📄 নির্বাহী শক্তি ও প্রশাসনের কুফর
এতো গেলো বিচারকদের কথা। আর যারা নিজেদেরকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে আল্লাহর আইনের বিপরীতে আইন রচনা করে বা অন্যের রচনা করা আইন নিজেদের জন্য পছন্দ করে সে অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে তথা নির্বাহী শক্তি এবং যারা সে কুফরি সংবিধানের প্রহরী তথা প্রশাসন, তাদের কুফর বুঝানোর জন্য মনে হয় আর বাড়তি কথা বলার প্রয়োজন হবে না।
📄 হাফেয ইবনে কাসিরের আলোচনা
হাফেয ইবনে কাসিরের (মৃ-৭৭৪ হি.) আলোচনা
পূর্বোল্লিখিত 'নুসুস'র সাথে হাফেয ইবনে কাসিরের আলোচনাটি আমরা দেখে নিতে পারি-
وقوله تعالى: "أفحكم الجاهلية يبغون ومن أحسن من الله حكماً لقوم يوقنون" ينكر تعالى على من خرج عن حكم الله المحكم المشتمل على كل خير، الناهي عن كل شر وعدل إلى ما سواه من الآراء والأهواء والاصطلاحات التي وضعها الرجال بلا مستند من شريعة الله، كما كان أهل الجاهلية يحكمون به من الضلالات والجهالات مما يضعونها بآرائهم وأهوائهم، وكما يحكم به التتار من السياسات الملكية المأخوذة عن ملكهم جنكزخان الذي وضع لهم الياسق، وهو عبارة عن كتاب مجموع من أحكام قد اقتبسها من شرائع شتى من اليهودية والنصرانية والملة الإسلامية وغيرها، وفيها كثير من الأحكام أخذها من مجرد نظره وهواه، فصارت في بنيه شرعاً متبعاً يقدمونه على الحكم بكتاب الله وسنة رسول الله ، فمن فعل ذلك منهم فهو كافر يجب قتاله حتى يرجع إلى حكم الله ورسوله، فلا يحكم سواه في قليل ولا كثير. (تفسير ابن كثير، ٨٦/٣)
“তারা কি তবে জাহেলিয়াতের বিধান চায়? আর বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?' আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে তাঁর প্রত্যেক কল্যাণসমৃদ্ধ ও অকল্যাণবর্জিত অকাট্য বিধান থেকে যে বের হয়ে যায় এবং শরয়ি দলিল ব্যতীত মানবরচিত বিভিন্ন মতবাদ, প্রবৃত্তি ও পরিভাষাসমূহ গ্রহণ করে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যেমনিভাবে জাহেলি যুগের লোকেরা তাদের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী রচিত বিভিন্ন ভ্রষ্টতা ও মূর্খতা দ্বারা ফয়সালা করতো। এবং যেমনিভাবে তাতারিরা তাদের বাদশাহ চেঙ্গিস খান থেকে সংগৃহীত রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসারে বিচার করছে, যে তাদের জন্য 'ইয়াসাক' নামক সংবিধান রচনা করেছে। আর তা হচ্ছে, ইহুদিবাদ, খৃস্টবাদ ও ইসলাম ইত্যাদি বিভিন্ন শরিআত থেকে নির্বাচিত অনেকগুলো বিধি-বিধানের সমষ্টিগ্রন্থ। এবং তাতে অনেকগুলো বিধান এমন আছে যা সে শুধু ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চয়ন করেছে। ফলে তা তার সন্তানদের মাঝে একটি অনুসৃত শরিআত হিসেবে অনুমোদিত হয়ে গেছে, যাকে তারা কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করার উপর প্রাধান্য দিচ্ছে। তাদের থেকে যেই এমনটি করবে সে কাফের, তার সঙ্গে কিতাল ওয়াজিব যতোক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে। কিছু-অনেক কোনো ক্ষেত্রেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের বিপরীত ফয়সালা করা যাবে না।” (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৩/৮৬)
