলেছিলাম, মনে আছে?'
'আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝেছি।' আমি তাড়া দিলাম—'এবার কাজের আলাপে ঢোক।' তারিক মুখ ঝামটা মেরে বলল—'তো এতক্ষণ কি আকামের কথা হয়েছে নাকি?'
'আরে, কাজের কথা মানে ইবনুল হাইসামের কাজকর্মের কথা বুঝিয়েছি।'
সিনান আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলল—'আরে আসছি তো ওই আলোচনায়। তবে আরেকটা কথা শোন। দেখবি, অনেকে বলবে—ইবনুল হাইসাম প্রবক্তা, তবে জনক দেকার্ত, গ্যালিলিও ও ফ্রান্সিস বেকন। কিন্তু এই কথাটাও ভুল। দেকার্ত আর ফ্রান্সিস বেকন সতেরোশো শতাব্দীতে যা বলেন, ইবনুল হাইসাম সেটাই করে দিয়ে গিয়েছেন দশম শতকে। ইবনুল হাইসামের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি—যেখানে তিনি অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন, যে প্রক্রিয়ায় তিনি গবেষণা করতেন, তা সন্দেহাতীতভাবে আধুনিক পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রথম চিহ্ন এবং পরবর্তী সময়ে গ্যালিলিও, দেকার্ত আর ফ্রান্সিস বেকন যা প্রতিষ্ঠা করেন তা-ই। আর রজার বেকনের মাধ্যমে একটা চেইনও তৈরি করা সম্ভব। তাই খেতাবটা ইবনুল হাইসামের প্রাপ্য। বর্তমানে একাধিক ইতিহাসবিদ বলেন, ইবনুল হাইসামের কাজগুলো পড়লে পুরোপুরি মডার্ন সায়েন্স নিয়ে লেখা বইয়ের মতো লাগে। অর্থাৎ কেবল প্রাকৃতিক দর্শনের দিক থেকেই তিনি প্রথম বিজ্ঞানী না; মডার্ন সায়েন্সের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও প্রথম বিজ্ঞানী।'
'ওফ! জিনিয়াস।'
'আমাকে বললি নাকি?'
'তোর মতো গরিবকে কে বলবে... সামনে যা!'
'ইবনুল হাইসাম অপটিক্স আর চোখের গঠনসংক্রান্ত বিজ্ঞানকে আলাদা করে দেখেছেন। তিনি উদ্‌ঘাটিত করেন কীভাবে আমরা দেখি। দিগন্তে চাঁদ-সূর্যকে বড়ো কেন দেখায়, তার সমাধান তিনি বের করেন। এটা আসলে আমাদের মস্তিষ্কের ভ্রম। ট্রপস্ফিয়ারের দূরত্ব নির্ণয় করেছেন সমুদ্র সমতল থেকে ১৬ কিলোমিটার। আধুনিক হিসাবে যদিও গড়ে ১৩ কিলোমিটার, কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া এত দূর আসাও-বা কম কী? সূর্য দিগন্তের ১৯ ডিগ্রি নিচে থাকা অবস্থায় টোয়াইলাইট হয়—এটা ওই সময়ে তার গবেষণার ফল। ইতিহাসে এসব উল্লিখিত বিষয়সমূহের প্রথম হিসাব।'
'টোয়াইলাইট সিরিজ তো এই কয়েক বছর আগের মুভি।' আমি বললাম। 'উফ!' তারিক বলল—'টোয়াইলাইট মানে গোধূলি, গোধূলি! এখন আবার বলি গোধূলি! গোধূলি!'
সিনান অধৈর্য হয়ে বলল—'আহ! বারবার প্রসঙ্গ ঘোরাস কেন? ফিজিক্স বইয়ে ঢুকি, চল। প্রতিসরণের অধ্যায়ে স্নেলের নাম দেওয়া আছে না প্রতিসরণের দ্বিতীয় সূত্রের জন্য? মূলত ইবনুল হাইসাম প্রায় এটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। কর্ড ব্যবহার না করে ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করলেই তিনি সেখানে পৌঁছে যেতেন। তবে তার আগে ইবনে সাহল এটি প্রমাণ করাতে সফল হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো জিম আল খালিলির মতে স্নেলের সূত্রকে ইবনে সাহলের সূত্র বলা উচিত। ২০১৮ সালের নতুন বইয়ে আবার ফ্রেনেলের নাম এসেছে।
যাহোক, ইবনুল হাইসাম থেকে যে প্রতিসরণ আর প্রতিফলন দুটিরই নিয়ম এসেছে—তার জন্য তো তাকে সম্মান দেওয়া হলো না। আলো সরল পথে চলার ধারণা তো প্রতিষ্ঠিত করেছেনই, প্রতিফলনের সূত্র দুটো আর প্রতিসরণের প্রথম সূত্রও দিয়েছেন; ইভেন দ্বিতীয়টাও প্রায় প্রতিষ্ঠিত করেই ফেলেছিলেন। প্রতিসরণের অন্যান্য মৌলিক জিনিস তো আছেই। যেমন—বায়ু, পানি, গ্লাস ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর গতির কারণে কীভাবে প্রতিসরণ হয়—তা বের করেন। ক্যামেরা অবসকিউরা নিয়ে ইবনুল হাইসামের অসাধারণ কাজের কথা তো লাইব্রেরিয়ানের মুখ থেকেই শুনেছিলাম। লিউয়েনহোয়েকের মাইক্রোস্কোপ আর গ্যালিলিও'র টেলিস্কোপ বানানোর পথ তিনি করে দেন ইবনুল হাইসাম। এত কিছুর পরও আলোর অধ্যায়গুলোতে তার নাম দেওয়া হলো না! কাজটা কি ঠিক হলো?'
'চল, আলো ছেড়ে এগিয়ে যাই। তিনি কোট্যানজেন্টের সূত্র দেন, ক্যালকুলাসের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করে তিনি মত দেন এটা বায়ুমণ্ডলের চেয়ে অনেক দূরে। গ্র্যাভিটি সম্পর্কেও জানতেন। আসলে তিনি একা নয়; আরও কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী মহাকর্ষ নিয়ে লেখালিখি করেন। ইবনুল হাইসাম এক ভরের বস্তু দিয়ে অন্য ভরের বস্তুকে আকর্ষণের ব্যাপারটি লিখেন। মানে, মহাবিশ্বের প্রত্যেক বস্তু আরেক বস্তুকে আকর্ষণ করার ওই সূত্র আরকি।'
'হুম, বুঝতে পেরেছি।' তারিকের জবাব।
সিনান মুখে মুচকি হাসি রেখে বলতে থাকল— 'যেসব জিনিস ইবনুল হাইসাম করে ফেলেছিলেন, কিন্তু তার অনেক পরে অন্যান্য বিজ্ঞানীরা তা করেন এবং সেসব তাদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তন্মধ্যে কয়েকটি Wilson's Theorem, Principle of Inertia—নিউটনের গতির প্রথম সূত্র, Fermat's Principle of Least Time, Ruffini-Horner Algorithm, Cauchy-Riemann integral-এর একটা সহজ রূপ, Stiles-Crawford Effect, Aguilonius's Horopter, Helmholtz's Principle of Unconscious Inference, Hering's Law of Equal Innervation, Panum's Fusional Area, Bloch's Law.'
'বলছিস যে এত কিছু, সব কি বুঝিস?' আমি বললাম।
'না সব...'
তারিক বলতে দিলো না—'হে হে! শান্তি পাইলাম।'
সিনান মূল আলোচনা চালিয়ে গেল—'এখানে ফারম্যাটের যে নীতিটা আছে, সেটা আমরা এইচএসসির ফিজিক্স সেকেন্ড পেপারে পাব। সেখানেও স্বাভাবিকভাবেই ইবনুল হাইসামের নাম পাবি না।'
আমি বললাম—'তোকে আগেও দেখেছি এইচএসসির বই তুলে আনতে। ভাইরে ভাই, এখনই এইচএসসির পড়া পড়িস? আমরা এখানে কেবল এসএসসি নিয়েই কূল-কিনারা পাচ্ছি না।'
সিনান হেসে দিয়ে বলতে থাকল—'ইবনুল হাইসাম চোখের পরিপূর্ণ বর্ণনা দেন। স্পষ্টভাবে চোখের বিভিন্ন অংশ আলাদা করেন। স্ক্লেরা, কর্নিয়া, করয়েড, আইরিস, রেটিনা, অপটিক নার্ভ, অ্যাকুয়াস হিউমার, ভিট্রিয়াস হিউমারের ব্যাখ্যা দেন। বস্তুর প্রতিবিম্ব চোখের রেটিনায় গঠিত হওয়ার কথা বলেন। Lens শব্দটি ইবনুল হাইসামের দেওয়া অ্যারাবিক নাম "আদাসা” থেকে এসেছে। কর্নিয়াও এসেছে কারনিয়া থেকে। চশমা আর ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাস তৈরির পথিকৃৎ তিনিই। বর্তমানের ক্যামেরা শব্দটি এসেছে তার দেওয়া অ্যারাবিক "কামারা” থেকে। অনেক কিছু বুঝতে না পারায় এখন সেগুলো বলতে পারলাম না। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে বুঝব।
এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ভার্সিটিতে ইবনুল হাইসামের রেফারেন্স দেওয়া হয়। আর বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশে তার নাম লুকানো হয়। তার অপটিক্সের বই কিতাব আল মানাজির সেই বিপ্লব টের পাওয়া বই। J.F. Allen-এর মতে, ১০ম শতাব্দীতে ইবনুল হাইসামের ২০ শতাব্দীর মস্তিষ্ক ছিল। আর দেখ, এখানে কত কিছু পরে নিউটনের নামে গিয়েছে। ক্যালকুলাস, গ্র্যাভিটি, জড়তার সূত্র। নিউটনের বিখ্যাত পরীক্ষার কথা শুনেছিস না? একটা প্রিজম দিয়ে সূর্যের আলোর সেই পরীক্ষা—এটা ইবনুল হাইসাম আগেই করেছিলেন।
নিরাশার হাসি নিয়ে আমি বললাম—'আইজ্যাক নিউটন স্যার বলেছিলেন—"If I have seen further, it is by standing on the shoulders of giants." যদি জানতে পারতাম এই দানবগুলো কারা!'
তারিক আমাকে আশা দিতে চাইল—'নিউটন তো ইবনুল হাইসামের বই পড়েও থাকতে পারেন। তার আগের সেরা সেরা বিজ্ঞানীরাও তো পড়েছিলেন—কেপলার, দেকার্ত, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও। আর নিউটনের লেখায় তো ইবনে তোফায়েলের স্পষ্ট ছাপ আছে।'
'কিন্তু...'
সিনান মুচকি হেসে বলল—'নিউটন তার লাইব্রেরিতে ইবনুল হাইসামের বই রেখেছিলেন।'
'কি! আসলে?'
'হ্যাঁ।'
মুখে স্বভাবসুলভ হাসি ফুটিয়ে বললাম—'তাহলে নিউটনের আইডিয়াগুলো গাছের ওই আপেল থেকে পড়েনি! ইবনুল হাইসামের বই শেলফের যে তাকে রাখা ছিল, সেখান থেকে পড়েছে!'

