📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 লেখকের মুখবন্ধ

📄 লেখকের মুখবন্ধ


নিশ্চয় সমুদয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। আমরা তাঁর সাহায্য চাইছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। আমাদের আত্মার অনিষ্ট ও মন্দ আমল থেকে আল্লাহর শরণ যাজ্ঞা করছি। আল্লাহ যাকে সুপথ দেখান, তাকে কেউ বিপথগামী করতে পারে না। আর যাকে বিপথগামী করেন, তাকে কেউ সুপথে আনতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রসুল। হে ইমানদারগণ, আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে থাক এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। হে মানবমণ্ডলী, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাজ্ঞা করে থাক এবং আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর (তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে সাবধান থাক)। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং নায্য কথা বল। তিনি তোমাদের কর্মাবলি সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। যে ব্যক্তিই আল্লাহ ও তার রসুলের আনুগত্য করবে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।

অনন্তর আমি যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইছি তা হলো, “ইমানের প্রকৃত পরিচয় এবং ইমান-বিরোধী 'ইরজায়ি আকিদা' থেকে সতর্কীকরণ”। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং তাৎপর্যপূর্ণ; কেননা ইমানের প্রকৃত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে শরিয়তের অনেক হুকুম-আহকাম। যেমন কাফির বলার মাসআলা, অন্যকে দ্বীনের মধ্যে প্রবিষ্টকরণের মাসআলা প্রভৃতি। আর সবচেয়ে বড়ো হারাম কর্মাবলির অন্যতম—কোনো শরয়ি দলিল ব্যতিরেকে একজন মুসলিমকে ইসলাম ধর্ম থেকে খারিজ করা, কিংবা কোনো ব্যক্তিকে ইসলাম ধর্মে প্রবিষ্ট করা, যেখানে শরয়ি দলিল জানিয়ে দিচ্ছে, সে ইসলামের গণ্ডির মধ্যে নেই। এজন্য (মুসলিম সমাজে) আকিদাবিষয়ক যে মতানৈক্যগুলো প্রথম দিকে দেখা দেয়, তার মধ্যে আলোচ্য বিষয়ের মতানৈক্য অন্যতম। যার সূচনা হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদিনদের জামানাতেই। এরপর এই বিষয়ে মতদ্বৈধতা ও মতবিরোধ বাড়তেই থাকে, এমনকি এ প্রসঙ্গে রচিত হয় হাজারও কিতাব! এজন্য আল্লাহ চাইলে, আমি শরয়ি দলিলসমগ্রে ইমানের প্রকৃত পরিচয় কী, সালাফদের নিকটে এর স্বরূপ কী ছিল এবং সালাফদের বিরোধী গোষ্ঠী তথা ওয়ায়িদিয়‍্যা ও মুরজিয়া ফের্কাদ্বয়ের নিকটেই বা ইমানের প্রকৃত পরিচয় কী—তা নিয়ে আলোচনা করব।

