📄 কেমিস্ট্রির বাপ
তারিকের পাশে আমরা দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ ধরে। সে-ও আমাদের দিকে না তাকিয়ে পড়েই যাচ্ছে। ওর হাতের বইটির নাম দেখতে পাচ্ছি এখন 1001 Inventions। নিচের সাব টাইটেলটা পড়তে পারছি না। তারিককে ডাক দিতে চাইছিলাম, কিন্তু সিনান নিষেধ করল। তার মতে, গভীর মনোযোগ সহকারে কেউ কিছু পড়তে থাকলে তাকে ডিস্টার্ব করা উচিত না।
হঠাৎ তারিক মুরগিওয়ালার মতো চিল্লিয়ে উঠল— 'কেমিস্ট্রির বাপ!'
আমরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম— 'মানে?'
তারিক বলল— 'রবার্ট বয়েল, জন ডাল্টনের নাম তো শুনেছিস। কিন্তু কেমিস্ট্রির জনক জাবির ইবনে হাইয়ানকে চিনিস? একাধারে কেমিস্ট, অ্যালকেমিস্ট, অ্যাস্ট্রনমার, অ্যাস্ট্রলজার, ইঞ্জিনিয়ার, জিওগ্রাফার, ফিলোসফার, ফার্মাসিস্ট, ফিজিসিস্ট আর ফিজিশিয়ান। একেবারে একের ভেতরে ১০!'
সিনান অবাক না হয়ে উত্তর দিলো— 'থাক। তোকে বলতে হবে না। জাবির ইবনে হাইয়ান ভালোই বিখ্যাত। বিভিন্ন জায়গায় তার নাম দেখা যায়। Paulo Coelho তার ইন্টারন্যাশনাল বেস্টসেলার The Alchemist-এ জাবির ইবনে হাইয়ানের ল্যাটিনাইজড রূপ গেবার ব্যবহার করা হয়েছে।' আমার দিকে তাকিয়ে বলল— 'তুইও তো মনে হয় চিনিস, না?'
'হ্যাঁ চিনি। "১০০ বিজ্ঞানীর জীবনী" টাইপের বইগুলোতে তার নাম থাকে।'
অ্যালকেমি সর্বপ্রথম এক্সপেরিমেন্টাল সায়েন্স; প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে তা নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে চায়। টেকনোলজি ব্যবহার করে পৃথিবী পাল্টানোর প্রথম পদক্ষেপ এটা।
এভাবে অনেকে চেয়েছিল বিভিন্ন ধাতু মিশিয়ে সোনা উৎপন্ন করতে। কেননা, স্বর্ণ ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে খাঁটি পদার্থ। জাবির ইবনে হাইয়ানের স্বর্ণ উৎপাদন পদ্ধতি, তার কথা অনুযায়ী—The idea of balance-এর ওপর ভিত্তি করা। অর্থাৎ উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতার ভারসাম্য। অ্যালকেমিতে এই ভারসাম্যের অর্থ হলো—ধাতুর ভেতরের বৈশিষ্ট্যগুলো সঠিক অনুপাতে ভাগ করা।
প্রত্যেক ধাতুর দুটি অভ্যন্তরীণ আর দুটি বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন—স্বর্ণের বাইরে ঠান্ডা আর শুকনো, কিন্তু ভেতরে উষ্ণ ও আর্দ্র। আবার রুপারের ক্ষেত্রে ঠিক উলটো। প্রত্যেক বৈশিষ্ট্যের ৪টি ডিগ্রি এবং ৭টি উপভাগ আছে। সোজা কথায় ২৮টি অংশ আরকি। জাবির ইবনে হাইয়ানের মতে—প্রত্যেক ধাতুর ভিত্তি “১৭” এই নম্বরটা। ১ : ৩ : ৫: ৮ এই অনুপাতে। ধাতুর বৈশিষ্ট্যগুলো হয় ১ : ৩ আর ৫: ৮ অনুপাতে বিভক্ত থাকে অথবা ঠিক এর উলটোভাবে।
এই অনুপাত ঠিকভাবে দেওয়া গেলে এক ধাতুকে আরেক ধাতুতে রূপান্তর করা যাবে। এখানে জাবির ইবনে হাইয়ান একটি ম্যাজিক স্কয়ার ব্যবহার করতেন; মিং ট্যাং। এই নিয়মে প্রাচীন চায়নার শহরগুলো বিভক্ত থাকত। এটি ১৭ ও ২৮ নম্বর দেয় এবং এখানে ১ : ৩: ৫: ৮ অনুপাতটিও পাওয়া যায়। মুসলিমরা অবশ্য বিভিন্ন ম্যাজিক স্কয়ার নিয়ে সব সময় উৎসাহী ছিল।
তবে, Elixir of life এবং Philosophers stone ছাড়া কিছুই হবে না! আচ্ছা, এখন তোদের আমি এমন একটা কথা বলব—যা শুনে সত্যি অবাক হবি।'
আমি অবশ্য অলরেডি অবাক। তারিক তো পাগল হয়ে গিয়েছে! পৌরাণিক কতগুলো জিনিস বাস্তব ভেবে বসে আছে।
'অন্যান্য অ্যালকেমিস্টদের মতো জাবির ইবনে হাইয়ানের মূল উদ্দেশ্য সোনা থেকে সোনা আনা ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল Artificial creation of life। আরবি শব্দটা হলো—তাক...তাকভি...' ভ্রু কুঁচকে বইয়ের একটা পাতার দিকে তাকিয়ে রইল তারিক।
'তাকউইন।' বলে দিলেন লাইব্রেরিয়ান।
'হ্যাঁ, ওটাই।' তারিকের জবাব— 'তার বইয়ের মধ্যে তিনি কীভাবে সাপ, বিচ্ছু বানাতে হয়—সে বর্ণনা দেন!'
আমাদের অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তারিক জিজ্ঞেস করল— 'তোদের মনে হচ্ছে আমি উলটা-পালটা কিছু খেয়ে এসেছি, তাই না?'
সিনান বলল—'আমরা সেটা বলতে পারব না। কারণ, তুই আমাদের সামনেই ছিলি, কিন্তু বাইরে গিয়ে কাউকে বললে ঠিকই উত্তর দেবে—"তো? আর কী মনে করব?"'
লাইব্রেরিয়ান তারিককে বললেন—'কিশোর বন্ধু! তুমি উত্তেজিত অবস্থায় আছ তো তাই ঠিকমতো বলতে পারছ না। কিছুক্ষণ বসো, চিন্তা করো; তারপর গুছিয়ে বলো। তাহলে সুন্দর করে বলতে পারবে। আর হ্যাঁ, অ্যালকেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ানের কথা না বলে কেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ানের কথা বলো।'
তারিক গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল—'পাঁচ মিনিট সময় দে।'
তারিক বসে বসে চিন্তা করছে। মাঝে মাঝে বইটি উলটে-পাল্টে দেখছে। অপেক্ষার ১১ মিনিট পেরিয়ে গেল।
অবশেষে তারিক দাঁড়াল। সিনান বলল—'কী? হয়েছে?'
আমি বললাম—'সোজাসুজি বলে দে, ইংরেজি কিচ্ছু বুঝতে পারছিস না!'
তারিক ভ্রুক্ষেপ না করে মুখে একটু হাসির রেশ টেনে বলতে শুরু করল— 'দোস্ত শোন। জাবির ইবনে হাইয়ান একটি স্কেল বানিয়েছিলেন, যা দিয়ে ১ কিলোগ্রামের ৬৪৮০ গুণ ছোটো পদার্থের ভর মাপা যেত। জিনিসটা জন ডালটনও বানিয়েছিলেন, জাবির ইবনে হাইয়ান শুধু তার ১০০০ বছর আগে কাজটা করেছিলেন আরকি।'
'ও রে বাবা! বলে কি!' আমরা দুজন চিল্লিয়ে উঠলাম।
তারিককে খুশি খুশি দেখাল। সে শান্তভাবেই বলল—'আমরা কেমিস্ট্রি বইয়ে যেসব পড়ি, তার অনেক কিছুর জনক জাবির ইবনে হাইয়ান। সালফিউরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড তিনিই আবিষ্কার করেছেন। বিশ্বাস করিস আর না করিস, এই তিনটির আবিষ্কার বা উদ্ঘাটন সিসা হতে স্বর্ণ আনার থেকে অতুলনীয়ভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।'
আমি বললাম—'ও রে ভাই! আস্তে, তুই কী বলিস! এসবের আবিষ্কারক জাবির ইবনে হাইয়ান? তিনটারই তো সেই মহা গুরুত্ব। H₂SO₄ ব্যবহার আর উৎপাদনকে কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। HNO₃..'
সিনান বাধা দিয়ে বলল—'তোর বলতে হবে না, সবাই জানে।'
তারিক বলল—'এসব এসিড ভারী ধাতুকে দ্রবীভূত করে ফেলতে পারে। কিন্তু এগুলো প্রশমিত করে এমন ক্ষারও জাবির ইবনে হাইয়ান আবিষ্কার করেছিলেন। মূলত ক্ষারের যে ইংরেজি শব্দ Alkali, সেটি এসেছে আরবি আল কালি থেকে—সোজা কথায়, জাবির ইবনে হাইয়ানের থেকে। HNO₃ আর HCl মিশিয়ে জাবির ইবনে হাইয়ান একধরনের তরল আবিষ্কার করেছিলেন। এটা সোনা আর প্লাটিনামকে পর্যন্ত দ্রবীভূত করে ফেলতে পারত। এটাকেই এখন আমরা Aqua Regia বা অম্লরাজ নামে চিনি।'
'হুম। এটাই সেই একমাত্র তরল—যা স্বর্ণকে দ্রবীভূত করতে পারে।' বলল সিনান।
তারিক বলে চলল—'ফিজিক্যাল পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে দেখলে প্রশমন বিক্রিয়ার অম্ল-ক্ষারক তত্ত্ব মূলত আসে জাবির ইবনে হাইয়ানের বিখ্যাত Sulfur-Mercury তত্ত্ব থেকে।'
'প্লিজ, আর না!' বলে আমি দৌড়ে পালাতে গেলাম।
তারিক উঠে এসে আমাকে ধাক্কা মেরে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল—'ঊর্ধ্বপাতন, তরলীকরণ, বিশোধন, ভস্মীকরণ, গলন, বিজারণ, সংযুক্তিকরণ, জারণ, কেলাসন, পাতন, বাষ্পীকরণ, পরিস্রাবণ—সবকিছুর পথিকৃৎ জাবির। আল কুহল পাতন করার জন্য...'