টিকাঃ
১. Michael H. Morgan p: 97, 104; Salim al-Hassani op. cit. p: 56, 306; Howard R. Turner, Science in Medieval Islam: An Illustrated Introduction. (University of Texas Press, 2006) p: 197
২. Michael H. Morgan, p: 105 (ibn al-Haytham must be considered an equal of Einstein, though largely lost to history)
৩. Bradley Steffens, Ibn Al-Haytham: First Scientist (Morgan Reynolds Publishing, 2007); Salim al-Hassani op. cit. p: 55; Michael H. Morgan p: 103; David C. Lindberg. 'Candidates for Revolutionary Status' in The Beginnings of Western Science op. cit.
৪. Kara Rogers op. cit. p: 38
৫. Salim al-Hassani op. cit. p: 55
৬. Ertan Salik. 'ibn al-Haytham: First Scientist' The Fountain Magazine.
৭. Robert Briffault, The Making of Humanity p: 201: Knowledge of Arabic and Arabian Science was for his contemporaries the only way to true knowledge.
৮. এখানে আরবি জ্ঞান বলতে ইসলামি জ্ঞান উদ্দেশ্য। রজার বেকন জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলামকে গুরুত্ব দিলেও ধর্মের দিক থেকে ইসলামের প্রতি বিরূপ মানসিকতা ধারণ করতেন।
৯. J. al-Khalili, Pathfinders loc. 3403
১০. Roshdi Rashed (edt), Encyclopedia of the History of Arabic Science (Routledge, 1996), vol. 2, p: 350.
১১. Howard R. Turner, Science in Medieval Islam op. cit. p: 196.
১২. Science in a Golden Age (AlJazeera) এর optics অংশ দেখুন। ইবনুল হাইসামের কিছু পরীক্ষা প্র্যাক্টিক্যালি দেখতেও পারবেন এখানে।
১৩. 'Medieval Science among the Arabians' in H. S. Williams and E. H. Williams, A History of Science (Harper and Brothers, 1904)
১৪. Seyyed Hossain Nasr, p: 129
১৫. Science in a Golden Age (AlJazeera)-এর optics অংশ দেখুন।
১৬. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 335.
১৭. M. Shamsher Ali, p: 107
১৮. M. Shamsher Ali, p: 110
১৯. বিস্তারিত জানতে, Roshdi Rashed, vol. 2, p: 318, 336.
২০. Howard R. Turner, Science in Medieval Islam: An Illustrate Introduction. p: 196.
২১. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী, ইসলামি বিশ্বকোষ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন দ্বিতীয় সংস্করণ, জুন ২০০৪), খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা: ৬৫২ থেকে
২২. Ehsan Masood, p: 145; Michael H. Morgan, p: 104.
২৩. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 4, p: 653
২৪. Michael H. Morgan p: 104.
২৫. The theorem is: if p is prime, then the polynomial 1+(p-1)! is divisible by p. Salim al-Hassani, p: 85.
২৬. সূত্রটি হলো : বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু সুষম দ্রুতিতে সরল পথে চলতে থাকবে। Seyyed Hossain Nasr, p: 128
২৭. সূত্রটি হলো: যে পথে গেলে সর্বাপেক্ষা কম সময় লাগে, আলো সে পথই অবলম্বন করে। M. Shamsher Ali, ১১২; আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী vol. 4, p: 651; Arun Bala, The Dialogue of Civilizations (Palgrave Macmillan, 2006) p: 165.
২৮. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 51
২৯. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 97; Ian P. Howard. 'Alhazen's Neglected Discoveries of Visual Phenomena' Perception. 25 (1996), pp: 1203-1217.
৩০. Michael H. Morgan, p: 103
৩১. M. Shamsher Ali, p: 263.
৩২. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 4, p: 651.
৩৩. ইবনুল হাইসামের পরীক্ষা প্র্যাক্টিক্যালি দেখতে চাইলে : J. al-Khalili 'Science and Islam on BBC Four, (Oxford Scientific Films) এ ছাড়া দেখুন Science in A Golden Age-এর optics অংশ।
৩৪. নিউটনের ওপর মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রভাব সংক্ষেপে পড়ুন : আরমান ফিরমান। 'স্যার আইজ্যাক নিউটনের ওপর মুসলিম প্রভাব'।।
৩৫. Salim al-Hassani, p: 35.
৩৬. মুসলিম বিজ্ঞানীদের থেকে নিউটনের নেওয়ার ব্যাপারটি জর্জ সারটনও উল্লেখ করেন (পরোক্ষভাবে) : Introduction to the History of Science Vol. 3.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 মেকানিক্যাল মাইন্ড : মধ্যযুগে রোবটিক্স

📄 মেকানিক্যাল মাইন্ড : মধ্যযুগে রোবটিক্স


'রোবট! এদিক আয়।'
রোবট বলে ডাকে সবাই, খারাপ লাগলেও বাস্তবতা মেনে নিলাম। কিন্তু এত কাছের বন্ধু যদি এমন করে, তাহলে খুব খারাপ লাগে। তা-ও ক্লাসের মধ্যে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ডাকছে!
তারিক বলল—'সম্মানিত সহপাঠীবৃন্দ! আমরা এখানে যে অসাধারণ যন্ত্রটি দেখতে পারছি...' সবাই হেসে উঠল। '....এটির আবিষ্কারক বদিউজ্জামান আল জাজারি। এই রোবটজাতির সূচনা হয়েছিল তারই হাতে...' সবাই আবার হেসে উঠল। 'এই... এইক... এটা তো হাসার কিছু না... সত্য ইতিহাস।' এবার কেউ হাসল না, কিন্তু আমি হেসে উঠলাম।
সিনান তারিককে সমর্থন দিলো—'না, হাসছিস কেন তোরা? তারিকের কথা ঠিক আছে তো।' সবাই অবশেষে মনোযোগ দিলো।
ভালো ছাত্র হওয়ায় সবাই সিনানকে দাম দেয়—'ইতিহাসের প্রথম রোবট, আশ্চর্যজনক কিছু যন্ত্র—যেগুলো পানি পরিবেশন করত, বাদ্য বাজাত নিজে নিজে। তিনিই সর্বপ্রথম এমন যন্ত্র তৈরি করেন, যেসব এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারত। তিনি বানিয়েছিলেন রোবটদের একটি ব্যান্ড; রাজকীয় মেহমানরা এলে সেসব ছেড়ে দেওয়া হতো। তিনি ময়ূরের মতো দেখতে কিছু রোবট বানিয়েছিলেন, সেগুলো অজুর পানি ঢেলে দিত এবং মানুষ অজু করতেন। কিছু কিছু রোবট আবার তোয়ালাও দিত!'
'কী পাগলামি! মধ্যযুগে অটোমেটেড মেকানিক্স? রোবট!' বলল কেউ কেউ।
সিনান নাটকীয়তা বাদ দিয়ে মুচকি হেসে বলল— 'বদিউজ্জামান ইবনে ইসমাঈল আল জাজারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন মাস্টারমাইন্ড, বুঝলি? তার বইয়ে ৫০টিরও বেশি অসাধারণ যন্ত্রের বর্ণনা আছে। ছোটো থাকতে একদিন খেয়াল করলেন, হাত পায়ের মতো ছোটো ছোটো জিনিস মিলে যেমন একটি দেহ গঠিত হয়, তেমন ছোটো ছোটো মেকানিক্যাল জিনিস একত্র করলে অনেক বড়ো কিছু হয় বা অসাধারণ কিছু হয়। তার বেশিরভাগ যন্ত্র অবশ্য পানি আনা-নেওয়া রিলেটেড। ঘড়ি বানাতেও তিনি সেই রকম দক্ষতা দেখান। ইতিহাসের সেরা একটা আবিষ্কার স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের হাতে অনেক চমৎকার মেকানিক্যাল ঘড়ি তৈরি হয়। এখন তো আমাদের হজম করানো হয়, ইউরোপে ১৪শ শতাব্দীতে অটোমেটেড ঘড়ির আবিষ্কার হয়। এটা বিরাট ভুল। ইউরোসেন্ট্রিক স্কলাররা এ কথা বলে ঠিক আছে, কিন্তু আবার অন্য মুখে স্বীকার করে—কে আবিষ্কার করেছে, তার কোনো আইডিয়া তাদের নেই।' কয়েকজন হেসে দিলো।
'অটোমেটেড জিনিসপাতি অনেক আগে থেকেই ছিল; গ্রিকদের মাঝে, চাইনিজদের মাঝে। ইউরোপে মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে অটোমেটেড ঘড়ি পৌঁছায়। অবশ্য ইন্ডিয়ান ট্র্যান্সমিশন রুটও আছে। কিন্তু ইউরোপে জিনিসটার উৎপত্তি একেবারে ফাঁকা কথা।
আল জাজারি অনেক ধরনের ঘড়ি বানিয়েছিলেন। Elephant Clock, Candle Clock, Citadel Clock, Clock of the Boat, Castle Clock, Peacock Clock হলো বিভিন্ন ধরন। সবগুলোর মূল প্রিন্সিপাল একই—প্রেশারাইজড পানি ব্যবহার করে এসব অটোমেটেড করা হয়। সবগুলোই Water Clock; ডিজাইনে ভিন্নতা। ডিজাইনে ভিন্নতা আনতে গিয়ে অবশ্য টেকনোলজিক্যাল প্রয়োগ ও পরিবর্তনেও সৃজনশীলতা আনতে হয়। তিনি অ্যাস্ট্রনমিক্যাল ক্লক বানিয়েছিলেন—যা সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহের মুভমেন্টের সময় প্রদর্শন করত। ঘড়ি নিয়ে তার ম্যাগনাম ওপাস আল জামি বাইনাল ইলম ওয়াল আমালুন-নাফি ফি সিনাআত আল হিয়াল গ্রন্থে তিনি ১০টি অধ্যায় লিখেছেন।
তিনি রক্ত পরিমাপের একটা যন্ত্রও বানিয়েছেন। এর আগে ইতিহাসে রক্ত পরিমাপ করতে পারে এমন কোনো যন্ত্রের রেকর্ড নেই। আরবের কনটেক্সটে তার আবিষ্কারের অনেকগুলোই ওয়াটার পাম্প। তার বানানো যন্ত্র দিয়ে কোনো আঙুল নাড়ানো ছাড়া বিপুল পরিমাণে পানি তোলা যেত। মেকানিক্স জটিল বিষয়। এসব বুঝতে ভয়ংকর প্যারা খেতে হয়। তাই তার যন্ত্রগুলোর বর্ণনা দিতে পারলাম না। শুনলে বুঝতি তার ট্যালেন্ট। যেমন—তিনি Double acting principle-এর অগ্রদূত। কিন্তু এটা কী, আমি ঠিক বুঝি নাই। তোরা কেউ জানতে পারলে জানাস।'
