📘 মুসলিম বিশ্ব ও সমকালীন মাসায়েল 📄 মাওলানা ইসহাক উবাইদি রহ. এর একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ (গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি রাজনীতি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও ফলাফল)

📄 মাওলানা ইসহাক উবাইদি রহ. এর একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ (গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি রাজনীতি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও ফলাফল)


পরিমার্জিত সংস্করণে মাওলানা ইসহাক উবাইদি রহ. এর 'গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি রাজনীতি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও ফলাফল' নামে একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ সংযোজন করা হয়েছে; যা তিনি একটি 'মুহাযারা'য় পেশ করেছিলেন।

নোয়াখালীর বশিরিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার সাবেক মুহতামিম, বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও রাজনীতিবিদ মাওলানা ইসহাক উবাইদি রহ. হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর রাজনৈতিক প্রেস সচিব ছিলেন।

রাজনীতি, রাজনীতির মাঠ, রাজনীতির বাস্তবরূপ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও রাজনীতির হালচাল তিনি খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি করা প্রবন্ধটি খুবই গুরুত্বপূণ এবং পাঠক তা থেকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করার মতো বহু উপাদান পাবেন বলে আশা করছি।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি রাজনীতি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও ফলাফল
মাওলানা ইসহাক উবাইদি রহ.

নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারিম। আম্মা বা'দ-

ইসলাম মানুষের ধর্ম। মানবকল্যাণে নিবেদিত একটি বহুজাতিক ধর্ম। কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে এর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য প্রয়োজন একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর। যার মাধ্যমে বিলিয়ে দেয়া যাবে মানবতার সুফল ও সুনীতিগুলো। ফলে গড়ে উঠবে সুশীল একটি সমাজব্যবস্থা। আর এর জন্য প্রয়োজন হয় লোক নির্বাচন করার, যারা মানবতার সুবাতাসকে ছড়িয়ে দেবে দেশব্যাপী।

এই নির্বাচন কীভাবে হওয়া উচিত; তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেয়া আছে ইসলামের বড়ো বড়ো আইনি গ্রন্থগুলোতে। পবিত্র কুরআনের মধ্যে বর্তমান পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের অসারতার কথা পরিষ্কারভাবেই বলা আছে। "وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ" লোকের আনুগত্য করো, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট করে ফেলবে।' পৃথিবীতে বসবাসকারী যতো মানুষ রয়েছে, তার মধ্যে খারাপ লোকের সংখ্যাই বেশি। ভালো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। পবিত্র কুরআনের কোথাও বলা হয়েছে "وقليل ما هم" অর্থাৎ ভালো মানুষ সংখ্যায় কমই হয়ে থাকে। আবার কোথাও বলা হয়েছে "أكثرهم لا يعقلون", "أكثرهم لا يعلمون" অর্থাৎ তাদের অধিকাংশ মূর্খ, অধিকাংশ অজ্ঞ। আবার কোথাও বলা হয়েছে "لَا يَسْتَوِي الْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيثِ" অসত্যের আধিক্য তোমাকে আশ্চর্যান্বিত করে।' সব কুরআনিক দর্শন থেকে একটি কথাই ফুটে উঠেছে যে, পৃথিবীতে খারাপের সংখ্যা সব সময় বেশিই থাকে। তাই বলে ওই সংখ্যাধিক্যের মতে বা তাদের সিদ্ধান্তে পৃথিবী চলতে পারে না। পৃথিবী চলবে অল্প সংখ্যক সৎ মানুষের নেতৃত্বে। নতুবা পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য।

অন্যদিকে আজকের গণতন্ত্রের ভাষ্য হচ্ছে পুরো উল্টো। অধিকাংশ মানুষ যা বলবে তাই সঠিক। অধিকাংশ মানুষ যাকে দেশ চালানোর কাজে নির্বাচিত করবে, আইন পরিষদ বা আইন প্রণয়নকারী হিসেবে নির্বাচন করবে, সে বা তারাই দেশ চালাবে বা আইন তৈরি করবে। আগেই বলেছি, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ খারাপ; কুরআনের এই দর্শনের সঙ্গে আমরা বাস্তবেও তার মিল হুবহু দেখতে পাচ্ছি। আমাদের সমাজে সৎ মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। দু'একজন থাকলেও তারা সমাজপতি নয়। অর্থাৎ সমাজ তাদের কথায় উঠে-বসে না। এমতাবস্থায় অধিকাংশ অসৎ লোকের ভোটে যে লোকটি নির্বাচিত হবে, সে কী করে সৎ হতে পারে। একজন অসৎ লোক কোনোদিন একজন সৎ লোককে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও নির্বাচন করবে না এবং করছে না যে এটাই বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই ম্যাজরিটির এই গণতন্ত্র দ্বারা একটি দেশের কল্যাণ কোনোদিনই আশা করা যায় না। এই গণতন্ত্র আছে বলেই বোমাবাজি ও সন্ত্রাস দিন দিন বেড়েই চলছে। কারণ, সন্ত্রাসীদের ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিটি সন্ত্রাসী হবে না তো হবেটা কী? এই গণতন্ত্র আছে বলেই নিজের পক্ষে ভোটের আধিক্য দেখানোর জন্য সন্ত্রাস করে হলেও ভোট চুরি করা হচ্ছে, জালভোট ডাকাতি হচ্ছে। এই গণতন্ত্রের কারণেই আইনের কোনো প্রয়োগ-ব্যবস্থা নেই। খুন-খারাবি করে জেলে গিয়ে নির্বাচিত মহারথীদের টেলিফোনেই আবার ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। এখন তো তাও লাগে না; খুন করে গিয়ে মন্ত্রী-মিনিস্টারের বাড়িতে-ছত্রছায়ায় লালিত পালিত হতে থাকে। এতোসব কাণ্ড-কারখানা চোখের সামনে হওয়া সত্ত্বেও নেতা-নেত্রীরা এই গণতন্ত্রের কথা বলে বেড়ায়। এই গণতন্ত্রের জয়গানই তারা সব সময় গেয়ে যায়। কারণ একটিই, সরকার বা বিরোধীপক্ষ যেই হোক না কেনো; তারা কেউই একটি সৎ নেতৃত্ব বা সৎ সমাজ গড়ে তুলতে আগ্রহী নয়।

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলো, ‘ঋণখেলাপিদের কেউ কিছু করতে পারবে না। কারণ, তারা সরকারি দলে যেমন আছে, বিরোধীদলেও ঠিক তেমনি রয়েছে। তাদেরকে আইনও কিছু করতে পারবে না।' (কোনো একজন ঋণখেলাপি কর্তৃক গভর্নরকে ধমকানোর কথা কে না জানে)। কারণ, আইন তো সেই অসৎ মানুষগুলো দ্বারাই পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন একবার ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দিতে বলেছিলো। কিন্তু নেতা-নেত্রীরা এতে সাড়া তো দিলই না; বরং প্রত্যেক দল নিজ নিজ ছাত্র সংগঠন দিয়ে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকাই গ্রহণ করা হয়েছিলো। কারণ একটাই, সৎ নেতৃত্ব না থাকায় জনসাধারণের ছেলে-সন্তানদের দিয়ে নিজ নিজ অসৎ চিন্তা-চেতনা বাস্তবায়নের কাজে নেতা-নেত্রীরা সদা ব্যস্ত। পড়ালেখার নামে গরিব মা-বাপেরা টাকা-পয়সা জোগান দিতে যেখানে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন, সেখানে তাদের সন্তানরা রাজনীতির নামে মাস্তানি, হত্যা-রাহাজানিসহ আরও বহু অসৎ কাজে লিপ্ত হয়ে ছাত্রজীবন তো নষ্ট করছেই, উপরন্তু ভাবী মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী যে এসব সন্ত্রাসীরাই হতে যাচ্ছে, তাও আমরা দিব্বি চোখে দেখতে পাচ্ছি। এ ব্যাপারে ছাত্রদের দোষ মোটেও নেই। যতো দোষ নেতা-নেত্রীদের। তারা নিজ নিজ স্বার্থোদ্ধারের কাজে এই তারুণ্যকে ব্যবহার করছে। অথচ তাদের সন্তানরা কিন্তু এখানে পড়ে না, পড়ে বিদেশে। (এই নেতা-নেত্রীদের স্বার্থে কতো মায়ের বুক এ পর্যন্ত খালি হয়েছে তার হিসাবই বা কে দেবে? নেত্রীদের জন্য খুব সহজ একটা পন্থা আবিষ্কার হয়েছে, আর তা হচ্ছে, একটি রক্ত ঝরলে নেত্রী দৌড়ে গিয়ে তার মাকে বুকে চেপে ধরে কেঁদে ফেলবেন। ব্যস! সব ঠাণ্ডা)। এর অর্থ এই যে, আমাদের সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠুক এবং শাসন-শোষণের জন্য যোগ্য হয়ে উঠুক, আর গরিব জনসাধারণের ছেলেরা বখাটে, মাস্তান, সন্ত্রাসী, হাইজ্যাকার ইত্যাদি হয়ে অশিক্ষা ও অরাজকতার দিকে চলে যাক। আর এটা যে শুধু নেতা-নেত্রীদের দ্বারাই হচ্ছে তাও পুরোপুরি মনে হয় না, বরং এর পেছনে বিদেশী ষড়যন্ত্রেও কাজ করছে বলে আমার মনে হয়। কারণ বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়ে উঠুক, এটা আমাদের পাশ্চাত্য বন্ধুরা (?) যেমন চায় না, আমাদের প্রতিবেশী অনেক বন্ধুও (?) তা চায় না।

গণতন্ত্রের নামে অস্ত্রের মহড়া চলছে। এক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও নাকি বলেছিলো, 'অস্ত্র তাদের কাছে থাকলে আমাদের কাছেও আছে। দেখা যাবে কে কতোটা প্রদর্শন করতে পারে?' এই ভাষ্য যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে জাতিকে নতুন করে ভাবতে হবে নির্বাচন সম্পর্কে। অস্ত্র সরকারি দলের কাছে যেমন আছে, বিরোধীদলের কাছেও তেমনি আছে। এ কথা সচেতন নাগরিকরা এমনিতেই ভালো করে জানেন। তারপর সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাও যার হাতে খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ন্যস্ত; তার মুখে উলঙ্গভাবে অস্ত্রের ঘোষণায় দেশ কোন দিকে যাচ্ছে তা বুঝতে কোনো সচেতন নাগরিকের জন্য কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

অন্যের মিটিং-মিছিল ও অফিস কক্ষে বোমা হামলা করা, মানুষের রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় মেতে উঠা, আমার বিরোধীকে আমার এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা, বিরোধীদলীয় নেত্রীর রাজনৈতিক সফর ঠেকিয়ে দেয়া, এমনকি বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করা- এটাই মূলত গণতন্ত্র। এ কথা বুঝতে জনগণের খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না। এরই নাম যেহেতু গণতন্ত্র, তাহলে বলা যায় জনগণ এই গণতন্ত্র চায় না। এ কথা উচ্চকণ্ঠে বলা যায়। যে কোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়াই যদি রাজনীতির উদ্দেশ্য হয়, দেশের কল্যাণে বা মঙ্গলের চিন্তা কারও মধ্যে না থাকে, তাহলে সে রাজনীতির কী দরকার? টাকা আর পিস্তলের জোরে ক্ষমতায় যাওয়ার ট্র্যাডিশন বেশ কিছুদিন থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। দলের ৩০ বছরের নিষ্ঠাবান গরিব নেতাকর্মীদের মনোনয়ন দেয়া হয় না। দেয়া হয় অসৎ উপায়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া একশ্রেণীর অসৎ টাকার কুমিরকে। কারণ টাকা ও পিস্তলের জোরে হয়ে যেতে পারে এই ভাবনায়। আর এই মনোভাব সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান। এমনটির চেয়ে সামরিক শাসন অনেক শ্রেয়। যদি সৎ হয় তাহলে কোনো কথাই নেই সোনায় সোহাগা, আর যদি সৎ না হয়, তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় দেশের ক্ষতি হলেও জনগণের উপর তার ছাপ সরাসরি পড়ে না, পড়ে পরোক্ষভাবে। এমতাবস্থায় এই তথাকথিত গণতন্ত্রের অসারতার কথা কি কাউকে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে?