'আঙ্কুহল্লাতন?' সিনানের জিজ্ঞাসা।
'আল কুহল।' গলা উঁচিয়ে বলল তারিক। 'অ্যালকোহল যে আরবি শব্দ থেকে এসেছে, এটা পাতন করার জন্য জাবির ইবনে হাইয়ান খুবই সাধারণ একটি আবিষ্কার করেছিলেন। তার মৃত্যুর ১২০০ বছর পর আজ পর্যন্ত যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয়। নাম Alembic বা আলিম্বিক—যা আরবি আল ইনবিক থেকে এসেছে।'
'কিন্তু মদ খাওয়া তো হারাম।' আমি বললাম।
তারিক জবাব দিলো—'তোরে খাইতে কইছে কে? এটা মদ বানানোর কাজে ব্যবহৃত হতো না। তার অ্যালকোহল পাতনের পদ্ধতিটি বিভিন্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির অ্যালকোহল পাতনের মূল প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে। সুগন্ধি, কালি, ঔষধ ইত্যাদি তৈরিতে এটা কাজে লাগে। ইথানল মানে—C₂H₅OH...'
'হইছে... সংকেত মেরে এত জ্ঞান দেখাতে হবে না...' হেসে বললাম।
'ধুর... প্রথম উৎপাদনেও জাবির ইবনে হাইয়ানের অবদান রয়েছে। তবে অবশ্য আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে জাকারিয়া আর-রাজি নামে আরেকজন এটি উৎপাদন করেন। এটি সেই জিনিস—যা জাবির ইবনে হাইয়ানের মৃত্যুর ১২০০ বছর পর বর্তমান সময়ে এসে আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার সমস্যার সমাধান দিয়েছে।'
'শোন, তাকে আর বাপ ডেকে হচ্ছে না! এখন থেকে দাদা ডাকতে হবে।'
এদিকে তারিকের কোনো থামাথামি নেই— 'আমাদের পদার্থ বইয়ে পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবক্তা হওয়ার কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে রজার বেকনকে। তিনি কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীদের দ্বারা প্রভাবিত। পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রথম দিয়েছিলেন আল হাইসাম। কিন্তু তারও ২০০ বছর আগে জাবির ইবনে হাইয়ান বলেছেন... দাঁড়া...' বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগল তারিক।
'এই তো, পেয়ে গেছি—"কেমিস্ট্রিতে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে, তোমাকে প্র্যাকটিক্যাল কাজ করতে হবে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে। কারণ, যে প্র্যাকটিক্যাল কাজ করে না এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় না, সে কখনো ন্যূনতম দক্ষতাও অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু তুমি, হে আমার ছেলে! পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাও, যেন জ্ঞান অর্জন করতে পারো। ধাতুর সান্নিধ্যে বিজ্ঞানীগণ আনন্দিত হন না; তাদের আনন্দ তো শুধু তাদের পরীক্ষা-পদ্ধতির নিয়ম-নীতিগুলোর সার্থকতার ওপর।"'
লাইব্রেরিয়ান বললেন—'এমপিরিসিজমের এর থেকে ভালো কোনো প্রকাশ আমার জানা নেই।'
'Elixir of Life একটি আজব গাছের প্রাপ্ত আজব পাউডার। এটি অস্তিত্ব সম্ভবত নেই। তবে Elixir শব্দটি এসেছে আরবি আল ইকসির থেকে। জাবির ইবনে হাইয়ানের ব্যবহৃত শব্দ। জাবির ইবনে হাইয়ান অনেক এসিড ও ক্ষারক আবিষ্কার করেছেন—সিন্নাবার, ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড, কস্টিক সোডা, পটাশিয়াম কার্বনেট, সোডিয়াম কার্বনেট এই-সেই, হ্যান-ত্যান।' কিছুক্ষণ থেমে থেকে ঠোঁটে মুচকি হাসি রেখে তারিক আবার বলল— 'তোদের এখন নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে—আমি কড়া শরবত খেয়ে এসেছি, তাই না?'
সিনান বলল—'হুম, লেবু খানিকটা বেশি চাপা হয়েছিল মনে হয়।'
তারিক হেসে দিয়ে বলল—'তো, আমার কথাগুলো হতে আজ তোরা কী শিখলি?'
সিনান বেশ ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে বলল—'আজ আমরা শিখলাম, তারিক ইংলিশও পড়তে পারে!' সিনানের কথায় আমরা হেসে উঠলাম।
'তোরা তো মেইন পয়েন্টটাই মিস করে গেলি।'
আমি চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বললাম— 'মেইন পয়েন্ট কী আর, জাবির ইবনে হাইয়ান অস্থির বিজ্ঞানী ছিলেন, এই তো?'
'না, মেইন পয়েন্ট হলো—কেমিস্ট্রির বাপ নিয়ে যখন আলোচনা উঠে, তখন "বাপ রে বাপ!" বলে চিল্লিয়ে উঠতেই হয়!'
টিকাঃ
১. George Sarton, Introduction to History of Science (Baltimore: Williams & Wilkins, 1927), vol. 1, p: 17.
২. Breeanna Elliott. 'Who built great Zimbabwe and why?' online video, TED ed.
৩. Seyyed Hossain Nasr, Science and Civilization in Islam (ABC International Group, Inc. 2001), p: 261. S. Nomanul Haq. 'Occult Sciences and Medicine' in Robert Irwin (edt), The New Cambridge History of Islam (Cambridge University Press, 2010), 654.
৪. Science and Civilization in Islam. p: 262: Matthew Mel Koushki. 'Powers of One: The Mathematicalization of the Occult Sciences in the High Persianate Tradition' Intellectual History of the Islamicate World. 5 (2017), 127-199.
৫. Ehsan Masood, Science and Islam - A History. p: 156: Michael Hamilton Morgan, Lost History : The Enduring Legacy of Muslim Scientists, Thinkers and Artists. p: 162
৬. পড়ুন, 'সেটা জিবারিশ।'
৭. Salim al-Hassani and Mohammed Abattouy, 'The Advent of Scientific Chemistry' Muslim Heritage; Salim al-Hassani. 'From Alchemy to Chemistry' Muslim Heritage : Ehsan Masood p: 158; Michael H. Morgan p: 164
৮. Ehsan Masood. p: 158; Michael H. Morgan. p: 164: Phillip K. Hitti, History of the Arabs. (MacMillan Education Ltd. Tenth Edition, 1970) p: 381
৯. রসায়ন, (৯ম-১০ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ২০১৭)
১০. Jim al-Khalili, Pathfinders: The Golden Age of Arabic Science (Allen Lane, 2010)
১১. অম্ল + ক্ষারক = লবণ + পানি
১২. S. H. Nasr, p: 266.
১৩. Salim al-Hassani and Mohammed Abattouy. 'The Advent of Scientific Chemistry' Muslim Heritage; P.K. Hitti p: 381
১৪. Michael H. Morgan. p: 164
১৫. Ehsan Masood. p: 158-159
১৬. পদার্থবিজ্ঞান (৯ম-১০ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ২০১৭) পৃ. ৩
১৭. 1001 Inventions: The Enduring Legacy of Muslim Civilization. p: 310
১৮. E. J. Holmyard, The Makers of Chemistry. p: 60. in S. E. al-Djazairi, The Hidden Debt to Islamic Civilization. (MSBN Books, 2018)
১৯. Michael H. Morgan, p: 163.
২০. Michael H. Morgan-এর অভিমত
২১. Salim al-Hassani op. cit. p: 91; Ehsan Masood : S.H. Nasr.
📄 বিদায় ঘণ্টা
তারিক জাবির ইবনে হাইয়ানকে নিয়ে বলা শেষে লাইব্রেরিয়ান যা বলেছিলেন—তাতে ফিরে গেলেন। 'বিংশ শতাব্দীতে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারক ও বিজ্ঞানীদের একটি সময়রেখা তৈরি করেন পিটার ফোর্ড আর অ্যান্টনি ফেল্ডম্যান। খুবই জনপ্রিয়।' লাইব্রেরিয়ান একটি বই বের করে তার একটি পৃষ্ঠা দেখালেন। সময়রেখা যাচ্ছে এভাবে : অ্যারিস্টটল (৩৮৩-৩২২ BC), আর্কিমিডিস (২৮৭-২১২ BC), জোহানেস গুটেনবার্গ (১৪০০-১৪৬৮ AD)।
'আসলেই কি? তোমাদেরও তা-ই মনে হয়?' লাইব্রেরিয়ান আমাদের জিজ্ঞেস করলেন।
আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিনি বলতে থাকলেন—'১৭০০ বছর ধরে যেন মানবজাতিই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল! ১৭০০ বছর ধরে একটিও আবিষ্কার না থাকা কতটুকু যৌক্তিক? আবার এই বিশাল সময়ের পর আবিষ্কারের ধারা হঠাৎ করে ফিরে এলো? Continuity বা ধারাবাহিকতা অনেক বড়ো একটি প্রশ্ন। বিজ্ঞানে কোনো কিছুই আকাশ থেকে পড়ে না। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার, এই বিকৃত ইতিহাসই বিশ্ববাসীর ধারণা। কারণ, এটি সারা পৃথিবীতে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। প্রচার বলতে একদম গুলিয়ে খাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড়ো স্কলারদের ছাড়া সকলেই এই বিকৃত, অযৌক্তিক, অর্থহীন ইতিহাসকে সমর্থন দিচ্ছে। সারা পৃথিবীতে বিজ্ঞানের পাঠ্যবইগুলোতে হয়তো একেবারেই মুসলিমদের কথা উল্লেখ থাকে না অথবা দেখানো হয়— মুসলিমদের বিজ্ঞান শুধুই গ্রিকদের থেকে কপি করা। ইউরোপিয়ানরা বৈশ্বিক প্রথম আবিষ্কার করেনি—এমন জিনিস তাদের নামে দিয়ে দেওয়া হয়। একটি উদাহরণ দিই। সাধারণভাবে প্যাসকেলের ত্রিভুজ নামে খ্যাত হলেও প্যাসকেল এটি আবিষ্কার করেননি। চায়নায় একে বলে "ইয়াং ওয়ে"-এর ত্রিভুজ। ইরানে খাইয়ামের ত্রিভুজ।
মুসলিম ইতিহাসবিদদের লেখা বইগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ, নিজেদের উৎসও হারিয়ে ফেলেছি। আর নন-মুসলিম স্কলাররা কয়েকজন বাদে বাকিরা বেশিরভাগ সব সময় সৎ থাকেননি।'
'মানে?'
