📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 জাগ্রতের জীবিত সন্তান

📄 জাগ্রতের জীবিত সন্তান


হন্তদন্ত হয়ে ক্লাস রুমে ঢুকলাম।
'কি রে, তুই কালকে আসিসনি কেন? মারতে পারলাম না তোকে!' তারিকের মশকরা।
তবে তার কথায় কান না দিয়ে আমি সিনানকে গিয়ে ধরলাম— 'সিনান! গতকাল কী হয়েছে, জানিস?'
'তুই না বললে ও কীভাবে জানবে?' হেসে বলল তারিক।
'গতকাল আমি আমাদের ঘরের পুরোনো বুকশেলফটা পরিষ্কার করছিলাম। আর তখনই একটা বই আমার হাতে আসে। আমার মনে পড়ে—ছোটোবেলায় বইটা অনেক পড়েছি; আমার জীবনে পড়া সেরা এক বই এটা। বইটার নাম আজব শিশু। কোনো সময় বইটার লেখকের নাম দেখিনি। কিন্তু কালকে খেয়াল করলাম, ইবনে তোফায়েল আন্দালুসি। ইবনে তোফায়েল ঠিক আছে, কিন্তু আন্দালুসি? আন্দালুস মানে মুসলিম স্পেন! উনি নিশ্চয়ই বড়ো কিছু হবেন, সিনান।'
স্বাভাবিকভাবে বলল সিনান— 'হুম, বইটা পড়েছি। মূল বইয়ের নাম Hayy ibn Yaqzan। ইংরেজি করলে অর্থ দাঁড়ায়— Alive Son of Awaken। ল্যাটিন নাম Philosophus Autodidactus। তুই যেটা পড়েছিস, সেটা তো বাচ্চা ভার্সন।'
তারিক হেসে উঠল—'সেই বই পড়িস তুই আরমান, বাচ্চা ভার্সন তোর জীবনে পড়া সেরা বইগুলোর মধ্যে একটি হয়ে গেছে, হে হে!'
'আবু বকর ইবনে তোফায়েল একজন ডাক্তার ছিলেন; মুসলিম স্পেনে। ইবনে রুশদের টিচার, তিনি একজন স্বনামধন্য দার্শনিকও বটে। তাঁর বইটা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম দার্শনিক উপন্যাস। আজ পর্যন্ত বইটির দার্শনিক গুরুত্ব রয়েছে। ১৭-১৮ শতাব্দীতে সারা ইউরোপে খুব প্রভাবশালী একটা বেস্টসেলারে পরিণত হয় বইটি। আধুনিক ওয়েস্টার্ন দর্শনের ওপরও এটার বিরাট প্রভাব রয়েছে। ইউরোপিয়ান রেনেসাঁস আর সায়েন্টিফিক রেভোল্যুশনের ব্যাপারে তো জানিস! এগুলোর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটা হলো এই বই। নিউটন, কান্ট, জন লক, থমাস হোবসের লেখা পড়ে দ্যাখ! স্পষ্ট এই বইয়ের প্রভাব লক্ষ করবি। এগুলো তো সব নন-ফিকশন গেল, ইভেন ফিকশনেও এটার ছাপ দেখবি।'
'তাই নাকি! যেমন?'
'এই ধর এডগার রাইজ বারোজ, রুডইয়ার্ড কিপলিং, ড্যানিয়েল ডিফোর টারজান, মউগলি, রবিনসন ক্রুসো—এই বই তিনটা তো বিশ্ববিখ্যাত। হতে পারে, তিনটাই ইবনে তোফায়েলের বই থেকে অনুপ্রাণিত। অথচ আমরা মুসলিমরা তাদের তিনজনের ভক্ত হলেও ইবনে তোফায়েলের মতো মহান মানুষকে চিনি না। জন লকের একটা লেখা আছে—"An Essay Concerning Human Understanding” নামে। আধুনিক ওয়েস্টার্ন ফিলোসফির ইম্পিরিসিজমের মূল সোর্স বলা চলে। সরাসরি ইবনে তোফায়েলের লেখা থেকে অনুপ্রাণিত। আবার উনার “টাবুলা রাসা” আইডিয়ার ডেভেলপমেন্টেও বইটার সরাসরি প্রভাব আছে। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ধারণা—সব দিক থেকে বইটা পারফেক্ট। আরও শুনবি? কার্ল মার্ক্স, জর্জ বার্কলি, ডেভিড হিউম, উইলিয়াম মলিনো, গটফ্রিড লাইবনিজ, বারুখ স্পিনোজা, জঁ জাক রুসো, ভল্টেয়ার, ক্রিস্টোফার হাইগেনস, জন ওয়ালিস, অ্যালেক্সান্ডার পোপ, ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্ত... একবাক্যে বললে— "Hayy is the first, best and most influential philosophical novel ever written."'
আমি আর তারিক সিনানের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। এমন সময় স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। আমি ব্যাগ রেখে বসলাম, অবশেষে।
টিফিন টাইমে তারিক সিনানকে বলল— 'বল, এবার জীবন্ত কাহিনি!'
সিনান ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার ভাব করে বলল— 'ওইটা কী আবার!'
'আরে, হাই ইবনে ইয়াকজানের গল্প বল না রে তুই...'
মুচকি হাসি নিয়ে সিনান বলতে শুরু করল— 'হাই একটি নবজাতক, যে নির্জন দ্বীপে একা। সেখানে একটি হরিণ তাকে বড়ো করল এবং প্রকৃতি প্রদত্ত জ্ঞান থেকে সে সবকিছু শিখল। অন্য প্রাণীদের মতো না হয়ে সে বুঝতে পারল, তার উলঙ্গতা ও নিজের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না থাকার কথা। তাই সে লতাপাতা দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিল এবং নিজের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করল।'
'ওয়াও! নির্জন দ্বীপে থেকেও বুঝতে পারল, নিজের শরীরকে ঢেকে রাখতে হয়? তা-ও কেউ শেখানো ছাড়া? আজকাল তো অনেক শিক্ষিত মানুষও এটা বুঝতে চায় না!'
'এরপর শোন। পশুদের দুই পায়ের তুলনায় নিজের দুই হাতের বিশেষত্ব টের পায় সে। একসময় তার মা হরিণী মারা যায়। পর্যবেক্ষণ থেকে সে বুঝে নেয়, পশুদের একটা আত্মা থাকে। দেহকে এটা শুধুই একটি যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। প্রকৃতি নিয়ে গভীর চিন্তা করে করে সে বিভিন্ন জিনিস আলাদা করতে শেখে। মানে পশু, গাছ, খনিজ এগুলো আরকি। সব জিনিসের Body আছে, এগুলোর কার্যপদ্ধতি কিন্তু একটা আরেকটা থেকে আলাদা। এটাও হাই ধরতে পারে। আবার প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট আকার আর আলাদা ফাংশনালিটি থাকবে। এটাই হলো আত্মা। কিন্তু এই আত্মা দেহ পেল কীভাবে?'
'আল্লাহ দিয়েছেন আরকি।' বোকার মতো বললাম আমি।
'ওইটা তো আমরা জানি।' সিনান বলল—'এখানে তো হাইকে নিয়ে কথা হচ্ছে।'
'ও হ্যাঁ, রাইট।'
'নিশ্চয়ই আত্মাটা কেউ তাকে দিয়েছে। এভাবে হাই একজন অনন্য সত্তার কথা চিন্তা করল, যে প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন গুণাবলি দিয়েছে। সে চিন্তা করে—এই অনন্য সত্তা তাহলে কোত্থেকে এলো আবার? যুক্তিচিন্তার মাধ্যমে বুঝতে পারল, তার সৃষ্টিকর্তা থাকলে আবার সেটিরও আরেকটি সৃষ্টিকর্তা লাগবে। এমন হলে তো এক অসীম ধারা চলতে থাকবে। তাই সে সত্তা একজনই, অনন্য। এমন চিন্তা-ভাবনা করতে করতে সে অনেক কিছু সঠিকভাবে বুঝে নিল।
এমন সময় পাশের বসতিপূর্ণ দ্বীপ থেকে আবসাল নামের একজন সাধু এসে হাইয়ের সাথে দেখা করল। ওই দ্বীপের রাজা সালামান। আবসাল, হাইকে, মানে প্রকৃতির এই সন্তানটিকে কুরআনের কথা জানাল। তারা দুজনে ঈশ্বর, প্রকৃতি ও নৈতিকতা নিয়ে লম্বা আলাপ চালাল। আবসাল অবাক হলো, ঐশ্বরিক বাণী হতে সে যা শিখেছে, হাই দেখা যাচ্ছে সেসব শুধু যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমেই বুঝে ফেলেছে! হাই আবার নিজের বুদ্ধিমত্তা থেকে সাথে সাথে বুঝতে পারল, কুরআনের শিক্ষাগুলো সত্য। এরপর তারা দুজনই একমত হলো, ধর্মের যৌক্তিক ব্যাখ্যা আর দর্শনের স্বাধীন চিন্তার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
এটা সাধারণ জনগণকে জানানোর জন্য তারা পাশের শহরে গেল। কিন্তু গোঁড়া মানুষরা তাদের কথা বিশ্বাস তো করলই না; উলটো প্রচলিত বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রাখল। হাই; যে এর আগে কখনো মানুষদের মাঝে আসেনি, মনে করল—মানুষরা সাধারণত স্বার্থপর, লোভী আর নিজ প্রবৃত্তির কাছে নত। এসব মানুষ যুক্তি ও বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেয় না। এরা দর্শনের কী বুঝবে? এদের সাহায্য প্রয়োজন, এরা নিজের চিন্তা নিজে করতে পারবে না। এই শিক্ষার পর তারা দুজনে আবার নির্জন দ্বীপে এসে চিন্তা-ভাবনা আর আল্লাহর ইবাদত করতে থাকল। এই আরকি কাহিনি।'