এই পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের আবার বহু রূপ আছে। আমেরিকায় এর রূপ-রূপায়ন এক রকম, ব্রিটেন-ফ্রান্স ইত্যাদি ইউরোপীয় গণতন্ত্রের রূপ আরেক রকম। অর্থাৎ যার যার দেশে তাদের স্বার্থ অনুযায়ী এই গণতন্ত্রেকে কেটে-ছেঁটে সাইজ করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এই গণতন্ত্রের অসারতার কথা কারও বুঝতে আর বাকি থাকলো না। এবার আসুন, এই গণতন্ত্রে কি সত্যিই ম্যাজরিটির ভোটে বিজয়ী হয়ে দেশ শাসন করা হচ্ছে? নাকি মাইনরটির ভোটে পাস করে ম্যাজরিটির উপর শাসন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, তা একটু খতিয়ে দেখি। প্রথমে আমরা দেখতে পাই, টোটাল ভোটারের শতকরা ৫৫ ভাগ ভোট কাস্ট করাতেও প্রশাসন ও প্রার্থীদের পক্ষে হিমশিম খেতে হয়। এর কারণ হিসেবে অনেকেই অশিক্ষা, কম শিক্ষা ইত্যাদিকে দায়ী করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয় তা সত্য নয়। বরং জনগণের হতাশাই এর মূল কারণ বলে আমি মনে করি। কারণ, তারা দীর্ঘ বয়সে ব্রিটিশ শাসন দেখেছে, দেখেছে পাকিস্তানের শাসন, এরপর বাংলাদেশেও বহুজনের বহু সাদা-কালো, লাল-নীল ইত্যাদি রংয়ের শাসনও তারা দেখেছে। কিন্তু জনগণের আশা-আকাঙ্খা পূরণ করার মতো কোনো শাসনকেই তারা দেখতে পায়নি। জনগণ যে তিমিরে সে তিমিরেই পড়ে আছে। মাঝখানে যারাই ক্ষমতার ছোঁয়া পেয়েছে, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে দেখেছে তাদের জনগণ। তাই তারা 'ভোট করে কী হবে'? এই এক মনোচিন্তার কারণে ভোট থেকে বিরত থাকাকে শ্রেয় বলে মনে করছে।

ভোটের ব্যাপারে গণস্বতঃস্ফূর্ততা পরিলক্ষিত না হওয়ার এই কারণটিই আমার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। তারপর যাওবা ৫৫ ভাগ ভোট কাস্ট করানো হয়, তার মধ্যে যদি ৪ জন প্রার্থী থাকে, তাহলে দেখা যায়, বিজয়ী ব্যক্তিটি মাত্র ১৪/১৫ ভাগ ভোট পেয়েও বিজয়ী হতে পারে। বাকিদের কেউ দশভাগ, কেউ আটভাগ, বিভিন্নভাবে পেয়ে পরাস্ত হলো বটে, কিন্তু এই পরাজিত তিনজনের সম্মিলিত ভোটের সংখ্যা বিজয়ী ব্যক্তির প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা থেকে অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও মাইনরটির ভোটে বিজয়ী ব্যক্তিটি এই ম্যাজরিটিকেও শাসন করছে এবং বাকি ৪৫ ভাগকে (যারা ভোট দেয়নি) তাদেরকেও শাসন করছে। তাহলে দেখা যায় শতকরা ১৪/১৫ ভাগ ভোটে বিজয়ী ব্যক্তিটি শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষের উপর মাইনরটি শাসনকে চাপিয়ে দিচ্ছে। একেই ম্যাজরিটির শাসন বা গণতন্ত্রের শাসন বলা হচ্ছে। অথচ সম্পূর্ণ মাইনরটির শাসন ম্যাজরিটির উপর চাপানো হচ্ছে।

আবার এই গণতন্ত্রে বোকা আর জ্ঞানী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সৎ-অসৎ, চোর-ডাকাত সবার ভোটকেই সমভাবে মর্যাদা দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ভোট আর একজন ডাকাতের ভোটকে যে গণতন্ত্রে একই মাপে মূল্যায়ন করা হয়, সে গণতন্ত্রের অসারতার কথা যুক্তি দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন হয় না।

ইসলাম এ ব্যাপারে 'আহলুল হল্লে ওয়ালআকদ' এর নির্বাচনের কথা বলে। যাকে এক কথায় শুরায়ি নিযাম বলা হয়। এদের নির্বাচনকে বাকি সাধারণ মানুষ মেনে নেবে। এটাই ইসলামের প্রথম যুগ থেকে চলে আসতে দেখা যায়।

বঙ্গদেশে আলেমদের রাজনীতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র

আমরা ছাত্র জীবনে মাইবুযি কিতাবে সিয়াসত বা রাজনীতিকে তিন ভাগে বিভক্ত করতে দেখেছি। তাহযিবে আখলাক, তাদবিরে মানযিল ও সিয়াসতে মুদুন। তাহযিবে আখলাক অর্থ আত্মশুদ্ধি, আর তাদবিরে মানযিল অর্থ পারিবারিক শুদ্ধি, তৃতীয় ধাপ হচ্ছে সিয়াসতে মুদুন বা নগরকেন্দ্রিক রাজনীতি। তাহলে বোঝা গেল, ব্যক্তিশুদ্ধি বা আত্মশুদ্ধি রাজনীতির প্রথম স্তর বা ধাপ। অন্যদিকে পারিবারিক শুদ্ধি বা সামাজিক শুদ্ধি হচ্ছে রাজনীতির দ্বিতীয় স্তর। আর নগরকেন্দ্রিক বা বৃহত্তর সমাজ অথবা রাষ্ট্রীয় শুদ্ধি রাজনীতির তৃতীয় ধাপ বা শেষ স্তর।

আমরা ছোটোবেলায় যে ভূগোল বই পড়েছি, তাতে রয়েছে কয়েকটি ব্যক্তি নিয়ে একটি পরিবার গঠিত হয়। আর কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি মহল্লা বা গ্রাম গঠিত হয়। আবার কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ইউনিয়ন, আর কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে একটি থানা গঠিত হয়। কয়েকটি থানা নিয়ে একটি মহকুমা, আবার কয়েকটি মহকুমা নিয়ে একটি জেলা, আর কয়েকটি জেলার সমন্বয়ে একটি বিভাগ, আবার কয়েকটি বিভাগ নিয়ে একটি প্রদেশ, আর কয়েকটি প্রদেশ নিয়েই একটি দেশ গঠিত হয়। আর কয়েকটি দেশ নিয়ে একটি মহাদেশ আর ওই সকল মহাদেশের সমন্বিত নাম আজকের বিশ্ব। তাহলে বোঝা গেল রাজনীতির স্তর বিন্যাসের ব্যাপারে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে ইসলামি দর্শনের হুবহু মিল রয়েছে। ধাপে ধাপে তার বিকাশও হয়।

মানুষের চব্বিশ ঘন্টার প্রতিটি মুহূর্তের ব্যাপারেই ইসলামের এক সুমহান নির্দেশনা রয়েছে। রয়েছে শৈশব-কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্যের ব্যাপারেও নীতিমালা। তাই একটি শিশুর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই রয়েছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ছায়া। এজন্যই ইসলামকে মানবজীবনের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বলা হয়। অর্থাৎ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, চাকরি-বাকরি বা বিয়ে-শাদি ইত্যাকার যাবতীয় বিষয়েই ইসলামের কিছু না কিছু ফরমান রয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় এসব স্তরকেই রাজনীতি বলা হয়।

স্পষ্টতই অনুধাবন হচ্ছে, মানুষের জন্য কখনো রাজনীতি বিবর্জিত কোনো অবস্থাই নেই। মানুষের প্রতিটি স্তরেই রাজনীতি বিরাজমান। রাজনীতির এই সংজ্ঞা ও স্তর বিন্যাস বোঝার পর আমরা বলতে পারি যে, ইসলামে রাজনীতির সংজ্ঞা অনেক ব্যাপক। মানুষ যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, তার রাজনীতি মুক্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই। সে পড়ছে বা পড়াচ্ছে, সে ক্ষেত-খামারে চাষাবাদ করছে বা ব্যবসা-বানিজ্য করছে, সে মালিক হোক বা মজুর, সে গরীব হোক বা ধনী, শাসক হোক বা শাসিত, সর্বাবস্থায় সে রাজনীতিতে লিপ্ত রয়েছে।

মুঘল সম্রাট শাহজাহান কন্যা জেবুন্নেছার মারাত্মক কোনো রোগ এক ইংরেজ ডাক্তারের উসিলায় ভালো হলে পরে সম্রাট খুশি হয়ে তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। ডাক্তার পুরস্কারস্বরূপ তার জাতির জন্য একটি বানিজ্য সুবিধার অনুমতি প্রার্থনা করেন। ধুরন্ধর ইংরেজ ডাক্তার সে সুবিধা মঞ্জুর করে নেয়ার মাধ্যমে প্রায় সাতশ বছর যাবত মুসলিম শাসিত ভারত উপমহাদেশটি ইংরেজ বেনিয়াদের গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

এরপর হযরত শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. এর ফর্মুলা অনুযায়ী তাঁর পুত্র হযরত শাহ আব্দুল আযিয রহ. এর দারুল হারবের ফতওয়ার মাধ্যমে আযাদী আন্দোলন আরম্ভ হয়। এক পর্যায়ে শাহ আব্দুল আযিয সাহেবের অন্যতম খলিফা হযরত সৈয়দ আহমদ বেরেলবি রহ. এর জিহাদি আন্দোলন জোরদার হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতে ইসলামি হুকুমত পুনরায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং তা বেশ কয়েক বছর যাবত চালুও থাকে। কিন্তু ইংরেজদের কূটচালে হিন্দু শিখদের ষড়যন্ত্রের ফলে ঐতিহাসিক বালাকোট যুদ্ধে তার সাময়ীক পরিসমাপ্তি ঘটলেও ইতিহাস সাক্ষী যে, হযরত সৈয়দ আহমদ বেরেলবির শিষ্য-শাগরিদ ও খলিফাদের মাধ্যমেই বঙ্গদেশে ইসলামী রাজনীতির জোয়ার আরম্ভ হয়।

