📘 মুসাফিরের পাথেয় 📄 হিজরতের প্রকারভেদ

📄 হিজরতের প্রকারভেদ


হিজরত দুই ধরনের।
১. সশরীরে এক দেশ থেকে আরেক দেশে হিজরত। শারীয়াতে এই হিজরতের নির্ধারিত বিধিবিধান রয়েছে। আমাদের আলোচনা এই প্রকারের হিজরত নিয়ে নয়।
২. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হিজরত করা। সশরীরে নয়, শর্তহীন দাসত্ব, আত্মসমর্পণ ও ইখলাসের মাধ্যমে। অনুসরণ, অনুকরণ ও একমাত্র আদর্শ হিসেবে সুন্নাহকে গ্রহণ করে রাসূলের দিকে হিজরত। আমাদের আলোচনার বিষয় এটিই। এটাই আসল ও প্রকৃত হিজরত। শারীরিক হিজরত মূলত এই হিজরতেরই অনুগামী।

আল্লাহর দিকে হিজরত
হিজরত মানে এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গার দিকে চলে যাওয়া। প্রত্যেক হিজরতের একটা শুরু ও শেষ থাকে। অর্থাৎ বান্দা অন্তরের মাধ্যমে গাইরুল্লাহর ভালোবাসা থেকে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসার দিকে হিজরত করবে। গাইরুল্লাহর দাসত্ব থেকে হিজরত করবে আল্লাহর দাসত্বের দিকে। গাইরুল্লাহকে ভয় না করে আল্লাহকে ভয় করবে। গাইরুল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করা বাদ দিয়ে প্রত্যাশা করবে আল্লাহ তাআলার কাছে। গাইরুল্লাহর ওপর ভরসা ছেড়ে দিয়ে, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। গাইরুল্লাহকে বাদ দিয়ে এক আল্লাহকে ডাকবে, গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে চাইবে এবং গাইরুল্লাহর আনুগত্য থেকে বের হয়ে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের দিকে হিজরত করবে। এটাকেই বলে আল্লাহর পানে ধাবিত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, তোমরা আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। তাওহীদের দাবিও এটিই। বান্দা আল্লাহর কাছ থেকে পলায়ন করে তাঁর দিকেই ছুটে আসবে।

এই পলায়ন করা ও ছুটে আসার মধ্যে তাওহীদের এক গূঢ় রহস্য রয়েছে। বান্দা তার আনুগত্য-আত্মসমর্পণ, ভয়-প্রত্যাশা, কামনা-যাচনা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই সংরক্ষিত রাখবে। শাস্ত্রীয় ভাষায় একে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ বলা হয়। অর্থাৎ ইবাদাত ও ইবাদাতের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো একমাত্র আল্লাহর জন্য। সব নবির দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু এটিই ছিল। এটাই হলো আল্লাহ তাআলার ‘দিকে' ছুটে আসার রহস্য। তাহলে আল্লাহ তাআলা থেকে পলায়নের ব্যাপারটা কী হবে?

এখানেও আল্লাহ তাআলার তাওহীদের এক গূঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে। একটু ভেঙে বলছি। দেখুন, দুনিয়ার যত দুঃখ-বিপর্যয় থেকে বান্দা দূরে থাকতে চায়, অপছন্দ করে, পলায়ন করতে চায়, তা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে। ইতিপূর্বে আমরা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম, যেগুলো থেকে ফিরে এসে বান্দাকে আল্লাহর দিকে ধাবিত হতে হবে, সেগুলোও আল্লাহরই ক্ষমতাধীন। কারণ, আল্লাহ তাআলা যা কিছু অস্তিত্বে আনার ইচ্ছা করেন, তা-ই অস্তিত্বে আসে। তিনি যা চান না, তা কখনোই অস্তিত্বে আসতে পারে না। বান্দা যা কিছু থেকে পলায়ন করে, যেসব বিষয় থেকে বান্দাকে আবশ্যিকভাবে বিরত থাকতে হয়, তার কোনোকিছুই আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার বাইরে নয়। অতএব বান্দা যখন কোনোকিছু থেকে পালিয়ে অন্য দিকে ছুটে চলে, বাস্তবে সে আল্লাহর থেকে আবার আল্লাহর দিকেই ছুটে আসে। এ বিষয়টি যে ধরতে পারবে, সে নবি -এর নিম্নোক্ত দুআ অনুধাবন করতে সক্ষম হবে।
‘আমি আপনার থেকে আপনার কাছেই আশ্রয় চাই।’
‘আপনার থেকে পালিয়ে আপনার দিকে যাওয়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো আশ্রয়স্থল ও পরিত্রাণের পথ নেই।’

বিশ্বজগতে যার ভয়ে পলায়ন করা হয়, যার থেকে পরিত্রাণ চাওয়া হয়, তার সবই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। আল্লাহই তো তাকে সৃষ্টি করেছেন। তাহলে কী দাঁড়াল? আশ্রয়প্রার্থী বান্দা আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট বিষয় থেকে পলায়ন করে, আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী হলো। বান্দা যেন আল্লাহর থেকে পালিয়ে আবার তাঁর দিকেই ছুটে গেল। আল্লাহ তাআলার কাছে স্বয়ং তাঁর থেকেই আশ্রয় প্রার্থনা করল।

