📄 সুন্দরতম পরিণতি
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, ‘এটাই উত্তম এবং সুন্দরতম পরিণাম।’ অর্থাৎ, ‘তোমাদেরকে আমার আনুগত্য ও আমার রাসূলের আনুগত্য এবং কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আনুগত্যের নির্দেশ দিলাম। তোমাদের জীবনের সমস্যার সমাধানে আমার ও আমার রাসূলের দ্বারস্থ হবে। এগুলো মূলত তোমাদের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের জন্যই। তোমাদের উভয় জগতের সফলতা এখানেই—আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে। ফায়সালা দেওয়ার একমাত্র অধিকার আহকামুল হাকিমীন ও তাঁর হাবীবের জন্য সংরক্ষিত রাখার মধ্যেই তোমাদের কল্যাণ।’
আমরা যদি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকাই, যাবতীয় অন্যায় আর অকল্যাণ নিয়ে চিন্তা করি, তবে তার মূল কারণ হলো, রহমাতুল্লিল আলামীনের আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া। যতটুকু কল্যাণ অবশিষ্ট আছে, তা রাসূলের অনুসরণের বরকতে। একইভাবে পরকালের অকল্যাণ, শাস্তি এবং যাবতীয় দুর্যোগও আল্লাহর রাসূল-এর অবাধ্যতা ও তাঁর বিরোধিতারই ফলাফল। মানুষ যথাযথভাবে আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করলে, এ জগতে আর কোনো অকল্যাণ থাকত না। এটা যেমন সার্বজনীন বালা-মুসিবত ও দুর্যোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনিভাবে বান্দার অভ্যন্তরীণ দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা-পেরেশানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা এই দুটিই সংঘটিত হয় নববি আদর্শের উলটা পথে হাঁটার কারণে। আর নববি আদর্শ হচ্ছে এমন এক দুর্গ, সেখানে প্রবেশ করার অর্থই হচ্ছে নিজেকে নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে নেওয়া। এটা এমন এক গুহা, যেখানে আশ্রয় নেয়ার অর্থই হচ্ছে সব ধরনের অকল্যাণ এবং অনিষ্ট থেকে নিষ্কৃতি লাভ করা।
অতএব দুনিয়া ও আখিরাতের সর্ব প্রকার অকল্যাণের কারণ একটা—রাসূলের আনীত আদর্শের ব্যাপারে অজ্ঞতা ও সে আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। বান্দার মুক্তির পথ একটাই—তাকে আল্লাহর রাসূলের আদর্শকে জানতে এবং তা আমলে বাস্তবায়িত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে। এটাই তার সৌভাগ্যের সোপান। তবে এই সৌভাগ্য ও কল্যাণের পূর্ণতা পেতে আরও দুটি বিষয় প্রয়োজন।
প্রথমত, মানুষকে এই আদর্শের দিকে দাওয়াত দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সে দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্য্য এবং অবিচলতার পরিচয় দেওয়া। সুতরাং মানব জীবনের পূর্ণতা এই চার স্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ : ১. রাসূলের আদর্শকে জানা, ২. কাজেকর্মে সুন্নাহর বাস্তবায়ন, ৩. মানুষের মাঝে সুন্নাহর প্রচার-প্রসার ও মানুষকে সেদিকে আহ্বান করা, ৪. এ দায়িত্ব পালনে চেষ্টা-সাধনা করা এবং ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি সাহাবিদের পথ জানতে চায়, তাদেরকে অনুসরণের ইচ্ছা করে, তাদের পথ এটাই। তাদের সাথে সম্পর্ক জুড়তে চাইলে তাদের পথে চলা শুরু করুন। দেখবেন, সে পথ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।
📄 বিভ্রান্তদের পরিণাম
রাসূল ﷺ-কে লক্ষ করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘বলুন, আমি বিভ্রান্ত হলে বিভ্রান্তির পরিণাম আমারই। আর যদি আমি সৎপথে থাকি, তবে তা এ জন্য যে, আমার রব আমার প্রতি ওহি পাঠান। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, অতি নিকটবর্তী।
একেবারে স্পষ্ট কথা। স্বয়ং রাসূল-ও ওহির মাধ্যমে সৎপথ লাভ করে থাকেন। সেখানে অন্যরা কীভাবে ওহি বাদ দিয়ে বিশৃঙ্খল নানাবিধ মতামত, চিন্তা ও দর্শনের মাধ্যমে পথ খুঁজে পাবে? এ তো বড়ই আজীব ব্যাপার! কিন্তু সত্য কথা এটাই যে, ‘আল্লাহ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, সে-ই সৎপথপ্রাপ্ত। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্য কোনো পথনির্দেশক অভিভাবক পাবেন না।
