📘 মুসলিম বিশ্ব ও সমকালীন মাসায়েল 📄 মানবরচিত আইনের শাসক, বিচারক ও প্রহরী মুরতাদ

📄 মানবরচিত আইনের শাসক, বিচারক ও প্রহরী মুরতাদ


মাসআলা: যে সরকার আল্লাহ প্রদত্ত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে না; বরং তার বিপরীতে মানবরচিত আইন গ্রহণ বা প্রণয়ন করে সকল নাগরিকের জন্য সেটির বিরোধিতা অপরাধ হিসেবে বিধিবদ্ধ করে দেয় এবং যে সকল বিচারক মানবরচিত আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে এবং যে সকল বাহিনী এই কুফরি আইনের প্রহরী ও বিরোধীদের জন্য খড়গহস্ত; তারা জন্মসূত্রে মুসলমান হয়ে থাকলেও তাদের কৃতকর্মের কারণে মুরতাদ হয়ে গেছে। মুসলমান হতে হলে তাদেরকে নতুন করে ইমান আনতে হবে।(৯)

টিকাঃ
৯. ক) এই গ্রন্থে আমার দাবি স্পষ্ট। আমি এখানে এবং সামনে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের আলোচনায় শুধু তিনশ্রেণির (নির্বাহী শক্তি, প্রশাসন ও বিচারবিভাগ) কুফরের কথা বলেছি। সুতরাং কেউ যদি তিনে তিনে নয় (?) মিলিয়ে আমার দিকে জনসাধারণকে 'তাকফির' করার নিসবত করেন, তা স্পষ্ট অপবাদ ও মিথ্যাচার।

এখানে আরেকটি বিষয় মাথায় রেখে সামনে অগ্রসর হওয়া উচিত। আমার দেয়া শিরোনামেও রয়েছে 'মানবরচিত আইনের...' এবং মাসআলা বর্ণনায় আরো 'তাফসিল' করা হয়েছে। এর বিপরীতে খারেজিরা যাদেরকে 'তাকফির' করেছিলো তাদেরকে কেউ কখনো মানবরচিত আইনের শাসক-বিচারক বলেননি। খিলাফত পতনের পূর্ব তথা যতোদিন পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহ মৌলিকভাবে সংবিধান ছিলো, তখনকার কোনো শাসক-বিচারকের ঘুষ বা স্বজনপ্রীতির কারণে শরিআত অনুযায়ী ফয়সালা না করার প্রেক্ষাপট, আর খিলাফত পতনের পর তথা যখন কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক মানবরচিত আইন সংবিধান হিসেবে স্থান পেয়েছে, তখন শাসক-বিচারকদের আল্লাহ তাআলার আইনের বিপরীতে ফয়সালা করার প্রেক্ষাপট; কেউ যদি উভয় প্রেক্ষাপটের মাঝে পার্থক্য করতে না পারেন, তাহলে তিনি হয়তো আমার দাবির বিপরীতে সমস্ত তাফসিরের কিতাব থেকে শত শত উদ্ধৃতি পেশ করে আমাকে জাহেল বা খিয়ানতকারী আখ্যা দিতে পারবেন, তবে দিনশেষে তিনি যে আমার দাবি ও দাবির প্রতিটি শব্দ লক্ষ্য করেননি সেটিই প্রমাণিত হবে। মানবরচিত আইনের শাসক-বিচারকদের সাদৃশ্যতা উমাইয়া-আব্বাসি শাসক-বিচারকদের মাঝে নয়; মুফাসসিরিনে কেরাম খারেজিদের কুফরের হুকুম যাদের থেকে প্রতিহত করেছেন, বরং তাদের সাদৃশ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে ইহুদিদের মাঝে; যাদেরকে কেন্দ্র করে দলিলে উল্লিখিত আয়াতটি নাযেল হয়েছে, এবং আরো খুঁজে পাওয়া যাবে 'তাতারি'দের মাঝে; যারা মুখে 'শাহাদাতাইন' উচ্চারণ করলেও 'ইয়াসাক' নামক মানবরচিত সংবিধানের আলোকেই ফয়সালা করতো। সামনে বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ।