টিকাঃ
১১ আল-কুরআন, ২ (সুরা আলে ইমরান) : ১০২।
১২ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১।
১৩ আল-কুরআন, ৩৩ (সুরা আহজাব) : ৭০-৭১।
১৪ অনুবাদকের টীকা: মুতাজিলা ও খারেজি ফের্কাদ্বয়কে একত্রে ওয়ায়িদিয়্যা বলা হয়। ওয়ায়িদিয়্যা শব্দটি আরবি 'ওয়ায়িদ (وعيد)' থেকে এসেছে, যার মানে হুঁশিয়ারি, শাস্তি দেওয়ার প্রতিজ্ঞা, ভীতিপ্রদর্শন ইত্যাদি। যেহেতু এই সম্প্রদায় আল্লাহপ্রদত্ত শাস্তিদানের প্রতিজ্ঞা সম্পর্কিত দলিলসমগ্র অনুযায়ী আমল করে এবং রহমতের প্রতিজ্ঞা সম্পর্কিত দলিলসমগ্র পরিত্যাগ করে, সেজন্য এদেরকে ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কা বলা হয়। দ্রষ্টব্য: সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান, শারহু আকিদাতিল ইমামিল মুজাদ্দিদ মুহাম্মাদ ইবনি আব্দুল ওয়াহহাব (রিয়াদ: মাকতাবাতু দারিল মিনহাজ, ২য় প্রকাশ, ১৪৩১ হি.), পৃ. ৩৫। কিংবা মনে করে, অবশ্যই আল্লাহ শাস্তিদানের প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়ন করবেন, ফলে তওবা না করে মারা গেলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে, এজন্য তাদেরকে ওয়ায়িদিয়্যা বলা হয়। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: গালিব আল-আওয়াজি, ফিরাকুন মুআসিরা তানতাসিবু ইলাল ইসলাম ওয়া বায়ানু মাওকিফিল ইসলামি মিনহা (জেদ্দা : আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যাতুজ জাহাবিয়্যা, ৪র্থ প্রকাশ, ১৪২২ হি./২০০১ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১১৬৭।
মুতাজিলা ও খারেজি ফের্কাদ্বয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় হিসেবে আমরা ইমাম ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্য পেশ করছি। শাইখ ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪২১ হি.) বলেছেন:
মুতাজিলা : এরা ওয়াসিল বিন আতার অনুসারী। যেই ওয়াসিল বিন আতা হাসান বাসরির (মতো মহান তাবেয়ির) মজলিস ত্যাগ করেছিল, যখন হাসান বাসরি সাব্যস্ত করেছিলেন, কবিরা গুনাহগার ত্রুটিপূর্ণ ইমানের অধিকারী মুমিন। তখন ওয়াসিল তাঁর মজলিস ত্যাগ করে সাব্যস্ত করতে থাকে, কবিরা গুনাহগার দুটো স্তরের মধ্যবর্তী স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর গুণরাজির ক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের মতাদর্শ হচ্ছে- জাহমিয়া সম্প্রদায়ের মতো আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করা। বান্দার কর্মাবলির ক্ষেত্রে এদের মতাদর্শ—– বান্দা তার কর্মে পুরোপুরি স্বাধীন। আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য ও ফায়সালা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বান্দা পরিপূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কর্ম সম্পাদন করে। এক্ষেত্রে এরা জাহমিয়া সম্প্রদায়ের বিপরীত। এজন্য এদেরকে 'তাকদির অস্বীকারকারী কাদারিয়া' বলা হয়। শাস্তির হুঁশিয়ারির ক্ষেত্রে এদের মতাদর্শ- কবিরা গুনাহগার হবে জাহান্নামে চিরস্থায়ী। এক্ষেত্রে এরা জাহমিয়া সম্প্রদায়ের বিপরীত, যারা কিনা মনে করে, কবিরা গুনাহগার কখনো জাহান্নামে প্রবেশই করবে না। এজন্য এদেরকে ওয়ায়িদিয়্যা বলা হয়। আর দ্বীন ও ইমানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে এদের মতাদর্শ- কবিরা গুনাহগার মুমিনও নয়, কাফিরও নয়, বরং দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে তারা জাহমিয়াদের বিপরীত, যেই জাহমিয়ারা মনে করে, কবিরা গুনাহগার পূর্ণ ইমানের অধিকারী মুমিন। এজন্য তাদেরকে 'দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্তরের আদর্শধারী' বলা হয়।...
খারেজি সম্প্রদায় : মুসলিমদের শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণে এদেরকে খারেজি বলা হয়। ইরাকের অন্তর্গত কুফার নিকটবর্তী 'হারুরা' নামক জায়গার প্রতি সম্পৃক্ত করে তাদেরকে হারুরিয়া বলেও অভিহিত করা হয়। কারণ তৎকালীন খারেজিরা এ জায়গায় আলি বিন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। বাহ্যিকভাবে তারা মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধার্মিক। এমনকি তাদের ব্যাপারে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, 'তোমরা তাদের নামাজের তুলনায় নিজেদের নামাজ ও রোজা নগণ্য বলে মনে করবে। এরা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু কুরআন এদের গলা অতিক্রম করে না। এরা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেমন তির শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তোমরা এদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করে ফেলবে। কেননা এদেরকে হত্যা করলে হত্যাকারীর জন্য কেয়ামতের দিনে রয়েছে প্রতিদান।' (আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৩৬১০, ৩৬১১, ৬৯৩০; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১০৬৬)
শাস্তির হুঁশিয়ারি বিষয়ে এদের মতাদর্শ হচ্ছে— কবিরা গুনাহগার জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি কাফির, যার জান ও মাল হরণ করা হালাল। এর ভিত্তিতেই শাসকরা যখন পাপাচারিতে লিপ্ত হয়, তখন তারা শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ মনে করে। শাইখ ইবনু উসাইমিনের বক্তব্য সমাপ্ত। দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, মুজাক্কিরাতুন আলাল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা (রিয়াদ : মাদারুল ওয়াতান, প্র. ১৪২৬ হি.), পৃ. ৫৫-৫৭।
পথভ্রষ্ট ওয়ায়িদিয়্যা সম্প্রদায়ের বিপরীত দল হচ্ছে মুরজিয়া ফের্কা, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক ভ্রষ্ট দলগুলোর অন্যতম। সাহাবিদের যুগের শেষদিকে এ দলের উত্থান হয়। মুরজিয়া শব্দটি আরবি 'ইরজা (إرجاء)' থেকে এসেছে। এর মানে বিলম্ব করা, পিছিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এরা আমলকে ইমান থেকে বিলম্ব করে বা পিছিয়ে দেয় বিধায় এদেরকে এ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মুরজিয়া শব্দটি আরবি 'রজা (رجاء)' থেকে এসেছে, যার মানে আশা, প্রত্যাশা প্রভৃতি। যেহেতু এরা পাপীতাপী সকল মানুষকে ভয় না দেখিয়ে আশা দেয়, সেজন্য এদেরকে মুরজিয়া বা আশাপ্রদানকারী বলে অভিহিত করা হয়েছে। তবে প্রথমোক্ত মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭২৮ হি.)। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : জামিউর রাসায়িল লিবনি তাইমিয়া, খ. ১, পৃ. ১১২; গৃহীত: আব্দুল্লাহ আস-সানাদ, আরাউল মুরজিয়া ফি মুসান্নাফাতি শাইখিল ইসলাম ইবনি তাইমিয়া আরদ ওয়া নাকদ (রিয়াদ: দারুত তাওহিদ, ১ম প্রকাশ, ১৪২৮ হি./২০০৭ খ্রি.), পৃ. ৮৩-৮৫।
মুরজিয়াদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে যেয়ে ইমাম ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন : মুরজিয়া : যারা আমলকে ইমান থেকে 'ইরজা' করা তথা পিছিয়ে দেওয়ার মতাদর্শ লালন করে। ফলে তাদের মতানুযায়ী আমল ইমানের অন্তর্গত নয়। স্রেফ অন্তরের স্বীকৃতিই ইমান। তাদের মতানুসারে পাপাচারী ফাসিক ব্যক্তিও পরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী; যদিও সে পাপাচারিতার মধ্য থেকে যা করার করে ফেলেছে, কিংবা আনুগত্যসূচক কর্তব্যের মধ্যে যা বর্জন করার তা বর্জন করে ফেলেছে! আমরা যদি দিনের কোনো জরুরি বিধান পরিত্যাগ করার ফলে কাউকে কাফির বলে ফয়সালা দিই, তাহলে সেই ফয়সালা এজন্যই দেওয়া হয়েছে বলে বিবেচনা করে হবে যে, উক্ত ব্যক্তি তার অন্তরে বিষয়টির স্বীকৃতি দেয়নি; সে এই আমল পরিত্যাগ করার দরুন কাফির হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়! এটা জাহমি গোষ্ঠীরও আদর্শ (অর্থাৎ জাহম বিন সফওয়ানের অনুসারীদের মতবাদ)। মুরজিয়াদের এই মতবাদ খারেজিদের মতাদর্শের পুরোপুরি বিপরীত। শাইখ ইবনু উসাইমিনের বক্তব্য সমাপ্ত। দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, তালিকুন মুখতাসার আলা কিতাবি লুমআতিল ইতিকাদ, তাহকিক : আশরাফ বিন আব্দুল মাকসুদ (রিয়াদ : মাকতাবাতু আদওয়ায়িস সালাফ, ৩য় প্রকাশ, ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খ্রি.), পৃ. ১৬২-১৬৩; মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, বিন্যাস ও সংকলন : ফাহাদ বিন নাসির আস-সুলাইমান (রিয়াদ : দারুল ওয়াতান ও দারুস সুরাইয়া, ১৪১৩ হিজরি), খ. ৫, পৃ. ৯২।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 অধ্যায় ১ : কুরআন ও সুন্নাহয় ইমানের প্রকৃত পরিচয়

📄 অধ্যায় ১ : কুরআন ও সুন্নাহয় ইমানের প্রকৃত পরিচয়


কুরআনে 'ইমান' এবং এর মূলধাতু থেকে নির্গত শব্দাবলি ৮০০ বারেরও বেশি উল্লেখিত হয়েছে। আবার তা সুন্নাহতে এর কয়েকগুণ বেশি বর্ণিত হয়েছে। আর কুরআন-সুন্নাহর শব্দাবলিকে ব্যাখ্যা করার মূলনীতি হলো – কুরআন-সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শব্দাবলিকে শরিয়তের পরিভাষা অনুযায়ীই ব্যাখ্যা করতে হবে। শরিয়তে যদি কোনো শব্দের পারিভাষিক পরিচয় না থাকে, তাহলে আরবি ভাষার দিকে ফিরে যেতে হবে; অন্যথায় ফিরে যেতে হবে প্রথাগত অর্থের দিকে।