ওই ব্যক্তির ভ্রষ্টতার চেয়ে নিকৃষ্ট কাজ আর কী হতে পারে, যে কিনা ওহির মাধ্যমে সৎপথের দিশা খোঁজে না! ফলে সে অমুকের মতাদর্শ, তমুকের চিন্তাধারার দ্বারস্থ হয়। কোন স্যার কী বলল, সেদিকে চেয়ে থাকে। যে বান্দাকে আল্লাহ তাআলা এ মহা মুসিবত ও ভয়ানক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেছেন, বাস্তবিকই সে রবের পক্ষ থেকে বিরাট নিয়ামাত লাভ করেছে। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘এটি কিতাব, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তার সম্পর্কে তোমার মনে যেন কোনো সংকীর্ণতা না থাকে। যাতে তুমি তার মাধ্যমে সতর্ক করতে পার এবং তা মুমিনদের জন্য উপদেশ। তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ কোরো না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ করো।’
রাসূলের ওপর যা নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করতে এবং এ ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরণ না করতে আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন। অপশন দুটি : হয়ত নাযিলকৃত ওহির অনুসরণ, নয়ত আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে অভিভাবক মেনে নিয়ে তার অনুসরণ। এর মাঝামাঝি কোনো অপশন নেই। অতএব যে ব্যক্তি ওহির অনুসরণ করে না, সে বাতিল (মতবাদ) এবং অসত্যের অনুসরণ করে। অভিভাবক হিসেবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও আনুগত্য করে। এটা একেবারে সুস্পষ্ট বিষয়, এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। প্রশংসা আল্লাহর দরবারে।
'যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের হাত দুটি কামড়াতে কামড়াতে বলবে, “হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল, আমার কাছে উপদেশ পৌঁছার পর। শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।
তাই যে ব্যক্তি রাসূলকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তার মতামতকে গ্রহণ করার জন্য রাসূলের আনীত বিধানকে উপেক্ষা করে, কিয়ামাতের দিন নিঃসন্দেহে সে এভাবে আফসোস করতে থাকবে। এজন্যই এই বন্ধুকে আল্লাহ তাআলা 'অমুক' বলে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেছেন। কারণ, দুনিয়াতে আল্লাহকে বাদ দিয়ে বিভিন্ন নামের অমুক তমুককেই তো অভিভাবক হিসেবে অনুসরণ করা হয়। রাসূলের আনুগত্যের বিপরীতে বন্ধুত্বকারীদের অবস্থা এমনই হবে। তাদের বন্ধুত্বের শেষ পরিণতি হবে শত্রুতা আর অভিসম্পাত দিয়ে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্রু, মুত্তাকিরা ছাড়া।”
(রাসূলকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো মতবাদের) অনুসারী এবং অনুসৃতদের অবস্থা আল্লাহ তাআলা একাধিক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে,
'যেদিন তাদের মুখমণ্ডল আগুনে উলট-পালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে, “হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রাসূলকে মেনে নিতাম!” তারা আরও বলবে, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো আমাদের নেতা ও বড় বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।””
মানুষ সেদিন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য না করার কারণে আক্ষেপ করবে। কিন্তু এ আক্ষেপ তাদের কোনো কাজে আসবে না। তারা অজুহাত পেশ করবে—তারা তাদের মুরুব্বি ও নেতৃস্থানীয়দের অনুসরণ করত। তারা স্বীকারোক্তি দেবে যে, এ ব্যাপারে আসলে তাদের কোনো ওজর ছিল না। রাসূলকে অমান্য করে তারা যে মুরুব্বি এবং নেতৃস্থানীয়দের অনুসরণ করেছে, এই আনুগত্য এবং সম্পর্কের পরিণতি শেষ হবে এ কথা বলে : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদেরকে দিন মহা অভিশাপ।