খসখস করে কোথাও কাগজে কিছু লেখার শব্দ হলো। কেউ মনে হয় টুুকে নিয়েছে।
সিনান বলে চলল—'তিনি চাষিদের জন্য এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, যার কথা তারা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারত না। তার অভিনব ওয়াটার পাম্পের কারণে পাইপের মাধ্যমে পানি চাষিদের জমি পর্যন্ত চলে যাচ্ছিল! সেট করা টাইম পরপর পানি আসত। মুসলিম বিশ্বে পুরো বিপ্লব ঘটে যায় এসব পাম্পের ফলে। হাসপাতালের রোগী হোক কিংবা মসজিদের মুসল্লি, সবার জন্য পানি রেডি। কারও নদী পর্যন্ত হেঁটে যেতে হতো না। তিনি এর জন্য Suction Pipe, Suction Pump, Double-Acting Pump এবং Double Acting Piston Cylinder Pump আবিষ্কার করেন।'
'তোরা যাদের মুসলিম বিজ্ঞানী বলিস, এরা কেউ আসলে হুজুর টাইপ না।' দিলিপ বলল—'ধর্মকর্ম করতে গেলে বিজ্ঞান হয় না।'
সিনান জবাব দিলো— 'একটু দ্বিমত আছে। বদিউজ্জামান আল জাজারি ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন। বলা বাহুল্য, মেকানিক্স ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষের দুআ কামিয়েছেন তিনি। একজন মানুষ বিজ্ঞান করে কীভাবে জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে পারেন, তার আদর্শ উদাহরণ তিনি। ক্যারোলিন অ্যালউড সরাসরি বলেছেন—“জাজারির চমৎকার আবিষ্কারের পেছনে কুরআনের বিশাল প্রভাব আছে।”'
এমন সময় যথারীতি স্যার এসে আমাদের সকল মজা পণ্ড করে দিলেন।
টিফিন টাইম এখন সিনান লেকচার টাইম! ক্লাসের প্রায় পনেরো-বিশজন এখানে আছি, সবার দৃষ্টি সিনানের দিকে নিবদ্ধ। আমাদের এখন খাবারের খিদে নেই; শুধু জানার খিদে আছে। প্রথমেই প্রশ্নের সম্মুখীন— 'সিনান, তুই আর যা-ই বলিস, এই রোবটের ব্যাপারটা বিশ্বাস করা কোনোমতেই সম্ভব না।' অর্ণব বলল।
সিনান কিছুটা জোরে হেসে দিয়ে বলল— 'অটোমেটেড জিনিসপাতি মুসলিম বিশ্বে নতুন কিছু তো নয়। এর আগেও তো বনু মুসা এই ফিল্ডে খেলা দেখিয়েছেন। তবে প্রথম ঘটনা সম্ভবত সুদূর উমর-এর সময়। পারস্য থেকে আসা একজন উমর-কে বলল, সে বাতাস ব্যবহার করে মিল বানাতে পারবে। সেই সময় ৭ম শতকেই মুসলিম বিশ্বে উইন্ডমিল ছিল। বর্তমানে আমরা ইলেক্ট্রিসিটি ইউজ করি, তখন সবচেয়ে সফিস্টিকেটেড টেকনোলজি চলত উচ্চচাপে থাকা বাতাস ও পানি দিয়ে। প্রিন্সিপাল একই। উনিশ শতক পর্যন্ত এর তুলনায় উন্নত টেবিল ইউরোপেও ছিল না। এবার মজার একটা ঘটনা বলি শোন, হারুনুর রশিদ এর সময় তিনি ইউরোপের ইতিহাসের সেরা শাসক শারলামেইনকে কিছু উপহার পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি ওয়াটার ক্লকও ছিল।'
'আর আবু আব্বাস নামের একটি হাতি!' তারিক হেসে দিয়ে বলল।
'হ্যাঁ। যাহোক, শারলামেইন আর তার অফিসারদের তো চোখ ছানাবড়া। শারলামেইনসহ সবাই ধরেই নিল, ঘড়িটা কোনো জাদুকরি যন্ত্র!'
'হা হা! ইউরোপের সর্বকালের সেরা শাসকদের একজনের এই অবস্থা। মুসলিমদের বানানো সিম্পল একটি যন্ত্রকে জাদু ভেবে বসে আছে। কত্ত পিছিয়ে ছিল ইউরোপ!' তারিকের কথায় অনেকে হেসে উঠল। অনাগ্রহী কয়েকজন উঠে চলে গেল। আমরা পাত্তা দিলাম না।
'মাত্র ৩০০ বছরের ভালো অবস্থা দেখে আমরা ভেবে বসে আছি—তারাই সব।' আমার কথায় আবার সকলে গম্ভীর হলো।
সিনান চালিয়ে গেল—'তো এখানে অবিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই। মানে এগুলো মুসলিমদের কোনো নস্টালজিক দাবি না, আর এসব বলছে নন-মুসলিমরাই। মুসলিম মেকানিক্সের সবচেয়ে সেরা ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড হিল, নন-মুসলিম। একাডেমিক লেভেলে মুসলিম-অমুসলিম স্কলার দিয়ে বেশি কিছু যায়-আসে না, বুঝেছিস? কে কী পরিমাণ স্কলারলি কাজ করেছে, কার কাজের স্টাইল কী রকম, কোন মাত্রার পরিশ্রম করতে পারে—সেসব দেখে বোঝা যায়, কার লেভেল কোথায়, বিশ্বাসযোগ্য কি না। মুসলিম হলে বায়াসড, অমুসলিম হলে বিশ্বাসযোগ্য অথবা অমুসলিম হলে বায়াসড, মুসলিম হলে বিশ্বাসযোগ্য—এসব বোকামি ও অগভীরতা। কাজ দেখে বুঝতে হবে—কে কী রকম। হিলের জায়গায় কোনো মুসলিম স্কলার যদি থাকত—যার অ্যাকমপ্লিশমেন্ট হিলের মতোই, তবে তারটা অবশ্যই একই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হতো।
বদিউজ্জামানের সবচেয়ে সেরা আবিষ্কার কী জানিস? The Crankshaft। পৃথিবী পালটে দেওয়া জিনিস একখান। অনেকটা ইংরেজি এল-এর মতো দেখতে একটা দণ্ড-হাতল টাইপের; ঘোরানো যায়। খেলনা থেকে শুরু করে বিশাল বিশাল যন্ত্র—সব মেকানিক্যাল ডিভাইসের মধ্যেই ক্র্যাঙ্ক থাকে। এটা ছাড়া যন্ত্রগুলো সচল হতো না। মানে... কী বলে যে এই মানুষটার প্রশংসা করব, বুঝে উঠতে পারছি না! কতগুলো রেভোল্যুশনারি আবিষ্কার করেছেন তিনি? তার ওয়াটার পাম্পিং মেশিন, ঘড়ি, ক্র্যাঙ্ক Absolutely brilliant। আমরা তার নাম জানি না, কীভাবে ম্যান?'
বিরতি। মানে, স্যার এসে গিয়েছেন!
ছুটির ঘণ্টা বাজল। আমরা কয়েকজন অবশ্য সিনানের ওখানে।
‘কিছু স্কলার জাজারিকে Cybernetics-এর প্রথম কারিগর বলে উল্লেখ করেন। যেসব যন্ত্র জীবিত প্রাণীর মতো আচরণ করে, তাদের স্টাডিকে সাইবারনেটিক্স বলে। এখানে যন্ত্র ও মানুষের মাঝে আদান-প্রদানকে ফোকাস করা হয়। তিনি তার হিউম্যানয়েড রোবটগুলো যেভাবে কন্ট্রোল করতেন, তা সাইবারনেটিক্সের মধ্যে পড়ে—যা তাকে এই ফিল্ডের প্রথম টেকনোলজিস্ট বানায়। এর আগে অবশ্য এই টাইপের কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়, তবে সেসব তেমন উন্নতমানের ছিল না। জাজারিকে প্রথম ধরতে অনেকের সমস্যা যদি হয়ও, একজন অগ্রদূত ধরতে কারও সমস্যা হবে না। জাজারিরটাকে সাইবারনেটিক্সের ইতিহাসে Hydropower Cybernetics নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর আগে অটোমাটা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে মূল কাজ করেছেন বনু মুসা ব্রাদার্স। মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানীগণ তাদের পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের কাজের ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলেন না। কন্টিনুইটি দেখা যায়, জাজারি বনু মুসার কাজের ওপর বিল্ড করেন। কিছু জায়গায় তাদের কাজের ভুলগুলো ধরিয়ে দেন। মেকানিক্সের ক্ষেত্রে জাজারি গ্রেকো-রোমান মেথোডোলজি ভেঙে দেন। গ্রিক ও রোমানরা কেবল সিম্পল কিছু ডিভাইস তৈরি করত—যা একমুখী। জাজারি ক্যামশ্যাফট ব্যবহার করে ক্র্যাঙ্কের গতিমুখ পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। জাজারিরটা Sequential Automata। তার কাজের মাধ্যমে মেশিনারির ওপর অত্যাধিক কন্ট্রোল স্থাপিত হয়।
সিনান উপসংহার টানল—'মাইকেল এইচ মরগান আল জাজারিকে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু এটা ঠিক না, যা বুঝি। জাজারিকে আরও সেরা হিসেবে দেখি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের বীরত্ব দেখাতে গিয়ে অন্যদের নিচে নামানো ঠিক না, কিন্তু দ্যা ভিঞ্চিকে যে অতুলনীয় সুপারস্টার বানানো হয়, তিনি সেটা না। ইতিহাসবিদ জেমস ফ্র্যাঙ্কলিন বলেন—"Leonardo's published jottings on mathematics are trivial, even puerile, and show no mathematical talent whatever।" অর্থাৎ, গণিত নিয়ে জট পাকানো কাজসমূহ একেবারে নিম্নমানের, গাণিতিক উৎকর্ষের কিছুই নেই।'
কিন্তু বদিউজ্জামানের কাজগুলো প্র্যাক্টিক্যাল, এগুলো আজ পর্যন্ত জীবিত। অবশ্য, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সাথে তুলনা করার কারণ বুঝেছি, বদিউজ্জামান একজন অসাধারণ আর্টিস্টও ছিলেন। সমান দক্ষতায় নিজের যন্ত্রগুলোর ছবি এঁকে রেখেছিলেন। তবে পার্থক্য হলো—বদিউজ্জামান যা এঁকেছেন, তা নিজেই করে দেখিয়েছেন। আর লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি যা এঁকেছেন, তা অন্যরা করেছে। সম্মান অবশ্য দ্যা ভিঞ্চির এক-তৃতীয়াংশও পান না। বদিউজ্জামান আল জাজারিকে হয়তো দুনিয়ার মানুষরা চেনে না, কিন্তু তার নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে প্রতিটি ক্র্যাঙ্কে, অদৃশ্যভাবে।'

টিকাঃ
১. Hank Green, 'The Medieval Islamicate World-Crash Course History of Science #7' online video, Crash Course; Mahmut Dirik, 'al-Jazari: the Ingenious Inventor of Cybernetics and Robotics' Journal of Soft Computing and Artificial Intelligence. 1:1 (2020), pp: 1-12.