সুতরাং কুরআন ও হাদিসে বিদ্যমান শব্দগুলোর ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকেই জানা যাবে, তখন আর সেগুলোর মর্মার্থ জানার জন্য আরবি ভাষাবিদ বা অন্যদের কথা দিয়ে দলিল পেশ করা যাবে না।

শরিয়তে উল্লিখিত সুমহান শব্দাবলির অন্যতম এই ইমান; কারণ এর সাথে জুড়ে আছে ইহ ও পরকালের অনেক বড়ো বড়ো হুকুম। সুতরাং সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, এই শব্দের ব্যাখ্যা করার গুরুত্ব অন্যান্য শব্দের চেয়ে বেশি। এজন্য নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে এমন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, শব্দটির মর্মার্থ জানতে এর মূলধাতু, আরবদের মাঝে শব্দটির ব্যবহারবিধি এবং মানুষের বিবেকবুদ্ধির কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। একারণে এ জাতীয় (শরিয়তে বর্ণিত) শব্দমালার প্রকৃত পরিচয় জানতে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের দেওয়া বিবরণের দিকেই ফিরে যাওয়া আবশ্যক। কেননা (ব্যাখ্যা হিসেবে) উক্ত বিবরণই যথেষ্ট।

অন্যান্য শব্দের তুলনায় 'ইমান' শব্দটি কুরআন-হাদিসে অধিক ব্যবহৃত হয়েছে। এটাই দ্বীনের মূল। এর মাধ্যমেই মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসে। এটাই সৌভাগ্যবান ও হতভাগাদের মধ্যে পার্থক্য করে, কার সাথে মিত্রতা করা হবে আর কার সাথে শত্রুতা করা হবে সেটার মধ্যেও পার্থক্য করে। সমগ্র দ্বীন-ই ইমানের অনুগামী। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এ সম্পর্কে জানা জরুরি। সুতরাং এ দাবি কি সঠিক হতে পারে যে—রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটার অর্থ বয়ান করতে অবহেলা করেছেন; অথচ এর সাথে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ হুকুম ওতপ্রোতভাবে জড়িত? বস্তুত কোনো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি শরিয়তের দলিলসমগ্রে উল্লিখিত ইমান শব্দের প্রতি লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, ইমান শব্দটি কুরআন-সুন্নাহয় তিনভাবে এসেছে।

এক. বাহ্যিক বিষয়াদিতে ইমান শব্দের প্রয়োগ। এখন কুরআন-হাদিসে যদি এমন কোনো সম্বোধন (বক্তব্য) পাওয়া যায় যা মুমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাহলে ওই ‘মুমিন’ অভিধার আওতাভুক্ত হবে এমন প্রত্যেক মুমিন, যে ওয়াজিব কাজ সম্পাদন করেছে এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থেকেছে। এই ‘মুমিন’ পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবে পাপী মুমিন এবং যার মুনাফেকি সুবিদিত হয়নি এমন মুনাফেকও। কুরআন-সুন্নাহর দলিলে এই অর্থ অনুযায়ী ‘ইমান’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

যেমন মহান আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা জানতে পার, তারা মুমিন নারী, তাহলে তাদেরকে কাফিরদের নিকটে ফিরিয়ে দিও না।”
তিনি আরও বলেন, “(কেউ ভুলবশত কাউকে হত্যা করলে কাফফারা হিসেবে) সে কোনো একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করে দেবে।”

উক্ত আয়াতদ্বয়ে মুমিনের অর্থ— সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের কাছে বাহ্যিকভাবে মুমিন হিসেবে বিদিত। এই অর্থানুযায়ী ইমানের সাথে পার্থিব জীবনের বিভিন্ন অধিকার ও দণ্ডবিধির বিধানাবলি সম্পৃক্ত। যেমন জানমালের হেফাজত এবং উত্তরাধিকারী সম্পত্তি বণ্টন প্রভৃতির বিধিবিধান।

দুই. শরিয়তের দলিলসমগ্রে ‘ইমান’, ‘মুমিন’, ‘যে ইমান এনেছে’—শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে মৌলিক ইমান বা ন্যূনতম ইমানের ক্ষেত্রে। তাই এসব শব্দগুচ্ছে ব্যবহৃত ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবে ওই মুমিন ব্যক্তি, যে ওয়াজিব কাজ সম্পন্ন করেছে ও হারাম কাজ থেকে বিরত থেকেছে, এবং আওতাভুক্ত হবে পাপাচারী ফাসিক মুমিনও। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ওহে যারা ইমান এনেছ।” তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক (তাহলে আল্লাহভীরু হও)।” এ অর্থটিই মৌলিক অর্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নোদ্ধৃত আয়াতগুলোতে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, "তারা তো মুমিন নয়।”

তিনি আরও বলেন, “তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না, তোমরা তো ইমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ।” তিনি আরও বলেছেন, “বরং আল্লাহই ইমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদের ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক (তবে এটাই মেনে নাও)।” এখানে আল্লাহ তাদের ন্যূনতম ইমানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। আর ন্যূনতম ইমানের পরিচয়ই আলোচ্য দ্বিতীয় প্রকার ইমান। মহান আল্লাহ তাদের থেকে পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়কে নাকচ করার পরে এই ন্যূনতম ইমান সাব্যস্ত করেছেন। তিনি (প্রথমে) বলেছিলেন, “(হে নবি) আপনি বলে দিন, তোমরা ইমান আনোনি।” উলামাদের দুটো মতের মধ্যে বিশুদ্ধতম মতানুযায়ী এ আয়াতে আলোচিত ইমান তৃতীয় প্রকারের ইমান (যা একটু পরেই আলোচিত হবে)।

তিন. ইমান শব্দটি আল-ইমানুল মুতলাক তথা পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এই প্রকার ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবেন কেবল সেই মুমিন ব্যক্তি, যিনি সমুদয় ওয়াজিব পালন করেছেন এবং সকল হারাম পরিত্যাগ করেছেন। এরূপ পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়ের সাথেই জুড়ে দেওয়া হয়েছে প্রশংসা ও পরকালীন পুরস্কার। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আর যারা ইমান এনেছে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও, তারা তাদের রবের নিকট পূর্ণ মর্যাদা লাভ করবে।” আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে আল্লাহ এমন উদ্যানরাজির ওয়াদা দিয়েছেন, যেগুলোর তলদেশে বইতে থাকবে নির্ঝরিণী, যেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে, আরও (ওয়াদা দিয়েছেন) উত্তম বাসস্থানসমূহের, চিরসুখী জান্নাতে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো নেয়ামত; এটাই সবচেয়ে বড়ো সফলতা।”

তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। তাদের রবের কাছে আছে তাদের পুরষ্কার – স্থায়ী জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় নির্ঝরিণী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এটি তার জন্য, যে তার রবকে ভয় করে।” তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় আমাদের রসুলগণকে এবং যারা ইমান এনেছে তাদেরকে আমি সাহায্য করব পার্থিব জীবনে, আর যেদিন সাক্ষীবর্গ দণ্ডায়মান হবে (সেই কেয়ামত-দিবসে)।” তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, দয়াময় (আল্লাহ) অবশ্যই তাদের জন্য সৃষ্টি করবেন ভালোবাসা।”

তিনি আরও বলেন, “যারা ইমান এনেছে, আল্লাহ তাদেরকে সুদৃঢ় বাক্যের দ্বারা পার্থিব জীবনে ও আখেরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।” তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে প্রতিরক্ষা করেন (defends), যারা ইমান এনেছে।”

তিনি আরও বলেন, "আর নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে, আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শনকারী।"

তিনি আরও বলেন, “আর আমাদের দায়িত্ব হলো মুমিনদের সাহায্য করা।” এরকম আরও দলিল রয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা এভাবে আরও বলেছেন, “মুমিন তো তারাই, আল্লাহর জিকির করা হলে, যাদের অন্তর প্রকম্পিত হয়।”

তিনি আরও বলেন, “অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা তাদের নামাজে ভীত-অনুগত।”

আরও বলেছেন, “শুধু তারাই আমার আয়াতসমূহের প্রতি ইমান আনে, যারা সেগুলোর দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে, আর তারা অহংকার করে না। তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা হতে দূরে থাকে, তারা তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে এবং আমরা তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।”

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ». “কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না।” তিনি আরও বলেন, «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبُّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ». “তোমাদের কেউ (পরিপূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।”

অনুরূপভাবে ইসলামের পরিচয় সাব্যস্ত করে এবং ইমানের পরিচয় নাকচ করে যে দলিলসমগ্র বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো মূলত পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়কে নাকচ করে, ন্যূনতম ইমানের পরিচয়কে নয়।

এই দলিলগুলোর আরেকটি দিক আছে, সেটি হলো- ইমান এবং ইসলাম শব্দ দুটি যদি একত্রিত হয় তাহলে দুটো স্বতন্ত্র অর্থ অনুযায়ী পরিভাষা দুটোর ব্যাখ্যা করতে হবে। যেমনটি হাদিসে জিবরিলে উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের ব্যাখ্যা করেছেন- ইসলাম হলো বাহ্যিক আমল। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ইসলাম হচ্ছে- তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসুল, নামাজ আদায় করবে, জাকাত প্রদান করবে, রমজান মাসের রোজা রাখবে এবং বায়তুল্লাহর হজ করবে যদি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে।” আর ইমানের ব্যাখ্যা করেছেন- ইমান হলো পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস রাখা।

তিনি বলেছেন, «الإيمان أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَلَقائه وَتُؤْمِنَ بِالبعث». “ইমান হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর সাথে সাক্ষাৎ এবং পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।”

পক্ষান্তরে স্বতন্ত্রভাবে 'ইমানের কথা' উল্লেখ করা হলে তা ইসলামকেও শামিল করে। যেমন আব্দুল কাইসের প্রতিনিধিদল প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনার স্বরূপ কী, তা কি তোমরা অবগত আছ?” সাহাবিগণ বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসুলই অধিক অবগত।' তিনি বললেন, “তা হচ্ছে এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসুল এবং (যথাযথভাবে) নামাজ আদায় করা, জাকাত প্রদান করা, রমজানের রোজা রাখা; আর গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হতে তোমাদের এক-পঞ্চমাংশ সম্পদ (মুসলিম রাষ্ট্রের কোষাগারে) অর্পণ করা।”

ইমান শব্দের আলোচ্য তিনটি অর্থ সালাত এবং হজ শব্দদ্বয়ের অর্থের ন্যায়। এসব শব্দ বাহ্যিক আমলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়, এমনকি মুনাফেক ও লৌকিকতাকারী ব্যক্তিদের আমলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়।

যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আর যখন তারা (মুনাফেকরা) সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে দাঁড়ায়, শুধু লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।”

আবার সালাত কবুল হওয়ার জন্য যতটুকু আদায় করা যথেষ্ট সেই ন্যূনতম পরিমাণের সালাত বোঝাতেও 'সালাত' শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। এছাড়াও নামাজের আরকান (ফরজসমগ্র), ওয়াজিবসমূহ ও মুস্তাহাব (সুন্নাতি) বিষয়াবলি যথাযথভাবে আদায় করা হয়েছে এমন পূর্ণাঙ্গ সালাত বোঝাতেও 'সালাত' শব্দটি প্রয়োগ করা হয়।

অনুরূপভাবে হজ ও গোসলের মতো পরিভাষাগুলো পরিপূর্ণ এবং যথেষ্ট-উভয়কে বোঝানোর ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়; আবার ফাসিদ (অকার্যকর) হজ-গোসল বোঝাতেও 'হজ-গোসল' শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়, যেখানে ফাসিদ বা অকার্যকর হওয়ার সঠিক কারণ জানা যায় না। যেমনভাবে গাছের কতিপয় ডাল কেটে ফেলার পরেও সেটাকে গাছই বলা হয়ে থাকে।

আর ইমান কীসের সাথে সম্পৃক্ত, সে ব্যাপারে অসংখ্য শরয়ি দলিল বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে প্রতীয়মান হয়, ইমান একইসাথে অন্তর, জবান এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত। পক্ষান্তরে কিছু দলিল বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায়, 'ইমান' কেবল অন্তরের সাথেই সম্পৃক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তাদের অন্তরে এখনও ইমান প্রবেশ করেনি।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ তাদের অন্তরে ইমান লিখে দিয়েছেন।”

তিনি আরও বলেছেন, “তাদের অন্তর ইমান আনেনি।”

যেমনভাবে কিছু দলিল বর্ণিত হয়েছে, যেখানে 'ইমান জবানের সাথেই সম্পৃক্ত' হিসেবে দেখানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর সুগভীর জ্ঞানীরা বলে, 'আমরা এগুলোর প্রতি ইমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে'।”

তিনি আরও বলেন, “মুমিনদের উক্তি তো এই, যখন তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের দিকে ডাকা হয়, তখন তারা বলে, 'আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম।' বস্তুত তারাই সফলকাম।”

অপরদিকে আরও কিছু দলিল বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে প্রতীয়মান হয়, ইমান অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের সাথে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও; যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।”

তিনি আরও বলেন, “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর, আর আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।”

হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ». “ইমানের শাখা ষাটটির কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই) এ কথা স্বীকার করা, এবং এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা ইমানের একটি (বিশেষ) শাখা।” অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা জবানের কথা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল, আর লজ্জা অন্তরের আমল।

