📄 অনুবাদকদ্বয়ের বিবৃতি
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
‘নামাজ না পড়লে কী হবে, আমার ইমান ঠিক আছে!’ ‘মাদক সেবন করলে কী হবে, আমার ইমান ঠিক আছে!’ ‘সুদ-ঘুষ খেলে কী হবে, আমার ইমান অনেক শক্তিশালী!’ ‘আমি মানুষ মারলে কী হবে, আমি তো হজ করি, তাহাজ্জুদ পড়ি, আমার ইমান কি এত কমজোর?!?’
এ ধরনের কথা আমরা অহরহ শুনতে পাই। এসব কথা খুব নিরীহ মনে হলেও আদতে এগুলো যে অতিশয় ভয়ংকর ও আকিদাবিধ্বংসী মন্তব্য, তা আমরা ঠাওর করতে পারি না। এসবের মূলে আছে কুখ্যাত মুরজিয়াদের বাতিল আকিদা। পাপিষ্ঠ, জালিম, ঘাতক, ক্রিমিনাল ও প্রবৃত্তপূজারিদের পছন্দের আকিদা। সাতখুন করেও যে আকিদার ছায়াতলে শান্তির ঠাঁই পাওয়া যায়, সেই আকিদা।
কুরআন-সুন্নাহর সমস্ত বিধিনিষেধ পরিত্যাগ করেও স্রেফ অন্তরে ও মুখে কালিমার দাবি করে ‘সাচ্চা মুসলমান’ সার্টিফিকেট পাওয়ার আকিদা। দুনিয়ার তাবৎ কুকর্ম করেও আবুবকর-ওমরের মতো ইমানদার কিংবা খোদ জিবরাইল-মিকাইলের মতো ইমানদার হওয়ার আকিদা। কাজের মাধ্যমে কুফরি করেও কাফির না হয়ে মুসলমান থাকার আকিদা। সারাজীবন ধরে ইসলামের সমস্ত ফরজ আমল ত্যাগ করেও সৌভাগ্যবান জান্নাতী হওয়ার আকিদা! এই কুখ্যাত আকিদার নাম—ইরজা। আর এই আকিদাধারীদের নাম মুরজিয়া।
সাহাবিগণের যুগের শেষদিকে এই ভ্রমাত্মক আকিদার সূত্রপাত হয়। এ আকিদার ভয়াবহতা ও বিধ্বংসী পরিণতি লক্ষ করে ন্যায়নিষ্ঠ সালাফগণ এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। এই আকিদাধারীদের বিদাতি আখ্যা দেন এবং তাদের থেকে বারংবার সতর্ক করেন।
প্রখ্যাত তাবেয়ি ইমাম ইবরাহিম আন-নাখয়ি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৯৬ হি.) বলেছেন, “এই উম্মতের জন্য মুরজিয়াদের ফিতনা আমার কাছে খারেজিদের ফিতনার চেয়েও ভয়ংকর মনে হয়।”
ইমাম নাখয়ি রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন, “মুরজিয়ারা এই দ্বীনকে 'সাবিরি (এক ধরনের ফিনফিনে বস্ত্র)' কাপড়ের চেয়েও হালকা ও পাতলা বানিয়ে ছেড়েছে।”
বিখ্যাত তাবেয়ি ইমাম ইবনু শিহাব আজ-জুহরি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১২৪ হি.) বলেছেন, “মুসলিমদের জন্য মুরজিয়াদের বিদাতের চেয়ে ক্ষতিকারক কোনো বিদাত ইসলামের মধ্যে উদ্ভূত হয়নি।”
তাবে তাবেয়ি ইমাম আওজায়ি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৫৭ হি.) বলেছেন, “কাতাদা ও ইয়াহইয়া রাহিমাহুমাল্লাহ বলতেন, বিদাতসমগ্রের মধ্যে উম্মতের জন্য মুরজিয়াদের বিদাতের চেয়ে ভীতিকর কোনো বিদাত নেই।”
এজন্য সালাফদের যুগ থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত উলামাগণ এ বিষয়ে বিশুদ্ধ আকিদা বর্ণনা করতে সচেষ্ট হয়েছেন, বিপথগামী মুরজিয়াদের বিভ্রান্ত আকিদা থেকে সতর্ক করে বইপুস্তক রচনা করেছেন। সেসব কিতাবের মধ্যে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও খুবই সহজবোধ্য অনুপম গ্রন্থ আল্লামা সাদ আশ-শাসরি হাফিজাহুল্লাহ বিরচিত-'হাকিকাতুল ইমানি ওয়া বিদাউল ইরজা ফিল কদিমি ওয়াল হাদিস (ইমানের মর্মার্থ এবং প্রাচীন ও সমকালীন যুগে ইরজার বিদাতসমূহ)।' আমরা এই কিতাবের বাংলা অনুবাদ করে এর নাম দিয়েছি 'মুরজিয়াদের আকিদা।'
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এই গ্রন্থকে এত সংক্ষিপ্ত কলেবরের মধ্যে অদ্বিতীয় কিতাব বললে বাহুল্য হবে না। কেননা আমরা মুরজিয়াদের আকিদা বিষয়ে আরও বিভিন্ন কিতাব ও অভিসন্দর্ভ অধ্যয়ন করেছি। কিন্তু সংক্ষিপ্ত পরিসরে ধারাবাহিকভাবে মুরজিয়াদের আকিদার এমন বিন্যাস ও সহজিয়া ধাঁচের প্রামাণ্য আলোচনা আমরা অন্য কোনো কিতাবে দেখিনি। মহান আল্লাহর তৌফিকে লেখক হাফিজাহুল্লাহ মুহাক্কিক উলামাদের—বিশেষত শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়ার-গ্রন্থরাজি থেকে একদম প্রয়োজনীয় খোলাসা কথা আলোকপাত করেছেন বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে। লেখক হাফিজাহুল্লাহ মূলত সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ আলুশ শাইখ রাহিমাহুল্লাহর সামনে এই বিষয়ে লেকচার দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই লেকচারই ট্রান্সক্রাইব করে কিতাবে রূপান্তর করা হয়েছে।
আমরা বইটি বঙ্গানুবাদ করার পাশাপাশি আলোচনাকে সুপাঠ্য ও সহজবোধ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় টীকাটিপ্পনী সংযোজন করেছি। লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখে বইয়ের শুরুতে সংযুক্ত করেছি। আর আমাদের টীকায় ব্যবহৃত উৎসগ্রন্থগুলোর 'বিব্লিয়োগ্রাফি' তথা 'গ্রন্থপঞ্জি' বইয়ের শেষে যুক্ত করে দিয়েছি।
সচেতন মুসলিম ভাইবোনের জন্য আমরা এই বইয়ের পঠনপাঠন জরুরি মনে করি। কেননা আমাদের সমাজে প্রচুর পরিমাণে মুরজিয়াদের বাতিল আকিদা ছড়িয়ে আছে। কবি বলেছেন, “আরাফতুশ শারা, লা লিশ শারি, লাকিন লি তাওয়াক্কিহি, মান লা ইয়ারিফিশ শারা মিনান নাসি, ইয়াকাউ ফিহি। আমি মন্দকে জেনেছি, মন্দ করার জন্য নয়, বরং মন্দ থেকে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে; মানুষদের মধ্যে যারা মন্দকে চেনে না, তারাই নিপাতিত হয় মন্দে!”
