📄 অনুবাদের সুনামি
লাইব্রেরির অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে আসার অনেক দিন পেরিয়ে গেল। সিনান তার বাসায় ডেকেছে। তারিককে কল দিয়ে সিনানের বাসার সামনে দাঁড়াতে বললাম। সিনানদের বাসায় যেতে যেতে চিন্তা করলাম আমাদের তিনজনের মেলবন্ধনের কথা। সিনানকে চিনি অষ্টম শ্রেণি থেকে। তারিককে অনেক আগে থেকেই দেখতাম। তবে সব সময় বাঁদরামি করত বলে নবম শ্রেণির আগে তার সাথে কখনো কথা বলিনি। লাইব্রেরির ঘটনার পর থেকে আমাদের এই বন্ধুত্ব।
সিনান খুব প্রতিভাধর একটি ছেলে। কিছুটা লাজুক স্বভাবের, সব সময় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত। ভেতর আর বাইরের অনেক জ্ঞান-ই সে রাখে। এমনিতে মিশুক না। তবে জ্ঞানের কথা উঠলে ঠিকই মিশুক।
তারিক মিশ্র স্বভাবের। সারাক্ষণ মাস্তি করতে থাকে। কিছুক্ষেত্রে মজাটা হারামের দিকে চলে যায়। কিছুতেই সিরিয়াস না, পরীক্ষায় ফেল করলে যেন আরও খুশি। অবশ্য কেন যেন মনে হয়, ছেলেটার ভেতরের দিকটা অসম্ভব ভালো। একটু নির্দেশনা পেলেই হয়তো সৎ পথে ফিরে আসত।
রইলাম আমি; হাবলা টাইপের ভ্যাবলা ছেলে। সিনান যতটুকু মিশুক, আমি তার থেকেও কম। বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। আর যা বলি, তা-ও কেউ বোঝে না! এজন্য ক্লাসে যেসব ছেলের কোনো গুরুত্ব নেই, একদম হাবাগোবা, তারাই আমার বন্ধু।
'আসসালামু আলাইকুম, তারিক।'
'ওয়া আলাইকুম আসসালাম।' তারিককে দেখতে খুবই মনমরা দেখাচ্ছে। আসলে, গত ১০-১৫ দিন ধরে ও এমন। লাইব্রেরির ওই ঘটনার পর থেকে ও আমাদের দুজনের সাথেই থাকে। মজা করে অনেক ভালো। সাধারণত আর উলটা-পালটা কথা বলে না।
আমরা সিনানের বাসায় ঢুকলাম। রুমে প্রবেশ করে দেখি, সিনান শুয়ে আছে। হাতে একটা ডিভাইস। একটি ফাঁকা বুকশেলফও নজরে পড়ল। অবশ্য কয়েকটি বই ছিল সেখানে।
'কি রে! তুই কি মুতানাব্বির মতো নাকি?'
'হ্যাঁ?' আমার আওয়াজ শুনে সিনান উঠে বসল। 'কেন? কী করেছিলেন মুতানাব্বি?'
আমি বললাম— 'মুতানাব্বি পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। তিনি একজন দোকানদারের কাছ থেকে একটি বই ধার এনে কিছুদিন পর তা ফেরত দিতে গেলেন। দোকানি জিজ্ঞেস করলেন, “কিনবেন না?” মুতানাব্বি উত্তর দিলেন, "আর কিনে কী করব!" বুঝেছিস?'
'না...'
'মানে তার মস্তিষ্কের মধ্যে পুরো বইটি ততক্ষণে স্টোর হয়ে গিয়েছিল! রুমে বুকশেলফ আছে, কিন্তু ফাঁকা! তুইও উনার মতো করিস নাকি?'
'আরে কী বলিস! বুকশেলফ নতুন নিয়েছি বলে ফাঁকা হয়ে আছে। সামনে অনেক বই পড়া হবে, ইনশাআল্লাহ। আচ্ছা, তোরা বস। তোদের সাথে কিছু কথা আছে।'
'তোর হাতে এটা কী?'
'কিন্ডল।'
'ভাইরে ভাই, তুই তো পুরাই বইখোর!'
'হা হা, বস তোরা।'
আমরা দুজন বসলাম। সিনান শুরু করল— 'লাইব্রেরির ওই ঘটনার পর তো অনেক দিন হয়ে গেল। সেই অভিজ্ঞতার কথা তোদের এতদিন মনে থাকবে— সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তোরা যে নিজে থেকে পড়া শুরু করবি, সেটা আশা করিনি। তবে তুই পড়ছিস, সেটা জেনে ভালো লাগল। তারিকের কাছ থেকে তো একদম কিচ্ছু আশা করি না। ভেবেছিলাম, আমিই একটু একটু পড়ে পড়ে তোদের জানাব, এজন্যই আজ তোদের ডাকা।'
'তো আজ কী পড়াবি?' উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
তারিক বলল—'আচ্ছা, লাইব্রেরিয়ান যেসব বিজ্ঞানীদের কথা বলেছিলেন, তাদের নিয়ে তো জানা দরকার।'
'জানবি আরকি! কিন্তু আজ যার জন্য ডেকেছি, সেটা বলি। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত ও বিশাল অনুবাদকরণ প্রক্রিয়া: The Greco-Arabic Translation Movement, সাধারণভাবে The Translation Movement বা অনুবাদ আন্দোলন বলা হয়। এ সময় গ্রিক, সংস্কৃত, মিশরীয়, পাহলভি, সিরিয়্যাক ইত্যাদি ভাষার বিপুল পরিমাণ বই আরবিতে অনূদিত হয়। এটি মূলত চলেছিল অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে দশম শতাব্দীর শেষ দিক পর্যন্ত।'
'তারপর কি শেষ হয়ে যায়? শেষই যদি হবে, তাহলে শুরুই-বা হয়েছিল কেন?'
'দুটো কারণ আছে। প্রথমটা ছোটো। মুসলিমদের আশেপাশের অঞ্চলগুলো থেকে অনুবাদ করার মতো আর কিছু ছিল না। দ্বিতীয় কারণটা কিন্তু গুরুতর মূলত মুসলিমদের শেখানোর মতো তাদের কাছে আর কিছু ছিল না! মুসলিমরা নিজেদের বিজ্ঞান গড়ে তুলেছিল। প্রথম গ্রিক ও মিশরীয় বই অনুবাদ করা হয় উমাইয়া যুগে খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের আদেশে। সেগুলো ছিল মেডিকেল বই। তিনিই মুসলিম বিশ্বে প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন করেন।
আল মাহদি, হারুনুর রশিদ আমলে ধীরে ধীরে ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্ট বেগ পেতে থাকে। তবে সেটি পূর্ণ রূপ লাভ করে মামুনের সময়। সংস্কৃত অনুবাদ শুরু হয় ইয়াহইয়া ইবনে খালিদের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন খলিফা মামুনের উজির। তিনি ভারত থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে ডাক্তার এনে একটি হাসপাতাল স্থাপন করেন। সেখান থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃত বইয়ের অনুবাদ শুরু হয়। বিক্ষিপ্তভাবে অবশ্য এটি জাফর আল মানসুরের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল।
যাহোক, এই অনুবাদের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা দিয়েছেন আস-সাফাদি। ১৪ শতাব্দীর স্কলার। সেখানে দুটি পদ্ধতি ছিল: আক্ষরিক অনুবাদ আর ভাবানুবাদ। দ্বিতীয়টাই সেরা। এর পথিকৃৎ হলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক। লেখকের বক্তব্য বোঝা না গেলেই কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করা হতো। অনূদিত বইগুলো বেশ কিছু পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে যাচাই করা হতো। সেখানে উত্তীর্ণ না হলে প্রকাশ করা হতো না। বুঝতেই পারছিস, মুসলিমরা অথেন্টিসিটির ব্যাপারে কত কঠোর ছিল। এ ব্যাপারে কোনো চান্স নিত না। ফিলসফি অনুবাদ হতো নির্দিষ্ট ভাবধারা অনুসরণে। অনুবাদকদের সম্মানও ছিল প্রচুর। এই পেশার জন্য তারা অনেক ধনী হয়ে উঠেছিলেন। মুসলিম অনুবাদকগণ এত উঁচু লেভেলের বই এত কম সময়ে এত নিখুঁতভাবে কীভাবে অনুবাদ করতেন—এটাই ভেবে কূল পাচ্ছেন না আধুনিক ইতিহাসবিদরা।
১০ম শতাব্দীতে যখন অনুবাদ কাজ সমাপ্ত হয়, তখন বিপুল পরিমাণে বই আরবিতে অনূদিত হয়ে যায়। যাদের বই অনুবাদ হয়, তাদের মধ্যে আছেন গণিতের ক্ষেত্রে ইউক্লিড, জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে টলেমি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্যালেন, উদ্ভিদবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডায়োসকরিডিস আর বর্তমানে অ্যারিস্টটলের যে পরিমাণে বই পাওয়া যায়, মোটামোটি তার সমসংখ্যাক বই-ই পাওয়া যাচ্ছিল তখন। ২৫০ বছরের মাথায় মুসলিমরা তার আগের জাতিসমূহের প্রায় সকল বই অনুবাদ করে ফেলে।
এই ব্যাপারে সবচেয়ে সেরা মৌলিক কাজ দিমিত্রি গুটাসের। তিনি ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্টকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন, যা সুন্দর করে সামারাইজ করেছেন রবার্ট উইসনভস্কি :
১. Earliest Period: যাতে ইউক্লিডের এলিমেন্টস ও অ্যারিস্টটলের রেটোরিক অনূদিত হয়।
২. Al-Kindi Period: যেটাতে বাইতুল হিকমায় আল কিন্দির সুপারভিশনে অনুবাদ প্রক্রিয়া চলে।
৩. Hunayn Ibn Ishaq Period: হুনাইন ইবনে ইসহাকের স্টাইলে যেসব অনুবাদ হয়েছে।
৪. Qusta Ibn Luqa Period: যে সময়ে কুস্তা ইবনে লুকার স্টাইল অনুসৃত হয়।
৫. Stage of Scholarly Emendation: সর্বোচ্চ চূড়া; যখন যেকোনো বই অনুবাদ হতো না। বইয়ের কন্টেন্ট অনুযায়ী কেবল প্রয়োজনীয় জিনিসাদি অনূদিত হতো।
এবার একটা সিরিয়াস কথা বলতে হবে। লাইব্রেরিয়ান আমাদের কী বলেছিলেন মনে আছে? এটা না হলে সেই আর্কিমিডিস, অ্যারিস্টটল, পিথাগোরাসসহ অন্যান্য বেশিরভাগ গ্রিক লেখকের বই-ই হারিয়ে যেত।
এই মুভমেন্টটা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটা। ঠিক আছে। কিন্তু লাইব্রেরিয়ানের কথাটা বাস্তব না।'
'কী বলিস!'
