📄 ইতিহাসের সাক্ষ্য
আমরা একটু পেছনে ফিরে যাই। ১৯২৪ খৃস্টাব্দে উসমানি খিলাফত পতনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে হাজারো যুলুম-অত্যাচার, অন্যায়-অবিচার হওয়া এবং শেষদিকে এসে খিলাফতের ব্যবস্থাপনা ভঙ্গুর হয়ে পড়া সত্ত্বেও খিলাফতের পক্ষ হতে হুদুদ-কিসাস ইত্যাদির ক্ষেত্রে শরয়ি আইন বলবৎ ছিলো, জিহাদি কাফেলা ছিলো, ছিলো 'রিবাত'র ব্যবস্থাও। শরয়ি আইনের বিপরীত কোনো মানবরচিত আইন বিধিবদ্ধ হয়নি। সে সময়ে কোনো কাযি নিজে গোনাহে লিপ্ত হচ্ছে জেনেই ধোঁকায় পড়ে কখনো শরিআতের বিপরীত ফয়সালা করলে উলামায়ে কেরাম তাকে ফাসেক হওয়ার ফাতওয়া দিয়েছেন। এর বিপরীতে শাসক কর্তৃক 'ইয়াসাক'র মতো যখনই কোনো মানবরচিত সংবিধান তৈরি হয়েছে, তখনই উলামায়ে কেরাম তাদেরকে কাফের আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করা ওয়াজিব হওয়ার ফাতওয়া দিয়েছেন। যেমনটি ইতোপূর্বে ইবনে কাসিরের উদ্ধৃতিতে উল্লেখ হয়েছে।
এখন একটু বিবেচনা করি; আমাদের দেশসহ কথিত মুসলিম বিশ্বের সরকার ও বিচার ব্যবস্থাপনা কোন প্রকারে পড়বে! যেখানে কুরআন-সুন্নাহর বিপরীতে মানবরচিত আইন গ্রহণ বা প্রণয়ন করা হয়েছে, আল্লাহর দেয়া শরিআতের সঙ্গে বিদ্রোহ করে তাগুতের আইনে সংবিধান তৈরি করা হয়েছে, শরয়ি বিধান মতে ফয়সালা দেয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি, আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার করা আবশ্যকীয় মনে করা তো দূরের কথা; বরং তার বিপরীতে মানবরচিত আইনে ফয়সালা করাকে বিচারকরা নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করছে, তখন এটি কোন প্রকারে পড়বে? কথিত মুসলিম বিশ্বের সংবিধান ও তাতারিদের 'ইয়াসাক'র মাঝে পার্থক্য কোথায়?
📄 শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সায়িদ আলকাহুতানির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
এ সংক্রান্ত মক্কা মুকাররমার প্রসিদ্ধ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ আলকাহতানির আলোচনাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ-
قال محمد بن سعيد القحطاني: (تعليق لا بد منه في النص المتقدم بعض العبارات التي قد توهم بعض الناس في قضية الحاكمية) حيث ذكر ابن القيم أن الحكم بغير ما أنزل الله كفر دون كفر. وهنا لا بد من إيضاح هذه القضية حتى يزول ما قد يحصل من إشكال.
إن المجتمع الإسلامي منذ قيامه على يد رسول الله ﷺ قد قام على الحكم بشريعة الله، ومضى على ذلك خلفاؤه الراشدون، ثم الخلفاء الأمويون مضوا على ذلك وإن كان بدر منهم بعض الانحرافات، إلا أن الحكم الذي يتحاكمون إليه الناس هو شرع الله، يظلهم برايته ويرعاهم بحكمته وعدالته. ثم جاءت الدولة العباسية وكان الشرع أيضاً هو نظام الحكم مع وجود ثغرات قوية بعض الشيء. ثم جاء التتار، وأتى (هولاكو) بـ (الياسق) - وسيرد كلام العلماء بخصوصه في مكانه المناسب إن شاء الله
ولما كان الأمر كذلك فإن كلام السلف ومنهم ابن القيم كلام لا غبار عليه، فإذا حكم الحاكم برشوة أو لقرابة، أو شفاعة أو ما أشبه ذلك فلا شك أن ذلك كفر دون كفر .