টিকাঃ
১৫ অনুবাদকের টীকা : অধিকাংশ উসুলবিদের মতানুসারে শরিয়তে বর্ণিত শব্দগুলোকে শরিয়তে প্রদত্ত অর্থ অনুযায়ীই ব্যাখ্যা করতে হবে। যদি এমনটি সম্ভবপর না হয়, তাহলে প্রথাগত অর্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হবে। তাও সম্ভব না হলে আরবি ভাষাগত অর্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হবে। হুবহু এই ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন বিখ্যাত উসুলবিদ ইমাম ইবনুন নাজ্জার আল-ফুতুহি আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৯৭২ হি.) এবং ইমাম মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি আল-মালিকি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৩৯৩ হি.)। আর এই ক্রমধারা উল্লেখ না করে মূলনীতিটি বলেছেন ইমাম ইবনু কুদামা আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৬২০ হি.) এবং সমকালীন খ্যাতনামা উসুলবিদ শাইখ আব্দুল কারিম আন-নামলা রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪৩৫ হি.)। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: আবুল বাকা মুহাম্মাদ বিন আহমাদ ইবনুন নাজ্জার আল-ফুতুহি আল-হাম্বালি, শারহুল কাওকাবিল মুনির, তাহকিক : মুহাম্মাদ জুহাইলি ও নাজিহ হাম্মাদ (রিয়াদ : মাকতাবাতুল উবাইকান, ২য় প্রকাশ, ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ৪৩৫-৪৩৭; মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি, মুজাক্কিরাতু উসুলিল ফিকহ, (রিয়াদ : দারু আতাআতিল ইলম, ৫ম প্রকাশ, ১৪৪১ হি./২০১৯ খ্রি.), পৃ. ২৭৪; মুওয়াফফাকুদ্দিন আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ ইবনু কুদামা আল-মাকদিসি, রওদাতুন নাজির ওয়া জুন্নাতুল মুনাজির, তাহকিক : ড. শাবান মুহাম্মাদ ইসমায়িল (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রাইয়‍্যান, ২য় প্রকাশ, ১৪২৩ হি./২০০২ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৪৯৭; আব্দুল কারিম আন-নামলা, আল-মুহাজ্জাব ফি ইলমি উসুলিল ফিকহিল মুকারান (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রুশদ, ১ম প্রকাশ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১১৫০-১১৫১ ও ১১৫৫-১১৫৬।
১৬ অনুবাদকের টীকা: গাঢ় বর্ণে লেখা কথাটুকু বক্ষ্যমাণ পুস্তিকার লেখক শাইখ শাসরি হাফিজাহুল্লাহ কারও দিকে সম্পৃক্ত করে বলেননি। কিন্তু আমরা দেখেছি, হুবহু কথা শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭২৮ হি.) বলেছেন তাঁর বিখ্যাত 'আল-ইমান' কিতাবে। দ্রষ্টব্য : আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালিম ইবনু তাইমিয়া আল-হারানি আন-নুমাইরি, আল-ইমান, তাহকিক: মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি (আম্মান : আল-মাকতাবুল ইসলামি, ৫ম প্রকাশ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ২২৪; ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৮৬।
১৭ আল-কুরআন, ৬০ (সুরা মুমতাহিনা): ১০।
১৮ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ৯২।
২০ অনুবাদকের টীকা: অর্থাৎ মুমিন শব্দের প্রথমোক্ত অর্থ অনুযায়ী যিনি মুমিন হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন, তাঁর জানমাল হারাম, এতে কোনোরূপ ক্ষতিসাধন করা মুসলিমদের জন্য হারাম। পাশাপাশি উক্ত মুমিন ব্যক্তি একজন মুসলিম হিসেবেই নিয়মমাফিক সম্পদ পাবেন এবং মুসলিম হিসেবেই তাঁর সম্পদ বণ্টিত হবে। বলা বাহুল্য, আলোচ্য অর্থানুযায়ী যে ব্যক্তি মুমিন হিসেবে সাব্যস্ত হয়নি, তার জানমাল হালাল; এদের জান ও মাল হরণ করা বৈধ। তবে এই বিধান সব কাফিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেবল মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কাফিরের ক্ষেত্রে এ বিধানের প্রয়োগ হবে। পক্ষান্তরে মুসলিম দেশে কর দিয়ে অবস্থানরত কাফির নাগরিক, শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ কিংবা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফির ব্যক্তির জানমাল হালাল নয়। এদের বিরুদ্ধে হামলা করা না-জায়েজ, বরং কবিরা গুনাহ। পাশাপাশি ইসলাম-ত্যাগকারী মুরতাদের জানমাল হালাল হওয়া সত্ত্বেও তাকে হত্যা করা জনসাধারণের জন্য বৈধ নয়। এ কাজের দায়িত্ব শাসকের ওপর অর্পিত। দ্রষ্টব্য : আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন ইসমায়িল আল-বুখারি, আস-সহিহ আল-জামি, পরিশীলন : মুহাম্মাদ আজ-জুহাইর আন-নাসির (বৈরুত: দারু তাওকিন নাজাত, ১৩১১ হিজরিতে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের ফরমানে মিশরের আল-মাতবাআতুল কুবরা আল-আমিরিয়‍্যায় মুদ্রিত কপির ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত, ১ম প্রকাশ, ১৪২২ হি.), খ. ১, পৃ. ১০, হা. ৩১৬৬; হাফিজ আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি বি শারহি সহিহিল বুখারি, পরিশীলন : মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব (বৈরুত : দারিল মারিফা, আব্দুল আজিজ ইবনু বাজের টীকা-সংবলিত, প্র. ১৩৭৯ হি.), খ. ১২, পৃ. ২৫৯; বুরহানুদ্দিন ইবনু মুফলিহ আল-হাম্বালি, আল-মুবদি ফি শারহিল মুকনি (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ৭, পৃ. ৪৮২; মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, আশ-শারহুল মুমতি আলা জাদিল মুস্তাকনি (সৌদি আরব : দারু ইবনিল জাওজি, ১ম প্রকাশ, ১৪২২-১৪২৮ হিজরি), খ. ১৪, পৃ. ৪৫৫।
২১ অনুবাদকের টীকা: প্রথম প্রকারের সাথে আলোচ্য দ্বিতীয় প্রকারের পার্থক্য হচ্ছে, প্রথমোক্ত প্রকার ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হয় নেককার ইমানদার, পাপী ইমানদার এবং ধরা না পড়া মুনাফেক, যে মুসলিম সমাজে ইমানদার হিসেবে পরিচিত। পক্ষান্তরে দ্বিতীয়োক্ত প্রকার ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবে শুধু নেককার ইমানদার ও পাপী ইমানদার। ধরা না পড়া মুনাফেক এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে না।
২২ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১৭২।
২৩ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৭৮।
২৫ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা): ৪৩।
২৬ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তাওবা) : ৬৬।