আবার আমাদের সমাজে অন্যায়ভাবে মানুষকে মুরজিয়া বলার ফিতনাও প্রচলিত আছে। মুহাক্কিক উলামাগণের কাছে যে বিষয় মুরজিয়াদের আকিদা হিসেবে স্বীকৃত নয়, সে বিষয়কে অন্যায়ভাবে 'ইরজা' বলার কুৎসিত চর্চা আছে। এই বই অধ্যয়ন করলে মুরজিয়াদের আকিদা বিষয়ে মৌলিক ইলম অর্জিত হবে এবং কোন জিনিস ইরজা, আর কোন জিনিস ইরজা নয় সেটা বুঝতেও কিঞ্চিৎ সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের মানহাজ হওয়া উচিত-মুহাক্কিক উলামাদের নিকট থেকে ইরজা বিষয়ক ইলম আহরণ করা, তাঁরা বাদে অন্য কেউ ইরজার ট্যাগ দিলেই সেটার পেছনে না ছোটা, বরং আকিদাশাস্ত্রের প্রাজ্ঞ বিদ্বানদের কাছ থেকে অন্যদের মন্তব্য ভ্যারিফাই করা। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন। আমিন।
দোয়া করি, আল্লাহ আমাদের এই সামান্য খেদমতকে কবুল করুন, আমাদের কাজকে একমাত্র তাঁরই জন্য একনিষ্ঠ করুন, এতে অজস্র রহমত ও অফুরন্ত বরকত বর্ষণ করুন, লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক ও পাঠক নির্বিশেষে সকল মুসলিম ভাই ও বোনের জন্য এই বইকে ফলপ্রসূ করুন। আমিন।
রহমানের রহমতপ্রত্যাশী—
আব্দুর রহমান মৃধা
মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মৃধা
টিকাঃ
১ আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালিম ইবনু তাইমিয়া আল-হারানি আন-নুমাইরি, মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা ফি নাকদি কালামিশ শিআতিল কাদারিয়্যা, তাহকিক : মুহাম্মাদ রাশাদ সালিম (রিয়াদ: ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়, ১ম প্রকাশ, ১৪০৬ হি./১৯৮৬ খ্রি.), খ. ৬, পৃ. ২৩১।
২ আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালিম ইবনু তাইমিয়া আল-হারানি আন-নুমাইরি, মাজমুউল ফাতাওয়া লি শাইখিল ইসলাম, সংকলন ও বিন্যাস: আব্দুর রহমান ইবনু কাসিম (মদিনা : কিং ফাহাদ গলোরিয়াস কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স, ১৪২৫ হি./২০০৪ খ্রি.), খ. ৭, পৃ. ৫০৭।
৩ আবু আব্দুল্লাহ উবাইদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ ইবনু বাত্তাহ আল-উকবারি, আল-ইবানা আন শারিয়াতিল ফিরকাতিন নাজিয়াতি ওয়া মুজানাবাতুল ফিরাকিল মাজমুমা, তাহকিক : ওয়ালিদ বিন মুহাম্মাদ নাসর (রিয়াদ: দারুর রায়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৪১৫ হি.), বর্ণনা নং : ১২২১, খ. ২, পৃ. ৮৮৫।
৪ মুহাম্মাদ ইবনু সাদ আল-হাশিমি, আত-তাবাকাতুল কুবরা, তাহকিক : মুহাম্মাদ আব্দুল কাদির আতা (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪১০ হি./১৯৯০ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ২৮২।
৫ ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানা, বর্ণনা নং: ১২২২, খ. ২, পৃ. ৮৮৫।
৬ ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানা, বর্ণনা নং: ১২২৩, খ. ২, পৃ. ৮৮৫।
৭ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা, মিফতাহু দারিস সাআদাহ ওয়া মানশুরু ওয়ালাইয়াতিল ইলমি ওয়াল ইরাদা, তাহকিক : আব্দুর রহমান বিন হাসান বিন কায়িদ (রিয়াদ: দারু আতাআতিল ইলম, ৩য় প্রকাশ, ১৪৪০ হি./২০১৯ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৮৩৭-৮৩৮।
📄 লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী
তাঁর জন্ম ও পরিচয়: তিনি হলেন আশ-শাইখ, আল-আল্লামা, আল-মুহাক্কিক, সাদ বিন নাসির বিন আব্দুল আজিজ বিন মুহাম্মাদ আশ-শাসরি হাফিজাহুল্লাহ। তিনি ১৩৮৭ হিজরি বর্ষে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর ইলম-অর্জন : তিনি শৈশবেই ইলমের প্রতি অভিনিবেশ করেছেন এবং পরহেজগার ইলমি পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছেন। তিনি ১৪০৯ হিজরিতে রিয়াদস্থ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সুউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া ফ্যাকাল্টি থেকে অনার্স কমপ্লিট করেন এবং সেখানে শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। এরপর তিনি সেখান থেকে যথাক্রমে মাস্টার্স ও পিএইচডি কমপ্লিট করেন। তাঁর মাস্টার্স থিসিসের বিষয় ছিল-'আত-তাফরিক বাইনাল উসুল ও ফুরু'। আর পিএইচডি থিসিসের বিষয় ছিল—'আল-কাতউ ওয়াজ জন্নু ইনদাল উসুলিয়্যিন'।