'লাইব্রেরিয়ান ভুল করেছেন। অবশ্য তার দোষ না, উৎসুক কিংবা আরও ভালোভাবে বললে হীনম্মন্য মুসলিমরা নিজেদের কাজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এটা এত বেশি ছড়িয়েছে যে, মানুষ সত্য বুঝে বসে। ঠিকভাবে স্টাডি করতে দেখতে পারত, ব্যাপারটা মূলত আরও অনেক বেশি সেরা।'
কথা শুনে আমি তো একেবোরে হাঁ করে তাকিয়ে আছি।
'দেখ, মধ্যযুগে গ্রিকদের টেক্সট বা বইগুলো ইউরোপে পাওয়া যেত, সেগুলো বিলুপ্ত হয়নি। বাইজান্টিয়াম, এথেন্স ইত্যাদি জায়গায় সেসব পাওয়া যেত। আর শুধু সেখানেই না; ফ্রান্সেও বিশাল পরিমাণ গ্রিক টেক্সট ছিল। ইংল্যান্ডে ছিল, জার্মানিতে ছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে, কেউ সেসব জায়গায় গিয়ে টেক্সটগুলো নিয়ে অনুবাদ করত না; যদিও গ্রিক থেকে অনুবাদ তাদের জন্য অনেক সহজ ছিল। উলটো আমরা দেখতে পাই, মুসলিম বিশ্বে এসে ইউরোপিয়ানরা কষ্ট করে আরবি ভাষা শিখে তারপর টেক্সট ল্যাটিনে অনুবাদ করছে। প্রাইমারি টেক্সট তাদের কাছে থাকার পরেও অর্থাৎ গ্রিক ভাষায় থাকার পরেও সেকেন্ডারি টেক্সট আরবি থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ করেছে। এর কারণ কী? কেন তারা গ্রিক এথেন্সে না গিয়ে মুসলিম টলেডো যায়? আর আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে—শত শত বছর ধরেই তো টেক্সটগুলো সেখানে পড়েছিল, এতদিন অনুবাদ করেনি কেন? মুসলিমরা এলো, আরবিতে সেগুলো অনুবাদ করল, তারপর ইউরোপিয়ানরা আরবি থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ শুরু করল—কাহিনি কী?
সাধারণ ন্যারেটিভে কি খাওয়ানো হয়, জানিস? মুসলিমরা কেবল গ্রিকদের কাজ সংরক্ষণ এবং তা ভাষান্তর করেছে। তাদের মাঝে কোনো নতুনত্ব নেই, তারা নিজেরা কিছুই করেনি। সুতরাং মুসলিমদের কোনো কৃতিত্ব নেই, গ্রিকদের টেক্সট ইউরোপে আসে আর ইউরোপে রেভোল্যুশন ঘটে যায়। কী জঘন্য ইউরোসেন্ট্রিক বায়াস! দ্যাখ, মুসলিমরা গ্রিকদের কাজ সংরক্ষণ করেছে—এটা পুরোপুরি হিস্টোরিক্যালি ইনভ্যালিড অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে অযৌক্তিক। কিন্তু মুসলিমরা যেটা করে, সেটা এর থেকে আরও অনেক বড়ো—যা হলো ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর।
ইউরোপের বিভিন্ন ভূমি থেকে হাতেগোনা কয়েকটা টেক্সট ল্যাটিন হয়েছিল। কিন্তু ৯৯% আরবি থেকে অনুবাদ করেন ইউরোপীয় অনুবাদকরা। প্রভাবশালী আর্কিটেকচারাল হিস্টোরিয়ান উইলিয়াম লেথাবি বলেন— “কাজের অনুবাদ শতভাগই আরবি থেকে; সরাসরি গ্রিক টেক্সট থেকে অনূদিতগুলো কেউ-ই ব্যবহার করেনি।” দ্যাখ, গ্রিক টেক্সট ইউরোপের উত্থানের মূল কারণ ছিল না; কারণ ছিল মুসলিমদের লেখা টেক্সটসমূহ।
গ্রিক টেক্সট তো হাজার বছর ধরে পড়ে আছে, ইউরোপে কিছু ঘটেনি। হঠাৎ মুসলিমদের থেকে অনুবাদ করার পর এমন কী হলো যে, ১২শ শতকে একটা আর ১৭শ শতকে আরেকটা রেভোল্যুশন ঘটে গেল? দুই ক্ষেত্রেই বিশাল পরিমাণ আরবি টেক্সট ঠিক সে সময়টায় অনুবাদ হয়েছিল। গ্রিক টেক্সট থেকে অনুবাদ না করে আরবি থেকে অনুবাদ করেছিল। কারণ, অনুবাদ করার সময় ভুল পেলে মুসলিমরা তা শুধরে দিত। এজন্য মুসলিমদেরটা ছিল আপডেটেড।
তা ছাড়া অনুবাদ করার পাশাপাশি মুসলিমরা যে ব্যাখ্যা লিখত, নোট দিত, তা ছিল ইউরোপিয়ানদের জন্য অমূল্য। তবে মেইনলি, অনুবাদ পড়ে ইউরোপ এগিয়ে যায়নি; তারা এগিয়ে গিয়েছে মুসলিমদের মৌলিক কাজ পড়ে। আরও ভালোভাবে বুঝতে চাইলে ১২শ শতকের আর ১৭শ শতকের ইউরোপিয়ান বিজ্ঞান-দর্শনের সাথে গ্রিক বিজ্ঞান-দর্শন মেলালে দেখবি—কিছুই মেলে না। কিন্তু সেই সময়ের সাথে মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান-দর্শন ও ওয়েস্টের বিজ্ঞান-দর্শন মেলালে দেখবি, বহুত মিল। জন ও'কনর এবং অ্যাডমন্ড রবার্টসন হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন—১৬শ ও ১৮শ শতকে ইউরোপে ডেভেলপ করা গণিতের সাথে মুসলিমদের ডেভেলপ করা গণিতের প্রচুর মিল। মুসলিমরা আগেই রেনেসাঁস পিরিয়ডের ম্যাথ করে বসে আছে। অন্যদিকে গ্রিক ম্যাথম্যাটিক্সের সাথে মিল কম।'
আমি বললাম—'তাইলে কনক্লুশন হচ্ছে, গ্রিকদের কাজ মুসলিমরা সংরক্ষণ করে; এটা ভিত্তিহীন। গ্রিকদের কাজ ইউরোপিয়ানরা ব্যবহার করে শিখরে ওঠে—এটা ফাঁকা কথা। বাস্তবতা হচ্ছে—মুসলিমদের মৌলিক কাজ মূলত ইউরোপের উন্নয়নের কারণ!'
'Exactly। যাক, বোঝাতে পেরেছি।'
'গুড পয়েন্ট। ব্যাপারটা মজার। নতুন ইসলামি বিশ্বের পাশেই ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, যারা এত ভালো প্রতিবেশী ছিল না। তাহলে গ্রিকদের ওপর ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য, গ্রিকদের বিজ্ঞান তাদের চেয়ে আরও ভালো জানার জন্য উত্তম পদ্ধতি আর কী হতে পারে? আর যদি অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটা একটা কারণ হয়—পাশের সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানদের জ্ঞানমূলক দিক থেকে হারানোর জন্য অনুবাদ করা হচ্ছিল, তবে এখানে আরেকটি মজার দিক আছে, আর তা হলো—ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্ট বা অনুবাদ আন্দোলন কিন্তু অনেকাংশে খ্রিষ্টানদের ওপরই নির্ভরশীল ছিল!