ইংরেজ বিরোধী জিহাদ চলাকালে তার খলিফা হযরত মাওলানা কারামত আলি জৈনপুরি রহ. কে তিনি ইসলামি দাওয়াতি মিশন এবং জিহাদের জন্য রসদ সাপ্লাইয়ের কাজেই বঙ্গদেশে প্রেরণ করেন। তার মাধ্যমে হাজার হাজার মুসলমান জিহাদি কাফেলায় যেমন শরিক হয়েছিল তেমনি লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে এসে সহিহ দ্বীনের উপর আমল করারও সুযোগ পায়।

ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লার নায়ক হাজি নেছার আলি ওরফে তিতুমীর তাঁরই একজন স্বনামধন্য শিষ্য ছিলেন। ফরিদপুরের ঐতিহাসিক ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজি শরিয়তুল্লাহও নাকি তাঁর ভাব শিষ্য ছিলেন। তাঁদের মাধ্যমে বঙ্গদেশে রাজনীতির প্রথম দুই ধাপে যেমন কাজ হয়েছে, তৃতীয় ধাপের কাজটি তার চাইতেও বেশী সফল হয়েছে। কুখ্যাত ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ-জিহাদের ফলে ইতিহাসেও তাঁরা অমর হয়ে আছেন। ফকির মজনু শাহ'র আন্দোলনও কম নাড়া দেয়নি তখন। তঁদের কালে ইংরেজরা বহু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারবার।

নোয়াখালীর হযরত মাওলানা ইমামুদ্দিন রহ. হযরত সৈয়দ আহমদ রহ. এর অন্যতম খলিফা ও বালাকোট যুদ্ধের গাজি ছিলেন। পরে তিনি দেশে ফিরে হযরত মাওলানা কারামত আলি জৈনপুরির উস্তাদ ও পীর হিসেবেও বরিত হন। নোয়াখালীর তৎকালীন তাহযিব-তামাদ্দুনে তার অবদান অনস্বীকার্য হয়ে আছে। বঙ্গদেশে ইসলামি রেনেসাঁর দুই অগ্রপথিক শর্ষিনা ও ফুরফুরার পীর হযরত মাওলানা নেছার উদ্দিন সাহেব ও হযরত মাওলানা আবু বকর সাহেবের দাদা পীর যিনি ছিলেন তিনিও হযরত সৈয়দ আহমদ বেরেলবির অন্যতম খলিফা ও বালাকোটের গাজি ছিলেন। যাঁর নাম সূফী নূর মোহাম্মদ রহ.। তিনি বর্তমান চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পরবর্তী আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের মাধ্যমে বঙ্গদেশে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটিয়েছেন।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া চনুতির শাহ আহমদ সাহেবদের পূর্বপুরুষ হযরত মাওলানা আব্দুল হাকীমও হযরত সৈয়দ আহমদ রহ. এর অন্যতম খলিফা ও বালাকোটের গাজি ছিলেন। বর্তমান দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রকাশক জনাব মাহফুজ আনামের বাবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ও কথাসাহিত্যিক মরহুম আবুল মানসুর আহমদের দাদা এবং নানা তারা দু'জনও নাকি বালাকোটের গাজি ছিলেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহতে তৎকালে ইসলামি সিয়াসতে তাঁরা বড় রকমের অবদান রাখতে সক্ষম হন। আবুল মানসুর আহমদ সাহেব তার আত্মজীবনীতে তাদের ব্যাপারে গাজি সাহেব বলে বলে অনেক আলোচনা করেছেন। এরা সবাই হযরত সৈয়দ আহমদ রহ. এর শিস্যত্ব গ্রহণ করে তৎকালীন বাংলায় রাজনীতির ত্রিধারাতেই সফল ভূমিকা রেখেছেন।

১৮৫৭ সনের সিপাহী বিদ্রোহের পর কতো হাজার আলেমকে যে গ্র্যান্ডট্রাংক রোডের দুই ধারে অবস্থিত গাছের সাথে ঝুলিয়ে ও পেরেক মেরে শহীদ করা হয়েছে তার সঠিক হিসাব কোনো ঐতিহাসিক দিতে পারবেনা। হযরত মোহাম্মদ মিয়া রচিত 'উলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযি' গ্রন্থে সবিস্তারে তার কিছু বর্ণিত হয়েছে। ইংরেজ ঐতিহাসিক ডব্লিউ হান্টারের 'দি ইন্ডিয়ান মুসলমান্স' গ্রন্থের বর্ণনানুযায়ী বোঝা যায়, চট্টগ্রাম থেকে আরম্ভ করে কাবুল সীমান্ত খাইবার গিরিপথ পর্যন্ত বিস্তৃত গ্র্যান্ডট্রাংক রোডের দুইপাশে অবস্থিত একটি গাছও এমন ছিলনা, যাতে কোনো না কোনো আলেমকে লটকানো হয়নি।

আলেমদের এসব নির্যাতনের পর সম্মুখ যুদ্ধ পরিহার করে ডিফেন্স করার স্বার্থে কর্মকৌশল পরিবর্তন করা হয় এবং ১৮৬৬ সনে হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ. এর উদ্যোগে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আযাদি আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপের কাজ আরম্ভ হয়। আযাদি আন্দোলের পরিবর্তিত এই ধারায় বঙ্গদেশে বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলায় ১৯০১ সনে হযরত মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ রহ. ও হযরত মাওলানা হাবিবুল্লাহ রহ. কর্তৃক চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসা স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুভ এ ধারা আরম্ভ হয়। আযাদি আন্দোলনের অন্যতম সিংহপুরুষ শায়খুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দি রহ. এর অন্যতম শিষ্য হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদ সন্ধিপি রহ. ও হযরত মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ সন্ধিপি রহ. এর মাধমে হাজার হাজার ইসলামি মনীষী ও মুজাহিদ তৈরী হয়ে বঙ্গদেশে ওই ধারাকে সমুন্নত রাখতে প্রয়াস পান।

আযাদী আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯০৫ সালে ঢাকায় নওয়াব সলিমুল্লাহ খাঁর মাধ্যমে মুসলিমলীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করলে আন্দোলনের এই ধারাটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যেহেতু মুসলিমলীগের অন্যতম সমর্থক ও তাত্ত্বিক ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম বুযুর্গ আলেমে দীন মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ. এবং এশিয়ার অন্যতম মুহাক্কিক ও দার্শনিক আল্লামা ড. মুহাম্মদ ইকবাল; তাই আলেমদের একটা অংশ মুসলিমলীগকে সমর্থন জানায়।

অন্যদিকে শায়খুল হিন্দের অন্যতম জানশিন আযাদি আন্দোলনের অন্যতম বীর পুরুষ শায়খুল আরব ওয়ালআজম হযরত মাওলানা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানিসহ বেশ কিছু বড় মাপের বুযুর্গ আলেমেদ্বীন খণ্ডিত ভারতের বিরুদ্ধে অখণ্ড ভারত আন্দোলনের পক্ষে থাকায় বঙ্গদেশের শীর্ষ আলেমদের একটি অংশ উলামায়ে হিন্দের সদস্য হয়ে অখণ্ড ভারত আন্দোলনে সক্রিয় হন। হযরত থানবি রহ. এর বক্তব্য ছিল, মুসলমানদের স্বাধীন একটা ভূখণ্ডের অনেক প্রয়োজন। যেখানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা তথা কুরআনি হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা যায়। পক্ষান্তরে হযরত মাদানি রহ. এর বক্তব্য ছিল, মুসলমানদের আলাদা ভূখণ্ড এবং সেখানে ইসলামি হুকুমতের বাস্তবায়ন একজন মুসলিম হিসেবে কে না চায়? তবে কথা হচ্ছে, যে মেজরিটির ভিত্তিতে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করবে, সেই মেজরিটি মুসলমানদের সাথে সেখানে মাইনরিটি হিন্দুরাও তো থেকে যাবে, তাদেরকে হেঁকে এনে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের হিন্দুস্তানে তো পাঠিয়ে দেয়া যাবে না। ঠিক তদ্রুপ হিন্দুদের হিন্দুস্তানেও তো সংখ্যালঘু মুসলমানদের একই অবস্থা হবে। তাদেরকেও ছেঁকে নিয়ে পাকিস্তানে পাঠানো সম্ভব নয়। তাহলে এই দুই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থা কী দাঁড়াবে? যদি সংখ্যালঘুদের ছেঁকে এনে যার যার কাঙ্খিত দেশে পাঠানো যেতো, তবে না হয় বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারতো, কিন্তু এটা তো কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। তাহলে একটি অবাস্তব ও অসম্ভব বিষয়কে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা কীভাবে করা যায়? যা কোনো বিবেকবান মানুষ করতে পারে না। তিনি আরো মনে করতেন, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর মাধ্যমে ইসলামের বাস্তবায়ন কোনো দিন সম্ভব নয়। ইংরেজ দেশে ইংরেজদের ভাবধারায় গঠিত মন-মস্তিষ্কের অধিকারী জিন্নাহ সাহেব কোনো দিন ইসলাম বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই আলেমদের একটি বিরাট অংশ পাকিস্তানের জন্মলগ্নে কৃত ওয়াদা পূরণের দাবীতে নেযামে ইসলাম পার্টি এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে দু'টি দল গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব নেযামে ইসলামের কর্ণধার হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ. আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তার সাথে খতিবে আযম হযরত মাওলানা সিদ্দিক আহমদ রহ.ও কাঁধে কাঁধ মেলান। খতিবে আযম রহ. একবার অখণ্ড পাকিস্তানের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে এম,এল, এ পদেও বরিত হন। তাঁর সাথে নেযামে ইসলামের অনেক সদস্যই তখন সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পূর্ব পাকিস্তান অংশের আলেমরাও সবসময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। তাঁদের অধিকাংশ আলেম ছিলেন সিলেটের বড় বড় পীর মাশায়েখ ও বুযুর্গ আলেমরা। যেমন হযরত মাদানির অন্যতম খলীফা হযরত শায়খে বাগা, হযরত মাওলানা মোশাহেদ আলী রহ, ও কৌড়িয়ার শেখ সাহেব হযরত মাওলানা আব্দুল করিম, বরুনার পীর সাহেব হযরত মাওলানা লুৎফর রহমান সাহেব প্রমুখ বুযুর্গ ব্যক্তিবর্গ।

পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তের সভাপতি ছিলেন ঐতিহাসিক ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজি শরিয়তুল্লাহর উত্তরপুরুষ হযরত মাওলানা পীর মুহসিনুদ্দিন দুদু মিয়া এবং জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন ঢাকা আরজাবাদ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী রহ.। যশোরের প্রখ্যাত বুযুর্গ হযরত মাওলানা আবুল হাসান যশোরী রহ.ও জমিয়তের সাথে আজীবন সম্পৃক্ত ছিলেন। ময়মনসিংহের হযরত মাওলানা ফয়জুর রহমান ও নেত্রকোণার হযরত মাওলানা মঞ্জুর আহমদ সাহেব ছিলেন নেযামে ইসলাম পার্টির অন্যতম বড় নেতা। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব নেযামে ইসলামের তাত্ত্বিক ও বড় নেতা ছিলেন। কক্সবাজারের মৌলভী ফরিদ আহমদ চৌধুরী নেযামে ইসলামের বড় নেতা হওয়ার সাথে সাথে পাকিস্তান সংসদের একজন অভিজ্ঞ পার্লমেন্টেরিয়ানও ছিলেন। ফেনী শর্শদী মাদরাসার বুযুর্গ আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা নজীর আহমদ শহীদ রহ. আজীবন নেযামে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। লালবাগ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. (সদর সাহেব হুজুর) নেযামে ইসলামের অন্যতম তাত্ত্বিক ও পরামর্শদাতা বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব। এখানে অনেক আলেমের নামই বাদ পড়ে যাচ্ছে হয়তো। কেননা, হাজার হাজার আলেমের মধ্যে ক'জনের জীবন সম্পর্কেই বা আমার জানা আছে।

