📄 فَقَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ -এর আলোচনা
আয়াতের এই অংশেও ইবরাহীম-এর প্রশংসা করা হয়েছে। কারণ তিনি মেহমানদের অভিবাদনের জবাব তাদের চেয়েও সুন্দরভাবে দিয়েছেন। ফেরেশতারা তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছিল ক্রিয়া-সূচিত বাক্য দ্বারা। পক্ষান্তরে ইবরাহীম জবাব দিয়েছেন উদ্দেশ্য ও বিধেয় দ্বারা। আরবি ব্যাকরণের রীতি অনুযায়ী উদ্দেশ্য ও বিধেয় দ্বারা গঠিত বাক্য স্থায়ী এবং বহমানতা প্রমাণ করে। পক্ষান্তরে ক্রিয়া-সূচিত বাক্যের চাহিদা হলো পুনঃপৌনিকতা। অতএব ইবরাহীম-এর অভিবাদন বেশি সুন্দর এবং পূর্ণাঙ্গতর।
📄 মেহমানদারির নিয়ম
তারপর ইবরাহীম বলেছেন, ‘অপরিচিত লোক।’ এ কথায় মেহমানদেরকে চমৎকারভাবে সম্বোধনের পাশাপাশি লজ্জার ভাবও ফুটে ওঠেছে। এখানে প্রশংসার দুটি দিক রয়েছে।
প্রথমত, এখানে বাক্যের প্রথমাংশ উহ্য রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ বাক্যটির অর্থ হলো 'তোমরা অপরিচিত ব্যক্তি।' লজ্জা এবং অপছন্দনীয় বোধ থাকায় বাক্যের প্রথমাংশ তথা সম্বোধন উহ্য রাখা হয়েছে। ফলে কথার সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের নবি ﷺ-এর অভ্যাসও এমন ছিল। তিনি কাউকে সরাসরি অপছন্দনীয় কথা বলতেন না। বরং তিনি এভাবে বলতেন: লোকেরা এমন কেন বলে? এমন কেন করে?
দ্বিতীয়ত, ইবরাহীম বলেছেন 'অপরিচিত লোক।' কিন্তু কার কাছে অপরিচিত, সেটা বলেননি। বাস্তবে মেহমানরা তাঁর কাছেই অপরিচিত ছিল। যেমন এ ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, ‘তিনি অপরিচিত বোধ করলেন’। এখানে 'আমি তোমাদেরকে চিনি না' বলার থেকে ‘অপরিচিত লোক' বলা বেশি সুন্দর হয়েছে।
পরবর্তী আয়াত দুটিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তারপর তিনি স্ত্রীর কাছে গেলেন এবং একটি মাংসল বাছুর ভাজা নিয়ে এলেন। সেটি তাদের সামনে রেখে তিনি বললেন, “তোমরা খাচ্ছ না কেন?” এ আয়াত দুটিতে কয়েক রকমের প্রশংসা, মেহমানদারির নিয়ম এবং অতিথি আপ্যায়নের কথা আছে। প্রথমত আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তারপর তিনি স্ত্রীর কাছে গেলেন' : আল্লাহ তাআলা এখানে রগা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যার মূল অর্থ হলো, দ্রুত এবং গোপনে যাওয়া। এ বাক্য থেকে বোঝা যায়, মেহমান আপ্যায়ন দ্রুত করতে হয়। আর গোপনে তড়িঘড়ি করার কারণ হলো, মেহমানকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচানো। অনেকেই এই ক্ষেত্রে ঢিলেমি করে। মেহমানের সামনে অলসতা প্রকাশ করে। তারপর মেহমানকে দেখিয়ে দেখিয়ে (আপ্যায়নের জন্য) বের হয়। মানিব্যাগ খুলে গুনে গুনে টাকা বের করে। মেহমান যেন দেখে, এমনভাবে জিনিসপত্র আনে। এসব দেখে মেহমান বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। আয়াতে উল্লিখিত শব্দটি এর বিপরীত অবস্থা প্রকাশ করে।