এই চিন্তা যদি বান্দা নিজের অন্তরে গেঁথে নিতে পারে, তবে তার অন্তর আল্লাহ ছাড়া অন্য যে-কারও থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অন্য কিছুর ভয়, আশা কিংবা ভালোবাসা থেকে মুক্ত হয়ে নিরেট তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে। তাকদীরের বিশ্বাসেও আর কোনো সমস্যা থাকবে না। কারণ সে বুঝতে পারবে—আমি যার থেকে পলায়ন করছি, যা কিছু থেকে আশ্রয় চাচ্ছি, তা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন। এসব তাঁরই সৃষ্টি। তখন বান্দার হৃদয়ে সেই সৃষ্টির্কতার ভয় ছাড়া আর কিছু বাকি থাকে না।

বান্দার পলায়ন করাটা যদি এমন কোনো বিষয় থেকে হতো যা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছে এবং ক্ষমতার বাইরে, তখন ওই বিষয়ের প্রতি ভীত হওয়াটা তার জন্য স্বাভাবিক ছিল। যেমন কোনো ব্যক্তি শক্তিশালী প্রাণী থেকে শক্তিশালী বস্তুর দিকে পলায়ন করছে। পালানোর সময় তার মধ্যে একটা ভয় কাজ করবে। সে আশঙ্কায় থাকবে-যার দিকে সে ছুটছে, সে যদি এই প্রাণী থেকে তাকে বাঁচাতে সক্ষম না হয়! পক্ষান্তরে যদি এমনটা হয় যে, সে যার দিকে ছুটে যাচ্ছে সে-ই ওই প্রাণীর নিয়ন্ত্রক, তখন তার হৃদয়ের সব মনোযোগ ওই একক সত্তার দিকেই নিবিষ্ট থাকবে। কোনো রকম দুশ্চিন্তা কাজ করবে না। এই গূঢ় রহস্যই রয়েছে নবি-এর কথা দুটিতে- 'আমি আপনার থেকে আপনার কাছেই আশ্রয় গ্রহণ করি।' 'আপনার থেকে পালিয়ে আপনার দিকে যাওয়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো আশ্রয়স্থল ও পরিত্রাণের পথ নেই। আমরা অনেকেই এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলে থাকি। কিন্তু এই পয়েন্টটি খুব কম মানুষই ধরতে পারে। অথচ এটাই মূল বিষয়।

একটা বিষয় লক্ষ করুন, বান্দার সব বিষয় ঘুরে ফিরে ওই এক জায়গাতেই চলে আসে—'আল্লাহর থেকে পলায়ন করে তাঁর কাছেই ছুটে আসা।' অর্থাৎ কিছু বিষয় থেকে ফিরে এসে কিছু বিষয়ের দিকে ছুটে যাওয়া। আমরা শুরুতে-যে আল্লাহর দিকে হিজরত করার কথা বলছিলাম, তার মর্মার্থও এটাই। এজন্যই নবি বলেছেন,
'(প্রকৃত) মুহাজির ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়কে পরিত্যাগ করে।'
ঈমান ও হিজরতের মধ্যে সম্পর্ক থাকার কারণে, একটি অপরটির পরিপূরক। সে জন্যেই আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমের একাধিক স্থানে উভয়টির আলোচনা পাশাপাশি এনেছেন। মোটকথা, আল্লাহ তাআলার দিকে হিজরতের মর্ম হচ্ছে, আল্লাহর অপছন্দের কাজগুলো ছেড়ে দিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির কাজ সম্পাদন করা।
এখানে মৌলিক বিষয় দুটি। পছন্দ এবং অপছন্দ, তথা ভালোবাসা এবং ঘৃণা। কারণ যে ব্যক্তি কোনো কিছু ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছুর দিকে হিজরত করবে, অবশ্যই তার পরিত্যাগকৃত বিষয়ের চেয়ে সামনে থাকা বিষয়টি বেশি পছন্দের হবে। ফলে সে দুটি বিষয়ের মধ্যে প্রিয়টিকে প্রাধান্য দেবে। তবে বান্দার প্রবৃত্তি ও শয়তান তার রবের পছন্দ ও সন্তুষ্টির বিপরীতে আহ্বান করে। তাই সে এগুলোর মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়ে যায়। অবস্থা এমন হয় যে, একদিকে তারা ডাকে আল্লাহ তাআলার নাফরমানির দিকে, আর অন্তরে থাকা ঈমানের দাবি তাকে টানতে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে। ফলে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে হিজরত চালিয়ে যেতে হয়।

টিকাঃ
[১২] সূরা যারিয়াত, ৫১ : ৫০
[১৩] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৮৬
[১৪] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২৪৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ২৭১০
[১৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ৪৮৬
[১৬] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২৪৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ২৭১০
[১৭] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১০ ও ৬৪৮৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px