তিনি অনেক বড়ো বড়ো আলিমের নিকট থেকে ইলমি তাজকিয়া (ইলমি স্বীকৃতি ও প্রশংসা) পেয়েছেন। যেমন ইমাম ইবনু বাজ, ইমাম ইবনু উসাইমিন, গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ আলুশ শাইখ, আল্লামা আব্দুল আজিজ আর-রাজিহি, আল্লামা সালিহ আল-ফাওজান, আল্লামা আব্দুর রহমান আল-বাররাক প্রমুখ।
তিনি উলামাদের নিকট থেকে হাদিসের কিতাবসমূহের অনেকগুলো ইজাজা (পড়ানো বা বর্ণনার অনুমতি) লাভ করেছেন। যেমন শাইখুল হানাবিলা ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু আকিল রাহিমাহুল্লাহ প্রমুখ।
তাঁর শিক্ষকমণ্ডলী : তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষক হলেন—
১. সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ইমাম ইবনু বাজ রাহিমাহুল্লাহ।
২. বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ আলুশ শাইখ হাফিজাহুল্লাহ।
৩. সৌদি ফতোয়া বোর্ডের সাবেক সদস্য আল্লামা আব্দুল্লাহ আল-গুদাইয়্যান রাহিমাহুল্লাহ।
৪. সৌদি ফতোয়া বোর্ডের সাবেক সদস্য আল্লামা সালিহ আল-আতরাম রাহিমাহুল্লাহ।
৫. সৌদি ফতোয়া বোর্ডের সাবেক সদস্য আল্লামা আহমাদ বিন আলি আল-মুবারাকি রাহিমাহুল্লাহ।
৬. শাইখ সাদের পিতা শাইখ নাসির বিন আব্দুল আজিজ আশ-শাসরি রাহিমাহুল্লাহ।
তাঁর কর্মজীবন :
১. ১৪০৯ হিজরিতে তিনি ইমাম মুহাম্মাদ বিন সুউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া ফ্যাকাল্টির শিক্ষক নিযুক্ত হন।
২. ১৪১৪ হিজরিতে প্রভাষক পদে উন্নীত হন।
৩. ১৪১৮ হিজরিতে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।
৪. ১৪২২ হিজরিতে সহযোগী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।
৫. ১৪২৬ হিজরি থেকে ১৪৩১ হিজরি পর্যন্ত সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য হিসেবে খেদমত আঞ্জাম দেন।
৬. ১৪৩৪ হিজরি থেকে এখন পর্যন্ত রিয়াদের কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফ্যাকাল্টি অফ ল অ্যান্ড পলিটিক্যাল সাইন্সের’ ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে কর্মরত আছেন।
৭. ১৪৩৭ হিজরি থেকে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য হিসেবেও কর্মরত আছেন।
৮. তিনি সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির সদস্য হিসেবেও কর্মরত আছেন।
৯. ১৪৩৭ হিজরি থেকে এখন পর্যন্ত 'দ্য সৌদি রয়্যাল কোর্টের' উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত আছেন; যা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদার সমান।
১০. ১৪৩৮ হিজরি বর্ষে তিনি আরাফার মাঠে হজের খুতবা দিয়েছেন।
তাঁর রচনাবলি : তাঁর রচিত কিছু উল্লেখযোগ্য কিতাব—
১. আত-তাফরিক বাইনাল উসুলি ওয়াল ফুরু।
২. আল-কাতউ ওয়াজ জন্ম ইনদাল উসুলিয়্যিন।
৩. আল-মুসাবাকাত ফিশ শারিয়াতিল ইসলামিয়্যা।
৪. আত-তাকলিদ ওয়া আহকামুহু ফিশ শারিয়া।
৫. কাওয়াদিহুল ইস্তিদলালি বিল ইজমা।
৬. মুখতাসার সহিহিল বুখারি।
৭. মাকাসিদুশ শারিয়া।
৮. শারহুল ওয়ারাকাত।
৯. হাকিকাতুল ইমানি ওয়া বিদাউল ইরজা।
১০. ইবাদাতুল হাজ।
১১. শারহু বুলুগিল মারাম।
১২. শারহু উমদাতিল আহকাম।
১৩. শারহু মুখতাসারির রওদা।
১৪. শারহু কাওয়ায়িদিল উসুল।
১৫. শারহু উসুল মিন ইলমিল উসুল।
১৬. শারহু মুখতাসার ইবনিল লাহহাম।
১৭. আখলাকিয়্যাতুত তাবিবিল মুসলিম।
১৮. তাহকিক মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা।
১৯. তাহকিক সুনান ইবনি মাজাহ।
২০. রওদাতুন নাজির লিবনি কুদামা ওয়া নুজহাতুল খাতিরিল আতির লিবনি বাদরান (তাহকিক)।
তাঁর ব্যাপারে উলামাগণের প্রশংসা : বর্তমান যুগের বিশিষ্ট সালাফি কিবার উলামাদের অন্যতম আল্লামা আব্দুল আর-রাজিহি হাফিজাহুল্লাহকে শাইখ শাসরি সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি বলেন, “শাইখ সাদ আমাদের কাছে সুপরিচিত। তিনি 'আল-উলামাউল আকাবির' তথা 'বড়ো বড়ো উলামাদের' অন্তর্ভুক্ত। আপনারা তাঁর থেকে ইলমি ফায়দা গ্রহণ করুন।”
