📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 সফল উড়ন্ত পাখিমানব

📄 সফল উড়ন্ত পাখিমানব


প্রথম পিরিয়ড শেষ। টিচারের কোনো খবর নেই। আজ নাকি কোনো এক বছরের এসএসসি ব্যাচের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। প্রথম পিরিয়ডে শুধু হাজিরা নিয়ে ম্যাডাম চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন চুপচাপ থাকতে, যেন টু শব্দটিও না করি। এবারের পুনর্মিলনে নাকি অনেক খরচা করা হয়েছে। শোনা যায়, এই ব্যাচের ভাই-বোনেরা ছিল আমাদের স্কুলের ইতিহাসে সবচেয়ে সার্থক ব্যাচ। একাধিক পপুলার সিঙ্গার, ডান্সার আনা হয়েছে। তার মধ্যে মিনার নামক একজন নাকি আমাদের স্কুল সংলগ্ন কলেজের শিক্ষার্থী। আর এসব জেনেছি রনি থেকে, ভালোই অপ্রয়োজনীয় তথ্য রাখে ছেলেটি।
ভালোই হয়েছে! আজ আব্বাস ইবনে ফিরনাসকে নিয়ে কথা হবে।
ক্লাসের পেছনের দিকের কোনায় বিপথগামী পোলাপানদের আড্ডা। আমাদের মুসলিম গ্যাং সামনের দিকের কোনায়। আজ জমবে, ইনশাআল্লাহ।
সিনান শুরু করল— 'মুয়াজ্জিন যেখানে আজান দেয়, সেখানে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তখন তো আবার উঁচু মিনার থেকে আজান দিত। এই দাঁড়িয়ে থাকা লোকের উদ্দেশ্য যে আজান দেওয়া না—তা অবশ্য বোঝাই যাচ্ছে। নিচে সবাই চিল্লাচ্ছে—"তাড়াতাড়ি মরে গিয়ে তোর পাগলামি শেষ কর!” “আরে লাফা!” অবশ্য, বুড়ো একটা লোককে এভাবে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে জীবন নিয়ে হতাশ, আত্মহত্যার চেষ্টাকারী মনে করাটা ভুল না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবার এক অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে—কী হতে যাচ্ছে এই ডানপিটে বুড়োর। তিনি...'
'আব্বাস ইবনে ফিরনাস!' চিল্লিয়ে উঠলাম আমি।
'না, তিনি Armen Firman.'
'এটা কে আবার?'
'বলছি, আগে কাহিনি শেষ করতে দে। এবার আরমান ফিরমান লাফ দিয়ে শেষের দিকে একটু ভয় পেয়েছিলেন যদিও, কিন্তু একজন স্টান্টম্যানের কলঙ্ক। পিছু হটা সাজে না। আস্তে আস্তে তিনি নিচে পড়ে গেলেন। উড়তে পারলেও সাহস তো দেখিয়েছেন। বাজির টাকাটা পেয়ে যাবেন।'
'বাজি?'
'হ্যাঁ, তিনি বিজ্ঞানের জন্য কিছু করেননি। তবে দর্শকদের ভেতর থেকে একজোড়া চোখ তাকে দেখছিল। ৪৭ বছর বয়সি এক ইঞ্জিনিয়ার, রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিদ, আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তাকে স্পেনে আনা হয়েছিল মূলত গান শেখানোর জন্য। প্রথম প্রথম সে গ্লাস বানাত। অসাধারণ সব গ্লাস। কৃত্রিম ক্রিস্টাল তৈরি পদ্ধতি তারই আবিষ্কার। এভাবেই বানিয়েছিলেন চোখ ধাঁধানো একটি বিজ্ঞানমঞ্চ, অবশেষে চিন্তা করলেন অ্যারোনটিক্সে ঢোকার।'
'আর... আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আবিষ্কারগুলো নিয়ে কিছু বলবি না?'
'বলছি, আগে কাহিনিটা তো শেষ করতে দে! গভীর দৃষ্টিতে পাখিদের উড়ান পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি। কয়েকবার মরুভূমিতে চেষ্টা চালালেন। অবশেষে ৭০ বছর বয়সে সিদ্ধান্ত নিলেন, একটি পাবলিক শো হওয়া দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ।'
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' এই বলে সিনান পারলে নিজেই লাফ দিয়ে দেয়! আমরা ধরাধরি করে থামানোর পর আবার বলতে শুরু করল— 'নিজ চোখে সবাই ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখল। ১০ মিনিট ধরে আকাশে উড়লেন তিনি। চিন্তা করতে পারিস? যদি ওখানে থাকতাম তখন! পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম প্যারাশুট ফ্লাইট। জান্নাতে যদি যেতে পারি রে ভাই, টাইম-ট্রাভেল করে ওই সময় চলে যাব!'
'চরম কাহিনি রে, চরম!'
'তো এই কাহিনিটি, সম্ভবত মিথ্যা।'
'কি!'
'না, পুরোটা না, শুধু আরমান ফিরমানের অংশটুকু। হতে পারে এটি আব্বাস ইবনে ফিরনাসের ভুল ল্যাটিনাইজড নাম। ঐতিহাসিক বর্ণনায় অবশ্য আরমান ফিরমান নামে বাস্তবে কেউ নেই। মানে, গল্প সুন্দর করতে হলে একটু রংটং মারতে হয়, বুঝেছিস? বাকিটুকু সত্য। খুব সম্ভবত ল্যাটিনে রূপান্তরের সময় দুই অনুবাদকের ভুল রূপান্তরের জন্য দুই উড়ন্ত মুসলিমের মিথ সৃষ্টি হয়। এখন, ইউরোপিয়ানদের মধ্যে রজার বেকন সর্বপ্রথম Ornithopter-এর বর্ণনা দেন।'
'এটা আবার কোন জাতের হেলিকপ্টার?' রনি বলল।
'আরে ব্যাটা, এর অর্থ উড়ন্ত যন্ত্র। মজার ব্যাপার কি, জানিস? রজার বেকন কর্ডোভায় পড়ালেখা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ Pierre Mandonnet বলেন— “রজার বেকনের সমস্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবুদ্ধি মুসলিমদের থেকে নেওয়া।” হতে পারে, আব্বাস ইবনে ফিরনাসের উড়ন্ত যন্ত্রের বর্ণনা পড়েই তিনি নিজ ভাষায় তা উল্লেখ করেন। আর এখান থেকেই লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি তার বর্ণনা দেন।
মুসলিমদের উড়ার যাত্রা কিন্তু এখানে শেষ হয়নি। লাগারি হাসান চেলেবি, অটোমান। রকেট যাত্রাকারী প্রথম মানুষ। সপ্তদশ শতাব্দীর ঘটনা। এটার ফুয়েল হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ৩০০ পাউন্ড গানপাউডার। পরে রাজপ্রাসাদের সামনে অবতরণ করেন নিরাপদে। হাজারফান আহমাদ চেলেবি, আরেকজন অটোমান। লাগারির মাত্র পাঁচ বছর পরে তিনি নিজেও একবার উড়াল দেন। সফলতার জন্য তাকে ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হয়। এটা অবশ্য রকেট ফ্লাইট ছিল না। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের অনেক অনেক আগে নিশ্চয়ই অনেকে উড়ার চেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন। তবে মূল সফলতার ধারা শুরু হয় আব্বাস ইবনে ফিরনাস থেকেই। মাঝখানে অনেকে এই চেষ্টা চালান। শেষমেশ শতভাগ সফল হন রাইট ব্রাদার্স।'
'মারভেলের স্ট্যানলি সাহেবকে তো আব্বাস ইবনে ফিরনাসের কথা জানানো দরকার ছিল রে, কিন্তু তার আগেই তিনি নিজেই ওপারেতে উড়াল দিলেন।'
সিনান মুচকি হাসল। তারিক অবশ্য রসকষহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আগের দিন কিছুটা উৎফুল্ল হলেও আজ আবার কেমন মরে গিয়েছে।
সিনান বলতে থাকল—'এখন আব্বাস ইবনে ফিরনাসের অন্যান্য কাজের দিকে তাকাই। মূলত তার জীবনের সফলতা গ্লাস নিয়ে। তিনি পাথর থেকে গ্লাস বানানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তার খাবার পানির গ্লাসগুলো ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ; কবি আল বুহতুরি বলেছেন—"রংহীন গ্লাসগুলো দেখলে নাকি মনে হয় কোনো কন্টেইনার ছাড়া পানি এমনি দাঁড়িয়ে আছে!" বাই দ্যা ওয়ে, এই বুহতরির থেকেই কিন্তু মুতানাব্বি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।'
'বিশাল ব্যাপার তো!'
'তা আর বলতে? তিনি ক্রিস্টাল বানানোর কৃত্রিম পদ্ধতির উন্নতি করেন। যার কারণেই স্পেনে গ্লাসশিল্প শুরু হয়। তিনি ক্রিস্টাল কাটার পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। পরে ১৫ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলিমদের প্রতি হিংসার কারণে খ্রিষ্টানরা তার ক্রিস্টাল নিয়ে লেখা মূল বই মুকতাবিস ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে বানানো বিভিন্ন ক্রিস্টালের নজির পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রাচীন চার্চে। নিজস্ব প্রতিভার মধ্যে রয়েছে—তিনি যেকোনো জটিল ধরনের লেখার পাঠোদ্ধার করতে পারতেন। এমন গ্লাস বানিয়েছিলেন, যেটা দিয়ে ম্যাগ্নিফাইং-এর কাজ করা যেত। একধরনের ঘড়িও বানিয়েছিলেন। আবার বর্তমান সময়ের চশমার মতো লেন্সও বানিয়েছিলেন, চোখের সমস্যায় ব্যবহার করা যায়—এমন। কিও বোরিং লাগছে?'
তারিক বলল—'নাহ! বোরিং হব কেন?'
'এতক্ষণ তো নীরস আবিষ্কারের কথা বললাম। এবার অন্য কিছু শোন। তিনি নবম শতাব্দীতে একটি প্ল্যানেটরিয়াম তৈরি করেছিলেন। সেখানে দর্শনার্থীরা বিশাল বিশাল কৃত্রিম যন্ত্রপাতি দিয়ে গ্রহের নাড়াচাড়া দেখত। এখন তো বেশি মনে হয় না। ওই আমলে কিন্তু এটা রীতিমতো বিস্ময়! আর লুকোনো কিছু যন্ত্রপাতি দিয়ে নানা ধরনের চমৎকার শব্দ সৃষ্টি করা হতো। কৃত্রিম বিদ্যুতের চমক, আওয়াজ, দমকা বাতাসের শব্দ, মেঘ ইত্যাদিও ছিল। এমন অনুভূতি যে নবম শতকে স্পেসশিপে একজন; বহির্বিশ্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিচ্ছে।'
'ওয়াও সিনান! আব্বাস ইবনে ফিরনাস তো নবম শতাব্দীতে পুরো শো মাতিয়ে রেখেছিলেন!'
'হুম, টোটালি।'