বিবেকবানরা চাইলে এই আলোচনা থেকে চমৎকার উপদেশ গ্রহণ করতে পারবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রটনা করে কিংবা তাঁর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করে, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে? তাদের জন্য যে হিসসা লেখা আছে, তা তাদের কাছে পৌঁছবে। যতক্ষণ না আমার ফেরেশতাগণ তাদের জান কবজের জন্য তাদের কাছে আসবে ও জিজ্ঞেস করবে, “আল্লাহর পরিবর্তে যাদের তোমরা ডাকতে তারা কোথায়?” তারা বলবে, “তারা আমাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে গেছে।” তারা স্বীকার করবে, নিশ্চয়ই তারা কাফির ছিল। আল্লাহ বলবেন, “তোমাদের আগে যে জিন ও মানুষেরা গত হয়েছে, তাদের সাথে তোমরা আগুনে প্রবেশ করো।” যখনই কোনো দল তাতে প্রবেশ করবে, তখনই অন্য দলকে তারা অভিসম্পাত করবে। অবশেষে সবাই তাতে একত্র হবে। তখন পরবর্তীরা তাদের পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, “হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদের বিভ্রান্ত করেছিল। কাজেই এদেরকে দ্বিগুণ আগুনের শাস্তি দিন।” আল্লাহ বলবেন, “প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ রয়েছে, কিন্তু তোমরা জানো না।” আর পূর্ববর্তীরা তাদের পরবর্তীদের বলবে, “আমাদের ওপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কাজেই তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করো।””
প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের উচিত এসব আয়াত ও অন্তর্নিহিত উপদেশগুলো নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা।
এই আয়াতের ব্যাখ্যা • আল্লাহ তাআলা প্রথমে বলছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রটনা করে কিংবা তাঁর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করে, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে?' এখানে দুই ধরনের বাতিলপন্থার আলোচনা করা হয়েছে। ১. বাতিল ও মিথ্যার উদ্ভাবন এবং তা মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা। ২. সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।
প্রথম প্রকারের কুফরি হয়েছে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে মিথ্যা রটনা ও মিথ্যারোপের মাধ্যমে। দ্বিতীয় প্রকারে কুফরি হয়েছে সত্যকে অস্বীকার করার মাধ্যমে। এই দুটি বাতিলপন্থাই সব ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতাকে উসকে দেয়। এর সাথে যদি বাতিলপন্থার দিকে আহ্বান করা এবং মানুষকে হক থেকে বাধা দেওয়া যুক্ত হয়, তবে সে ব্যক্তি দ্বিগুণ শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যায়। কারণ তার কুফর আর অনিষ্ট এখানে দ্বিগুণ। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলছেন,
'যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির ওপর শাস্তি বাড়িয়ে দেবো। কারণ তারা অশান্তি সৃষ্টি করত।'
অর্থাৎ কুফরি এবং হকের পথ থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করার কারণে তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দেওয়া হবে। একটি আযাব তাদের কুফরির কারণে, অপরটি হকের পথে বাধা সৃষ্টি করার কারণে। এজন্যই আল্লাহ তাআলা যেখানে শুধুমাত্র কুফরির কথা উল্লেখ করেন, সেখানে দ্বিগুণ শাস্তির কথা বলেন না। যেমন,
'আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'তাদের জন্য যে হিসসা লেখা আছে, তা তাদের কাছে পৌঁছবে।' অর্থাৎ তাদের জন্য রিযক, জীবন-জীবিকাসহ যেসব জাগতিক বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে, তারা সেগুলো পাবে। এরপর বলা হয়েছে, 'যতক্ষণ না আমার ফেরেশতাগণ তাদের জান কবজের জন্য তাদের কাছে আসবে ও জিজ্ঞেস করবে, “আল্লাহর পরিবর্তে যাদের তোমরা ডাকতে তারা কোথায়?”'
