📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 মুখে দাবি করা ‘ভালোবাসি’

📄 মুখে দাবি করা ‘ভালোবাসি’


আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন ব্যক্তিরাও রাসূলকে এই অগ্রাধিকার প্রদান ও ভালোবাসার দাবি করে, যাদের রাতদিনের চেষ্টা-সাধনা অন্যের কথা ও মতামত-কেন্দ্রিক। রাসূলের বাণী নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। সেগুলোকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে তারা নিয়োজিত। তাদের রাগ-ভালোবাসা, সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টিও হয় সেগুলোকে কেন্দ্র করে। তাদের নালিশ দেওয়ার জায়গাও রাসূলের সুন্নাহ নয়, অন্য কোনো ব্যক্তি এবং ভিন্ন কোনো মতাদর্শ। নবিজির বক্তব্যকে তারা সেসব কথা ও মতামতের সাথে তুলনা করে। মিলে গেলে গ্রহণ করে নেয়। আর বিপক্ষে চলে গেলে অজুহাত খুঁজে বেড়ায়। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে, নানাভাবে পাশ কাটিয়ে চলে প্রিয়নবির সুন্নাহকে। কুরআন কারীমে এমনটাই বলা হয়েছে। দেখুন,

‘আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে (জেনে রেখো,) আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত।’

টিকাঃ
[২৮] সূরা নিসা, ৪: ১৩৫

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা

📄 ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা


আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদেশ দিয়েছেন; যাকে ইনসাফ বলা হয়। এ আদেশের আলোকে সবার সাথে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বন্ধু কিংবা শত্রুর সাথেও। ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বান্দা দ্বীন-সংক্রান্ত মতামতকে প্রাধান্য দেবে। কারণ তা আল্লাহ তাআলার আদেশ এবং তাঁর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সংবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ক্ষেত্রে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা, কোনো ব্যক্তিগত মতামতকে রক্ষা করতে গিয়ে রাসূলের সুন্নাহ থেকে সরে যাওয়া-নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহর রাসূলদের আনীত বিধানের পরিপন্থি। আর ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা উম্মাহর মধ্যে রাসূলের প্রতিনিধিত্বকারী নববি ইলমের আমানতপ্রাপ্ত উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। এ আমানতদারির গুণে গুণান্বিত তাদেরই করা যায়, যারা পূর্ণরূপে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহ, তাঁর রাসূল, তাঁর কিতাব ও তাঁর বান্দাদের প্রতি কল্যাণকামী হয়ে নিষ্কলুষ ইনসাফ বজায় রেখেছে। রাসূলের প্রকৃত উত্তরাধিকারী তাদেরকেই বলা যায়।

পক্ষান্তরে কিছু মানুষ নিজেদের গুরু ও নেতাদের, নিজেদের দল ও মতাদর্শকে হকের মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছে। কারও সাথে নিজেদের মতাদর্শ মিললে তবেই তার সাথে বন্ধুত্ব করে। শুধুমাত্র নিজের মতাদর্শের বিপরীতে যাওয়ার কারণে কারও সাথে শত্রুতা পোষণ করে। কোথায় গেল সেই ইনসাফ, যা আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বান্দার ওপর ফরয করেছেন? এটাই তো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এবং মহাকর্তব্য।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ।' সাক্ষ্য দেওয়া মানে তো কোনো বিষয়ে সংবাদ দেওয়া। এখন সাক্ষ্যদাতা যদি সত্য সংবাদ দেয়, তবে সে ন্যায়ের পক্ষে। পক্ষান্তরে অসত্য সংবাদ দেওয়া মানে মিথ্যা ও যুলুমের পক্ষ নেওয়া। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা আদেশ করছেন যে, আমরা সাক্ষ্য ন্যায়সঙ্গতভাবে দেবো, পাশাপাশি আমাদের সাক্ষ্য হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। অন্য কারও জন্য নয়। আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলছেন,

‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাকবে৷’

তো এই আয়াত দুটিতে চারটি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে : ১. ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, ২. ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা আল্লাহর জন্য হওয়া, ৩. ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দেওয়া এবং ৪. সেটাও আল্লাহর জন্য হওয়া।

