📄 আমার পক্ষ থেকে উপহার
এই পাতা কয়টিতে আমি যা লিখেছি সেগুলো নিয়ে একটু চিন্তা করলেই যে-কেউ এটা লেখার হাকিকত বুঝতে পারবে। আমার উদ্দেশ্যও হলো—নেক কাজ, তাকওয়া এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হিজরত করার কয়েকটি পাথেয় যোগান দেওয়া। ইলম অর্জনের পথে আমার সতীর্থদের জন্য আমি তা আগাম উপহার হিসেবে পেশ করছি। আল্লাহ তাআলাকে সাক্ষী রেখে বলছি, তাদের কেউ এ উপহারটুকু পেলে অবশ্যই সেটা লুফে নেবে, তা অনুধাবন করতে চেষ্টা করবে এবং মনে করবে যে, এটা বন্ধুর প্রতি আরেক বন্ধুর শ্রেষ্ঠ উপহার। এটা ছাড়া সংবাদবাহক কাফেলা যেসব সংবাদ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সেগুলোর উপকারিতা নিতান্তই সামান্য। কিন্তু মানুষ সেসবের প্রতিই আগ্রহী। সচরাচর উপভোগ্য বলে তা দামেও সস্তা। বাস্তবে কল্যাণকর উপহার তো প্রজ্ঞাপূর্ণ আলোচনা, যা এক মুসলমান অপর মুসলমান ভাইকে দিয়ে থাকে।
📄 এই সফরে ইচ্ছুকদের করণীয়
এই সফর করতে চাইলে মৃত ব্যক্তিদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা উচিত। কারণ জগতে প্রকৃতপক্ষে তারাই জীবিত। তাদের সান্নিধ্যে থেকেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। মানুষের মাঝে যারা জীবিত, বাস্তবিক অর্থে তারা মৃত। তাদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলতে হবে। এ পথের পথিকদের তথাকথিত 'জীবিত'দের সংস্পর্শের তুলনায় তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। এজন্যই সালাফে সালিহীনের অনেকে বলতেন, জীবিত লোকের সংস্পর্শে গিয়ে অন্তরের মৃত্যু ঘটানোর চেয়ে, মৃত লোকের সান্নিধ্যে অন্তর তরতাজা করা অনেক ভালো।
আত্মীয়-স্বজন এবং স্বজাতির লোকের মাধ্যমেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। এদের কারণে তার দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী হয় না, তাদের সাথে নিজের মিল দেখে মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং তারা যে পথে চলে, সেদিকে চলার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এমনকি তারা সাপের গর্তে ঢুকলে, তাদের সাথে সেখানেও ঢুকতে পছন্দ করে।
ব্যক্তি হারিয়ে গেছে, কিন্তু পৃথিবী তার কীর্তি স্মরণ রেখেছে—এমন সব লোকের সান্নিধ্যে গেলে মনোবল উন্নত হয়। এর মাধ্যমে নতুন উদ্যম ও অভিনব কাজের সূচনা ঘটে। ব্যক্তি তখন প্রসিদ্ধ আর উচ্চ বংশীয় হলেও, গুরাবা হিসেবেই থাকতে চাইবে। তার অবস্থা মানুষ দেখবে না। কিন্তু সে ঠিকই সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করবে। তাদের মাঝে দুই ধরনের দৃষ্টি নিয়ে চলবে। এক প্রকার দৃষ্টি থাকবে আদেশ এবং নিষেধের দিকে। এর মাধ্যমে সে মানুষকে আদেশ/নিষেধ করবে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব/শত্রুতা করবে এবং তাদের হক আদায় করবে যথাযথভাবে।
আরেক প্রকার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে আল্লাহ তাআলার ফায়সালা এবং নিয়তির দিকে। এর মাধ্যমে সে তাদের প্রতি দয়ার আচরণ করবে। তাদের জন্য দুআ-ইসতিগফার করবে। যেসব ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার আদেশ কিংবা শারীয়াতের বিধান লঙ্ঘন না হয়, এমন সব ক্ষেত্রে মানুষকে নানাভাবে অপারগ মনে করবে। মায়া, মমতা, নম্রতা এবং উদারতা দিয়ে মানুষকে সে ঘিরে রাখবে। নিম্নোক্ত আয়াতের সামনে সে স্থির হয়ে যাবে,
‘ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং মূর্খদের এড়িয়ে চলুন।
