📘 মুসলিম বিশ্ব ও সমকালীন মাসায়েল 📄 আয়াতের ক্ষেত্র নির্ণয়

📄 আয়াতের ক্ষেত্র নির্ণয়


আরেকটি কথা আমাদের সকলেরই জানা আছে যে, আয়াতটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হলেও হুকুম সবার জন্য ব্যাপক। কারো সন্দেহ থাকলে তাফসিরের কিতাবাদি দেখে নিতে পারেন।(১১) তবে এক্ষেত্রে ইমাম শা'বির (মৃ-১০৩ হি.) ব্যাখ্যাটি স্পষ্ট। (১২)

عن الشعبي أنه قال: نزلت "الكافرون" في المسلمين، و"الظالمون" في اليهود، و"الفاسقون" في النصارى. (تفسير ابن جرير الطبري، ٣٥٣/١٠)

“ইমাম শা'বি বলেন, 'কাফিরুন' অবতীর্ণ হয়েছে মুসলমানের ক্ষেত্রে, ‘যালিমুন' ইহুদিদের ক্ষেত্রে আর 'ফাসিকুন' খৃস্টানদের ক্ষেত্রে।”(১৩) (তাফসিরে ইবনে জারির তাবারি, ১০/৩৫৩)

ইবনে জুযাই আলকালবির তাফসিরে ইমাম শাফেয়ির (মৃ-২০৪ হি.) দিকে নিসবত করে এমন ব্যাখ্যা উল্লেখ হয়েছে। ইবনে জুযাই বলেন,

قال الشافعي: الكافرون في المسلمين، والظالمون في اليهود، والفاسقون في النصارى. (تفسير ابن جزي الكلبي، ۲۳۸/۱)

“ইমাম শাফেয়ি বলেন, 'কাফিরুন' অবতীর্ণ হয়েছে মুসলমানের ক্ষেত্রে, 'যালিমুন' ইহুদিদের ক্ষেত্রে আর 'ফাসিকুন' খৃস্টানদের ক্ষেত্রে'।” (তাফসিরে ইবনে জুযাই আলকালবি, ১/২৩৮)(১৪)

টিকাঃ
১১. একটি দীর্ঘ হাদিসের সংক্ষিপ্ত বর্ণনার কারণে কেউ কেউ সংশয়ের শিকার হয়েছেন। সংক্ষিপ্ত বর্ণনাটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদ বলেন,

حدثنا أبو معاوية، حدثنا الأعمش، عن عبد الله بن مرة، عن البراء بن عازب، عن النبي ﷺ قوله: "وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ"، "وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ"، "وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ"، قال: هي في الكفار كلها. (مسند الإمام أحمد، ٤٩٤/٣٠ ، رقم الحديث : ١٨٥٢٩)

উক্ত বর্ণনার আলোকে কেউ কেউ দাবি করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, উল্লিখিত সকল আয়াত শুধু কাফেরদের জন্য প্রযোজ্য। তাই আয়াতগুলোর ব্যাপকতার দাবি করা ভুল।

অথচ এটি একটি দীর্ঘ হাদিসের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। বলা যায় সংক্ষেপণটি ত্রুটিযুক্ত (اختصار مخل) হয়েছে। হুবহু উক্ত সনদে ইমাম আহমাদ কয়েকটি হাদিস পূর্বে (১৮৫২৫ নম্বরে) দীর্ঘ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিমসহ অনেক মুহাদ্দিস তা বর্ণনা করেছেন। দীর্ঘ হাদিসটি সামনে রাখলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা নয়, বরং তা বারা ইবনে আযেবের রাযি. বক্তব্য। স্পষ্টতার বিবেচনায় সহিহ মুসলিম থেকে বর্ণনাটি উল্লেখ করছি। ইমাম মুসলিম বলেন,

حدثنا يحيى بن يحيى وأبو بكر بن أبي شيبة كلاهما عن أبي معاوية، قال يحيى: أخبرنا أبو معاوية عن الأعمش عن عبد الله بن مرة عن البراء بن عازب قال: مر على النبي ﷺ بيهودي محمماً مجلوداً، فدعاهم ﷺ فقال: هكذا تجدون حد الزاني في كتابكم? قالوا: نعم! فدعا رجلاً من علمائهم فقال : أنشدك بالله الذي أنزل التوراة على موسى، أهكذا تجدون حد الزاني في كتابكم? قال" لا ! ولولا أنك نشدتني بهذا لم أخبرك، نجده الرجم، ولكنه كثر في أشرافنا، فكنا إذا أخذنا الشريف تركناه، وإذا أخذنا الضعيف أقمنا عليه الحد، قلنا: تعالوا فلنجتمع على شيء نقيمه على الشريف والوضيع، فجعلنا التحميم والجلد مكان الرجم. فقال رسول الله ﷺ: اللهم إنى أول من أحيا أمرك إذ أماتوه. فأمر به فرجم، فأنزل الله عز وجل: "يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنُكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ" إلى قوله "إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ" يقول: ائتوا محمداً، فإن أمركم بالتحميم والجلد فخذوه وإن أفتاكم بالرجم فاحذروا. فأنزل الله تعالى "وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ"، "وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ"، "وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ"، في الكفار كلها। (صحيح مسلم، كتاب الحدود، باب رجم اليهود أهل الذمة في الزنى، ص ٧٢٦ ، رقم الحديث: ٤٤٤٠)