যেহেতু এখানে চলেই এসেছি, আরেকটা বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। বইগুলোর প্রথম দিককার অনুবাদকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন খ্রিষ্টান। কারণ মুসলিমরা প্রথম প্রথম গ্রিক পারত না। এই ছুতোয় অনেকে মুসলিমদের কোনো ক্রেডিটই দিতে চায় না। অথচ খলিফা মামুনের বাইতুল হিকমার অনুবাদকদের প্রধান ছিলেন ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি; একজন মুসলিম। তা ছাড়া প্রফেসর জন এফ হিলিও সম্পূর্ণ ক্রেডিট মুসলিমদের দিচ্ছেন। আমার প্রশ্ন হলো—যে কাজটি মুসলিমরা করতে পারল, সে খ্রিষ্টানরা আগে করল না কেন? যখন মুসলিমরা এই সেক্টরে বিশাল ফান্ডিং করল, তখনই কেন তারা অনুবাদে আগ্রহী হয়ে উঠল? মূল উদ্যোগ ছিল মুসলিমদের; খ্রিষ্টানরা শুধু শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে।'
আমি বলে উঠলাম—'হা হা! তাহলে তো ইহুদি-খ্রিষ্টানরা পয়সার লোভে মুসলিমদের কামলা খেটেছে!'
সিনান বলল—'আমি এমনটা বলতে চাইছি না। কারণ, অমুসলিমদের মধ্যেও অনেক সেরা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তবে হুনাইন ইবনে ইসহাক, সাবিত ইবনে কুররাদের মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের প্রতিভা ইসলামের মানুষরাই খুঁজে বের করেন। মুসলিমদের সুপারভিশন আর অভিভাবকত্ব ছাড়া কখনো অমুসলিমরা এই জটিল-কঠিন কাজ করতে পারত না।'
'আচ্ছা, এই মুভমেন্টের আগেই তো মুসলিমরা বিজ্ঞান নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিল, না?' বলল তারিক।
'হুম, তুইও তাইলে তথ্যার্জন চালিয়েছিস!' মুচকি হাসি দিলো সিনান—' এসব বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন ইয়াকুব বিন তারিক, হাল্লাজ ইবনে মাতার, মাশাআল্লাহ আল ফারিসি এবং অন্যরা। মুসলিমরা শুধু অমুসলিমদের সাহায্য নিয়েছে এবং এর বিনিময়ে সম্মান ও ধন দিয়েছে।'
শ্বাস নিয়ে—'ওই সময় প্রত্যেক প্রভাবশালী মানুষ অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন; বাদশাহ, ধনী লোক, সকলে। এই ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্ট বিভিন্ন জাতির জ্ঞানের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে। এরই ফলে অসংখ্য নতুন আইডিয়া বের হয়ে আসে। এসব অনুবাদের কোয়ালিটি এত্ত চমৎকার ছিল, গ্রিক কপি থাকা সত্ত্বেও ইউরোপিয়ানরা গ্রিকটি ব্যবহার না করে অ্যারাবিক থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ করছিল—সেটা এক অনুবাদের ঢেউ ছিল। বিশাল ঢেউ; অনুবাদের এক সুনামি!'
আমরা দুজন হাঁ করা অবস্থায় হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ালাম।
পানি খেয়ে নিয়ে সিনান জিজ্ঞেস করল— 'কুরআনে হামানের যে হিস্টোরিক্যাল মিরাকল বলা হয়, সেটার কথা তোরা শুনেছিস?'
'হ্যাঁ।' আমি বললাম।
'ভালো। মিশরীয় হায়ারোগ্লিফগুলো কোন সময়ে পুনর্জীবিত করা হয়, বল তো দেখি!'
'১৯ শতক।'
'হুম, ওটা ভুল।'
'কিন্তু সবাই তো ওটাই লেখে! বাংলাদেশি, টার্কিশ, আমেরিকান, ইংলিশ সকল রাইটার।'
তারিক বলল—'তুই ব্যাটা এখন রিভিশনিস্টদের মতো ডিকন্সট্রাকশন চালাচ্ছিস।'
তারিকের কথা শুনে হেসে দিয়ে সিনান আমার কথার জবাব দিলো—'তো কী হয়েছে? সকলের মূল রেফারেন্স অবশেষে একই জায়গায় গিয়ে আটকায়। সেটা অবশ্য ইউরোপে ইজিপ্টলজির জন্মের জন্য ঠিক। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ইজিপ্টলজির জন্ম হয়েছে এর অনেক আগে, মুসলিম বিশ্বে।'
সিনান দাঁড়িয়ে বলতে লাগল— 'বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মুসলিমরা কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আদিকালের জাতিগুলো নিয়ে গবেষণা করতে উজ্জীবিত হয়। এখন অনেক মুসলিম মনে করে, ইসলামের আগের সময় নিয়ে জ্ঞান অর্জন অনুচিত। কারণ, সে সময়টি হলো জাহেলিয়াত। এই চিন্তাধারাটি পুরাই ভুল। কারণ, জাহেলিয়াত কোনো নির্দিষ্ট সময়কাল না; বরং সঠিক বৈশিষ্ট্য থাকলে যেকোনো সময় কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা জায়গার জন্য ব্যবহার করা যায়।
অনেক মুসলিম মনে করতেন—ইজিপসিয়ান অর্থাৎ মিশরীয় হায়ারোগ্লিফগুলোর রহস্য ভাঙতে পারলে বিজ্ঞানের অনেকগুলো দরজা খুলে যাবে। বিখ্যাত সুফি জুননুন মিশরি মিশরের আখমিম নামক জায়গার একটি ধর্ম মন্দিরে থাকতেন। তিনি মন্দিরের দেয়াল লেখা সেই ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফের ভাষার বুঝ রাখতেন। আর এ থেকেই তিনি "ইলমুল আহওয়াল ওয়াল-মাকামাত" নামে একটি নতুন সুফি ধারার উদ্ভব ঘটান। মিশরে বিভিন্ন মসজিদে অর্থাৎ মুসলিম স্থাপত্যে হায়ারোগ্লিফের ব্যবহার দেখা যায়।
বিশেষ করে অ্যালকেমিস্টরা ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফে ছিলেন বেশি আগ্রহী। তাই ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতেন জুননুন মিশরি, ইবনে ওয়াহশিয়া, আবুল কাসিম ইরাকির মতো কেমিস্টরা। মুসলিম কেমিস্ট, আবুল কাসিম আল ইরাকি তার বইয়ে বিভিন্ন অ্যালকেমিকাল সিম্বল ব্যবহার করেছিলেন, যা ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ থেকে অনুপ্রাণিত। আর ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ নিয়ে প্রথম মুসলিম—যিনি বই লিখেছিলেন, তিনি হলেন জাবির ইবনে হাইয়ান। মূলত তিনি একাধিক প্রাচীন ভাষার বিশ্বকোষ লিখেছিলেন। ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ কীভাবে পড়তে হয়, তা নিয়ে বই লিখেছিলেন আইয়ুব ইবনে মাসলামাহ। ইবনে ওয়াহশিয়াও এ নিয়ে বই লিখেন। আবুল কাসিম আল ইরাকি আর ইবনে ওয়াহশিয়ার বেঁচে যাওয়া বইগুলো থেকে দেখা গিয়েছে, তাদের বুঝ সঠিক।
ইউরোপে কপ্টিক গ্রামার নিয়ে প্রথম লিখেছিলেন A. Kircher। এর জন্য তিনি ৪০টি অ্যারাবিক বইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন—যেগুলো মিশর থেকে আনা হয়েছিল। ন্যাপলিওন বোনাপার্টের মাধ্যমে প্রথম রসেটা স্টোন আবিষ্কৃত হয়। চম্পোলিয়ন ছিলেন আরবিতে খুবই দক্ষ। তিনি এই রসেটা স্টোন ব্যবহার করেছিলেন। মিশরীয় হায়ারোগ্লিফের রহস্য ইউরোপে ভেদ করেছিলেন চম্পোলিয়ন এবং তা তিনি করেছেন অ্যারাবিক বইগুলোর ওপর ভিত্তি করেই।
তার সময়ে অন্যান্য দক্ষ স্কলাররাও চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। পার্থক্য হচ্ছে—চম্পোলিয়ন আরবিতে দক্ষ ছিলেন, অন্যরা ছিলেন না। ঊনবিংশ শতকে ইউরোপিয়ানরা মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ ডিসাইফার করতে সক্ষম হন, অর্থ বের করতে পারেন। কিন্তু মুসলিমরা এই পথে অনেক আগেই হেঁটে গিয়েছিলেন। এবার বোঝ, ইজিপ্টলজির জন্ম কোথায় আর কখন হয়েছিল। মুসলিম অনুবাদকগণ এতই ভয়ংকর প্রতিভাধর ছিলেন, তারা অজানা ভাষা পর্যন্ত অনুবাদ করে ফেলেছিলেন!’
‘সেই সেই! জোশ, অস্থির এসব!’ দুঃখে ভরা তারিক হঠাৎ লাফিয়ে উঠল।
চলে যাওয়ার সময় হলো। চরম কিছু জিনিস জেনে বের হলাম তারিক আর আমি। কাল আবার স্কুলে দেখা হবে।
ঘরে যখন যাচ্ছি, তখন চিন্তা করলাম, আমরা তিনজন তিন রকমের মানুষ, কীভাবে বন্ধুত্ব হলো! অবশ্য সঠিক মস্তিষ্ক থাকলে বোঝা যায়, এটা আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব।
টিকাঃ
১. Philip K. Hitti, p: 412
২. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison, 'The Sciences in Islamic Societies (750 - 1800)' in Robert Irwin (edt), The New Cambridge History of Islam (Cambridge University Press, 2010) vol. 4, p: 565
৩. বাইজান্টিয়াম, ইন্ডিয়া। ইউরোপ ছিল অবশ্য, কিন্তু ইউরোপ থেকে নেওয়ার মতো কিছু ছিল না। মূলত ইউরোপের অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, মুসলিম সেনাপতিগণ তা জয়ের কোনো ইচ্ছাও পোষণ করতেন না। John M. Hobson, The Eastern Origins of Western Civilisation. (Cambridge: Cambridge University Press. 2004), p: 100.