'মোঙ্গলরা মুসলিম বিশ্বে আক্রমণ চালানোর সময় বাগদাদের বিশাল লাইব্রেরি ধ্বংস করে দেয়। যদিও অবশ্য পরবর্তী সময়ে নাসিরুদ্দিন তুসি ৪ লাখের মতো বই বাঁচাতে পেরেছিলেন। তবে ক্ষতিটা বিশাল বড়ো। জ্ঞানের যত কিছু ছিল, স্কুল, মসজিদ, লাইব্রেরি—সব তারা ধ্বংস করে। তারপর স্পেনের রয়াল লাইব্রেরি ধ্বংস হলো একবার। ক্রুসেডাররা ত্রিপলির লাইব্রেরি জ্বালিয়ে দিয়েছিলো বলা হয়ে থাকে, সেখানে ৩০ লাখ বই ছিল। এখন আমাদের কাছে বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে অল্প কিছু বই আছে। চাইনিজ বিজ্ঞানের ইতিহাসের কাজ একজনই বিপুল পরিমাণে করে দিয়ে গিয়েছেন—জোসেফ নিডহ্যাম। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে সহজেই ১৫ জনের মতো সেরা স্কলারদের নাম উল্লেখ করা যায়, যারা অত্যন্ত পরিশ্রম করে সেরা মানের কাজ করে দিয়েছেন। তবুও তারা মূলত কিছুই করতে পারেননি। এখনও লাখ লাখ ম্যানুস্ক্রিপ্ট অসম্পাদিত। এবার বোঝো, মুসলিম বিজ্ঞানের ইতিহাস কত বিস্তৃত!
জর্জ উইকেন্সের একটি কথা নিজের ভাষায় বলি তোমাদের। মিডলইস্ট থেকে পশ্চিমাদের নেওয়া ঋণ হলো—পুরো পশ্চিমা সভ্যতার মৌলিক কাঠামো। মিডলইস্ট থেকে ধার না নিলে পশ্চিমাদের অনেক বিষয়ই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। কৃষি, পশুপালন, নির্মাণ-স্থাপত্য, পয়ঃনিষ্কাশন, সেচ, রাস্তা তৈরি, চাকা, ইস্পাতের কাজ, সব ধরনের সাধারণ যন্ত্রপাতি, অস্ত্র, জাহাজ (Sailing Ships), জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomical observations), ক্যালেন্ডার, লেখা, তথ্য সংরক্ষণ, আইন-কানুন ও নাগরিক জীবন, মুদ্রার ব্যবহার, বিমূর্ত চিন্তা (Abstract thought), গণিত, পশ্চিমের সকল ধরনের ধর্মীয় আইডিয়া, প্রতীক... কোনটা বাদ আছে? মূলত এগুলোর মৌলিক আইডিয়াগুলো যে পশ্চিমে উদ্ভব হয়েছে, এর কোনো প্রমাণই নেই।'
আমার মাথায় প্রশ্ন ঘুরছিল—'তাহলে মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে করা বেশিরভাগ কাজ নন-মুসলিমরা করেছে?'
'হ্যাঁ, মূল কাজের প্রায় সবগুলো। এখনও মূলত নন-মুসলিম ইতিহাসবিদ বেশি। বিশেষ করে দুই সেডিলট, রেইনড, হ্যাসকিন্স, উইডমান, উয়োপচা, মিলাস ভালিক্রোসা, ডোনাল্ড হিল, ডেভিড কিং, লেকলার্ক, মায়ার্স, সুটার, কেনেডি, রিবেরা, সার্টন, মিয়েলিরা না থাকলে বিশাল একটা অংশের কিছুই থাকত না। আর এরা অনেকের মাঝে মাত্র কয়েকটা নাম।'
'মুসলিমরা কি বসে বসে মুড়ি খেয়েছে?' তারিক বলল।
'মুসলিমরা যখন ছেড়ে দিয়েছে, তখন শুধু জাগতিক বিজ্ঞান ছাড়েনি; ইতিহাসচর্চা এমনকী দ্বীনের অভ্যন্তরীণ কুরআন, হাদিস, ফিকহ, ধর্মতত্ত্বের গভীর স্টাডিও ছেড়ে দিয়েছে। যাহোক, মুসলিম বিজ্ঞানীদের অনেকের নাম সাধারণ মানুষদের জানা আছে। কিন্তু তারা কী করেছেন, কী অবদান রেখেছেন, সে ব্যাপারে প্রায় সকলেই অজ্ঞ। এমনকী শিক্ষিত মুসলিম পরিবারের মানুষরাও।
মুসলিমরা না থাকলে আধুনিক যুগপূর্বক প্রায় সব তথ্যই হারিয়ে যেত। মুসলিমরা টেক্সটগুলো অর্থাৎ আবিষ্কারসংক্রান্ত বই এবং সোর্সগুলো অনুবাদ করেছিল বলেই এসব আমরা পেয়েছি। ইবনে রুশদ না থাকলে অ্যারিস্টটলের কোনো কাজই বলতে গেলে আমরা পেতাম না। কিন্তু দেখবে, গ্রিকদের নিয়ে সারা পৃথিবীতে তুমুল উত্তেজনা; অথচ মুসলিমদের নিয়ে কোনো লাফালাফি নেই।
গ্রিকদের অনেকের ক্ষেত্রে বাস্তবে তারা ছিল কী ছিল না—সেটা জানাও যায় না। তাদের ইতিহাস খুবই ভাঙাচোরা। অনেক কিছুই স্পষ্টভাবে জানা যায় না। মুসলিম বিজ্ঞানীদের বেশিরভাগ জিনিসই স্পষ্ট, ইতিহাস সমৃদ্ধ। মেডিভাল ইউরোপের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল তারও ৩৫০০ বছর আগের ইন্ডাস ভ্যালির পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার চেয়ে খারাপ। কিন্তু সেখানকার গোবরে ছিল এক পদ্মফুল—মুসলিম স্পেন। পচা কাদার মধ্যে ডুবে থাকা ইউরোপকে পুনর্জীবিত করে এই মুসলিম জাতি।'
তারিক বলল—'হ্যাঁ, আসলেই! জাবির ইবনে হাইয়ান কত্ত কিছু করেছেন, তবু আমাদের কেমিস্ট্রি বইয়ে তার নামটা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি!'
সিনান বলল—'নতুনটায় আছে।'
'যেটির লেখকদের মধ্যে মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর মোহাম্মদ কায়কোকোবাদ আছেন, সেটিতে?'
'হ্যাঁ।'
'ইয়েস! আমি জানতাম, জাফর ইকবাল ভালো।'
'তবে সেখানে লেখা হয়েছে—অনেকে জাবির ইবনে হাইয়ানকে রসায়নের জনক বলেন, তবে আধুনিক রসায়নের জনক অ্যান্টোয়ান ল্যাভয়সিয়ে।'
'ঠিকই তো আছে বলে মনে হয়।'
সিনান কিছু বলল না। আমি বললাম—'এখন তো সবাই-ই স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে মনে হয়। অনেকেই জানে।'
লাইব্রেরিয়ান বললেন— 'হুম, তবে সেটা একাডেমিয়ায়। ট্রেনিংহীন বেশিরভাগ মানুষ এখনও মনে করে, গ্রিক আর ইউরোপিয়ানদের মাঝে কেউ কিছু করেনি। এর জবাব দিয়ে জর্জ সারটন মুষ্টিমেয় কিছু চমৎকার নাম উল্লেখ করেন—যাদের সমতুল্য কেউ তার সময়ে অর্থাৎ ১৯৩০-৪০ সালের দিকে পশ্চিমে ছিলেন না; জাবির ইবনে হাইয়ান, আল কিন্দি, আল খাওয়ারিজমি, আল ফারগানি, আবু বকর আল রাজি, সাবিত ইবনে কুররা, আল বাত্তানি, হুনাইন ইবনে ইসহাক, আল ফারাবি, ইবরাহিম ইবনে সিনান, আল মাসুদি, আল তাবারি, আবুল ওয়াফা, আলি ইবনে আব্বাস, আবুল কাসিম আল জাহরাউই, ইবনুল জাজ্জার, আল বেরুনি, ইবনে সিনা, ইবনে ইউনুস, আল কাশি, ইবনুল হাইসাম, আলি ইবনে ইসা, আল গাজালি, আল জারকালি, উমার খাইয়াম। কেউ মধ্যযুগকে বৈজ্ঞানিক দিক থেকে অনুর্বর দাবি করলে জর্জ সারটন সেই ভদ্রলোকের কাছে শুধু এ নামগুলো বর্ণনা করতে বলেছেন। এদের সবাই উজ্জ্বল ছিল ৭৫০ থেকে ১১০০ শতাব্দীর মধ্যে।'
'একটা জিনিস খেয়াল করো। ওই সময় কিন্তু আইনস্টাইনও ছিলেন পশ্চিমে। সেই সময় ছিল ইউরোপের ইতিহাসে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখর।'
অভিভূত হয়ে বললাম—'এতগুলো মুসলিম বিজ্ঞানী!'