মদিনার মুফতি আল্লামা সালিহ বিন সাদ আস-সুহাইমি হাফিজাহুল্লাহ বলেছেন, “আমাদের অকুতোভয় উলামাবর্গ, আল্লাহওয়ালা উলামাগণ বিদ্যমান রয়েছেন; যাঁরা আমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অন্তরসমূহ যাঁদের দিকে ধাবিত হয় এবং যাঁদের ইলম থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য সফর করা হয়। যেমন আমাদের সামাহাতুশ শাইখ আল-মুফতি আশ-শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ, আমাদের সম্মাননীয় শাইখ আশ-শাইখ সালিহ আল-ফাওজান, শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুদাইয়্যান, শাইখ সালিহ আল-লুহাইদান, শাইখ রাবি বিন হাদি, শাইখ সাদ আশ-শাসরি প্রমুখ। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন তাঁদের ইলমের মাধ্যমে আমাকে ও আপনাদেরকে উপকৃত করেন।”
মহান আল্লাহ শাইখ সাদ আশ-শাসরিকে হেফাজত করুন, তাঁকে এবং তাঁর পিতামাতা ও শিক্ষকবৃন্দকে ক্ষমা করুন, তাঁর ইলম, আমল ও দাওয়াতে বরকত দিন, আমাদের তরফ থেকে তাঁকে সর্বোত্তম পারিতোষিক দিন, এবং তাঁর ইলমের মাধ্যমে আমাদেরকে উপকৃত করুন। আমিন।
টিকাঃ
৮ দ্রষ্টব্য: https://youtu.be/g9aScavnpjo?si=aSE2VO4WJ2PvA3Xn
৯ দ্রষ্টব্য: https://youtu.be/55GtYG24dUU?si=Z_UhN9ZdJg2dIp-z
১০ বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : সাদ আশ-শাসরি, “আস-সিরাতুজ জাতিয়্যা”, আলশাথরি ডট কম, তথ্যসংগ্রহের তারিখ : ৫ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রি., https://tinyurl.com/5hedbd4; "সাদ আশ-শাসরি”, উইকিপিডিয়া, সর্বশেষ সংশোধনী : ১লা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রি., https://tinyurl.com/3szkfz3a
📄 লেখকের মুখবন্ধ
নিশ্চয় সমুদয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। আমরা তাঁর সাহায্য চাইছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। আমাদের আত্মার অনিষ্ট ও মন্দ আমল থেকে আল্লাহর শরণ যাজ্ঞা করছি। আল্লাহ যাকে সুপথ দেখান, তাকে কেউ বিপথগামী করতে পারে না। আর যাকে বিপথগামী করেন, তাকে কেউ সুপথে আনতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রসুল। হে ইমানদারগণ, আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে থাক এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। হে মানবমণ্ডলী, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাজ্ঞা করে থাক এবং আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর (তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে সাবধান থাক)। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং নায্য কথা বল। তিনি তোমাদের কর্মাবলি সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। যে ব্যক্তিই আল্লাহ ও তার রসুলের আনুগত্য করবে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।
অনন্তর আমি যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইছি তা হলো, “ইমানের প্রকৃত পরিচয় এবং ইমান-বিরোধী 'ইরজায়ি আকিদা' থেকে সতর্কীকরণ”। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং তাৎপর্যপূর্ণ; কেননা ইমানের প্রকৃত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে শরিয়তের অনেক হুকুম-আহকাম। যেমন কাফির বলার মাসআলা, অন্যকে দ্বীনের মধ্যে প্রবিষ্টকরণের মাসআলা প্রভৃতি। আর সবচেয়ে বড়ো হারাম কর্মাবলির অন্যতম—কোনো শরয়ি দলিল ব্যতিরেকে একজন মুসলিমকে ইসলাম ধর্ম থেকে খারিজ করা, কিংবা কোনো ব্যক্তিকে ইসলাম ধর্মে প্রবিষ্ট করা, যেখানে শরয়ি দলিল জানিয়ে দিচ্ছে, সে ইসলামের গণ্ডির মধ্যে নেই। এজন্য (মুসলিম সমাজে) আকিদাবিষয়ক যে মতানৈক্যগুলো প্রথম দিকে দেখা দেয়, তার মধ্যে আলোচ্য বিষয়ের মতানৈক্য অন্যতম। যার সূচনা হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদিনদের জামানাতেই। এরপর এই বিষয়ে মতদ্বৈধতা ও মতবিরোধ বাড়তেই থাকে, এমনকি এ প্রসঙ্গে রচিত হয় হাজারও কিতাব! এজন্য আল্লাহ চাইলে, আমি শরয়ি দলিলসমগ্রে ইমানের প্রকৃত পরিচয় কী, সালাফদের নিকটে এর স্বরূপ কী ছিল এবং সালাফদের বিরোধী গোষ্ঠী তথা ওয়ায়িদিয়্যা ও মুরজিয়া ফের্কাদ্বয়ের নিকটেই বা ইমানের প্রকৃত পরিচয় কী—তা নিয়ে আলোচনা করব।