৪. Ehsan Masood, p: 54
৫. A. I. Sabra, Optics, Astronomy and Logic: Studies in Arabic Science and Philosophy. p: 226, in Muzaffar Iqbal, Science and Islam op. cit.
৬. M. Shamsher Ali op. cit. p: 235
৭. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit. p: 569
৮. Ehsan Masood, p: 46-47
৯. Phillip K. Hitti, p: 311
১০. Muzaffar Iqbal, p: 16
১১. Ehsan Masood, p: 48
১২. Ehsan Masood, p: 46
১৩. 'Founded in Translation: From Greek to Syriac to Arabic' Peter Adamson, Philosophy in the Islamic World: A History of Philosophy Without any Gaps (Oxford University Press, 2016)
১৪. David C. Lindberg, The Beginnings of Western Science op. cit
১৫. Robert Wisnovsky, Avicenna's Metaphysics in Context (Cornell University Press, 2018)
১৬. S. E. al-Djazairi. 'Suppressing the Muslim Role' in The Hidden Debt op. cit.
১৭. Ehsan Masood p: 49
১৮. John F. Healey. 'The Syriac-speaking Christians and the Translation of Greek Science into Arabic' Muslim Heritage.
১৯. George Saliba, A History of Arabic Astronomy p: 16, in Muzaffar Iqbal op. cit.
২০. না জানলে দেখুন/পড়ুন, Nouman Ali Khan, 'Historical Miracle of Qur'an' online video, FreeQuran Education; Caner Taslaman, The Qur'an: The Unchallengeable Miracle (Nettleberry Publications, 2006) p: 214; মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার, 'মুসা আঃ-এর সময়ে ফেরাউনের সহচর হামান: কুরআনের ঐতিহাসিক বর্ণনায় কি ভুল আছে?' shottokothon.com (সত্যকথন: ১২৫)
২১. আদ, সামুদ ইত্যাদি জাতির ইতিহাস থেকে
২২. Okasha el Daly. 'Deciphering Egyptian Hieroglyphs in Muslim Heritage' Muslim Heritage; Sayyed Abul Hasan 'Ali Nadwi op. cit
২৩. বিস্তারিত জানতে পড়ুন—Okasha el Daly, Egyptology: The Missing Millennium (Routledge, 2016)। তা ছাড়াও জিম আল খালিলির ডক্যুমেন্টারি Islam and Science-এর প্রথম পর্বটি দেখতে পারেন। সেখানেও 'উকাশা আল ডালি-এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
📄 সফল উড়ন্ত পাখিমানব
প্রথম পিরিয়ড শেষ। টিচারের কোনো খবর নেই। আজ নাকি কোনো এক বছরের এসএসসি ব্যাচের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। প্রথম পিরিয়ডে শুধু হাজিরা নিয়ে ম্যাডাম চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন চুপচাপ থাকতে, যেন টু শব্দটিও না করি। এবারের পুনর্মিলনে নাকি অনেক খরচা করা হয়েছে। শোনা যায়, এই ব্যাচের ভাই-বোনেরা ছিল আমাদের স্কুলের ইতিহাসে সবচেয়ে সার্থক ব্যাচ। একাধিক পপুলার সিঙ্গার, ডান্সার আনা হয়েছে। তার মধ্যে মিনার নামক একজন নাকি আমাদের স্কুল সংলগ্ন কলেজের শিক্ষার্থী। আর এসব জেনেছি রনি থেকে, ভালোই অপ্রয়োজনীয় তথ্য রাখে ছেলেটি।
ভালোই হয়েছে! আজ আব্বাস ইবনে ফিরনাসকে নিয়ে কথা হবে।
ক্লাসের পেছনের দিকের কোনায় বিপথগামী পোলাপানদের আড্ডা। আমাদের মুসলিম গ্যাং সামনের দিকের কোনায়। আজ জমবে, ইনশাআল্লাহ।
সিনান শুরু করল— 'মুয়াজ্জিন যেখানে আজান দেয়, সেখানে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তখন তো আবার উঁচু মিনার থেকে আজান দিত। এই দাঁড়িয়ে থাকা লোকের উদ্দেশ্য যে আজান দেওয়া না—তা অবশ্য বোঝাই যাচ্ছে। নিচে সবাই চিল্লাচ্ছে—"তাড়াতাড়ি মরে গিয়ে তোর পাগলামি শেষ কর!” “আরে লাফা!” অবশ্য, বুড়ো একটা লোককে এভাবে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে জীবন নিয়ে হতাশ, আত্মহত্যার চেষ্টাকারী মনে করাটা ভুল না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবার এক অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে—কী হতে যাচ্ছে এই ডানপিটে বুড়োর। তিনি...'
'আব্বাস ইবনে ফিরনাস!' চিল্লিয়ে উঠলাম আমি।
'না, তিনি Armen Firman.'
'এটা কে আবার?'
'বলছি, আগে কাহিনি শেষ করতে দে। এবার আরমান ফিরমান লাফ দিয়ে শেষের দিকে একটু ভয় পেয়েছিলেন যদিও, কিন্তু একজন স্টান্টম্যানের কলঙ্ক। পিছু হটা সাজে না। আস্তে আস্তে তিনি নিচে পড়ে গেলেন। উড়তে পারলেও সাহস তো দেখিয়েছেন। বাজির টাকাটা পেয়ে যাবেন।'
'বাজি?'
'হ্যাঁ, তিনি বিজ্ঞানের জন্য কিছু করেননি। তবে দর্শকদের ভেতর থেকে একজোড়া চোখ তাকে দেখছিল। ৪৭ বছর বয়সি এক ইঞ্জিনিয়ার, রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিদ, আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তাকে স্পেনে আনা হয়েছিল মূলত গান শেখানোর জন্য। প্রথম প্রথম সে গ্লাস বানাত। অসাধারণ সব গ্লাস। কৃত্রিম ক্রিস্টাল তৈরি পদ্ধতি তারই আবিষ্কার। এভাবেই বানিয়েছিলেন চোখ ধাঁধানো একটি বিজ্ঞানমঞ্চ, অবশেষে চিন্তা করলেন অ্যারোনটিক্সে ঢোকার।'
'আর... আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আবিষ্কারগুলো নিয়ে কিছু বলবি না?'
'বলছি, আগে কাহিনিটা তো শেষ করতে দে! গভীর দৃষ্টিতে পাখিদের উড়ান পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি। কয়েকবার মরুভূমিতে চেষ্টা চালালেন। অবশেষে ৭০ বছর বয়সে সিদ্ধান্ত নিলেন, একটি পাবলিক শো হওয়া দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ।'
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' এই বলে সিনান পারলে নিজেই লাফ দিয়ে দেয়! আমরা ধরাধরি করে থামানোর পর আবার বলতে শুরু করল— 'নিজ চোখে সবাই ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখল। ১০ মিনিট ধরে আকাশে উড়লেন তিনি। চিন্তা করতে পারিস? যদি ওখানে থাকতাম তখন! পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম প্যারাশুট ফ্লাইট। জান্নাতে যদি যেতে পারি রে ভাই, টাইম-ট্রাভেল করে ওই সময় চলে যাব!'
'চরম কাহিনি রে, চরম!'
'তো এই কাহিনিটি, সম্ভবত মিথ্যা।'
'কি!'