২৭ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ১৭।
২৮ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ১৪।
২৯ অনুবাদকের টীকা: অর্থাৎ এমন ইমান থাকলেই কেবল সামনে আগত আয়াতগুলোর প্রশংসা পাওয়ার হকদার হবে এবং ওয়াদাকৃত পরকালীন পুরস্কার পাবে, অন্যথায় পাপাচারী ইমানদার শাস্তির হকদার হবে, আল্লাহ তাকে মাফ করে বিলকুল জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দিতে পারেন, আবার আল্লাহ চাইলে তাকে জাহান্নামের শাস্তিও দিতে পারেন, তথাপি একসময় ইমানের দরুন সেও জান্নাতে যাবে; পক্ষান্তরে ইমানের পরিচয়ে থাকা মুনাফেক চিরকাল থাকবে জাহান্নামে।
৩০ আল-কুরআন, ১০ (সুরা ইউনুস) : ২।
৩১ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তওবা) : ৭২।
৩২ আল-কুরআন, ৯৮ (সুরা বায়্যিনা): ৭-৮।
৩৩ আল-কুরআন, ৪০ (সুরা গাফির): ৫১।
৩৪ আল-কুরআন, ১৯ (সুরা মারইয়াম) : ৯৬।
৩৫ আল-কুরআন, ১৪ (সুরা ইবরাহিম) : ২৭।
৩৬ আল-কুরআন, ২২ (সুরা হজ): ৩৮।
৩৭ আল-কুরআন, ২২ (সুরা হজ): ৫৪।
৩৮ আল-কুরআন, ৩০ (সুরা রুম) : ৪৭।
৩৯ আল-কুরআন, ৮ (সুরা আনফাল): ২।
৪০ আল-কুরআন, ২৩ (সুরা মুমিনুন) : ১-২।
৪১ আল-কুরআন, ৩২ (সুরা সাজদা): ১৫-১৬।
৪২ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ২৪৭৫।
৪৩ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১৩।
৪৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৫০; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৯।
৪৫ অনুবাদকের টীকা : এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ কথা হলো- ছয়টি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস রাখার নাম ইমান। কেননা আলোচ্য হাদিসে জিবরিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ». “ইমান হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমগ্র, তাঁর রসুলগণ, শেষ দিবস ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখা।” দ্রষ্টব্য: আল-বুখারি, আস-সহিহ, খ. ১, পৃ. ১৯, হা. ৫০; আবুল হুসাইন মুসলিম বিন হাজ্জাজ আল-কুশাইরি আন-নাইসাবুরি, আল-জামি আস-সহিহ, তাহকিক : আহমাদ বিন রিফআত, মুহাম্মাদ ইজ্জাত বিন উসমান ও মুহাম্মাদ শুকরি বিন হাসান, পরিশীলন : মুহাম্মাদ জুহাইর আন-নাসির (বৈরুত : দারু তাওকিন নাজাত, তুরস্কের দারুত তাবাআতিল আমিরায় মুদ্রিত কপির ওপর ভিত্তি করে শাইখ ফুআদ আব্দুল বাকির সংখ্যায়নে প্রকাশিত, ১ম প্রকাশ, ১৪৩৩ হি.), কিতাবুল ইমান, বাবের নামবিহীন, খ. ১, পৃ. ২৮, হা. ৯। কিন্তু অনেক মুহাক্কিক উলামা আলোচনা করার সময় পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি ইমান আনার কথা বলেছেন এবং উল্লিখিত ছয়টি বিষয়ের মধ্য থেকে তাকদিরের প্রতি ইমান আনার কথা বাদ দিয়ে বাকিগুলো উল্লেখ করেছেন। যেমন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭২৮ হি.), তাঁর ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৫১ হি.), তাঁর ছাত্র ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৯৫ হি.), ইমাম ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৯২ হি.) প্রমুখ। দ্রষ্টব্য: ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৫৯; আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা, আস-সাওয়ায়িকুল মুরসালা আলাল জাহমিয়‍্যাতি ওয়াল মুয়াত্তিলা, তাহকিক : হুসাইন বিন উক্কাশা বিন রমদান (রিয়াদ : দারু আতাআতিল ইলম; বৈরুত : দারু ইবনু হাজম, ১ম প্রকাশ, ১৪৪২ হি./২০২০ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ১৬১; জাইনুদ্দিন আব্দুর রহমান বিন আহমাদ ইবনু রজব আল-হাম্বালি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, তাহকিক : মাহমুদ বিন শাবান ও অন্যান্য (মদিনা : মাকতাবাতুল গুরাবায়িল আসারিয়‍্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ২০৯; আলাউদ্দিন আলি বিন মুহাম্মাদ ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি, শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, তাহকিক : শুওয়াইব আল-আরনাউত ও আব্দুল্লাহ বিন মুহসিন আত-তুর্কি (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালা, ১০ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৪৮৯। কেননা তাঁরা কুরআনের দুটো আয়াতকে সামনে রেখে 'ইমানের পাঁচটি মৌলিক বিষয়' উল্লেখ করেছেন, যেই আয়াতদ্বয়ে তাকদিরের কথা নেই। [দ্রষ্টব্য : আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা) : ১৭৬ ও আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১৩৫] কিন্তু তাকদিরের কথা বিশেষভাবে বলা না হলেও উক্ত পাঁচটি বিষয় তাকদিরকেও নিজেদের মধ্যে শামিল করে। কেননা মহান আল্লাহর প্রতি ইমান আনার অন্তর্গত তাঁর গুণরাজি ও বাণীর প্রতি ইমান রাখা, আর তাকদিরের আলোচনা এগুলোর বাইরে নয়। তদ্রুপ সামগ্রিকভাবে বাকি বিষয়গুলোও তাকদিরের আলোচনা নিজেদের মধ্যে সন্নিবেশিত করে। উল্লেখ্য যে, লেখক হাফিজাহুল্লাহ পাঁচটি বিষয়ের কথা বলে হাদিসে জিবরিল থেকে দলিল দেওয়ার সময় স্রেফ তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। আর লেখক কর্তৃক উল্লিখিত 'আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও পুনরুত্থান' মূলত শেষ দিবসেরই অন্তর্গত।
৪৬ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৫০; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৯।
৪৭ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৫৩।
৪৯ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ১৪২।
৫০ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত): ১৪।
৫১ আল-কুরআন, ৫৮ (সুরা মুজাদিলা): ২২।
৫২ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা): ৪১।
৫৩ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান): ৭।
৫৪ আল-কুরআন, ২৪ (সুরা নূর): ৫১।
৫৫ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা) : ২৭৮।
৫৬ আল-কুরআন, ৮ (সুরা আনফাল) : ১।
৫৭ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৯; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৩৫।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 অধ্যায় ২ : সালাফদের নিকট ইমানের প্রকৃত পরিচয়

