📄 শর্তহীন আনুগত্য
কাজেই, এই হিজরতের কথা শোনো। তার পথ অনুসরণ করো। নিজে নিজে একটু হিসাব কষে দেখো। তুমি কি এই পথের হিজরতকারী হবে, নাকি পরিত্যাগকারী? তো এই হিজরতের সংজ্ঞা কী? প্রিয়নবি -এর নিঃশর্ত অনুসরণ। জীবনের আদর্শ হিসেবে একমাত্র তাঁকেই গ্রহণ করা। সকল পথ, মত ও তন্ত্রমন্ত্রের ওপর তাঁর সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সুন্নাহর দীপ্ত আলোতেই হিদায়াত ও মুক্তির পথ খোঁজা। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে জীবনতরীর মুখ মদীনাওয়ালার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। জীবনে উদ্ভাবিত সকল বিষয়ে 'আস-সাদিকুল মাসদৃক' নবি আলাইহিস সালামের মুখনিঃসৃত নূরানি ঝরনার দিকে ছোটা। সবকিছু উপেক্ষা করে তাঁর হিদায়াতের খনিতেই সমাধানের পথ খোঁজা। যার ব্যাপারে প্রতিপালক এই স্বীকৃতি দিয়েছেন :
'তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেননা। তা তো ওহি, যা তার কাছে প্রত্যাদেশ হয়।'
অতএব প্রত্যেক বিষয়েই তার সত্যায়ন পেতে হবে। রিসালাতের কষ্টিপাথরে না টিকলে, কোনোকিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো সাক্ষীকে তিনি যদি সত্যায়ন না করেন, তবে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। সে যে-ই হোক না কেন। এটাই রাসূলের দিকে হিজরত।
আমরা বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াই—'আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের দেখানো পথে চলি। তাদের রজ্জু আঁকড়ে ধরি। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি। তাঁরা কি কম বুঝতেন? আমার কল্যাণের ব্যাপারে তাদের বিবেচনা অবশ্যই ভালো ছিল।’
(নবিজির অনুসরণ না করে এই ধরনের কথা বললে,) আমার সেই হিজরতের আর কী বাকি থাকল? সব কিছুই তো বাপদাদাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। সফলতা আর মুক্তির দায়িত্ব তো তাদের কাঁধেই ন্যস্ত করলাম। নিজেরা অলস হয়ে গেলাম এই ভেবে যে, আমাদের বুঝ-বুদ্ধির চেয়ে তাদেরটা অনেক ভালো ছিল। আসলে আমরা এই নশ্বর দুনিয়ার মোহে পড়ে আছি। সেই সাথে অলসতা ও অকর্মণ্যতা আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। নবি -এর সুন্নাহকে অনুধাবন আর গ্রহণ করার প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। সত্যকে এড়িয়ে যেতেই আমরা এসব কথা বলি। মাআযাল্লাহ! অথচ এই হিজরত সবার ওপর সর্বাবস্থায় ফরয। 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ'-এর দাবিও এই হিজরত। কেননা এই শাহাদাতের দাবি হচ্ছে, আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করা, রাসূলের সবকথা একবাক্যে বিশ্বাস করে নেওয়া এবং তাঁর দেখানো পথে আল্লাহর ইবাদাত করা। এটা 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এরও দাবি।
এই দুই হিজরতের ব্যাপারে কবরে ও কিয়ামাতে প্রত্যেক বান্দা জিজ্ঞাসিত হবে। দুনিয়াতেও তার থেকে এই দুই হিজরতই কাম্য। তাহলে কী দাঁড়ালো? তিন স্থানে বান্দা এই দুই বিষয়ে আদিষ্ট : দুনিয়ার জীবন, কবরের জগৎ এবং শেষ বিচারের দিন। ক্বাতাদাহ বলেন, দুটি বাক্যের ব্যাপারে সব মানুষ জিজ্ঞাসিত হবে : ১. তোমরা কীসের ইবাদাত করতে? ২. তোমাদের কাছে প্রেরিত রাসূলের ডাকে কীভাবে সাড়া দিয়েছিলে?
