📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 ‘হে ঈমানদার’ বলার কারণ

📄 ‘হে ঈমানদার’ বলার কারণ


আল্লাহ তাআলা প্রথমে আমাদেরকে 'হে ঈমানদার' বলে সম্বোধন করলেন। তারপর তাঁর আনুগত্য ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিলেন। 'ঈমানদার' বলে সম্বোধন করার দ্বারা, আল্লাহ তাআলা সচেতন করছেন। যে ঈমানের দিকে সম্পৃক্ত করে ডাক দেওয়া এবং সম্বোধন করা হয়েছে, সেই ঈমানের দাবি তো এটাই যে, তোমরা এ আদেশ পালন করবে। এটি একটি ভাষাগত সৌন্দর্যও বটে। যেমনটি বলা হয়, 'হে আল্লাহর দয়া ও নিয়ামাতে ধন্য বান্দা! আল্লাহ তাআলা যেভাবে তোমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও তেমনি (তাঁর সৃষ্টির ওপর) অনুগ্রহ করো।' 'ওহে জ্ঞানী ব্যক্তি! মানুষকে উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দিন।' 'হে বিচারক! ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন।' ইত্যাদি।

কুরআনুল কারীমের যেসব জায়গাতে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের মৌলিক বিধিবিধানের কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানেই 'হে ঈমানদারগণ' বলে সম্বোধন করেছেন। যেমন :
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সাওম ফরয করা হয়েছে।’
‘হে ঈমানদারগণ! যখন জুমুআর দিন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়...।
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের কৃত অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো৷’

এভাবে সম্বোধন করার তাৎপর্য এই যে, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে ঈমানের দাবি হচ্ছে তোমরা এই এই কাজ করবে।

টিকাঃ
[৩৬] সূরা নিসা, ৪ : ৫৯
[৩৭] সূরা বাকারাহ, ২ : ১৮৩
[৩৮] সূরা জুমুআহ, ৬২ : ৯
[৩৯] সূরা মায়িদাহ, ৫ : ১

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য

📄 আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য


এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।' এখানে একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য রয়েছে, যার ইঙ্গিত আমরা ইতিপূর্বে দিয়েছিলাম। আল্লাহ তাআলা এখানে এভাবে বলতে পারতেন, 'তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।' কিন্তু তা না করে ক্রিয়াপদকে দ্বিরুক্ত করে ও রাসূলের আনুগত্যের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সূক্ষ্মভাবে ইশারা দিলেন যে, আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য স্বতন্ত্রভাবেই আবশ্যক। এজন্যই কোনো বিষয়ে নবিজির কাছ থেকে আদেশ/নিষেধ পাওয়া গেলে, এবং কুরআন কারীমে সে বিষয়টা হুবহু উল্লেখ না থাকলেও, তাঁর হুকুম গ্রহণ করতে হবে ও আবশ্যকীয়ভাবে আমল করতে হবে। কুরআনে নেই, এ অজুহাতে তা পরিত্যাগ করা চলবে না। কারণ রাসূলের আনুগত্য মানে আল্লাহর আনুগত্য- একথাই কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। কিছু নির্বোধ এমনটা ধারণা করে থাকে, রাসূল কোনো ব্যাপারে নির্দেশ দিলে সেটা যদি কুরআনে বর্ণিত না থাকে, তবে তার আনুগত্য আবশ্যক নয়! নবিজি নিজেই (এই লোকদের সম্পর্কে সতর্ক করে) গেছেন,

'এমন একটা সময় আসবে যখন কোনো প্রাচুর্যবান লোক তার আসনে উপবেশন করবে। তার কাছে আমার কোনো আদেশ এলে সে বলবে, “আমাদের এবং তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট। আমরা কেবল তা-ই অনুসরণ করব, যা এতে পাব।” জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ একটি (অর্থাৎ সুন্নাহ) দেওয়া হয়েছে।

টিকাঃ
[৪০] মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৩২; সুনানু দারিমি : ৫৯২; তিরমিযি : ২৬৬৪, ইবনে মাজাহ : ১২

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আনুগত্য

📄 কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আনুগত্য


এবার আসি ‘উলুল আমর' তথা কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আনুগত্য প্রসঙ্গে। তাদের কারও আনুগত্য রাসূলের আনুগত্য অনুযায়ী হলে, তা মেনে নেওয়া আবশ্যক। তবে তাদের আনুগত্য করা স্বতন্ত্র কোনো ফরয নয়। যেমনটা নবি থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে,
'মুসলিম ব্যক্তির অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হচ্ছে প্রত্যেক প্রিয় এবং অপ্রিয় ব্যাপারে (দায়িত্বশীলের) আনুগত্য করা, যতক্ষণ না তাকে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ করা হয়। যদি আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ করা হয়, তাতে আনুগত্য (করার বিধান) নেই।'