এই রাজনীতিতে একটা মজার ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় যে, যারা বৃটিশ ভারতে মুসলিমলীগ বা পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিলেন তাঁদের সংখ্যাগুরু আলেমকে দেখা যায়, পাকিস্তান হওয়ার পর তাঁরা নেযামে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত থেকে রাজনীতি করেছেন। অপরদিকে যারা বৃটিশ ভারতে অখণ্ড ভারতের পক্ষে রাজনীতি করেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশ আলেমকে দেখা যায় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পরিবর্তে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করতে।

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কালে ওয়াদা কুরআনি হুকুমত বাস্তবায়ন করা যখন চরম মোনাফেকিতে পর্যবসিত হলো এবং স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খাঁর উপদেষ্টা ড. ফজলুর রহমানের 'ইসলাম' নামীয় অনৈসলামি একটি গ্রন্থে ইসলামের বিরুদ্ধে অনেক কিছু প্রকাশ পেলো, তখন আবার বাংলার আলেম সমাজ সোচ্চার হয়ে গর্জে উঠলেন। আমার খুব মনে পড়ছে, নেযামে ইসলামের অন্যতম নেতা খতিবে আযম হযরত মাওলানা সিদ্দিক আহমদ রহ. ও মৌলভী ফরিদ আহমদ চৌধুরীসহ বড়ো বড়ো নেতাদের আহ্বানে রাজপথ, মাঠ-ঘাট কাঁপানো সভা-সমিতি তখন বাংলাকে আবার কাঁপিয়ে তুলেছিলো।

জেনারেল আইয়ুব খাঁর মসনদ যখন তাঁদের সংগ্রামের তোড়ে নড়বড়ে হয়ে ওঠে, তখন ওই আন্দোলনে নতুন মাত্রা হিসেবে যোগ হয় আওয়ামীলীগের ৬ দফা আন্দোলন ও ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন। এতে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে গণবিস্ফোরণের রূপ নেয়। এবং আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হয়ে জেনারেল ইয়াহইয়া খানকে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে সাময়িকভাবে জনরোষ থেকে নিস্তার পান। কিন্তু দুঃখের বিষয় আলেমদের সৃষ্ট এই আন্দোলনের ঘোড়ায় কোনো যোগ্য ঘোড়সওয়ার না থাকায় শেখ মুজিব ওই ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বসে এবং ইসলামি বিস্ফোরণের পরিবর্তে একটি সাধারণ গণবিস্ফোরণের জন্ম দেন। ফলে তিনি তার দেশ পূর্ব পাকিস্তানে শুধু দুইটি আসন ব্যতীত বাকী সব আসনেই জয়ী হয়ে যান। কিন্তু তারপরও পশ্চিমারা তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টাল-বাহানা শুরু করায় আবারো আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্র গতিতে এগিয়ে যায়। এক পর্যায়ে ঢাকায় প্রহসনমূলক গোলবৈঠক ডাকা হয় বটে; কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহইয়া তখন গোপনে পশ্চিম থেকে পূর্বে সেনা সমাবেশ বাড়াতে থাকে এবং সেই ঐতিহাসিক ২৫শে মার্চের কালো রাতে ঢাকা আক্রমণ করে বসে। ফলে স্বায়ত্বশাসন চাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের ঘাড়ে অতর্কিতভাবে একটি যুদ্ধ চেপে বসে। আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধের আগাম প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা না থাকায় এবং যুদ্ধের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ পরিষ্কার ছিলো না বিধায় যুদ্ধের ব্যাপারে এখানকার আলেম সমাজ কিছুটা দ্বিধা-সংকোচে পড়ে যান। ফলে অনেক আলেম অখণ্ড পাকিস্তানের আশায় জামাত-মুসলিমলীগের সাথে হাত মেলান। কিন্তু অধিকাংশ আলেম খামোশ ও নীরব ভূমিকা পালন করেন।

গোলটেবিল বৈঠক শেষে নিখিল পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সেক্রেটারী জেনারেল হযরত মাওলানা মুফতি মাহমুদ সাহেব পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তের সভাপতি পীর মুহসিনুদ্দিন দুদুমিয়ার সিদ্ধেশ্বরীর বাসভবনে এখানকার জমিয়ত নেতা ও কর্মীদের কিন্তু ২৫শে মার্চের পূর্বেই বৈঠক সফল না হওয়ার বিষয় সম্পর্কে জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, আপনারা আপনাদের দেশীয় স্বার্থের সাথে মিলেমিশে কাজ করবেন। ফলে যুদ্ধের সময় এখানকার অধিকাংশ জমিয়ত নেতা স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করেন। জমিয়তের অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা জনাব মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ সাহেব তাঁদের অন্যতম ছিলেন। অন্যদিকে জমিয়তের সভাপতি পীর দুদুমিয়া সাহেব ও সহসভাপতি জনাব মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সাহেবরা হতাহতের সংখ্যা কম রাখার স্বার্থে এবং লুটতরাজ ও নৈরাজ্য বন্ধ রাখার স্বার্থে যুদ্ধের এক পর্যায়ে ঢাকার শান্তি কমিটিতে যোগ দেন এবং রাও ফরমান আলী খান ও জেনারেল টিক্কা খানের সাথে সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক চিত্র তুলে ধরেন।

এই যুদ্ধ যে ইসলাম বনাম অনৈসলামের যুদ্ধ ছিলো না; বরং দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য ও জুলুমের বিরুদ্ধে ছিলো, একথাটা পরিস্কার না হওয়ায় জামায়াতে ইসলামের সাথে হাত মেলানো নেযামে ইসলামের অনেক বড়ো বড়ো আলেমকে মুক্তিযোদ্ধারা শহিদ করে দিয়েছিলো। যেমন শর্শদীর হযরত মাওলানা নজীর আহমদ সাহেবকে তারা উযুর সময় গুলি করে হত্যা করে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের চার স্তম্ভের একটি স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতা থাকায় এবং আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে যে কোনো ইসলামি রাজনীতি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণায় এবং অধিকাংশ বন্ধ থাকা মাদরাসা সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রকম বক্তব্য না থাকায়, আলেমদের বিরাট একটা অংশ আওয়ামীলীগের বিপক্ষে অবস্থান নেন। ইতোমধ্যে সরকারের লাল বাহিনী, সবুজ বাহিনী ও রক্ষী বাহিনীর জুলুম নির্যাতনের ফলে দেশ স্বাধীন হয়ে একটা অরাজক দেশে পরিণত হয়।

শেষ পর্যন্ত মেজর ডালিম, কর্ণেল ফারুক ও রশিদের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সেই নির্মম রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তনের বেশ কিছুদিন পর জিয়াউর রহমান সাহেব যখন দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে আসেন এবং প্রথমে ফোরাম ও জাগদল এবং আরো পরে বিএনপি গঠন করেন এবং ইসলামি রাজনীতিকে ছাড় দিয়ে দেন, তখন আবার আলেম সমাজের সেই অংশটিকে মুসলিমলীগ আর বিএনপি একই ঘরানার হওয়াতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে একটু বেশি ঝুঁকে পড়তে দেখা যায়। খতিবে আযম রহ. তো সরাসরি জামায়াতের বিকল্প আইডিএল এর সভাপতি পর্যন্ত হন। কিন্তু জামায়াত যখন তার সাথে চরম বেআদবি ও মোনাফেকি করে বসে, তখন হযরতের টনক নড়ে। কিন্তু ততক্ষণে তারা হযরতের ঘাড়ে বসে তাদের সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া পথকে অনেকটা প্রশস্ত করে নিতে সক্ষম হয়ে যায়। অন্যদিকে আওয়ামীলীগ তাদের রাজনৈতিক দর্শনের কারণেই আলেম সমাজকে তাদের প্রতি কখনো আকৃষ্ট করতে পেরেছে বলে দেখা যায় না।

১৯৮১ এর পর মে মাসের ৩০ তারিখে প্রেসিডেন্ট জিয়া আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর ৮১ এর শেষের দিকে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হক্কানি আলেমদের পক্ষ থেকে বাংলার বয়োবৃদ্ধ মহান বুযুর্গ আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে হক্কানি আলেম সমাজের মাঝে আবার এক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়। শুধু আলেম সমাজই নয় সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ইসলামী রাজনীতির এই তৃতীয় ধাপে এক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। নির্বাচনে হাফেজ্জী হুজুর তৃতীয় স্থান অধিকার করলেও সরকারের দেখানো মাত্র তিন লাখ আশি হাজার ভোট পেয়ে তিনি থার্ড হননি, তিনি নাকি তখন প্রায় পনের লক্ষ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন।

এই তথ্যটি আমাকে পরবর্তী সময়ে হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনের ভরা জোয়ারের সময় হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসা রাজনীতিবিদ জনাব কাজি জাফর আহমদ সাহেব দিয়েছিলেন। (ইসলামের প্রতি মানুষের বেশি সমর্থন দেখার কারণে তৎকালীন বিএনপি সরকার নাকি তার সঠিক পরিসংখ্যান গোপন রেখে কম করে দেখিয়েছিলো) নির্বাচন ও নির্বচনোত্তর খেলাফত আন্দোলনে যেহেতু আমার সরাসরি হুজুরের সাথে থাকার সৌভাগ্য নসীব হয়েছিল আমি হলফ করে বলতে পারি, আমরা যদি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সততা দিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিতে পারতাম, তাহলে আজ মনে হয় দেশের চিত্র ভিন্ন রকম হতে পারতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এতো বড়ো গণজোয়ারকে আমরা আলেম সমাজই নিজ নিজ স্বার্থের কারণে ধরে রাখতে পারিনি। বরং হযরত হাফেজ্জী হুজুরের জীবদ্দশায়ই খেলাফত আন্দোলন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

এ ভাঙ্গনের ফলে সৎ ও হকপন্থী অধিকাংশ আলেমরাই আবার রাজনীতির এই তৃতীয় ধাপ থেকে সরে এসে প্রথম দুই ধাপে কাজ করতে প্রয়াস পান। এ থেকে আমি যা বুঝতে পেরেছি তা হচ্ছে, রাজনীতির এই তৃতীয় ধাপে কাজ করতে হলে প্রথম দুই ধাপ পরিপূর্ণভাবে অতিক্রম করে আসতে হবে। হাফেজ্জী হুজুরের মতো শুধু দু'একজন নেতার অতিক্রম দিয়ে গোটা জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। কমপক্ষে জাতির কর্ণধার আলেম সমাজের একটি বিরাট অংশকে এই দুই ধাপ পূর্ণাঙ্গভাবে অতিক্রম করতে হবে। তা না হলে খেলাফতের বেলায় যা দেখেছি, সব সময় তাই দেখতে হবে।

আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, উপমহাদেশে যে সমস্ত বড়ো বড়ো আলেম-মনীষী রাজনীতির এই তৃতীয় ধাপে কাজ করেছেন, তাঁদের অধিকাংশকেই শেষ জীবনে এই ধাপে আর কাজ করতে দেখা যায়নি। এমনকি অনেককে নিরাশ প্রকাশ করে প্রথম দুই ধাপে কাজ করার ব্যাপারে তাঁদের ভক্ত মুরিদদের অসিয়ত পর্যন্ত করে যেতে দেখা যায়। যেমন আযাদী আন্দোলনের পুরোধা শাইখুল হিন্দ হযরত মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ. ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে মাল্টা জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর হাজার হাজার ভক্ত-মুরিদ ও স্বাধীনতাকামী আলেম শিষ্যদেরকে যে অসিয়ত করেছিলেন তা ছিলো, তিনি এ পর্যন্ত যা যা করেছেন তা তেমন কোনো কার্যকরী ফল লাভে সক্ষম হয়নি। এখন সবাই যেন বেশি বেশি কোরআনি শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করে। তবেই স্বাধীনতা তরান্বিত হবে।

হযরত মাওলানা আতহার আলী সাহেব তো তার একমাত্র ছেলেকে এই তৃতীয় ধাপে রাজনীতির ব্যাপারে নিষেধই করে গেছেন। খতিবে আযম রহ.ও মোটামুটি তাই করেছিলেন। এ সকল বিষয় বিবেচনা করে আমার মনে হয়েছে, রাজনীতির এই ধাপে কাজ করার উপযুক্ততা ও যোগ্যতা অর্জন ব্যতীত এই অংশগ্রহণ করাই উচিৎ নয়।

বিষয়টি বোধগম্য হওয়ার জন্য বেশি দূর যাওয়া লাগবে না। আমাদের বর্তমান আলেম সমাজের বর্তমান রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলেই তা সহজে বুঝে আসবে।

নোয়াখালীর প্রখ্যাত বুজুর্গ আলেম পীরে কামেল উজানীর হযরত কারি ইবরাহীম সাহেব রহ. ও চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা বুযুর্গ হযরত মাওলানা আজিজুল হক সাহেবের মতো শত শত বুযুর্গ মনীষীরা আধ্যাত্মিকভাবে যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন তাও রাজনীতির প্রথম দুই ধাপেরই কাজ ছিলো। কাজেই এ কথা অনায়াসেই বলা যায় যে, আধুনিক বঙ্গদেশেও ইসলামী রেনেসাঁ সৃষ্টিতে এখানকার আলেম সমাজের ভূমিকা ইতিহাসে সব সময় অমর হয়ে থাকবে।

ইসলামী রাজনীতির নামে

'শেখ হাসিনার পতন ও পুনরায় ক্ষমতায় আসতে না পারার জন্য যে কোনো দলের সঙ্গে ঐক্য করতে পারি' এ কথা নাকি বলেছিলেন চরমোনাই মরহুম পীর সাহেব। শেখ হাসিনার পতনের জন্য অনেক দিন আগে থেকেই নাকি কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে সভা-সমিতি করে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। অথচ শেষমেশ দেখা গেল, শেখ হাসিনার পুনঃক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করতে নামানো এরশাদ সাহেবের সঙ্গেই জোটগঠন করলেন তিনি। একেই বলে প্রচলিত রাজনীতি। যার মধ্যে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। এই রাজনীতি যদি পীর সাহেবকেও করতে হয়, তাহলে তার এতদিনের সাধনারই বা কি হবে? আর মুরিদান ও সাধারণ মানুষই বা কোথায় যাবে?

ইসলামে রাজনীতি আছে, প্রচলিত রাজনীতি নেই। ইসলামী রাজনীতির সংজ্ঞা কিন্তু ভিন্ন। ইসলামী রাজনীতির তিন স্তরের প্রথম স্তর হচ্ছে, তাহযিবে আখলাক, ব্যক্তিশুদ্ধি বা আত্মশুদ্ধি। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে তাদবিরে মানযিল, পারিবারিক শুদ্ধি বা সামাজিক শুদ্ধি। তৃতীয় বা শেষ স্তর হচ্ছে সিয়াসতে মুদুন, নগরশুদ্ধি বা রাষ্ট্রীয় শুদ্ধি।

পীর সাহেব এতদিন রাজনীতি করছিলেন পীর-মুরিদির মাধ্যমে। কেননা, মুরিদানের আত্মশুদ্ধি বা ব্যক্তিশুদ্ধির মাধ্যমে আস্তে আস্তে পারিবারিক বা সামাজিক শুদ্ধিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রচলিত রাজনীতির ধাক্কায় আমও গেল ছালাও যাবে যাবে প্রায়। মহিলা নেতৃত্ব ইসলামে বৈধ নয় বলে দুই মহিলা নেতৃত্বের বিরুদ্ধেই সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন পীর সাহেব প্রথম দিকটায়। আবার জামায়াতবিরোধী ভূমিকায়ও অনমনীয়তার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি। জামায়াতে ইসলামী যে কোনো ইসলামী দল নয়, এ কথা তিনিই একটু একটু বড়ো গলায় বলতে শুরু করেছিলেন। মাঝখানে ভন্ড দেওয়ানবাগীর সঙ্গে যুদ্ধ-জিহাদ করেও পত্র-পত্রিকার হেড লাইনে উঠে এসেছিলেন তিনি। এতো কিছুর মধ্যেও ইসলামী ঐক্যজোটে আছেন আবার নেই, এমন একটা ভাব সব সময় লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। আবার ক্ষমতার লড়াইয়ে যুক্ত না হয়ে ইসলামের বিশুদ্ধ খেদমতে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক ইসলমি সংগঠন তাবলিগ জামাত সম্পর্কেও তাঁর কিছু বিরূপ মন্তব্য শোনা যাচ্ছিল। এতো সব বিরোধিতার পেছনে তার উদ্দেশ্য আমার মনে হয় একটাই ছিলো, আর তা হচ্ছে, তার খাঁটিত্ব ও বিশুদ্ধতা প্রমাণ করা। তার এই খাঁটি (?) নেতৃত্বের ভেতরে আরেকটি জিনিসও লুকিয়ে থাকতে পারে বলে আমার সন্দেহ হয়েছিল, আর তা হচ্ছে, আত্মঅহংবোধ বা অহংকার। যা হয়তো তিনিও টের করে উঠতে পারেননি। অন্যদিকে অহংকারকে কিন্তু আল্লাহ মোটেও বরদাশত করেন না। আমার যা মনে হয়, এ কারণেই হয়তো মহিলা কেলেংকারিসহ শত কেলেংকারি ও দুর্নীতিতে জড়িত এরশাদ সাহেবের সঙ্গে জোট বাঁধতে যাওয়ায় তার তুঙ্গে ওঠা রাজনৈতিক ইমেজ ধপাস করে ভুলুণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলো।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিলো যে, এরশাদের সঙ্গে জোটের কার্যকারিতা থাকুক আর নাই থাকুক, ভুলুণ্ঠিত ইমেজকে আর সহজে দাঁড় করানো যায়নি। অন্যদিকে এরশাদ সাহেবের ইমেজ তো অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছিলো। উপরন্তু জাতীয় পার্টি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আরো জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছিল।

এমতাবস্থায় চারদলীয় ঐক্যজোটে যাওয়ায় এরশাদ সাহেবের গণইমেজ বাড়তে শুরু করতে না করতেই তাতে করলেন তিনি কুঠারাঘাত। জনগণকে নেতা- নেত্রীরা যত বোকা মনে করে থাকেন, আসলে তারা তা নয়। নিজের জেল- জুলুম ও অবৈধ টাকা রক্ষাসহ যাবতীয় স্বার্থোদ্ধারের জন্য একবার হাসিনার আঁচলে আবার খালেদার আঁচলে, আবার হাসিনার সঙ্গে আঁতাতে যাওয়াকে জামায়াতের মতো এরশাদও রাজনীতি মনে করতে পারেন। কিন্তু জনগণ একে ধোঁকাবাজি বলেই মনে করে থাকে।

হাসিনার পতন ও হাসিনার পুনঃক্ষমতায়নে বাধা দিতে যুদ্ধ-জিহাদে নামা পীর সাহেব হাসিনার টোপ গেলা মন্ত্রে দীক্ষিত এরশাদের সঙ্গে জোট বেঁধে পরোক্ষভাবে হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে সহায়ক শক্তি হিসাবেই কাজ করছেন বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছিলো। কারণ, এই জোট কার ভোট কাটবে? চারদলীয় ঐক্যজোটের ভোটই তো কাটবে। আওয়ামীলীগের ভোট মোটেও কাটবে না। অন্যদিকে চারদলীয় শক্তিতে ভাটা দেখাতে পারলে নির্বাচনে আওয়ামী জাল-জালিয়াতি বিদেশী পর্যবেক্ষকদের কাছে সহনীয় করে তোলাই ছিলো এই জোটের মুখ্য উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে আওয়ামীলীগের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণে পীর সাহেবের ছেলে ও শাসনতন্ত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল লতীফ চৌধুরীকে দল থেকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার কথা শোনা গিয়েছিলো। বলা যায়, ওই সম্পর্ক বুঝি আরো গভীরে ছাপ রেখে গেছে।

যেই বুর্জোয়া নাশতান্ত্রিক ভোট প্রথার কথা ইসলামের কোথাও নেই, পীর সাহেবদের মতো লোকদের তা করতে হবে কেন? ইসলাম কি ভোটের মধ্যেই বন্দি হয়ে আছে নাকি? আর ইসলামে যে তওবার দুয়ার খোলা নেই তাও নয়। তবে সারা বছর আকাম-কুকাম করে শুধু বুঝি নির্বাচন প্রাক্কালে এরশাদ সাহেবের তওবার সময় হয়েছিল। অন্যদিকে ইসলামি আইন বাস্তবায়ন কমিটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। একটি পীর সাহেবের দলের মধ্য থেকে ছিলো।

প্রচলিত, বস্তাপঁচা, ঘুণেধরা এই রাজনীতির অবয়ব যে এমন, এ কথা তো আর নতুন করে বোঝাতে হবে না। কিন্তু ইসলামের নামে যারা রাজনীতি করছেন বা করবেন, তারা কেন এমন হবেন? এই প্রশ্ন আজ জনগণের।