'বুঝলাম।' আমার কণ্ঠে অনিশ্চয়তা।
'ইবনে তোফায়েলের বইয়ের মূল শিক্ষা হচ্ছে—সঠিকভাবে পরিচালিত যুক্তিচিন্তা পরবর্তী সময়ে কুপ্রবৃত্তিহীন ও লোভহীন ধর্মীয় বিশ্বাসেই পরিণত হয়। যুক্তি ও ধর্ম একে অপরকে পরিপূর্ণ করে। বর্তমানের ক্ষেত্রে একদা আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন— "Science without religion is lame, religion without science is blind."
'আরেকটা ব্যাপার আছে শোন। মানুষ তার যৌক্তিকতা ব্যবহার করে কুরআনে আল্লাহ আমাদের যে উদ্দেশ্যে উদ্যত হতে বলেছেন, সে পর্যন্ত যেতে পারবে— এ ধারণা মূলত দিতে চাচ্ছেন ইবনে তোফায়েল। কুরআনে যে নৈতিকতা বর্ণিত আছে, আল্লাহ আমাদের স্বাভাবিক রূপ সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন—যা হলো ফিতরাহ। যখন মানুষ বিপথে যায়, তখন ফিতরাহর বিরুদ্ধে কাজ করে। সুতরাং নির্জন দ্বীপে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ছাড়া একজন মানুষ তার ফিতরাহকে অনুসরণ করে সে পর্যন্ত যেতেই পারে। পরবর্তী সময়ে ইবনুন নাফিস ইসলামের একজন আলিম হওয়ার পরও কিছুটা এমনই দেখিয়েছেন। তাই এই ধারণা নিয়ে ভেবে দেখা যায়। কিছু মডার্নিস্ট মুসলিম বলতে চেয়েছেন— ইবনে তোফায়েল এখানে একরকম সেক্যুলার ভাবধারার বয়ান দিয়েছেন, কিন্তু এটা একেবারেই বাজে ব্যাখ্যা। মূলত ইবনে তোফায়েল সুফিবাদের দিকে ইঙ্গিত করেন, বইয়ের পরিণতি ক্লিয়ারলি তা-ই নির্দেশ করে। এই বইয়ের মর্মার্থ এই নয়—"Reason is better than religion, বরং Reason leads to religion, " বুঝতে পারছিস?'
'That's just sick! অস্থির ব্যাটা' তারিক বলল—'ইবনে তাইমিয়াহ থেকেও আমরা এমন তত্ত্ব পাই। সুস্থ যুক্তি আর ওহির মাঝে কোনো বিরোধ নেই—তিনিও এমন দেখিয়েছেন। তিনি আল্লাহর এমন এক বর্ণনা দেন—যা তাঁর বিশ্বাস, কুরআন-হাদিস দ্বারা সমর্থিত। কিন্তু তিনি এর জটিল দার্শনিক ব্যাখ্যাও দেন! তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শেষমেশ আমরা একই জায়গায় পৌঁছাই! এটা কনসিডার করার কিছু না; বরং এটাই ঠিক। ইবনে তাইমিয়া এটা একদম প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।'
কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল সিনান—'কি রে তারিক! ইবনে তাইমিয়াহ স্টাডি করিস তুই?'
'তুই করিস না? পড়িস পড়িস, ভয়ংকর মজা, ব্যাটা।'
'Okay অাখি।'
'আর শোন, তুই যে রকম বললি, একাকী একজনকে দ্বীপে রেখে দিলে সে নিজ থেকে কোনো রকম ঐশ্বরিক কোনো কিছু ছাড়া আল্লাহকে পেয়ে যাবে, সেটাও ইবনে তাইমিয়া বলেছেন— নবির দিকনির্দেশনা ছাড়াও মানুষের অকলুষিত প্রকৃতি ইসলামে ফিরে আসে। ইবনে তাইমিয়া, ফাখরুদ্দিন রাজির বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। এরপরেও এই বিষয়ে দুজনে অনেকটা একমত। রাজি বলেন— "আল্লাহ মানুষের যুক্তি এমনভাবেই সৃষ্টি করেছেন, তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করবে।” তাই ইমাম ফাখরুদ্দিন রাজির মতে, কুরআন-হাদিস ছাড়াও অকলুষিত যুক্তির মাধ্যমে মানুষ দ্বীনের পথে চলতে পারবে।'
'জিনিসটা তো খুবই সেরা!' আমার রিমার্ক দিয়ে টিফিন টাইম শেষ হলো। অনিশ্চয়তা দূর হলো। আমরা ক্লাসে ঢুকলাম।
ছুটির পর আমরা তিনজন হেঁটে হেঁটে বাসায় যাচ্ছি। সিনান বলল—'সবই ভালো। শুধু একটা জিনিস বুঝলাম না—ইবনে তোফায়েল এত ভালো একটি উপন্যাস একা কীভাবে লিখলেন। গবেষণায় নামলাম। দেখতে পেলাম—না, উনি একা সম্পূর্ণ নিজ হাতে লিখেননি। "হাই ইবনে ইয়াকজান নামে ইবনে সিনারও একটি গল্প ছিল। ইবনে উমর-এরও একটা গল্প আছে সালামান ওয়া আসাল নামে। ইবনে তোফায়েলের বইয়ের নাম এগুলোই। আবার এই গল্পেও একটি হরিণও ছিল! অবশ্যই ইবনে সিনার লেখা গল্প আর ইবনে তোফায়েলের লেখা গল্পে বিরাট ফারাক। প্রায় সব মুসলিম দার্শনিকের লেখা গল্প মূলত "Ibn Sina Recycled"।
ইবনে তোফায়েল ছাড়াও ইবনুন নাফিস, আবু হামিদ আল গাজালি, শিহাবুদ্দিন সুহরাওয়ারদিসহ অনেকে আছে। ইবনে তোফায়েলের বইটার ওপর সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলেছে ইবনে বাজ্জাহর তাদবির আল মুতাওয়াহহিদ বই। হাই ইবনে ইয়াকজান ওই কল্পিত চরিত্রটির একটা চরম রূপ। তবে ইবনে বাজ্জাহর ওই চরিত্রটি অসম্পূর্ণ ছিল। তাই আবু হামিদ আল গাজালির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি চরিত্রটিকে পূর্ণতা দান করেন হাই ইবনে ইয়াকজান হিসেবে। আর হ্যাঁ, কুরআনে ইবরাহিম-এর ঘটনা থেকেও ভালোভাবে প্রভাবিত ছিলেন ইবনে তোফায়েল। হুনাইন ইবনে ইসহাকের অনুবাদকৃত একটা গ্রিক টেক্সটেরও প্রভাব আছে ইবনে তোফায়েলের ওপর। মূলত এদের সাথে ইবনে তোফায়েলের গল্প অনেকটাই মেলে। আর সম্ভবত মিশরীয় ও ইরানি প্রভাবও আছে।'
'ধুর ব্যাটা!' বলল তারিক— 'ভাবলাম, ইবনে তোফায়েলের অরিজিনাল কাণ্ড। এখন তো দেখি পুরাই...'
'উঁহু! দ্বিমত। লেখার ফুল ক্রেডিট ইবনে তোফায়েলের। তুই দ্যাখ, একপাশে যেসব বইয়ের কথা বলেছি, সবই সিম্পল গল্প। তেমন বিশেষত্ব নেই। বেশ সিম্পল গল্প থেকে ইবনে তোফায়েল অসাধারণ একটা দর্শনভিত্তিক উপন্যাস বানিয়ে ফেলেছেন। এর জন্য ভালো দক্ষতা আর উচ্চমানের চিন্তাধারা লাগে।
শোন, শেক্সপিয়রের The Merchant of Venice খুব বিখ্যাত নাটক। কিন্তু ১৫৯৬ সালে শেক্সপিয়র এটা লেখার ১৭ বছর আগেই নাটকটা মঞ্চস্থ হয়। তারও আগে এমনই একটি বই পাওয়া যায় স্যার জিওভানির লেখা। ১৫৫০ সালে প্রকাশিত। শেক্সপিয়রের বইয়ের কাহিনির সাথে হুবহু মিলে যায়। আবার শাইলকের চরিত্র তিনি ধার করেন বিখ্যাত সাহিত্যিক মার্লোর জু অফ মাল্টা থেকে। তো, শেক্সপিয়রের বইটি কোনোভাবেই অরিজিনাল না। কিন্তু এতে কি শেক্সপিয়রের সম্মান কমানো হয়? না! সাহিত্যে এমন কাজ নিয়মিতই হয়। এটা নিয়ে সমালোচনা করা মানে সাহিত্যিকের জ্ঞানের অভাব। শেক্সপিয়রেরটা অসাধারণ, অন্য লেভেলের সাহিত্য মানলাম। কিন্তু ইবনে তোফায়েল যে চমৎকার দর্শন ও বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দিলেন, এটার আলাদা ক্রেডিট নেই? তা-ও আবার ইবনে সিনার বই আর হাই ইবনে ইয়াকজানের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ইবনে সিনার বইটি মূলত অনেকটা প্রাবন্ধিক লেখার মতোই। সাহিত্য বলতে কিছুই নেই তাতে।'
'এজন্য ফিলিপ কে হিট্টি কোনো রকম কথা না বলেই ইবনে তোফায়েলের বইটাকে অরিজিনাল বলেছেন।'
'অ, তাহলে তো ঠিকই আছে।' তারিক বলল।
'এই বইটা পাঠকদের আনন্দদানের জন্য লেখা না; বরং ১২শ শতকে মুসলিম বিশ্বে থাকা বিজ্ঞান ও দর্শনের একটা সামারি। সে সময় মুসলিম বিশ্বে থাকা বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ভাবধারার অনেকটাই তুলে ধরা হয়ে গেছে বইটিতে। এমনিতে পড়লে তোর কাছে সাদামাটা লাগবে। তুই আগে 'Maker of the Muslim World' সিরিজে টানেলি কুকোনেন-এর Ibn Tufayl বইটা পড়ে নিস। তাইলে বুঝবি, কীভাবে এই বই ইউরোপ পালটে দেয়, কী আছে এই বইয়ে।'
আমাদের মাঝে এমন অনেক সময়ই হয়, স্কুল থেকে বাসায় যাওয়ার সময় অনেকক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডিসকাশন করি। অবশেষে আজকেরটা শেষ হলো। এখন বাসার পথে...