টিকাঃ
১. Michael H. Morgan op. cit.
২. Michael H. Morgan, p: 154-157.
৩. Salah Zaimeche. 'The Impact of Islamic Science and Learning on England’ Muslim Heritage.
৪. Salim al-Hassani, p: 298-300
৫. Salim al-Hassani p: 145
৬. Phillip K. Hitti p: 598
৭. Ehsan Masood p: 72; Michael H. Morgan p: 156; Salim al-Hassani p: 39
৮. M. Shamsher Ali op. cit. p: 161.
৯. Salim al-Hassani p: 39
১০. Michael H. Morgan p: 154-157
১১. Ehsan Masood p: 72
১২. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী, ইসলামি বিশ্বকোষ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দ্বিতীয় সংস্করণ, জুন ২০০৪) vol. 2, p: 390.
১৩. Ehsan Masood, p: 71-73
১৪. Michael H. Morgan p: 156

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 বানু মুসা—থ্রিলিং থ্রি

📄 বানু মুসা—থ্রিলিং থ্রি


তারিক আজ কোচিং সেন্টারে আসেনি। গণিত খাতা দেওয়া হবে বলেই আসেনি বোঝা যাচ্ছে।
ক্লাস শেষ। সিনান আর আমি তারিকের বাসার দিকে যাচ্ছি। রাস্তায় রনির দেখা হলো। তাকে বললাম—'রনি! কংগ্র্যাটস। তুই গণিতে তারিকের চেয়ে দুই নম্বর বেশি পেয়েছিস।'
'কী বলিস! পরীক্ষা এত বাজে হয়েছিল, মনে তো করেছিলাম ফেল করব। তারপরও তারিকের চেয়েও দুই নাম্বার বেশি পেয়ে গেলাম! তা কটা পেয়েছি আমি?'
'দুই।'
সিনান আর আমি হাসিতে ফেটে পড়লাম।
তারিকের বাসার দিকে যাচ্ছি আর তার সাথে পরিচিত হওয়ার প্রথম দিনের কথা মনে পড়ছে। সময়টা ছিল নবম শ্রেণির প্রথম দিকে। উচ্চতর গণিতের কিছুই পারতাম না। আর নাউজুবিল্লাহ... স্যরি, নজিবুল্লাহ স্যার বাড়ির কাজ দিয়েছিলেন। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। সিনান পর্যন্ত দেখি ভয়ে লাফাচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, সে বাড়ির কাজ করেছে, কিন্তু খাতা হারিয়ে ফেলেছে। পেছনের দিকে গিয়ে দেখলাম, তারিক সিনানের হারানো খাতা দেখে দেখে বাড়ির কাজ করছে। সিনানকে না বলে আমিও বসে গেলাম তারিকের সাথে। ও বারবার 'θ'-এর মতো একটি চিহ্ন দিচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম—'এটা কী?'
ও বলল—'থিটা।'
'মানে?'
'আরে, এই যে একটা চ্যাপটা গোল এঁকে তার পেট কেটে দিলে থিটা হয়ে যায়!'
তারিকের বাসার সামনে চলে এলাম। নক করলাম। আন্টি দরজা খুললেন।
'আসসালামু আলাইকুম, আন্টি!'
'ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছ তোমরা?'
'আলহামদুলিল্লাহ! আপনি ভালো আছেন?'
'এই তো ভালো। ভেতরে এসো, তারিক ওর রুমেই আছে।'
তারিক ল্যাপটপের সামনে বসে আছে। আমাদের দেখে রুমের বাইরে গেল।
সিনান আর আমি বসে আছি। তারিক এতক্ষণ কী করছিল ল্যাপটপে—তা দেখার ইচ্ছা হলো।
'সিনান, তারিক মুসলিম বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে পড়ে উলটিয়ে ফেলছে!'
'কী বলিস!'
'হ্যাঁ, এই দেখ। কয়েকটা পিডিএফ খোলা। নোট নিয়ে পড়ছে দেখি... এই ব্যাটা এটা দেখে যা! চরম নোট নিয়েছে তো!'
'পড়ে শোনা।'
'ইতিহাসবিদ এসপি স্কট দ্বারা বর্ণিত—“অষ্টম শতকে ইউরোপের একজন সাধারণ মানুষের বাসস্থান: বসবাসের অনুপযোগী একটি কুঁড়েঘরে—যা পাথর ও অকর্তিত কাঠ দিয়ে নির্মিত, শুষ্ক খরকুটো দ্বারা ছাওয়া, দূর্বা দ্বারা তৈরি মেঝে, সাথে মাথার ওপর (ছাদে) সর্বদা একটা গর্তের সুবিধা—যা দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে যায়। তাদের (ইউরোপিয়ানদের) দেয়াল ও ছাদ কালি ও গ্রিজ দিয়ে সর্বদা মাখানো থাকত।” স্কট সাহেব আরও বলেন—“জংলিদের থেকে এদের শুধু একটুখানি পার্থক্য ছিল।”
মরিস লম্বার্ড বলেন—“ইসলাম পশ্চিমকে তার জংলিমার্কা কালোরাত্রি হতে টেনে বের করে আনে।”'
ধাক্কা খেয়ে খাটে গিয়ে বসলাম। তারিক এত ইনফরমেটিভ রিসোর্স পায় কোত্থেকে! সিনানের মুখে কেবল মুচকি হাসি দেখা গেল।
কিছুক্ষণ পর তারিক এলো শরবত নিয়ে। মনে করেছিলাম তারিক আসার সঙ্গে সঙ্গে সিনান তাকে পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু সে কিছুই বলল না। আমি তার দিকে তাকালাম। দেখলাম, সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমিও সেদিকে তাকালাম। দেয়ালে দুটি কার্ডবোর্ড লাগানো। লেখা—'বনু মুসা ব্রাদার্স'। তির চিহ্ন দিয়ে নিচে লেখা—মুহাম্মাদ, আহমাদ ও আল হাসান। আমি কিছু বলার আগেই সিনান জিজ্ঞেস করল— 'এরা কারা, তারিক?'
'ও! আমি আমার রুমটা নতুন করে সাজাচ্ছি।'
'হুম, আগে এই জায়গাটায় বড়ো করে রোনালদোর একটি ছবি টাঙানো ছিল।'
'এরা কারা, সেটা বল।'
'Trium fratum!'
'অ্যাঁ?'
'বনু মুসার ল্যাটিন নাম।'
'এরা কী করেছিল?'
'এরা যা করেছিল أخي....'
'আখি মানে?' আমি প্রশ্ন করলাম।
'ভাই, ব্রো। অন্যান্য ভাষায় পারি না!'
সিনান উত্তেজিত—'আরে, তুই বনু মুসার কাহিনি বল।'
'হ্যাঁ হ্যাঁ। জাফর মুহাম্মাদ ইবনে মুসা জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি, ইঞ্জিনিয়ারিং; আহমাদ ইবনে মুসা ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেকানিক্স; আল হাসান ইবনে মুসা ইঞ্জিনিয়ারিং আর জ্যামিতি।'
'কী অদ্ভুত! মানুষের নামের ভেতর জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি...'
'আরে উনারা যেসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, সেগুলো বললাম।'
'তুই কি একটু ক্লিয়ারলি বুঝিয়ে বলতে পারিস না?'
'স্যরি। আমি তো কোনো সময় কাউকে জ্ঞান দিই না... মানে... কোনো সময় কাউকে কিছু শেখানোর সুযোগ তো হয় না, এজন্য আমি বুঝিয়ে বলতে পারি না।'
'আচ্ছা হ্যাঁ। বল।'
'মুসা ইবনে শাকির একজন দস্যু ছিলেন। কিন্তু নিজের যৌবনের কীর্তি পেছনে ফেলে হয়ে উঠেন একজন জ্যোতির্বিদ। তিনি খলিফা হারুনুর রশিদের কাছের বন্ধু হয়ে ওঠেন। তিনটি ছোটো ছোটো ছেলে রেখে কম বয়সে মারা গেলেন তিনি। হারুনুর রশিদের ছেলে আল মামুন তাদের দেখাশোনা করার ওয়াদা করেন। তারা বড়ো হতে থাকল। খলিফা আল মামুন তাদের বাইতুল হিকমায় মুক্তভাবে বিচরণ করার সুযোগ দিলেন। তারা এই সুযোগটি ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে সেরা সেরা বিজ্ঞানের আলিম হয়ে উঠল। জ্ঞানের প্রতি ছিল অদম্য টান। অনুবাদকদের বিভিন্ন বই অনুবাদ করার জন্য প্রতিমাসে ২৪০০০ ইউরো করে দিতেন।'
'ওই সময় ইউরো এলো কোথা থেকে?'
'৫০০ দিনার দিতেন। বর্তমান সময়ের হিসাবে এটা ২৪০০০ ইউরো।'
'টাকায় কত রে?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।
'হিসাব করতে পারিস না?'
সিনান মূল আলোচনায় ফিরে আসতে বলল। তারিক শুরু করল— 'বনু মুসা মুসলিম বিজ্ঞানীদের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তিনজন। তারা ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের অধীনে হুনাইন ইবনে ইসহাক ও সাবিত ইবনে কুররা বাইতুল হিকমায় নিজেদের অনুবাদকাজ চালান। আসলে সাবিত ইবনে কুররা তার পুরো ক্যারিয়ারের জন্যই বনু মুসার কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, বনু মুসাই এই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর ট্যালেন্ট প্রথম বুঝতে পারেন এবং তাকে বাইতুল হিকমায় নিয়ে আসেন। বিজ্ঞানের কাজ চালাতে অনেক টাকার প্রয়োজন। বিজ্ঞানীদের ফান্ডিং করা পৃষ্ঠপোষকদের একজন এই বনু মুসা।'