২. Howard R. Turner p: 188
৩. Salim al-Hassani op. cit. p: 50
৪. Roshdi Rashed, p: 794
৫. Donald R. Hill, Studies in Medieval Islamic Technology (Routledge, 1998) p: 23; John M. Hobson, 131.
৬. Yavuz Unat. 'Overview on al-Jazari and his Mechanical Devices' Muslim Heritage; Mahmut Dirik. Op. cit.
৭. Howard R. Turner, p: 166.
৮. Salim al-Hassani, p: 122.
৯. Science in a Golden Age-এর Mechanics অংশ দেখুন। এখানে কিছু কাজ প্র্যাক্টিক্যালি করেও দেখানো হয়েছে। Fuat Sezgin, Science and Technology in Islam (tr. Renate Sarma and Sreeramula Rajeswara Sarma, 5 vols, Institut für Geschichte der Arabisch-Islamischen Wissenschaften Westendstrasse, 2010) 5: 49-56 এ অনেক যন্ত্রের ক্লাসিক্যাল ও মডার্ন ছবি পাবেন বর্ণনাসহ। Michael H. Morgan p:173
১০. Roshdi Rashed, p: 790; Howard R. Turner p: 181.
১১. Cem Nizamoglu. 'Ingenious Clocks from Muslim Civilization that Defied the Middle Ages' Muslim Heritage.
১২. Cem Nizamoglu. 'Amazing Mechanical Devices from Muslim Civilization' Muslim Heritage.
১৩. 'Water Supply' in 'Market' in Salim al-Hassani op. cit.; Sally Ganchy and Sarah Gancher, Islam and Science, Medicine, and Technology (The Rosen Publishing Group, 2009) p: 41; বুঝতে [১] দেখুন; Mahmut Dirik op. cit;
১৪. Mahmut Dirik.; G. Nadarajan. 'Islamic Automation: A Reading of al-Jazari's The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices (1206)' Semantic Scholar.
১৫. G. Nadarajan op. cit.
১৬. 'Leonardo da Vinci' in Kara Rogers op. cit.
১৭. E. T. Bell, (New York: Dover Publications, 1992)

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 সার্জারির স্যার

📄 সার্জারির স্যার


তারিক আর আমি এসেছি স্কুল ক্যান্টিনে। সিনান আরেকটু পরে আসার কথা বলেছিল। জিয়েলিনস্কি আর ওয়াইবেলের Allah's Automata বইটি পড়ে বসে বসে।
কিছুক্ষণ পর এলো সে। এসেই বলল—‘আচ্ছা, লাইব্রেরিয়ান আমাদের কোন কোন বিজ্ঞানীর নাম যেন বলেছিলেন?’
আমি বললাম—‘আ... আব্বাস ইবনে ফিরনাস, আবুল কাসিম আল জাহরাউই, ইবনুল হাইসাম, মারইয়াম আস্তুরলাবি আর...’
‘বদিউজ্জামান আল জাজারি!’ তারিক বলল।
‘ঠিক আছে।’ সিনান বলল—‘আজ তাহলে আবুল কাসিম আল জাহরাউই হয়ে যাক।'
আমি উৎফুল্ল হলাম, ‘Oh yeah!’
একটি মাদরাসার লাইব্রেরিতে দেখা হওয়ার কথা রইল।
অনেক দূর আসতে হলো লাইব্রেরির জন্য। এলাকায় কোনো লাইব্রেরি নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করে একটার পর একটা মসজিদ বানায়, কয়েক হাজার টাকা খরচ করে একটা লাইব্রেরি বানাতে পারে না। লোকজন এলাকায় তিন-চারটি মসজিদ থাকলে আরও একটা মসজিদই বানাবে; ইসলামি লাইব্রেরি বানাতে কেউ ইচ্ছুক নয়।
‘আবুল কাসিম আল জাহরাউই সার্জারির পথিকৃৎ। আমাদের দেশে অবশ্য জনক শব্দটা চলে বেশি। তার কিতাবুল তাসরিফ-এর শুধু এক খণ্ড সার্জারি নিয়ে। এই এক খণ্ডেই বাজিমাত। ২০০-এর বেশি যন্ত্রের বর্ণনা আর ৩২টি রোগের আলোচনা আছে। যন্ত্রগুলোর অধিকাংশই তার নিজের আবিষ্কার। সার্জারির যত Do's and Don'ts আছে, প্রায় সবগুলোই বর্ণিত হয়েছে এই কিতাবে। বইয়ের এই খণ্ডটি ল্যাটিনে অনুবাদ হয়। পরের ৫০০ বছরেও বেশি সময় ধরে ইউরোপে বিশাল প্রভাব ছিল এর। রেনেসাঁসের পরেও আধুনিক পর্যায়েও তাঁর কিছু যন্ত্রপাতি আর আবিষ্কার আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। এই বইটাতেই প্রথমবারের মতো ছবি এঁকে সার্জারি বোঝানো হয়েছে। ইতিহাসে এর আগে কোনো বইয়ে এমন করে নেই।’
'অহম!' আমি বললাম।
‘রক্তক্ষরণ না থামলে ওটাকে কী বলে, জানিস? Haemophilia। আবুল কাসিম প্রথম এই রোগের বংশীয় কারণ শনাক্ত করেন। তিনিই সর্বপ্রথম Ectopic বা ওভারীয় প্রেগন্যান্সি কে অস্বাভাবিক প্রেগন্যান্সি রূপে চিহ্নিত করেন। তিনি দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর জন্য ছোটো আকারের নল, Cannula-এর ব্যবহার দেখান। Aneurysm শিরা বা ধমনি ফুলে যাওয়া চিকিৎসা পদ্ধতি বের করেন তিনি। গ্যালেনও এর চিকিৎসা আগে করেছিলেন, তবে এটাকে টিউমার ধরা হতো। জাহরাউই বলেন—“একে টিউমার ধরা ভুল হবে।” স্বয়ংক্রিয় ক্ষত হওয়ার পরও যে এর নিরাময় সম্ভব, সেটি প্রমাণ করেন আল জাহরাউই। তিনি প্রথমবারের মতো উদরসংক্রান্ত বা Abdominal Surgery-এর বিস্তৃত বর্ণনা দেন। তিনি প্রথম সার্জন, যিনি সফলভাবে অস্ত্রোপচার সেলাই করেন। ধমনি বা শিরা থেকে রক্তক্ষরণ রোধ করার জন্য সফলভাবে Thermal cauterization প্রয়োগ করেন। Thyroidectomy অর্থাৎ থাইরয়েড গ্রন্থি সরানোর সার্জারি করা প্রথম সার্জন। শিরা পেঁচিয়ে যাওয়াকে ঠিক করতে তিনি করেন—Varicose Vein Surgery। তিনি অনেক ধরনের Amputation করেন। বাংলায় কী বলে একে? অঙ্গচ্ছেদ? অঙ্গচ্ছেদ বলে সম্ভবত। শরীরে পচে যাওয়া অংশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কেটে ফেলে দিতেন তিনি। ১ হাজার বছর আগে এসব এমন হাই কোয়ালিটিতে হতো সত্যি বিস্ময়কর।’
'কী রে, এত বেশি জায়গায় প্রথম কেন!'
‘এটা বাদেও Adenoids, Gynecomastia, Circumcision, Hermaphrodites, Imperforate anus, and Supernumerary and Webbed fingers-এর সৃজনশীল বর্ণনা দিয়েছেন জাহরাউই। Neurosurgery আর Neurological diagnosis-এরও পথিকৃৎ উনি। মাথায় আঘাত, খুলির ফাটল, মেরুদণ্ডসংক্রান্ত ব্যথা, মস্তিষ্কে তরল একধরনের পদার্থ নিঃসরণের ফলে মাথা বড়ো হয়ে যাওয়া—যা হলো Hydrocephalus, মস্তিষ্ক ও সুষুম্না কাণ্ডের শক্ত বহিঃঝিল্লির নিচে তরল প্রবাহ—যাকে বলে Subdural Effusion আর মাথাব্যথার চিকিৎসা করেন। Hydrocephalus-এর ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টভাবেই মস্তিষ্কের ভেতর তরল পদার্থের কথা উল্লেখ করেন। তিনি সিম্পল কিছু জিনিস ধরতে পারেন, যা তার আগের বেশিরভাগ শল্যচিকিৎসকরাই ধরতে পারেননি। অকারণে শরীরে ব্যথা হয় না; এটা রোগের লক্ষণ, মেরুদণ্ডে ফাটলের কারণে প্যারালাইসিস হতে পারে ইত্যাদি।
সার্জারির জন্য তিনি অসংখ্য যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। মূত্রনালির ভেতরে পর্যবেক্ষণ। গলা, কান ইত্যাদি অংশ থেকে বাইরের বস্তু সরানো ইত্যাদি কাজ করতে গিয়ে যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হয়। মূত্রথলির পাথর সরানোর জন্য বর্তমান সময়ের লিথোরাইটের মতো একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেন তিনি। তার এই পদ্ধতির কারণে লিথোটমির ব্যাপক উন্নতি হয়।'
'কী জিনিস এটা?' আমার জিজ্ঞাসা।
সিনান বলল—'মূত্রাশয় থেকে পাথর সরানোর একটা সিস্টেম। ইউরোপের পদ্ধতিতে তখন রোগী অনেক কষ্ট পেত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারাও যেত। আল জাহরাউই এমন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যেটায় মূত্রথলির ছিদ্র করাই লাগত না। নাকের ফিস্টুলার চিকিৎসায় তিনি Scraper আবিষ্কার করেন। দাঁত রিপ্লেস করা, দাঁতের পার্শ্ববর্তী স্থানের অর্থাৎ Periodontal disease-এর রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করা—এগুলোতেও তিনি ফার্স্ট। সাধারণভাবে তখন সার্জারির পর ইনফেকশন ঠেকানোর কোনো রকম চিন্তা ডাক্তাররা করত না। তবে জাহরাউই অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল কেমিক্যাল ব্যবহার করতেন সার্জারির পর। এমনকী তিনি রোগীর ওপর অ্যানেস্থেশিয়াও প্রয়োগ করতেন! তার যন্ত্রপাতিগুলো এই ১০০০ বছর পরও ছোটোখাটো কিছু পরিবর্তন করে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতই সূক্ষ্ম আর অ্যাকুরেট ছিল! ইউরোপে সার্জারির উত্থানে এই যন্ত্রগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত বেশি। '
'হয়েছে أخي হয়েছে। মাথা-টাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যা বলেছিস, এমনিতেই অনেক বেশি হয়ে গেছে...'
'চুপ থাক! কষ্ট করে মুখস্থ করেছি, এখন বলব। তার ক্যাটগাট আবিষ্কারের গল্পটা জোস। তিনি একদিন দেখলেন, তার গিটারের তারগুলো বাঁদরে খেয়ে ফেলেছে...'
'ডাক্তার আবার গিটারও বাজায়?' তারিক বলল।
'তো এখান থেকে তিনি গিটারের তারের উপাদানটা দিয়ে ক্যাটগাট বানান। বাঁদর যেহেতু জিনিসটা খেয়ে ফেলেছে, তাহলে নিশ্চয়ই জিনিসটা শরীরের ভেতর দ্রবীভূত হবে। ক্যাটগাট তো ব্যবহার করা হয় শরীরের ভেতরে সেলাই মারতে। এটা শরীরে দ্রবীভূত না হলে ঝামেলা আছে। আবুল কাসিমের মাথার বুদ্ধি দেখ! আবার মরা ফিটাস, বায়োলজি বইয়ে পড়েছি—এটি ভ্রূণ বিকাশের একটি স্তর, একে বের করে আনার জন্য একধরনের ফোরসেপসও আবিষ্কার করেন। তিনি প্রথম দিককার প্লাস্টিক সার্জনদের একজন।'
'মানে কী! তিনি প্লাস্টিক সার্জারি করেছিলেন?'