সিনান বলল—'তালিকাটিকে আরও বড়ো করা যাবে; খেয়াল করিসনি?'
লাইব্রেরিয়ান বলল—'আরে! তোমরা এখনও বুঝতে পারছ না সংখ্যাটি কত বিশাল। মুসলিমদের লেখা শুধু জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত ম্যান্যুস্ক্রিপ্টের সংখ্যাই গ্রিক ও ল্যাটিনদের সব বইকে ছাড়িয়ে যায়। অন্যান্য সাবজেক্ট নাহয় বাদই দিলাম।'
আজ রাতে আমাদের মনে হয় আর ঘুম হবে না।
মুচকি হাসি দিয়ে লাইব্রেরিয়ান আবার বলা শুরু করলেন— 'মুসলিমরা জ্ঞানকে অনেক গুরুত্ব দিত। খলিফা মামুন একটি বই অনুবাদ করার জন্য অনুবাদককে বইয়ের ওজনের সমান স্বর্ণ দিতেন। শুধু আব্বাসি আমলে যে পরিমাণ আবিষ্কার মুসলিম বিশ্বে হয়েছিল, সে পরিমাণ আবিষ্কার এর আগে কখনো অন্য কোনো সময়কালে হয়নি, কোনো জাতিতেও নয়। মুসলিমরা...'
ওয়ার্নিং বেলের আওয়াজ শোনা গেল। লাইব্রেরিয়ান বললেন—'আচ্ছা, তোমাদের চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। তারিক, তুমি বইটি রাখতে পারো।'
তারিক বলল—'না না, একটু দেরি করে গেলে কিচ্ছু হবে না। আপনি বলুন।'
'তাড়াহুড়োর বিদায় ভালো লাগে না বন্ধু; বরং তোমরা নিজে থেকেই জ্ঞান অর্জন করো। আমার সময় তো জ্ঞানের উৎস অনেক কম ছিল, কিন্তু এখন তো তার কোনো অভাব নেই। আশা করি বিস্তর স্টাডি করবে, একসময় অন্যদের শেখাবে। ইনশাআল্লাহ! তোমাদের সাথে আবার দেখা হবে।'
আমরা তিনজন হাঁটা দিলাম। রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো পেছনে ঘুরে তাকালাম। এ কি! এ তো আগে খেয়াল করিনি। তারিক আর সিনানকে ডাক দিয়ে দেখালাম। আমরা তিনজন অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। ওপরে অনেক সুন্দর করে লেখা—
'The main task of mankind was accomplished by Muslims. The greatest philosopher, al-Farabi, was a Muslim; the greatest mathematicians, Abu Kamil and Ibrahim ibn Sinan, were Muslims; the greatest geographer and encyclopaedist, al-Mas'udi, was a Muslim; the greatest historian, al-Tabari, was still a Muslim.' - George Sarton
আবারও তিনজন হাঁটা দিলাম। একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছি না। আমি যা চিন্তা করছি, তারিক ও সিনান সম্ভবত তা-ই ভাবছে। মূলত আমাদের কী দেওয়া হয়েছিল, আর আমরা কী নিয়ে আছি।
আলহামদুলিল্লাহ! সময়মতো পৌঁছতে পেরেছি। ম্যাডাম মাত্র সবাইকে জিজ্ঞাসা করছেন, প্রত্যেক যুগে বিজ্ঞানীরা কী প্রভাব ফেলেছিলেন। সিঁড়িতে ওঠার অবস্থায়-ই তিনি আমাদের খেয়াল করলেন। দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জিজ্ঞাসা করলেন— 'তোমাদের সম্ভবত অনেক কঠিন সময় পার হয়েছে, তাই না? শেখার তো তেমন কিছুই পাওনি মনে হয়।'
তারিক বলল—'না, ম্যাডাম। শেখার অনেক কিছুই ছিল।'
সিনান বলল— 'অন্ধকার যুগ আসলে এতটা অন্ধকার ছিল না।'
ম্যাডাম অদ্ভুতভাবে আমাদের দিকে তাকালেন। তিনি সম্ভবত ভাবছেন, অন্ধকার যুগ থেকে ঘুরে এসে আমাদের মস্তিষ্কের বাতিও নিভে গেছে!
আমরা বাসে উঠলাম। একপাশে তিনজনের সিট, অন্য পাশে দুজনের। আর একটি তিনজনের সিটে বসলাম।
তারিক : মুসলিম বিজ্ঞানীরা তো বোম ফাটিয়ে দিয়েছেন!
সিনান : Yep, bomb of the intellect!
টিকাঃ
১. Muzaffar Iqbal, p: 27.
২. Wajdi Mohamed Ratemi. 'The Mathematical Secrets of Pascal's Triangle' online video, TED ed.
৩. Muzaffar Iqbal, p: 131.
৪. Seyyed Hossain Nasr, Science and Civilization.
৫. Ehsan Masood, p: 108.
৬. William Draper, A History of Conflict Between Religion and Science. (Temple of Earth Publishing) p: 57b.
৭. G.M. Wickens. 'What the West Borrowed from Middle East' in R. M. Savory, Introduction to Islamic Civilization (CUP, 1976).
৮. Muzaffar Iqbal, Science and Islam p: 15; 1001 Inventions p: 23; Michael H. Morgan p: xvi; M. Shamsher Ali (edt), Muslim Contribution to Science and Technology. (Islamic Foundation Bangladesh, Second Edition, 2012) p: 234; Sayyed Abul Hasan 'Ali Nadwi, Islam and the World: the Rise and Decline of Muslims and Its Effect on Mankind (UK Islamic Academy, 2005)
৯. Walter Libby, An Introduction to the History of Science (The Riverside Press, 1917) ch. 4.
১০. Kara Rogers (edt), The 100 Most Influential Scientists of All Time (Britannica Educational Publishing, 2010)
১১. Hank Green, 'The Dark Ages...How Dark Were They, Really - Crash Course World History #14' online video, Crash Course.
১২. Victor Robinson, The Story of Medicine. p: 164, in Hamza A. Tzortzis, The Divine Reality: God, Islam and The Mirage of Atheism. (Lion Rock Publishing, 2019); Jonathan Lyons, The House of Wisdom: How The Arabs Transformed Western Civilization (Bloomsbury Press, 2009)
১৩. রসায়ন (৯ম-১০ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ২০১৮) পৃ. ৪.
১৪. George Sarton, vol. 1, p: 17.
১৫. 'Introduction' in Salim al-Hassani op. cit.
১৬. Phillip K. Hitti, p: 313
১৭. Karen Armstrong, A History of God (London: Vintage Books 1999) p: 203.
১৮. George Sarton, vol. 1, p: 624.
📄 অনুবাদের সুনামি
লাইব্রেরির অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে আসার অনেক দিন পেরিয়ে গেল। সিনান তার বাসায় ডেকেছে। তারিককে কল দিয়ে সিনানের বাসার সামনে দাঁড়াতে বললাম। সিনানদের বাসায় যেতে যেতে চিন্তা করলাম আমাদের তিনজনের মেলবন্ধনের কথা। সিনানকে চিনি অষ্টম শ্রেণি থেকে। তারিককে অনেক আগে থেকেই দেখতাম। তবে সব সময় বাঁদরামি করত বলে নবম শ্রেণির আগে তার সাথে কখনো কথা বলিনি। লাইব্রেরির ঘটনার পর থেকে আমাদের এই বন্ধুত্ব।
সিনান খুব প্রতিভাধর একটি ছেলে। কিছুটা লাজুক স্বভাবের, সব সময় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত। ভেতর আর বাইরের অনেক জ্ঞান-ই সে রাখে। এমনিতে মিশুক না। তবে জ্ঞানের কথা উঠলে ঠিকই মিশুক।
তারিক মিশ্র স্বভাবের। সারাক্ষণ মাস্তি করতে থাকে। কিছুক্ষেত্রে মজাটা হারামের দিকে চলে যায়। কিছুতেই সিরিয়াস না, পরীক্ষায় ফেল করলে যেন আরও খুশি। অবশ্য কেন যেন মনে হয়, ছেলেটার ভেতরের দিকটা অসম্ভব ভালো। একটু নির্দেশনা পেলেই হয়তো সৎ পথে ফিরে আসত।
রইলাম আমি; হাবলা টাইপের ভ্যাবলা ছেলে। সিনান যতটুকু মিশুক, আমি তার থেকেও কম। বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। আর যা বলি, তা-ও কেউ বোঝে না! এজন্য ক্লাসে যেসব ছেলের কোনো গুরুত্ব নেই, একদম হাবাগোবা, তারাই আমার বন্ধু।
'আসসালামু আলাইকুম, তারিক।'
'ওয়া আলাইকুম আসসালাম।' তারিককে দেখতে খুবই মনমরা দেখাচ্ছে। আসলে, গত ১০-১৫ দিন ধরে ও এমন। লাইব্রেরির ওই ঘটনার পর থেকে ও আমাদের দুজনের সাথেই থাকে। মজা করে অনেক ভালো। সাধারণত আর উলটা-পালটা কথা বলে না।
আমরা সিনানের বাসায় ঢুকলাম। রুমে প্রবেশ করে দেখি, সিনান শুয়ে আছে। হাতে একটা ডিভাইস। একটি ফাঁকা বুকশেলফও নজরে পড়ল। অবশ্য কয়েকটি বই ছিল সেখানে।
'কি রে! তুই কি মুতানাব্বির মতো নাকি?'
'হ্যাঁ?' আমার আওয়াজ শুনে সিনান উঠে বসল। 'কেন? কী করেছিলেন মুতানাব্বি?'
আমি বললাম— 'মুতানাব্বি পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। তিনি একজন দোকানদারের কাছ থেকে একটি বই ধার এনে কিছুদিন পর তা ফেরত দিতে গেলেন। দোকানি জিজ্ঞেস করলেন, “কিনবেন না?” মুতানাব্বি উত্তর দিলেন, "আর কিনে কী করব!" বুঝেছিস?'