'একজন মানে তিনজন?'
'ওই আরকি, বুঝে নে।'
তারিক শরবতে চুমুক দিলো। তারপর আবার বলা শুরু করল— ‘বনু মুসা অনেক ধরনের মেকানিক্যাল যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। তাদের বই কিতাব আল হিয়াল-এ এ রকম ১০০টিরও বেশি যন্ত্রের গঠন বর্ণনা পাওয়া যায়। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে মেকানিক্সের শুরু’।
‘বইয়ের নামটার অর্থ কী?’ আমার জিজ্ঞাসা।
‘The Book of Ingenious Devices.’
‘ওহ আচ্ছা।’
‘তো শোন, তাদের বইয়েই ইতিহাসের প্রথম মেকানিক্যাল লজিক আর কন্ট্রোল সিস্টেম দেখা যায়। বর্তমানের মতো লজিক গেইট তো আর ছিল না। তাই এসবেরই অত্যন্ত সিম্পলিফাইড ফর্ম বলা চলে। ১১০০ বছর পুরোনো হলে কী হবে? যন্ত্রগুলো কিন্তু অসাধারণ। কিছু কিছু যন্ত্র বর্তমান সময়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদেরও টাশকি খাইয়ে দিতে পারে। তাদের বানানো যন্ত্রগুলো ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রোগ্রামেবল মেশিন। বিদ্যুতের জায়গায় তারা ব্যবহার করেছিলেন উচ্চচাপে থাকা পানি আর বায়ু। বর্তমান সময়ের অটোমেটেড যন্ত্রপাতি আর বনু মুসার তৈরি যন্ত্রপাতির মধ্যে মূল পার্থক্য এটাই।’
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম— ‘তারা কী যন্ত্র বানিয়েছিলেন, তা কি একটু বলবি?’
‘ও স্যরি! আমি বেশি ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে ফেলছি। আচ্ছা, একটা হলো ড্রিংকিং বুল রোবট। পানি খাওয়া শেষ হলে তৃপ্তির এক আওয়াজ করত! খুবই মজার একটা খেলা। এটা মানুষদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যস্ত রাখতে পারে। প্রক্রিয়াটা বিশাল, তাই বললাম না। আরেকটা হলো—মেকানিক্যাল টি গার্ল। জিনিসটা আসলেই চা পরিবেশন করত! আরও আছে অটোমেটিক্যালি আকার পালটানো পানির ঝরনা, অটোমেটিক্যালি পানি ঢালা যান্ত্রিক জগ, নিজে নিজেই বাজে এমন বাঁশি। আরেকটা কী যেন, আরেকটা কী যেন... ওহ! ফ্লাস্ক উইথ টু স্পাউটস আরেকটা মজার খেলা। প্রতি স্পাউটে আলাদা রঙের তরল দেওয়া হতো। কিন্তু ঢালা হলে ভুল স্পাউট থেকে ভুল রঙের তরল বেরিয়ে আসত!’
'ওহ চরম!' সিনান বলল।
আমি ইম্প্রেস না হয়ে বললাম— 'খেলনা আবিষ্কার আবার এমন কী?'
'উঁহু! এসব আবিষ্কার খেলনার মতো হলেও এতে যে পরিমাণ মাথা খাটাতে হয়েছে আর যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, তার প্রশংসা না করে পারবি না। এদের তুচ্ছজ্ঞান করা বোকামি। এসব মেকানিক্যাল মেশিন টেকনোলজি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় দারুণ ভূমিকা রেখেছে। আমার কথা না; ডোনাল্ড হিল বলেছেন। শিল্প বিপ্লবেও এগুলোর বিশাল ভূমিকা আছে। আধুনিক মেকানিক্সের মূলনীতি আর বনু মুসার ব্যবহৃত মূলনীতি একই। আর মূলত তাদের মেকানিক্স থেকে উন্নত কিছু এই সেদিন মাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, বেশিদিন আগে না।'
তারিক আবার শরবতে চুমুক দিতে গেল— 'কি রে, গলায় কিছু পড়ছে না কেন?' দেখতে পেল গ্লাস খালি! বিব্রতভাব চেপে আবার বলতে শুরু করল—
'তো, বনু মুসা যদি কারখানায় ব্যবহার উপযোগী যন্ত্র বানিয়েও থাকে, তবুও তা কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে। তবে তারা শুধু যন্ত্র নিয়ে কাজ করেছেন—এমনটা না...'
'আরে ভাই, তা আগে বলেছিস তো। কী করেছেন, সেটা বল।' সিনান বাধা দিলো।
'ভাই না: অাখি!'
সিনান হেসে দিলো, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ।'
'জ্যোতির্বিদ্যায় কাজ আছে তাদের। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব যে সব সময় এক না—এ কথা ইতিহাসে তারাই প্রথম বলেছিলেন।'
'এক না!' আমি অবাক হলাম।
'আরে পল্টু! পৃথিবী তো কক্ষপথে ঘুরছে, দূরত্ব সব সময় এক কীভাবে হবে?'
'ও হ্যাঁ, তাই তো!'
'অনুসূর ও অপসূরও তারাই প্রথম মেপেছেন। ক্রান্তিবৃত্তের তীর্যকতা সম্বন্ধেও প্রথম নির্ভুল ধারণা দেন তারা; তবে এটা কী জিনিস জানি না। Precession of Equinoxes-এর ধারণা সর্বপ্রথম তারাই দেন।'
'আরও আছে। পৃথিবীতে দুদিন, দুই রাত সমান; এ দুদিন কোন দুদিন—তা বনু মুসা বের করেন। Regulus নামে একটা তারা আছে। বনু মুসা এটা পর্যবেক্ষণ করেন। পৃথিবীতে যে ১ বছর হয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টায়—এটাও তাদের হিসাব। আরও আছে বহুত। এখন মনে নেই।'
সিনান এই সময় বলল—'একটি ব্যাপার খেয়াল করেছিস? মুসলিমদের অবদান সবচেয়ে বেশি হলো জ্যোতির্বিদ্যায়। যদিও অন্যান্য সব বিষয়েই মুসলিমদের অবদান আছে, তবে এক্ষেত্রে তা তুলনামূলক বেশি। ওই সময় তো জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। তারপরও মুসলিম বিজ্ঞানীরা কীভাবে এত সূক্ষ্ম হিসাব অবিশ্বাস্য সঠিকতার সাথে করেছেন—তা সত্যি ভাবিয়ে তোলে!'
তারিক আমার হাত থেকে শরবতের গ্লাস কেড়ে নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল—'এবার গণিত হবে। তাদের পরিমিতির বইয়ে তারা ১৮টা সমস্যা ও তার সমাধানের কথা উল্লেখ করেছেন। বৃত্তের পরিধি, তিন বাহু ব্যবহার করে বৃত্তের ক্ষেত্রফল, কোণ ত্রিখণ্ডিত করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন বনু মুসা। বাহুর পরিমাপ দিয়ে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করার সূত্রও তাদের আবিষ্কার। দুটি কেন্দ্রের সাথে লাইন টেনে উপবৃত্ত অঙ্কন প্রণালিও তারা উদ্ভাবন করেন।'
'এরা তিনজন তো টেরিফায়িং ট্রায়ো!' আমি বললাম— 'তবে আমার একটা প্রশ্ন ছিল। তাদের সব সময় বনু মুসা ইবনে শাকির এভাবে একসাথে কেন ধরা হয়?'
তারিক উত্তর দিলো— 'তাদের আলাদা আলাদা ধরা খুবই কঠিন। তিন ভাই যা করেছেন, সব একসঙ্গে করেছেন। বইগুলোও তিনজনে একসঙ্গেই লিখেছেন। তাই তাদের তিনজনকে একসঙ্গেই ধরা হয়।'
সিনান তারিকের প্রশংসা করল— 'তুই কিছু পারিস না কে বলেছে, তারিক?'
'তোরাই তো বলিস!'
সিনান বলল—'আরে আমরা... আমরা তো মজা করি... যাহোক, আমি বলতে চাচ্ছিলাম, তোর মধ্যে একটি অসাধারণ গুণ আছে। কম সময়ে একটি জিনিস পড়েই তা মনে রাখা এবং বুঝে নেওয়া।'
মাগরিবের আজান শোনা গেল। সিনান বলল—'চল, মসজিদে যাই।'
তারিক বলল—'তোরা যা, আমার ঘুমোতে হবে। সালাত যেন কাজা না হয়, সেজন্যই অনেক কষ্টে এতক্ষণ জেগে ছিলাম। সালাত আদায় করে ঘুমাব।'
'বুঝলাম না।'
'সেই ফজরের সময় উঠেছিলাম, রাত ২ টায় ঘুমিয়ে।'
'তুই ফজর থেকে পড়ছিস? এত কী পড়িস!'
'হে হে! কয়দিন পরেই দেখবি। যা এখন, নাহলে জামাত মিস হয়ে যাবে।'
যাওয়ার সময় দেখলাম, তারিকের আয়নায় লেখা—'If you want to make the world a better place, just take a look at yourself and make that change!'
তারিক নিজের পেছনের জীবন ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে, সেজন্যই এতদিন সে মনমরা ছিল, বুঝতে পারছি। আমরা বের হলাম। হঠাৎ সিনান মনে করালো— 'আরে! আমরা তো তারিককে ওর ম্যাথ খাতা দিতেই ভুলে গেছি!'
'ও হ্যাঁ!'