'হুম। পাতন আর ঊর্ধ্বপাতন পদ্ধতিতে ওষুধও বানিয়ে ফেলেছেন। এর কারণে পরে বিশালসংখ্যক ওষুধ বানানো সম্ভব হয়। লেড মনোক্সাইড, সাদা সিসা, লেড সালফাইড, পোড়া কপার, মারকাসাইট আয়রন সালফাইড, হলুদ আর্সেনিক আর প্রচুর ভিট্রিওল আর লবণ তৈরির প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেন উনি। ব্যথা নিরাময়ে তার ড্রাই প্রসেসিং-এর একটা মেথড ছিল—যা অত্যন্ত স্মরণীয় একটা কাজ। তার মতে, কসমেটিক্স হলো মেডিকেল সায়েন্সের বিষয়। তিনি একে বলতেন আইয়াত আল জিনাহ বা সৌন্দর্যের ওষুধবিজ্ঞান। বিভিন্ন ধরনের পারফিউম আর সলিড ডিওডরেন্টের আদিরূপ তার হাত দিয়েই এসেছে। '
তারিক হাসি দিয়ে বলল—'তাকেই তো দরকার!' হাসতে হাসতে ঘুসি মারলাম তারিকের কাঁধে।
সিনান অনবরত বলে চলেছে— 'আল জাহরাউই ৩০ খণ্ডের তাসরিফ-এর একদম শেষের খণ্ডটা শল্যচিকিৎসার। অন্যগুলোতে তিনি রোগবিদ্যা বা Pathology, অস্থি চিকিৎসাবিদ্যা বা Orthopaedics, Ophthalmology বা চোখের নানা হাবিজাবি, ওষুধসংক্রান্ত বিদ্যা বা Pharmacology, ডেন্টিস্ট্রি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, বাচ্চা পয়দা এই সব আলোচনা আছে। তার মতে, মেডিকেলের অন্য সব শাখায় খুব অভিজ্ঞ হওয়ার পরেই সার্জারি করতে যাওয়া উচিত। এটাকে তিনি চিকিৎসাবিদ্যার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ বলেন। এজন্যই শেষ খণ্ডে এটা আনা। পাক্কা ৫০ বছরের পরিশ্রমের ফল। বইয়ের মধ্যে তিনি ডাক্তার আর রোগীর মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। ওই সময়ে তার এই জিনিস নিয়ে লেখা অবাক করার মতো। টিচার হিসেবে ভালো ছিলেন। স্টুডেন্টদের নিজের সন্তান ডাকতেন। বলতেন, সব স্টুডেন্টেরই কুরআন, হাদিস, অ্যাস্ট্রনমি, ম্যাথ যে যা স্টাডি করে, সেসবে একটা লেভেলে এসে গেলে চিকিৎসাবিজ্ঞান স্টাডি করা উচিত।
Ambroise Pare, Emil Kocher, Guy de Chauliac, Harvey Cushing, Jacques Dalechamps এবং আরও অনেক ওয়েস্টার্ন সায়েন্টিস্ট পরবর্তী সময়ে যা করেছেন, তার অনেক কিছুই জাহরাউই একা একা আগে করে রেখে গিয়েছেন। এখানে কয়েকজন তার নাম নেন, বেশিরভাগ নেন না বা ইন্ডিপেন্ডেন্টলি কাজ করেছেন। জাহরাউই-এর বই তারা পড়েছেন কি না বা অন্য কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন কি না—সেসব ক্ষেত্রে অর্থাৎ এখনও তেমন ট্রান্সমিশনের কাজ হয়নি। তার টাইটেল হলো—Father of Modern Surgery, Chief of All Surgeons ইত্যাদি। স্পেনে বর্তমানে তার নামে একটি রাস্তাও আছে।'
আমি বললাম— 'أخي, তার কাজের কথাগুলো শুনে ছয়তলা ছাদ থেকে লাফ মারতে ইচ্ছে করছে!'
হঠাৎ খেয়াল হলো—১০ মিনিট লেট হয়ে গেছে! তিনজনে দৌড় দিলাম।

টিকাঃ
১. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol: 3, p: 653
২. Robert E. Krebs, Groundbreaking Scientific Experiments, Inventions, and Discoveries of the Middle Ages and the Renaissance (Greenwood Publishing Group, 2004) p. 95.
৩. Muhammad Abdul Jabbar Beg. 'The Origins of Islamic Science', Muslim Heritage.
৪. 'Abū al-Qāsim' Encyclopedia Britannica Online
৫. Michael H. Morgan, p: 203; Maria Do Sameiro Barroso. 'Albucasis: A Landmark for Arabic and European Surgery' Muslim Heritage.
৬. Sina Zarrintan et al. 'Abu Al-Qasim Al-Zahrawi (936-1013 CE), Icon of Medieval Surgery' Annals of Vascular Surgery. (2020), pp: 1-3.
৭. Paolo Missori, Giacoma M. Brunetto, and Maurizio Domenicucci. 'Origin of the Cannula for Tracheotomy During the Middle Ages and Renaissance'. World Journal of Surgery. 36:4 (2012), pp. 928-934; Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox, 95.
৮. Roshdi Rashed, p: 945; Sina Zarrintan, 2-3.
৯. Mehmet Turgut. 'Surgical scalpel used in the treatment of "infantile hydrocephalus" by Al Zahrawi (936-1013 A.D.)' Childs Nerv Syst. 25 (2009), pp: 1043-1044; Sina Zarrintan, 2; S. E. al-Djazairi op. cit.
১০. Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox op. cit.
১১. Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox op. cit.
১২. 'Instruments of Surgery' in 'Hospital' in Salim al-Hassani op. cit.
১৩. Ibid
১৪. Ibid; Maria Do Sameiro Barroso op. cit; Ali Osman Arslan et al. 'Albucasis: Founder of Catgut' Acta Medica Anatolia. 2:3 (2014), pp: 103-104.
১৫. Ibid; 'Instruments of Surgery' op. cit. বিভিন্ন চিত্রের জন্য দেখুন Fuat Sezgin, vol. 4.
১৬. Dr. Sharif Kaf al-Ghazal. 'Al-Zahrawi (Albucasis) the Great Andalusian Surgeon' Muslim Heritage.
১৭. 'Pharmacy' in 'Hospital' in Salim al-Hassani op. cit.
১৮. ibid
১৯. S. E. al-Djazairi op. cit.
২০. 'Pharmacy' in 'Hospital' in Salim al-Hassani op. cit.
২১. Dr. Sharif Kaf al-Ghazal op. cit; Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox op. cit.; Salim al-Hassani op. cit.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 দার্শনিক ব্যক্তিত্ব

📄 দার্শনিক ব্যক্তিত্ব


আমাদের স্কুলে নতুন এক ইসলাম শিক্ষা টিচার এসেছেন। নাম আব্দুল মাজিদ। স্যার অনেক লম্বা: ৬.২" হবে সম্ভবত। স্যারের দাড়িও ওই রকম লম্বা। স্যারের ক্লাস অনেক মজার, কথাবার্তা দারুণ। নতুন নতুন জিনিস শেখান।
ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইটি অবশ্য পড়ান না। প্রথম দিনই আমাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন—'তোমাদের কী ইসলাম পড়াব নাকি ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা?' তখন আমরাই বলেছিলাম ইসলাম পড়াতে। কিন্তু এবার তিনি ভয়ংকর একটি সিদ্ধান্ত আমাদের জানালেন—'তোমাদের প্রত্যেককে সামনে আসতে হবে এবং ইসলামের ওপর বক্তব্য রাখতে হবে। ইসলামের কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে। কুরআন, হাদিস, ইতিহাস, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাহলে দেখবে, অনেক কিছু শেখা হবে। ভুল হলে আমি ঠিক করে দেবো।'
তারিক আর আমার রোল তো পেছনে, কিন্তু সিনানের কী হবে? ওর রোল তিন! তার আবার আমার মতো সবার সামনে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গেলে পা কাঁপে। তারিকের অবশ্য কিছু কাঁপে না। তার আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, সাহস ভালোই আছে। সিনানকে অবশ্য দেখে নির্ভার মনে হচ্ছে।
যেহেতু রোল এক হিন্দু, তাই প্রথম বক্তা রোল দুই। এর বক্তব্য এক্কেবারে বাজে হলো। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বই থেকে মুখস্থ বুলি আওড়ে গেল শুধু। এবারে সিনানের পালা! তারিক আর আমি মুচকি মুচকি হাসছি। সিনান অবশ্য পুরো আত্মবিশ্বাস নিয়েই উঠে গেল, তেমনভাবেই বলা শুরু করল—
'বাদশাহ সাইফুদ্দউলার দরবার, সে সময়কার বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম এক আকর্ষণ। তিনি বুদ্ধিজীবীদের সকল ধরনের সুবিধাই দিচ্ছিলেন তখন। একদিন তার দরবারে বুদ্ধিজীবীদের আসর বসল। এমন সময় আবির্ভূত হলেন নতুন এক মানুষ; কালো জুব্বা পরা। সবাই তার সম্মানে দাঁড়ালেন, বাদশাহও। বাদশাহ তাকে বসতে বললেন।
ব্যক্তিটি প্রশ্ন করলেন— “আপনি আমার ব্যাপারে যা ধারণা রাখেন সে অনুযায়ী বসব, না নিজ যোগ্যতা অনুসারে বসব?”
বাদশাহ উত্তর দিলেন— “নিজ যোগ্যতা অনুসারেই বসুন।”
তিনি যেটা করলেন, বাদশাহকে সরিয়ে তার আসনে বসে পড়লেন! বাদশাহ তো মহাবিরক্ত। উজিরকে গোপন ভাষায় বললেন— “আমি এখন তাকে কিছু প্রশ্ন করব, সে যদি সেগুলোর উত্তর দিতে না পারে, তবে তাকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।”
দরবারে কেউ বাদশাহর কথাগুলো বুঝতে পারল না, তবে সেই ব্যক্তিটি ঠিকই উত্তর দিয়ে দিলেন। বাদশাহ তো অবাক! কাঁচুমাচু করে সে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি... আপনি এ ভাষাটি পারেন?”
“জি, আমি এই... ৭০টির মতো ভাষা পারি, মাত্র।”
পুরো দরবারে পিনপতন নীরবতা। সবাই একদৃষ্টিতে ব্যাটম্যানের মতো কালো জামা পরা সাদা মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। বাদশাহ উনাকে তার দক্ষতা দেখাতে বললেন। তিনি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শুরু করলেন। প্রথমে সকলে হাসতে থাকল; তারপর সবাই কাঁদতে লাগল। শেষে এমন সুর দিলেন যে, সকলে ঘুমিয়ে পড়ল!'
ওরে! সিনানের গল্পটা তো অস্থির। কিন্তু তার পা কাঁপছে না কেন? ব্যাপার কী?