খ) এটি স্পষ্ট 'তাকফিরে উমুম' তথা ব্যক্তি নির্দিষ্ট না করে শুধু কোনো মতবাদ, কথা বা কাজ কুফর হওয়ার বিষয় স্পষ্ট করে বলা যে, যারা এমন মতবাদ লালন করে বা এমনটি বলে বা করে তারা কাফের। এটি 'তাকফিরে মুআইয়ান' তথা ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলা নয়; যেক্ষেত্রে 'তাকফির'র প্রতিবন্ধক বিষয়াদি দেখার প্রয়োজন হয়। এ দুয়ের পার্থক্য মাথায় না রেখে কেউ কেউ অনর্থক কিছু ফলাফল বের করে থাকেন যা দুঃখজনক। এ ছাড়াও 'তাকফির'র প্রতিবন্ধক বিষয়াদি থেকে 'জাহালত' ও 'ইকরাহ'র সীমা কী? সেটির আলোচনা সামনে আসছে।

📘 মুসলিম বিশ্ব ও সমকালীন মাসায়েল 📄 দলিল

📄 দলিল


সাধারণত এ বিষয়ে সুরা মায়েদার ৪৪ নম্বর আয়াত "ومن لم يحكم بما أنزل الله" (যারা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের) কে দলিল হিসেবে পেশ করা হয়। (১০) "ارتداد الحكام" (মানবরচিত আইনের বিচারক ও শাসকের 'ইরতিদাদ') 'بغير ما أنزل الله ( প্রমাণের জন্য 'সরিহ'-সুস্পষ্ট এই একটি আয়াতই যথেষ্ট। যদিও এর সমর্থনে আরো বহু আয়াত ও হাদিস বিদ্যমান আছে। উসুলে ফিকহের পরিভাষায় যেগুলো "قطعي الثبوت" হওয়ার পাশাপাশি "قطعي الدلالة" -ও বটে। তাই অর্থ ও ব্যাখ্যা করে 'ওযহে ইসতেদলাল' বুঝানোর প্রয়োজন নেই। যদি কোনো ধরনের অস্পষ্টতা মেনেও নেয়া হয়, তা সামনের আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১০. প্রথম সংস্করণেও বলা হয়েছে, সাধারণত এই আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করা হয়। এটিকে অন্যতম দলিল, সবচেয়ে বড়ো দলিল বা একমাত্র দলিল বলা হয়নি। হ্যাঁ! উক্ত আয়াতকেন্দ্রিক কিছু সংশয় সামনে আসায় অনেক গবেষক আলেম দাবির পক্ষে উক্ত আয়াতের পরিবর্তে অন্যান্য আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করে থাকেন। তবে সংশয়গুলোর পর্যালোচনার বিষয় সামনে রেখে আমি উক্ত আয়াতকে দলিল হিসেবে নির্বাচন করেছি। এ ছাড়াও সংশয়বাদী কর্তৃক সংশয় সৃষ্টির কারণে যৌক্তিক কোনো দলিলকে পরিহার করা আমি অযৌক্তিক মনে করি।

📘 মুসলিম বিশ্ব ও সমকালীন মাসায়েল 📄 আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা

📄 আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনা


আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি উল্লেখ করে বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি করার প্রয়োজন ছিলো না। তবে ঘটনা থেকে যেহেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় প্রতিভাত হয়, তাই পরবর্তিতে আলোচনার সুবিধার্থে পূর্ণ ঘটনাটি উল্লেখ করছি। বিভিন্ন হাদিস ও তারিখের আলোকে ইমাম বাগাবি ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।