টিকাঃ
১. S. P. Scott, History of the Moorish Empire in Europe (Philadelphia: The Lippincot Company, 1904) vol. 1, p: 339. cited in S. E. al-Djazairi op. cit.
২. www.archipress.org/batin/ts20lombard.htm
৩. Ehsan Masood p:44
৪. Ehsan Masood p:48
৫. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit. vol: 4, p: 573
৬. Salim al-Hassani op. cit. p: 52
৭. পড়তে চাইলে— 'The Mechanics of Banu Musa in the Light of Modern System and Control Engineering' Muslim Heritage.
৮. জন স্কট নামের বিশ্বসেরা একজন ইঞ্জিনিয়ার এটি পুনরুৎপাদন করেছেন দেখুন: Science in a Golden Age-এর মেকানিক্স অংশ।
৯. এটি না দেখলে বুঝবেন না: '[Trailer] Banu Musa and the Science of Tricks' online video, 1001 Inventions.
১০. যন্ত্রের বর্ণনা Salim al-Hassani op. cit. p: 52-53 I Ehsan Masood p: 162-163 হতে
১১. 'Trick Devices' in 'Home' in Salim al-Hassani op. cit.
১২. M. Shamsher Ali op. cit. p: 30.
১৩. অনুসূর : জানুয়ারি ১ থেকে ৩, সূর্য পৃথিবীর নিকটতম। অপসূর : ১ থেকে ৩ জুলাই, সূর্য পৃথিবীর দূরতম।
১৪. M. Shamsher Ali op. cit. p: 30
১৫. J. J. O'Connor and E. F. Robertson. 'Banu Musa brothers' School of Mathematics and Statistics, University of St Andrews Scotland: http://www.history.mcs.standrews.ac.uk/Biographies/ BanuMusa.html
১৬. Muzaffar Iqbal, Science and Islam op. cit.
১৭. M. Shamsher Ali op. cit. p: 65, 101.
১৮. Thomas Hockey (edt), The Biographical Encyclopedia of Astronomers (Springer, 2005) p: 93.
১৯. একটা গানের লিরিক