টিকাঃ
১. Dr. Ibrahim Kalin. 'Hayy ibn Yaqdhan and the European Enlightenment. Daily Sabah'.
২. G. A. Russell, The Arabick Interest of the Natural Philosophers in Seventeenth-Century England. (Brill Publishers, 1994) p. 228.
৩. G. J. Toomer, Eastern Wisedome and Learning: The Study of Arabic in Seventeenth-Century England (Oxford University Press, 1996) p. 218.
৪. Samar Attar, The Vital Roots of European Enlightenment Tufayl's Influence on Modern Western Thought (Lexington Books, 2010)
৫. Cyril Glasse, New Encyclopedia of Islam (Rowman Altamira 2001) p. 202
৬. The Royal Society. Arabic Roots June 2011. আপাতভাবে জিনিসটা ইসলামবিরোধী মনে হতে পারে, তবে আশআরি চিন্তা-ভাবনায় ক্ষিতিবাদ ব্যাপারে ধারণা ট্যাবুলা রাসার মতোই (জুওয়াইনি, গাজালি, ফাখর রাজি)।
৭. Taneli Kukkonen, Ibn Tufayl: Living the Life of Reason (Making of the Muslim World. Oneworld Academic, 2014)
৮. Dominique Urvoy, 'The Rationality of Everyday Life: The Andalusian Tradition?' in Lawrence I. Conrad, The World of Ibn Tufayl: Interdisciplinary Perspectives on Hayy Ibn Yaqzan (Brill Publishers, 1996) pp. 38-46.
৯. Diana Lobel, A Sufi-Jewish Dialogue: Philosophy and Mysticism in Bahya Ibn Paquda's Duties of the Heart (University of Pennsylvania Press, 2006) P: 24.
১০. Martin Wainwright, 'Desert island scripts' The Guardian.
১১. Tor Eigeland, 'The Ripening Years' Saudi Aramco World September-October 1976.
১২. G. A. Russell (1994), The 'Arabick' Interest of the Natural Philosophers in Seventeenth-Century England, pp. 224-239.
১৩. Samar Attar, The Vital Roots of European Enlightenment op. cit. p: 20; Andreas Eppink and Muhammad Perla. 'Arab Thinking in the History of Ideas: The Case of ibn Tufail' Academia.
১৪. Oussama Hamza. 'Alive and Awake: The First and Greatest Novel' The Muslim 500 (2020) p: 202-204.
১৫. মূল বইটি পড়তে উৎসাহিত এবং বাংলা অনুবাদ পড়তে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ইংরেজি অনুবাদের ক্ষেত্রে গ্রন্থপঞ্জির বইটি রিকমেন্ডেড।
১৬. Dr. Ibrahim Kalin. 'Hayy ibn Yaqdhan and the European Enlightenment' Daily Sabah.
১৭. Albert Einstein, Out of My Later Years (Gramercy, 1993)
১৮. এখানে ইবনে তোফায়েলের জন্য কথাটার আক্ষরিক অর্থ নেওয়া হচ্ছে। আইনস্টাইন কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, সেটার ব্যাপারে কিছু বলা হচ্ছে না।
১৯. আইনস্টাইনের জন্য কনটেক্সচুয়ালি বুঝতে হলে পড়ুন : Majid Daneshgar. ‘Behind the Scenes: A Review of Western Figures' Supportive Comments Regarding the Qur'an' Al-Bayan. 11:2 (2013), pp. 131-153. বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে সংঘাত নিয়ে আইনস্টাইনের চিন্তাধারার ব্যাপারে জানতে পড়ুন : John Hedley Brooke. 'If I Were God' Einstein and Religion Zygon. 41:3 (2006), 941-54.
২০. আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, ইলমের ভালোবাসায় চিরকুমার উলামায়ে কেরাম (অনুবাদ : আবু সাঈদ মুহাম্মদ নুমান, মাকতাবাতুল আযহার, ২০১৯) পৃষ্ঠা: ১৭৭-১৮৩।
২১. পড়ুন-ইবনুন নাফিসের কৃতিত্ব।
২২. Dr. Abu Shadi al-Roubi. 'Ibn Al-Nafis as a philosopher', Symposium on Ibn al-Nafis, Second International Conference on Islamic Medicine: Islamic Medical Organization, Kuwait; available at: http://www.islamset.com/isc/nafis/drroubi.html
২৩. Oussama Hamza. Alive and Awake: The First and Greatest Novel The Muslim 500 (2020) p: 202 204.
২৪. ইবনে তোফায়েলের বইয়ের শিক্ষা ও দর্শন এই গল্পে আলোচ্য নয়। তার জন্য অবশ্যই আলাদা গল্প/লেখা লাগবে। এখানে শুধু একটু স্বাদ দেওয়া হলো। আল্লাহ তাওফিক দিলে ভবিষ্যতে লেখা যাবে।
২৫. Carl Sharif el-Tobgui, Ibn Taymiyya on Reason and Revelation. A Study of Dar ta'arud al- aql wa-l-naql (Leiden: Brill, 2020); Yasir Kazi [Qadhi], 'Reconciling Reason and Revelation in the Writings of ibn Taymiyyah (d. 728/1328): An Analytical Study of ibn Taymiyyah's Dar al-Ta'arud' (Phd Dissertation, Yale University, 2013); বাংলায় একটা আইডিয়া পেতে চাইলে : আরমান ফিরমান, 'যুক্তি ও ওহীর মাঝে ইবনে তাইমিয়া: কার্ল শারিফ আল তোবোগুই ও ইয়াসির কাদির ডক্টরাল থিসিসের একটা ওভারভিউ' Medium.
২৬. Carl Sharif el-Tobgui, p: 261.
২৭. Paul L. Heck, Skepticism in Classical Islam: Moments of Confusion (Routledge, 2014) p: 166; Tariq Jaffer, Razi: Master of Quranic Interpretation and Theological Reasoning (Oxford University Press).
২৮. Sarah Stroumsa, 'Avicenna's Philosophical Stories: An Aristotelian Poetics Reinterpreted' available at: https://booksc.xyz/view/ 11397170/e5b9a6
২৯. Yasir Kazi, p: 293.
৩০. একটা আইডিয়া পেতে : https://bit.ly/2XFKXB8
৩১. 'Introduction' in William Shakespeare, The Merchant of Venice (Penguin Books, 1999)
৩২. Abu Ali ibn Sina, Risalah Hayy ibn Yaqzan (Tr. Form French by W.R. Trask, Princeton, NJ, 1990) in S.H. Nasr and M. Aminrazavi op. cit.
৩৩. Philip K. Hitti op. cit. p: 582.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 The Physicist: ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী

📄 The Physicist: ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী


'আচ্ছা তারিক, তোর ফেসবুক আইডির নাম Tarik Tariq ক্যান রে?'
বসে আছি সিনানের বাড়ির ছাদের ওপর। সিনান কোনো এক রিসার্চ পেপার পড়ছিল, আমাদের পাঠিয়ে দিয়ে বলল, একটু পরে আসবে।
'আসলে... বানানটা Tarik হবে নাকি Tariq হবে— সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না বলে দুটোই লিখে দিয়েছি!'
গরমের মধ্যে তারিকের নরম জোকে মজা পেলাম না। বাতাসও নেই তেমন, কাক কতগুলো চেঁচাচ্ছে। অবশেষে দেখলাম সিনান আসছে। হাতে ছোটো একটা নোটবুক।
সিনানের এ রকম অনেক নোটবুক আছে। অনেক বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করে, চিন্তা-ভাবনা করে। যখন সেরা কিছু পায় বা চরম কোনো আইডিয়া আসে মাথায়, তখন কোনো এক ছোটো নোটবুকে লিখে রাখে। হামিদুদ্দিন ফারাহির মতন। বাকিটা আশা করি সে নিজের জীবনের কাজ সমাপ্ত করে যেতে পারবে।
'এসেছিস তাহলে? তাড়াতাড়ি কর! 1001 Inventions and the World of Ibn al-Haytham দেখার পর ইবনুল হাইসামের ব্যাপারে ফ্যাক্টগুলো জানার খুব ইচ্ছা হচ্ছে।'
বলতে শুরু করল সিনান— 'হাসান আল হাইসাম খুব জনপ্রিয় বিজ্ঞানী।'
'মুহাম্মাদ আল খাওয়ারিজমি মারা গিয়েছেন অনেক দিন হলো। লোকে তো কাভালিয়েরি, লিউয়েনহয়েক, দেকার্ত, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও সবার গুণ গান গেয়েই যাচ্ছে!'
'তারিক জিজ্ঞেস করল—'এই জনপ্রিয়তার কারণ কী?'
'কারণ তো অাখি, একটু পরই জানতে পারবি।'
'ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী!' তারিক ধাক্কা খেল।
'হুম। তিনিই আসল পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক। আমাদের ফিজিক্স বইয়ে তো রজার বেকনের নাম লেখা। মূলত সব জায়গায় তার নাম থাকে। একদম ভুল। রজার বেকন সর্বপ্রথম এটি ইউরোপে আনেন, ইতিহাসে না। তারপর আবার তার এটার ওপর নিজের প্র্যাকটিস রং চড়িয়ে বলা হয়েছে। এই বিকৃত ইতিহাসটা দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়। মুসলিমদের মধ্যে ইবনুল হাইসামই প্রথম গ্রিকদের পুরাপুরি রিজেক্ট করেন। প্রত্যেকটা বৈজ্ঞানিক কাজের কঠোরভাবে পরীক্ষা করার কাজ ইবনুল হাইসামই প্রথম করেন। এর আগে অনেক গ্রিক এ ব্যাপারে জানত, তবে তারা তা প্র্যাকটিস করত না। নিজের মত কীভাবে প্রমাণ করতে হবে—সবাই এটা নিয়েই ব্যস্ত ছিল।
সাধারণভাবে উনিশ শতকের আগে বিজ্ঞান বলতে কিছু ছিল না। তার আগে সায়েন্স ছিল মূলত প্রাকৃতিক দর্শন। তখন এমন অনেক জিনিসকেই বিজ্ঞান বলা হতো, যা আমরা বর্তমানে কখনোই বিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি দেবো না। ইবনুল হাইসাম মূলত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির শুরুটা করেছিলেন। বর্তমানে অসংখ্য পদ্ধতি আছে। একেক বিষয়ে একেক পদ্ধতি। আমরা একে পরীক্ষামূলক পদ্ধতি বলি। বিজ্ঞানে অনেক ক্ষেত্রে এক্সপেরিমেন্ট করাও যায় না। যেমন—তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান। তবে ইবনুল হাইসামের সাথে এক্সপেরিমেন্টাল ও ইনডাক্টিভ মেথোড বিজ্ঞানে প্রয়োগ শুরু হয়। যার জন্য তাকে প্রথম বিজ্ঞানী বলে দাবি করা হয়।
বেকনে ফিরে আসি। রজার বেকন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কৃতিত্ব ইবনুল হাইসামকে না দিয়ে দিয়েছেন পিটার পেরেগ্রিনাসকে। এর অবশ্য কারণ ছিল। ইবনুল হাইসামকে কৃতিত্ব দিলে খ্রিষ্টান সমাজে গ্রহণযোগ্যতা হারানোর সম্ভাবনা ছিল। বেকন অবশ্য পরে আরবি আর আরবি বিজ্ঞানের জ্ঞানকে সত্য জ্ঞানের একমাত্র পথ বলে স্বীকার করেছিলেন। তার ওপর ইসলামি প্রভাব নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে। কয়েক দিন আগে স্কুলে ম্যান্ডোনেটের কথা বলেছিলাম, মনে আছে?'
'আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝেছি।' আমি তাড়া দিলাম—'এবার কাজের আলাপে ঢোক।' তারিক মুখ ঝামটা মেরে বলল—'তো এতক্ষণ কি আকামের কথা হয়েছে নাকি?'
'আরে, কাজের কথা মানে ইবনুল হাইসামের কাজকর্মের কথা বুঝিয়েছি।'
সিনান আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলল—'আরে আসছি তো ওই আলোচনায়। তবে আরেকটা কথা শোন। দেখবি, অনেকে বলবে—ইবনুল হাইসাম প্রবক্তা, তবে জনক দেকার্ত, গ্যালিলিও ও ফ্রান্সিস বেকন। কিন্তু এই কথাটাও ভুল। দেকার্ত আর ফ্রান্সিস বেকন সতেরোশো শতাব্দীতে যা বলেন, ইবনুল হাইসাম সেটাই করে দিয়ে গিয়েছেন দশম শতকে। ইবনুল হাইসামের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি—যেখানে তিনি অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন, যে প্রক্রিয়ায় তিনি গবেষণা করতেন, তা সন্দেহাতীতভাবে আধুনিক পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রথম চিহ্ন এবং পরবর্তী সময়ে গ্যালিলিও, দেকার্ত আর ফ্রান্সিস বেকন যা প্রতিষ্ঠা করেন তা-ই। আর রজার বেকনের মাধ্যমে একটা চেইনও তৈরি করা সম্ভব। তাই খেতাবটা ইবনুল হাইসামের প্রাপ্য। বর্তমানে একাধিক ইতিহাসবিদ বলেন, ইবনুল হাইসামের কাজগুলো পড়লে পুরোপুরি মডার্ন সায়েন্স নিয়ে লেখা বইয়ের মতো লাগে। অর্থাৎ কেবল প্রাকৃতিক দর্শনের দিক থেকেই তিনি প্রথম বিজ্ঞানী না; মডার্ন সায়েন্সের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও প্রথম বিজ্ঞানী।'
'ওফ! জিনিয়াস।'
'আমাকে বললি নাকি?'
'তোর মতো গরিবকে কে বলবে... সামনে যা!'
'ইবনুল হাইসাম অপটিক্স আর চোখের গঠনসংক্রান্ত বিজ্ঞানকে আলাদা করে দেখেছেন। তিনি উদ্‌ঘাটিত করেন কীভাবে আমরা দেখি। দিগন্তে চাঁদ-সূর্যকে বড়ো কেন দেখায়, তার সমাধান তিনি বের করেন। এটা আসলে আমাদের মস্তিষ্কের ভ্রম। ট্রপস্ফিয়ারের দূরত্ব নির্ণয় করেছেন সমুদ্র সমতল থেকে ১৬ কিলোমিটার। আধুনিক হিসাবে যদিও গড়ে ১৩ কিলোমিটার, কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া এত দূর আসাও-বা কম কী? সূর্য দিগন্তের ১৯ ডিগ্রি নিচে থাকা অবস্থায় টোয়াইলাইট হয়—এটা ওই সময়ে তার গবেষণার ফল। ইতিহাসে এসব উল্লিখিত বিষয়সমূহের প্রথম হিসাব।'
'টোয়াইলাইট সিরিজ তো এই কয়েক বছর আগের মুভি।' আমি বললাম। 'উফ!' তারিক বলল—'টোয়াইলাইট মানে গোধূলি, গোধূলি! এখন আবার বলি গোধূলি! গোধূলি!'
সিনান অধৈর্য হয়ে বলল—'আহ! বারবার প্রসঙ্গ ঘোরাস কেন? ফিজিক্স বইয়ে ঢুকি, চল। প্রতিসরণের অধ্যায়ে স্নেলের নাম দেওয়া আছে না প্রতিসরণের দ্বিতীয় সূত্রের জন্য? মূলত ইবনুল হাইসাম প্রায় এটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। কর্ড ব্যবহার না করে ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করলেই তিনি সেখানে পৌঁছে যেতেন। তবে তার আগে ইবনে সাহল এটি প্রমাণ করাতে সফল হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো জিম আল খালিলির মতে স্নেলের সূত্রকে ইবনে সাহলের সূত্র বলা উচিত। ২০১৮ সালের নতুন বইয়ে আবার ফ্রেনেলের নাম এসেছে।
যাহোক, ইবনুল হাইসাম থেকে যে প্রতিসরণ আর প্রতিফলন দুটিরই নিয়ম এসেছে—তার জন্য তো তাকে সম্মান দেওয়া হলো না। আলো সরল পথে চলার ধারণা তো প্রতিষ্ঠিত করেছেনই, প্রতিফলনের সূত্র দুটো আর প্রতিসরণের প্রথম সূত্রও দিয়েছেন; ইভেন দ্বিতীয়টাও প্রায় প্রতিষ্ঠিত করেই ফেলেছিলেন। প্রতিসরণের অন্যান্য মৌলিক জিনিস তো আছেই। যেমন—বায়ু, পানি, গ্লাস ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর গতির কারণে কীভাবে প্রতিসরণ হয়—তা বের করেন। ক্যামেরা অবসকিউরা নিয়ে ইবনুল হাইসামের অসাধারণ কাজের কথা তো লাইব্রেরিয়ানের মুখ থেকেই শুনেছিলাম। লিউয়েনহোয়েকের মাইক্রোস্কোপ আর গ্যালিলিও'র টেলিস্কোপ বানানোর পথ তিনি করে দেন ইবনুল হাইসাম। এত কিছুর পরও আলোর অধ্যায়গুলোতে তার নাম দেওয়া হলো না! কাজটা কি ঠিক হলো?'
'চল, আলো ছেড়ে এগিয়ে যাই। তিনি কোট্যানজেন্টের সূত্র দেন, ক্যালকুলাসের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করে তিনি মত দেন এটা বায়ুমণ্ডলের চেয়ে অনেক দূরে। গ্র্যাভিটি সম্পর্কেও জানতেন। আসলে তিনি একা নয়; আরও কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী মহাকর্ষ নিয়ে লেখালিখি করেন। ইবনুল হাইসাম এক ভরের বস্তু দিয়ে অন্য ভরের বস্তুকে আকর্ষণের ব্যাপারটি লিখেন। মানে, মহাবিশ্বের প্রত্যেক বস্তু আরেক বস্তুকে আকর্ষণ করার ওই সূত্র আরকি।'
'হুম, বুঝতে পেরেছি।' তারিকের জবাব।
সিনান মুখে মুচকি হাসি রেখে বলতে থাকল— 'যেসব জিনিস ইবনুল হাইসাম করে ফেলেছিলেন, কিন্তু তার অনেক পরে অন্যান্য বিজ্ঞানীরা তা করেন এবং সেসব তাদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তন্মধ্যে কয়েকটি Wilson's Theorem, Principle of Inertia—নিউটনের গতির প্রথম সূত্র, Fermat's Principle of Least Time, Ruffini-Horner Algorithm, Cauchy-Riemann integral-এর একটা সহজ রূপ, Stiles-Crawford Effect, Aguilonius's Horopter, Helmholtz's Principle of Unconscious Inference, Hering's Law of Equal Innervation, Panum's Fusional Area, Bloch's Law.'
'বলছিস যে এত কিছু, সব কি বুঝিস?' আমি বললাম।
'না সব...'
তারিক বলতে দিলো না—'হে হে! শান্তি পাইলাম।'
সিনান মূল আলোচনা চালিয়ে গেল—'এখানে ফারম্যাটের যে নীতিটা আছে, সেটা আমরা এইচএসসির ফিজিক্স সেকেন্ড পেপারে পাব। সেখানেও স্বাভাবিকভাবেই ইবনুল হাইসামের নাম পাবি না।'
আমি বললাম—'তোকে আগেও দেখেছি এইচএসসির বই তুলে আনতে। ভাইরে ভাই, এখনই এইচএসসির পড়া পড়িস? আমরা এখানে কেবল এসএসসি নিয়েই কূল-কিনারা পাচ্ছি না।'
সিনান হেসে দিয়ে বলতে থাকল—'ইবনুল হাইসাম চোখের পরিপূর্ণ বর্ণনা দেন। স্পষ্টভাবে চোখের বিভিন্ন অংশ আলাদা করেন। স্ক্লেরা, কর্নিয়া, করয়েড, আইরিস, রেটিনা, অপটিক নার্ভ, অ্যাকুয়াস হিউমার, ভিট্রিয়াস হিউমারের ব্যাখ্যা দেন। বস্তুর প্রতিবিম্ব চোখের রেটিনায় গঠিত হওয়ার কথা বলেন। Lens শব্দটি ইবনুল হাইসামের দেওয়া অ্যারাবিক নাম "আদাসা” থেকে এসেছে। কর্নিয়াও এসেছে কারনিয়া থেকে। চশমা আর ম্যাগ্নিফাইয়িং গ্লাস তৈরির পথিকৃৎ তিনিই। বর্তমানের ক্যামেরা শব্দটি এসেছে তার দেওয়া অ্যারাবিক "কামারা” থেকে। অনেক কিছু বুঝতে না পারায় এখন সেগুলো বলতে পারলাম না। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে বুঝব।
এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ভার্সিটিতে ইবনুল হাইসামের রেফারেন্স দেওয়া হয়। আর বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশে তার নাম লুকানো হয়। তার অপটিক্সের বই কিতাব আল মানাজির সেই বিপ্লব টের পাওয়া বই। J.F. Allen-এর মতে, ১০ম শতাব্দীতে ইবনুল হাইসামের ২০ শতাব্দীর মস্তিষ্ক ছিল। আর দেখ, এখানে কত কিছু পরে নিউটনের নামে গিয়েছে। ক্যালকুলাস, গ্র্যাভিটি, জড়তার সূত্র। নিউটনের বিখ্যাত পরীক্ষার কথা শুনেছিস না? একটা প্রিজম দিয়ে সূর্যের আলোর সেই পরীক্ষা—এটা ইবনুল হাইসাম আগেই করেছিলেন।
নিরাশার হাসি নিয়ে আমি বললাম—'আইজ্যাক নিউটন স্যার বলেছিলেন—"If I have seen further, it is by standing on the shoulders of giants." যদি জানতে পারতাম এই দানবগুলো কারা!'
তারিক আমাকে আশা দিতে চাইল—'নিউটন তো ইবনুল হাইসামের বই পড়েও থাকতে পারেন। তার আগের সেরা সেরা বিজ্ঞানীরাও তো পড়েছিলেন—কেপলার, দেকার্ত, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও। আর নিউটনের লেখায় তো ইবনে তোফায়েলের স্পষ্ট ছাপ আছে।'
'কিন্তু...'
সিনান মুচকি হেসে বলল—'নিউটন তার লাইব্রেরিতে ইবনুল হাইসামের বই রেখেছিলেন।'
'কি! আসলে?'
'হ্যাঁ।'
মুখে স্বভাবসুলভ হাসি ফুটিয়ে বললাম—'তাহলে নিউটনের আইডিয়াগুলো গাছের ওই আপেল থেকে পড়েনি! ইবনুল হাইসামের বই শেলফের যে তাকে রাখা ছিল, সেখান থেকে পড়েছে!'