وأما ما جد في حياة المسلمين ولأول مرة في تاريخهم وهو تنحية شريعة الله عن الحكم ورميها بالرجعية والتخلف وأنها لم تعد تواكب التقدم الحضاري والعصر المتطور. فهذه ردة جديدة في حياة المسلمين। إذ الأمر لم يقتصر على تلك الدعاوى التافهة، بل تعداه إلى إقصائها فعلاً عن واقع الحياة واستبدال الذي هو أدنى بها، فحل محلها القانون الفرنسي أو الإنجليزي أو الأمريكي أو الاشتراكية الإلحادية وما أشبه ذلك من تلك النظم الجاهلية الكافرة. (الولاء والبراء في الإسلام لمحمد بن سعيد القحطاني، ص٦٨)
“(অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যালোচনা) উপর্যুক্ত বক্তব্যের কিছু বাক্য 'হাকেমিয়্যাত' বিষয়ে কারো মনে সংশয় সৃষ্টি করতে পারে। কেননা হাফেয ইবনুল কাইয়িম বলেছেন যে, আল্লাহ প্রদত্ত বিধান পরিপন্থী ফয়সালা করা কুফরে আসগার। এখানে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যেনো সৃষ্ট সন্দেহ দূর হয়ে যায়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকে তা আল্লাহর শরিআতের উপরই অবিচল ছিলো। এ অবস্থার উপরই খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগ অতিবাহিত হয়েছে। অতঃপর উমাবি খুলাফারাও এভাবে চলেছে, যদিও তাদের থেকে বিভিন্ন বিচ্যুতি প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু যে সংবিধানের কাছে তারা বিচারপ্রার্থী হতো তা আল্লাহর বিধি-বিধানই ছিলো। আল্লাহর শরিআতের পতাকাতলে তাদেরকে আশ্রয় দিতো এবং শরিআতের হিকমত ও ইনসাফের মাধ্যমে তাদেরকে পরিচর্যা করতো। অতঃপর আব্বাসি খিলাফতের সূচনা হলো। তখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের ফাঁক- ফোকরের উপস্থিতি সত্ত্বেও বিচারব্যবস্থা শরিআতে ইসলামিই ছিলো।
অতঃপর তাতারিদের উত্থান হলো এবং হালাকু খান 'ইয়াসাক' নামক সংবিধান নিয়ে আসলো। 'ইয়াসাক' সম্পর্কে উলামায়ে কেরামর মন্তব্য বিশেষভাবে তার সঙ্গত স্থানে উল্লেখ করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
বিষয়টি যখন এমনই, তাহলে ইবনুল কাইয়িমসহ অন্যান্য সালাফের বক্তব্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই। কেননা বিচারক যদি ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, সুপারিশ বা এ জাতীয় কোনো কারণে বিপরীত ফয়সালা করে, তাহলে নিঃসন্দেহে তা কুফরে আসগর।
কিন্তু মুসলমানদের জীবনে যা নতুনভাবে এসে পড়েছে -বরং তাদের ইতিহাসে সর্বপ্রথম- আর তা হচ্ছে, বিচারকার্য থেকে আল্লাহর শরিআতকে দূরে সরিয়ে দেয়া, সেটিকে পশ্চাদমুখী ও সেকেলে এবং সভ্যতার উন্নতি ও বিবর্তিত কালের সহযাত্রী হতে পারছে না বলে আখ্যা দেয়া। এটি মুসলিম জীবনে 'ইরতিদাদ'র নতুনরূপ। কেননা তা শুধু এ সকল অসার দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং শরিআতকে কার্যকরীভাবে বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া এবং শরিআতের পরিবর্তে নিকৃষ্টতর ব্যবস্থা গ্রহণ করা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ইসলামি আইনের পরিবর্তে সেখানে স্থান করে নিয়েছে ফরাসি, ইংরেজি, মার্কিন, কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্র এবং এ জাতীয় বিভিন্ন জাহেলি কুফরি ব্যবস্থার আইন-কানুন।” (আলওয়ালা ওয়ালবারা ফিল ইসলাম, পৃ: ৬৮)
অতঃপর তিনি তাঁর দাবির পক্ষে দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করেছেন। সচেতন পাঠক মূল কিতাব থেকে পুরো আলোচনাটি দেখে নিতে পারেন। বরং পুরো কিতাবটি বুঝে-শুনে অধ্যয়ন করলে গ্রহণ করার মতো বহু উপাদান পাওয়া যাবে।
📄 ‘ইতিদাল’ কোনটি?