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 বন্দি বিজ্ঞানী

📄 বন্দি বিজ্ঞানী


লুঙ্গির মধ্যে শার্ট ইন করিয়া বাহির হইলাম। গ্রীষ্মের কালে এত কুয়াশা কোথা হইতে আসিয়াছে, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। কিছুক্ষণ পর বুঝিলাম, কুয়াশা নহে; বরং ইহা তো কালো ধোঁয়া!
অক্স্রসর হইতে থাকিলাম। পরিচিত পথ কেন যেন অচেনা লাগিতেছে। সম্মুখে দেখিতে পাইলাম একটি উদ্যান। কিন্তু এইখানে উদ্যান কোথা হইতে আসিল, তাহা মাথায় খেলিল না। দুই দিন আগেও তো এইখানে বিরাট অট্টালিকা ছিল!
উদ্যানে কেহ নাই, তবে একজন সুদর্শন বুড়োকে দেখিতে পাইলাম। তাহাকে দেখিয়া কৌতূহলের সৃষ্টি হইল। কাছে গিয়া দাঁড়াইলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিবার পর জিজ্ঞাসা করিলাম, কোনো সাহায্য করিতে পারি কি না। তিনি আমার দিকে চক্ষু নিক্ষেপ করিলেন, কয়েক মুহূর্ত পর সরাইয়া লইলেন।
দাঁড়াইয়া রহিয়াছি, মিনিট পাঁচেক হইবে। কোনো সাড়া-শব্দ নাই। আমি তাঁর পার্শ্বে গিয়া বসিলাম। অনেকক্ষণ ধরিয়া বসিয়া রহিলাম, কিন্তু তিনি কোনো গুরুত্বই দিলেন না!
অবশেষে আমার দিকে চাহিয়া কহিলেন—'তোমার ধৈর্য দেখিয়া আমি প্রসন্ন হইয়াছি। তুমি নিশ্চয়ই কিছু জ্ঞান পাইবার উদ্দেশ্যে এত সময় ধরিয়া অপেক্ষা করিতেছ, তাহা নয় কি?'
তাঁহার এমন বাণী শুনিব—তাহা আশা করি নাই। তবুও ভাব করিবার উদ্দেশ্য লইয়া হ্যাঁ বোধক মস্তক নাড়াইলাম।
তিনি বলিলেন—'আমি একজন আলোকবিজ্ঞানী।'
হুম। তাঁহার চক্ষুর দীপ্তি দেখিয়া মন তাহা বিশ্বাস করিতে চাহিল। কিন্তু দ্বিধা দিয়া ভাবিয়া বুঝিলাম, বুড়োর তার ছিঁড়িয়া গিয়াছে।
বুড়ো বিশাল এক কাহিনি আরম্ভ করিল— 'সর্বোচ্চ সম্মাননা লইয়া আমি আমার সিভিল সার্ভিসের পড়ালেখা খতম করি। কয়েক দিনের অভ্যন্তরেই আমাকে বসরার চিফ মিনিস্টার বানানো হইল। ইহা ছিল এমন এক চাকুরি, যাহা সকলেই খুঁজিয়া বেড়াইত।'
ও বদ্দা! চাটগাঁ তুন হডে বসরাৎ গিয়ে গুই। জাইগা ইভা হডে!
'কয়েক দিন কাটিল, তারপর বিজ্ঞানের জন্য আমি আমার উঁচুমানের পদ ছাড়িয়া দিলাম।'
কী গণ্ডমূর্খ এই বুড়ো!
'বিজ্ঞান নিয়া কাজ করিতে থাকিলাম। ক্রমেই আমি চারিদিকে খ্যাত হইয়া উঠিলাম। আরও কয়েক দিন পর সমগ্র পৃথিবীতেই এক পরিচিত নাম হইয়া গেলাম।'
কী অবুঝ আমি!
'আমার কথা অবশেষে এক পাগলার কানে গিয়া পৌঁছিল। কায়রোর ইসমাইলি ফাতিমি খলিফা; আল হাকিম। সে অবশ্য আব্বাসি খিলাফতের বেশিরভাগের ওপরই শাসন চালাইত। সে চাহিত, যেন সকল শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ তাহার শহরে আসে। সে আরও চাহিত পুরো বিশ্ব জয় করিতে এবং কায়রোকে তাহার শ্রেষ্ঠ শহর বানাইতে।
এসব অবশ্যই ভালো, কিন্তু এই আল হাকিমের মাথায় সমস্যা ছিল। সে ইতিহাসে "পাগলা খলিফা” বলিয়া খ্যাত। ইহুদি আর খ্রিষ্টানদের অনেক সমস্যা হয় এই পাগলার জন্য। সে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের অনেক উপাসনালয় ধ্বংস করে। তালিকায় জেরুজালেমের পবিত্র সেপালকার (Holy Sepulchre in Jerusalem) রহিয়াছে, যাহার ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে—এইখানে যীশুখ্রিষ্টকে শূলে চড়ানো হইয়াছিল, আর এইখানেই তিনি পুনর্জীবিত হইবেন। উমর চার্চ রক্ষার ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের আশ্বাস দিয়াছিলেন, কিন্তু আল হাকিম তাহা উড়াইয়া দিলো। খ্রিষ্টান আর ইহুদিরাই তাহার একমাত্র শিকার ছিল না অবশ্য; মুসলিমরাও তাহার অত্যাচার হইতে বাঁচিয়া থাকেন নাই। সুন্নিদের ওপর সে নানা রকম নিষেধাজ্ঞা ও বাধ্যবাধকতা প্রদান করে।
খ্রিষ্টান ও সুন্নিদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। শুধু শুধু তাহার মতো পাগলাদের কারণে ইসলামের নাম খারাপ হয়।
শুধু মানুষ নয়; পশুরাও তাহার অত্যাচার হইতে বাঁচিয়া যাইতে পারে নাই। তাহার প্রাসাদের চারপাশের সকল কুকুর মারিয়া ফেলা হইয়াছিল। কারণ, তাহাদের চিৎকার আল হাকিমের নিকট বিরক্তিকর ঠেকিত।'
হায়, হায় বলে কি!
'সে দাবা খেলা নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছিল। কেননা, সে তাহাতে ভালো ছিল না।'
কী অদ্ভুত...
'অবশেষে একদিন সে একাকী মরুভূমিতে বাহির হইয়া গেল এবং অদ্ভুত হইলেও সত্য, সে আর ফিরিল না।'
আহা আহা...
'তবে এতসবের মধ্যে এইটা ঠিক, বিজ্ঞানের ব্যাপারে তাহার উৎসাহ খলিফা আল মামুন হইতে কোনো অংশে কম ছিল না। তিনি মিশরে দারুল হিকমা স্থাপন করিয়াছিলেন, যেইখান হইতে অনেক বড়ো বড়ো বিজ্ঞানী আবির্ভূত হইয়াছিল। উদাহরণস্বরূপ, জগদ্বিখ্যাত সাইয়িদ ইবনে সিনা সেইখানে কাজ করিয়াছিলেন। শত বছর পূর্বে যখন মানুষ জ্ঞান অর্জনের জন্য বাগদাদে যাইত, তাহার পরিবর্তে মানুষ মিশরে যাইতেছিল।'
জ্ঞানী বুড়ো ক্ষণিকের জন্য মৌন হইলেন। দীর্ঘশ্বাস নিয়া আবার শুরু করিলেন—'এই সময় আমি নীলনদের ওপর দিয়া এক বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করিলাম। খলিফা আল হাকিম তাহা জানিতে পারিয়া তৎক্ষণাৎ আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করিলেন। তোমার প্রশ্ন জাগিতে পারে, নীলনদের ওপর দিয়া বাঁধ কেন, যেখানে বন্যা হওয়া কৃষি জমির উর্বরতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ? এর কারণ হইল, বন্যা সব সময় অতিরিক্ত হইত এবং তাহা মারাত্মক ক্ষতিসাধন করিয়া থাকিত। যাহোক, খলিফার ডাকে সাড়া প্রদান করিলাম। নীলনদ পর্যন্ত ভ্রমণও অনেক আনন্দদায়ক ছিল। কিন্তু যখন আমি নদীর পাড়ে গিয়া পৌঁছাইলাম, আমি বুঝিতে পারিলাম—নদীর প্রস্থ অতিরিক্ত এবং আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নহে। এখন আমার ব্যর্থতার কথাটি গিয়া খলিফাকে জানাইতে হইবে। কিন্তু আমি তাহা করিতে সাহস করিলাম না।
বরং আমি আল হাকিম হইতে বেশি পাগলামি শুরু করিলাম। এতে তিনি মনে করিলেন, আমি সত্যি পাগল হইয়া গিয়াছি এবং আমাকে তিনি গৃহবন্দি বানাইয়া দিলেন।
আমার পরিকল্পনায় আমি ব্যর্থ, কিন্তু আল্লাহ কোনো সময় তাঁহার পরিকল্পনা ব্যর্থ করেন না। একরাত্রে অন্ধকার কামরায় বসিয়া ছিলাম। হঠাৎ করিয়া খেয়াল করিলাম, চাঁদের আলোর সঙ্গে একটি বস্তুর উলটো প্রতিবিম্ব আসিয়া পড়িয়াছে দেয়ালে। আর ইহা আমার জীবন পালটাইয়া দিলো। আলহামদুলিল্লাহ! এই ঘটনাটির কারণেই আলোকবিদ্যার প্রতি আমার আগ্রহ সৃষ্টি হইল। পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আলোকবিজ্ঞানীদের একজন বলিয়া আমাকে স্বীকৃত করা হয়। আল্লাহ আমাকে অমর বানাইয়া দেন, আমার মৃত্যুর ১০০০ বছর পরেও আজও বিশ্বের মানুষ আমাকে স্মরণে রাখিয়াছে। আল্লাহ যাহা করেন, ভালোর জন্যই করেন।'
আমার চেতনা ফিরে এলো। তারিকের মতো বেশি করে পড়ার চেষ্টা করছিলাম রাত জেগে, কিন্তু প্রতিদিনই পড়া অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ছি! উঠে গিয়ে অজু করলাম, আবার ফিরে এসে পড়তে বসে গেলাম ব্র্যাডলি স্টেফেন্সের উপন্যাস The Prisoner of al-Hakim। হঠাৎ মনে হলো—আমার লুঙ্গি পরা, অট্টালিকার জায়গায় পার্ক দেখা আর সুদর্শন বুড়োর সাথে কথোপকথন সবই অবাস্তব ছিল...
বইটি পড়ার সময় ধাক্কা খেলাম। কেন যেন ইবনুল হাইসামের জীবনের একাংশ আর বুড়োর গল্প ১: ১-এ মিলে যাচ্ছে!

টিকাঃ
নোট: হাকিমের পাগলামি বা ইবনুল হাইসামের বন্দি হওয়ার ঘটনার তেমন হিস্টোরিক্যাল ভ্যালিডিটি নেই। সাধারণভাবে যে-ই কোনো বইয়ে এসব উল্লেখ করে, সে পরবর্তী সময়ে এই কথাটা লিখে দেয়। এটা বলতে গেলে নিউটনের আপেল, আর্কিমিডিস ও ইউরেকা, গ্যালিলিও ও পিসার টাওয়ার, জেমস ওয়াট ও কেটলির ঘটনাগুলোর মতো বিজ্ঞানীদের নিয়ে বানানো রূপকথার মধ্যে পড়ে। এখানেও গল্পের জন্য ট্র্যাডিশনাল ন্যারেটিভটা রেখে দেওয়া হয়েছে। বিস্তারিত জানতে দেখুন: Dr. Khalil Andani, Fatimid Imam-Caliph al-Hakim: Debunking the "Mad Caliph" narrative, online video, YouTube।

📘 মুসলিম মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের অনবদ্য গল্প 📄 জাগ্রতের জীবিত সন্তান