'না, পুরোটা না, শুধু আরমান ফিরমানের অংশটুকু। হতে পারে এটি আব্বাস ইবনে ফিরনাসের ভুল ল্যাটিনাইজড নাম। ঐতিহাসিক বর্ণনায় অবশ্য আরমান ফিরমান নামে বাস্তবে কেউ নেই। মানে, গল্প সুন্দর করতে হলে একটু রংটং মারতে হয়, বুঝেছিস? বাকিটুকু সত্য। খুব সম্ভবত ল্যাটিনে রূপান্তরের সময় দুই অনুবাদকের ভুল রূপান্তরের জন্য দুই উড়ন্ত মুসলিমের মিথ সৃষ্টি হয়। এখন, ইউরোপিয়ানদের মধ্যে রজার বেকন সর্বপ্রথম Ornithopter-এর বর্ণনা দেন।'
'এটা আবার কোন জাতের হেলিকপ্টার?' রনি বলল।
'আরে ব্যাটা, এর অর্থ উড়ন্ত যন্ত্র। মজার ব্যাপার কি, জানিস? রজার বেকন কর্ডোভায় পড়ালেখা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ Pierre Mandonnet বলেন— “রজার বেকনের সমস্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবুদ্ধি মুসলিমদের থেকে নেওয়া।” হতে পারে, আব্বাস ইবনে ফিরনাসের উড়ন্ত যন্ত্রের বর্ণনা পড়েই তিনি নিজ ভাষায় তা উল্লেখ করেন। আর এখান থেকেই লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি তার বর্ণনা দেন।
মুসলিমদের উড়ার যাত্রা কিন্তু এখানে শেষ হয়নি। লাগারি হাসান চেলেবি, অটোমান। রকেট যাত্রাকারী প্রথম মানুষ। সপ্তদশ শতাব্দীর ঘটনা। এটার ফুয়েল হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ৩০০ পাউন্ড গানপাউডার। পরে রাজপ্রাসাদের সামনে অবতরণ করেন নিরাপদে। হাজারফান আহমাদ চেলেবি, আরেকজন অটোমান। লাগারির মাত্র পাঁচ বছর পরে তিনি নিজেও একবার উড়াল দেন। সফলতার জন্য তাকে ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হয়। এটা অবশ্য রকেট ফ্লাইট ছিল না। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের অনেক অনেক আগে নিশ্চয়ই অনেকে উড়ার চেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন। তবে মূল সফলতার ধারা শুরু হয় আব্বাস ইবনে ফিরনাস থেকেই। মাঝখানে অনেকে এই চেষ্টা চালান। শেষমেশ শতভাগ সফল হন রাইট ব্রাদার্স।'
'মারভেলের স্ট্যানলি সাহেবকে তো আব্বাস ইবনে ফিরনাসের কথা জানানো দরকার ছিল রে, কিন্তু তার আগেই তিনি নিজেই ওপারেতে উড়াল দিলেন।'
সিনান মুচকি হাসল। তারিক অবশ্য রসকষহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আগের দিন কিছুটা উৎফুল্ল হলেও আজ আবার কেমন মরে গিয়েছে।
সিনান বলতে থাকল—'এখন আব্বাস ইবনে ফিরনাসের অন্যান্য কাজের দিকে তাকাই। মূলত তার জীবনের সফলতা গ্লাস নিয়ে। তিনি পাথর থেকে গ্লাস বানানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তার খাবার পানির গ্লাসগুলো ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ; কবি আল বুহতুরি বলেছেন—"রংহীন গ্লাসগুলো দেখলে নাকি মনে হয় কোনো কন্টেইনার ছাড়া পানি এমনি দাঁড়িয়ে আছে!" বাই দ্যা ওয়ে, এই বুহতরির থেকেই কিন্তু মুতানাব্বি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।'
'বিশাল ব্যাপার তো!'
'তা আর বলতে? তিনি ক্রিস্টাল বানানোর কৃত্রিম পদ্ধতির উন্নতি করেন। যার কারণেই স্পেনে গ্লাসশিল্প শুরু হয়। তিনি ক্রিস্টাল কাটার পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। পরে ১৫ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলিমদের প্রতি হিংসার কারণে খ্রিষ্টানরা তার ক্রিস্টাল নিয়ে লেখা মূল বই মুকতাবিস ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে বানানো বিভিন্ন ক্রিস্টালের নজির পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রাচীন চার্চে। নিজস্ব প্রতিভার মধ্যে রয়েছে—তিনি যেকোনো জটিল ধরনের লেখার পাঠোদ্ধার করতে পারতেন। এমন গ্লাস বানিয়েছিলেন, যেটা দিয়ে ম্যাগ্নিফাইং-এর কাজ করা যেত। একধরনের ঘড়িও বানিয়েছিলেন। আবার বর্তমান সময়ের চশমার মতো লেন্সও বানিয়েছিলেন, চোখের সমস্যায় ব্যবহার করা যায়—এমন। কিও বোরিং লাগছে?'
তারিক বলল—'নাহ! বোরিং হব কেন?'
'এতক্ষণ তো নীরস আবিষ্কারের কথা বললাম। এবার অন্য কিছু শোন। তিনি নবম শতাব্দীতে একটি প্ল্যানেটরিয়াম তৈরি করেছিলেন। সেখানে দর্শনার্থীরা বিশাল বিশাল কৃত্রিম যন্ত্রপাতি দিয়ে গ্রহের নাড়াচাড়া দেখত। এখন তো বেশি মনে হয় না। ওই আমলে কিন্তু এটা রীতিমতো বিস্ময়! আর লুকোনো কিছু যন্ত্রপাতি দিয়ে নানা ধরনের চমৎকার শব্দ সৃষ্টি করা হতো। কৃত্রিম বিদ্যুতের চমক, আওয়াজ, দমকা বাতাসের শব্দ, মেঘ ইত্যাদিও ছিল। এমন অনুভূতি যে নবম শতকে স্পেসশিপে একজন; বহির্বিশ্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিচ্ছে।'
'ওয়াও সিনান! আব্বাস ইবনে ফিরনাস তো নবম শতাব্দীতে পুরো শো মাতিয়ে রেখেছিলেন!'
'হুম, টোটালি।'
টিকাঃ
১. Michael H. Morgan op. cit.
২. Michael H. Morgan, p: 154-157.
৩. Salah Zaimeche. 'The Impact of Islamic Science and Learning on England’ Muslim Heritage.
৪. Salim al-Hassani, p: 298-300
৫. Salim al-Hassani p: 145
৬. Phillip K. Hitti p: 598
৭. Ehsan Masood p: 72; Michael H. Morgan p: 156; Salim al-Hassani p: 39
৮. M. Shamsher Ali op. cit. p: 161.
৯. Salim al-Hassani p: 39
১০. Michael H. Morgan p: 154-157
১১. Ehsan Masood p: 72
১২. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী, ইসলামি বিশ্বকোষ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দ্বিতীয় সংস্করণ, জুন ২০০৪) vol. 2, p: 390.
১৩. Ehsan Masood, p: 71-73
১৪. Michael H. Morgan p: 156
📄 বানু মুসা—থ্রিলিং থ্রি
তারিক আজ কোচিং সেন্টারে আসেনি। গণিত খাতা দেওয়া হবে বলেই আসেনি বোঝা যাচ্ছে।
ক্লাস শেষ। সিনান আর আমি তারিকের বাসার দিকে যাচ্ছি। রাস্তায় রনির দেখা হলো। তাকে বললাম—'রনি! কংগ্র্যাটস। তুই গণিতে তারিকের চেয়ে দুই নম্বর বেশি পেয়েছিস।'
'কী বলিস! পরীক্ষা এত বাজে হয়েছিল, মনে তো করেছিলাম ফেল করব। তারপরও তারিকের চেয়েও দুই নাম্বার বেশি পেয়ে গেলাম! তা কটা পেয়েছি আমি?'
'দুই।'
সিনান আর আমি হাসিতে ফেটে পড়লাম।
তারিকের বাসার দিকে যাচ্ছি আর তার সাথে পরিচিত হওয়ার প্রথম দিনের কথা মনে পড়ছে। সময়টা ছিল নবম শ্রেণির প্রথম দিকে। উচ্চতর গণিতের কিছুই পারতাম না। আর নাউজুবিল্লাহ... স্যরি, নজিবুল্লাহ স্যার বাড়ির কাজ দিয়েছিলেন। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। সিনান পর্যন্ত দেখি ভয়ে লাফাচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, সে বাড়ির কাজ করেছে, কিন্তু খাতা হারিয়ে ফেলেছে। পেছনের দিকে গিয়ে দেখলাম, তারিক সিনানের হারানো খাতা দেখে দেখে বাড়ির কাজ করছে। সিনানকে না বলে আমিও বসে গেলাম তারিকের সাথে। ও বারবার 'θ'-এর মতো একটি চিহ্ন দিচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম—'এটা কী?'
ও বলল—'থিটা।'
'মানে?'
'আরে, এই যে একটা চ্যাপটা গোল এঁকে তার পেট কেটে দিলে থিটা হয়ে যায়!'
তারিকের বাসার সামনে চলে এলাম। নক করলাম। আন্টি দরজা খুললেন।
'আসসালামু আলাইকুম, আন্টি!'
'ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছ তোমরা?'
'আলহামদুলিল্লাহ! আপনি ভালো আছেন?'
'এই তো ভালো। ভেতরে এসো, তারিক ওর রুমেই আছে।'
তারিক ল্যাপটপের সামনে বসে আছে। আমাদের দেখে রুমের বাইরে গেল।
সিনান আর আমি বসে আছি। তারিক এতক্ষণ কী করছিল ল্যাপটপে—তা দেখার ইচ্ছা হলো।
'সিনান, তারিক মুসলিম বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে পড়ে উলটিয়ে ফেলছে!'
'কী বলিস!'
'হ্যাঁ, এই দেখ। কয়েকটা পিডিএফ খোলা। নোট নিয়ে পড়ছে দেখি... এই ব্যাটা এটা দেখে যা! চরম নোট নিয়েছে তো!'