হাফেজ্জী হুজুরের রহ. নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট

আমি রাশিয়া সফর করায় মস্কোপন্থী কমরেড মুযাফফর আহমদের সঙ্গে পরিচয় ছিলো। তো কমরেড মুযাফফর আমাকে একদিন বললেন, মাওলানা! হাফেজ্জী হুজুরকে ইলেকশনে কেউ না কেউ দাঁড় করিয়েছে; এটা আপনি কতোটুকু জানেন? আমি বললাম, অসম্ভব! এটা হতেই পারে না। তখন তিনি বললেন, তাহলে আপনি রাজনীতি করতে পারবেন না। আপনার মধ্যে রাজনীতি করার মতো যোগ্যতা নেই। আমি তো থ হয়ে গেলাম; এটা বলে কী? বিষয়টি আমি মাওলানা আবু তাহের মিসবাহকে জানালাম। মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ তো সরাসরি কর্মী ছিলেন না, কিন্তু ইলেকশন অফিসে আসা- যাওয়া করতেন। আমি তাকে বললাম, মুযাফফর সাহেব এমন কথা বললেন, ঘটনা কী? মাওলানা আবু তাহের বললেন, আপনি কিছু বলবেন না, আমি রাজনীতি করতে পারি কিনা দেখি। তখন তিনি বললেন, হাফেজ্জী হুজুরকে যদি কেউ ইলেকশনে দাঁড় করিয়ে থাকে, তাহলে সে লোকটা হলো সিরাজুদ্দৌলা। তার এ কথার পর আমার নযরে সিরাজুদ্দৌলা এসেছে। তখন আমি পেছনের কয়েকদিনের ঘটনাগুলো মন্থন করতে থাকি। আগেরদিন উনিশজন না কয়জনের একটি বৈঠক ছিলো কিল্লার মোড়ে। মাওলানা মহিউদ্দিন খান, সিরাজুদ্দৌলা, মাওলানা আমিনুল ইসলাম ও মাওলানা উবাইদুল হক সাহেবসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। এর আগের দিন সিরাজুদ্দৌলা তার খয়েরি রংয়ের একটি গাড়িতে করে আমাকে আর মাওলানা হামিদুল্লাহকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছে কয়েক জায়গায়। বেশ অনেক জায়গায় যেতে হয়েছে আমাদের। সিরাজুদ্দৌলার সাথে আমরা কোথায় কোথায় গেলাম এবং সিরাজুদ্দৌলা কী কী বললো; এগুলো আমি খুব ভেবেছি। মাওলানা আবু তাহের বলার আগেও আমার কাছে মনে হয়েছিলো লোকটি সিরাজুদ্দৌলাই হবে। কিন্তু মাওলানা আবু তাহের আমাকে বলতে নিষেধ করায় আমি আমার মন্তব্য প্রকাশ করিনি।

এর কিছুদিন পর আমি মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিসবাহ সাহেবকেও কমরেড মুযাফফরের কথাটি বললাম। তিনিও নির্দ্বিধায় বললেন, লোকটি তো তাহলে সিরাজুদ্দৌলাই হবে। মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ কেনো সিরাজুদ্দৌলার কথা বলেছিলেন, তা আমি তাকে আর জিজ্ঞাসা করিনি।

কিন্তু মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিসবাহ সাহেবকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেনো আপনি সিরাজুদ্দৌলার কথা বলছেন? তখন তিনি বললেন, মাওলানা মুমিনুল্লাহ সাহেব হুজুরের (হাফেজ্জী হুজুরের খলিফা ও আমার শেষ শায়খ। আমি তাঁর হাতে বাইয়াত হয়েছি) সাথে একদিন দেখা হয়েছে। তিনি বললেন, এলিফ্যান্ট রোডে থাকে যে খয়েরি রংয়ের গাড়িওয়ালা; এই লোকটা জিয়াউর রহমানের ইন্তিকালের পর থেকে সবসময় গাড়ি নিয়ে তাহাজ্জুদের সময় কিল্লার মোড়ে এসে হুজুরকে এখান থেকে লালবাগের রুমে নিয়ে যেতো এবং ফজর বা ইশরাকের পর ড্রাইভ করে আবার বাসায় পৌঁছে দিতো। মাওলানা মুমিনুল্লাহ সাহেব অধিকাংশ সময় হাফেজ্জী হুজুরের খাদেম হিসেবে থাকতেন। তিনি বলেন, এই লোকটা (খয়েরি রংয়ের গাড়িওয়ালা) সবসময় বলতো যে, 'হুজুর! জিয়াউর রহমান মারা গেছে, এখন দেশ তো শেষ। ইসলামের আর কিছু হবে না, ইসলাম তো শেষ। এরকম কিছু কথাবার্তা বলতো।' হুজুর হাফেজ্জী হুজুরের খলিফা ছিলেন, আমরা তো হাফেজ্জী হুজুরের সোহবত বেশি পাইনি। আমি ওই ইলেকশনের সময় থেকে দু'য়েক বছর যা ছিলাম। মাওলানা মুমিনুল্লাহ সাহেবরা আগে থেকেই চিনতেন হুজুরকে। হুজুরের একটা তবিয়ত ছিলো, একটা কথা যদি বারবার বলা হতো, তখন তা হুজুরের মনে 'রুসুখ' হয়ে যেতো। এই কারণেই মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিসবাহ সাহেব বললেন যে, এই লোকটা সিরাজুদ্দৌলাই হবে।

বিষয়টি যদিও আমাদের তিনজনের ধারণা মাত্র, তবে কমরেড মুযাফফরের কথা অনুযায়ী হাফেজ্জী হুজুরের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে পেছন থেকে কারো কলকাঠি নাড়ানো বা সিরাজুদ্দৌলা কেন্দ্রিক সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার কয়েকটি কারণ ছিলো। প্রথমত: সিরাজুদ্দৌলা ফেনী কলেজে পড়াকালীন ছাত্রলীগের সাথে জড়িত ছিলো এবং আওয়ামীলীগের উত্থানের সময় মন্ত্রীর বদান্যতায় সুতার লাইসেন্স ভাগিয়ে নারায়নগঞ্জ গিয়ে কিছু কাজ করতো; সেই দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে যাচ্ছি না। দ্বিতীয়ত: আমি ছিলাম প্রেস সেক্রেটারী। অথচ কে একজন আমাদের অজান্তে হুজুরের বিভিন্ন প্রোগ্রামের এ্যাড দিয়ে দিতো। তাও শুধু ইত্তেফাক পত্রিকায় দিতো। আমাকে সবাই জিজ্ঞাসা করতে লাগলো যে, তুমি হলে প্রেস সেক্রেটারী; তাহলে এটা কে করে? মূলত এটি সিরাজুদ্দৌলাই করতো। আমি একদিন কিল্লার মোড়ে অফিসে তা প্রকাশ করে দিলাম এবং তাকে বললাম আপনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা না করে এ্যাড দেন কেনো? আর এক পত্রিকায় দেওয়ায় অন্যরা তো আমাদের শত্রু হয়ে যাবে। তখন সে আমাকে একটা শক্ত কথা বলেছিলো। যার কারণে মাওলানা ইসমাইল (বর্তমান আলহাইআতুল উলয়ার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক) ও মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জীসহ আরো কে কে যেনো ছিলো; সকলেই বয়কট করেছিলো এবং বলেছিলো, উবাইদিকে বলার অর্থ আমাদেরকেও বলা। তখন সে তার কথার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য হলো। তৃতীয়ত: ইত্তিফাকের চীফ রিপোর্টার নাজিমুদ্দিন মোস্তানও আমাকে একটি ইশারা দিয়েছিলো।

বিষয়টি হচ্ছে, ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হঠাৎ করে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ায় পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেয়া হলে বিএনপি থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, আওয়ামীলীগ থেকে ড. কামাল হোসেন এবং জাসদ থেকে মেজর এম. এ. জলিল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতো জাঁদরেল কেন্ডিডেটের মধ্যে ইসলামি আদর্শের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহিমাহুল্লাহও উক্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁদের নির্বাচনী সফরে প্রচার মাধ্যমগুলো থেকে জাঁদরেল জাঁদরেল সাংবাদিক নিযুক্ত করা হয়। তবে সবচেয়ে দুর্বল প্রার্থী হযরত হাফেজ্জী হুজুরের সাথে ইত্তেফাক থেকে যাকে নিযুক্ত করা হয়, আমার দৃষ্টিতে তিনি সবচেয়ে বেশী দক্ষ ও প্রবীন ছিলেন। আর তিনি ছিলেন ইত্তেফাকের তৎকালীন চীফ রিপোর্টার জনাব নাজিমুদ্দিন মোস্তান। হাফেজ্জী হুজুরের প্রেস সেক্রেটারী হিসেবে এই অধমও যেহেতু সফরসঙ্গী ছিলাম, তাই একদিন নাজিমুদ্দিন মোস্তানকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলাম। প্রশ্নটি ছিলো, এতো জাঁদরেল কেন্ডিডেট থাকতে আপনার মতো একজন ঝানু সাংবাদিক তাদের কারো সাথে না দিয়ে হাফেজ্জী হুজুরের মতো একজন দুর্বল প্রার্থীর সাথে কেনো ফিট করে দেয়া হলো? মোস্তান সাহেব হেসে বললেন, হাফেজ্জী হুজুরর যে গণজোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে আমাদের আশংকা হচ্ছে যে, ড. কামাল এবং আব্দুস সাত্তার সাহেবের মধ্যে ভোট কাড়াকাড়ি ও ভাগাভাগি হতে গিয়ে মাঝখানে হাফেজ্জী হুজুর পাশ করে না ফেলে। তাঁর পাশ করার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই সম্ভাবনার বাস্তবতা কতটুকু; মাঠে ময়দানে গিয়ে তা যাচাই করার জন্যই আমাকে হুজুরের সাথে দেয়া হয়েছে।

ইত্তেফাকে তখন আমাদের নিউজ থাকতো প্রথম পাতায় অনেক নিচে, তাও আবার এক কলামে। পক্ষান্তরে আব্দুস সাত্তার সাহেবের নিউজ থাকতো প্রথম পাতায় সবার উপরে প্রথম হেড লাইন ও কয়েক কলাম জুড়ে। অন্যদিকে কামাল হোসেনের নিউজ থাকতো প্রথম পাতায় দ্বিতীয় হেড লাইনে একটু নিচে দুই কলাম জুড়ে। হঠাৎ একদিন দেখি ড. কামালের নিউজ আর আব্দুস সাত্তার সাহেবের নিউজ প্রথম পাতায় প্রথম হেড লাইনে পাশাপাশি সমান কলামে ছাপা হয়েছে, অন্যদিকে হাফেজ্জী হুজুরের নিউজও অতো নিচে আর নেই। অনেকটা উপরে উঠে এসেছে এবং দুই কলামে। ইত্তেফাকের এসব কাণ্ড দেখে আমি মোস্তান সাহেবকে প্রশ্ন করে বসলাম। জিজ্ঞাসা করলাম যে, আমাদেরকে গাজীপুরের সভা থেকে দুই কলাম উপরে তুলে আনা হলো কেনো এবং ড. কামাল হোসেনকেও আব্দুস সাত্তার সাহেবের সাথে সমানে সমানে কয়েক কলাম জুড়ে দেয়ারই বা কারণ কী? মোস্তান সাহেব তখন বললেন, বহুদূর থেকে সাগরে দুটি জাহাজ আসতে দেখা যাচ্ছিলো। দূরবীন দিয়ে আমরা তা ঠাহর করতে পারছিলাম না যে জাহাজ দুটি কাদের? তবে ধারণা হচ্ছিলো, ড. কামালের জাহাজ মস্কো থেকে আসছিলো, আর আপনাদের জাহাজখানি মদিনা থেকে। কিন্তু জাহাজ দুটি কাছে আসতে আসতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো যে, ড. কামালের জাহাজ আমেরিকান পতাকা উড়াচ্ছে, অন্যদিকে আপনাদের জাহাজও সম্পূর্ণ মদিনার নয় বলে মনে হচ্ছে। তাই আমরা দুই আমেরিকান জাহাজকে সমান কলামে সমান মাপে প্রথম পাতায় হেডলাইন করে নিউজ করা আরম্ভ করলাম। আর আপনাদেরকে খাঁটি মদিনার না হওয়ায় একটু উপরে দুই কলামে নিয়ে আসলাম। মক্কা-মদিনার জাহাজ মনে করে ভয়ের কারণেই আগে কভারেজের ব্যাপারে একটু অবহেলা করা হচ্ছিলো। কিন্তু যখন সন্দেহ দূর হয়ে গেলো এবং পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে ভয়ের কোনো কারণ নেই, তখন কভারেজের দিকটা বাড়িয়ে দেয়া হলো।