খেয়াল করুন, আয়াতের পরবর্তী অংশে অর্থাৎ 'আল্লাহ এবং রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও'-এখানে ঠিক একই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখানে বলা হয়নি, 'আল্লাহর দিকে এবং তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।' কারণ আল্লাহর দিকে ফেরানো, আর রাসূলের দিকে ফেরানো একই কথা। কুরআনের দিকে ফেরানো হলে তার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-উভয়ের দিকে ফেরানো। আবার সুন্নাহর দিকে ফেরানো মানেও আল্লাহ ও রাসূল-উভয়ের দিকেই ফেরানো। সুতরাং, আল্লাহ তাআলা কোনো বিষয়ে বিধান দিলে, সেটা তাঁর রাসূলেরও বিধান। আবার রাসূল ﷺ কোনো বিষয়ে বিধান দিলে, সেটাও স্বয়ং আল্লাহর বিধান বলেই গণ্য হবে। কাজেই, আমরা যদি মতভেদের জায়গাগুলো আল্লাহর দিকে অর্থাৎ তাঁর কিতাবের দিকে ফিরিয়ে দিই, তবে আমরা আল্লাহ এবং রাসূল উভয়ের দিকে ফেরালাম। আবার যদি রাসূলের দিকে অর্থাৎ তাঁর সুন্নাহর দিকে ফিরাই, তবে সেটা আল্লাহর দিকেই ফিরিয়ে দেওয়া বলে গণ্য হবে। এই বিষয়টি কুরআনের অন্যতম সূক্ষ্ম তাৎপর্য।

টিকাঃ
[৪১] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৮৩৯; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৭১৪৪।

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 উলুল আমরের পরিচয়

📄 উলুল আমরের পরিচয়


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল ‘উলুল আমর’ বা কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তি সম্পর্কে দুটি মত বর্ণনা করেছেন। প্রথম মতানুসারে কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তি হচ্ছেন আলেমগণ। আর দ্বিতীয় মতানুসারে (ইসলামি) শাসকবৃন্দ। এই আয়াতের তাফসীরে দুটি মতই সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত। বাস্তবতা হচ্ছে, এখানে দুই দলই অন্তর্ভুক্ত হবেন। ১. উলামায়ে কেরাম, ২. (ইসলামি বিধান প্রয়োগকারী) শাসক। কারণ, রাসূল-এর আনীত দ্বীনের কর্তৃত্ব উলামা এবং শাসক—উভয় শ্রেণীর ওপরই ন্যস্ত।

১. উলামায়ে কেরাম: উলামাগণ দ্বীনের বিষয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ করেন। মানুষকে দ্বীনের কথাগুলো বয়ান করে বুঝিয়ে দেন এবং বাতিলপন্থিদের খণ্ডন করেন। কেউ সংশয় সৃষ্টি করলে, দ্বীনের বিকৃতি ঘটাতে চাইলে, বা রিদ্দার পথে হাঁটলে, তাদের অপনোদন করেন। এসব বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে দায়িত্ব প্রদান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘সুতরাং যদি এরা এগুলোকে প্রত্যাখ্যানও করে, তবে আমি এমন এক সম্প্রদায়ের প্রতি এগুলোর দায়িত্ব অর্পণ করেছি-যারা তা প্রত্যাখ্যান করবে না।
বস্তুত এটা এক মহান দায়িত্ব, যার অধিকারীদের আনুগত্য করা এবং তাদের শরণাপন্ন হতে লোকে বাধ্য। আর সাধারণ মানুষের তো তাদের অনুসরণ না করে উপায় নেই।

২. (ইসলামি বিধান প্রয়োগকারী) শাসক : শাসকদের দায়িত্ব হচ্ছে দ্বীনের বিষয়াদি বাস্তবায়ন করা, পৃষ্ঠপোষণ করা, রাষ্ট্রে দ্বীন কায়েম করা, জিহাদে নেতৃত্ব দেওয়া এবং দ্বীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের দমন করা। এই দুই শ্রেণীর মানুষ কর্তৃস্থানীয়/উলুল আমর। অন্য সবাই তাদের অনুসারী আর অধীনস্থ।

টিকাঃ
[৪২] শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, ইমাম আহমাদসহ অনেকেই উভয় দলকেই উলুল আমর আখ্যা দিয়েছেন। কারণ আল্লাহর নির্দেশের অনুগামী হলে উভয় দলের কথাই মান্য করা আবশ্যক। নবি ﷺ-এর জীবদ্দশাতে এবং তাঁর পরবর্তী খলিফাদের যুগে উভয় দলই একত্রে ছিলেন। -মাজমুউল ফাতাওয়া : ১৮/১৫৮
[৪৩] তাফসীরুত তাবারি: ৫/৯৩-৯; তাফসীরুল কুরতুবি: ৫/২৫৯-২৬০; আদদুররুল মানছুর : ২/৫৭৩-৫৭৬
[৪৪] সূরা আনআম, ৬ : ৮৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px