📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকা

📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকা


তারপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'অতএব ন্যায়বিচার করতে গিয়ে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না।' মহান আল্লাহ প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করছেন, যা ন্যায়বিচার করতে বাধা প্রদান করে। বসরার ব্যাকরণবিদদের মতে এ আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়—ন্যায়বিচার করে ফেলবে এই ভয়ে, অথবা ন্যায়বিচারকে অপছন্দ করে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না। প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করার মানে হলো, ন্যায়ের প্রতি ঘৃণা এবং ইনসাফ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তোমার মধ্যে রয়েছে। আর কুফার ব্যাকরণবিদদের মতে এ আয়াতের ব্যাখ্যা হবে—ন্যায়বিচার না করার উদ্দেশ্যে প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না। তবে বসরার ব্যাকরণবিদদের ব্যাখ্যাই এখানে বেশি সুন্দর ও জুতসই।

আল্লাহ তাআলা এরপর বলছেন, 'আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলো, কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও তবে (জেনে রেখো,) আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত।' আল্লাহ তাআলা এখানে সত্য গোপন করার দুটি পন্থা উল্লেখ করে সেগুলো থেকে সতর্ক করেছে। ১. বক্রতা (ঘুরানো-পেঁচানো) ২. উপেক্ষা করা (পাশ কাটিয়ে যাওয়া)।

যখন সত্য ও ন্যায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়, ফন্দিবাজরা তখন হককে প্রতিহত করার উপায় খুঁজে না পেয়ে বোবা শয়তানের মতো নিরবে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আবার কখনও হকের প্রমাণাদিকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। অপব্যাখ্যা করে এর মর্মার্থ বিকৃত করার প্রয়াস চালায়। এটি আবার দুইভাবে হতে পারে-
ক) শব্দের বিকৃতি : শব্দের ক্ষেত্রে বিকৃতির উদাহরণ হলো, শব্দকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উপস্থাপন করা। এক শব্দের জায়গায় আরেক শব্দ বলা বা নিজের মতো বাড়িয়ে কমিয়ে বলা, কিংবা শব্দকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যেন শ্রোতারা ধোঁকায় পড়ে যায়। যেমন, নবি-কে সালাম দেওয়ার সময় ইয়াহুদিরা মুখ বাঁকিয়ে 'আসসামু আলাইকুম' বলত।
খ) অর্থের বিকৃতি : আবার কখনও এই বিকৃতি সাধন করা হয় মর্মার্থ ও উদ্দেশ্য বোঝানোর ক্ষেত্রে। যেমন: কোনো বক্তব্যকে বক্তার উদ্দেশ্যের বিপরীত অর্থে ব্যাখ্যা করা, আংশিক মর্মার্থ উপস্থাপন করা ইত্যাদি।

এই দুই পদ্ধতিতে হকের প্রমাণকে বিকৃত করা হয়।

টিকাঃ
[৩২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২৯৩৫, ৬০২৪; সহীহ মুসলিম. হাদীস নং : ২১৬৫

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই চূড়ান্ত দলিল

📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই চূড়ান্ত দলিল


দুটি বিষয়ে আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। পুরো আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বান্দা শারীয়াতের দলিল পেলে, তা বিনাবাক্যে মেনে নেবে, প্রকাশ্যে স্বীকার করবে এবং মানুষকে সে দিকে আহ্বান করবে। উপেক্ষা বা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে না। পূর্ণ ঈমানদার হতে হলে, এমনকি ঈমানদার নামের হক আদায় করতে এর কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের নির্দেশ দিলে, কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না।

অতএব এটাই প্রমাণিত হয়, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে কোনো বিধান আসে—হোক তা আদেশ-নিষেধ কিংবা সংবাদমূলক—সেখানে মুমিন বান্দার এর বিপরীতে অন্যকিছু গ্রহণ করার অধিকার থাকে না। আদতে কোনো ঈমানদার নর-নারী এমনটা করতেই পারে না। এটা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক।

イমাম শাফিয়ি সাহাবা, তাবিয়ি ও পরবর্তী সালাফদের থেকে এ মর্মে ইজমা বর্ণনা করেছেন, যার কাছে কোনো বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ স্পষ্ট হয়ে যাবে, তার জন্য অন্য কারও কথার ওপর ভিত্তি করে সেই সুন্নাহ ত্যাগ করার কোনো জো নেই।

ইমাম শাফিয়ির এই কথার বিশুদ্ধতা পরবর্তী সকল ইমামগণ দ্বিধাহীনভাবে মেনে নিয়েছেন। কারণ সেই মহান মানুষের কথাই অকাট্য দলিল, সমগ্র মানবজাতির ওপর তা মেনে নেওয়া আবশ্যক, যিনি সব ধরনের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত, পবিত্র ও নিষ্পাপ। যিনি প্রবৃত্তির তাড়না থেকে কোনো কথা বলেন না। পক্ষান্তরে তিনি ছাড়া অন্য সবার কথার সর্বোচ্চ অবস্থান হচ্ছে, তা অনুসরণের 'উপযুক্ত', ব্যস। সে-সবকে রাসূলের সুন্নাহর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া কিংবা সুন্নাহর ওপর প্রাধান্য দেওয়া তো বহুত দূর কি বাত! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ ধরনের পদস্খলন থেকে হিফাযত করুন।

আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘বলুন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনিই দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে। মূলত রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।

আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, হিদায়াত একমাত্র রাসূলের আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত, অন্য কারও মধ্যে নয়। আল্লাহ এখানে শর্তযুক্ত করে দিয়েছেন, 'যদি তাঁর আনুগত্য করো, তবে হিদায়াত পাবে।' সুতরাং রাসূলের আনুগত্য যেখানে নেই, সেখানে হিদায়াতও নেই। বরং তা প্রবৃত্তির অনুসরণ ছাড়া কিছু নয়।