নারী নেতৃত্ব ও আলেম সমাজ

কয়েক বছর আগের কথা। আমার সমবয়সী আমার এক খালাতো ভাই জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা শাকের আমার রুমে এসেছিলেন। বিভিন্ন কথার মাঝে নারী নেতৃত্বের সাথে আলেমদের অংশগ্রহণ সম্পর্কেও কথা হচ্ছিলো। এক পর্যায়ে হক্কানী আলেম সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ইসলামি ঐক্যজোটের নেতা শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা আজিজুল হক সাহেব ও জনাব মুফতি ফজলুল হক আমিনি সাহেব সম্পর্কেও কথা উঠলো। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে তাদের বৈঠকের ধরন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে তিনি বললেন, জামায়াতকে তো আপনারা আমলেই আনেন না, তাই আমাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু একজন মহিলা নেত্রীকে মাঝখানে রেখে এতো বড়ো বড়ো আলেমদের বৈঠক কেমন দেখায়? টিভি পর্দায় তাদের অবাধে কথা-বার্তা ও হাসি-খুশী ভাব দেখে মনে হয় যেনো তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে বসতে পেরে ধন্য হয়েছেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এভাবে ছবি এসেছে নাকি? তিনি বললেন তাইতো। আমার তখন লজ্জায় আর কিছু বলার থাকলো না। শুধু বললাম, সমাজে বা রাষ্ট্রে ইসলাম বাস্তবায়নের ব্যাপারে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক দেখানো পথ ও মত ব্যতীত অন্য কোনো পন্থায় তা বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব নয়। ইসলাম যে পথকে অনুমোদন করে না সে পথ ইসলাম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা হলে তা আর যাই হোক, ইসলাম কখনো হবে না। শাকের সাহেব জানেন যে, একসময় আমি তাঁদের (শায়খুল হাদিস সাহেব ও আমিনি সাহেব) সাথে একযোগে রাজনীতি করেছি। তাই তিনি কথাগুলো বলে আমাকেই ঘা-টা দিলেন।

শায়খুল হাদিস সাহেব ও আমিনি সাহেবরা আমার চাইতেও অনেক বেশী এবং খুব ভালো করেই জানেন যে, আমাদের পূর্বসূরী আকাবের বুযুর্গরা নারী নেতৃত্ব তো দূরে থাক, ক্ষমতাশীল পুরুষ নেতাদের ধারে কাছেও যেতেন না। কদাচিৎ কেউ যদি তাঁদের দরবারে এসে পড়তেন, তখন প্রয়োজনীয় উপদেশ বা পরামর্শ দিয়ে তাকে বিদায় করে দিতেন। মির্জা জানে জানান রহ. দিল্লির একজন বড়ো বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। বাদশাহ আলমগির রহ. -এর খালাতো ভাই ছিলেন তিনি। তাঁর নামটিও রেখেছেন স্বয়ং বাদশাহ আলমগির। কিতাবে লেখা আছে যে, এক নওয়াব এসে তাঁকে বাইশ হাজার টাকা হাদিয়া দিতে চাইলেন। মির্জা সাহেব তা গ্রহণ করলেন না। নওয়াব সাহেব বললেন, হুজুরের প্রয়োজন না থাকলে দান করে দিলেই তো হয়। হুজুর বললেন, দান দক্ষিণার আদব বা ফর্মালিটিজি আমার জানা নেই; বরং আপনি নিজেই বাড়ি যেতে যেতে পথিমধ্যে দান করতে থাকলে বাড়ি পর্যন্ত তা আর থাকবে না। দেখুন! তৎকালীন সময়ের বাইশ হাজার টাকা কম কথা নয়। এখনকার টাকার মূল্য মানে প্রায় বাইশ কোটি টাকা হবে হয়তো। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করলেন না। আরেকবার বাদশাহ বললেন, হুজুর! আমার এতো বড়ো সাম্রাজ্য থেকে আপনি কিছু গ্রহণ করুন না! উত্তরে হুজুর বললেন, আল্লাহ তো পুরা দুনিয়াটাকেই 'মাতাউন কালিল' সামান্য সম্পদ বলেছেন। তার মধ্যে আপনার সাম্রাজ্যই বা আর কতোটুকুন? তার উপর আবার আমি ভাগ বসাবো কী? এতোদূরের পূর্বসূরীর কথা না হয় বাদই দিলাম, স্বয়ং শায়খুল হাদিস সাহেব ও আমিনি সাহেবের অতিপ্রিয় উস্তাদ, লালবাগ মাদরাসাসহ অনেকগুলো মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরি (সদর সাহবে হুজুর) রহ. -এর কথা বলা যাক না। সদর সাহেব হুজুর জিনজিরায় জায়গির থাকতেন। প্রতিদিন নদী পার হয়ে সেখান থেকে এসে লালবাগ মাদরাসায় পড়াতেন। জিনজিরায় এক ধনাঢ্য ব্যক্তি হুজুরকে একটি দালান বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। হুজুর তাকে অনুমতি দেননি। আরেকজন ভক্ত বাইশ হাজার টাকা হাদিয়া দিতে চেয়েছিলেন, হুজুর তাও গ্রহণ করেননি। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান হুজুরের নামে দশ লক্ষ টাকার একটি চেক পাঠিয়েছিলেন, হুজুর তাও ফেরত পাঠিয়ে দেন এবং বলেন, প্রেসিডেন্ট কি আমাকে ঘুষ দিতে চায় নাকি?

এই সকল ঘটনা আমার চাইতে শায়খুল হাদিস সাহেব ও আমিনি সাহেবের অনেক বেশি জানা ছিলো। তারপরও ইসলামি রাজনীতির খাতিরে যদি তাঁদেরকে সরকার প্রধানের সাথে দেখা-সাক্ষাত করতেই হয়, তাহলে পুরুষ নেতাদের সাথে সাক্ষাত করলেই হয়। আমার মতে তাঁদের প্রথম কর্তব্য ছিলো নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সোচ্ছার ভূমিকা রাখা ও আন্দোলন গড়ে তোলা। চাই তিনি খালেদা জিয়া হোক বা শেখ হাসিনাই হোক। কেননা নারী নেতৃত্ব ইসলামের কোথাও জায়েয নেই। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় ফাতেমা জিন্নার পক্ষে যে কিছু আলেম কাজ করেছিলেন, তাতেও বড়ো বড়ো মুফতি সাহেবরা একমত ছিলেন না। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রান্ড মুফতি হযরত মুফতি ফয়জুল্লাহ সাহেব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুফতি মাহমুদসহ অনেকেই তার বিরোধিতা করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে আমিনি সাহেবদের দেখা-সাক্ষাৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেশের বহুল প্রচারিত একটি দৈনিকের একজন বিভাগীয় সম্পাদক আমাকে বলেছিলেন, যদি এমনটি হতো যে, তাঁদের বৈঠকের মাঝখানে একটি পর্দা হতো; পর্দার একপাশে প্রধানমন্ত্রী আরেকপাশে আলেম সমাজ থাকতেন, তাহলেও তো জনগণের মনে তাঁদের প্রতি এবং ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হাজার গুণ বেড়ে যেতো। আমি বিষয়টি নিয়ে তখন স্বয়ং মুফতি আমিনি সাহেবের সাথে একান্তে কথা তুলেছিলাম যে, আপনাদের নারী নেতৃত্বের সাথে এভাবে খোলামেলা সাক্ষাত করায় ইসলাম ও আপনাদের ভাবমূর্তির কী অবস্থা হচ্ছে? তিনি উত্তরে বলছিলেন, বিএনপি বা আওয়ামীলীগে ওই এক শীর্ষ নেত্রী ছাড়া আর কেউ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। তাই আমাদেরকে কিছু করতে হলে বা বলতে হলে বাধ্য হয়ে সরাসরি তাদেরকেই বলতে হয়। আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে তাই করুন, তবে পর্দার মাঝে থেকে করুন বা বলুন। ইসলাম ও জনগণের এটাই চাহিদা। তাতে ইসলমের যেমন মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে, আপনাদেরও মর্যাদা বাড়বে শতগুণে। জনগণের মাঝে ইসলাম বাস্তবায়নের রাজনীতি করতে গিয়ে নিজেদের ইসলামের ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেলে তো আর চলবে না; যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে মানুষের উপর আরোপ করা হয়েছে। তা ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন আছে, পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ঠিক তেমনি আছে। ব্যক্তি ও পরিবারকে বাদ দিয়ে শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম বাস্তবায়নের কোনো পদ্ধতি ইসলামে অন্তত নেই। বরং ইসলামে প্রথম স্তরই হচ্ছে ব্যক্তি দিয়ে আরম্ভ। আর শেষ স্তর হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে তা বাস্তবায়ন করা। আর কোনো বস্তুর প্রথম না থাকলে তার শেষ কোথা থেকে আসবে? (সমাপ্ত)