'না...'
'মানে তার মস্তিষ্কের মধ্যে পুরো বইটি ততক্ষণে স্টোর হয়ে গিয়েছিল! রুমে বুকশেলফ আছে, কিন্তু ফাঁকা! তুইও উনার মতো করিস নাকি?'
'আরে কী বলিস! বুকশেলফ নতুন নিয়েছি বলে ফাঁকা হয়ে আছে। সামনে অনেক বই পড়া হবে, ইনশাআল্লাহ। আচ্ছা, তোরা বস। তোদের সাথে কিছু কথা আছে।'
'তোর হাতে এটা কী?'
'কিন্ডল।'
'ভাইরে ভাই, তুই তো পুরাই বইখোর!'
'হা হা, বস তোরা।'
আমরা দুজন বসলাম। সিনান শুরু করল— 'লাইব্রেরির ওই ঘটনার পর তো অনেক দিন হয়ে গেল। সেই অভিজ্ঞতার কথা তোদের এতদিন মনে থাকবে— সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তোরা যে নিজে থেকে পড়া শুরু করবি, সেটা আশা করিনি। তবে তুই পড়ছিস, সেটা জেনে ভালো লাগল। তারিকের কাছ থেকে তো একদম কিচ্ছু আশা করি না। ভেবেছিলাম, আমিই একটু একটু পড়ে পড়ে তোদের জানাব, এজন্যই আজ তোদের ডাকা।'
'তো আজ কী পড়াবি?' উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
তারিক বলল—'আচ্ছা, লাইব্রেরিয়ান যেসব বিজ্ঞানীদের কথা বলেছিলেন, তাদের নিয়ে তো জানা দরকার।'
'জানবি আরকি! কিন্তু আজ যার জন্য ডেকেছি, সেটা বলি। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত ও বিশাল অনুবাদকরণ প্রক্রিয়া: The Greco-Arabic Translation Movement, সাধারণভাবে The Translation Movement বা অনুবাদ আন্দোলন বলা হয়। এ সময় গ্রিক, সংস্কৃত, মিশরীয়, পাহলভি, সিরিয়্যাক ইত্যাদি ভাষার বিপুল পরিমাণ বই আরবিতে অনূদিত হয়। এটি মূলত চলেছিল অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ হতে দশম শতাব্দীর শেষ দিক পর্যন্ত।'
'তারপর কি শেষ হয়ে যায়? শেষই যদি হবে, তাহলে শুরুই-বা হয়েছিল কেন?'
'দুটো কারণ আছে। প্রথমটা ছোটো। মুসলিমদের আশেপাশের অঞ্চলগুলো থেকে অনুবাদ করার মতো আর কিছু ছিল না। দ্বিতীয় কারণটা কিন্তু গুরুতর মূলত মুসলিমদের শেখানোর মতো তাদের কাছে আর কিছু ছিল না! মুসলিমরা নিজেদের বিজ্ঞান গড়ে তুলেছিল। প্রথম গ্রিক ও মিশরীয় বই অনুবাদ করা হয় উমাইয়া যুগে খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের আদেশে। সেগুলো ছিল মেডিকেল বই। তিনিই মুসলিম বিশ্বে প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন করেন।
আল মাহদি, হারুনুর রশিদ আমলে ধীরে ধীরে ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্ট বেগ পেতে থাকে। তবে সেটি পূর্ণ রূপ লাভ করে মামুনের সময়। সংস্কৃত অনুবাদ শুরু হয় ইয়াহইয়া ইবনে খালিদের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন খলিফা মামুনের উজির। তিনি ভারত থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে ডাক্তার এনে একটি হাসপাতাল স্থাপন করেন। সেখান থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃত বইয়ের অনুবাদ শুরু হয়। বিক্ষিপ্তভাবে অবশ্য এটি জাফর আল মানসুরের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল।
যাহোক, এই অনুবাদের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা দিয়েছেন আস-সাফাদি। ১৪ শতাব্দীর স্কলার। সেখানে দুটি পদ্ধতি ছিল: আক্ষরিক অনুবাদ আর ভাবানুবাদ। দ্বিতীয়টাই সেরা। এর পথিকৃৎ হলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক। লেখকের বক্তব্য বোঝা না গেলেই কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করা হতো। অনূদিত বইগুলো বেশ কিছু পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে যাচাই করা হতো। সেখানে উত্তীর্ণ না হলে প্রকাশ করা হতো না। বুঝতেই পারছিস, মুসলিমরা অথেন্টিসিটির ব্যাপারে কত কঠোর ছিল। এ ব্যাপারে কোনো চান্স নিত না। ফিলসফি অনুবাদ হতো নির্দিষ্ট ভাবধারা অনুসরণে। অনুবাদকদের সম্মানও ছিল প্রচুর। এই পেশার জন্য তারা অনেক ধনী হয়ে উঠেছিলেন। মুসলিম অনুবাদকগণ এত উঁচু লেভেলের বই এত কম সময়ে এত নিখুঁতভাবে কীভাবে অনুবাদ করতেন—এটাই ভেবে কূল পাচ্ছেন না আধুনিক ইতিহাসবিদরা।
১০ম শতাব্দীতে যখন অনুবাদ কাজ সমাপ্ত হয়, তখন বিপুল পরিমাণে বই আরবিতে অনূদিত হয়ে যায়। যাদের বই অনুবাদ হয়, তাদের মধ্যে আছেন গণিতের ক্ষেত্রে ইউক্লিড, জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে টলেমি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্যালেন, উদ্ভিদবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডায়োসকরিডিস আর বর্তমানে অ্যারিস্টটলের যে পরিমাণে বই পাওয়া যায়, মোটামোটি তার সমসংখ্যাক বই-ই পাওয়া যাচ্ছিল তখন। ২৫০ বছরের মাথায় মুসলিমরা তার আগের জাতিসমূহের প্রায় সকল বই অনুবাদ করে ফেলে।
এই ব্যাপারে সবচেয়ে সেরা মৌলিক কাজ দিমিত্রি গুটাসের। তিনি ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্টকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন, যা সুন্দর করে সামারাইজ করেছেন রবার্ট উইসনভস্কি :
১. Earliest Period: যাতে ইউক্লিডের এলিমেন্টস ও অ্যারিস্টটলের রেটোরিক অনূদিত হয়।
২. Al-Kindi Period: যেটাতে বাইতুল হিকমায় আল কিন্দির সুপারভিশনে অনুবাদ প্রক্রিয়া চলে।
৩. Hunayn Ibn Ishaq Period: হুনাইন ইবনে ইসহাকের স্টাইলে যেসব অনুবাদ হয়েছে।
৪. Qusta Ibn Luqa Period: যে সময়ে কুস্তা ইবনে লুকার স্টাইল অনুসৃত হয়।
৫. Stage of Scholarly Emendation: সর্বোচ্চ চূড়া; যখন যেকোনো বই অনুবাদ হতো না। বইয়ের কন্টেন্ট অনুযায়ী কেবল প্রয়োজনীয় জিনিসাদি অনূদিত হতো।
এবার একটা সিরিয়াস কথা বলতে হবে। লাইব্রেরিয়ান আমাদের কী বলেছিলেন মনে আছে? এটা না হলে সেই আর্কিমিডিস, অ্যারিস্টটল, পিথাগোরাসসহ অন্যান্য বেশিরভাগ গ্রিক লেখকের বই-ই হারিয়ে যেত।
এই মুভমেন্টটা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটা। ঠিক আছে। কিন্তু লাইব্রেরিয়ানের কথাটা বাস্তব না।'
'কী বলিস!'
'লাইব্রেরিয়ান ভুল করেছেন। অবশ্য তার দোষ না, উৎসুক কিংবা আরও ভালোভাবে বললে হীনম্মন্য মুসলিমরা নিজেদের কাজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এটা এত বেশি ছড়িয়েছে যে, মানুষ সত্য বুঝে বসে। ঠিকভাবে স্টাডি করতে দেখতে পারত, ব্যাপারটা মূলত আরও অনেক বেশি সেরা।'
কথা শুনে আমি তো একেবোরে হাঁ করে তাকিয়ে আছি।
'দেখ, মধ্যযুগে গ্রিকদের টেক্সট বা বইগুলো ইউরোপে পাওয়া যেত, সেগুলো বিলুপ্ত হয়নি। বাইজান্টিয়াম, এথেন্স ইত্যাদি জায়গায় সেসব পাওয়া যেত। আর শুধু সেখানেই না; ফ্রান্সেও বিশাল পরিমাণ গ্রিক টেক্সট ছিল। ইংল্যান্ডে ছিল, জার্মানিতে ছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে, কেউ সেসব জায়গায় গিয়ে টেক্সটগুলো নিয়ে অনুবাদ করত না; যদিও গ্রিক থেকে অনুবাদ তাদের জন্য অনেক সহজ ছিল। উলটো আমরা দেখতে পাই, মুসলিম বিশ্বে এসে ইউরোপিয়ানরা কষ্ট করে আরবি ভাষা শিখে তারপর টেক্সট ল্যাটিনে অনুবাদ করছে। প্রাইমারি টেক্সট তাদের কাছে থাকার পরেও অর্থাৎ গ্রিক ভাষায় থাকার পরেও সেকেন্ডারি টেক্সট আরবি থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ করেছে। এর কারণ কী? কেন তারা গ্রিক এথেন্সে না গিয়ে মুসলিম টলেডো যায়? আর আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে—শত শত বছর ধরেই তো টেক্সটগুলো সেখানে পড়েছিল, এতদিন অনুবাদ করেনি কেন? মুসলিমরা এলো, আরবিতে সেগুলো অনুবাদ করল, তারপর ইউরোপিয়ানরা আরবি থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ শুরু করল—কাহিনি কী?