আয়াতে 'আনুগত্য করা' ক্রিয়াপদটি দ্বিরুক্ত না করে একবার উল্লেখ করলেই যথেষ্ট হতো। তা এভাবে যে, 'তোমরা আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করো।' এই দ্বিরুক্তিকরণের বিষয়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এ সম্পর্কে আমরা সামনে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনি দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী।' এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অর্পিত রিসালাতের বাণী প্রচার করা, মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া। আর তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে রাসূলকে সত্যায়ন করা। আনুগত্যের চাদর বিছিয়ে তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া। যেমনটি ইমাম যুহরি বলেছেন: 'আল্লাহর পক্ষ থেকে বয়ান এসেছে। রাসূলের দায়িত্ব তা পৌঁছে দেওয়া, আর আমাদের দায়িত্ব তা মেনে নেওয়া।' এখন তোমরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন না করো, ঈমান না আন এবং রাসূলের আনুগত্য না করো, তবে তাতে তোমাদেরই ক্ষতি; রাসূলের নয়। কারণ তার দায়িত্ব তো ছিল কেবল তোমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া; তোমাদেরকে ঈমানদার বানিয়ে দেওয়া নয়। 'মূলত রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।' তোমাদের হিদায়াত বা তাওফীক দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর নয়।

টিকাঃ
[৩৩] সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬
[৩৪] সূরা নূর, ২৪:৫৪
[৩৫] সহীহ বুখারি: ১৩/৫০৩

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 ‘হে ঈমানদার’ বলার কারণ

📄 ‘হে ঈমানদার’ বলার কারণ


আল্লাহ তাআলা প্রথমে আমাদেরকে 'হে ঈমানদার' বলে সম্বোধন করলেন। তারপর তাঁর আনুগত্য ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিলেন। 'ঈমানদার' বলে সম্বোধন করার দ্বারা, আল্লাহ তাআলা সচেতন করছেন। যে ঈমানের দিকে সম্পৃক্ত করে ডাক দেওয়া এবং সম্বোধন করা হয়েছে, সেই ঈমানের দাবি তো এটাই যে, তোমরা এ আদেশ পালন করবে। এটি একটি ভাষাগত সৌন্দর্যও বটে। যেমনটি বলা হয়, 'হে আল্লাহর দয়া ও নিয়ামাতে ধন্য বান্দা! আল্লাহ তাআলা যেভাবে তোমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও তেমনি (তাঁর সৃষ্টির ওপর) অনুগ্রহ করো।' 'ওহে জ্ঞানী ব্যক্তি! মানুষকে উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দিন।' 'হে বিচারক! ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন।' ইত্যাদি।

কুরআনুল কারীমের যেসব জায়গাতে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের মৌলিক বিধিবিধানের কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানেই 'হে ঈমানদারগণ' বলে সম্বোধন করেছেন। যেমন :
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সাওম ফরয করা হয়েছে।’
‘হে ঈমানদারগণ! যখন জুমুআর দিন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়...।
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের কৃত অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো৷’

এভাবে সম্বোধন করার তাৎপর্য এই যে, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে ঈমানের দাবি হচ্ছে তোমরা এই এই কাজ করবে।

টিকাঃ
[৩৬] সূরা নিসা, ৪ : ৫৯
[৩৭] সূরা বাকারাহ, ২ : ১৮৩
[৩৮] সূরা জুমুআহ, ৬২ : ৯
[৩৯] সূরা মায়িদাহ, ৫ : ১

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য

📄 আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য


এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।' এখানে একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য রয়েছে, যার ইঙ্গিত আমরা ইতিপূর্বে দিয়েছিলাম। আল্লাহ তাআলা এখানে এভাবে বলতে পারতেন, 'তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।' কিন্তু তা না করে ক্রিয়াপদকে দ্বিরুক্ত করে ও রাসূলের আনুগত্যের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সূক্ষ্মভাবে ইশারা দিলেন যে, আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য স্বতন্ত্রভাবেই আবশ্যক। এজন্যই কোনো বিষয়ে নবিজির কাছ থেকে আদেশ/নিষেধ পাওয়া গেলে, এবং কুরআন কারীমে সে বিষয়টা হুবহু উল্লেখ না থাকলেও, তাঁর হুকুম গ্রহণ করতে হবে ও আবশ্যকীয়ভাবে আমল করতে হবে। কুরআনে নেই, এ অজুহাতে তা পরিত্যাগ করা চলবে না। কারণ রাসূলের আনুগত্য মানে আল্লাহর আনুগত্য- একথাই কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। কিছু নির্বোধ এমনটা ধারণা করে থাকে, রাসূল কোনো ব্যাপারে নির্দেশ দিলে সেটা যদি কুরআনে বর্ণিত না থাকে, তবে তার আনুগত্য আবশ্যক নয়! নবিজি নিজেই (এই লোকদের সম্পর্কে সতর্ক করে) গেছেন,

'এমন একটা সময় আসবে যখন কোনো প্রাচুর্যবান লোক তার আসনে উপবেশন করবে। তার কাছে আমার কোনো আদেশ এলে সে বলবে, “আমাদের এবং তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট। আমরা কেবল তা-ই অনুসরণ করব, যা এতে পাব।” জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ একটি (অর্থাৎ সুন্নাহ) দেওয়া হয়েছে।

টিকাঃ
[৪০] মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৩২; সুনানু দারিমি : ৫৯২; তিরমিযি : ২৬৬৪, ইবনে মাজাহ : ১২

ফন্ট সাইজ
15px
17px