📄 অধ্যায় ২ : সালাফদের নিকট ইমানের প্রকৃত পরিচয়


আহলুস সুন্নাহ ইমানের পরিচয় দিয়েছে, জবানের কথা, অন্তরের বিশ্বাস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজকে বলা হয় ইমান। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৪১ হি.) বলেন, «الْإِيمَانُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ يَزِيدُ وَيَنْقُصُ». “ইমান হলো কথা ও কাজ; যা বাড়ে এবং কমে।” ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৫৬ হি.) তাঁর 'আস-সহিহ' গ্রন্থের শুরুতে উল্লেখ করেছেন, «وَهُوَ قَوْلٌ وَفِعْلٌ وَيَزِيدُ وَيَنْقُصُ». “ইমান হলো কথা ও কাজ; যা বাড়ে এবং কমে।” একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, «وَالْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ مِنَ الْإِيمَانِ». “আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা করাও ইমানের অন্তর্ভুক্ত।”

এটা শুধু উক্ত দুই ইমামেরই কথা নয়, বরং এটা সাহাবাগণ এবং আহলুস সুন্নাহর ঐক্যমত। (এ বিষয়ে) তাঁদের কথামালা একদল উলামা উল্লেখ করেছেন।

ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৪৬৩ হি.) বলেন :
«الْقَوْلُ فِي الْإِيمَانِ عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَهُمْ أَهْلُ الْأَثَرِ مِنَ الْمُتَفَقِّهَةِ وَالنَّقَلَةِ وَعِنْدَ مَنْ خَالَفَهُمْ مَنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ فِي الْعِبَارَةِ عَنْهُ اخْتِلَافٌ وَسَتَذْكُرُ مِنْهُ فِي হ্যﺬَا الْبَابِ مَا فِيهِ مَقْنَعٌ وَهِدَايَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ أَجْمَعَ أَهْلُ الْفِقْهِ وَالْحَدِيثِ عَلَى أَنَّ الْإِيمَانَ قَوْلُ وَعَمَلٌ وَلَا عَمَلَ إِلَّا بِنِيَّةٍ وَالْإِيمَانُ عِنْدَهُمْ يَزِيدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ وَالطَّاعَاتُ كُلُّهَا عِنْدَهُمْ إِيمَانٌ».
“ইমান বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর বক্তব্য : আহলুস সুন্নাহ হলেন হাদিস বর্ণনাকারী ও ফিকহের জ্ঞানে সমৃদ্ধ আহলুল আসার। সমুদয় ফাকিহ ও মুহাদ্দিস একমত হয়েছেন, ইমান হলো কথা ও কাজের নাম। আর নিয়ত ছাড়া কোনো আমল (শুদ্ধ) হয় না। আহলুস সুন্নাহর মতে ইমান (শরিয়তের) আনুগত্যমূলক কাজের ফলে বাড়ে এবং অবাধ্যতার ফলে কমে যায়। তাঁদের মতে (শরিয়তে বিবৃত) সমস্ত ভালো কাজ ইমানের অন্তর্ভুক্ত।” ইবনু আব্দিল বারের বক্তব্য এখানেই সমাপ্ত। এরপর ইবনু আব্দিল বার মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের মতানৈক্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেছেন, “কাঙিক্ষত শরয়ি ইমান- বিশ্বাস, কথা ও কাজ ব্যতিরেকে অর্জিত হয় না। অধিকাংশ ইমামগণ এই মত পোষণ করেছেন। এমনকি ইমাম শাফেয়ি, আহমাদ, আবু উবাইদ-সহ অপরাপর উলামা এ মর্মে ইজমা (সর্ববাদিসম্মত অভিমত) বর্ণনা করেছেন যে, ইমান হলো কথা ও কাজ, যা বাড়ে এবং কমে।” বাগাবি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৫১৬ হি.) শারহুস সুন্নাহয় উল্লেখ করেছেন, «اتَّفَقَتِ الصَّحَابَةُ وَالتَّابِعُونَ، فَمَنْ بَعْدَهُمْ مِنْ عُلَمَاءِ السُّنَّةِ عَلَى أَنَّ الأَعْمَالَ مِنَ الإِيمَانِ ... وَقَالُوا: إِنَّ الإِيمَانَ قَوْلُ، وَعَمَلٌ، وَعَقِيدَةٌ». “সাহাবিবর্গ, তাবেয়িবৃন্দ এবং তৎপরবর্তী সুন্নাহপন্থি উলামাগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন, যাবতীয় আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা আরো বলেছেন, ইমান হলো কথা, কাজ এবং বিশ্বাস।”

এসব বর্ণনায় মতানৈক্য রয়েছে—এমনটি যেন আবার কেউ ভেবে না বসে। কেননা ইমানের পরিচয়কে যিনি শুধু কথা ও কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন তিনি 'কথা' বলতে জবান ও অন্তরের কথা উদ্দেশ্য করেছেন। আর যিনি 'বিশ্বাস' শব্দটি বাড়িয়ে বলেছেন, তিনি মূলত আশঙ্কা করেছেন, কেউ হয়তো ভ্রমাত্মক ধারণা করে বসবে, 'বিশ্বাস' অন্তরের কথার অন্তর্ভুক্ত নয়! তাঁদের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, “ইমান কথা, কাজ এবং নিয়তের নাম।” কেউ আরও বৃদ্ধি করে বলেছেন, “সুন্নাহর অনুসরণও (ইমান)।” কেননা কথা এবং কাজ কেবল সুন্নাহ অনুসারে করলেই তা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্ণিত হয়েছে :
«سُئِلَ سَهْلُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ التستري عَنْ الْإِيمَانِ مَا هُوَ؟ فَقَالَ: قَوْلٌ وَعَمَلٌ وَنِيَّةٌ وَسُنَّةٌ لِأَنَّ الْإِيمَانَ إِذَا كَانَ قَوْلًا بِلَا عَمَلٍ فَهُوَ كُفْرٌ وَإِذَا كَانَ قَوْلًا وَعَمَلًا بِلَا نِيَّةٍ فَهُوَ نِفَاقٌ وَإِذَا كَانَ قَوْلًا وَعَمَلًا وَنِيَّةً بِلَا سُنَّةٍ فَهُوَ بِدْعَةٌ».
সাহল আত-তুসতারি রাহিমাহুল্লাহকে (মৃ. ২৮৩ হি.) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “ইমান কী?” তিনি বলেন, “ইমান হলো কথা, কাজ, নিয়ত ও সুন্নাহ। কেননা ইমান যদি হয় আমলবিহীন কথা, তবে সেটা কুফরি। ইমান যদি হয় নিয়তবিহীন কথা ও কাজ, তবে সেটা নিফাক। আর ইমান যদি হয় সুন্নাতবিহীন কথা, কাজ ও নিয়ত, তবে সেটা বিদাত।”