সাধারণ ন্যারেটিভে কি খাওয়ানো হয়, জানিস? মুসলিমরা কেবল গ্রিকদের কাজ সংরক্ষণ এবং তা ভাষান্তর করেছে। তাদের মাঝে কোনো নতুনত্ব নেই, তারা নিজেরা কিছুই করেনি। সুতরাং মুসলিমদের কোনো কৃতিত্ব নেই, গ্রিকদের টেক্সট ইউরোপে আসে আর ইউরোপে রেভোল্যুশন ঘটে যায়। কী জঘন্য ইউরোসেন্ট্রিক বায়াস! দ্যাখ, মুসলিমরা গ্রিকদের কাজ সংরক্ষণ করেছে—এটা পুরোপুরি হিস্টোরিক্যালি ইনভ্যালিড অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে অযৌক্তিক। কিন্তু মুসলিমরা যেটা করে, সেটা এর থেকে আরও অনেক বড়ো—যা হলো ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর।
ইউরোপের বিভিন্ন ভূমি থেকে হাতেগোনা কয়েকটা টেক্সট ল্যাটিন হয়েছিল। কিন্তু ৯৯% আরবি থেকে অনুবাদ করেন ইউরোপীয় অনুবাদকরা। প্রভাবশালী আর্কিটেকচারাল হিস্টোরিয়ান উইলিয়াম লেথাবি বলেন— “কাজের অনুবাদ শতভাগই আরবি থেকে; সরাসরি গ্রিক টেক্সট থেকে অনূদিতগুলো কেউ-ই ব্যবহার করেনি।” দ্যাখ, গ্রিক টেক্সট ইউরোপের উত্থানের মূল কারণ ছিল না; কারণ ছিল মুসলিমদের লেখা টেক্সটসমূহ।
গ্রিক টেক্সট তো হাজার বছর ধরে পড়ে আছে, ইউরোপে কিছু ঘটেনি। হঠাৎ মুসলিমদের থেকে অনুবাদ করার পর এমন কী হলো যে, ১২শ শতকে একটা আর ১৭শ শতকে আরেকটা রেভোল্যুশন ঘটে গেল? দুই ক্ষেত্রেই বিশাল পরিমাণ আরবি টেক্সট ঠিক সে সময়টায় অনুবাদ হয়েছিল। গ্রিক টেক্সট থেকে অনুবাদ না করে আরবি থেকে অনুবাদ করেছিল। কারণ, অনুবাদ করার সময় ভুল পেলে মুসলিমরা তা শুধরে দিত। এজন্য মুসলিমদেরটা ছিল আপডেটেড।
তা ছাড়া অনুবাদ করার পাশাপাশি মুসলিমরা যে ব্যাখ্যা লিখত, নোট দিত, তা ছিল ইউরোপিয়ানদের জন্য অমূল্য। তবে মেইনলি, অনুবাদ পড়ে ইউরোপ এগিয়ে যায়নি; তারা এগিয়ে গিয়েছে মুসলিমদের মৌলিক কাজ পড়ে। আরও ভালোভাবে বুঝতে চাইলে ১২শ শতকের আর ১৭শ শতকের ইউরোপিয়ান বিজ্ঞান-দর্শনের সাথে গ্রিক বিজ্ঞান-দর্শন মেলালে দেখবি—কিছুই মেলে না। কিন্তু সেই সময়ের সাথে মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞান-দর্শন ও ওয়েস্টের বিজ্ঞান-দর্শন মেলালে দেখবি, বহুত মিল। জন ও'কনর এবং অ্যাডমন্ড রবার্টসন হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন—১৬শ ও ১৮শ শতকে ইউরোপে ডেভেলপ করা গণিতের সাথে মুসলিমদের ডেভেলপ করা গণিতের প্রচুর মিল। মুসলিমরা আগেই রেনেসাঁস পিরিয়ডের ম্যাথ করে বসে আছে। অন্যদিকে গ্রিক ম্যাথম্যাটিক্সের সাথে মিল কম।'
আমি বললাম—'তাইলে কনক্লুশন হচ্ছে, গ্রিকদের কাজ মুসলিমরা সংরক্ষণ করে; এটা ভিত্তিহীন। গ্রিকদের কাজ ইউরোপিয়ানরা ব্যবহার করে শিখরে ওঠে—এটা ফাঁকা কথা। বাস্তবতা হচ্ছে—মুসলিমদের মৌলিক কাজ মূলত ইউরোপের উন্নয়নের কারণ!'
'Exactly। যাক, বোঝাতে পেরেছি।'
'গুড পয়েন্ট। ব্যাপারটা মজার। নতুন ইসলামি বিশ্বের পাশেই ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, যারা এত ভালো প্রতিবেশী ছিল না। তাহলে গ্রিকদের ওপর ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য, গ্রিকদের বিজ্ঞান তাদের চেয়ে আরও ভালো জানার জন্য উত্তম পদ্ধতি আর কী হতে পারে? আর যদি অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটা একটা কারণ হয়—পাশের সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানদের জ্ঞানমূলক দিক থেকে হারানোর জন্য অনুবাদ করা হচ্ছিল, তবে এখানে আরেকটি মজার দিক আছে, আর তা হলো—ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্ট বা অনুবাদ আন্দোলন কিন্তু অনেকাংশে খ্রিষ্টানদের ওপরই নির্ভরশীল ছিল!
যেহেতু এখানে চলেই এসেছি, আরেকটা বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। বইগুলোর প্রথম দিককার অনুবাদকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন খ্রিষ্টান। কারণ মুসলিমরা প্রথম প্রথম গ্রিক পারত না। এই ছুতোয় অনেকে মুসলিমদের কোনো ক্রেডিটই দিতে চায় না। অথচ খলিফা মামুনের বাইতুল হিকমার অনুবাদকদের প্রধান ছিলেন ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি; একজন মুসলিম। তা ছাড়া প্রফেসর জন এফ হিলিও সম্পূর্ণ ক্রেডিট মুসলিমদের দিচ্ছেন। আমার প্রশ্ন হলো—যে কাজটি মুসলিমরা করতে পারল, সে খ্রিষ্টানরা আগে করল না কেন? যখন মুসলিমরা এই সেক্টরে বিশাল ফান্ডিং করল, তখনই কেন তারা অনুবাদে আগ্রহী হয়ে উঠল? মূল উদ্যোগ ছিল মুসলিমদের; খ্রিষ্টানরা শুধু শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে।'
আমি বলে উঠলাম—'হা হা! তাহলে তো ইহুদি-খ্রিষ্টানরা পয়সার লোভে মুসলিমদের কামলা খেটেছে!'
সিনান বলল—'আমি এমনটা বলতে চাইছি না। কারণ, অমুসলিমদের মধ্যেও অনেক সেরা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তবে হুনাইন ইবনে ইসহাক, সাবিত ইবনে কুররাদের মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের প্রতিভা ইসলামের মানুষরাই খুঁজে বের করেন। মুসলিমদের সুপারভিশন আর অভিভাবকত্ব ছাড়া কখনো অমুসলিমরা এই জটিল-কঠিন কাজ করতে পারত না।'
'আচ্ছা, এই মুভমেন্টের আগেই তো মুসলিমরা বিজ্ঞান নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিল, না?' বলল তারিক।
'হুম, তুইও তাইলে তথ্যার্জন চালিয়েছিস!' মুচকি হাসি দিলো সিনান—' এসব বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন ইয়াকুব বিন তারিক, হাল্লাজ ইবনে মাতার, মাশাআল্লাহ আল ফারিসি এবং অন্যরা। মুসলিমরা শুধু অমুসলিমদের সাহায্য নিয়েছে এবং এর বিনিময়ে সম্মান ও ধন দিয়েছে।'
শ্বাস নিয়ে—'ওই সময় প্রত্যেক প্রভাবশালী মানুষ অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন; বাদশাহ, ধনী লোক, সকলে। এই ট্র্যান্সলেশন মুভমেন্ট বিভিন্ন জাতির জ্ঞানের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে। এরই ফলে অসংখ্য নতুন আইডিয়া বের হয়ে আসে। এসব অনুবাদের কোয়ালিটি এত্ত চমৎকার ছিল, গ্রিক কপি থাকা সত্ত্বেও ইউরোপিয়ানরা গ্রিকটি ব্যবহার না করে অ্যারাবিক থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ করছিল—সেটা এক অনুবাদের ঢেউ ছিল। বিশাল ঢেউ; অনুবাদের এক সুনামি!'
আমরা দুজন হাঁ করা অবস্থায় হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ালাম।
পানি খেয়ে নিয়ে সিনান জিজ্ঞেস করল— 'কুরআনে হামানের যে হিস্টোরিক্যাল মিরাকল বলা হয়, সেটার কথা তোরা শুনেছিস?'
'হ্যাঁ।' আমি বললাম।
'ভালো। মিশরীয় হায়ারোগ্লিফগুলো কোন সময়ে পুনর্জীবিত করা হয়, বল তো দেখি!'