টিকাঃ
১. Michael H. Morgan p: 97, 104; Salim al-Hassani op. cit. p: 56, 306; Howard R. Turner, Science in Medieval Islam: An Illustrated Introduction. (University of Texas Press, 2006) p: 197
২. Michael H. Morgan, p: 105 (ibn al-Haytham must be considered an equal of Einstein, though largely lost to history)
৩. Bradley Steffens, Ibn Al-Haytham: First Scientist (Morgan Reynolds Publishing, 2007); Salim al-Hassani op. cit. p: 55; Michael H. Morgan p: 103; David C. Lindberg. 'Candidates for Revolutionary Status' in The Beginnings of Western Science op. cit.
৪. Kara Rogers op. cit. p: 38
৫. Salim al-Hassani op. cit. p: 55
৬. Ertan Salik. 'ibn al-Haytham: First Scientist' The Fountain Magazine.
৭. Robert Briffault, The Making of Humanity p: 201: Knowledge of Arabic and Arabian Science was for his contemporaries the only way to true knowledge.
৮. এখানে আরবি জ্ঞান বলতে ইসলামি জ্ঞান উদ্দেশ্য। রজার বেকন জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলামকে গুরুত্ব দিলেও ধর্মের দিক থেকে ইসলামের প্রতি বিরূপ মানসিকতা ধারণ করতেন।
৯. J. al-Khalili, Pathfinders loc. 3403
১০. Roshdi Rashed (edt), Encyclopedia of the History of Arabic Science (Routledge, 1996), vol. 2, p: 350.
১১. Howard R. Turner, Science in Medieval Islam op. cit. p: 196.
১২. Science in a Golden Age (AlJazeera) এর optics অংশ দেখুন। ইবনুল হাইসামের কিছু পরীক্ষা প্র্যাক্টিক্যালি দেখতেও পারবেন এখানে।
১৩. 'Medieval Science among the Arabians' in H. S. Williams and E. H. Williams, A History of Science (Harper and Brothers, 1904)
১৪. Seyyed Hossain Nasr, p: 129
১৫. Science in a Golden Age (AlJazeera)-এর optics অংশ দেখুন।
১৬. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 335.
১৭. M. Shamsher Ali, p: 107
১৮. M. Shamsher Ali, p: 110
১৯. বিস্তারিত জানতে, Roshdi Rashed, vol. 2, p: 318, 336.
২০. Howard R. Turner, Science in Medieval Islam: An Illustrate Introduction. p: 196.
২১. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী, ইসলামি বিশ্বকোষ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন দ্বিতীয় সংস্করণ, জুন ২০০৪), খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা: ৬৫২ থেকে
২২. Ehsan Masood, p: 145; Michael H. Morgan, p: 104.
২৩. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 4, p: 653
২৪. Michael H. Morgan p: 104.
২৫. The theorem is: if p is prime, then the polynomial 1+(p-1)! is divisible by p. Salim al-Hassani, p: 85.
২৬. সূত্রটি হলো : বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু সুষম দ্রুতিতে সরল পথে চলতে থাকবে। Seyyed Hossain Nasr, p: 128
২৭. সূত্রটি হলো: যে পথে গেলে সর্বাপেক্ষা কম সময় লাগে, আলো সে পথই অবলম্বন করে। M. Shamsher Ali, ১১২; আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী vol. 4, p: 651; Arun Bala, The Dialogue of Civilizations (Palgrave Macmillan, 2006) p: 165.
২৮. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 51
২৯. Roshdi Rashed, vol. 2, p: 97; Ian P. Howard. 'Alhazen's Neglected Discoveries of Visual Phenomena' Perception. 25 (1996), pp: 1203-1217.
৩০. Michael H. Morgan, p: 103
৩১. M. Shamsher Ali, p: 263.
৩২. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol. 4, p: 651.
৩৩. ইবনুল হাইসামের পরীক্ষা প্র্যাক্টিক্যালি দেখতে চাইলে : J. al-Khalili 'Science and Islam on BBC Four, (Oxford Scientific Films) এ ছাড়া দেখুন Science in A Golden Age-এর optics অংশ।
৩৪. নিউটনের ওপর মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রভাব সংক্ষেপে পড়ুন : আরমান ফিরমান। 'স্যার আইজ্যাক নিউটনের ওপর মুসলিম প্রভাব'।।
৩৫. Salim al-Hassani, p: 35.
৩৬. মুসলিম বিজ্ঞানীদের থেকে নিউটনের নেওয়ার ব্যাপারটি জর্জ সারটনও উল্লেখ করেন (পরোক্ষভাবে) : Introduction to the History of Science Vol. 3.

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 মেকানিক্যাল মাইন্ড : মধ্যযুগে রোবটিক্স