সবমিলিয়ে এই দুটি বাক্যই কালিমা শাহাদাতের দুই অংশ। এই হিজরত দুটিই শাহাদাতের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট সব বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফায়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়৷’
আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের মহান সত্তার শপথ করে বলেছেন, বিবদমান সব বিষয়ে এবং দ্বীনের সর্বক্ষেত্রে নবি -কে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হিসেবে না মানলে, ঈমানদার হওয়া যাবে না। আয়াতে 'সব বিবাদের' বলে ব্যাপকতার সাথে হুকুম দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কেউ যদি একটি বিষয়েও নবিজিকে ফায়সালাকারী না মানে, নবিজির বিধান ছাড়া অন্য কোনো মতবাদকে ফায়সালাকারী হিসেবে সাব্যস্ত করে, তবে তার ঈমান প্রত্যাখ্যাত হবে। এটুকুই শেষকথা নয়। সাথে সাথে হৃদয়ের প্রশস্ততার ব্যাপারেও শর্তারোপ করা হয়েছে-রাসূলের ফায়সালার প্রতি অন্তরে কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখা যাবে না। কোনো রকম কিন্তু রাখা যাবে না; বরং খুশিমনে তা গ্রহণ করবে। এমন নয় যে, বাধ্য হয়ে ঘোলা জল পান করবে বা চাপে পড়ে মেনে নেবে। এই অবস্থা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। ঈমানের দাবি হচ্ছে সন্তুষ্টির সাথে (নবিজির ফায়সালা) মেনে নেওয়া। এ ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান যাচাই করতে চাইলে, বান্দার উচিত নিজের অন্তরের দিকে লক্ষ করা।
টিকাঃ
[২০] সূরা নাজম, ৫৩: ৩-৪
[২১] তাফসীরুত তাবারি : ১৪/৪৬; তাফসীরু ইবনি কাসীর : ২/৫৭৯
[২২] সূরা নিসা, ৪: ৬৫
📄 পূর্ণ সম্মতির ভিত্তিতে আনুগত্য
আবার কিছু লোকের অন্তরে কুরআন-সুন্নাহর টেক্সটের প্রতি অনেক বিদ্বেষ (লুকিয়ে থাকে)! প্রবৃত্তির অনুসরণ করার জন্য ওরা ইনিয়ে বিনিয়ে কত কথাই-না বলে। তাদের মনের বাসনা এমন—এই বিধানগুলো না এলেই তো ভালো হতো!
আল্লাহ তাআলা এতটুকুতেই শেষ করেননি। এর সাথে আরও যুক্ত করেছেন, ‘এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়’। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল স. যা ফায়সালা দেবেন, তা স্বেচ্ছায় মেনে নেবে। সন্তুষ্টচিত্তে সেই ফায়সালার সামনে আত্মসমর্পণ করবে। বল প্রয়োগকারী স্বৈরাচারের কাছে পরাভূত ব্যক্তির মতো বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ নয়; বরং একজন অনুগত গোলামের মতো নিজেকে সঁপে দেওয়া, যার কাছে মনিব সবার চেয়ে প্রিয়। সে এটা অনুধাবন করতে পারে যে, নিজেকে মনিবের কাছে সমর্পণ করার মধ্যেই তার যত সুখ ও সফলতা। সে ভালো করে জানে, মনিবই তার সর্বাধিক আপন, তার প্রতি সবচেয়ে সদয়। তিনিই সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী এবং তাকে রক্ষা করতে সবচেয়ে বেশি তৎপর। এ সব কিছুতে তিনিই সর্বাগ্রে। এমনকি তার নিজের চেয়েও বেশি। বান্দা যখন আল্লাহর রাসূলের ব্যাপারে এই উপলব্ধি হৃদয়ে গেঁথে নিতে সক্ষম হবে, তখন বিনাবাক্যে নিজেকে সোপর্দ করবে তাঁর কাছে। অন্তরের প্রতিটি অংশ তাঁর কাছে সঁপে দেবে। আর এটা বিশ্বাস করবে যে, রাসূলের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা ও তাঁর আনুগত্য করার মাঝেই নিজের সৌভাগ্য ও সফলতা।