'পড়ে শোনা।'
'ইতিহাসবিদ এসপি স্কট দ্বারা বর্ণিত—“অষ্টম শতকে ইউরোপের একজন সাধারণ মানুষের বাসস্থান: বসবাসের অনুপযোগী একটি কুঁড়েঘরে—যা পাথর ও অকর্তিত কাঠ দিয়ে নির্মিত, শুষ্ক খরকুটো দ্বারা ছাওয়া, দূর্বা দ্বারা তৈরি মেঝে, সাথে মাথার ওপর (ছাদে) সর্বদা একটা গর্তের সুবিধা—যা দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে যায়। তাদের (ইউরোপিয়ানদের) দেয়াল ও ছাদ কালি ও গ্রিজ দিয়ে সর্বদা মাখানো থাকত।” স্কট সাহেব আরও বলেন—“জংলিদের থেকে এদের শুধু একটুখানি পার্থক্য ছিল।”
মরিস লম্বার্ড বলেন—“ইসলাম পশ্চিমকে তার জংলিমার্কা কালোরাত্রি হতে টেনে বের করে আনে।”'
ধাক্কা খেয়ে খাটে গিয়ে বসলাম। তারিক এত ইনফরমেটিভ রিসোর্স পায় কোত্থেকে! সিনানের মুখে কেবল মুচকি হাসি দেখা গেল।
কিছুক্ষণ পর তারিক এলো শরবত নিয়ে। মনে করেছিলাম তারিক আসার সঙ্গে সঙ্গে সিনান তাকে পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু সে কিছুই বলল না। আমি তার দিকে তাকালাম। দেখলাম, সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমিও সেদিকে তাকালাম। দেয়ালে দুটি কার্ডবোর্ড লাগানো। লেখা—'বনু মুসা ব্রাদার্স'। তির চিহ্ন দিয়ে নিচে লেখা—মুহাম্মাদ, আহমাদ ও আল হাসান। আমি কিছু বলার আগেই সিনান জিজ্ঞেস করল— 'এরা কারা, তারিক?'
'ও! আমি আমার রুমটা নতুন করে সাজাচ্ছি।'
'হুম, আগে এই জায়গাটায় বড়ো করে রোনালদোর একটি ছবি টাঙানো ছিল।'
'এরা কারা, সেটা বল।'
'Trium fratum!'
'অ্যাঁ?'
'বনু মুসার ল্যাটিন নাম।'
'এরা কী করেছিল?'
'এরা যা করেছিল أخي....'
'আখি মানে?' আমি প্রশ্ন করলাম।
'ভাই, ব্রো। অন্যান্য ভাষায় পারি না!'
সিনান উত্তেজিত—'আরে, তুই বনু মুসার কাহিনি বল।'
'হ্যাঁ হ্যাঁ। জাফর মুহাম্মাদ ইবনে মুসা জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি, ইঞ্জিনিয়ারিং; আহমাদ ইবনে মুসা ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেকানিক্স; আল হাসান ইবনে মুসা ইঞ্জিনিয়ারিং আর জ্যামিতি।'
'কী অদ্ভুত! মানুষের নামের ভেতর জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি...'
'আরে উনারা যেসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, সেগুলো বললাম।'
'তুই কি একটু ক্লিয়ারলি বুঝিয়ে বলতে পারিস না?'
'স্যরি। আমি তো কোনো সময় কাউকে জ্ঞান দিই না... মানে... কোনো সময় কাউকে কিছু শেখানোর সুযোগ তো হয় না, এজন্য আমি বুঝিয়ে বলতে পারি না।'
'আচ্ছা হ্যাঁ। বল।'
'মুসা ইবনে শাকির একজন দস্যু ছিলেন। কিন্তু নিজের যৌবনের কীর্তি পেছনে ফেলে হয়ে উঠেন একজন জ্যোতির্বিদ। তিনি খলিফা হারুনুর রশিদের কাছের বন্ধু হয়ে ওঠেন। তিনটি ছোটো ছোটো ছেলে রেখে কম বয়সে মারা গেলেন তিনি। হারুনুর রশিদের ছেলে আল মামুন তাদের দেখাশোনা করার ওয়াদা করেন। তারা বড়ো হতে থাকল। খলিফা আল মামুন তাদের বাইতুল হিকমায় মুক্তভাবে বিচরণ করার সুযোগ দিলেন। তারা এই সুযোগটি ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে সেরা সেরা বিজ্ঞানের আলিম হয়ে উঠল। জ্ঞানের প্রতি ছিল অদম্য টান। অনুবাদকদের বিভিন্ন বই অনুবাদ করার জন্য প্রতিমাসে ২৪০০০ ইউরো করে দিতেন।'
'ওই সময় ইউরো এলো কোথা থেকে?'
'৫০০ দিনার দিতেন। বর্তমান সময়ের হিসাবে এটা ২৪০০০ ইউরো।'
'টাকায় কত রে?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।
'হিসাব করতে পারিস না?'
সিনান মূল আলোচনায় ফিরে আসতে বলল। তারিক শুরু করল— 'বনু মুসা মুসলিম বিজ্ঞানীদের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তিনজন। তারা ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের অধীনে হুনাইন ইবনে ইসহাক ও সাবিত ইবনে কুররা বাইতুল হিকমায় নিজেদের অনুবাদকাজ চালান। আসলে সাবিত ইবনে কুররা তার পুরো ক্যারিয়ারের জন্যই বনু মুসার কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, বনু মুসাই এই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর ট্যালেন্ট প্রথম বুঝতে পারেন এবং তাকে বাইতুল হিকমায় নিয়ে আসেন। বিজ্ঞানের কাজ চালাতে অনেক টাকার প্রয়োজন। বিজ্ঞানীদের ফান্ডিং করা পৃষ্ঠপোষকদের একজন এই বনু মুসা।'
'একজন মানে তিনজন?'
'ওই আরকি, বুঝে নে।'
তারিক শরবতে চুমুক দিলো। তারপর আবার বলা শুরু করল— ‘বনু মুসা অনেক ধরনের মেকানিক্যাল যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। তাদের বই কিতাব আল হিয়াল-এ এ রকম ১০০টিরও বেশি যন্ত্রের গঠন বর্ণনা পাওয়া যায়। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে মেকানিক্সের শুরু’।
‘বইয়ের নামটার অর্থ কী?’ আমার জিজ্ঞাসা।
‘The Book of Ingenious Devices.’
‘ওহ আচ্ছা।’
‘তো শোন, তাদের বইয়েই ইতিহাসের প্রথম মেকানিক্যাল লজিক আর কন্ট্রোল সিস্টেম দেখা যায়। বর্তমানের মতো লজিক গেইট তো আর ছিল না। তাই এসবেরই অত্যন্ত সিম্পলিফাইড ফর্ম বলা চলে। ১১০০ বছর পুরোনো হলে কী হবে? যন্ত্রগুলো কিন্তু অসাধারণ। কিছু কিছু যন্ত্র বর্তমান সময়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদেরও টাশকি খাইয়ে দিতে পারে। তাদের বানানো যন্ত্রগুলো ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রোগ্রামেবল মেশিন। বিদ্যুতের জায়গায় তারা ব্যবহার করেছিলেন উচ্চচাপে থাকা পানি আর বায়ু। বর্তমান সময়ের অটোমেটেড যন্ত্রপাতি আর বনু মুসার তৈরি যন্ত্রপাতির মধ্যে মূল পার্থক্য এটাই।’
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম— ‘তারা কী যন্ত্র বানিয়েছিলেন, তা কি একটু বলবি?’
‘ও স্যরি! আমি বেশি ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে ফেলছি। আচ্ছা, একটা হলো ড্রিংকিং বুল রোবট। পানি খাওয়া শেষ হলে তৃপ্তির এক আওয়াজ করত! খুবই মজার একটা খেলা। এটা মানুষদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যস্ত রাখতে পারে। প্রক্রিয়াটা বিশাল, তাই বললাম না। আরেকটা হলো—মেকানিক্যাল টি গার্ল। জিনিসটা আসলেই চা পরিবেশন করত! আরও আছে অটোমেটিক্যালি আকার পালটানো পানির ঝরনা, অটোমেটিক্যালি পানি ঢালা যান্ত্রিক জগ, নিজে নিজেই বাজে এমন বাঁশি। আরেকটা কী যেন, আরেকটা কী যেন... ওহ! ফ্লাস্ক উইথ টু স্পাউটস আরেকটা মজার খেলা। প্রতি স্পাউটে আলাদা রঙের তরল দেওয়া হতো। কিন্তু ঢালা হলে ভুল স্পাউট থেকে ভুল রঙের তরল বেরিয়ে আসত!’
'ওহ চরম!' সিনান বলল।
আমি ইম্প্রেস না হয়ে বললাম— 'খেলনা আবিষ্কার আবার এমন কী?'
'উঁহু! এসব আবিষ্কার খেলনার মতো হলেও এতে যে পরিমাণ মাথা খাটাতে হয়েছে আর যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, তার প্রশংসা না করে পারবি না। এদের তুচ্ছজ্ঞান করা বোকামি। এসব মেকানিক্যাল মেশিন টেকনোলজি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় দারুণ ভূমিকা রেখেছে। আমার কথা না; ডোনাল্ড হিল বলেছেন। শিল্প বিপ্লবেও এগুলোর বিশাল ভূমিকা আছে। আধুনিক মেকানিক্সের মূলনীতি আর বনু মুসার ব্যবহৃত মূলনীতি একই। আর মূলত তাদের মেকানিক্স থেকে উন্নত কিছু এই সেদিন মাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, বেশিদিন আগে না।'
তারিক আবার শরবতে চুমুক দিতে গেল— 'কি রে, গলায় কিছু পড়ছে না কেন?' দেখতে পেল গ্লাস খালি! বিব্রতভাব চেপে আবার বলতে শুরু করল—
'তো, বনু মুসা যদি কারখানায় ব্যবহার উপযোগী যন্ত্র বানিয়েও থাকে, তবুও তা কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে। তবে তারা শুধু যন্ত্র নিয়ে কাজ করেছেন—এমনটা না...'
