📄 ঘটনার গুরুত্ব বোঝানো
ঘটনাটি আল্লাহ তাআলা প্রশ্নের ধাঁচে শুরু করেছেন, যদিও প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। এজন্যই কেউ কেউ বলেছেন, এসব ক্ষেত্রে প্রশ্নের আঙ্গিকে কথা বলা হলেও মূলত কথার নিশ্চয়তা বোঝানো উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কিন্তু এভাবে প্রশ্নের আঙ্গিকে কথা বলার মাঝে একটি সূক্ষ্ম রহস্য ও চমৎকার অর্থ লুকিয়ে আছে। বক্তা যখন শ্রোতাকে এমন কোনো বিষয় বলতে চায় যা ভালোমতো মনোযোগ দিয়ে শোনা দরকার, তখন সে প্রথম কথাটা এমনভাবে বলে, যাতে শ্রোতা একটু নড়েচড়ে বসে। এ উদ্দেশ্যেই কখনও কখনও সতর্ক করার শব্দ ব্যবহার করে। আবার কখনও প্রশ্নের আঙ্গিকে কথা শুরু করে থাকে। কুরআনুল কারীমের অনেক জায়গাতেই এর ব্যবহার আছে। যেমন দেখুন,
‘মূসার বৃত্তান্ত আপনার কাছে পৌঁছেছে কি?’
‘আপনার কাছে কি বিবাদকারীদের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে?’
‘আপনার কাছে কিয়ামাতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি?’
এসবের উদ্দেশ্য হলো, ঘটনার গুরুত্ব বোঝানো। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঘটনা জানতে এবং সেসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করা। আরেকটি বিষয় হলো, নবি ﷺ-কে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলছেন, এসব বৃত্তান্ত সম্পর্কে অবগত হওয়া আপনার নুবুওয়াতের সত্যতার অন্যতম নিদর্শন। কারণ, অদৃশ্যের এসব সংবাদ আপনি এবং আপনার সম্প্রদায়ের কেউই জানত না। সুতরাং আমি না জানালেও কি আপনি এটা জানতেন? নাকি আমি জানানোর পরই আপনি অবগত হয়েছেন? কথাটি প্রশ্নের আঙ্গিকে করার কারণে অলংকারশাস্ত্রের মানে কেমন উন্নীত হয়েছে, পাঠক তা এবার ভেবে দেখুন।
টিকাঃ
[৭০] তাবীলু মুশকিলিল কুরআন, পৃষ্ঠা নং: ৫৩৮
[৭১] সূরা নাযিআত, ৭৯ : ১৫
[৭২] সূরা সোয়াদ, ৩৮ : ২১
[৭৩] সূরা গাশিয়াহ, ৮৮ : ১
📄 الْمُكْرَمِينَ শব্দটি অর্থ
আল্লাহ তাআলা তাঁর খলীল ইবরাহীম ﷺ-এর প্রশংসায় মেহমানদের ‘মুকাররামুন’ (সম্মানিত) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ الْمُكْرَمِينَ শব্দটির দুটি অর্থ হতে পারে।
১. ইবরাহীম মেহমান হিসেবে তাদের সম্মান করেছেন বলে তারা সম্মানিত। এ কথার মাধ্যমে ইবরাহীম ﷺ-এর আতিথেয়তা বুঝে আসে।
২. মেহমানরূপী ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কাছে সম্মানিত। যেমন অন্য আয়াতে ফেরেশতাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বরং তারা তো (আল্লাহর) সম্মানিত বান্দা।
এ অর্থ হিসেবেও আল্লাহ তাআলা তার খলীল ইবরাহীম-এর প্রশংসা করেছেন। কারণ তিনি আল্লাহ তাআলার সম্মানিত বান্দাদের আতিথেয়তা করেছেন। মোটকথা, উভয় অর্থ বিবেচনায় আনলেও এটা মূলত ইবরাহীম-এর প্রশংসা।
টিকাঃ
[৭৪] সূরা আম্বিয়া, ২১ : ২৬
📄 فَقَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ -এর আলোচনা