📄 মেকানিক্যাল মাইন্ড : মধ্যযুগে রোবটিক্স


'রোবট! এদিক আয়।'
রোবট বলে ডাকে সবাই, খারাপ লাগলেও বাস্তবতা মেনে নিলাম। কিন্তু এত কাছের বন্ধু যদি এমন করে, তাহলে খুব খারাপ লাগে। তা-ও ক্লাসের মধ্যে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ডাকছে!
তারিক বলল—'সম্মানিত সহপাঠীবৃন্দ! আমরা এখানে যে অসাধারণ যন্ত্রটি দেখতে পারছি...' সবাই হেসে উঠল। '....এটির আবিষ্কারক বদিউজ্জামান আল জাজারি। এই রোবটজাতির সূচনা হয়েছিল তারই হাতে...' সবাই আবার হেসে উঠল। 'এই... এইক... এটা তো হাসার কিছু না... সত্য ইতিহাস।' এবার কেউ হাসল না, কিন্তু আমি হেসে উঠলাম।
সিনান তারিককে সমর্থন দিলো—'না, হাসছিস কেন তোরা? তারিকের কথা ঠিক আছে তো।' সবাই অবশেষে মনোযোগ দিলো।
ভালো ছাত্র হওয়ায় সবাই সিনানকে দাম দেয়—'ইতিহাসের প্রথম রোবট, আশ্চর্যজনক কিছু যন্ত্র—যেগুলো পানি পরিবেশন করত, বাদ্য বাজাত নিজে নিজে। তিনিই সর্বপ্রথম এমন যন্ত্র তৈরি করেন, যেসব এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারত। তিনি বানিয়েছিলেন রোবটদের একটি ব্যান্ড; রাজকীয় মেহমানরা এলে সেসব ছেড়ে দেওয়া হতো। তিনি ময়ূরের মতো দেখতে কিছু রোবট বানিয়েছিলেন, সেগুলো অজুর পানি ঢেলে দিত এবং মানুষ অজু করতেন। কিছু কিছু রোবট আবার তোয়ালাও দিত!'
'কী পাগলামি! মধ্যযুগে অটোমেটেড মেকানিক্স? রোবট!' বলল কেউ কেউ।
সিনান নাটকীয়তা বাদ দিয়ে মুচকি হেসে বলল— 'বদিউজ্জামান ইবনে ইসমাঈল আল জাজারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন মাস্টারমাইন্ড, বুঝলি? তার বইয়ে ৫০টিরও বেশি অসাধারণ যন্ত্রের বর্ণনা আছে। ছোটো থাকতে একদিন খেয়াল করলেন, হাত পায়ের মতো ছোটো ছোটো জিনিস মিলে যেমন একটি দেহ গঠিত হয়, তেমন ছোটো ছোটো মেকানিক্যাল জিনিস একত্র করলে অনেক বড়ো কিছু হয় বা অসাধারণ কিছু হয়। তার বেশিরভাগ যন্ত্র অবশ্য পানি আনা-নেওয়া রিলেটেড। ঘড়ি বানাতেও তিনি সেই রকম দক্ষতা দেখান। ইতিহাসের সেরা একটা আবিষ্কার স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের হাতে অনেক চমৎকার মেকানিক্যাল ঘড়ি তৈরি হয়। এখন তো আমাদের হজম করানো হয়, ইউরোপে ১৪শ শতাব্দীতে অটোমেটেড ঘড়ির আবিষ্কার হয়। এটা বিরাট ভুল। ইউরোসেন্ট্রিক স্কলাররা এ কথা বলে ঠিক আছে, কিন্তু আবার অন্য মুখে স্বীকার করে—কে আবিষ্কার করেছে, তার কোনো আইডিয়া তাদের নেই।' কয়েকজন হেসে দিলো।
'অটোমেটেড জিনিসপাতি অনেক আগে থেকেই ছিল; গ্রিকদের মাঝে, চাইনিজদের মাঝে। ইউরোপে মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে অটোমেটেড ঘড়ি পৌঁছায়। অবশ্য ইন্ডিয়ান ট্র্যান্সমিশন রুটও আছে। কিন্তু ইউরোপে জিনিসটার উৎপত্তি একেবারে ফাঁকা কথা।
আল জাজারি অনেক ধরনের ঘড়ি বানিয়েছিলেন। Elephant Clock, Candle Clock, Citadel Clock, Clock of the Boat, Castle Clock, Peacock Clock হলো বিভিন্ন ধরন। সবগুলোর মূল প্রিন্সিপাল একই—প্রেশারাইজড পানি ব্যবহার করে এসব অটোমেটেড করা হয়। সবগুলোই Water Clock; ডিজাইনে ভিন্নতা। ডিজাইনে ভিন্নতা আনতে গিয়ে অবশ্য টেকনোলজিক্যাল প্রয়োগ ও পরিবর্তনেও সৃজনশীলতা আনতে হয়। তিনি অ্যাস্ট্রনমিক্যাল ক্লক বানিয়েছিলেন—যা সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহের মুভমেন্টের সময় প্রদর্শন করত। ঘড়ি নিয়ে তার ম্যাগনাম ওপাস আল জামি বাইনাল ইলম ওয়াল আমালুন-নাফি ফি সিনাআত আল হিয়াল গ্রন্থে তিনি ১০টি অধ্যায় লিখেছেন।
তিনি রক্ত পরিমাপের একটা যন্ত্রও বানিয়েছেন। এর আগে ইতিহাসে রক্ত পরিমাপ করতে পারে এমন কোনো যন্ত্রের রেকর্ড নেই। আরবের কনটেক্সটে তার আবিষ্কারের অনেকগুলোই ওয়াটার পাম্প। তার বানানো যন্ত্র দিয়ে কোনো আঙুল নাড়ানো ছাড়া বিপুল পরিমাণে পানি তোলা যেত। মেকানিক্স জটিল বিষয়। এসব বুঝতে ভয়ংকর প্যারা খেতে হয়। তাই তার যন্ত্রগুলোর বর্ণনা দিতে পারলাম না। শুনলে বুঝতি তার ট্যালেন্ট। যেমন—তিনি Double acting principle-এর অগ্রদূত। কিন্তু এটা কী, আমি ঠিক বুঝি নাই। তোরা কেউ জানতে পারলে জানাস।'
খসখস করে কোথাও কাগজে কিছু লেখার শব্দ হলো। কেউ মনে হয় টুুকে নিয়েছে।
সিনান বলে চলল—'তিনি চাষিদের জন্য এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, যার কথা তারা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারত না। তার অভিনব ওয়াটার পাম্পের কারণে পাইপের মাধ্যমে পানি চাষিদের জমি পর্যন্ত চলে যাচ্ছিল! সেট করা টাইম পরপর পানি আসত। মুসলিম বিশ্বে পুরো বিপ্লব ঘটে যায় এসব পাম্পের ফলে। হাসপাতালের রোগী হোক কিংবা মসজিদের মুসল্লি, সবার জন্য পানি রেডি। কারও নদী পর্যন্ত হেঁটে যেতে হতো না। তিনি এর জন্য Suction Pipe, Suction Pump, Double-Acting Pump এবং Double Acting Piston Cylinder Pump আবিষ্কার করেন।'
'তোরা যাদের মুসলিম বিজ্ঞানী বলিস, এরা কেউ আসলে হুজুর টাইপ না।' দিলিপ বলল—'ধর্মকর্ম করতে গেলে বিজ্ঞান হয় না।'
সিনান জবাব দিলো— 'একটু দ্বিমত আছে। বদিউজ্জামান আল জাজারি ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন। বলা বাহুল্য, মেকানিক্স ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষের দুআ কামিয়েছেন তিনি। একজন মানুষ বিজ্ঞান করে কীভাবে জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে পারেন, তার আদর্শ উদাহরণ তিনি। ক্যারোলিন অ্যালউড সরাসরি বলেছেন—“জাজারির চমৎকার আবিষ্কারের পেছনে কুরআনের বিশাল প্রভাব আছে।”'
এমন সময় যথারীতি স্যার এসে আমাদের সকল মজা পণ্ড করে দিলেন।
টিফিন টাইম এখন সিনান লেকচার টাইম! ক্লাসের প্রায় পনেরো-বিশজন এখানে আছি, সবার দৃষ্টি সিনানের দিকে নিবদ্ধ। আমাদের এখন খাবারের খিদে নেই; শুধু জানার খিদে আছে। প্রথমেই প্রশ্নের সম্মুখীন— 'সিনান, তুই আর যা-ই বলিস, এই রোবটের ব্যাপারটা বিশ্বাস করা কোনোমতেই সম্ভব না।' অর্ণব বলল।
সিনান কিছুটা জোরে হেসে দিয়ে বলল— 'অটোমেটেড জিনিসপাতি মুসলিম বিশ্বে নতুন কিছু তো নয়। এর আগেও তো বনু মুসা এই ফিল্ডে খেলা দেখিয়েছেন। তবে প্রথম ঘটনা সম্ভবত সুদূর উমর-এর সময়। পারস্য থেকে আসা একজন উমর-কে বলল, সে বাতাস ব্যবহার করে মিল বানাতে পারবে। সেই সময় ৭ম শতকেই মুসলিম বিশ্বে উইন্ডমিল ছিল। বর্তমানে আমরা ইলেক্ট্রিসিটি ইউজ করি, তখন সবচেয়ে সফিস্টিকেটেড টেকনোলজি চলত উচ্চচাপে থাকা বাতাস ও পানি দিয়ে। প্রিন্সিপাল একই। উনিশ শতক পর্যন্ত এর তুলনায় উন্নত টেবিল ইউরোপেও ছিল না। এবার মজার একটা ঘটনা বলি শোন, হারুনুর রশিদ এর সময় তিনি ইউরোপের ইতিহাসের সেরা শাসক শারলামেইনকে কিছু উপহার পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি ওয়াটার ক্লকও ছিল।'
'আর আবু আব্বাস নামের একটি হাতি!' তারিক হেসে দিয়ে বলল।
'হ্যাঁ। যাহোক, শারলামেইন আর তার অফিসারদের তো চোখ ছানাবড়া। শারলামেইনসহ সবাই ধরেই নিল, ঘড়িটা কোনো জাদুকরি যন্ত্র!'
'হা হা! ইউরোপের সর্বকালের সেরা শাসকদের একজনের এই অবস্থা। মুসলিমদের বানানো সিম্পল একটি যন্ত্রকে জাদু ভেবে বসে আছে। কত্ত পিছিয়ে ছিল ইউরোপ!' তারিকের কথায় অনেকে হেসে উঠল। অনাগ্রহী কয়েকজন উঠে চলে গেল। আমরা পাত্তা দিলাম না।
'মাত্র ৩০০ বছরের ভালো অবস্থা দেখে আমরা ভেবে বসে আছি—তারাই সব।' আমার কথায় আবার সকলে গম্ভীর হলো।
সিনান চালিয়ে গেল—'তো এখানে অবিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই। মানে এগুলো মুসলিমদের কোনো নস্টালজিক দাবি না, আর এসব বলছে নন-মুসলিমরাই। মুসলিম মেকানিক্সের সবচেয়ে সেরা ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড হিল, নন-মুসলিম। একাডেমিক লেভেলে মুসলিম-অমুসলিম স্কলার দিয়ে বেশি কিছু যায়-আসে না, বুঝেছিস? কে কী পরিমাণ স্কলারলি কাজ করেছে, কার কাজের স্টাইল কী রকম, কোন মাত্রার পরিশ্রম করতে পারে—সেসব দেখে বোঝা যায়, কার লেভেল কোথায়, বিশ্বাসযোগ্য কি না। মুসলিম হলে বায়াসড, অমুসলিম হলে বিশ্বাসযোগ্য অথবা অমুসলিম হলে বায়াসড, মুসলিম হলে বিশ্বাসযোগ্য—এসব বোকামি ও অগভীরতা। কাজ দেখে বুঝতে হবে—কে কী রকম। হিলের জায়গায় কোনো মুসলিম স্কলার যদি থাকত—যার অ্যাকমপ্লিশমেন্ট হিলের মতোই, তবে তারটা অবশ্যই একই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হতো।
বদিউজ্জামানের সবচেয়ে সেরা আবিষ্কার কী জানিস? The Crankshaft। পৃথিবী পালটে দেওয়া জিনিস একখান। অনেকটা ইংরেজি এল-এর মতো দেখতে একটা দণ্ড-হাতল টাইপের; ঘোরানো যায়। খেলনা থেকে শুরু করে বিশাল বিশাল যন্ত্র—সব মেকানিক্যাল ডিভাইসের মধ্যেই ক্র্যাঙ্ক থাকে। এটা ছাড়া যন্ত্রগুলো সচল হতো না। মানে... কী বলে যে এই মানুষটার প্রশংসা করব, বুঝে উঠতে পারছি না! কতগুলো রেভোল্যুশনারি আবিষ্কার করেছেন তিনি? তার ওয়াটার পাম্পিং মেশিন, ঘড়ি, ক্র্যাঙ্ক Absolutely brilliant। আমরা তার নাম জানি না, কীভাবে ম্যান?'
বিরতি। মানে, স্যার এসে গিয়েছেন!
ছুটির ঘণ্টা বাজল। আমরা কয়েকজন অবশ্য সিনানের ওখানে।
‘কিছু স্কলার জাজারিকে Cybernetics-এর প্রথম কারিগর বলে উল্লেখ করেন। যেসব যন্ত্র জীবিত প্রাণীর মতো আচরণ করে, তাদের স্টাডিকে সাইবারনেটিক্স বলে। এখানে যন্ত্র ও মানুষের মাঝে আদান-প্রদানকে ফোকাস করা হয়। তিনি তার হিউম্যানয়েড রোবটগুলো যেভাবে কন্ট্রোল করতেন, তা সাইবারনেটিক্সের মধ্যে পড়ে—যা তাকে এই ফিল্ডের প্রথম টেকনোলজিস্ট বানায়। এর আগে অবশ্য এই টাইপের কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়, তবে সেসব তেমন উন্নতমানের ছিল না। জাজারিকে প্রথম ধরতে অনেকের সমস্যা যদি হয়ও, একজন অগ্রদূত ধরতে কারও সমস্যা হবে না। জাজারিরটাকে সাইবারনেটিক্সের ইতিহাসে Hydropower Cybernetics নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর আগে অটোমাটা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে মূল কাজ করেছেন বনু মুসা ব্রাদার্স। মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানীগণ তাদের পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের কাজের ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলেন না। কন্টিনুইটি দেখা যায়, জাজারি বনু মুসার কাজের ওপর বিল্ড করেন। কিছু জায়গায় তাদের কাজের ভুলগুলো ধরিয়ে দেন। মেকানিক্সের ক্ষেত্রে জাজারি গ্রেকো-রোমান মেথোডোলজি ভেঙে দেন। গ্রিক ও রোমানরা কেবল সিম্পল কিছু ডিভাইস তৈরি করত—যা একমুখী। জাজারি ক্যামশ্যাফট ব্যবহার করে ক্র্যাঙ্কের গতিমুখ পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। জাজারিরটা Sequential Automata। তার কাজের মাধ্যমে মেশিনারির ওপর অত্যাধিক কন্ট্রোল স্থাপিত হয়।
সিনান উপসংহার টানল—'মাইকেল এইচ মরগান আল জাজারিকে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু এটা ঠিক না, যা বুঝি। জাজারিকে আরও সেরা হিসেবে দেখি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের বীরত্ব দেখাতে গিয়ে অন্যদের নিচে নামানো ঠিক না, কিন্তু দ্যা ভিঞ্চিকে যে অতুলনীয় সুপারস্টার বানানো হয়, তিনি সেটা না। ইতিহাসবিদ জেমস ফ্র্যাঙ্কলিন বলেন—"Leonardo's published jottings on mathematics are trivial, even puerile, and show no mathematical talent whatever।" অর্থাৎ, গণিত নিয়ে জট পাকানো কাজসমূহ একেবারে নিম্নমানের, গাণিতিক উৎকর্ষের কিছুই নেই।'
কিন্তু বদিউজ্জামানের কাজগুলো প্র্যাক্টিক্যাল, এগুলো আজ পর্যন্ত জীবিত। অবশ্য, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সাথে তুলনা করার কারণ বুঝেছি, বদিউজ্জামান একজন অসাধারণ আর্টিস্টও ছিলেন। সমান দক্ষতায় নিজের যন্ত্রগুলোর ছবি এঁকে রেখেছিলেন। তবে পার্থক্য হলো—বদিউজ্জামান যা এঁকেছেন, তা নিজেই করে দেখিয়েছেন। আর লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি যা এঁকেছেন, তা অন্যরা করেছে। সম্মান অবশ্য দ্যা ভিঞ্চির এক-তৃতীয়াংশও পান না। বদিউজ্জামান আল জাজারিকে হয়তো দুনিয়ার মানুষরা চেনে না, কিন্তু তার নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে প্রতিটি ক্র্যাঙ্কে, অদৃশ্যভাবে।'