টিকাঃ
১১ আল-কুরআন, ২ (সুরা আলে ইমরান) : ১০২।
১২ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১।
১৩ আল-কুরআন, ৩৩ (সুরা আহজাব) : ৭০-৭১।
১৪ অনুবাদকের টীকা: মুতাজিলা ও খারেজি ফের্কাদ্বয়কে একত্রে ওয়ায়িদিয়্যা বলা হয়। ওয়ায়িদিয়্যা শব্দটি আরবি 'ওয়ায়িদ (وعيد)' থেকে এসেছে, যার মানে হুঁশিয়ারি, শাস্তি দেওয়ার প্রতিজ্ঞা, ভীতিপ্রদর্শন ইত্যাদি। যেহেতু এই সম্প্রদায় আল্লাহপ্রদত্ত শাস্তিদানের প্রতিজ্ঞা সম্পর্কিত দলিলসমগ্র অনুযায়ী আমল করে এবং রহমতের প্রতিজ্ঞা সম্পর্কিত দলিলসমগ্র পরিত্যাগ করে, সেজন্য এদেরকে ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কা বলা হয়। দ্রষ্টব্য: সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান, শারহু আকিদাতিল ইমামিল মুজাদ্দিদ মুহাম্মাদ ইবনি আব্দুল ওয়াহহাব (রিয়াদ: মাকতাবাতু দারিল মিনহাজ, ২য় প্রকাশ, ১৪৩১ হি.), পৃ. ৩৫। কিংবা মনে করে, অবশ্যই আল্লাহ শাস্তিদানের প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়ন করবেন, ফলে তওবা না করে মারা গেলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে, এজন্য তাদেরকে ওয়ায়িদিয়্যা বলা হয়। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: গালিব আল-আওয়াজি, ফিরাকুন মুআসিরা তানতাসিবু ইলাল ইসলাম ওয়া বায়ানু মাওকিফিল ইসলামি মিনহা (জেদ্দা : আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাতুজ জাহাবিয়্যা, ৪র্থ প্রকাশ, ১৪২২ হি./২০০১ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১১৬৭।
মুতাজিলা ও খারেজি ফের্কাদ্বয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় হিসেবে আমরা ইমাম ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্য পেশ করছি। শাইখ ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪২১ হি.) বলেছেন:
মুতাজিলা : এরা ওয়াসিল বিন আতার অনুসারী। যেই ওয়াসিল বিন আতা হাসান বাসরির (মতো মহান তাবেয়ির) মজলিস ত্যাগ করেছিল, যখন হাসান বাসরি সাব্যস্ত করেছিলেন, কবিরা গুনাহগার ত্রুটিপূর্ণ ইমানের অধিকারী মুমিন। তখন ওয়াসিল তাঁর মজলিস ত্যাগ করে সাব্যস্ত করতে থাকে, কবিরা গুনাহগার দুটো স্তরের মধ্যবর্তী স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর গুণরাজির ক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের মতাদর্শ হচ্ছে- জাহমিয়া সম্প্রদায়ের মতো আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করা। বান্দার কর্মাবলির ক্ষেত্রে এদের মতাদর্শ—– বান্দা তার কর্মে পুরোপুরি স্বাধীন। আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য ও ফায়সালা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বান্দা পরিপূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কর্ম সম্পাদন করে। এক্ষেত্রে এরা জাহমিয়া সম্প্রদায়ের বিপরীত। এজন্য এদেরকে 'তাকদির অস্বীকারকারী কাদারিয়া' বলা হয়। শাস্তির হুঁশিয়ারির ক্ষেত্রে এদের মতাদর্শ- কবিরা গুনাহগার হবে জাহান্নামে চিরস্থায়ী। এক্ষেত্রে এরা জাহমিয়া সম্প্রদায়ের বিপরীত, যারা কিনা মনে করে, কবিরা গুনাহগার কখনো জাহান্নামে প্রবেশই করবে না। এজন্য এদেরকে ওয়ায়িদিয়্যা বলা হয়। আর দ্বীন ও ইমানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে এদের মতাদর্শ- কবিরা গুনাহগার মুমিনও নয়, কাফিরও নয়, বরং দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে তারা জাহমিয়াদের বিপরীত, যেই জাহমিয়ারা মনে করে, কবিরা গুনাহগার পূর্ণ ইমানের অধিকারী মুমিন। এজন্য তাদেরকে 'দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্তরের আদর্শধারী' বলা হয়।...