টিকাঃ
[৭৫] তিনি যে এভাবে বলতেন তা অনেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠক এজন্য সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৭৫০; ৬১০১; ৭৩০১ এবং সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৩৫৬ দেখতে পারেন।
[৭৬] সূরা হুদ, ১১:৭০
📄 ইবরাহীম ﷺ ও তাঁর স্ত্রীর প্রশংসা
স্ত্রীর কাছে : এটা বলে আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম ﷺ-এর আরেকটি প্রশংসা করেছেন। এটা থেকে বোঝা যায় যে মেহমানের আপ্যায়নের ব্যবস্থা তাঁর স্ত্রীর কাছে প্রস্তুত ছিল। এজন্য তাঁকে প্রতিবেশীর কাছে ধরনা দিতে হয়নি। কারণ তারা নিজেরাই আপ্যায়নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
তখন একটি মাংসল বাছুর ভাজা নিয়ে এলেন : এ অংশের মধ্যে তিন ধরনের প্রশংসা আছে।
১. অন্য কাউকে না পাঠিয়ে নিজেই মেহমানের সেবা করেছেন।
২. আংশিক না এনে গোটা প্রাণীটাই নিয়ে এসেছেন। যাতে মেহমান নিজের পছন্দমতো অংশ বেছে নিতে পারে।
৩. মোটাতাজা প্রাণী এনেছেন, শীর্ণকায় নয়। এটা ছিল উৎকৃষ্ট সম্পদ। মাংসল বাছুর। মেহমান পেয়ে তিনি খুশি হয়েছেন। তাই সম্মান প্রদর্শনের জন্য এমন দামি প্রাণী জবাই করে উপস্থাপন করেছেন।
সেটি তাদের সামনে রাখলেন : এখানে একটি প্রশংসা এবং মেহমানদারির একটি নিয়মের কথা বলা হয়েছে। সেটি হলো মেহমানের সামনে খাবার উপস্থিত করা। পক্ষান্তরে অনেকে ভিন্ন জায়গাতে খাবার প্রস্তুত করে। তারপর মেহমানকে সেখানে নিয়ে গিয়ে তার সামনে খাবার পরিবেশন করে থাকে।
তিনি বললেন, তোমরা খাচ্ছ না কেন? : এখানেও একটি প্রশংসা এবং মেহমানদারির একটি নিয়ম দেখানো হয়েছে। মেহমানের সামনে খাবার পরিবেশন করে তিনি খেতে অনুরোধ করছেন।
📄 পুত্রের সুসংবাদ
তখন তাদের ব্যাপারে তাঁর মনে ভয়ের সঞ্চার হলো : অর্থাৎ মেহমানরা খাচ্ছে না দেখে ইবরাহীম উদ্বিগ্ন বোধ করলেন। কারণ মেহমান খাবার গ্রহণ করলে মেজবান নিশ্চিন্ত বোধ করে। ইবরাহীম-এর উদ্বেগ বুঝতে পেরে ফেরেশতারা তাঁকে অভয় দিলেন এবং একজন জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ জানালেন। এই পুত্রটি ছিলেন ইসহাক, ইসমাঈল নয়। কারণ ইবরাহীম-এর স্ত্রী সুসংবাদ শুনে আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন, 'আমার মতো বৃদ্ধা-বন্ধ্যার সন্তান হবে কেমন করে?' আর ইসমাঈল ছিলেন ইবরাহীম-এর অন্য স্ত্রী হাজের-এর গর্ভজাত। হাজের ছিলেন কমবয়স্কা, আর ইসমাঈল ছিলেন প্রথম সন্তান। সূরা হুদ-এ আল্লাহ তাআলা এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন,
‘তখন আমি তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবের।
টিকাঃ
[৭৭] সূরা হুদ, ১১ : ৭১