'আরে ভাই, তা আগে বলেছিস তো। কী করেছেন, সেটা বল।' সিনান বাধা দিলো।
'ভাই না: অাখি!'
সিনান হেসে দিলো, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ।'
'জ্যোতির্বিদ্যায় কাজ আছে তাদের। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব যে সব সময় এক না—এ কথা ইতিহাসে তারাই প্রথম বলেছিলেন।'
'এক না!' আমি অবাক হলাম।
'আরে পল্টু! পৃথিবী তো কক্ষপথে ঘুরছে, দূরত্ব সব সময় এক কীভাবে হবে?'
'ও হ্যাঁ, তাই তো!'
'অনুসূর ও অপসূরও তারাই প্রথম মেপেছেন। ক্রান্তিবৃত্তের তীর্যকতা সম্বন্ধেও প্রথম নির্ভুল ধারণা দেন তারা; তবে এটা কী জিনিস জানি না। Precession of Equinoxes-এর ধারণা সর্বপ্রথম তারাই দেন।'
'আরও আছে। পৃথিবীতে দুদিন, দুই রাত সমান; এ দুদিন কোন দুদিন—তা বনু মুসা বের করেন। Regulus নামে একটা তারা আছে। বনু মুসা এটা পর্যবেক্ষণ করেন। পৃথিবীতে যে ১ বছর হয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টায়—এটাও তাদের হিসাব। আরও আছে বহুত। এখন মনে নেই।'
সিনান এই সময় বলল—'একটি ব্যাপার খেয়াল করেছিস? মুসলিমদের অবদান সবচেয়ে বেশি হলো জ্যোতির্বিদ্যায়। যদিও অন্যান্য সব বিষয়েই মুসলিমদের অবদান আছে, তবে এক্ষেত্রে তা তুলনামূলক বেশি। ওই সময় তো জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। তারপরও মুসলিম বিজ্ঞানীরা কীভাবে এত সূক্ষ্ম হিসাব অবিশ্বাস্য সঠিকতার সাথে করেছেন—তা সত্যি ভাবিয়ে তোলে!'
তারিক আমার হাত থেকে শরবতের গ্লাস কেড়ে নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল—'এবার গণিত হবে। তাদের পরিমিতির বইয়ে তারা ১৮টা সমস্যা ও তার সমাধানের কথা উল্লেখ করেছেন। বৃত্তের পরিধি, তিন বাহু ব্যবহার করে বৃত্তের ক্ষেত্রফল, কোণ ত্রিখণ্ডিত করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন বনু মুসা। বাহুর পরিমাপ দিয়ে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করার সূত্রও তাদের আবিষ্কার। দুটি কেন্দ্রের সাথে লাইন টেনে উপবৃত্ত অঙ্কন প্রণালিও তারা উদ্ভাবন করেন।'
'এরা তিনজন তো টেরিফায়িং ট্রায়ো!' আমি বললাম— 'তবে আমার একটা প্রশ্ন ছিল। তাদের সব সময় বনু মুসা ইবনে শাকির এভাবে একসাথে কেন ধরা হয়?'
তারিক উত্তর দিলো— 'তাদের আলাদা আলাদা ধরা খুবই কঠিন। তিন ভাই যা করেছেন, সব একসঙ্গে করেছেন। বইগুলোও তিনজনে একসঙ্গেই লিখেছেন। তাই তাদের তিনজনকে একসঙ্গেই ধরা হয়।'
সিনান তারিকের প্রশংসা করল— 'তুই কিছু পারিস না কে বলেছে, তারিক?'
'তোরাই তো বলিস!'
সিনান বলল—'আরে আমরা... আমরা তো মজা করি... যাহোক, আমি বলতে চাচ্ছিলাম, তোর মধ্যে একটি অসাধারণ গুণ আছে। কম সময়ে একটি জিনিস পড়েই তা মনে রাখা এবং বুঝে নেওয়া।'
মাগরিবের আজান শোনা গেল। সিনান বলল—'চল, মসজিদে যাই।'
তারিক বলল—'তোরা যা, আমার ঘুমোতে হবে। সালাত যেন কাজা না হয়, সেজন্যই অনেক কষ্টে এতক্ষণ জেগে ছিলাম। সালাত আদায় করে ঘুমাব।'
'বুঝলাম না।'
'সেই ফজরের সময় উঠেছিলাম, রাত ২ টায় ঘুমিয়ে।'
'তুই ফজর থেকে পড়ছিস? এত কী পড়িস!'
'হে হে! কয়দিন পরেই দেখবি। যা এখন, নাহলে জামাত মিস হয়ে যাবে।'
যাওয়ার সময় দেখলাম, তারিকের আয়নায় লেখা—'If you want to make the world a better place, just take a look at yourself and make that change!'
তারিক নিজের পেছনের জীবন ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে, সেজন্যই এতদিন সে মনমরা ছিল, বুঝতে পারছি। আমরা বের হলাম। হঠাৎ সিনান মনে করালো— 'আরে! আমরা তো তারিককে ওর ম্যাথ খাতা দিতেই ভুলে গেছি!'
'ও হ্যাঁ!'
টিকাঃ
১. S. P. Scott, History of the Moorish Empire in Europe (Philadelphia: The Lippincot Company, 1904) vol. 1, p: 339. cited in S. E. al-Djazairi op. cit.
২. www.archipress.org/batin/ts20lombard.htm
৩. Ehsan Masood p:44
৪. Ehsan Masood p:48
৫. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit. vol: 4, p: 573
৬. Salim al-Hassani op. cit. p: 52
৭. পড়তে চাইলে— 'The Mechanics of Banu Musa in the Light of Modern System and Control Engineering' Muslim Heritage.
৮. জন স্কট নামের বিশ্বসেরা একজন ইঞ্জিনিয়ার এটি পুনরুৎপাদন করেছেন দেখুন: Science in a Golden Age-এর মেকানিক্স অংশ।
৯. এটি না দেখলে বুঝবেন না: '[Trailer] Banu Musa and the Science of Tricks' online video, 1001 Inventions.
১০. যন্ত্রের বর্ণনা Salim al-Hassani op. cit. p: 52-53 I Ehsan Masood p: 162-163 হতে
১১. 'Trick Devices' in 'Home' in Salim al-Hassani op. cit.
১২. M. Shamsher Ali op. cit. p: 30.
১৩. অনুসূর : জানুয়ারি ১ থেকে ৩, সূর্য পৃথিবীর নিকটতম। অপসূর : ১ থেকে ৩ জুলাই, সূর্য পৃথিবীর দূরতম।
১৪. M. Shamsher Ali op. cit. p: 30
১৫. J. J. O'Connor and E. F. Robertson. 'Banu Musa brothers' School of Mathematics and Statistics, University of St Andrews Scotland: http://www.history.mcs.standrews.ac.uk/Biographies/ BanuMusa.html
১৬. Muzaffar Iqbal, Science and Islam op. cit.
১৭. M. Shamsher Ali op. cit. p: 65, 101.
১৮. Thomas Hockey (edt), The Biographical Encyclopedia of Astronomers (Springer, 2005) p: 93.
১৯. একটা গানের লিরিক
📄 বন্দি বিজ্ঞানী
লুঙ্গির মধ্যে শার্ট ইন করিয়া বাহির হইলাম। গ্রীষ্মের কালে এত কুয়াশা কোথা হইতে আসিয়াছে, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। কিছুক্ষণ পর বুঝিলাম, কুয়াশা নহে; বরং ইহা তো কালো ধোঁয়া!
অক্স্রসর হইতে থাকিলাম। পরিচিত পথ কেন যেন অচেনা লাগিতেছে। সম্মুখে দেখিতে পাইলাম একটি উদ্যান। কিন্তু এইখানে উদ্যান কোথা হইতে আসিল, তাহা মাথায় খেলিল না। দুই দিন আগেও তো এইখানে বিরাট অট্টালিকা ছিল!
উদ্যানে কেহ নাই, তবে একজন সুদর্শন বুড়োকে দেখিতে পাইলাম। তাহাকে দেখিয়া কৌতূহলের সৃষ্টি হইল। কাছে গিয়া দাঁড়াইলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিবার পর জিজ্ঞাসা করিলাম, কোনো সাহায্য করিতে পারি কি না। তিনি আমার দিকে চক্ষু নিক্ষেপ করিলেন, কয়েক মুহূর্ত পর সরাইয়া লইলেন।
দাঁড়াইয়া রহিয়াছি, মিনিট পাঁচেক হইবে। কোনো সাড়া-শব্দ নাই। আমি তাঁর পার্শ্বে গিয়া বসিলাম। অনেকক্ষণ ধরিয়া বসিয়া রহিলাম, কিন্তু তিনি কোনো গুরুত্বই দিলেন না!
অবশেষে আমার দিকে চাহিয়া কহিলেন—'তোমার ধৈর্য দেখিয়া আমি প্রসন্ন হইয়াছি। তুমি নিশ্চয়ই কিছু জ্ঞান পাইবার উদ্দেশ্যে এত সময় ধরিয়া অপেক্ষা করিতেছ, তাহা নয় কি?'