'১৯ শতক।'
'হুম, ওটা ভুল।'
'কিন্তু সবাই তো ওটাই লেখে! বাংলাদেশি, টার্কিশ, আমেরিকান, ইংলিশ সকল রাইটার।'
তারিক বলল—'তুই ব্যাটা এখন রিভিশনিস্টদের মতো ডিকন্সট্রাকশন চালাচ্ছিস।'
তারিকের কথা শুনে হেসে দিয়ে সিনান আমার কথার জবাব দিলো—'তো কী হয়েছে? সকলের মূল রেফারেন্স অবশেষে একই জায়গায় গিয়ে আটকায়। সেটা অবশ্য ইউরোপে ইজিপ্টলজির জন্মের জন্য ঠিক। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ইজিপ্টলজির জন্ম হয়েছে এর অনেক আগে, মুসলিম বিশ্বে।'
সিনান দাঁড়িয়ে বলতে লাগল— 'বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মুসলিমরা কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আদিকালের জাতিগুলো নিয়ে গবেষণা করতে উজ্জীবিত হয়। এখন অনেক মুসলিম মনে করে, ইসলামের আগের সময় নিয়ে জ্ঞান অর্জন অনুচিত। কারণ, সে সময়টি হলো জাহেলিয়াত। এই চিন্তাধারাটি পুরাই ভুল। কারণ, জাহেলিয়াত কোনো নির্দিষ্ট সময়কাল না; বরং সঠিক বৈশিষ্ট্য থাকলে যেকোনো সময় কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা জায়গার জন্য ব্যবহার করা যায়।
অনেক মুসলিম মনে করতেন—ইজিপসিয়ান অর্থাৎ মিশরীয় হায়ারোগ্লিফগুলোর রহস্য ভাঙতে পারলে বিজ্ঞানের অনেকগুলো দরজা খুলে যাবে। বিখ্যাত সুফি জুননুন মিশরি মিশরের আখমিম নামক জায়গার একটি ধর্ম মন্দিরে থাকতেন। তিনি মন্দিরের দেয়াল লেখা সেই ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফের ভাষার বুঝ রাখতেন। আর এ থেকেই তিনি "ইলমুল আহওয়াল ওয়াল-মাকামাত" নামে একটি নতুন সুফি ধারার উদ্ভব ঘটান। মিশরে বিভিন্ন মসজিদে অর্থাৎ মুসলিম স্থাপত্যে হায়ারোগ্লিফের ব্যবহার দেখা যায়।
বিশেষ করে অ্যালকেমিস্টরা ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফে ছিলেন বেশি আগ্রহী। তাই ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতেন জুননুন মিশরি, ইবনে ওয়াহশিয়া, আবুল কাসিম ইরাকির মতো কেমিস্টরা। মুসলিম কেমিস্ট, আবুল কাসিম আল ইরাকি তার বইয়ে বিভিন্ন অ্যালকেমিকাল সিম্বল ব্যবহার করেছিলেন, যা ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ থেকে অনুপ্রাণিত। আর ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ নিয়ে প্রথম মুসলিম—যিনি বই লিখেছিলেন, তিনি হলেন জাবির ইবনে হাইয়ান। মূলত তিনি একাধিক প্রাচীন ভাষার বিশ্বকোষ লিখেছিলেন। ইজিপসিয়ান হায়ারোগ্লিফ কীভাবে পড়তে হয়, তা নিয়ে বই লিখেছিলেন আইয়ুব ইবনে মাসলামাহ। ইবনে ওয়াহশিয়াও এ নিয়ে বই লিখেন। আবুল কাসিম আল ইরাকি আর ইবনে ওয়াহশিয়ার বেঁচে যাওয়া বইগুলো থেকে দেখা গিয়েছে, তাদের বুঝ সঠিক।
ইউরোপে কপ্টিক গ্রামার নিয়ে প্রথম লিখেছিলেন A. Kircher। এর জন্য তিনি ৪০টি অ্যারাবিক বইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন—যেগুলো মিশর থেকে আনা হয়েছিল। ন্যাপলিওন বোনাপার্টের মাধ্যমে প্রথম রসেটা স্টোন আবিষ্কৃত হয়। চম্পোলিয়ন ছিলেন আরবিতে খুবই দক্ষ। তিনি এই রসেটা স্টোন ব্যবহার করেছিলেন। মিশরীয় হায়ারোগ্লিফের রহস্য ইউরোপে ভেদ করেছিলেন চম্পোলিয়ন এবং তা তিনি করেছেন অ্যারাবিক বইগুলোর ওপর ভিত্তি করেই।
তার সময়ে অন্যান্য দক্ষ স্কলাররাও চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। পার্থক্য হচ্ছে—চম্পোলিয়ন আরবিতে দক্ষ ছিলেন, অন্যরা ছিলেন না। ঊনবিংশ শতকে ইউরোপিয়ানরা মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ ডিসাইফার করতে সক্ষম হন, অর্থ বের করতে পারেন। কিন্তু মুসলিমরা এই পথে অনেক আগেই হেঁটে গিয়েছিলেন। এবার বোঝ, ইজিপ্টলজির জন্ম কোথায় আর কখন হয়েছিল। মুসলিম অনুবাদকগণ এতই ভয়ংকর প্রতিভাধর ছিলেন, তারা অজানা ভাষা পর্যন্ত অনুবাদ করে ফেলেছিলেন!’
‘সেই সেই! জোশ, অস্থির এসব!’ দুঃখে ভরা তারিক হঠাৎ লাফিয়ে উঠল।
চলে যাওয়ার সময় হলো। চরম কিছু জিনিস জেনে বের হলাম তারিক আর আমি। কাল আবার স্কুলে দেখা হবে।
ঘরে যখন যাচ্ছি, তখন চিন্তা করলাম, আমরা তিনজন তিন রকমের মানুষ, কীভাবে বন্ধুত্ব হলো! অবশ্য সঠিক মস্তিষ্ক থাকলে বোঝা যায়, এটা আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব।
টিকাঃ
১. Philip K. Hitti, p: 412
২. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison, 'The Sciences in Islamic Societies (750 - 1800)' in Robert Irwin (edt), The New Cambridge History of Islam (Cambridge University Press, 2010) vol. 4, p: 565
৩. বাইজান্টিয়াম, ইন্ডিয়া। ইউরোপ ছিল অবশ্য, কিন্তু ইউরোপ থেকে নেওয়ার মতো কিছু ছিল না। মূলত ইউরোপের অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, মুসলিম সেনাপতিগণ তা জয়ের কোনো ইচ্ছাও পোষণ করতেন না। John M. Hobson, The Eastern Origins of Western Civilisation. (Cambridge: Cambridge University Press. 2004), p: 100.
৪. Ehsan Masood, p: 54
৫. A. I. Sabra, Optics, Astronomy and Logic: Studies in Arabic Science and Philosophy. p: 226, in Muzaffar Iqbal, Science and Islam op. cit.
৬. M. Shamsher Ali op. cit. p: 235
৭. Sonja Brentjes and Robert G. Morrison op. cit. p: 569
৮. Ehsan Masood, p: 46-47
৯. Phillip K. Hitti, p: 311
১০. Muzaffar Iqbal, p: 16
১১. Ehsan Masood, p: 48
১২. Ehsan Masood, p: 46
১৩. 'Founded in Translation: From Greek to Syriac to Arabic' Peter Adamson, Philosophy in the Islamic World: A History of Philosophy Without any Gaps (Oxford University Press, 2016)
১৪. David C. Lindberg, The Beginnings of Western Science op. cit
১৫. Robert Wisnovsky, Avicenna's Metaphysics in Context (Cornell University Press, 2018)
১৬. S. E. al-Djazairi. 'Suppressing the Muslim Role' in The Hidden Debt op. cit.
১৭. Ehsan Masood p: 49
১৮. John F. Healey. 'The Syriac-speaking Christians and the Translation of Greek Science into Arabic' Muslim Heritage.
১৯. George Saliba, A History of Arabic Astronomy p: 16, in Muzaffar Iqbal op. cit.
২০. না জানলে দেখুন/পড়ুন, Nouman Ali Khan, 'Historical Miracle of Qur'an' online video, FreeQuran Education; Caner Taslaman, The Qur'an: The Unchallengeable Miracle (Nettleberry Publications, 2006) p: 214; মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার, 'মুসা আঃ-এর সময়ে ফেরাউনের সহচর হামান: কুরআনের ঐতিহাসিক বর্ণনায় কি ভুল আছে?' shottokothon.com (সত্যকথন: ১২৫)
২১. আদ, সামুদ ইত্যাদি জাতির ইতিহাস থেকে
২২. Okasha el Daly. 'Deciphering Egyptian Hieroglyphs in Muslim Heritage' Muslim Heritage; Sayyed Abul Hasan 'Ali Nadwi op. cit
২৩. বিস্তারিত জানতে পড়ুন—Okasha el Daly, Egyptology: The Missing Millennium (Routledge, 2016)। তা ছাড়াও জিম আল খালিলির ডক্যুমেন্টারি Islam and Science-এর প্রথম পর্বটি দেখতে পারেন। সেখানেও 'উকাশা আল ডালি-এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
📄 সফল উড়ন্ত পাখিমানব
প্রথম পিরিয়ড শেষ। টিচারের কোনো খবর নেই। আজ নাকি কোনো এক বছরের এসএসসি ব্যাচের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। প্রথম পিরিয়ডে শুধু হাজিরা নিয়ে ম্যাডাম চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন চুপচাপ থাকতে, যেন টু শব্দটিও না করি। এবারের পুনর্মিলনে নাকি অনেক খরচা করা হয়েছে। শোনা যায়, এই ব্যাচের ভাই-বোনেরা ছিল আমাদের স্কুলের ইতিহাসে সবচেয়ে সার্থক ব্যাচ। একাধিক পপুলার সিঙ্গার, ডান্সার আনা হয়েছে। তার মধ্যে মিনার নামক একজন নাকি আমাদের স্কুল সংলগ্ন কলেজের শিক্ষার্থী। আর এসব জেনেছি রনি থেকে, ভালোই অপ্রয়োজনীয় তথ্য রাখে ছেলেটি।
ভালোই হয়েছে! আজ আব্বাস ইবনে ফিরনাসকে নিয়ে কথা হবে।
ক্লাসের পেছনের দিকের কোনায় বিপথগামী পোলাপানদের আড্ডা। আমাদের মুসলিম গ্যাং সামনের দিকের কোনায়। আজ জমবে, ইনশাআল্লাহ।
সিনান শুরু করল— 'মুয়াজ্জিন যেখানে আজান দেয়, সেখানে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তখন তো আবার উঁচু মিনার থেকে আজান দিত। এই দাঁড়িয়ে থাকা লোকের উদ্দেশ্য যে আজান দেওয়া না—তা অবশ্য বোঝাই যাচ্ছে। নিচে সবাই চিল্লাচ্ছে—"তাড়াতাড়ি মরে গিয়ে তোর পাগলামি শেষ কর!” “আরে লাফা!” অবশ্য, বুড়ো একটা লোককে এভাবে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে জীবন নিয়ে হতাশ, আত্মহত্যার চেষ্টাকারী মনে করাটা ভুল না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবার এক অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে—কী হতে যাচ্ছে এই ডানপিটে বুড়োর। তিনি...'