وممن توفي فيها من الأعيان: جنكيز خان... وهو الذي وضع لهم الياساق التي يتحاكمون إليها، ويحكمون بها، وأكثرها مخالف لشرائع الله تعالى وكتبه، وهو شيء اقترحه من عند نفسه، وتبعوه في ذلك।
(ثم بعد سطور ذكر بعض الأحكام فيها، ثم قال: ( وفي ذلك كله مخالفة لشرائع الله المنزلة على عباده الأنبياء عليهم الصلاة والسلام، فمن ترك الشرع المحكم المنزل على محمد بن عبد الله خاتم الأنبياء وتحاكم إلى غيره من الشرائع المنسوخة كفر، فكيف بمن تحاكم إلى الياساق وقدمها عليه? من فعل ذلك كفر بإجماع المسلمين. (البداية والنهاية، (১০৮ ، ১০৭/۱۳
“এবং ৬২৪ হিজরিতে যে সকল প্রসিদ্ধ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে চেঙ্গিস খান।... সে তাতারিদের জন্য 'ইয়াসাক' নামক সংবিধান রচনা করেছে যার কাছে তারা বিচারপ্রার্থী হয় এবং সে অনুসারে ফয়সালা করে। যে 'ইয়াসাক'র অধিকাংশ বিধান আল্লাহ প্রদত্ত শরিআত ও প্রেরিত কিতাবাদির বিপরীত। চেঙ্গিস খান নিজ থেকে তা প্রণয়ন করেছে আর তাতারিরা সেটির অনুসরণ করেছে।
(এর কয়েক লাইন পর হাফেয ইবনে কাসির 'ইয়াসাক'র কিছু বিধান উল্লেখ করে বলেন) এ সবকটি বিধানই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর বান্দা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের নিকট প্রেরিত শরিআতের বিপরীত। তো যেখানে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রেরিত অকাট্য শরিআতকে বাদ দিয়ে কেউ যদি কোনো রহিত শরিআতের কাছে বিচারপ্রার্থী হয় তাকে কাফের আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে যে 'ইয়াসাক'র নিকট বিচারপ্রার্থী হয় এবং সেটিকে প্রাধান্য দেয় তার কী হুকুম হবে? যে এমনটি করবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্যে তাকে কাফের আখ্যায়িত করা হবে।” (আলবিদায়া ওয়াননিহায়া -৬২৪ হিজরির আলোচনা-, ১৩/১০৭, ১০৮)
📄 বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি সুস্পষ্ট কুফরি ধারা ও মূলনীতি
উপরিউক্ত আলোচনার পর বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি সুস্পষ্ট কুফরি ধারা ও মূলনীতি পড়ে দেখা আবশ্যকীয় মনে করছি। এটা তো জানা কথা যে, বাংলাদেশের আদালত বৃটিশ আইনে পরিচালিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্রকর্তৃক যিনা(১৯), রিবা (২০) ও মদের (২১) বৈধতা, অপরদিকে ফাতওয়াকে শুধুমাত্র তাদের দৃষ্টিতে ধর্মীয় বিষয়াদির সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেয়া; তাও আবার স্বেচ্ছায় গ্রহণ করার অধিকার(২২) প্রদানসহ মৌলিক ও শাখাগত হাজারো বিষয়ে শরিআতের বিপরীতে সুস্পষ্ট অবস্থান বিধিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। যে সকল আইনকে বাহ্যত শরিআতবিরোধী মনে হয় না; সেগুলোকে এজন্য গ্রহণ করা হয়নি যে তা শরিআতসম্মত, বরং সেগুলোকে এজন্য গ্রহণ করা হয়েছে যে তা গণতন্ত্র ধর্মের বিপরীত নয়। তো ওই সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য আরেকটি রচনার প্রয়োজন। আমি এখানে শুধুমাত্র সংবিধানের সুস্পষ্ট কয়েকটি মৌলিক কুফরি ধারা উল্লেখ করছি; যেনো উপর্যুক্ত আলোচনার সঙ্গে কুফরি ধারাগুলো মিলিয়ে পাঠকের জন্য ফলাফল বের করা সহজ হয়।