আজ কোথায় তারা, যাদের খাতিরে তোমরা বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা রাখতে? আল্লাহর পরিবর্তে যাদের তোমরা আশা করতে এবং ভয় করতে? 'তারা বলবে, “তারা আমাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে গেছে।”' অর্থাৎ সেসব আমাদের ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে এবং আমাদের সেই ডাকাডাকি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। 'তারা স্বীকার করবে, নিশ্চয়ই তারা কাফির ছিল। আল্লাহ বলবেন, “তোমাদের আগে যে জিন ও মানুষেরা গত হয়েছে, তাদের সাথে তোমরা আগুনে প্রবেশ করো।”' অর্থাৎ তাদের সাথে তোমরাও শামিল হয়ে যাও।
জাহান্নামে ঢোকার পর কী হবে? 'যখনই কোনো দল তাতে প্রবেশ করবে, তখনই অন্য দলকে তারা অভিসম্পাত করবে। অবশেষে সবাই তাতে একত্র হবে। তখন তাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে অভিযোগ দায়ের করবে।' আসলে প্রতিটি (বিভ্রান্ত) ব্যক্তিই তার পূর্ববর্তী (কোনো-না-কোনো পথভ্রষ্টের) দ্বারা গোমরাহ হয়েছে। এই জন্য তারা বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদের গোমরাহ করেছিল; কাজেই এদের দ্বিগুণ আগুনের শাস্তি দিন।' অর্থাৎ তারা যেহেতু আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল ও আপনার রাসূলদের আনুগত্য করা থেকে আমাদেরকে বাধা দিয়েছিল, সুতরাং আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন।
'আল্লাহ বলবেন, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ রয়েছে।' অর্থাৎ অনুসারী এবং অনুসৃতের জন্য নিজ নিজ গোমরাহি ও কুফরি অনুসারে দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ বলবেন, 'কিন্তু তোমরা জান না।' অর্থাৎ উভয় দলের কোনো দলই জানে না, তারা ছাড়া অন্য দলের ওপর কী পরিমাণ শাস্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এরপর 'পূর্ববর্তীরা তাদের পরবর্তীদের বলবে, “আমাদের ওপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।”’ কারণ, তোমরা আমাদের পরে এসেছ। এরপর তোমাদের কাছে রাসূলদের পাঠানো হয়েছে। তোমাদের কাছে তাঁরা হক স্পষ্ট করেছেন, আমাদের গোমরাহি থেকে তোমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। আমাদের অনুসরণ-অনুকরণ না করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কথায় কর্ণপাত না করে তোমরা গোঁ ধরে ছিলে। রাসূলের আনীত সত্যকে উপেক্ষা করে অন্ধভাবে আমাদের অনুসরণ করেছিলে। তো, আমরা তোমাদের চেয়ে আর বেশি কী ছিলাম? আমরা যেমন গোমরাহ হয়েছিলাম, তেমনি তোমরাও গোমরাহ হয়েছ। আমাদের মতো তোমরাও সত্যকে উপেক্ষা করেছ। তোমরা যেভাবে আমাদের মাধ্যমে গোমরাহ হয়েছ, একইভাবে আমরাও তো অন্যদের মাধ্যমে গোমরাহ হয়েছিলাম। ‘কাজেই তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করো।'
আল্লাহ তাআলার এই উপদেশ কতটা নিগূঢ় অর্থ বহন করে! কতটা গভীর অর্থবহ রাব্বুল আলামীনের এই নাসীহাহ! অন্তর সজীব করার জন্য এর চেয়ে উত্তম আর কী আছে! এ যেন আল্লাহ তাআলার পথের পথিকের হৃদয়ের কথা। যদিও গাফিলদের এ নিয়ে কোনো খবরই নেই।
টিকাঃ
[৪৬] সূরা সাবা, ৩৪ : ৫০
[৪৭] সূরা কাহফ, ১৮: ১৭
[৪৮] সূরা আরাফ, ৭ : ২-৩
[৪৯] সূরা ফুরকান, ২৫ : ২৭-২৯
[৫০] সূরা যুখরুফ, ৪৩ : ৬৭
[৫১] সূরা আহযাব, ৩৩ : ৬৬-৬৭
[৫২] সূরা আহযাব, ৩৩ : ৬৮
[৫৩] সূরা আরাফ, ৭ : ৩৭-৩৯
[৫৪] সূরা নাহল, ১৬:৮৮
[৫৫] সূরা বাকারাহ, ২ : ১০৪; সূরা মুজাদালাহ, ৫৮ : ৪
📄 দুর্ভাগা অনুসারীদের কথা
এটা তো গেল মুশরিকদের কথা। অনুসারী এবং অনুসৃত দু'দলই গোমরাহ। আরও এক শ্রেণী রয়েছে, যারা তাদের পূর্ববর্তীদের নীতি-আদর্শের উলটা পথে চলেও দাবি করে—তারা পূর্বসূরিদের অনুসারী। আসলে তারা মোটেই তাদের অনুসরণ করে না। আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলছেন,