আমরা চিল্লিয়ে উঠলাম। এরপর সিনান নেমে চলে এলো।
সিনান সিটে বসার পর স্যার বললেন—'তোমরা কি কেউ ধারণা করতে পারো, ব্যক্তিটা কে?'
উঠল সিনান।
'তিনি ক্লাসিক্যাল মুসলিম বিশ্বের একজন।'
কিছুক্ষণ আশেপাশে তাকালেন স্যার। তারপর বললেন—
'আসলে এখন পুরো বাংলাদেশের কোনো শিক্ষার্থী তার নাম বলতে পারবে না। কেন জানো? কারণ, তিনি মুসলিম বিশ্বের একজন স্কলার। তিনি যদি প্রাচীন গ্রিস বা আধুনিক পশ্চিমের কোনো স্কলার হতেন, তাহলে এটা হয়তো-বা কেউ না কেউ পেরে যেত। আল্লামা ইকবালের একটি কথা মনে পড়ে গেল— "বিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রকে আপাতদৃষ্টিতে জীবিত মনে হলেও আসলে সে মৃত। কারণ, সে পশ্চিমাদের কাছ থেকে শ্বাস-প্রশ্বাস ধার করে এনেছে।"'
'সিনান যার কথা বলছিল, তিনি আবু নাসর আল ফারাবি। দার্শনিক, মিউজিশিয়ান, লিঙ্গুইস্ট। সুন্দর বলেছ সিনান। ঘটনাটা লিপিবদ্ধ করেছেন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনুল খাল্লিকান। অবশ্য এটা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার কারণ আছে। আল ফারাবি ৭০টি ভাষা পারতেন—এটা ভুল। তিনি চার ভাষার বেশি পারতেন না।'
'এভাবে মিউজিক ব্যবহার করে ম্যাজিকও তো সম্ভব না।' বলল একজন।
'না, সেটা সম্ভব। মিউজিক অনেক মারাত্মক একটা জিনিস। অকারণে ইসলামের বেশিরভাগ উলামা একে হারাম বলেননি।'
'জি স্যার। কনসার্টে নিজেকে আটকে রাখা যায় না, বডি নিজে নিজেই লাফানো শুরু করে।' তারিক উত্তেজিত হয়ে বলল।
'আচ্ছা, সেদিকে না যাই। দেখি, পরে কে।'
'স্যার, স্যার, আল ফারাবি আলোচনা করে আজকে ক্লাসটা নিয়ে ফেলেন।' কয়েকজন বলে উঠল। রোল চার তো মরিয়া হয়ে চিল্লিয়েই উঠল!
'ও...' ঘড়ির দিকে তাকিয়ে— 'আচ্ছা নেওয়া যায়। আল ফারাবি ছিলেন মূলত দর্শনের মানুষ।'
স্যার বলতে থাকলেন— 'এখন, আল ফারাবির দর্শন...'
'স্যার, মিউজিকের ব্যাপারে যা শুনলাম, সংগীতবিজ্ঞানে তার কাজ নিয়ে যদি কিছু বলে নিতেন আগে।' পেছন থেকে একজন বলল।
'হুম...' কেশে নিলেন স্যার। 'আচ্ছা সংক্ষেপে কিছু বলি—
মিউজিকে তিনি খুব দক্ষ ছিলেন। কিতাব আল মুসিকা আল কাবির নামে বিশাল একটা বই লিখেছিলেন। তিনি রাবাব-এর উন্নতি করেন। বর্তমানের Violin বা বেহালার পূর্বসূরি এটা। আবার বীণা বা Harp-এর মতো তার-নির্ভর আরেকটা বাদ্যযন্ত্র বানান: কানুন নাম। পিচ, মূল স্বরসপ্তকসংক্রান্ত সুরকরণ (ইংরেজিতে Diatonic Tuning), মাইক্রোটোন বা Neutral Intervals নিয়ে ওই সময় লেখালিখি করেন। তিনি শারীরবৃত্তীয় শব্দবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন, যার কোনো নজির গ্রিকদের মাঝে পাওয়া যায় না। তিনি পরিমাপসংক্রান্ত মিউজিকের সাথে পরিচিত থাকায় মেজর থার্ড, যার কম্পাঙ্ক ৪ : ৫ আর মাইনর থার্ড, যার কম্পাঙ্ক ৫: ৬-কে সুরসংগতি হিসেবে চিনতে পারেন।'
সিনান কানে কানে বলল—'এইচএসসির ফিজিক্স বইয়ে পড়তে হবে এগুলো।'
'তার মিউজিকের বইগুলো আজ পর্যন্ত অ্যারাবিক মিউজিকে ব্যবহৃত হয়। পশ্চিমা মিউজিকে তার প্রভাব বিস্তীর্ণ। De Divisione Philosophiae, Gundisalvus-এর লেখা এই বইটিতে মিউজিক নিয়ে একটি অংশ আছে, যার বেশিরভাগ নেওয়া হয়েছে আল ফারাবির De Scientiis আর De Ortu Scientiarum নামক দুটি বই হতে। Vincent de Beauvais-এর De Musica ও Speculum Doctrinale নামের মিউজিকের দুটি গ্রন্থে বারবার অন্যান্যদের সাথে আল ফারাবির নাম নেওয়া হয়েছে। অবশ্য ফারাবি মিউজিককে এন্টারটেইনমেন্টের জন্য ব্যবহার করতেন না। এটাকে The science of harmonical proportion বলা হতো।'
'স্যার, আমাদের ফিজিক্স বইয়ে সুরযুক্ত শব্দ পড়ানো হয় তো।'
'হুম। অন্যান্য পশ্চিমা ব্যক্তিত্ব যেমন—রবার্ট কিলওয়ার্ডবি, অ্যালবার্ট দা গ্রেট, রাইমুন্ডো লুল, সাইমন টানস্টেড, অ্যাডাম ডি ফুল্ডা, থমাস অ্যাকুইনাস ইত্যাদি আল ফারাবির লেখা দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং ১৭ শতাব্দী পর্যন্ত পশ্চিমে আল ফারাবির বইগুলো আধিপত্য বজায় রেখেছিল। '
'ঠিক আছে তাহলে, আমরা এবার দর্শনে ফিরে আসি। যেটা বলছিলাম, সেটা হচ্ছে—আল ফারাবির দর্শনের আগে তোমাদের প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। তোমাদের আগে বুঝতে হবে—মুসলিম বিশ্বে দর্শন কীভাবে এলো।'
বলে স্যার বোর্ডে লিখলেন— ১. সাধারণ মানব আচরণ ২. ইসলাম অর্থাৎ কুরআন-হাদিস ৩. গ্রিক প্রভাব ৪. অন্যান্য প্রভাব
'দর্শন জিনিসটা মূলত কী? সাধারণ মানব চিন্তা-চেতনার একটা উন্নত রূপই দর্শন। চিন্তা করা সাধারণ মানব আচরণের বিরাট একটা অংশ। আর এখানে তোমরা দ্বিতীয় কারণটা দেখতে পাও। কুরআনে অনেক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন চিন্তা করতে। একাধিক শব্দ ব্যবহার হয়েছে এর জন্য : তা’লামুন, তাদাব্বুর, তাফাক্কুর। ইসলামিক ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা আলিমদের একজন ইমাম গাজালি বলেন— “কিছু জিনিসের ক্ষেত্রে শেষ ফলাফলে আসা সম্ভব না। আল্লাহ তায়ালা কিছু ক্ষেত্রে আমাদের কোনো উত্তর প্রদান করেননি। ইংরেজিতে learned ignorance বলে একে। কথা হচ্ছে—যদি সকল উত্তর আল্লাহ দিয়ে দিতেন, তাহলে তো আর পরীক্ষা থাকত না। তাহলে তো আমরা আর চিন্তা করতাম না; চিন্তা এক জায়গায় গিয়ে শেষ হতো। কিন্তু আল্লাহ চান যেন আমরা নিজেদের মস্তিষ্ক প্রয়োগ করি। যেন আমরা চিন্তা করতে থাকি।”
সাধারণত একটা জাতি যথেষ্ট সময় দাঁড়িয়ে থাকলেই জ্ঞানচর্চা শুরু করে। মুসলিমরাও তা-ই করেছিল। আরেকটা সাধারণ মানব বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—চিন্তা করা। যার এই ক্ষমতা আছে, তার চিন্তা করার জন্য বিষয় লাগবে। তারে ঠেকানো যাবে না। এমন কিছু লাগবেই, যা নিয়ে সে দিন-রাত পড়ে থাকবে।'
'They have to feed their brains' সিনানের আওয়াজ পেলাম। তার মুখ থেকে কেন বেরিয়েছে বুঝতে পারছি।
স্যারের কথায় মনোযোগ দিলাম— 'তোমরা পরবর্তীদের দিকে যদি তাকাও, যেমন : যদি গাজালির বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরসূরি ফাখরুদ্দিন রাজির দিকে তাকাও তাহলে দেখবে—তার চিন্তাধারায় এমন অনেক জিনিস আছে, যা আপাতভাবে মনে হবে অপ্রয়োজনীয়। তারা যা পেয়েছে, তা নিয়ে ভেবেছে। আর কোনোটাই অপ্রয়োজনীয় ছিল না অবশ্যই; আর কিছু হোক আর না হোক, দর্শন একজনের চিন্তাকে তীক্ষ্ণ বানায়। কেবল এই একটা কারণ থাকলেও এটা অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই যে গতকাল একটা কবিতা পড়লাম, পড়ে শোনাই তোমাদের।
স্যার ক্লাসে বইয়ের সাথে সব সময় একটা ডায়েরি নিয়ে ঢোকেন। খুলে পড়লেন—
'Pangur, white Pangur, How happy we are/Alone together, scholar and cat Each has his own work to do daily/For you it is hunting, for me study Your shining eye watches the wall/My feeble eyes fixed on a book You rejoice, when your claws entrap a mouse/I rejoice when my mind fathoms a problem Pleased with his own art, neither hinders another/ Thus we live together without tedium or envy.'
বিড়ালের নামটা আছে, তবে লেখকের নাম জানা নেই। দর্শন পড়া, দর্শন করার জন্য তার কাছে অতিরিক্ত কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য ছিল না। তার এটা ভালো লাগত, চিন্তা করা তার সাধারণ মানব আচরণ ছিল বলে তিনি করে গিয়েছেন। বই লিখে চলে গিয়েছেন, কিন্তু একটাবার নিজের নাম উল্লেখ করেননি!