সূরা নিসায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেওয়াকে বিশেষায়িত করা হয়েছে। আর সূরা মায়িদায় বিশেষায়িত করা হয়েছে আল্লাহর জন্য অবিচল থাকা ও ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দেওয়াকে। দুই আয়াতে ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে উল্লেখ করার মাঝে কুরআনুল কারীমের একটি চমৎকার রহস্যের দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়; যা এখানকার আলোচনার বিষয় নয় বলে আলোচনা করা থেকে বিরত থাকলাম। এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।'

আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেন বান্দা যেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে এবং সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকে। এই ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যদি তার সবচেয়ে আপন মানুষ পিতা-মাতা এবং আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে চলে যায়, এমনকি নিজের বিরুদ্ধেও যায়, তবুও যেন সে পিছপা না হয়। কারণ নিজের জীবনের মায়া, কাছের মানুষদের ভালোবাসা-বান্দাকে ন্যায়ের পক্ষে থাকতে বাধা দেয়। বিশেষত যদি সত্য বললে বিপরীত পক্ষে রায় চলে যায়, তখন তো ব্যাপারটি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমন কঠিন মুহূর্তে কেবল ওই ব্যক্তিই ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে পারে, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল যার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়। এই অবস্থায় বান্দা নিজের ঈমানকে পরখ করে দেখতে পারে। জেনে নিতে পারে অন্তরে থাকা ঈমানের হাল-হাকিকত।

এ তো গেল ভালোবাসা আর মায়ার জালে জড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা থেকে পিছিয়ে না পড়ার আলোচনা। এবার দেখি ঘৃণা ও ক্ষোভের জায়গাটা। বান্দা তার বিরোধী পক্ষের লোকের ব্যাপারে এমনকি শত্রুর ব্যাপারেও ইনসাফ বজায় রাখবে। পিতা-মাতা এবং আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে গেলেও তাদের ভালোবাসার জালে আটকে গিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা থেকে যেমন বিরত থাকবে না; তেমনি ঘৃণার কারণে কারও প্রতি যুলুম করে বসবে না। মোটকথা, কারও প্রতি ঘৃণা যেন কোনো অন্যায় কাজে তাকে প্ররোচিত না করে। তেমনি কারও প্রতি ভালোবাসাও যেন ন্যায় থেকে দূরে সরিয়ে না রাখে। যেমনটি একজন সালাফ বলতেন, 'ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি রাগান্বিত হলে, তার রাগ তাকে দিয়ে কোনো অন্যায় কাজ করাতে পারে না। আবার কারও প্রতি সন্তুষ্টি হলে, তার সন্তুষ্টি তাকে হক থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।

তো এই আয়াত দুটি থেকে দুইটি বিধান পাওয়া যায়, ১. ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং ২. শত্রুমিত্র সবার ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দেওয়া।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'সে ধনী বা দরিদ্র যাই হোক, আল্লাহ (তোমাদের চেয়ে) তাদের বেশি কল্যাণকামী।' অর্থাৎ যার বিপক্ষে সাক্ষ্য দিতে হবে, হতে পারে সে ধনী। তার থেকে উপকার লাভের আশায় তোমরা সাক্ষ্য দেওয়া থেকে পিছিয়ে যেতে পার। হতে পারে সে দরিদ্র, যার কাছে তোমাদের কোনো কিছু পাওয়ার আশা নেই বা তাকে তোমরা ভয় করো না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমাদের তুলনায় তাদের বেশি কল্যাণকামী। তিনি তাদের উভয় শ্রেণীর প্রতিপালক, উভয় শ্রেণীর মনিব। তোমরা যেমন আল্লাহর বান্দা, তেমনি তারাও তো আল্লাহরই বান্দা। কাজেই ধনীর সম্পদের দিকে আকৃষ্ট হয়ে, কিংবা দরিদ্রের গরিবি হালতের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে, কোনো অবস্থাতেই কারও পক্ষপাতিত্ব করবে না। কারণ তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেয়ে বেশি কল্যাণকামী।