ذكر البغوي هذه القصة: بأنَّ رجلاً وامرأة من أشراف أهل خيبر زنيا وكانا محصنين، وكان حدهما الرجم في التوراة، فكرهت اليهود رجمهما لشرفهما، فقالوا: إن هذا الرجل الذي بيثرب ليس في كتابه الرجم ولكنه الضرب، فأرسلوا إلى إخوانكم من بني قريظة فإنهم جيرانه وصلح له فليسألوه عن ذلك। فبعثوا رهطا منهم مستخفين وقالوا لهم: سلوا محمداً عن الزانيين إذا أحصنا ما حدهما؟ فإن أمركم بالجلد فاقبلوا منه، وإن أمركم بالرجم فاحذروه ولا تقبلوا منه، وأرسلوا معهم الزانيين، فقدم الرهط حتى نزلوا على بني قريظة والنضير فقالوا لهم: إنكم جيران هذا الرجل ومعه في بلده وقد حدث فينا حدث، فلان وفلانة قد فجرا وقد أحصنا، فنحب أن تسألوا لنا محمداً عن قضائه فيه، فقالت لهم قريظة والنضير : إذا والله يأمركم بما تكرهون. ثم انطلق قوم منهم كعب بن الأشرف وكعب بن أسد وسعية بن عمرو ومالك بن الصيف وكنانة بن أبي الحقيق وغيرهم إلى رسول الله ﷺ، فقالوا: يا محمد أخبرنا عن الزاني والزانية إذا أحصنا ما حدهما في كتابك؟
فقال ﷺ: هل ترضون بقضائي؟ قالوا: نعم، فنزل جبريل عليه السلام بالرجم فأخبرهم بذلك, فأبوا أن يأخذوا به।
فقال له جبريل عليه السلام: اجعل بينك وبينهم ابن صوريا، ووصفه له।
فقال لهم رسول الله ﷺ: "هل تعرفون شاباً أمرد أعور يسكن فدك يقال له ابن صوريا؟ قالوا: نعم، قال: فأي رجل هو فيكم؟ فقالوا: هو أعلم يهودي بقي على وجه الأرض بما أنزل الله سبحانه وتعالى على موسى عليه السلام في التوراة.
قال: فأرسلوا إليه، ففعلوا فأتاهم، فقال له النبي ﷺ: "أنت ابن صوريا"؟ قال: نعم، قال: وأنت أعلم اليهود؟ قال: كذلك يزعمون، قال: أتجعلونه بيني وبينكم؟ قالوا: نعم.
فقال له النبي ﷺ : " أنشدك بالله الذي لا إله إلا هو الذي أنزل التوراة على موسى عليه السلام وأخرجكم من مصر، وفلق لكم البحر وأنجاكم وأغرق آل فرعون، والذي ظلل عليكم الغمام وأنزل عليكم المن والسلوى، وأنزل عليكم كتابه وفيه حلاله وحرامه، هل تجدون في كتابكم الرجم على من أحصن؟"
قال ابن صوريا : نعم والذي ذكرتني به لولا خشية أن تحرقني التوراة إن كذبت أو غيرت ما اعترفت لك، ولكن كيف هي في كتابك يا محمد? قال: "إذا شهد أربعة رهط عدول أنه قد أدخله فيها كما يدخل الميل في المكحلة وجب عليه الرجم"، فقال ابن صوريا: والذي أنزل التوراة على موسى هكذا أنزل الله عز وجل في التوراة على موسى عليه السلام، فقال له النبي ﷺ: "فما كان أول ما ترخصتم به أمر الله?"، قال: كنا إذا أخذنا الشريف تركناه وإذا أخذنا الضعيف أقمنا عليه الحد، فكثر الزنا في أشرافنا حتى زنى ابن عم ملك لنا فلم نرجمه، ثم زنى رجل آخر من الناس فأراد ذلك الملك رجمه فقام دونه قومه، فقالوا: والله لا ترجمه حتى يرجم فلان لابن عم الملك فقلنا: تعالوا نجتمع فلنضع شيئاً دون الرجم يكون على الوضيع والشريف، فوضعنا الجلد والتحميم، وهو أن يجلد أربعين جلدة بحبل مطلي بالقار ثم يسود وجوههما، ثم يحملان على حمارين ووجوههما من قبل دبر الحمار ويطاف بهما، فجعلوا هذا مكان الرجم، فقالت اليهود لابن صوريا: ما أسرع ما أخبرته به، وما كنا لما أثنينا عليك بأهل ولكنك كنت غائباً فكرهنا أن نغتابك، فقال لهم: إنه قد أنشدني بالتوراة ولولا خشية التوراة أن تهلكني لما أخبرته، فأمر بهما النبي ﷺ فرجما عند باب مسجده، وقال: اللهم إني أول من أحيى أمرك إذا أماتوه، فأنزل اللهُ عَزَّ وَجَلَّ {يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنُكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ}. (تفسير البغوي، ٥٥/٣، تفسير المظهري، ١٤٠/٣، معارف القرآن للمفتي محمد شفيع، ١٤١/٣)