'আব্বাস ইবনে ফিরনাস!' চিল্লিয়ে উঠলাম আমি।
'না, তিনি Armen Firman.'
'এটা কে আবার?'
'বলছি, আগে কাহিনি শেষ করতে দে। এবার আরমান ফিরমান লাফ দিয়ে শেষের দিকে একটু ভয় পেয়েছিলেন যদিও, কিন্তু একজন স্টান্টম্যানের কলঙ্ক। পিছু হটা সাজে না। আস্তে আস্তে তিনি নিচে পড়ে গেলেন। উড়তে পারলেও সাহস তো দেখিয়েছেন। বাজির টাকাটা পেয়ে যাবেন।'
'বাজি?'
'হ্যাঁ, তিনি বিজ্ঞানের জন্য কিছু করেননি। তবে দর্শকদের ভেতর থেকে একজোড়া চোখ তাকে দেখছিল। ৪৭ বছর বয়সি এক ইঞ্জিনিয়ার, রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিদ, আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তাকে স্পেনে আনা হয়েছিল মূলত গান শেখানোর জন্য। প্রথম প্রথম সে গ্লাস বানাত। অসাধারণ সব গ্লাস। কৃত্রিম ক্রিস্টাল তৈরি পদ্ধতি তারই আবিষ্কার। এভাবেই বানিয়েছিলেন চোখ ধাঁধানো একটি বিজ্ঞানমঞ্চ, অবশেষে চিন্তা করলেন অ্যারোনটিক্সে ঢোকার।'
'আর... আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আবিষ্কারগুলো নিয়ে কিছু বলবি না?'
'বলছি, আগে কাহিনিটা তো শেষ করতে দে! গভীর দৃষ্টিতে পাখিদের উড়ান পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি। কয়েকবার মরুভূমিতে চেষ্টা চালালেন। অবশেষে ৭০ বছর বয়সে সিদ্ধান্ত নিলেন, একটি পাবলিক শো হওয়া দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ।'
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' এই বলে সিনান পারলে নিজেই লাফ দিয়ে দেয়! আমরা ধরাধরি করে থামানোর পর আবার বলতে শুরু করল— 'নিজ চোখে সবাই ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখল। ১০ মিনিট ধরে আকাশে উড়লেন তিনি। চিন্তা করতে পারিস? যদি ওখানে থাকতাম তখন! পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম প্যারাশুট ফ্লাইট। জান্নাতে যদি যেতে পারি রে ভাই, টাইম-ট্রাভেল করে ওই সময় চলে যাব!'
'চরম কাহিনি রে, চরম!'
'তো এই কাহিনিটি, সম্ভবত মিথ্যা।'
'কি!'
'না, পুরোটা না, শুধু আরমান ফিরমানের অংশটুকু। হতে পারে এটি আব্বাস ইবনে ফিরনাসের ভুল ল্যাটিনাইজড নাম। ঐতিহাসিক বর্ণনায় অবশ্য আরমান ফিরমান নামে বাস্তবে কেউ নেই। মানে, গল্প সুন্দর করতে হলে একটু রংটং মারতে হয়, বুঝেছিস? বাকিটুকু সত্য। খুব সম্ভবত ল্যাটিনে রূপান্তরের সময় দুই অনুবাদকের ভুল রূপান্তরের জন্য দুই উড়ন্ত মুসলিমের মিথ সৃষ্টি হয়। এখন, ইউরোপিয়ানদের মধ্যে রজার বেকন সর্বপ্রথম Ornithopter-এর বর্ণনা দেন।'
'এটা আবার কোন জাতের হেলিকপ্টার?' রনি বলল।
'আরে ব্যাটা, এর অর্থ উড়ন্ত যন্ত্র। মজার ব্যাপার কি, জানিস? রজার বেকন কর্ডোভায় পড়ালেখা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ Pierre Mandonnet বলেন— “রজার বেকনের সমস্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবুদ্ধি মুসলিমদের থেকে নেওয়া।” হতে পারে, আব্বাস ইবনে ফিরনাসের উড়ন্ত যন্ত্রের বর্ণনা পড়েই তিনি নিজ ভাষায় তা উল্লেখ করেন। আর এখান থেকেই লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি তার বর্ণনা দেন।
মুসলিমদের উড়ার যাত্রা কিন্তু এখানে শেষ হয়নি। লাগারি হাসান চেলেবি, অটোমান। রকেট যাত্রাকারী প্রথম মানুষ। সপ্তদশ শতাব্দীর ঘটনা। এটার ফুয়েল হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ৩০০ পাউন্ড গানপাউডার। পরে রাজপ্রাসাদের সামনে অবতরণ করেন নিরাপদে। হাজারফান আহমাদ চেলেবি, আরেকজন অটোমান। লাগারির মাত্র পাঁচ বছর পরে তিনি নিজেও একবার উড়াল দেন। সফলতার জন্য তাকে ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হয়। এটা অবশ্য রকেট ফ্লাইট ছিল না। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের অনেক অনেক আগে নিশ্চয়ই অনেকে উড়ার চেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন। তবে মূল সফলতার ধারা শুরু হয় আব্বাস ইবনে ফিরনাস থেকেই। মাঝখানে অনেকে এই চেষ্টা চালান। শেষমেশ শতভাগ সফল হন রাইট ব্রাদার্স।'
'মারভেলের স্ট্যানলি সাহেবকে তো আব্বাস ইবনে ফিরনাসের কথা জানানো দরকার ছিল রে, কিন্তু তার আগেই তিনি নিজেই ওপারেতে উড়াল দিলেন।'
সিনান মুচকি হাসল। তারিক অবশ্য রসকষহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আগের দিন কিছুটা উৎফুল্ল হলেও আজ আবার কেমন মরে গিয়েছে।
সিনান বলতে থাকল—'এখন আব্বাস ইবনে ফিরনাসের অন্যান্য কাজের দিকে তাকাই। মূলত তার জীবনের সফলতা গ্লাস নিয়ে। তিনি পাথর থেকে গ্লাস বানানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তার খাবার পানির গ্লাসগুলো ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ; কবি আল বুহতুরি বলেছেন—"রংহীন গ্লাসগুলো দেখলে নাকি মনে হয় কোনো কন্টেইনার ছাড়া পানি এমনি দাঁড়িয়ে আছে!" বাই দ্যা ওয়ে, এই বুহতরির থেকেই কিন্তু মুতানাব্বি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।'
'বিশাল ব্যাপার তো!'
'তা আর বলতে? তিনি ক্রিস্টাল বানানোর কৃত্রিম পদ্ধতির উন্নতি করেন। যার কারণেই স্পেনে গ্লাসশিল্প শুরু হয়। তিনি ক্রিস্টাল কাটার পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। পরে ১৫ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলিমদের প্রতি হিংসার কারণে খ্রিষ্টানরা তার ক্রিস্টাল নিয়ে লেখা মূল বই মুকতাবিস ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে বানানো বিভিন্ন ক্রিস্টালের নজির পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রাচীন চার্চে। নিজস্ব প্রতিভার মধ্যে রয়েছে—তিনি যেকোনো জটিল ধরনের লেখার পাঠোদ্ধার করতে পারতেন। এমন গ্লাস বানিয়েছিলেন, যেটা দিয়ে ম্যাগ্নিফাইং-এর কাজ করা যেত। একধরনের ঘড়িও বানিয়েছিলেন। আবার বর্তমান সময়ের চশমার মতো লেন্সও বানিয়েছিলেন, চোখের সমস্যায় ব্যবহার করা যায়—এমন। কিও বোরিং লাগছে?'
তারিক বলল—'নাহ! বোরিং হব কেন?'
'এতক্ষণ তো নীরস আবিষ্কারের কথা বললাম। এবার অন্য কিছু শোন। তিনি নবম শতাব্দীতে একটি প্ল্যানেটরিয়াম তৈরি করেছিলেন। সেখানে দর্শনার্থীরা বিশাল বিশাল কৃত্রিম যন্ত্রপাতি দিয়ে গ্রহের নাড়াচাড়া দেখত। এখন তো বেশি মনে হয় না। ওই আমলে কিন্তু এটা রীতিমতো বিস্ময়! আর লুকোনো কিছু যন্ত্রপাতি দিয়ে নানা ধরনের চমৎকার শব্দ সৃষ্টি করা হতো। কৃত্রিম বিদ্যুতের চমক, আওয়াজ, দমকা বাতাসের শব্দ, মেঘ ইত্যাদিও ছিল। এমন অনুভূতি যে নবম শতকে স্পেসশিপে একজন; বহির্বিশ্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিচ্ছে।'
'ওয়াও সিনান! আব্বাস ইবনে ফিরনাস তো নবম শতাব্দীতে পুরো শো মাতিয়ে রেখেছিলেন!'
'হুম, টোটালি।'
টিকাঃ
১. Michael H. Morgan op. cit.
২. Michael H. Morgan, p: 154-157.
৩. Salah Zaimeche. 'The Impact of Islamic Science and Learning on England’ Muslim Heritage.
৪. Salim al-Hassani, p: 298-300
৫. Salim al-Hassani p: 145
৬. Phillip K. Hitti p: 598
৭. Ehsan Masood p: 72; Michael H. Morgan p: 156; Salim al-Hassani p: 39
৮. M. Shamsher Ali op. cit. p: 161.
৯. Salim al-Hassani p: 39
১০. Michael H. Morgan p: 154-157
১১. Ehsan Masood p: 72
১২. আ.ফ.ম আব্দুল হক ফরিদী, ইসলামি বিশ্বকোষ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দ্বিতীয় সংস্করণ, জুন ২০০৪) vol. 2, p: 390.
১৩. Ehsan Masood, p: 71-73
১৪. Michael H. Morgan p: 156