আয়াতের এই অংশেও ইবরাহীম-এর প্রশংসা করা হয়েছে। কারণ তিনি মেহমানদের অভিবাদনের জবাব তাদের চেয়েও সুন্দরভাবে দিয়েছেন। ফেরেশতারা তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছিল ক্রিয়া-সূচিত বাক্য দ্বারা। পক্ষান্তরে ইবরাহীম জবাব দিয়েছেন উদ্দেশ্য ও বিধেয় দ্বারা। আরবি ব্যাকরণের রীতি অনুযায়ী উদ্দেশ্য ও বিধেয় দ্বারা গঠিত বাক্য স্থায়ী এবং বহমানতা প্রমাণ করে। পক্ষান্তরে ক্রিয়া-সূচিত বাক্যের চাহিদা হলো পুনঃপৌনিকতা। অতএব ইবরাহীম-এর অভিবাদন বেশি সুন্দর এবং পূর্ণাঙ্গতর।
📄 মেহমানদারির নিয়ম
তারপর ইবরাহীম বলেছেন, ‘অপরিচিত লোক।’ এ কথায় মেহমানদেরকে চমৎকারভাবে সম্বোধনের পাশাপাশি লজ্জার ভাবও ফুটে ওঠেছে। এখানে প্রশংসার দুটি দিক রয়েছে।
প্রথমত, এখানে বাক্যের প্রথমাংশ উহ্য রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ বাক্যটির অর্থ হলো 'তোমরা অপরিচিত ব্যক্তি।' লজ্জা এবং অপছন্দনীয় বোধ থাকায় বাক্যের প্রথমাংশ তথা সম্বোধন উহ্য রাখা হয়েছে। ফলে কথার সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের নবি ﷺ-এর অভ্যাসও এমন ছিল। তিনি কাউকে সরাসরি অপছন্দনীয় কথা বলতেন না। বরং তিনি এভাবে বলতেন: লোকেরা এমন কেন বলে? এমন কেন করে?
দ্বিতীয়ত, ইবরাহীম বলেছেন 'অপরিচিত লোক।' কিন্তু কার কাছে অপরিচিত, সেটা বলেননি। বাস্তবে মেহমানরা তাঁর কাছেই অপরিচিত ছিল। যেমন এ ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, ‘তিনি অপরিচিত বোধ করলেন’। এখানে 'আমি তোমাদেরকে চিনি না' বলার থেকে ‘অপরিচিত লোক' বলা বেশি সুন্দর হয়েছে।
পরবর্তী আয়াত দুটিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তারপর তিনি স্ত্রীর কাছে গেলেন এবং একটি মাংসল বাছুর ভাজা নিয়ে এলেন। সেটি তাদের সামনে রেখে তিনি বললেন, “তোমরা খাচ্ছ না কেন?” এ আয়াত দুটিতে কয়েক রকমের প্রশংসা, মেহমানদারির নিয়ম এবং অতিথি আপ্যায়নের কথা আছে। প্রথমত আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তারপর তিনি স্ত্রীর কাছে গেলেন' : আল্লাহ তাআলা এখানে রগা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যার মূল অর্থ হলো, দ্রুত এবং গোপনে যাওয়া। এ বাক্য থেকে বোঝা যায়, মেহমান আপ্যায়ন দ্রুত করতে হয়। আর গোপনে তড়িঘড়ি করার কারণ হলো, মেহমানকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচানো। অনেকেই এই ক্ষেত্রে ঢিলেমি করে। মেহমানের সামনে অলসতা প্রকাশ করে। তারপর মেহমানকে দেখিয়ে দেখিয়ে (আপ্যায়নের জন্য) বের হয়। মানিব্যাগ খুলে গুনে গুনে টাকা বের করে। মেহমান যেন দেখে, এমনভাবে জিনিসপত্র আনে। এসব দেখে মেহমান বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। আয়াতে উল্লিখিত শব্দটি এর বিপরীত অবস্থা প্রকাশ করে।
টিকাঃ
[৭৫] তিনি যে এভাবে বলতেন তা অনেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠক এজন্য সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৭৫০; ৬১০১; ৭৩০১ এবং সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৩৫৬ দেখতে পারেন।
[৭৬] সূরা হুদ, ১১:৭০