এ আয়াতে মানুষের সঙ্গে সদাচার, তাদের হক আদায়, পাশাপাশি তাদের অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে সে চিন্তাভাবনা করবে। সমস্ত মানুষই যদি এ আয়াত অনুসরণ করে, তবে সবাই উপকৃত হবে। কারণ ক্ষমা হলো চরিত্রের বাড়তি সৌন্দর্য, যার মাধ্যমে চারিত্রিক উন্নতি ঘটে। ক্ষমাশীল লোকের জন্য মানুষ জান-মাল ব্যয় করতে কোনো রকম কার্পণ্য করে না। এটা হলো মুসাফিরের প্রতি মানুষের আচরণ। আর মানুষের প্রতি মুসাফিরের আচরণ হবে তাদেরকে সৎকাজের আদেশ করা। সর্বোপরি এটাই আল্লাহ তাআলার আদেশ। আর মূর্খদের দেওয়া কষ্ট থেকে বেঁচে থাকা, তাদেরকে উপেক্ষা করা এবং নিজের খাতিরে প্রতিশোধ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা চাই। মানুষের জন্য এটাই সর্বোচ্চ সম্মান। দুনিয়াতে এটাই সর্বোত্তম জীবন যাপন পদ্ধতি। পৃথিবীর সব অনিষ্টের কারণ হলো, এই মৌলিক তিনটি আদেশ বা যে-কোনো একটি পালনে ত্রুটি। অপরদিকে মানুষ যত কল্যাণ লাভ করে, তার সবই এসব আদেশ পালন করার কারণে হয়ে থাকে।
অবশ্য কিছু কল্যাণ এমন আছে, যা বাহ্যিকভাবে অকল্যাণ বলে মনে হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তো তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে কোরো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণজনক।
মন্দ আর কষ্টকর অবস্থাতেও এই কাজ কল্যাণের উৎস হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা নবি ﷺ-কে বলেছেন, ‘কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। তারপর কোনো কাজের সংকল্প করলে, তখন আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করুন।
টিকাঃ
[৮৪] সূরা আরাফ, ৭ : ১৯৯
[৮৫] সূরা নূর, ২৪ : ১১
[৮৬] সূরা আলে ইমরান, ৩ : ১৫৯
📄 চরিত্র গঠনের নীতিমালা
চরিত্র গঠনের এমন সব নীতিমালা রাসূল ﷺ-কে আল্লাহ তাআলা শিক্ষা দিয়েছেন। আর তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,
‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, ‘কুরআনই ছিল নবি ﷺ-এর চরিত্র।
এই উন্নত চরিত্র লাভ করতে প্রয়োজন তিনটি বৈশিষ্ট্য। ১. ব্যক্তিত্ববান হওয়া। স্বভাব যদি রূঢ় এবং কর্কশ হয়, তাহলে উন্নত চরিত্রের জ্ঞান অর্জন করতে চাওয়া, এ সম্পর্কে আগ্রহী হওয়া এবং এর জন্য অনুশীলন করা কঠিন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে অনুগত এবং নম্র প্রকৃতি হলো চাষের উপযোগী যমিনের মতো। ২. প্রবৃত্তি এবং ভ্রষ্টতার বিপক্ষে শক্তিশালী এবং অপ্রতিরোধ্য হওয়া। কারণ প্রবৃত্তি এবং ভ্রষ্টতা হলো উৎকর্ষতার শত্রু। এখন ব্যক্তি যদি সেগুলোকে দমন করার মতো শক্তি না রাখে, তবে সে নিজেই পরাস্ত হতে থাকবে। ৩. বস্তুর স্বরূপ এবং স্তর সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা। যাতে পার্থক্য করা যায়— কোনটা চর্বি, আর কোনটা টিউমার। কোনটা কাঁচ, আর কোনটা জহরত।
এই বৈশিষ্ট্য তিনটির পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার দেওয়া তাওফিকও যদি লাভ হয়, তবে তো সোনায় সোহাগা। সে তখন ওই লোকদের দলভুক্ত হয়ে যাবে, যাদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে এবং পরিপূর্ণ অনুগ্রহ করা হয়েছে।
সর্বশেষ কথা হলো, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক করা, অন্য সবকিছুর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে অন্তরে একমাত্র তাঁকেই আসন দেওয়া এবং তাঁর কাছে ধরনা দিয়ে পড়ে থাকা। এই স্তরে পৌঁছতে পারলে বান্দা আল্লাহ তাআলার বিস্ময়কর অনুগ্রহ দেখতে পাবে। সে দেখবে, আল্লাহ তাআলা কীভাবে বান্দার প্রতি রহম করেন এবং যাবতীয় অনিষ্ট থেকে দূরে রাখেন। পাশাপাশি অন্যান্য মানুষের অন্তরে সেই বান্দার প্রতি ভালোবাসা এবং দয়া সঞ্চার করে দেন।
কিন্তু আমরা বলি : হে আমাদের রব! আমরা অনেক তিরস্কার শুনছি। আমাদের মূর্খতা, অত্যাচার এবং অন্যায় অনেক বেড়ে গেছে। আমরা স্বীকার করে নিচ্ছি, আমরা সীমালঙ্ঘন এবং কমতি করছি। লাঞ্ছিত আর ইতর লোকই কেবল এতকিছুর পর আপনার কাছে সুনাম দাবি করে। এখন আপনি যদি আমাদেরকে আমাদের হাতেই ছেড়ে দেন, তবে তো আপনি ধ্বংস ও পাপের মাঝে আমাদেরকে ছেড়ে দিলেন। আপনার সন্তুষ্টির জন্য আক্ষেপ করা ছাড়া আমাদের কোনো গতি থাকবে না। আপনি ছাড়া অন্য কারও ক্রোধের পরোয়া আমরা করি না। আপনার আনুগত্য, ভালোবাসা এবং আপনার সাথে থাকা সৎ সম্পর্কের ঊর্ধ্বে কাউকে স্থান দিই না।
টিকাঃ
[৮৭] সূরা কালাম, ৬৮ : ৪
[৮৮] আল আদাবুল মুফরাদ : ৩০৮; সহীহ মুসলিম : ৭৪৬; ইবনে মাজাহ : ২৩৩৩