অনেকে আবার যুক্তি আর ঐশী বাণীর মাঝে অমিলকে দর্শনের উত্থানের মূল কারণ হিসেবে দেখেছেন। আমি বলব, মূল কারণগুলোর একটা। অবশ্যই মূল কারণগুলোর একটা। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ হিউম্যান রিজনিং-এর সাথে অসাধারণ রেভেলেশন বা ওহির পথের বিযুক্তি ঘটে। আস্তে আস্তে এটা অনেক বড়ো হয়ে যায়। আর মুসলিম বিশ্বে সব সময়ই এই সংঘাতটা একটা মূল আলোচ্য বিষয় ছিল। দর্শনের চর্চার উত্থানের পেছনে অনেক বড়ো একটা কারণ।
ঠিক আছে, এবার আমরা সাধারণ শাসক আচরণে আসি। নিজেদের সাম্রাজ্যে দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান নিয়ে আসাটা গর্বের ব্যাপার। কিন্তু বই আনলেই তো হবে না, অন্যান্য জাতির সামনে ভাব বজায় রাখতে হলে স্কলারও লাগবে। তাই স্টাডিকে উৎসাহিত করা হতো। আর এত এত বই কালেক্ট করার পর ভাবুক মানুষরা কি বসে থাকবে? আলাদা বেশি কিছুর প্রয়োজন পড়ত না, স্কলারিক লোকেরা এমনিতেই আসত।
আমরা এখন গ্রিক প্রভাব নিয়ে কথা বলব। ইসলামের প্রথম দার্শনিক ধরা হয় আল কিন্দিকে। আগে তার দুটো উক্তি উল্লেখ করি।' স্যার ডায়েরির পাতা উলটালেন—
"দর্শন প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয়। যদি প্রয়োজনীয় হতো তাহলে এটা স্টাডি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই। যদি অপ্রয়োজনীয় হয়, তবে কথাটা জাস্টিফাই করতে হবে আর ডেমনস্ট্রেশন দ্বারা এটা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু Justification, Demonstration—এগুলো দর্শনের অংশ। যার স্টাডি থেকে সরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
সত্য যেখান থেকেই আসুক না কেন, তা গ্রহণ করতে আমাদের শঙ্কাবোধ করা উচিত না, তা উপলব্ধ করা উচিত। যদিও এমন হয়, এটা অন্যান্য জাতি থেকে আসছে।"
শুরুতেই বলেছিলাম, সাধারণ চিন্তার কিছুটা উন্নত রূপই দর্শন। প্রথম পয়েন্ট সেদিকে যায়। আর দ্বিতীয়টা দিয়ে আল কিন্দি মূলত বোঝাচ্ছেন—মুসলিমদের গ্রিকদের থেকে জ্ঞান নেওয়ার ক্ষেত্রে সংকোচ করা উচিত না।
মুসলিমদের ওপর গ্রিক দর্শনের বিস্তর প্রভাব পড়ে। এমনকী অ্যারিস্টটলের কথা অনেক দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখত। আবার বলছি, অনেক ধর্মতাত্ত্বিক পর্যন্ত দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলের কথা মুহাম্মাদ-এর কথার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখত। এমনকী অনেকে অ্যারিস্টটলের নামের শেষে "রাহিমাহুল্লাহ" পর্যন্ত লাগিয়ে দিত! গ্রিক প্রভাব কেবল দর্শন ও ধর্মতত্ত্বতে না; বরং সামগ্রিকভাবে ইসলামের ওপর প্রভাব ফেলে। এমনকী আজ পর্যন্ত ফিকহ অর্থাৎ ইসলামি আইন-কানুন পড়তে গেলে গ্রিক লজিক জানা লাগে।
অন্যান্য জায়গারও কিছু প্রভাব পড়ে, বিশেষ করে ফারসি ও ভারতীয় চিন্তা-চেতনার।
'গ্রিক প্রভাব এত বেশি কেন স্যার?' একজন জিজ্ঞেস করল।
'ভালো প্রশ্ন। মুসলিম বিশ্বে অসংখ্য খ্রিষ্টান অনুবাদক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক কাজ করতেন। ভৌগোলিকভাবেও আশেপাশে খ্রিষ্টবিশ্ব ছিল। খ্রিষ্টান দার্শনিকরা গ্রিক দর্শন, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেখালিখি করত। রাজদরবারে মুসলিমদের সাথে বিতর্ক করত। এটা মূল কারণ।
সাধারণ ন্যারেটিভে গ্রিক প্রভাবকে মুসলিম বিশ্বে দর্শনচর্চার মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়, সেটা ইউরোসেন্ট্রিক বায়াস থেকে আসে। ব্যাপারটা এমন যেন গ্রিকের জায়গায় আরবি পরিভাষা বসানো ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি।
কিছু মুসলিম আবার দাবি করে, পুরোটাই ইসলামি ভাবধারা থেকে উঠে আসে। এ-ও ভুল। এ পর্যন্ত স্টাডি থেকে যা পাচ্ছি, গ্রিক প্রভাব ও ইসলামি ভাবধারা— উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইসলামি ভাবধারাই বড়ো কারণ।
বেশি পরিমাণে গ্রিক দর্শন ভৌগোলিক কারণে মুসলিমদের হাতে আসে। সে সময়ের জন্য মুসলিমরা ধরে নেয়, এটাই সর্বোচ্চ দার্শনিক চিন্তাধারা। আশেপাশে খ্রিষ্টবিশ্ব না থেকে যদি চীন থাকত, তাহলে চীনা দর্শনই মুসলিমদের ওপর মূল প্রভাব ফেলত। গ্রিক দর্শন অপরিহার্য না। এটাকে মূল কোনো কারণ হিসেবে দেখাটা ভুল। এটা জরুরি না।
অন্যদিকে মুসলিমদের চিন্তাজগতে প্রথম আলো আসে কুরআন থেকে। মুসলিম শিশুকে সবার আগে কুরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। এই ইসলামি পরিবেশ একজনের চেতনা গড়ে তোলে।
যখন কোনো বই গ্রিক থেকে আরবিতে অনূদিত হতো, ইসলাম অনুযায়ী অনেক কিছু পালটে ফেলা হতো। ইসলামি ভাবধারার মাধ্যমে এই পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন বিষয় উঠে আসত। এই ওরিয়েন্টালিস্ট দাবি—এক ভাষা থেকে দর্শনতত্ত্ব অন্য ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে একই অর্থ বহন করবে তা কোনোভাবেই ডিফেন্ড করা যায় না।
ইসলামি ভাবধারা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা ছাড়া মুসলিম বিশ্বে দর্শন কখনোই দাঁড়াত না। কুরআন, হাদিস, ইসলামি ধ্যানধারণা থেকে অসংখ্য দার্শনিক চিন্তা উঠে আসে। '
'স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল।' তারিক হাত তুলল।
'হুম, বলো।'
'মাথা ঘোরাচ্ছে। কুরআন থেকেই যদি প্রাথমিকভাবে চিন্তাধারা শুরু হয়, তাহলে কুরআন ছেড়ে গ্রিক দর্শনে যাওয়ার প্রয়োজনটা কী ছিল?'
'অত্যন্ত ভালো প্রশ্ন তারিক।' স্যার খুশি হলেন। আসলেই, প্রশ্ন ভালো হয়েছে। এমনিতে তো অবাক হতাম। তবে কয়েক দিন আগে ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে ও কিছু কথা বলেছিল, তাই আর চমৎকৃত হলাম না।
'দেখ, ইসলাম সামগ্রিকভাবে প্রভাব রাখে। দার্শনিকরা সব সময় চেষ্টা করত ইসলামের সাথে গ্রিক দর্শনের মেলবন্ধনের। কিন্তু কথা হচ্ছে—গ্রিক দর্শনের গুরুত্ব এত বেশি কেন? কুরআনের ওপর তাদাব্বুর করলে কি হতো না?'
'এখানে কয়েকটা কারণ দেওয়া যায়। আমি একটা বলব কেবল।' স্যার একবার ঘড়ির দিকে তাকালেন।
'কথা হচ্ছে, আমরা সব সময় পার্টিকুলার বা জুযই জিনিসটাই দেখি, ইউনিভার্সাল বা কুল্লিটা দেখি না। চোখের সামনে যেটা আছে, সংকীর্ণভাবে যা আমাদের কাছে আসে, তা-ই আমরা বাস্তব ধরে নিই। এটা নিয়ে গভীরতর চিন্তা করে মর্ম পর্যন্ত যেতে পারি না। কোনো কিছু সামগ্রিকভাবে দেখার অভ্যাসটা আমাদের নেই। আর এখানে দর্শন তোমার মস্তিষ্ককে উন্নত করে। তুমি সামগ্রিক চিত্রটা বুঝতে শেখো।
দেখ, মুসলিম বিশ্বে সব সময়ই চুলোচুলির একটা পরিবেশ ছিল। দার্শনিকরা নিজে থেকে এবং পরবর্তী সময়ে ধর্মতাত্ত্বিকরাই সিদ্ধান্ত নেয়—মুসলিমদের বাঁচাতে দর্শন প্রয়োজন।
কুরআন-হাদিস দিয়ে হচ্ছিল না; কুরআন আনলে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হতো, হাদিস আনলে সঠিকত্বের জন্য আরও কঠিন নীতিমালা দিয়ে হাদিস অস্বীকার করা হতো। এমন কিছু প্রয়োজন ছিল, যেখানে চাইলেই কিছু একটা করা যেত না। যা মানব মস্তিষ্ককে অচল রাখবে; যদি না একজন সেটার সঠিক প্রয়োগ করে। অর্থাৎ যুক্তির প্রয়োগ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
ইমাম গাজালি তার জীবনের এককালে বলে বসেন—“যে লজিক বোঝে না, তার থেকে দ্বীনের কোনো জ্ঞান নেওয়া যাবে না।” এর জন্য তিনি অনেক সমালোচিত, কিন্তু যদি আমরা কন্টেক্সচুয়ালাইজ করি, পরিবেশটা বুঝি—মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ এত বেড়ে গিয়েছিল—গাজালির পূর্বসূরি, আবু বকর বাকিল্লানি ১০ম শতকে লিখছিলেন— “কিয়ামতের সময় এসে গেছে।” আর দুনিয়া তখন মোঙ্গলদের দেখেওনি! সে রকম পরিস্থিতিতে ইমাম গাজালিকে এমন একটা নীতিতে যেতে হয়েছিল, সেটা কালের দাবি ছিল। আর তারপর থেকে সব সময়ই ছিল এবং আছে।
এটা এমন না, অন্তরের বিষক্রিয়ার জন্য মানুষ দর্শনে এসেছিল; বরং প্রথমে চিন্তার কৌতূহলের জন্য এসেছিল। আর পরে এটা মারাত্মক প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। তো, এরপর দার্শনিকরা ধর্মতাত্ত্বিকদের সহায়তা করতে চায় দর্শন দিয়ে, আর ধর্মতাত্ত্বিকরা সাড়া দিয়ে চলে আসে দর্শনের ভেতর। গাজালির পরে আমার মনে হয় না, বৃহত্তর অর্থে মুসলিম বিশ্বে দর্শন বা ধর্মতত্ত্ব বলতে আলাদা কিছু ছিল। যেটা ছিল, সেটা হচ্ছে—Philosophical theology বা দার্শনিক ধর্মতত্ত্ব।
যাহোক, এর নেগেটিভ প্রভাবও ছিল। বেশিরভাগ মনে করে, দর্শন এনে এখানে বিভেদের অসুস্থতাকে ঠিক করতে হবে। অন্যদিকে কিছু মানুষ ধরে নেয়, ধর্মের মানুষদের মাঝে এত মারামারি, তাই ধর্মে উত্তর থাকতে পারে না।