টিকাঃ
১. Hank Green, 'The Medieval Islamicate World-Crash Course History of Science #7' online video, Crash Course; Mahmut Dirik, 'al-Jazari: the Ingenious Inventor of Cybernetics and Robotics' Journal of Soft Computing and Artificial Intelligence. 1:1 (2020), pp: 1-12.
২. Howard R. Turner p: 188
৩. Salim al-Hassani op. cit. p: 50
৪. Roshdi Rashed, p: 794
৫. Donald R. Hill, Studies in Medieval Islamic Technology (Routledge, 1998) p: 23; John M. Hobson, 131.
৬. Yavuz Unat. 'Overview on al-Jazari and his Mechanical Devices' Muslim Heritage; Mahmut Dirik. Op. cit.
৭. Howard R. Turner, p: 166.
৮. Salim al-Hassani, p: 122.
৯. Science in a Golden Age-এর Mechanics অংশ দেখুন। এখানে কিছু কাজ প্র্যাক্টিক্যালি করেও দেখানো হয়েছে। Fuat Sezgin, Science and Technology in Islam (tr. Renate Sarma and Sreeramula Rajeswara Sarma, 5 vols, Institut für Geschichte der Arabisch-Islamischen Wissenschaften Westendstrasse, 2010) 5: 49-56 এ অনেক যন্ত্রের ক্লাসিক্যাল ও মডার্ন ছবি পাবেন বর্ণনাসহ। Michael H. Morgan p:173
১০. Roshdi Rashed, p: 790; Howard R. Turner p: 181.
১১. Cem Nizamoglu. 'Ingenious Clocks from Muslim Civilization that Defied the Middle Ages' Muslim Heritage.
১২. Cem Nizamoglu. 'Amazing Mechanical Devices from Muslim Civilization' Muslim Heritage.
১৩. 'Water Supply' in 'Market' in Salim al-Hassani op. cit.; Sally Ganchy and Sarah Gancher, Islam and Science, Medicine, and Technology (The Rosen Publishing Group, 2009) p: 41; বুঝতে [১] দেখুন; Mahmut Dirik op. cit;
১৪. Mahmut Dirik.; G. Nadarajan. 'Islamic Automation: A Reading of al-Jazari's The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices (1206)' Semantic Scholar.
১৫. G. Nadarajan op. cit.
১৬. 'Leonardo da Vinci' in Kara Rogers op. cit.
১৭. E. T. Bell, (New York: Dover Publications, 1992)