“খাইবারের অভিজাত পরিবারের দুই বিবাহিত পুরুষ ও মহিলা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। তাওরাত অনুযায়ী তাদের 'রজম' পস্তরাঘাতে হত্যার বিধান ছিলো। তাদের আভিজাত্যের কারণে ইহুদিরা তাদেরকে পস্তরাঘাতে হত্যা করতে অপছন্দ করলো। তখন তারা পারস্পরিক আলোচনা করলো যে, ইয়াসরিব-মদিনার এই লোকটির (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিতাবে 'রজম'র বিধান নেই, বরং তাতে প্রহারের কথা আছে। তাই তোমরা তোমাদের স্বজাতি বনি কুরাইযার নিকট সংবাদ পাঠাও তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে। কেননা বনি কুরাইযা তার প্রতিবেশী এবং তার সঙ্গে তাদের সন্ধি রয়েছে। অতঃপর তারা গোপনে তাদের একটি কাফেলাকে প্রেরণ করলো এবং বলে দিলো, তোমরা মুহাম্মাদকে জিজ্ঞাসা করবে যে, ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া দুই বিবাহিত পুরুষ-মহিলার শাস্তি কী? যদি সে প্রহারের কথা বলে তাহলে গ্রহণ করবে, আর যদি 'রজম'র কথা বলে তাহলে বিরত থাকবে এবং গ্রহণ করবে না। তারা তাদের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া দুই পুরুষ-মহিলাকেও পাঠিয়ে দিয়েছে।

অতঃপর ওই কাফেলা আগমন করে বনি কুরাইযা ও নাযিরের নিকট আসলো এবং তাদেরকে বললো, তোমরা এই লোকটির প্রতিবেশী এবং তার সঙ্গে তার এলাকায় অবস্থান করছো। আমাদের এখানে একটি ঘটনা ঘটে গেছে। অমুক পুরুষ ও অমুক মহিলা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে অথচ দু'জনই বিবাহিত। এজন্য আমরা চাচ্ছি, তোমরা মুহাম্মাদকে এ বিষয়ের ফয়সালা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো। কুরাইযা ও নাযির তাদেরকে বললো, আল্লাহর কসম করে বলছি, সে যে আদেশ দেবে তা তোমরা পছন্দ করবেন না।

অতঃপর কা'ব ইবনুল আশরাফ, কা'ব ইবনে আসাদ, সা'ইয়া ইবনে আমর, মালেক ইবনুস সাইফ এবং কিনানা ইবনে আবিল হুকাইক প্রমুখের এক কাফেলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো, হে মুহাম্মাদ! বিবাহিত কোনো পুরুষ-মহিলা যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমার কিতাবে তার কী শাস্তি রয়েছে?