এখন সুস্থ বিবেক সিদ্ধান্ত দেবে এক্ষেত্রে 'ই'তিদাল' কোনটি? খাওয়ারেজ সম্প্রদায়ের 'ইফরাত'র গোমরাহি যদি ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে যারা 'ইয়াসাক'র উত্তরসূরিদের কাফের মানতে প্রস্তুত নয়; তাদের এই 'তাফরিত'র গোমরাহি কি ভয়ঙ্কর নয়? এটি কি 'ইজমায়ে উম্মাহ'র খেলাফ অবস্থান নয়? যেমনটি পূর্বে ইবনে কাসিরের উদ্ধৃতিতে উল্লেখ হয়েছে- من"فعل ذلك كفر بإجماع المسلمين। তেমনিভাবে ইবনে তাইমিয়াও বলেছেন-
فإن التتار يتكلمون بالشهادتين، ومع هذا فقتالهم واجب بإجماع المسلمين. (الفتاوى الكبرى لابن تيمية، (٣٢/٢)
“তাতারিরা 'শাহাদাতাইন' মুখে উচ্চারণ করে, তবুও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্যে তাদের মোকাবেলায় কিতাল ওয়াজিব। (আলফাতাওয়াল কুবরা, ২/৩২) (২৪)
ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাসির সেই শতকের দুই মনীষা যে শতকে তাতারিরা তাদের পূর্ব কুফর থেকে ফিরে আসলেও আল্লাহর আইনের পরিবর্তে 'ইয়াসাক' নামক মানবরচিত সংবিধান থেকে ফিরে আসেনি। তাদের ‘ইজমা'র দাবির উপর আমাদের জানা মতে আজ পর্যন্ত কেউ আপত্তি করেননি বা তা প্রত্যাখ্যান করেননি।
টিকাঃ
২৪. এখানে আমার মৌলিকভাবে উদ্দেশ্য হাফেয ইবনে কাসিরের বক্তব্য। হাঁ! দাবির 'সামারা' ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করতেই শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য উল্লেখ করেছি। তাতারিরা 'শাহাদাতাইন' উচ্চারণ করা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে 'কিতাল'র ব্যাপারে যেমনিভাবে তিনি 'ইজমা' দাবি করেছেন, তেমনিভাবে তিনি তাদেরকে মুসলমানও মনে করতেন না। তাতারিদের ব্যাপারে করা স্বতন্ত্র প্রশ্নের জবাব আমরা তার 'মাজমুউল ফাতাওয়া' (২৮/৫০৯) ও 'আলফাতাওয়াল কুবরা' (৩/৫৩৪) থেকে দেখে নিতে পারি। এছাড়াও 'মাজমুউল ফাতাওয়া'র ১০/৬৭৪, ২২/৫১, ২৮/৩৯৯ থেকে তাতারিদের ব্যাপারে করা তাঁর মন্তব্যগুলো দেখে নিতে পারি। তবে যেহেতু তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিলো জনসাধারণকে তাতারিদের বিরুদ্ধে 'কিতালে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করা, তাই তিনি কখনো কখনো তাতারিদের কুফরের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে শুধু 'খারেজি'দের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলতেন, যেহেতু হাদিসে খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে এবং সাহাবায়ে কেরাম তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তাহলে এদের অবস্থা তো আরো শোচনীয়; সুতরাং এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আরো বেশি জরুরি। কখনো আবু বকর রাযি. কর্তৃক যারা যাকাত আদায় করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তাদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেন। এ থেকে এমনটি মনে করার সুযোগ নেই যে, তিনি তাতারিদের মুসলমান মনে করতেন। তাতার সংক্রান্ত তাঁর সবগুলো বক্তব্য সামনে রাখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে কেউ এ আপত্তি করতে পারেন যে, তাতারিদেরকে তিনি শুধু “ইয়াসাক’র কারণে ইসলাম থেকে খারেজ মনে করতেন; বিষয়টি এমন নয়, বরং ইমান পরিপন্থী তাদের আরো অনেক দিক তিনি উল্লেখ করেছেন। আমরাও বলি, তিনি যে সকল দিক উল্লেখ করেছেন তা শতভাগ বর্তমান মানবরচিত আইনের শাসকদের মাঝে বিদ্যমান থাকার দাবি করলে ভুল হবে না।