📄 জাগ্রতের জীবিত সন্তান


হন্তদন্ত হয়ে ক্লাস রুমে ঢুকলাম।
'কি রে, তুই কালকে আসিসনি কেন? মারতে পারলাম না তোকে!' তারিকের মশকরা।
তবে তার কথায় কান না দিয়ে আমি সিনানকে গিয়ে ধরলাম— 'সিনান! গতকাল কী হয়েছে, জানিস?'
'তুই না বললে ও কীভাবে জানবে?' হেসে বলল তারিক।
'গতকাল আমি আমাদের ঘরের পুরোনো বুকশেলফটা পরিষ্কার করছিলাম। আর তখনই একটা বই আমার হাতে আসে। আমার মনে পড়ে—ছোটোবেলায় বইটা অনেক পড়েছি; আমার জীবনে পড়া সেরা এক বই এটা। বইটার নাম আজব শিশু। কোনো সময় বইটার লেখকের নাম দেখিনি। কিন্তু কালকে খেয়াল করলাম, ইবনে তোফায়েল আন্দালুসি। ইবনে তোফায়েল ঠিক আছে, কিন্তু আন্দালুসি? আন্দালুস মানে মুসলিম স্পেন! উনি নিশ্চয়ই বড়ো কিছু হবেন, সিনান।'
স্বাভাবিকভাবে বলল সিনান— 'হুম, বইটা পড়েছি। মূল বইয়ের নাম Hayy ibn Yaqzan। ইংরেজি করলে অর্থ দাঁড়ায়— Alive Son of Awaken। ল্যাটিন নাম Philosophus Autodidactus। তুই যেটা পড়েছিস, সেটা তো বাচ্চা ভার্সন।'
তারিক হেসে উঠল—'সেই বই পড়িস তুই আরমান, বাচ্চা ভার্সন তোর জীবনে পড়া সেরা বইগুলোর মধ্যে একটি হয়ে গেছে, হে হে!'
'আবু বকর ইবনে তোফায়েল একজন ডাক্তার ছিলেন; মুসলিম স্পেনে। ইবনে রুশদের টিচার, তিনি একজন স্বনামধন্য দার্শনিকও বটে। তাঁর বইটা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম দার্শনিক উপন্যাস। আজ পর্যন্ত বইটির দার্শনিক গুরুত্ব রয়েছে। ১৭-১৮ শতাব্দীতে সারা ইউরোপে খুব প্রভাবশালী একটা বেস্টসেলারে পরিণত হয় বইটি। আধুনিক ওয়েস্টার্ন দর্শনের ওপরও এটার বিরাট প্রভাব রয়েছে। ইউরোপিয়ান রেনেসাঁস আর সায়েন্টিফিক রেভোল্যুশনের ব্যাপারে তো জানিস! এগুলোর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটা হলো এই বই। নিউটন, কান্ট, জন লক, থমাস হোবসের লেখা পড়ে দ্যাখ! স্পষ্ট এই বইয়ের প্রভাব লক্ষ করবি। এগুলো তো সব নন-ফিকশন গেল, ইভেন ফিকশনেও এটার ছাপ দেখবি।'
'তাই নাকি! যেমন?'
'এই ধর এডগার রাইজ বারোজ, রুডইয়ার্ড কিপলিং, ড্যানিয়েল ডিফোর টারজান, মউগলি, রবিনসন ক্রুসো—এই বই তিনটা তো বিশ্ববিখ্যাত। হতে পারে, তিনটাই ইবনে তোফায়েলের বই থেকে অনুপ্রাণিত। অথচ আমরা মুসলিমরা তাদের তিনজনের ভক্ত হলেও ইবনে তোফায়েলের মতো মহান মানুষকে চিনি না। জন লকের একটা লেখা আছে—"An Essay Concerning Human Understanding” নামে। আধুনিক ওয়েস্টার্ন ফিলোসফির ইম্পিরিসিজমের মূল সোর্স বলা চলে। সরাসরি ইবনে তোফায়েলের লেখা থেকে অনুপ্রাণিত। আবার উনার “টাবুলা রাসা” আইডিয়ার ডেভেলপমেন্টেও বইটার সরাসরি প্রভাব আছে। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ধারণা—সব দিক থেকে বইটা পারফেক্ট। আরও শুনবি? কার্ল মার্ক্স, জর্জ বার্কলি, ডেভিড হিউম, উইলিয়াম মলিনো, গটফ্রিড লাইবনিজ, বারুখ স্পিনোজা, জঁ জাক রুসো, ভল্টেয়ার, ক্রিস্টোফার হাইগেনস, জন ওয়ালিস, অ্যালেক্সান্ডার পোপ, ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্ত... একবাক্যে বললে— "Hayy is the first, best and most influential philosophical novel ever written."'
আমি আর তারিক সিনানের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। এমন সময় স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। আমি ব্যাগ রেখে বসলাম, অবশেষে।
টিফিন টাইমে তারিক সিনানকে বলল— 'বল, এবার জীবন্ত কাহিনি!'
সিনান ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার ভাব করে বলল— 'ওইটা কী আবার!'
'আরে, হাই ইবনে ইয়াকজানের গল্প বল না রে তুই...'
মুচকি হাসি নিয়ে সিনান বলতে শুরু করল— 'হাই একটি নবজাতক, যে নির্জন দ্বীপে একা। সেখানে একটি হরিণ তাকে বড়ো করল এবং প্রকৃতি প্রদত্ত জ্ঞান থেকে সে সবকিছু শিখল। অন্য প্রাণীদের মতো না হয়ে সে বুঝতে পারল, তার উলঙ্গতা ও নিজের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না থাকার কথা। তাই সে লতাপাতা দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিল এবং নিজের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করল।'
'ওয়াও! নির্জন দ্বীপে থেকেও বুঝতে পারল, নিজের শরীরকে ঢেকে রাখতে হয়? তা-ও কেউ শেখানো ছাড়া? আজকাল তো অনেক শিক্ষিত মানুষও এটা বুঝতে চায় না!'
'এরপর শোন। পশুদের দুই পায়ের তুলনায় নিজের দুই হাতের বিশেষত্ব টের পায় সে। একসময় তার মা হরিণী মারা যায়। পর্যবেক্ষণ থেকে সে বুঝে নেয়, পশুদের একটা আত্মা থাকে। দেহকে এটা শুধুই একটি যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। প্রকৃতি নিয়ে গভীর চিন্তা করে করে সে বিভিন্ন জিনিস আলাদা করতে শেখে। মানে পশু, গাছ, খনিজ এগুলো আরকি। সব জিনিসের Body আছে, এগুলোর কার্যপদ্ধতি কিন্তু একটা আরেকটা থেকে আলাদা। এটাও হাই ধরতে পারে। আবার প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট আকার আর আলাদা ফাংশনালিটি থাকবে। এটাই হলো আত্মা। কিন্তু এই আত্মা দেহ পেল কীভাবে?'
'আল্লাহ দিয়েছেন আরকি।' বোকার মতো বললাম আমি।
'ওইটা তো আমরা জানি।' সিনান বলল—'এখানে তো হাইকে নিয়ে কথা হচ্ছে।'
'ও হ্যাঁ, রাইট।'
'নিশ্চয়ই আত্মাটা কেউ তাকে দিয়েছে। এভাবে হাই একজন অনন্য সত্তার কথা চিন্তা করল, যে প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন গুণাবলি দিয়েছে। সে চিন্তা করে—এই অনন্য সত্তা তাহলে কোত্থেকে এলো আবার? যুক্তিচিন্তার মাধ্যমে বুঝতে পারল, তার সৃষ্টিকর্তা থাকলে আবার সেটিরও আরেকটি সৃষ্টিকর্তা লাগবে। এমন হলে তো এক অসীম ধারা চলতে থাকবে। তাই সে সত্তা একজনই, অনন্য। এমন চিন্তা-ভাবনা করতে করতে সে অনেক কিছু সঠিকভাবে বুঝে নিল।
এমন সময় পাশের বসতিপূর্ণ দ্বীপ থেকে আবসাল নামের একজন সাধু এসে হাইয়ের সাথে দেখা করল। ওই দ্বীপের রাজা সালামান। আবসাল, হাইকে, মানে প্রকৃতির এই সন্তানটিকে কুরআনের কথা জানাল। তারা দুজনে ঈশ্বর, প্রকৃতি ও নৈতিকতা নিয়ে লম্বা আলাপ চালাল। আবসাল অবাক হলো, ঐশ্বরিক বাণী হতে সে যা শিখেছে, হাই দেখা যাচ্ছে সেসব শুধু যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমেই বুঝে ফেলেছে! হাই আবার নিজের বুদ্ধিমত্তা থেকে সাথে সাথে বুঝতে পারল, কুরআনের শিক্ষাগুলো সত্য। এরপর তারা দুজনই একমত হলো, ধর্মের যৌক্তিক ব্যাখ্যা আর দর্শনের স্বাধীন চিন্তার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
এটা সাধারণ জনগণকে জানানোর জন্য তারা পাশের শহরে গেল। কিন্তু গোঁড়া মানুষরা তাদের কথা বিশ্বাস তো করলই না; উলটো প্রচলিত বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রাখল। হাই; যে এর আগে কখনো মানুষদের মাঝে আসেনি, মনে করল—মানুষরা সাধারণত স্বার্থপর, লোভী আর নিজ প্রবৃত্তির কাছে নত। এসব মানুষ যুক্তি ও বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেয় না। এরা দর্শনের কী বুঝবে? এদের সাহায্য প্রয়োজন, এরা নিজের চিন্তা নিজে করতে পারবে না। এই শিক্ষার পর তারা দুজনে আবার নির্জন দ্বীপে এসে চিন্তা-ভাবনা আর আল্লাহর ইবাদত করতে থাকল। এই আরকি কাহিনি।'