টিকাঃ
১৯. যৌনকর্মী: স্বাধীনভাবে জীবিকা বেছে নেয়ার সুযোগে বাংলাদেশে যারা আভিধানিক অর্থে গণিকা তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পতিতা বা নটি নামে অভিহিত না হয়ে পেশাজীবী যৌনকর্মী (পেযৌক) হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।........... রাষ্ট্র গণিকালয়ে পেযৌকদের যৌনকর্ম নিয়ন্ত্রণ-লক্ষ্যে তাদের নাম নিবন্ধন করে এবং তাদেরকে সুনির্দিষ্ট (নিষিদ্ধ) এলাকায় বসবাসে সীমাবদ্ধ রাখে। এসব বসতিস্থল, সাধারণত নটি পাড়া বা বেশ্যা পাড়া নামে পরিচিত। যৌনকর্মীকে নিবন্ধিত হবার আগে গণ লেখ্য- প্রমাণিকের (নোটারি পাবলিক) মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হলফনামা (এফিডেবিট) দিয়ে অনুমতিপত্র নিতে হয়। (বাংলাপিডিয়া, যৌনকর্মী)
২০. ধারা-১৫৭: কতিপয় ক্ষেত্রে কোম্পানী কর্তৃক মূলধন হতে সুদের টাকা পরিশোধের ক্ষমতা: যে ক্ষেত্রে কোন ইমারত বা অন্যবিধ নির্মাণকার্য অথবা দীর্ঘায়িত সময়ের জন্য লাভজনক করা যায় না এমন কোন স্থাপনার (plant) ব্যয় নির্বাহের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কোন কোম্পানী শেয়ার ইস্যু করে, সে ক্ষেত্রে কোম্পানী, উক্ত শেয়ার ইস্যুর সময় পর্যন্ত পরিশোধিত মূলধনের উপর এই ধারার বিধানাবলী সাপেক্ষে, সুদ পরিশোধ করিতে পারিবে; এবং উক্ত সুদকে নির্মাণকার্য বা স্থাপনার ব্যয়ের অংশ ধরিয়া মূলধনের উপর চার্জ সৃষ্টি করিতে পারিবে।..... (কোম্পানী আইন, ১৯৯৪, ১৮ নং আইন)
২১. মাদক (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৯০: এ আইনে এ্যালকোহল ব্যতীত যেকোন ধরনের মাদকদ্রব্যের চাষ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, স্থানান্তর, আমদানি, রাপ্তানি, সরবরাহ, ক্রয়, বিক্রয়, হস্তগতকরণ, সংরক্ষণ, মজুতকরণ, প্রদর্শন এবং ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।..... অবশ্য যেকোন ধরনের মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, ব্যবহার, বহন এবং স্থানান্তরের জন্য লাইসেন্স, অনুমতিপত্র, বা ছাড়পত্রধারী ব্যক্তিদের বেলায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হইবে না। তবে বৈধ লাইসেন্স, অনুমতিপত্র বা পাশ ছাড়া এ নিষেধাজ্ঞাসমূহ ভঙ্গ করা দণ্ডনীয় অপরাধ.....। (বাংলাপিডিয়া, ফৌজদারি দণ্ডবিধি)
২২. ..... ধর্মীয় বিষয়াদিতে শুধু সঠিক শিক্ষিত ব্যক্তিগণ ফতোয়া দিতে পারবেন, যা শুধু স্বেচ্ছায় গ্রহণযোগ্য। কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ বা অনুচিত প্রভাব প্রয়োগ করা যাবে না। (দৈনিক ইনকিলাব, ২৮ জানুয়ারি, বুধবার ২০১৫ ইং)
📄 ক) আইন প্রণয়নের অধিকার মানবের হাতে
ক) আইন প্রণয়নের অধিকার মানবের হাতে: ধারা: ৭। (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান - পঞ্চদশ সংশোধন আইন ২০১১- প্রথম ভাগ, প্রজাতন্ত্র, পৃঃ ৩)