কুরআনে যদি সত্য থাকত, তবে কুরআন নিয়ে এত বিদ্বেষাত্মক বিভেদ দেখা যেত না। তারা ধর্ম বাদ দিয়ে সেক্যুলার দর্শনের দিকে যায়। ইখওয়ানুস সাফা নামে দার্শনিকদের একটা সংঘ ছিল। তারা বলেছিল— “আসল দার্শনিক সব সময় ধর্মভীরু হয়; যারা মনমতো চলে, তারা কখনো দার্শনিক না; বরং মুতাফালাসিফা—ভন্ড দার্শনিক।”
তাহলে এবার আমরা আল ফারাবির দিকে যাব। তবে দর্শনের প্রশংসা যেহেতু করেছি, নেগেটিভ পার্টটাও হালকা করে বলা প্রয়োজন।
দর্শন অনেক ক্ষতিকরও হতে পারে। আর এসব দর্শন-বিরোধিতাকারীদের বলার প্রয়োজন নেই, দর্শনের মানুষরাই বলে থাকে। ফারাবির আগের দার্শনিক আল জাহিজ বলেন—“দর্শন অত্যন্ত ভয়ংকর একটা জিনিস।” আল ফারাবি নিজে বলেছেন—“যে নিজ থেকে দর্শন পড়ে না, তাকে দর্শনের ব্যাপারে কোনো কিছু বলতে যাওয়া উচিত না।” ১০ম শতকের দার্শনিক আবু হাইয়ান তাওহিদি বলেন—“দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের কাজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া না; এর কাজ প্রশ্ন বৃদ্ধি করা।”
প্রথমে যেমন বললাম, প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে চিন্তা শেষ হয়ে যাবে। দর্শন এজন্যই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এটা একজনকে চিন্তা করতে বাধ্য করে। কিন্তু দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের আরেকটা মূল কাজ কনফিউশন বা সন্দেহ সৃষ্টি করা। এটাও অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। দর্শন একজনকে পাস্পেক্টিভ দেয়। বুঝতে দেয় যে, এক বিষয়ের অনেক দিক থাকতে পারে, অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আর একজনকে শেখায় যে—সে-ও ভুল হতে পারে। সন্দেহের ওপরে যখন একজন উঠে আসে, তখন খুবই ভালো একটা অনুভূতি হয়। মুসলিমদের ক্ষেত্রে ঈমান শক্ত হয়। একজন ক্লিয়ারলি ভাবতে পারে। কিন্তু এটা ঝুঁকিপূর্ণ পথ। মুসলিম স্পেনের বিখ্যাত আলিম ইবনে হাজম বলেন—“জটিল ধরনের জ্ঞান তীব্র ওষুধের ন্যায়, যা শক্তদের মানায় ও দুর্বলদের নিঃশেষ করে দেয়। অনুরূপভাবে জটিল জ্ঞান বলিষ্ঠ মস্তিষ্ককে উন্নত করে এবং তাকে সব ধরনের খারাপ হতে দূরে রাখে। কিন্তু মধ্যম মস্তিষ্ককে শ্রান্ত করে তোলে।" এই কথাটা একদম পারফেক্ট। ফিলোসফি স্টাডি করার আগে নিজের যোগ্যতা বুঝতে হবে; তোমার মস্তিষ্ক শক্ত থাকলে এটা তোমাকে সেরা মানুষ বানাতে পারে, কিন্তু দুর্বল থাকলে তুমি শেষ হয়ে যেতে পারো। ইসলামে দৃঢ় বিশ্বাস বা ইয়াকিন নিয়ে একজন নিশ্চিত না থাকলে এখানে আসা উচিত না। আরও সময় নিয়ে ২-৩ বছর ইসলামের অন্যান্য মৌলিক জিনিস স্টাডি করে তারপর আসা উচিত।'
'স্যার, আপনার কোনো সমস্যা হয়েছিল?' ডান দিক থেকে প্রশ্ন এলো।
'না, আলহামদুলিল্লাহ হয়নি। কারণ, এ পথে আসার আগে চার বছর কুরআন ও আত্মশুদ্ধি নিয়ে ছিলাম। যখন একজন কম ঝুঁকির কোনো ফিল্ডে কিছুটা গভীর স্টাডি করে নেয়, তখন কীভাবে পড়তে হয়—সে ব্যাপারে তার ধারণা তৈরি হয়ে যায়। সাধারণভাবে উপদেশ দিই, একটা পুরো তাফসির পড়া ছাড়া এবং সিরাত বোঝা ছাড়া একজনের দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব পড়তে যাওয়া উচিত না। অবশ্য এটা কতটুকু কার্যকর, তা নিশ্চিত বলতে পারছি না। আমার ক্ষেত্রে কাজ হয়েছিল তাই বলছি; সবাই তো আর এক রকম হয় না। তবে পার্সোনালি মনে করি, এ দুটো করার পর একজন যেকোনো বই-ই পড়তে পারবে।'
ঘণ্টা পড়ে গেল। 'ওহ! ফারাবিকে নিয়ে কথা বলা গেল না। আচ্ছা, তার অবদান নিয়ে কিছু কথা বলি পরের টিচার আসা পর্যন্ত; তার দর্শন নিয়ে নাহয় অন্যদিন কথা হবে।
ইসলামে গ্রিক দর্শনের সমন্বয় শুরু করেন আল কিন্দি। উন্নতিকরণ হয় আল ফারাবির দ্বারা এবং পারফেকশন পায় ইবনে সিনার হাতে। আল ফারাবির টাইটেল—The Second Teacher, প্রথম শিক্ষক অ্যারিস্টটল। কেননা, মুসলিমদের জন্য তিনি গ্রিক দর্শন গুছিয়ে বর্ণনা করেছেন। তিনি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম বিজ্ঞানকে শ্রেণিবিন্যস্ত করেন। দর্শন গ্রিস থেকে কীভাবে মুসলিম সাম্রাজ্যে ভ্রমণ করে তার ইতিহাস রচনা করেন। শূন্যস্থান বা Vacuum-এর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা চালান। তার রিসালা আল খালা বইয়ে এর কথা আছে।
Islamic Geometric Design বলতে গেলে আলাদা একটা সাবজেক্ট। এ নিয়ে আল ফারাবির চমৎকার একটা বই আছে। ভাষার অলংকার বিজ্ঞানে তার কাজের জন্য ড. ফুয়াদ হাদ্দাদ তাকে আধুনিক লিঙ্গুইস্টদের সাথে তুলনা করেন।
এপিস্টেমোলজি বা জ্ঞানতত্ত্বে ফারাবির কাজ দেখে অভিভূত হয়ে ড. আম্মার আল-তালবি তাকে এপিস্টেমোলজির আসল জনক বলেন। আল ফারাবি বলেছিলেন— "যে মহান আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও মূল কারণ, তার পরিচয় লাভই দর্শনচর্চার উদ্দেশ্য।" আল ফারাবি গ্রিক দর্শন থেকে বিশালভাবে প্রভাবিত হলেও তার দর্শন মূলত ইসলামি ভাবধারা দ্বারা আবৃত ছিল। বাংলাদেশের একজন দর্শন গবেষকের কিছু অ্যাসপেক্ট তার বইয়ে দেখিয়েছেন।
আর দর্শনে আল ফারাবি বলতে গেলে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, কান্ট, বার্গস, হারবার্ট স্পেন্সার, রুসো All in one।'
স্যার যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তারিক বলল—'স্যার, আপনি আমাদের বোঝানোর সময় একদম আমাদের মতোই হয়ে যান, অত্যন্ত ভালো লাগে স্যার।'
শুনে মুচকি হাসলেন স্যার— 'আসলে তারিক, স্কুল শিক্ষকদের তেমনই হওয়া উচিত।'
টিফিন টাইমে তারিক বলল—'ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে সেই একটা বই পড়েছিলাম। কার্ল শারিফ আল তোবগুইয়ের Ibn Taymiyya on Reason and Revelation। সেটা অনেকটা Philosophical theology টাইপেরই ছিল। এই বিষয়ে আমি সিরিয়াসলি ইন্টারেস্টেড।'
সিনান বলল—'আমিও ঢুকব ভাবছি।'
পাশে দিয়ে আমি একজন, যে কিছু বোঝে না!

টিকাঃ
১. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. খণ্ড ৩, পৃ: ৬৫৯.
২. 'al-Farabi' in K.J. Ahmad, Hundred Great Muslims (Library of Islam, 1987)
৩. Salim al-Hassani op. cit. p:48
৪. Michael H. Morgan p: 240
৫. K. J. Ahmad p: 267
৬. George Sarton, vol. 1, p: 628; ইসলাম ও মিউজিক নিয়ে জানতে পড়ুন : আহমাদ মুসা জিবরিল, মিউজিক: শয়তানের সুর (ঢাকা: সমর্পণ প্রকাশন, ২০২০);
সংক্ষেপে অন্য কিছু মতের জন্য: আবু মুয়াবিয়াহ ইসমাইল কামদার, হালাল বিনোদন (ঢাকা: পার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স, ২০১৭); Academic: Omar Farahat 'Listening to Music and the Interplay of Law and Morality in Medieval Sunni Thought' Academia.
৭. K. J. Ahmad, p: 267.
৮. Ibrahim Kalin, Reason and Rationality in the Qur'an (Kalam Research and Media, 2015); Paul L. Heck, ch. 3.
৯. Majid Fakhry, Islamic Philosophy A Beginner's Guide (Oneworld Publications, 2011), p: 91; Salim al-Hassani op. cit. ch. 1.
১০. Paul L. Heck op. cit; Mohammad Akram Nadwi, 'Qiyas, Ijma' and Ijtihad' Al-Salam Institute; Mohammad Akram Nadwi, 'Introduction to Logic' Al-Salam Institute;
১১. Seyyed Hossein Nasr and Oliver Leaman, History of Islamic Philosophy (Routledge, 2008)
১২. Paul Heck, 71ff.
১৩. Phillip K. Hitti p: 371
১৪. Seyyed Hossain Nasr, Science and Civilization op. cit. p: 60-61.
১৫. George Saliba, Islamic Science and Making of European Renaissance (The MIT Press, 2007) p: 7
১৬. M. Shamsher Ali op. cit. p: 102
১৭. Karen Armstrong, A History of God op. cit. p: 208-209 Ehsan Masood, Science and Islam op. cit; Eric Broug, Islamic Geometric Design (Thames and Hudson, 2013); Eric Broug. 'The Complex Geometry of Islamic Design' online video, TED ed. দেখুন।
১৮. মুহাম্মদ শাহজাহান, আল ফারাবির দার্শনিক চিন্তাধারা (বুক্স ফেয়ার, ২০১৮) p: 53.
১৯. Ammar Al-Talbi. 'Al-Farabi's Doctrine of Education: Between Philosophy and Sociological Theory' Muslim Heritage.
২০. মুহাম্মদ শাহজাহান, p: 87.
২১. মুহাম্মদ শাহজাহান, আল ফারাবির দার্শনিক চিন্তাধারা (বুক্স ফেয়ার, ২০১৮); ড. মুহাম্মদ শাহজাহান তার ডক্টরাল থিসিস করেছিলেন আল ফারাবির ওপর। আল ফারাবির ওপর তার একাধিক রিসার্চ পেপার আছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px