খারেজি সম্প্রদায় : মুসলিমদের শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণে এদেরকে খারেজি বলা হয়। ইরাকের অন্তর্গত কুফার নিকটবর্তী 'হারুরা' নামক জায়গার প্রতি সম্পৃক্ত করে তাদেরকে হারুরিয়া বলেও অভিহিত করা হয়। কারণ তৎকালীন খারেজিরা এ জায়গায় আলি বিন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। বাহ্যিকভাবে তারা মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধার্মিক। এমনকি তাদের ব্যাপারে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, 'তোমরা তাদের নামাজের তুলনায় নিজেদের নামাজ ও রোজা নগণ্য বলে মনে করবে। এরা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু কুরআন এদের গলা অতিক্রম করে না। এরা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেমন তির শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তোমরা এদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করে ফেলবে। কেননা এদেরকে হত্যা করলে হত্যাকারীর জন্য কেয়ামতের দিনে রয়েছে প্রতিদান।' (আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৩৬১০, ৩৬১১, ৬৯৩০; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১০৬৬)
শাস্তির হুঁশিয়ারি বিষয়ে এদের মতাদর্শ হচ্ছে— কবিরা গুনাহগার জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি কাফির, যার জান ও মাল হরণ করা হালাল। এর ভিত্তিতেই শাসকরা যখন পাপাচারিতে লিপ্ত হয়, তখন তারা শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ মনে করে। শাইখ ইবনু উসাইমিনের বক্তব্য সমাপ্ত। দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, মুজাক্কিরাতুন আলাল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা (রিয়াদ : মাদারুল ওয়াতান, প্র. ১৪২৬ হি.), পৃ. ৫৫-৫৭।
পথভ্রষ্ট ওয়ায়িদিয়্যা সম্প্রদায়ের বিপরীত দল হচ্ছে মুরজিয়া ফের্কা, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক ভ্রষ্ট দলগুলোর অন্যতম। সাহাবিদের যুগের শেষদিকে এ দলের উত্থান হয়। মুরজিয়া শব্দটি আরবি 'ইরজা (إرجاء)' থেকে এসেছে। এর মানে বিলম্ব করা, পিছিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এরা আমলকে ইমান থেকে বিলম্ব করে বা পিছিয়ে দেয় বিধায় এদেরকে এ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মুরজিয়া শব্দটি আরবি 'রজা (رجاء)' থেকে এসেছে, যার মানে আশা, প্রত্যাশা প্রভৃতি। যেহেতু এরা পাপীতাপী সকল মানুষকে ভয় না দেখিয়ে আশা দেয়, সেজন্য এদেরকে মুরজিয়া বা আশাপ্রদানকারী বলে অভিহিত করা হয়েছে। তবে প্রথমোক্ত মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭২৮ হি.)। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : জামিউর রাসায়িল লিবনি তাইমিয়া, খ. ১, পৃ. ১১২; গৃহীত: আব্দুল্লাহ আস-সানাদ, আরাউল মুরজিয়া ফি মুসান্নাফাতি শাইখিল ইসলাম ইবনি তাইমিয়া আরদ ওয়া নাকদ (রিয়াদ: দারুত তাওহিদ, ১ম প্রকাশ, ১৪২৮ হি./২০০৭ খ্রি.), পৃ. ৮৩-৮৫।
মুরজিয়াদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে যেয়ে ইমাম ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন : মুরজিয়া : যারা আমলকে ইমান থেকে 'ইরজা' করা তথা পিছিয়ে দেওয়ার মতাদর্শ লালন করে। ফলে তাদের মতানুযায়ী আমল ইমানের অন্তর্গত নয়। স্রেফ অন্তরের স্বীকৃতিই ইমান। তাদের মতানুসারে পাপাচারী ফাসিক ব্যক্তিও পরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী; যদিও সে পাপাচারিতার মধ্য থেকে যা করার করে ফেলেছে, কিংবা আনুগত্যসূচক কর্তব্যের মধ্যে যা বর্জন করার তা বর্জন করে ফেলেছে! আমরা যদি দিনের কোনো জরুরি বিধান পরিত্যাগ করার ফলে কাউকে কাফির বলে ফয়সালা দিই, তাহলে সেই ফয়সালা এজন্যই দেওয়া হয়েছে বলে বিবেচনা করে হবে যে, উক্ত ব্যক্তি তার অন্তরে বিষয়টির স্বীকৃতি দেয়নি; সে এই আমল পরিত্যাগ করার দরুন কাফির হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়! এটা জাহমি গোষ্ঠীরও আদর্শ (অর্থাৎ জাহম বিন সফওয়ানের অনুসারীদের মতবাদ)। মুরজিয়াদের এই মতবাদ খারেজিদের মতাদর্শের পুরোপুরি বিপরীত। শাইখ ইবনু উসাইমিনের বক্তব্য সমাপ্ত। দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, তালিকুন মুখতাসার আলা কিতাবি লুমআতিল ইতিকাদ, তাহকিক : আশরাফ বিন আব্দুল মাকসুদ (রিয়াদ : মাকতাবাতু আদওয়ায়িস সালাফ, ৩য় প্রকাশ, ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খ্রি.), পৃ. ১৬২-১৬৩; মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, বিন্যাস ও সংকলন : ফাহাদ বিন নাসির আস-সুলাইমান (রিয়াদ : দারুল ওয়াতান ও দারুস সুরাইয়া, ১৪১৩ হিজরি), খ. ৫, পৃ. ৯২।
📄 অধ্যায় ১ : কুরআন ও সুন্নাহয় ইমানের প্রকৃত পরিচয়
কুরআনে 'ইমান' এবং এর মূলধাতু থেকে নির্গত শব্দাবলি ৮০০ বারেরও বেশি উল্লেখিত হয়েছে। আবার তা সুন্নাহতে এর কয়েকগুণ বেশি বর্ণিত হয়েছে। আর কুরআন-সুন্নাহর শব্দাবলিকে ব্যাখ্যা করার মূলনীতি হলো – কুরআন-সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শব্দাবলিকে শরিয়তের পরিভাষা অনুযায়ীই ব্যাখ্যা করতে হবে। শরিয়তে যদি কোনো শব্দের পারিভাষিক পরিচয় না থাকে, তাহলে আরবি ভাষার দিকে ফিরে যেতে হবে; অন্যথায় ফিরে যেতে হবে প্রথাগত অর্থের দিকে।
সুতরাং কুরআন ও হাদিসে বিদ্যমান শব্দগুলোর ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকেই জানা যাবে, তখন আর সেগুলোর মর্মার্থ জানার জন্য আরবি ভাষাবিদ বা অন্যদের কথা দিয়ে দলিল পেশ করা যাবে না।
শরিয়তে উল্লিখিত সুমহান শব্দাবলির অন্যতম এই ইমান; কারণ এর সাথে জুড়ে আছে ইহ ও পরকালের অনেক বড়ো বড়ো হুকুম। সুতরাং সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, এই শব্দের ব্যাখ্যা করার গুরুত্ব অন্যান্য শব্দের চেয়ে বেশি। এজন্য নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে এমন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, শব্দটির মর্মার্থ জানতে এর মূলধাতু, আরবদের মাঝে শব্দটির ব্যবহারবিধি এবং মানুষের বিবেকবুদ্ধির কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। একারণে এ জাতীয় (শরিয়তে বর্ণিত) শব্দমালার প্রকৃত পরিচয় জানতে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের দেওয়া বিবরণের দিকেই ফিরে যাওয়া আবশ্যক। কেননা (ব্যাখ্যা হিসেবে) উক্ত বিবরণই যথেষ্ট।