আরেকটু ভেঙে বললে, কখনও কখনও আমরা ধনী ও দরিদ্রের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে কিংবা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে ভয় পাই। ধনীর ক্ষেত্রে তার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর দরিদ্রের ক্ষেত্রে আশঙ্কা থাকে যে, সে আরও অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এসব কারণে অন্তরে সহানুভূতি তৈরি হয়। ফলে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এজন্যই আমাদেরকে বলা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা ধনী-গরিব সবার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে বেশি কল্যাণকামী। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয়ে তোমাদের চেয়ে তিনি বেশি অবগত এবং তাদের প্রতি তোমাদের চেয়ে বেশি দয়াশীল। অতএব ধনী-গরিব কারও ক্ষেত্রেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় পিছপা হয়ো না।

টিকাঃ
[২৯] সূরা নিসা, ৪: ১৩৫
[৩০] সূরা মায়িদাহ, ৫ : ৮
[৩১] ইহয়াউ উলূমিদ্দীন: ৩/১৭৬-এ মুহাম্মাদ ইবনু কাব-এর সূত্রে এবং আল মুজামুস সগীর লিততাবারানি, পৃষ্ঠা নং: ১১৪-এ আনাস-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকা

📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকা


তারপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'অতএব ন্যায়বিচার করতে গিয়ে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না।' মহান আল্লাহ প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করছেন, যা ন্যায়বিচার করতে বাধা প্রদান করে। বসরার ব্যাকরণবিদদের মতে এ আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়—ন্যায়বিচার করে ফেলবে এই ভয়ে, অথবা ন্যায়বিচারকে অপছন্দ করে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না। প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করার মানে হলো, ন্যায়ের প্রতি ঘৃণা এবং ইনসাফ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তোমার মধ্যে রয়েছে। আর কুফার ব্যাকরণবিদদের মতে এ আয়াতের ব্যাখ্যা হবে—ন্যায়বিচার না করার উদ্দেশ্যে প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না। তবে বসরার ব্যাকরণবিদদের ব্যাখ্যাই এখানে বেশি সুন্দর ও জুতসই।

আল্লাহ তাআলা এরপর বলছেন, 'আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলো, কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও তবে (জেনে রেখো,) আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত।' আল্লাহ তাআলা এখানে সত্য গোপন করার দুটি পন্থা উল্লেখ করে সেগুলো থেকে সতর্ক করেছে। ১. বক্রতা (ঘুরানো-পেঁচানো) ২. উপেক্ষা করা (পাশ কাটিয়ে যাওয়া)।

যখন সত্য ও ন্যায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়, ফন্দিবাজরা তখন হককে প্রতিহত করার উপায় খুঁজে না পেয়ে বোবা শয়তানের মতো নিরবে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আবার কখনও হকের প্রমাণাদিকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। অপব্যাখ্যা করে এর মর্মার্থ বিকৃত করার প্রয়াস চালায়। এটি আবার দুইভাবে হতে পারে-
ক) শব্দের বিকৃতি : শব্দের ক্ষেত্রে বিকৃতির উদাহরণ হলো, শব্দকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উপস্থাপন করা। এক শব্দের জায়গায় আরেক শব্দ বলা বা নিজের মতো বাড়িয়ে কমিয়ে বলা, কিংবা শব্দকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যেন শ্রোতারা ধোঁকায় পড়ে যায়। যেমন, নবি-কে সালাম দেওয়ার সময় ইয়াহুদিরা মুখ বাঁকিয়ে 'আসসামু আলাইকুম' বলত।
খ) অর্থের বিকৃতি : আবার কখনও এই বিকৃতি সাধন করা হয় মর্মার্থ ও উদ্দেশ্য বোঝানোর ক্ষেত্রে। যেমন: কোনো বক্তব্যকে বক্তার উদ্দেশ্যের বিপরীত অর্থে ব্যাখ্যা করা, আংশিক মর্মার্থ উপস্থাপন করা ইত্যাদি।

এই দুই পদ্ধতিতে হকের প্রমাণকে বিকৃত করা হয়।

টিকাঃ
[৩২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২৯৩৫, ৬০২৪; সহীহ মুসলিম. হাদীস নং : ২১৬৫

📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই চূড়ান্ত দলিল

📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই চূড়ান্ত দলিল


দুটি বিষয়ে আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। পুরো আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বান্দা শারীয়াতের দলিল পেলে, তা বিনাবাক্যে মেনে নেবে, প্রকাশ্যে স্বীকার করবে এবং মানুষকে সে দিকে আহ্বান করবে। উপেক্ষা বা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে না। পূর্ণ ঈমানদার হতে হলে, এমনকি ঈমানদার নামের হক আদায় করতে এর কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের নির্দেশ দিলে, কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না।

অতএব এটাই প্রমাণিত হয়, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে কোনো বিধান আসে—হোক তা আদেশ-নিষেধ কিংবা সংবাদমূলক—সেখানে মুমিন বান্দার এর বিপরীতে অন্যকিছু গ্রহণ করার অধিকার থাকে না। আদতে কোনো ঈমানদার নর-নারী এমনটা করতেই পারে না। এটা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক।

イমাম শাফিয়ি সাহাবা, তাবিয়ি ও পরবর্তী সালাফদের থেকে এ মর্মে ইজমা বর্ণনা করেছেন, যার কাছে কোনো বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ স্পষ্ট হয়ে যাবে, তার জন্য অন্য কারও কথার ওপর ভিত্তি করে সেই সুন্নাহ ত্যাগ করার কোনো জো নেই।

ইমাম শাফিয়ির এই কথার বিশুদ্ধতা পরবর্তী সকল ইমামগণ দ্বিধাহীনভাবে মেনে নিয়েছেন। কারণ সেই মহান মানুষের কথাই অকাট্য দলিল, সমগ্র মানবজাতির ওপর তা মেনে নেওয়া আবশ্যক, যিনি সব ধরনের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত, পবিত্র ও নিষ্পাপ। যিনি প্রবৃত্তির তাড়না থেকে কোনো কথা বলেন না। পক্ষান্তরে তিনি ছাড়া অন্য সবার কথার সর্বোচ্চ অবস্থান হচ্ছে, তা অনুসরণের 'উপযুক্ত', ব্যস। সে-সবকে রাসূলের সুন্নাহর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া কিংবা সুন্নাহর ওপর প্রাধান্য দেওয়া তো বহুত দূর কি বাত! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ ধরনের পদস্খলন থেকে হিফাযত করুন।

আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘বলুন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনিই দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে। মূলত রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।

আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, হিদায়াত একমাত্র রাসূলের আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত, অন্য কারও মধ্যে নয়। আল্লাহ এখানে শর্তযুক্ত করে দিয়েছেন, 'যদি তাঁর আনুগত্য করো, তবে হিদায়াত পাবে।' সুতরাং রাসূলের আনুগত্য যেখানে নেই, সেখানে হিদায়াতও নেই। বরং তা প্রবৃত্তির অনুসরণ ছাড়া কিছু নয়।

আয়াতে 'আনুগত্য করা' ক্রিয়াপদটি দ্বিরুক্ত না করে একবার উল্লেখ করলেই যথেষ্ট হতো। তা এভাবে যে, 'তোমরা আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করো।' এই দ্বিরুক্তিকরণের বিষয়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এ সম্পর্কে আমরা সামনে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনি দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী।' এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অর্পিত রিসালাতের বাণী প্রচার করা, মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া। আর তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে রাসূলকে সত্যায়ন করা। আনুগত্যের চাদর বিছিয়ে তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া। যেমনটি ইমাম যুহরি বলেছেন: 'আল্লাহর পক্ষ থেকে বয়ান এসেছে। রাসূলের দায়িত্ব তা পৌঁছে দেওয়া, আর আমাদের দায়িত্ব তা মেনে নেওয়া।' এখন তোমরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন না করো, ঈমান না আন এবং রাসূলের আনুগত্য না করো, তবে তাতে তোমাদেরই ক্ষতি; রাসূলের নয়। কারণ তার দায়িত্ব তো ছিল কেবল তোমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া; তোমাদেরকে ঈমানদার বানিয়ে দেওয়া নয়। 'মূলত রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।' তোমাদের হিদায়াত বা তাওফীক দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর নয়।

টিকাঃ
[৩৩] সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬
[৩৪] সূরা নূর, ২৪:৫৪
[৩৫] সহীহ বুখারি: ১৩/৫০৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px