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি আমার ফয়সালায় সন্তুষ্ট হবে? তারা বললো, হাঁ! তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম 'রজম'র বিধান নিয়ে অবতরণ করলেন, আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তা জানিয়ে দিলেন। তখন তারা সেটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালো।

জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইবনে সুরিয়ার আকৃতির বিবরণ দিয়ে বললেন, আপনি আপনার ও তাদের মাঝে ইবনে সুরিয়াকে নিযুক্ত করুন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি কেশবিহীন কানা এক যুবককে চেনো যে 'ফাদাক' এলাকায় বসবাস করে, যার নাম ইবনে সুরিয়া? তারা বললো, হাঁ! তিনি আবার তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা তাকে কেমন জানো? তারা বললো, আল্লাহ তাআলা তাওরাতে মুসা আলাইহিস সালামের উপর যা অবতীর্ণ করেছেন, সেটির ব্যাপারে বর্তমানে পৃথিবীর বুকে ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো আলেম সে।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, তাকে ডেকে পাঠাও। তারা সংবাদ পৌঁছালো এবং সে আসলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমিই কি ইবনে সুরিয়া? সে বললো, হাঁ! তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি ইহুদিদের সবচেয়ে বড়ো আলেম? সে বললো, লোকেরা এমনই ধারণা করে। তিনি ইহুদিদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কি আমার ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করার জন্য ইবনে সুরিয়াকে নিযুক্ত করবে? তারা বললো, হাঁ!

তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে সুরিয়ার দিকে ফিরে বললেন, আমি তোমাকে ওই আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি যিনি ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই, যিনি মুসা আলাইহিস সালামের উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন, যিনি তোমাদেরকে মিসর থেকে বের করেছেন এবং সমুদ্রকে তোমাদের জন্য বিদীর্ণ করে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন আর ফেরআউনের বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছেন, যিনি তোমাদের উপর মেঘমালার ছায়া দিয়েছেন ও মান্না-সালওয়া পাঠিয়েছেন এবং যিনি তোমাদের জন্য তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তাঁর হালাল ও হারাম বিষয়গুলো রয়েছে; সত্য করে বলোতো, তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া বিবাহিত পুরুষ-মহিলাকে পস্তরাঘাত করে হত্যার বিধানটি কি নেই?

イবনে সুরিয়া বললো, হাঁ! আপনি যা উল্লেখ করেছেন; যদি মিথ্যা বললে বা বিকৃত করলে তাওরাত আমাকে জ্বালিয়ে দেয়ার ভয় না করতাম, তাহলে আমি আপনার সামনে স্বীকার করতাম না। কিন্তু, হে মুহাম্মাদ! তোমার কিতাবে এই বিধানের বিবরণ কেমন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন চারজন নিষ্ঠাবান ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে যে, তারা পুরুষের পুরুষাঙ্গকে মহিলার যৌনাঙ্গে এমনভাবে প্রবিষ্ট করতে দেখেছে, যেমনিভাবে সুরমাদানিতে সুরমাদণ্ড ঢুকানো হয়; তখন তার উপর 'রজম' ওয়াজিব হয়ে যাবে। তখন ইবনে সুরিয়া বললো, ওই আল্লাহর কসম করে বলছি যিনি মুসা আলাইহিস সালামের উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন, তাওরাতেও আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের উপর বিধানটি এভাবেই অবতীর্ণ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ তাআলার বিধানের বিপরীতে অন্য বিধানের অনুমতিদানের সূচনা কীভাবে হয়েছিলো? ইবনে সুরিয়া বললো, আমরা অভিজাত পরিবারের কেউ ধরা খেলে তাকে ছেড়ে দিতাম আর দুর্বলদের কেউ ধরা খেলে তার উপর শাস্তি আরোপ করতাম। ফলে অভিজাত পরিবারে ব্যভিচার ব্যাপক হয়ে গেলো। এক পর্যায়ে আমাদের এক বাদশাহর চাচাতো ভাই ব্যভিচারে লিপ্ত হলে আমরা তাকে পস্তরাঘাত করে হত্যা করিনি।