তাঁহার এমন বাণী শুনিব—তাহা আশা করি নাই। তবুও ভাব করিবার উদ্দেশ্য লইয়া হ্যাঁ বোধক মস্তক নাড়াইলাম।
তিনি বলিলেন—'আমি একজন আলোকবিজ্ঞানী।'
হুম। তাঁহার চক্ষুর দীপ্তি দেখিয়া মন তাহা বিশ্বাস করিতে চাহিল। কিন্তু দ্বিধা দিয়া ভাবিয়া বুঝিলাম, বুড়োর তার ছিঁড়িয়া গিয়াছে।
বুড়ো বিশাল এক কাহিনি আরম্ভ করিল— 'সর্বোচ্চ সম্মাননা লইয়া আমি আমার সিভিল সার্ভিসের পড়ালেখা খতম করি। কয়েক দিনের অভ্যন্তরেই আমাকে বসরার চিফ মিনিস্টার বানানো হইল। ইহা ছিল এমন এক চাকুরি, যাহা সকলেই খুঁজিয়া বেড়াইত।'
ও বদ্দা! চাটগাঁ তুন হডে বসরাৎ গিয়ে গুই। জাইগা ইভা হডে!
'কয়েক দিন কাটিল, তারপর বিজ্ঞানের জন্য আমি আমার উঁচুমানের পদ ছাড়িয়া দিলাম।'
কী গণ্ডমূর্খ এই বুড়ো!
'বিজ্ঞান নিয়া কাজ করিতে থাকিলাম। ক্রমেই আমি চারিদিকে খ্যাত হইয়া উঠিলাম। আরও কয়েক দিন পর সমগ্র পৃথিবীতেই এক পরিচিত নাম হইয়া গেলাম।'
কী অবুঝ আমি!
'আমার কথা অবশেষে এক পাগলার কানে গিয়া পৌঁছিল। কায়রোর ইসমাইলি ফাতিমি খলিফা; আল হাকিম। সে অবশ্য আব্বাসি খিলাফতের বেশিরভাগের ওপরই শাসন চালাইত। সে চাহিত, যেন সকল শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ তাহার শহরে আসে। সে আরও চাহিত পুরো বিশ্ব জয় করিতে এবং কায়রোকে তাহার শ্রেষ্ঠ শহর বানাইতে।
এসব অবশ্যই ভালো, কিন্তু এই আল হাকিমের মাথায় সমস্যা ছিল। সে ইতিহাসে "পাগলা খলিফা” বলিয়া খ্যাত। ইহুদি আর খ্রিষ্টানদের অনেক সমস্যা হয় এই পাগলার জন্য। সে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের অনেক উপাসনালয় ধ্বংস করে। তালিকায় জেরুজালেমের পবিত্র সেপালকার (Holy Sepulchre in Jerusalem) রহিয়াছে, যাহার ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে—এইখানে যীশুখ্রিষ্টকে শূলে চড়ানো হইয়াছিল, আর এইখানেই তিনি পুনর্জীবিত হইবেন। উমর চার্চ রক্ষার ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের আশ্বাস দিয়াছিলেন, কিন্তু আল হাকিম তাহা উড়াইয়া দিলো। খ্রিষ্টান আর ইহুদিরাই তাহার একমাত্র শিকার ছিল না অবশ্য; মুসলিমরাও তাহার অত্যাচার হইতে বাঁচিয়া থাকেন নাই। সুন্নিদের ওপর সে নানা রকম নিষেধাজ্ঞা ও বাধ্যবাধকতা প্রদান করে।
খ্রিষ্টান ও সুন্নিদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। শুধু শুধু তাহার মতো পাগলাদের কারণে ইসলামের নাম খারাপ হয়।
শুধু মানুষ নয়; পশুরাও তাহার অত্যাচার হইতে বাঁচিয়া যাইতে পারে নাই। তাহার প্রাসাদের চারপাশের সকল কুকুর মারিয়া ফেলা হইয়াছিল। কারণ, তাহাদের চিৎকার আল হাকিমের নিকট বিরক্তিকর ঠেকিত।'
হায়, হায় বলে কি!
'সে দাবা খেলা নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছিল। কেননা, সে তাহাতে ভালো ছিল না।'
কী অদ্ভুত...
'অবশেষে একদিন সে একাকী মরুভূমিতে বাহির হইয়া গেল এবং অদ্ভুত হইলেও সত্য, সে আর ফিরিল না।'
আহা আহা...
'তবে এতসবের মধ্যে এইটা ঠিক, বিজ্ঞানের ব্যাপারে তাহার উৎসাহ খলিফা আল মামুন হইতে কোনো অংশে কম ছিল না। তিনি মিশরে দারুল হিকমা স্থাপন করিয়াছিলেন, যেইখান হইতে অনেক বড়ো বড়ো বিজ্ঞানী আবির্ভূত হইয়াছিল। উদাহরণস্বরূপ, জগদ্বিখ্যাত সাইয়িদ ইবনে সিনা সেইখানে কাজ করিয়াছিলেন। শত বছর পূর্বে যখন মানুষ জ্ঞান অর্জনের জন্য বাগদাদে যাইত, তাহার পরিবর্তে মানুষ মিশরে যাইতেছিল।'
জ্ঞানী বুড়ো ক্ষণিকের জন্য মৌন হইলেন। দীর্ঘশ্বাস নিয়া আবার শুরু করিলেন—'এই সময় আমি নীলনদের ওপর দিয়া এক বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করিলাম। খলিফা আল হাকিম তাহা জানিতে পারিয়া তৎক্ষণাৎ আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করিলেন। তোমার প্রশ্ন জাগিতে পারে, নীলনদের ওপর দিয়া বাঁধ কেন, যেখানে বন্যা হওয়া কৃষি জমির উর্বরতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ? এর কারণ হইল, বন্যা সব সময় অতিরিক্ত হইত এবং তাহা মারাত্মক ক্ষতিসাধন করিয়া থাকিত। যাহোক, খলিফার ডাকে সাড়া প্রদান করিলাম। নীলনদ পর্যন্ত ভ্রমণও অনেক আনন্দদায়ক ছিল। কিন্তু যখন আমি নদীর পাড়ে গিয়া পৌঁছাইলাম, আমি বুঝিতে পারিলাম—নদীর প্রস্থ অতিরিক্ত এবং আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নহে। এখন আমার ব্যর্থতার কথাটি গিয়া খলিফাকে জানাইতে হইবে। কিন্তু আমি তাহা করিতে সাহস করিলাম না।
বরং আমি আল হাকিম হইতে বেশি পাগলামি শুরু করিলাম। এতে তিনি মনে করিলেন, আমি সত্যি পাগল হইয়া গিয়াছি এবং আমাকে তিনি গৃহবন্দি বানাইয়া দিলেন।
আমার পরিকল্পনায় আমি ব্যর্থ, কিন্তু আল্লাহ কোনো সময় তাঁহার পরিকল্পনা ব্যর্থ করেন না। একরাত্রে অন্ধকার কামরায় বসিয়া ছিলাম। হঠাৎ করিয়া খেয়াল করিলাম, চাঁদের আলোর সঙ্গে একটি বস্তুর উলটো প্রতিবিম্ব আসিয়া পড়িয়াছে দেয়ালে। আর ইহা আমার জীবন পালটাইয়া দিলো। আলহামদুলিল্লাহ! এই ঘটনাটির কারণেই আলোকবিদ্যার প্রতি আমার আগ্রহ সৃষ্টি হইল। পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আলোকবিজ্ঞানীদের একজন বলিয়া আমাকে স্বীকৃত করা হয়। আল্লাহ আমাকে অমর বানাইয়া দেন, আমার মৃত্যুর ১০০০ বছর পরেও আজও বিশ্বের মানুষ আমাকে স্মরণে রাখিয়াছে। আল্লাহ যাহা করেন, ভালোর জন্যই করেন।'
আমার চেতনা ফিরে এলো। তারিকের মতো বেশি করে পড়ার চেষ্টা করছিলাম রাত জেগে, কিন্তু প্রতিদিনই পড়া অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ছি! উঠে গিয়ে অজু করলাম, আবার ফিরে এসে পড়তে বসে গেলাম ব্র্যাডলি স্টেফেন্সের উপন্যাস The Prisoner of al-Hakim। হঠাৎ মনে হলো—আমার লুঙ্গি পরা, অট্টালিকার জায়গায় পার্ক দেখা আর সুদর্শন বুড়োর সাথে কথোপকথন সবই অবাস্তব ছিল...
বইটি পড়ার সময় ধাক্কা খেলাম। কেন যেন ইবনুল হাইসামের জীবনের একাংশ আর বুড়োর গল্প ১: ১-এ মিলে যাচ্ছে!
টিকাঃ
নোট: হাকিমের পাগলামি বা ইবনুল হাইসামের বন্দি হওয়ার ঘটনার তেমন হিস্টোরিক্যাল ভ্যালিডিটি নেই। সাধারণভাবে যে-ই কোনো বইয়ে এসব উল্লেখ করে, সে পরবর্তী সময়ে এই কথাটা লিখে দেয়। এটা বলতে গেলে নিউটনের আপেল, আর্কিমিডিস ও ইউরেকা, গ্যালিলিও ও পিসার টাওয়ার, জেমস ওয়াট ও কেটলির ঘটনাগুলোর মতো বিজ্ঞানীদের নিয়ে বানানো রূপকথার মধ্যে পড়ে। এখানেও গল্পের জন্য ট্র্যাডিশনাল ন্যারেটিভটা রেখে দেওয়া হয়েছে। বিস্তারিত জানতে দেখুন: Dr. Khalil Andani, Fatimid Imam-Caliph al-Hakim: Debunking the "Mad Caliph" narrative, online video, YouTube।