আরবি জানা যেকোনো হাদিসের ছাত্রের কাছে এটি স্পষ্ট হবে যে, উল্লিখিত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইহুদি আলেমের কথোপকথনের পর এখানে দাগটানা অংশটি পুরোই বারা ইবনে আযেবের রাযি. বক্তব্য। সুতরাং শুধু কাফেরদের জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথাটি বারা ইবনে আযেবের রাযি., রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয়। ইমাম আবু বকর আলজাসসাস 'আহকামুল কুরআনে এটিকে বারা ইবনে আযেবের রাযি. কথা হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,

وقال البراء بن عازب وذكر قصة رجم اليهود فأنزل الله تعالى: يا أَيُّهَا الرَّسُولُ لا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسارِعُونَ فِي الْكُفْرِ الآيات إلى قوله - وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولئِكَ هُمُ الكافِرُونَ، قال: في اليهود خاصة، وقوله: فَأُولئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ، فَأُولئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ، فِي الكفار كلهم। (أحكام القرآن، ٩٣/٤)

হাঁ! বারা ইবনে আযেব রাযি. ও ইবনে আব্বাস রাযি. (এক বর্ণনা অনুযায়ী) এমনটি দাবি করলেও ইবনে মাসউদ রাযি., হাসান বসরি ও ইবরাহিম নাখায়ি ব্যাপকতার দাবি করেছেন। তেমনিভাবে হুযাইফা রাযি. বলেছেন, বনি ইসরাইলের জন্য নাযেল হলেও তোমরাও হুবহু সে পথেই চলবে। (দেখুন: আহকামুল কুরআন, জাসসাস, ৪/৯৩)

এছাড়াও আয়াতকে 'জুহুদ' অস্বীকারের শর্তে শর্তযুক্ত বা 'কুফরে আসগর' দ্বারা কুফরের ব্যাখ্যা করা (এ দুটি ব্যাখ্যাও ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে) থেকেও ব্যাপকতার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। তাফসিরের কিতাবাদি অধ্যয়ন করলে আয়াতগুলো ব্যাপক হওয়ার প্রাধান্যের বিষয়টি যেকোনো পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে।

১২. ইমাম শা'বির ব্যাখ্যাকে প্রণিধানযোগ্য বা স্পষ্ট বলা হয়েছে। এটিকে একমাত্র ব্যাখ্যাও বলা হয়নি এবং 'জুহুদ' অস্বীকারের শর্তে শর্তযুক্ত বা 'কুফরে আসগর' দ্বারা কুফরের ব্যাখ্যা করাকেও এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। বরং সামনে উভয় ব্যাখ্যার পর্যালোচনা উল্লেখ হয়েছে। সুতরাং পূর্ণ আলোচনা না পড়ে কেউ যদি আমার দিকে 'খিয়ানত' বা 'দেখেও না দেখার ভান করা'র অপবাদ দিয়ে থাকেন, তা স্পষ্ট বদ গুমানি হবে। আল্লাহ তাআলা সব ধরনের 'খিয়ানত', 'তাজাহুল' ও বদ গুমানি থেকে আমাদেরকে হেফাযত করুন, আমিন।

১৩. ইমাম শা'বির ব্যাখ্যার বাস্তবতা অনুধাবন না করেই কেউ কেউ হয়তো তাঁর ব্যাখ্যার উপর আপত্তি করতে পারেন। ইবনে মাসউদ রাযি., হাসান বসরি, ইবরাহিম নাখায়ি ও হুযাইফা রাযি.; জাসসাসের উদ্ধৃতিতে যাদের ব্যাখ্যার দিকে পূর্বে ইঙ্গিত করা হয়েছে, ইমাম শা'বি তাদের ব্যাখ্যার ব্যতিক্রম কিছু বলেননি। অর্থাৎ আলোচ্য আয়াত যেহেতু ইহুদি কর্তৃক 'কুফরে আকবর'র প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছে, তাই মুসলমান কর্তৃক সে পর্যায়ের অবস্থান তৈরি হলে তাও 'কুফরে আকবর'ই হবে। হাঁ! ইমাম শা'বি অতিরিক্ত যা করেছেন তা হচ্ছে, যদিও কুরআনে কারিমে 'ফাসিক' ও 'যালিম' শব্দদ্বয় সাধারণত কাফেরের জন্য ব্যবহার হয়েছে এবং এখানেও তাই হয়েছে। তবে যেহেতু 'ফাসিক' ও 'যালিম' উভয় শব্দ থেকে ভিন্ন অর্থ বুঝার সুযোগ আছে, আর 'কাফির' শব্দ কুফরের অর্থে অনেকটা অকাট্য। তাই তিনি স্পষ্ট করার জন্য 'কাফিরুন' শব্দকে মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। অন্যথায় মূল মাসআলায় ইবনে মাসউদ রাযি. প্রমুখের সঙ্গে তাঁর দাবির কোনো পার্থক্য নেই। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। ইমাম শা'বিকে কিন্তু উক্ত ব্যাখ্যার কারণে 'খারেজি' আখ্যা দেয়া হয়নি।

১৪. তাফসিরে ইবনে জুযাই আলকালবির আমাদের দেখা কপিতে এভাবে উল্লেখ হয়েছে। যদি এখানে ইমাম শাফেয়ির উল্লেখ যথাযথ না হয়ে থাকে, তা আলোচ্য বিষয়ে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ, আমরা তা শুধু ইমাম শা'বির ব্যাখ্যার সমর্থন হিসেবে উল্লেখ করেছি। মৌলিকভাবে আমাদের উদ্দেশ্য ইমাম শা'বির ব্যাখ্যা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px