পরবর্তীতে সাধারণ এক লোক ব্যভিচারে লিপ্ত হলো। ওই বাদশাহ যখন তাকে 'রজম' করতে চাইলো তখন ওই ব্যক্তির গোত্রের লোকেরা সে ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। তারা বললো, আল্লাহর কসম করে বলছি, আপনার চাচাতো ভাইকে 'রজম' করার পূর্বে আপনি আমাদের এই লোককে 'রজম' করতে পারবেন না। তখন আমরা বললাম, আসুন! আমরা সকলেই একত্রিত হয়ে 'রজম'র পরিবর্তে আরেকটি বিধান রচনা করি, যা আমাদের অভিজাত ও সাধারণ সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অতঃপর আমরা বেত্রাঘাত ও মুখ কালোকরণের বিধানটি রচনা করি। আর সেটির পদ্ধতি হলো, আলকাতরার প্রলেপ দেয়া রশি দিয়ে চল্লিশবার প্রহার করা হবে, অতঃপর উভয়ের মুখমণ্ডলকে কৃষ্ণবর্ণ করে চেহারাকে গাধার পাছার দিকে করে দু'টি গাধায় দু'জনকে চড়ানো হবে এবং ঘুরানো হবে। তারা 'রজম'র পরিবর্তে এটিকেই প্রণয়ন করেছে। এতোটুকুর পর ইহুদিরা ইবনে সুরিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো, এ বিষয়ে তাকে অবগত করার ব্যাপারে তুমি তাড়াহুড়া করে ফেলেছো। আমরা যে তোমার প্রশংসা করেছি, আসলে তুমি প্রশংসার উপযুক্ত ছিলে না, কিন্তু তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার সমালোচনা করাটা আমরা পছন্দ করিনি। ইবনে সুরিয়া তাদেরকে বললো, তাওরাত আমাকে ধ্বংস করে দেয়ার যদি ভয় না করতাম, তাহলে আমি তাকে এ বিষয়ে অবগত করতাম না। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশে উভয়কে মসজিদে নববির দরজায় পস্তরাঘাত করে হত্যা করা হলো। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আল্লাহ! আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি; যে আপনার একটি বিধানকে যিন্দা করেছে, তারা সেটিকে নিঃশেষ করে দেয়ার পর। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, 'হে রাসুল, তোমাকে যেন তারা চিন্তিত না করে, যারা কুফরে দ্রুত ছুটছে।” (তাফসিরে বাগাবি, ৩/৫৫, তাফসিরে মাযহারি, ৩/১৪০, মাআরিফুল কুরআন, ৩/১৪১)

📘 মুসলিম বিশ্ব ও সমকালীন মাসায়েল 📄 উল্লিখিত ঘটনায় কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়

📄 উল্লিখিত ঘটনায় কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়


ক) তাওরাত সত্য কিতাব হওয়ার ব্যাপারে ইবনে সুরিয়ার বিশ্বাস লক্ষণীয়। অন্যায় কথা বলার ক্ষেত্রে তাওরাত তাকে জ্বালিয়ে দেয়ার ভয় পাচ্ছে এবং আল্লাহর নাম নিয়ে কসম দেয়ায় এমন সত্য বলতে প্রস্তুত হয়েছে, যাতে তার সম্প্রদায়ের জন্য অপমান নিহিত ছিলো।

খ) তারা তাওরাতের 'রজম'র বিধান আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিল হওয়াকে অস্বীকার করেনি। তাওরাতের হুকুমকে গোপন করে সেটির বিপরীতে নিজেদের পক্ষ থেকে আরেকটি বিধান কার্যকর করেছে।

গ) ইহুদি আলেমরা নিজেদের নির্ধারণ করা শাস্তিকে কোনো বিধিবদ্ধের রূপ দেয়নি বা তাওরাতের বিপরীতে কোনো সংবিধান রচনা করেনি। বরং রজমের বিধান তখনও তাওরাতে বিদ্যমান আছে। তাদের পরিবর্তনটা শুধু মৌখিক ছিলো।

ঘ) এ পর্যায়ের অবস্থানের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যারা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের'।

ফন্ট সাইজ
15px
17px