📘 মুসলিম বিশ্ব ও সমকালীন মাসায়েল 📄 ثبت المصادر والمراجع

📄 ثبت المصادر والمراجع


١ - القرآن الكريم
۲ - آپ کے مسائل اور ان کا حل -یوسف لدھیانوی - زکریا بکڈپو، دیو بند
احسن الفتاوی رشید احمد لدھیانوی - زکریا بکڈپو ، دیو بند
- أحكام القرآن لأبي بكر الجصاص، دار إحياء التراث العربي، بيروت
- ادیان کی جنگ - عاصم عمر - ادارہ حطین
- الإسناد من الدين وصفحة مشرقة من تاريخ سماع الحديث عند المحدثين لعبد الفتاح أبي غدة، المكتبة الغفورية العاصمية، كراتشي، باكستان
۷- اشرف الجواب - افادات حکیم الامت - مکتبہ عمر فاروق ، شاہ فیصل کالونی، کراچی
الأشباه والنظائر لابن نجيم، دار الفكر، بيروت
- أصول الإفتاء لتقي العثماني، مكتبة الحجاز، بنغلا بازار، داكا
١٠- أضواء البيان محمد الأمين الشنقيطي، دار عالم الفوائد
11 - الإعلام بقواطع الإسلام لابن حجر الهيتمي (الجامع في ألفاظ الكفر)، دار إيلاف الدولية، الكويت
١٢- إعلام الموقعين لابن القيم، دار ابن الجوزي، المملكة العربية السعودية
١٣ - إكفار الملحدين لأنور شاه الكشميري، دار الکتب العلمیہ ، اکوڑہ خٹک، پشاور
١٤ - الأم للإمام الشافعي، دار الوفاء، المنصورة
١٥- الباعث على إنكار البدع والحوادث لأبي شامة المقدسي، مطبعة النهضة الحديثة، مكة المكرمة
-١٦- البحر الرائق لابن نجيم دار الكتب العلمية، بيروت
১৭ - بدائع الصنائع لعلاء الدين الكاساني، دار الكتب العلمية، بيروت
১৮ - البداية والنهاية لابن كثير، دار الحديث، القاهرة
十九 - تاريخ الإسلام للذهبي، المكتبة التوفيقية
২০ - تاریخ دمشق لابن عساكر، دار الفكر، بيروت
২১ - تاريخ الطبري (تاريخ الرسل والملوك)، دار المعارف، مصر
২২ - تأنيب الخطيب للكوثري، طبع محمد أمين
২৩ - تبيين الحقائق لفخر الدين الزيلعي، المطبعة الكبرى الأميرية ببولاق مصر المحمية
২৪ - تذکرہ مشائخ دیو بند ، عزیز الرحمن بجنوری
২৫ - تفسير ابن أبي حاتم (تفسير القرآن العظيم)، مكتبة نزار مصطفى الباز، مكة المكرمة
২৬ - تفسير ابن جزي الكلبي (التسهيل لعلوم التنزيل)، دار الكتب العلمية، بيروت
২৭ - تفسير ابن عطية (المحرر الوجيز في تفسير الكتاب العزيز)، دار الكتب العلمية، بيروت
২৮ - تفسير ابن كثير (تفسير القرآن العظيم)، دار ابن الجوزي، القاهرة
২৯ - تفسير البحر المحيط لأبي حيان الأندلسي، دار الكتب العلمية، بيروت
৩০ - تفسير البغوي (معالم التنزيل)، دار طيبة، الرياض
৩১ - تفسير البيضاوي (أنوار التنزيل وأسرار التأويل)، دار إحياء التراث العربي، بيروت
৩২ - تفسير الطبري (جامع البيان عن تأويل القرآن)، مكتبه ابن تيمية، القاهرة
৩৩ - تفسير القرطبي (الجامع لأحكام القرآن)، دار عالم الكتب، الرياض
৩৪ - التفسير الكبير للرازي، دار الفكر، بيروت
৩৫ - تفسير المظهري للقاضي ثناء الله المظهري، زکریا بکڈپو، دیوبند
৩৬ - تفسير النسفي (مدارك التنزيل وحقائق التأويل)، دار الكلم الطيب، بيروت
৩৭- تكملة فتح الملهم لتقى العثماني، دار القلم، دمشق
۳۸- تهذيب الكمال للمزي، مؤسسة الرسالة
۳۹- جامع الترمذي، مؤسسة الرسالة ناشرون
٤٠- جامع الفصولين لابن قاضي سماونة، اسلامی کتب خانہ، علامہ بنوری ٹاؤن، کراچی (الشبكة)
٤١- جواہر الفتاوی- عبد السلام چانگامی- المکتبة الاتحادية، امین بازار، سری نفر، منشی گنج
٤٢- جواہر الفقہ- مفتی محمد شفیع- مکتبہ سیرت النبی، جامع مسجد، دیو بند
٤٣- حجة الله البالغة للشاه ولي الله الدهلوي، دار ابن كثير، دمشق
٤٤- حیات اطہر- شفیق الرحمن جلال آبادی، کتب خانہ مظہری، گلشن اقبال ۲، کراچی
٤٥- خزائن معرفت و محبت- حکیم محمد اختر- خانقاہ امدادیہ اشرفیہ، گلشن اقبال، کراچی
٤٦- خطبات شامزی - نظام الدین شامزی- اسلامی کتب خانہ، علامہ بنوری ٹاؤن، کراچی
٤٧- خلاصة الفتاوى لطاهر بن عبد الرشيد البخاري، مکتبہ رشیدیہ، سر کی روڈ، کوئٹہ
٤٨- رد المحتار لابن عابدين الشامي، دار الكتاب، ديوبند، الهند
٤٩- زاد المسير لابن الجوزي، المكتب الإسلامي
٥٠- سنن أبي داود، مؤسسة الرسالة ناشرون
٥١- سنن الدارمي، مؤسسة الرسالة ناشرون
٥٢- سير أعلام النبلاء للذهبي، مؤسسة الرسالة
٥٣- شرح أصول اعتقاد أهل السنة والجماعة لأبي القاسم هبة الله اللالكائي، دار الفكر، بيروت
٥٤- شرح التلويح على التوضيح للتفتازاني، دار الكتب العلمية، بيروت
٥٥- شرح الحموي على الأشباه (غمز عيون البصائر)، دار الكتب العلمية، بيروت
٥٦- شرح صحيح مسلم للنووي (المنهاج في شرح صحيح مسلم بن الحجاج)، مؤسسة الرسالة ناشرون
٥٧- شرح العقيدة الطحاوية لابن أبي العز الحنفي, مؤسسة الرسالة
٥٨- الشفا للقاضي عياض، دار الكتب العلمية، بيروت
٥٩- الصارم المسلول لابن تيمية، زمادي للنشر - المؤتمن للتوزيع، المملكة العربية السعودية
٦٠- صحيح البخاري، مؤسسة الرسالة ناشرون
٦١- صحيح مسلم، مؤسسة الرسالة ناشرون
٦٢- عقائد الاسلام - ادریس کاندھلوی اداره اسلامیات، کراچی، لاہور
٦٣- عمدة التفسير لأحمد شاكر، دار الوفاء، المنصورة
٦٤- عمدة القاري للعيني السحار للطباعة والنشر، القاهرة
٦٥- فتاوی حقانیہ - عبدالحق الحقانی - جامعہ دار العلوم حقانیہ، اکوڑہ خٹک، پشاور
٦٦- الفتاوى الصغرى ليوسف بن أحمد الخوارزمي الخاصي، مخطوطة جامعة الملك سعود (الشبكة)
٦٧- فتاوى قاضي خان (الخانية)، مكتبة الاتحاد، ديوبند، الهند
٦٨- الفتاوى الكبرى لابن تيمية دار الكتب العلمية، بيروت
٦٩- فتاوی محمودیه - محمود حسن گنگوہی زکریا بکڈپو، دیوبند
٧٠- فتاوى ورسائل لمحمد بن إبراهيم آل الشيخ، مطبعة الحكومة بمكة المكرمة
۷۱- الفتاوى الهندية لعدة من علماء الهند، زکریا بکڈپو، دیوبند
৭২ - فتح الباري لابن حجر العسقلاني الرسالة العالمية
৭৩ - فتح القدير لابن الهمাম دار الكتب العلمية، بيروت
৭৪ - الفروق للقرافي، دار الكتب العلمية، بيروت
৭৫ - فطری حکومت - قاری محمد طیب - دار الکتاب، دیوبند ، یوپی
৭৬ - الفقيه والمتفقه للخطيب البغدادي، دار ابن الجوزي، المملكة العربية السعودية
৭৭ - فيض الباري لأنور شاه الكشميري، دار الكتب العلمية، بيروت
৭৮ - كتاب الرد على المنطقيين لابن تيمية، مؤسسة الريان، بيروت
৭৯ - الكشاف للزمخشري، مكتبة العبيكان، الرياض
৮০ - كشاف القناع للبهوتي، وزارة العدل في المملكة العربية السعودية
৮১ - كشف الأسرار على أصول البزدوي لعلاء الدين البخاري، دار الكتب العلمية، بيروت
৮২ - المبسوط للسرخسي، دار المعرفة، بيروت
৮৩ - مجلة البحوث الإسلامية مجلة دورية تصدر عن الرئاسة العامة لإدارات البحوث العلمية والإفتاء والدعوة والإرشاد (الشاملة)
৮৪ - مجموع الفتاوى لابن تيمية مجمع الملك فهد المملكة العربية السعودية
৮৫ - مدارج السالكين لابن القيم، دار إحياء التراث العربي، بيروت
৮৬ - المستدرك للحاكم النيسابوري، دار الفكر، بيروت
৮৭ - مسند الإمام أحمد، مؤسسة الرسالة
৮৮ - المصنف لعبد الرزاق، المكتب الإسلامي، بيروت
৮৯ - المصنف لابن أبى شيبة دار القبلة جدة - مؤسسة علوم القرآن بيروت
৯০ - معارف القرآن - مفتی محمد شفیع - المكتبة المتحدة، ڈھاکہ، بنگلہ دیش
৯১ - معالم إرشادية لمحمد عوامة، دار اليسر - دار المنهاج
৯২ - معالم السنن للخطابي، دار الكتب العلمية، بيروت
৯৩ - المغني لابن قدامة، دار عالم الكتب، الرياض
৯৪ - مقالات الكوثري دار السلام مصر، الطبعة الرابعة
৯৫ - مکتوبات شیخ الاسلام حسین احمد مدنی، مکتبہ دینیه ، دیو بند
৯৬ - المنثور في القواعد لبدر الدين الزركشي، دار الكتب العلمية، بيروت
৯৭ - منهاج السنة النبوية لابن تيمية، جامعة الإمام محمد بن سعود الإسلامية
৯৮ - الموسوعة العربية العالمية، مؤسسة أعمال الموسوعة، الرياض، الطبعة الثانية
৯৯ - الموسوعة الفقهية الكويتية، وزارة الأوقاف والشئون الإسلامية، الكويت
১০০ - موقف العقل والعلم والعالم المصطفى صبري، دار إحياء التراث العربي, بيروت
১০১ - نونية ابن القيم الكافية الشافية في الانتصار للفرقة الناجية)، دار عالم الفوائد
১০২ - النهاية في الفتن والملاحم لابن كثير، دار الحديث، القاهرة
১০৩ - الولاء والبراء في الإسلام محمد بن سعيد القحطاني، دار طيبة، الرياض
১০৪ - الهداية لبرهان الدين المرغيناني المكتبة الإسلامية, بنغলা বাজার, ঢাকা
১০৫- হাফেজ্জী হুজুর রহ. স্মারকগ্রন্থ, হাফেজ্জী হুজুর রহ. পরিষদ
১০৬- অন্তরঙ্গ আলোকে শাইখুল হাদীস রহ., মুহাম্মদ এহসানুল হক, থানভী লাইব্রেরী
১০৭- মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. জীবন ও সংগ্রাম, নবপ্রকাশন
১০৮- ঈমান সবার আগে, মাওলানা আব্দুল মালেক, রাহনুমা প্রকাশনী
১০৯- প্রচলিত জাল হাদীসের (১) ভূমিকা, মাওলানা আব্দুল মালেক, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা, প্রথম প্রকাশ
১১০- মাসিক আলকাউসার, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা
১১১- দৈনিক ইনকিলাব
১১২- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় (সর্বশেষ সংশোধনীসহ মুদ্রিত অক্টোবর, ২০১১)
১১৩- বাংলাপিডিয়া (google)
১১৪- জিয়াউর রহমান উইকিপিডিয়া (google)
১১৫- কোম্পানী আইন ১৯৯৪ (google)

ফন্ট সাইজ
15px
17px