টিকাঃ
৫৮ আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ, কিতাবুস সুন্নাহ, খ. ১, পৃ. ২০৭।
৫৯ আল-বুখারি, আস-সহিহ, খ. ১, পৃ. ১০, অধ্যায়: কিতাবুল ইমান।
৬০ আত-তামহিদ, খ. ৯, পৃ. ২৩৮; লালাকায়ি, শারহু উসুলিল ইতিকাদ, খ. ৪, পৃ. ৮৩২; ফাতহুল বারি, খ. ১; পৃ. ৪৭।
৬১ তাফসিরু ইবনি কাসির, খ. ১, পৃ. ৩৯।
৬২ শারহুস সুন্নাহ, খ. ১, পৃ. ৩৮।
৬৩ মাজমুউল ফাতাওয়া লিবনি তাইমিয়া, খ. ৭, পৃ. ১৭১।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 অধ্যায় ৩ : ইমানের প্রকৃত পরিচয়ের ক্ষেত্রে যারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধী

📄 অধ্যায় ৩ : ইমানের প্রকৃত পরিচয়ের ক্ষেত্রে যারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধী


ইমানের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে সালাফদের অভিমত যেহেতু সুসাব্যস্ত হয়ে গেল, সেহেতু আমাদের নিকট প্রতিভাত হলো, সালাফগণ মূলত দুটি ভ্রান্ত দল- 'ওয়ায়িদিয়্যা এবং মুরজিয়া' – এর মধ্যবর্তী উত্তম দল। ওয়ায়িদিয়‍্যারা হলো খারেজি সম্প্রদায় ও মুতাজিলা সম্প্রদায়। তারা বলে, কবিরা গুনাহগার ইমানের পরিচয় থেকে বের হয়ে যায় এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার হকদার হয়। ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার অন্তর্ভুক্ত খারেজি সম্প্রদায় বলে, উক্ত ব্যক্তি কাফির। পক্ষান্তরে মুতাজিলারা বলে, সে দুটি পর্যায়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ে রয়েছে। মুতাজিলাদের ব্যাপারটা আশ্চর্যের, তারা নিজেদের ব্যাপারে দাবি করে, তারা হলো আদলকারী (ন্যায়পরায়ণ)। অথচ তারাই আবার বলে, কেউ একটা কবিরা গুনাহ করলেই তার সকল ভালো আমল বরবাদ হয়ে যায়, যদিও তার আমল পাহাড় সমপরিমাণ হয়ে থাকে!

ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কা একটি বাতিল ফের্কা। কেননা সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির (বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত বর্ণনা) পর্যায়ের দলিলসমগ্র থেকে প্রতীয়মান হয়, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি ইমানের ন্যূনতম পরিচয়ের আওতা থেকে বের হয়ে যায় না। এজন্যই কিসাস (সমপরিমাণ বদলা) ও হুদুদের (নির্ধারিত শাস্তি) মতো শরয়ি দণ্ডবিধি— হত্যাকারী, চোর, ব্যভিচারের অপবাদদাতা ও মদ্যপানকারী ব্যক্তিদের ওপর প্রয়োগ করা হয়। যদি সে কবিরা গুনাহর কারণে ইমানের পরিচয় থেকে বের হয়েই যেত, তাহলে তো তার ওপর রিদ্দাহ তথা ধর্মত্যাগের দণ্ডবিধান প্রয়োগ করে হত্যা করা হত; তার জন্য ঐ (নির্দিষ্ট) দণ্ডবিধিগুলো বাস্তবায়ন করা হত না।

উদাহরণস্বরূপ আপনি হত্যার মতো অপরাধের কথা চিন্তা করেন। এটা অনেক বড়ো একটা অপরাধ। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا». “মুমিন ব্যক্তি তার দিনের ব্যাপারে পূর্ণ প্রশস্ততায় থাকে, যে পর্যন্ত না সে কোনো হারাম (অবৈধ) রক্তপাতে লিপ্ত হয়।” (রক্তপাত ঘটানোর পরেও) হত্যাকারীকে মুমিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হাদিসে।

আল্লাহ তায়ালা যখন কিসাসকে বাধ্যতামূলক করছেন, তখন তিনি হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “হে ইমানদারগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কিসাসের বিধান লিখে দেওয়া হয়েছে।” এরপরে বলেছেন, «فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَان». “তবে তার (নিহত) ভাইয়ের পক্ষ থেকে তাকে (ঘাতককে) কোনো ক্ষমাপ্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা এবং সততার সাথে তার রক্ত-বিনিময় (দিয়াত) আদায় করা কর্তব্য।”

মহান আল্লাহ তায়ালা হত্যাকারীকে ইমানের পরিচয় থেকে খারিজ করে দেননি, বরং তার জন্য (ইমানি) ভ্রাতৃত্ব সাব্যস্ত করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেছেন বলেছেন, “আর মুমিনদের দুদল যুদ্ধে লিপ্ত হলে...।" তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরেও আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য ইমানের নাম সাব্যস্ত করেছেন (তাদেরকে মুমিন হিসেবে অভিহিত করেছেন)। তিনি আরও বলেছেন, “মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে মিমাংসা করে দাও।”

ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার খণ্ডনে সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলোর অন্যতম- মহান আল্লাহর এই বাণী, “তারপর তাদেরকে আমি কিতাবের অধিকারী করলাম, যাদেরকে আমার বান্দাদের মধ্য থেকে আমি মনোনিত করেছি; তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থি এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণের কাজে অগ্রগামী। এটাই তো মহাঅনুগ্রহ।”

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজের নাফসের প্রতি জুলুমকারীকেও এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

আর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তিই আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে অবশ্যই এক মহাপাপ উদ্ভাবন করে। "

এই আয়াত তওবাকারীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি। কেননা তওবা তো সকল গুনাহ মিটিয়ে দেয়, যদিও তা শির্ক হয়ে থাকে।

ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার ব্যাপারে (আল্লাহর শাস্তির) আশঙ্কা করা হয় নিম্নোক্ত হাদিসটির কারণে। জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'এক লোক বলল, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ অমুক লোককে মাফ করবেন না।' আর আল্লাহ তাআলা বললেন, 'সে লোক কে? যে আমার শপথ করে বলে যে, আমি অমুককে মাফ করব না? আমি তাকেই মাফ করে দিলাম, আর তোর আমলকে নষ্ট করে দিলাম।'

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَوْ بَقَتْ دُنْيَاهُ وَآخِرَتَهُ». “সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, সে এমন কথা বলেছে, যা তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ করে দিয়েছে।”

টিকাঃ
৬৪ অর্থাৎ তারা বলে, 'তাকে আমরা মুমিনও বলব না, আবার কাফিরও বলব না।' – অনুবাদক।
৬৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৮৬২।
৬৬ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১৭৮।
৬৭ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ৯।
৬৮ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ১০।
৬৯ আল-কুরআন, ৩৫ (সুরা ফাতির) : ৩২।
৭০ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ৪৮।
৭১ কেননা তারা এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে – অনুবাদক।
৭২ মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ২৬২১।
৭৩ সুনানু আবি দাউদ, হা. ৪৯০১; সনদ : হাসান।

ফন্ট সাইজ
15px
17px