'বুঝলাম।' আমার কণ্ঠে অনিশ্চয়তা।
'ইবনে তোফায়েলের বইয়ের মূল শিক্ষা হচ্ছে—সঠিকভাবে পরিচালিত যুক্তিচিন্তা পরবর্তী সময়ে কুপ্রবৃত্তিহীন ও লোভহীন ধর্মীয় বিশ্বাসেই পরিণত হয়। যুক্তি ও ধর্ম একে অপরকে পরিপূর্ণ করে। বর্তমানের ক্ষেত্রে একদা আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন— "Science without religion is lame, religion without science is blind."
'আরেকটা ব্যাপার আছে শোন। মানুষ তার যৌক্তিকতা ব্যবহার করে কুরআনে আল্লাহ আমাদের যে উদ্দেশ্যে উদ্যত হতে বলেছেন, সে পর্যন্ত যেতে পারবে— এ ধারণা মূলত দিতে চাচ্ছেন ইবনে তোফায়েল। কুরআনে যে নৈতিকতা বর্ণিত আছে, আল্লাহ আমাদের স্বাভাবিক রূপ সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন—যা হলো ফিতরাহ। যখন মানুষ বিপথে যায়, তখন ফিতরাহর বিরুদ্ধে কাজ করে। সুতরাং নির্জন দ্বীপে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ছাড়া একজন মানুষ তার ফিতরাহকে অনুসরণ করে সে পর্যন্ত যেতেই পারে। পরবর্তী সময়ে ইবনুন নাফিস ইসলামের একজন আলিম হওয়ার পরও কিছুটা এমনই দেখিয়েছেন। তাই এই ধারণা নিয়ে ভেবে দেখা যায়। কিছু মডার্নিস্ট মুসলিম বলতে চেয়েছেন— ইবনে তোফায়েল এখানে একরকম সেক্যুলার ভাবধারার বয়ান দিয়েছেন, কিন্তু এটা একেবারেই বাজে ব্যাখ্যা। মূলত ইবনে তোফায়েল সুফিবাদের দিকে ইঙ্গিত করেন, বইয়ের পরিণতি ক্লিয়ারলি তা-ই নির্দেশ করে। এই বইয়ের মর্মার্থ এই নয়—"Reason is better than religion, বরং Reason leads to religion, " বুঝতে পারছিস?'
'That's just sick! অস্থির ব্যাটা' তারিক বলল—'ইবনে তাইমিয়াহ থেকেও আমরা এমন তত্ত্ব পাই। সুস্থ যুক্তি আর ওহির মাঝে কোনো বিরোধ নেই—তিনিও এমন দেখিয়েছেন। তিনি আল্লাহর এমন এক বর্ণনা দেন—যা তাঁর বিশ্বাস, কুরআন-হাদিস দ্বারা সমর্থিত। কিন্তু তিনি এর জটিল দার্শনিক ব্যাখ্যাও দেন! তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শেষমেশ আমরা একই জায়গায় পৌঁছাই! এটা কনসিডার করার কিছু না; বরং এটাই ঠিক। ইবনে তাইমিয়া এটা একদম প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।'
কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল সিনান—'কি রে তারিক! ইবনে তাইমিয়াহ স্টাডি করিস তুই?'
'তুই করিস না? পড়িস পড়িস, ভয়ংকর মজা, ব্যাটা।'
'Okay অাখি।'
'আর শোন, তুই যে রকম বললি, একাকী একজনকে দ্বীপে রেখে দিলে সে নিজ থেকে কোনো রকম ঐশ্বরিক কোনো কিছু ছাড়া আল্লাহকে পেয়ে যাবে, সেটাও ইবনে তাইমিয়া বলেছেন— নবির দিকনির্দেশনা ছাড়াও মানুষের অকলুষিত প্রকৃতি ইসলামে ফিরে আসে। ইবনে তাইমিয়া, ফাখরুদ্দিন রাজির বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। এরপরেও এই বিষয়ে দুজনে অনেকটা একমত। রাজি বলেন— "আল্লাহ মানুষের যুক্তি এমনভাবেই সৃষ্টি করেছেন, তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করবে।” তাই ইমাম ফাখরুদ্দিন রাজির মতে, কুরআন-হাদিস ছাড়াও অকলুষিত যুক্তির মাধ্যমে মানুষ দ্বীনের পথে চলতে পারবে।'
'জিনিসটা তো খুবই সেরা!' আমার রিমার্ক দিয়ে টিফিন টাইম শেষ হলো। অনিশ্চয়তা দূর হলো। আমরা ক্লাসে ঢুকলাম।
ছুটির পর আমরা তিনজন হেঁটে হেঁটে বাসায় যাচ্ছি। সিনান বলল—'সবই ভালো। শুধু একটা জিনিস বুঝলাম না—ইবনে তোফায়েল এত ভালো একটি উপন্যাস একা কীভাবে লিখলেন। গবেষণায় নামলাম। দেখতে পেলাম—না, উনি একা সম্পূর্ণ নিজ হাতে লিখেননি। "হাই ইবনে ইয়াকজান নামে ইবনে সিনারও একটি গল্প ছিল। ইবনে উমর-এরও একটা গল্প আছে সালামান ওয়া আসাল নামে। ইবনে তোফায়েলের বইয়ের নাম এগুলোই। আবার এই গল্পেও একটি হরিণও ছিল! অবশ্যই ইবনে সিনার লেখা গল্প আর ইবনে তোফায়েলের লেখা গল্পে বিরাট ফারাক। প্রায় সব মুসলিম দার্শনিকের লেখা গল্প মূলত "Ibn Sina Recycled"।
ইবনে তোফায়েল ছাড়াও ইবনুন নাফিস, আবু হামিদ আল গাজালি, শিহাবুদ্দিন সুহরাওয়ারদিসহ অনেকে আছে। ইবনে তোফায়েলের বইটার ওপর সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলেছে ইবনে বাজ্জাহর তাদবির আল মুতাওয়াহহিদ বই। হাই ইবনে ইয়াকজান ওই কল্পিত চরিত্রটির একটা চরম রূপ। তবে ইবনে বাজ্জাহর ওই চরিত্রটি অসম্পূর্ণ ছিল। তাই আবু হামিদ আল গাজালির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি চরিত্রটিকে পূর্ণতা দান করেন হাই ইবনে ইয়াকজান হিসেবে। আর হ্যাঁ, কুরআনে ইবরাহিম-এর ঘটনা থেকেও ভালোভাবে প্রভাবিত ছিলেন ইবনে তোফায়েল। হুনাইন ইবনে ইসহাকের অনুবাদকৃত একটা গ্রিক টেক্সটেরও প্রভাব আছে ইবনে তোফায়েলের ওপর। মূলত এদের সাথে ইবনে তোফায়েলের গল্প অনেকটাই মেলে। আর সম্ভবত মিশরীয় ও ইরানি প্রভাবও আছে।'
'ধুর ব্যাটা!' বলল তারিক— 'ভাবলাম, ইবনে তোফায়েলের অরিজিনাল কাণ্ড। এখন তো দেখি পুরাই...'
'উঁহু! দ্বিমত। লেখার ফুল ক্রেডিট ইবনে তোফায়েলের। তুই দ্যাখ, একপাশে যেসব বইয়ের কথা বলেছি, সবই সিম্পল গল্প। তেমন বিশেষত্ব নেই। বেশ সিম্পল গল্প থেকে ইবনে তোফায়েল অসাধারণ একটা দর্শনভিত্তিক উপন্যাস বানিয়ে ফেলেছেন। এর জন্য ভালো দক্ষতা আর উচ্চমানের চিন্তাধারা লাগে।
শোন, শেক্সপিয়রের The Merchant of Venice খুব বিখ্যাত নাটক। কিন্তু ১৫৯৬ সালে শেক্সপিয়র এটা লেখার ১৭ বছর আগেই নাটকটা মঞ্চস্থ হয়। তারও আগে এমনই একটি বই পাওয়া যায় স্যার জিওভানির লেখা। ১৫৫০ সালে প্রকাশিত। শেক্সপিয়রের বইয়ের কাহিনির সাথে হুবহু মিলে যায়। আবার শাইলকের চরিত্র তিনি ধার করেন বিখ্যাত সাহিত্যিক মার্লোর জু অফ মাল্টা থেকে। তো, শেক্সপিয়রের বইটি কোনোভাবেই অরিজিনাল না। কিন্তু এতে কি শেক্সপিয়রের সম্মান কমানো হয়? না! সাহিত্যে এমন কাজ নিয়মিতই হয়। এটা নিয়ে সমালোচনা করা মানে সাহিত্যিকের জ্ঞানের অভাব। শেক্সপিয়রেরটা অসাধারণ, অন্য লেভেলের সাহিত্য মানলাম। কিন্তু ইবনে তোফায়েল যে চমৎকার দর্শন ও বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দিলেন, এটার আলাদা ক্রেডিট নেই? তা-ও আবার ইবনে সিনার বই আর হাই ইবনে ইয়াকজানের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ইবনে সিনার বইটি মূলত অনেকটা প্রাবন্ধিক লেখার মতোই। সাহিত্য বলতে কিছুই নেই তাতে।'
'এজন্য ফিলিপ কে হিট্টি কোনো রকম কথা না বলেই ইবনে তোফায়েলের বইটাকে অরিজিনাল বলেছেন।'
'অ, তাহলে তো ঠিকই আছে।' তারিক বলল।
'এই বইটা পাঠকদের আনন্দদানের জন্য লেখা না; বরং ১২শ শতকে মুসলিম বিশ্বে থাকা বিজ্ঞান ও দর্শনের একটা সামারি। সে সময় মুসলিম বিশ্বে থাকা বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ভাবধারার অনেকটাই তুলে ধরা হয়ে গেছে বইটিতে। এমনিতে পড়লে তোর কাছে সাদামাটা লাগবে। তুই আগে 'Maker of the Muslim World' সিরিজে টানেলি কুকোনেন-এর Ibn Tufayl বইটা পড়ে নিস। তাইলে বুঝবি, কীভাবে এই বই ইউরোপ পালটে দেয়, কী আছে এই বইয়ে।'
আমাদের মাঝে এমন অনেক সময়ই হয়, স্কুল থেকে বাসায় যাওয়ার সময় অনেকক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডিসকাশন করি। অবশেষে আজকেরটা শেষ হলো। এখন বাসার পথে...