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 সার্জারির স্যার

📄 সার্জারির স্যার


তারিক আর আমি এসেছি স্কুল ক্যান্টিনে। সিনান আরেকটু পরে আসার কথা বলেছিল। জিয়েলিনস্কি আর ওয়াইবেলের Allah's Automata বইটি পড়ে বসে বসে।
কিছুক্ষণ পর এলো সে। এসেই বলল—‘আচ্ছা, লাইব্রেরিয়ান আমাদের কোন কোন বিজ্ঞানীর নাম যেন বলেছিলেন?’
আমি বললাম—‘আ... আব্বাস ইবনে ফিরনাস, আবুল কাসিম আল জাহরাউই, ইবনুল হাইসাম, মারইয়াম আস্তুরলাবি আর...’
‘বদিউজ্জামান আল জাজারি!’ তারিক বলল।
‘ঠিক আছে।’ সিনান বলল—‘আজ তাহলে আবুল কাসিম আল জাহরাউই হয়ে যাক।'
আমি উৎফুল্ল হলাম, ‘Oh yeah!’
একটি মাদরাসার লাইব্রেরিতে দেখা হওয়ার কথা রইল।
অনেক দূর আসতে হলো লাইব্রেরির জন্য। এলাকায় কোনো লাইব্রেরি নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করে একটার পর একটা মসজিদ বানায়, কয়েক হাজার টাকা খরচ করে একটা লাইব্রেরি বানাতে পারে না। লোকজন এলাকায় তিন-চারটি মসজিদ থাকলে আরও একটা মসজিদই বানাবে; ইসলামি লাইব্রেরি বানাতে কেউ ইচ্ছুক নয়।
‘আবুল কাসিম আল জাহরাউই সার্জারির পথিকৃৎ। আমাদের দেশে অবশ্য জনক শব্দটা চলে বেশি। তার কিতাবুল তাসরিফ-এর শুধু এক খণ্ড সার্জারি নিয়ে। এই এক খণ্ডেই বাজিমাত। ২০০-এর বেশি যন্ত্রের বর্ণনা আর ৩২টি রোগের আলোচনা আছে। যন্ত্রগুলোর অধিকাংশই তার নিজের আবিষ্কার। সার্জারির যত Do's and Don'ts আছে, প্রায় সবগুলোই বর্ণিত হয়েছে এই কিতাবে। বইয়ের এই খণ্ডটি ল্যাটিনে অনুবাদ হয়। পরের ৫০০ বছরেও বেশি সময় ধরে ইউরোপে বিশাল প্রভাব ছিল এর। রেনেসাঁসের পরেও আধুনিক পর্যায়েও তাঁর কিছু যন্ত্রপাতি আর আবিষ্কার আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। এই বইটাতেই প্রথমবারের মতো ছবি এঁকে সার্জারি বোঝানো হয়েছে। ইতিহাসে এর আগে কোনো বইয়ে এমন করে নেই।’
'অহম!' আমি বললাম।
‘রক্তক্ষরণ না থামলে ওটাকে কী বলে, জানিস? Haemophilia। আবুল কাসিম প্রথম এই রোগের বংশীয় কারণ শনাক্ত করেন। তিনিই সর্বপ্রথম Ectopic বা ওভারীয় প্রেগন্যান্সি কে অস্বাভাবিক প্রেগন্যান্সি রূপে চিহ্নিত করেন। তিনি দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর জন্য ছোটো আকারের নল, Cannula-এর ব্যবহার দেখান। Aneurysm শিরা বা ধমনি ফুলে যাওয়া চিকিৎসা পদ্ধতি বের করেন তিনি। গ্যালেনও এর চিকিৎসা আগে করেছিলেন, তবে এটাকে টিউমার ধরা হতো। জাহরাউই বলেন—“একে টিউমার ধরা ভুল হবে।” স্বয়ংক্রিয় ক্ষত হওয়ার পরও যে এর নিরাময় সম্ভব, সেটি প্রমাণ করেন আল জাহরাউই। তিনি প্রথমবারের মতো উদরসংক্রান্ত বা Abdominal Surgery-এর বিস্তৃত বর্ণনা দেন। তিনি প্রথম সার্জন, যিনি সফলভাবে অস্ত্রোপচার সেলাই করেন। ধমনি বা শিরা থেকে রক্তক্ষরণ রোধ করার জন্য সফলভাবে Thermal cauterization প্রয়োগ করেন। Thyroidectomy অর্থাৎ থাইরয়েড গ্রন্থি সরানোর সার্জারি করা প্রথম সার্জন। শিরা পেঁচিয়ে যাওয়াকে ঠিক করতে তিনি করেন—Varicose Vein Surgery। তিনি অনেক ধরনের Amputation করেন। বাংলায় কী বলে একে? অঙ্গচ্ছেদ? অঙ্গচ্ছেদ বলে সম্ভবত। শরীরে পচে যাওয়া অংশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কেটে ফেলে দিতেন তিনি। ১ হাজার বছর আগে এসব এমন হাই কোয়ালিটিতে হতো সত্যি বিস্ময়কর।’
'কী রে, এত বেশি জায়গায় প্রথম কেন!'
‘এটা বাদেও Adenoids, Gynecomastia, Circumcision, Hermaphrodites, Imperforate anus, and Supernumerary and Webbed fingers-এর সৃজনশীল বর্ণনা দিয়েছেন জাহরাউই। Neurosurgery আর Neurological diagnosis-এরও পথিকৃৎ উনি। মাথায় আঘাত, খুলির ফাটল, মেরুদণ্ডসংক্রান্ত ব্যথা, মস্তিষ্কে তরল একধরনের পদার্থ নিঃসরণের ফলে মাথা বড়ো হয়ে যাওয়া—যা হলো Hydrocephalus, মস্তিষ্ক ও সুষুম্না কাণ্ডের শক্ত বহিঃঝিল্লির নিচে তরল প্রবাহ—যাকে বলে Subdural Effusion আর মাথাব্যথার চিকিৎসা করেন। Hydrocephalus-এর ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টভাবেই মস্তিষ্কের ভেতর তরল পদার্থের কথা উল্লেখ করেন। তিনি সিম্পল কিছু জিনিস ধরতে পারেন, যা তার আগের বেশিরভাগ শল্যচিকিৎসকরাই ধরতে পারেননি। অকারণে শরীরে ব্যথা হয় না; এটা রোগের লক্ষণ, মেরুদণ্ডে ফাটলের কারণে প্যারালাইসিস হতে পারে ইত্যাদি।
সার্জারির জন্য তিনি অসংখ্য যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। মূত্রনালির ভেতরে পর্যবেক্ষণ। গলা, কান ইত্যাদি অংশ থেকে বাইরের বস্তু সরানো ইত্যাদি কাজ করতে গিয়ে যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হয়। মূত্রথলির পাথর সরানোর জন্য বর্তমান সময়ের লিথোরাইটের মতো একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেন তিনি। তার এই পদ্ধতির কারণে লিথোটমির ব্যাপক উন্নতি হয়।'
'কী জিনিস এটা?' আমার জিজ্ঞাসা।
সিনান বলল—'মূত্রাশয় থেকে পাথর সরানোর একটা সিস্টেম। ইউরোপের পদ্ধতিতে তখন রোগী অনেক কষ্ট পেত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারাও যেত। আল জাহরাউই এমন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যেটায় মূত্রথলির ছিদ্র করাই লাগত না। নাকের ফিস্টুলার চিকিৎসায় তিনি Scraper আবিষ্কার করেন। দাঁত রিপ্লেস করা, দাঁতের পার্শ্ববর্তী স্থানের অর্থাৎ Periodontal disease-এর রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করা—এগুলোতেও তিনি ফার্স্ট। সাধারণভাবে তখন সার্জারির পর ইনফেকশন ঠেকানোর কোনো রকম চিন্তা ডাক্তাররা করত না। তবে জাহরাউই অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল কেমিক্যাল ব্যবহার করতেন সার্জারির পর। এমনকী তিনি রোগীর ওপর অ্যানেস্থেশিয়াও প্রয়োগ করতেন! তার যন্ত্রপাতিগুলো এই ১০০০ বছর পরও ছোটোখাটো কিছু পরিবর্তন করে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতই সূক্ষ্ম আর অ্যাকুরেট ছিল! ইউরোপে সার্জারির উত্থানে এই যন্ত্রগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত বেশি। '
'হয়েছে أخي হয়েছে। মাথা-টাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যা বলেছিস, এমনিতেই অনেক বেশি হয়ে গেছে...'
'চুপ থাক! কষ্ট করে মুখস্থ করেছি, এখন বলব। তার ক্যাটগাট আবিষ্কারের গল্পটা জোস। তিনি একদিন দেখলেন, তার গিটারের তারগুলো বাঁদরে খেয়ে ফেলেছে...'
'ডাক্তার আবার গিটারও বাজায়?' তারিক বলল।
'তো এখান থেকে তিনি গিটারের তারের উপাদানটা দিয়ে ক্যাটগাট বানান। বাঁদর যেহেতু জিনিসটা খেয়ে ফেলেছে, তাহলে নিশ্চয়ই জিনিসটা শরীরের ভেতর দ্রবীভূত হবে। ক্যাটগাট তো ব্যবহার করা হয় শরীরের ভেতরে সেলাই মারতে। এটা শরীরে দ্রবীভূত না হলে ঝামেলা আছে। আবুল কাসিমের মাথার বুদ্ধি দেখ! আবার মরা ফিটাস, বায়োলজি বইয়ে পড়েছি—এটি ভ্রূণ বিকাশের একটি স্তর, একে বের করে আনার জন্য একধরনের ফোরসেপসও আবিষ্কার করেন। তিনি প্রথম দিককার প্লাস্টিক সার্জনদের একজন।'
'মানে কী! তিনি প্লাস্টিক সার্জারি করেছিলেন?'
'হুম। পাতন আর ঊর্ধ্বপাতন পদ্ধতিতে ওষুধও বানিয়ে ফেলেছেন। এর কারণে পরে বিশালসংখ্যক ওষুধ বানানো সম্ভব হয়। লেড মনোক্সাইড, সাদা সিসা, লেড সালফাইড, পোড়া কপার, মারকাসাইট আয়রন সালফাইড, হলুদ আর্সেনিক আর প্রচুর ভিট্রিওল আর লবণ তৈরির প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেন উনি। ব্যথা নিরাময়ে তার ড্রাই প্রসেসিং-এর একটা মেথড ছিল—যা অত্যন্ত স্মরণীয় একটা কাজ। তার মতে, কসমেটিক্স হলো মেডিকেল সায়েন্সের বিষয়। তিনি একে বলতেন আইয়াত আল জিনাহ বা সৌন্দর্যের ওষুধবিজ্ঞান। বিভিন্ন ধরনের পারফিউম আর সলিড ডিওডরেন্টের আদিরূপ তার হাত দিয়েই এসেছে। '
তারিক হাসি দিয়ে বলল—'তাকেই তো দরকার!' হাসতে হাসতে ঘুসি মারলাম তারিকের কাঁধে।
সিনান অনবরত বলে চলেছে— 'আল জাহরাউই ৩০ খণ্ডের তাসরিফ-এর একদম শেষের খণ্ডটা শল্যচিকিৎসার। অন্যগুলোতে তিনি রোগবিদ্যা বা Pathology, অস্থি চিকিৎসাবিদ্যা বা Orthopaedics, Ophthalmology বা চোখের নানা হাবিজাবি, ওষুধসংক্রান্ত বিদ্যা বা Pharmacology, ডেন্টিস্ট্রি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, বাচ্চা পয়দা এই সব আলোচনা আছে। তার মতে, মেডিকেলের অন্য সব শাখায় খুব অভিজ্ঞ হওয়ার পরেই সার্জারি করতে যাওয়া উচিত। এটাকে তিনি চিকিৎসাবিদ্যার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ বলেন। এজন্যই শেষ খণ্ডে এটা আনা। পাক্কা ৫০ বছরের পরিশ্রমের ফল। বইয়ের মধ্যে তিনি ডাক্তার আর রোগীর মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। ওই সময়ে তার এই জিনিস নিয়ে লেখা অবাক করার মতো। টিচার হিসেবে ভালো ছিলেন। স্টুডেন্টদের নিজের সন্তান ডাকতেন। বলতেন, সব স্টুডেন্টেরই কুরআন, হাদিস, অ্যাস্ট্রনমি, ম্যাথ যে যা স্টাডি করে, সেসবে একটা লেভেলে এসে গেলে চিকিৎসাবিজ্ঞান স্টাডি করা উচিত।
Ambroise Pare, Emil Kocher, Guy de Chauliac, Harvey Cushing, Jacques Dalechamps এবং আরও অনেক ওয়েস্টার্ন সায়েন্টিস্ট পরবর্তী সময়ে যা করেছেন, তার অনেক কিছুই জাহরাউই একা একা আগে করে রেখে গিয়েছেন। এখানে কয়েকজন তার নাম নেন, বেশিরভাগ নেন না বা ইন্ডিপেন্ডেন্টলি কাজ করেছেন। জাহরাউই-এর বই তারা পড়েছেন কি না বা অন্য কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন কি না—সেসব ক্ষেত্রে অর্থাৎ এখনও তেমন ট্রান্সমিশনের কাজ হয়নি। তার টাইটেল হলো—Father of Modern Surgery, Chief of All Surgeons ইত্যাদি। স্পেনে বর্তমানে তার নামে একটি রাস্তাও আছে।'
আমি বললাম— 'أخي, তার কাজের কথাগুলো শুনে ছয়তলা ছাদ থেকে লাফ মারতে ইচ্ছে করছে!'
হঠাৎ খেয়াল হলো—১০ মিনিট লেট হয়ে গেছে! তিনজনে দৌড় দিলাম।

টিকাঃ
১. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী op. cit. vol: 3, p: 653
২. Robert E. Krebs, Groundbreaking Scientific Experiments, Inventions, and Discoveries of the Middle Ages and the Renaissance (Greenwood Publishing Group, 2004) p. 95.
৩. Muhammad Abdul Jabbar Beg. 'The Origins of Islamic Science', Muslim Heritage.
৪. 'Abū al-Qāsim' Encyclopedia Britannica Online
৫. Michael H. Morgan, p: 203; Maria Do Sameiro Barroso. 'Albucasis: A Landmark for Arabic and European Surgery' Muslim Heritage.
৬. Sina Zarrintan et al. 'Abu Al-Qasim Al-Zahrawi (936-1013 CE), Icon of Medieval Surgery' Annals of Vascular Surgery. (2020), pp: 1-3.
৭. Paolo Missori, Giacoma M. Brunetto, and Maurizio Domenicucci. 'Origin of the Cannula for Tracheotomy During the Middle Ages and Renaissance'. World Journal of Surgery. 36:4 (2012), pp. 928-934; Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox, 95.
৮. Roshdi Rashed, p: 945; Sina Zarrintan, 2-3.
৯. Mehmet Turgut. 'Surgical scalpel used in the treatment of "infantile hydrocephalus" by Al Zahrawi (936-1013 A.D.)' Childs Nerv Syst. 25 (2009), pp: 1043-1044; Sina Zarrintan, 2; S. E. al-Djazairi op. cit.
১০. Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox op. cit.
১১. Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox op. cit.
১২. 'Instruments of Surgery' in 'Hospital' in Salim al-Hassani op. cit.
১৩. Ibid
১৪. Ibid; Maria Do Sameiro Barroso op. cit; Ali Osman Arslan et al. 'Albucasis: Founder of Catgut' Acta Medica Anatolia. 2:3 (2014), pp: 103-104.
১৫. Ibid; 'Instruments of Surgery' op. cit. বিভিন্ন চিত্রের জন্য দেখুন Fuat Sezgin, vol. 4.
১৬. Dr. Sharif Kaf al-Ghazal. 'Al-Zahrawi (Albucasis) the Great Andalusian Surgeon' Muslim Heritage.
১৭. 'Pharmacy' in 'Hospital' in Salim al-Hassani op. cit.
১৮. ibid
১৯. S. E. al-Djazairi op. cit.
২০. 'Pharmacy' in 'Hospital' in Salim al-Hassani op. cit.
২১. Dr. Sharif Kaf al-Ghazal op. cit; Nayef R.F. Al-Rodhan and John L. Fox op. cit.; Salim al-Hassani op. cit.

ফন্ট সাইজ
15px
17px