'অনুসৃতরা যখন অনুসরণকারীদের থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা করবে এবং আযাব প্রত্যক্ষ করবে ও তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অনুসারীরা তখন বলবে, “হায়, যদি আমাদেরকে পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ দেওয়া হতো! তাহলে আমরাও তাদের থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা দিয়ে দিতাম, যেমন তারা আমাদের থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করেছে।” এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাদের কৃতকর্মগুলো তাদেরকে দেখাবেন, তাদেরকে অনুতপ্ত করার জন্য। আর তারা কস্মিনকালেও আগুন থেকে বের হতে পারবে না।
মূলত এই অনুসৃত ব্যক্তিরা ছিলেন হিদায়াতপ্রাপ্ত। তাদের অনুসারীরা তাদের মত ও পথের বিপরীতে চলেও দাবি করত যে, তারা সেসব ব্যক্তিদের আদর্শের ওপরই আছে। তারা এও দাবি করত যে, 'আমরা তাদের আদর্শের উলটা পথে চললে কী হবে, আমরা তো তাদেরকে ভালোবাসি! এই ভালোবাসার কারণেই আমরা পার পেয়ে যাব। কিন্তু কিয়ামতের দিন দেখা যাবে, অনুসৃতরা এই অনুসারীদের থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা দিয়ে দেবে। কারণ এরা আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে তাদেরকে অভিভাবক বানিয়ে নিয়েছিল। আর ধারণা করেছিল, এই অভিভাবকরা তাদের উপকার করবে।
এই অবস্থাই হবে সেসব লোকের, যারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবক বানিয়ে নেয়। তাদের খাতিরেই বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা করে। তারা সন্তুষ্ট এবং ক্রুদ্ধও হয়ে থাকে এই অভিভাবক আর বন্ধুদের স্বার্থেই। এই লোকদের সমস্ত আমল বাতিল হয়ে যাবে। কিয়ামতের দিন তাদের আমলের সংখ্যা বেশি দেখা যাবে, পরিশ্রম হবে অনেক, তবুও এসব তাদের আক্ষেপের কারণ হবে। কারণ তারা নিজেদের বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা, ভালোবাসা এবং ঘৃণা, জয় এবং অগ্রাধিকার—আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য করেনি। তাই আল্লাহ তাআলা সমস্ত আমল বাতিল করে দিয়ে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দেবেন। দুনিয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য করা কোনো সম্পর্কই বহাল থাকবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।'
কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য করা সব ধরনের সম্পর্ক, মাধ্যম এবং ভালোবাসা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক জুড়ে দেয়, এমন সম্পর্কই কেবল সেদিন বহাল থাকবে। যেমন: আল্লাহ ও রাসূলের দিকে হিজরত, কেবল আল্লাহর জন্য করা ইবাদাত ইত্যাদি। এর জন্য আবশ্যকীয় বিষয় হলো—ভালোবাসা এবং ঘৃণা, প্রদান করা এবং বিরত থাকা, শত্রুতা এবং মিত্রতা, নৈকট্য এবং দূরত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে শুধু রাসূলের অনুসরণ করা এবং অন্য কারও কথা বর্জন করা। রাসূল ﷺ আনীত শারীয়াতের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকা এবং যারা তা করে তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা। অন্য কারও দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে শুধু তাঁরই অনুসরণ করা। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক না করা বা অন্য কারও কথাকে তাঁর কথার ওপর প্রাধান্য না দেওয়া।
এটা হলো চিরস্থায়ী সম্পর্ক। বান্দার সাথে রবের সম্পর্ক এটাই। এটাই প্রকৃত বান্দার পরিচয়। এই বন্ধন এদিক-সেদিক ঘুরে, তারপর তার দিকেই ফিরে আসে। এই সম্পর্কই বান্দার উপকার করে। এটা ছাড়া দুনিয়া, কবর এবং আখিরাতে এমন কিছু নেই, যা বান্দার উপকার করতে পারে। এই সম্পর্কই বান্দার ভরসা, আশ্রয়, নিয়ামত এবং সফলতার কেন্দ্র। এটাই বান্দার সাথে আল্লাহর অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক।
টিকাঃ
[৫৬] সূরা বাকারাহ, ২ : ১৬৬-১৬৭