টিকাঃ
১. Dr. Ibrahim Kalin. 'Hayy ibn Yaqdhan and the European Enlightenment. Daily Sabah'.
২. G. A. Russell, The Arabick Interest of the Natural Philosophers in Seventeenth-Century England. (Brill Publishers, 1994) p. 228.
৩. G. J. Toomer, Eastern Wisedome and Learning: The Study of Arabic in Seventeenth-Century England (Oxford University Press, 1996) p. 218.
৪. Samar Attar, The Vital Roots of European Enlightenment Tufayl's Influence on Modern Western Thought (Lexington Books, 2010)
৫. Cyril Glasse, New Encyclopedia of Islam (Rowman Altamira 2001) p. 202
৬. The Royal Society. Arabic Roots June 2011. আপাতভাবে জিনিসটা ইসলামবিরোধী মনে হতে পারে, তবে আশআরি চিন্তা-ভাবনায় ক্ষিতিবাদ ব্যাপারে ধারণা ট্যাবুলা রাসার মতোই (জুওয়াইনি, গাজালি, ফাখর রাজি)।
৭. Taneli Kukkonen, Ibn Tufayl: Living the Life of Reason (Making of the Muslim World. Oneworld Academic, 2014)
৮. Dominique Urvoy, 'The Rationality of Everyday Life: The Andalusian Tradition?' in Lawrence I. Conrad, The World of Ibn Tufayl: Interdisciplinary Perspectives on Hayy Ibn Yaqzan (Brill Publishers, 1996) pp. 38-46.
৯. Diana Lobel, A Sufi-Jewish Dialogue: Philosophy and Mysticism in Bahya Ibn Paquda's Duties of the Heart (University of Pennsylvania Press, 2006) P: 24.
১০. Martin Wainwright, 'Desert island scripts' The Guardian.
১১. Tor Eigeland, 'The Ripening Years' Saudi Aramco World September-October 1976.
১২. G. A. Russell (1994), The 'Arabick' Interest of the Natural Philosophers in Seventeenth-Century England, pp. 224-239.
১৩. Samar Attar, The Vital Roots of European Enlightenment op. cit. p: 20; Andreas Eppink and Muhammad Perla. 'Arab Thinking in the History of Ideas: The Case of ibn Tufail' Academia.
১৪. Oussama Hamza. 'Alive and Awake: The First and Greatest Novel' The Muslim 500 (2020) p: 202-204.
১৫. মূল বইটি পড়তে উৎসাহিত এবং বাংলা অনুবাদ পড়তে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ইংরেজি অনুবাদের ক্ষেত্রে গ্রন্থপঞ্জির বইটি রিকমেন্ডেড।
১৬. Dr. Ibrahim Kalin. 'Hayy ibn Yaqdhan and the European Enlightenment' Daily Sabah.
১৭. Albert Einstein, Out of My Later Years (Gramercy, 1993)
১৮. এখানে ইবনে তোফায়েলের জন্য কথাটার আক্ষরিক অর্থ নেওয়া হচ্ছে। আইনস্টাইন কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, সেটার ব্যাপারে কিছু বলা হচ্ছে না।
১৯. আইনস্টাইনের জন্য কনটেক্সচুয়ালি বুঝতে হলে পড়ুন : Majid Daneshgar. ‘Behind the Scenes: A Review of Western Figures' Supportive Comments Regarding the Qur'an' Al-Bayan. 11:2 (2013), pp. 131-153. বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে সংঘাত নিয়ে আইনস্টাইনের চিন্তাধারার ব্যাপারে জানতে পড়ুন : John Hedley Brooke. 'If I Were God' Einstein and Religion Zygon. 41:3 (2006), 941-54.
২০. আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, ইলমের ভালোবাসায় চিরকুমার উলামায়ে কেরাম (অনুবাদ : আবু সাঈদ মুহাম্মদ নুমান, মাকতাবাতুল আযহার, ২০১৯) পৃষ্ঠা: ১৭৭-১৮৩।
২১. পড়ুন-ইবনুন নাফিসের কৃতিত্ব।
২২. Dr. Abu Shadi al-Roubi. 'Ibn Al-Nafis as a philosopher', Symposium on Ibn al-Nafis, Second International Conference on Islamic Medicine: Islamic Medical Organization, Kuwait; available at: http://www.islamset.com/isc/nafis/drroubi.html
২৩. Oussama Hamza. Alive and Awake: The First and Greatest Novel The Muslim 500 (2020) p: 202 204.
২৪. ইবনে তোফায়েলের বইয়ের শিক্ষা ও দর্শন এই গল্পে আলোচ্য নয়। তার জন্য অবশ্যই আলাদা গল্প/লেখা লাগবে। এখানে শুধু একটু স্বাদ দেওয়া হলো। আল্লাহ তাওফিক দিলে ভবিষ্যতে লেখা যাবে।
২৫. Carl Sharif el-Tobgui, Ibn Taymiyya on Reason and Revelation. A Study of Dar ta'arud al- aql wa-l-naql (Leiden: Brill, 2020); Yasir Kazi [Qadhi], 'Reconciling Reason and Revelation in the Writings of ibn Taymiyyah (d. 728/1328): An Analytical Study of ibn Taymiyyah's Dar al-Ta'arud' (Phd Dissertation, Yale University, 2013); বাংলায় একটা আইডিয়া পেতে চাইলে : আরমান ফিরমান, 'যুক্তি ও ওহীর মাঝে ইবনে তাইমিয়া: কার্ল শারিফ আল তোবোগুই ও ইয়াসির কাদির ডক্টরাল থিসিসের একটা ওভারভিউ' Medium.
২৬. Carl Sharif el-Tobgui, p: 261.
২৭. Paul L. Heck, Skepticism in Classical Islam: Moments of Confusion (Routledge, 2014) p: 166; Tariq Jaffer, Razi: Master of Quranic Interpretation and Theological Reasoning (Oxford University Press).
২৮. Sarah Stroumsa, 'Avicenna's Philosophical Stories: An Aristotelian Poetics Reinterpreted' available at: https://booksc.xyz/view/ 11397170/e5b9a6
২৯. Yasir Kazi, p: 293.
৩০. একটা আইডিয়া পেতে : https://bit.ly/2XFKXB8
৩১. 'Introduction' in William Shakespeare, The Merchant of Venice (Penguin Books, 1999)
৩২. Abu Ali ibn Sina, Risalah Hayy ibn Yaqzan (Tr. Form French by W.R. Trask, Princeton, NJ, 1990) in S.H. Nasr and M. Aminrazavi op. cit.
৩৩. Philip K. Hitti op. cit. p: 582.

ফন্ট সাইজ
15px
17px