এই বিষয়টি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার সম্ভব নয়। হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধি করার বিষয়। এটা শুধুই বোঝার বিষয়, বোঝানোর নয়। কেবল আশা কিংবা দাবির মাধ্যমেও অর্জন করার কোনো বিষয়ও এটি নয়। ভালোবাসার মানুষের নাম জানা এবং ভালোবাসার (ব্যাপারে নিজের) অবস্থান-এ দুয়ের মাঝে তফাত আছে। কোনো অবস্থার নাম জানা এবং অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া, দুটিকে অনেকেই এক করে ফেলে। সুস্থতা সম্পর্কে জানা অসুস্থ ব্যক্তি এবং সুস্থতার বর্ণনা দিতে অক্ষম সুস্থ ব্যক্তির মাঝেও পার্থক্য আছে। আবার ভয় সম্পর্কে জানে এমন ব্যক্তি এবং ভীত ব্যক্তিও একরকম নয়।
টিকাঃ
[২০] আল কিয়ামাহ, ৭৫ : ১৪-১৫ (বিঃ দ্রঃ এটি মূল বইয়ের ২৬ পৃষ্ঠার রেফারেন্স)
📄 বিভিন্ন আঙ্গিকে জোর প্রদান
আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা নবি ﷺ-এর আনুগত্য করতে বিভিন্ন আঙ্গিকে জোর দিয়েছেন। একটু লক্ষ করুন :
১. শপথের শুরুতে 'না' যুক্ত করা: কেউ কেউ এই 'না'-কে অতিরিক্ত ধারণা করলেও প্রকৃতপক্ষে আরবদের কথায় এটার ব্যাপক প্রচলন আছে। তারা কোনো বিষয়ে জোর বুঝানোর জন্য কথার শুরুতে 'না' এবং শপথের শব্দ ব্যবহার করে থাকে। কুরআনুল কারীমের অনেক জায়গাতে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে কাফিররা মিথ্যা অভিযোগ করেছিল। তারা একে কবিতা, যাদু এমনকি গণকের কথা সাব্যস্ত করেছিল। তাদের কথা রদ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
'অতএব না! (তাদের কথা সঠিক নয়,) আমি তারকারাজির অস্তাচলের শপথ করছি। নিশ্চয়ই এটা এক মহাশপথ, যদি তোমরা জানতে! অবশ্যই এটা সম্মানিত কুরআন।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
'অতএব না! (তাদের কথা সঠিক নয়,) আমি শপথ করছি সেসব নক্ষত্রের যা পশ্চাতে সরে যায়, যা প্রত্যাগমন করে ও অদৃশ্য হয়! শপথ করছি রাতের, যখন তার অবসান হয়! এবং প্রভাতের, যখন তার আগমন ঘটে! নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবাহকের আনীত বাণী।
অন্য জায়গায় বলেন,
'না! (পুনরুত্থানের বিষয়ে তাদের মত সঠিক নয়,) আমি শপথ করছি কিয়ামাত-দিবসের! আরও শপথ করছি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়! মানুষ কি মনে করে আমি তাদের অস্থিসমূহ একত্র করব না? ওপরন্তু আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সঠিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম৷’
মোটকথা, এভাবে না-বোধক শব্দ দ্বারা শপথ শুরু করার উদ্দেশ্যে হচ্ছে— শপথকৃত বিষয়টি আরও জোরদার করা এবং তার বিপরীত বিষয়টিকে চূড়ান্তভাবে রদ করা।
২. শপথের মাধ্যমে জোর প্রদান: সরাসরি শপথের মাধ্যমেও জোর দেওয়া হয়েছে।
৩. শপথকৃত বিষয়ের গুরুত্ব বুঝানো: কোনো সৃষ্টির নামে শপথ না করে, স্বয়ং নিজ সত্তার শপথ করা। আল্লাহ তাআলা কখনও নিজ সত্তার শপথ করেন, আবার কখনও তাঁর কোনো সৃষ্টির শপথ করেন। (কিন্তু এই ক্ষেত্রে নিজের নামে কসম করেছেন)।
৪. হৃদয়ের সংকীর্ণতাকে নাকচ: এর মাধ্যমে আত্মসমর্পণের শর্তারোপ করে, জরুরি তাগিদ করা হয়েছে।
৫. ক্রিয়ার সাথেও জোর প্রদান: আরবি ব্যাকরণের পরিভাষায় একে 'আত-তাকীদ বিল মাসদার' বলা হয়। আর এভাবে তাকীদযুক্ত করে উল্লেখ করার দ্বারা, বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে আসে।
টিকাঃ
[২৪] ওয়াক্বিআহ, ৫৬ : ৭৫-৭৭
[২৫] সূরা তাকভীর, ৮১ : ১৫-১৯
[২৬] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫ : ১-৪