অন্যান্য শব্দের তুলনায় 'ইমান' শব্দটি কুরআন-হাদিসে অধিক ব্যবহৃত হয়েছে। এটাই দ্বীনের মূল। এর মাধ্যমেই মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসে। এটাই সৌভাগ্যবান ও হতভাগাদের মধ্যে পার্থক্য করে, কার সাথে মিত্রতা করা হবে আর কার সাথে শত্রুতা করা হবে সেটার মধ্যেও পার্থক্য করে। সমগ্র দ্বীন-ই ইমানের অনুগামী। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এ সম্পর্কে জানা জরুরি। সুতরাং এ দাবি কি সঠিক হতে পারে যে—রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটার অর্থ বয়ান করতে অবহেলা করেছেন; অথচ এর সাথে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ হুকুম ওতপ্রোতভাবে জড়িত? বস্তুত কোনো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি শরিয়তের দলিলসমগ্রে উল্লিখিত ইমান শব্দের প্রতি লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, ইমান শব্দটি কুরআন-সুন্নাহয় তিনভাবে এসেছে।
এক. বাহ্যিক বিষয়াদিতে ইমান শব্দের প্রয়োগ। এখন কুরআন-হাদিসে যদি এমন কোনো সম্বোধন (বক্তব্য) পাওয়া যায় যা মুমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাহলে ওই ‘মুমিন’ অভিধার আওতাভুক্ত হবে এমন প্রত্যেক মুমিন, যে ওয়াজিব কাজ সম্পাদন করেছে এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থেকেছে। এই ‘মুমিন’ পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবে পাপী মুমিন এবং যার মুনাফেকি সুবিদিত হয়নি এমন মুনাফেকও। কুরআন-সুন্নাহর দলিলে এই অর্থ অনুযায়ী ‘ইমান’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
যেমন মহান আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা জানতে পার, তারা মুমিন নারী, তাহলে তাদেরকে কাফিরদের নিকটে ফিরিয়ে দিও না।”
তিনি আরও বলেন, “(কেউ ভুলবশত কাউকে হত্যা করলে কাফফারা হিসেবে) সে কোনো একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করে দেবে।”
উক্ত আয়াতদ্বয়ে মুমিনের অর্থ— সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের কাছে বাহ্যিকভাবে মুমিন হিসেবে বিদিত। এই অর্থানুযায়ী ইমানের সাথে পার্থিব জীবনের বিভিন্ন অধিকার ও দণ্ডবিধির বিধানাবলি সম্পৃক্ত। যেমন জানমালের হেফাজত এবং উত্তরাধিকারী সম্পত্তি বণ্টন প্রভৃতির বিধিবিধান।
দুই. শরিয়তের দলিলসমগ্রে ‘ইমান’, ‘মুমিন’, ‘যে ইমান এনেছে’—শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে মৌলিক ইমান বা ন্যূনতম ইমানের ক্ষেত্রে। তাই এসব শব্দগুচ্ছে ব্যবহৃত ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবে ওই মুমিন ব্যক্তি, যে ওয়াজিব কাজ সম্পন্ন করেছে ও হারাম কাজ থেকে বিরত থেকেছে, এবং আওতাভুক্ত হবে পাপাচারী ফাসিক মুমিনও। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ওহে যারা ইমান এনেছ।” তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক (তাহলে আল্লাহভীরু হও)।” এ অর্থটিই মৌলিক অর্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নোদ্ধৃত আয়াতগুলোতে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, "তারা তো মুমিন নয়।”
তিনি আরও বলেন, “তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না, তোমরা তো ইমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ।” তিনি আরও বলেছেন, “বরং আল্লাহই ইমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদের ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক (তবে এটাই মেনে নাও)।” এখানে আল্লাহ তাদের ন্যূনতম ইমানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। আর ন্যূনতম ইমানের পরিচয়ই আলোচ্য দ্বিতীয় প্রকার ইমান। মহান আল্লাহ তাদের থেকে পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়কে নাকচ করার পরে এই ন্যূনতম ইমান সাব্যস্ত করেছেন। তিনি (প্রথমে) বলেছিলেন, “(হে নবি) আপনি বলে দিন, তোমরা ইমান আনোনি।” উলামাদের দুটো মতের মধ্যে বিশুদ্ধতম মতানুযায়ী এ আয়াতে আলোচিত ইমান তৃতীয় প্রকারের ইমান (যা একটু পরেই আলোচিত হবে)।
তিন. ইমান শব্দটি আল-ইমানুল মুতলাক তথা পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এই প্রকার ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবেন কেবল সেই মুমিন ব্যক্তি, যিনি সমুদয় ওয়াজিব পালন করেছেন এবং সকল হারাম পরিত্যাগ করেছেন। এরূপ পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়ের সাথেই জুড়ে দেওয়া হয়েছে প্রশংসা ও পরকালীন পুরস্কার। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আর যারা ইমান এনেছে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও, তারা তাদের রবের নিকট পূর্ণ মর্যাদা লাভ করবে।” আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে আল্লাহ এমন উদ্যানরাজির ওয়াদা দিয়েছেন, যেগুলোর তলদেশে বইতে থাকবে নির্ঝরিণী, যেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে, আরও (ওয়াদা দিয়েছেন) উত্তম বাসস্থানসমূহের, চিরসুখী জান্নাতে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো নেয়ামত; এটাই সবচেয়ে বড়ো সফলতা।”
তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। তাদের রবের কাছে আছে তাদের পুরষ্কার – স্থায়ী জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় নির্ঝরিণী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এটি তার জন্য, যে তার রবকে ভয় করে।” তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় আমাদের রসুলগণকে এবং যারা ইমান এনেছে তাদেরকে আমি সাহায্য করব পার্থিব জীবনে, আর যেদিন সাক্ষীবর্গ দণ্ডায়মান হবে (সেই কেয়ামত-দিবসে)।” তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, দয়াময় (আল্লাহ) অবশ্যই তাদের জন্য সৃষ্টি করবেন ভালোবাসা।”
তিনি আরও বলেন, “যারা ইমান এনেছে, আল্লাহ তাদেরকে সুদৃঢ় বাক্যের দ্বারা পার্থিব জীবনে ও আখেরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।” তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে প্রতিরক্ষা করেন (defends), যারা ইমান এনেছে।”
তিনি আরও বলেন, "আর নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে, আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শনকারী।"
তিনি আরও বলেন, “আর আমাদের দায়িত্ব হলো মুমিনদের সাহায্য করা।” এরকম আরও দলিল রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা এভাবে আরও বলেছেন, “মুমিন তো তারাই, আল্লাহর জিকির করা হলে, যাদের অন্তর প্রকম্পিত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা তাদের নামাজে ভীত-অনুগত।”
আরও বলেছেন, “শুধু তারাই আমার আয়াতসমূহের প্রতি ইমান আনে, যারা সেগুলোর দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে, আর তারা অহংকার করে না। তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা হতে দূরে থাকে, তারা তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে এবং আমরা তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।”
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ». “কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না।” তিনি আরও বলেন, «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبُّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ». “তোমাদের কেউ (পরিপূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।”
অনুরূপভাবে ইসলামের পরিচয় সাব্যস্ত করে এবং ইমানের পরিচয় নাকচ করে যে দলিলসমগ্র বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো মূলত পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়কে নাকচ করে, ন্যূনতম ইমানের পরিচয়কে নয়।
এই দলিলগুলোর আরেকটি দিক আছে, সেটি হলো- ইমান এবং ইসলাম শব্দ দুটি যদি একত্রিত হয় তাহলে দুটো স্বতন্ত্র অর্থ অনুযায়ী পরিভাষা দুটোর ব্যাখ্যা করতে হবে। যেমনটি হাদিসে জিবরিলে উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের ব্যাখ্যা করেছেন- ইসলাম হলো বাহ্যিক আমল। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ইসলাম হচ্ছে- তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসুল, নামাজ আদায় করবে, জাকাত প্রদান করবে, রমজান মাসের রোজা রাখবে এবং বায়তুল্লাহর হজ করবে যদি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে।” আর ইমানের ব্যাখ্যা করেছেন- ইমান হলো পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস রাখা।
তিনি বলেছেন, «الإيمان أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَلَقائه وَتُؤْمِنَ بِالبعث». “ইমান হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর সাথে সাক্ষাৎ এবং পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।”
পক্ষান্তরে স্বতন্ত্রভাবে 'ইমানের কথা' উল্লেখ করা হলে তা ইসলামকেও শামিল করে। যেমন আব্দুল কাইসের প্রতিনিধিদল প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনার স্বরূপ কী, তা কি তোমরা অবগত আছ?” সাহাবিগণ বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসুলই অধিক অবগত।' তিনি বললেন, “তা হচ্ছে এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসুল এবং (যথাযথভাবে) নামাজ আদায় করা, জাকাত প্রদান করা, রমজানের রোজা রাখা; আর গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হতে তোমাদের এক-পঞ্চমাংশ সম্পদ (মুসলিম রাষ্ট্রের কোষাগারে) অর্পণ করা।”
ইমান শব্দের আলোচ্য তিনটি অর্থ সালাত এবং হজ শব্দদ্বয়ের অর্থের ন্যায়। এসব শব্দ বাহ্যিক আমলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়, এমনকি মুনাফেক ও লৌকিকতাকারী ব্যক্তিদের আমলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়।
যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আর যখন তারা (মুনাফেকরা) সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে দাঁড়ায়, শুধু লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।”
আবার সালাত কবুল হওয়ার জন্য যতটুকু আদায় করা যথেষ্ট সেই ন্যূনতম পরিমাণের সালাত বোঝাতেও 'সালাত' শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। এছাড়াও নামাজের আরকান (ফরজসমগ্র), ওয়াজিবসমূহ ও মুস্তাহাব (সুন্নাতি) বিষয়াবলি যথাযথভাবে আদায় করা হয়েছে এমন পূর্ণাঙ্গ সালাত বোঝাতেও 'সালাত' শব্দটি প্রয়োগ করা হয়।
অনুরূপভাবে হজ ও গোসলের মতো পরিভাষাগুলো পরিপূর্ণ এবং যথেষ্ট-উভয়কে বোঝানোর ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়; আবার ফাসিদ (অকার্যকর) হজ-গোসল বোঝাতেও 'হজ-গোসল' শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়, যেখানে ফাসিদ বা অকার্যকর হওয়ার সঠিক কারণ জানা যায় না। যেমনভাবে গাছের কতিপয় ডাল কেটে ফেলার পরেও সেটাকে গাছই বলা হয়ে থাকে।
আর ইমান কীসের সাথে সম্পৃক্ত, সে ব্যাপারে অসংখ্য শরয়ি দলিল বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে প্রতীয়মান হয়, ইমান একইসাথে অন্তর, জবান এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত। পক্ষান্তরে কিছু দলিল বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায়, 'ইমান' কেবল অন্তরের সাথেই সম্পৃক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তাদের অন্তরে এখনও ইমান প্রবেশ করেনি।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ তাদের অন্তরে ইমান লিখে দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেছেন, “তাদের অন্তর ইমান আনেনি।”
যেমনভাবে কিছু দলিল বর্ণিত হয়েছে, যেখানে 'ইমান জবানের সাথেই সম্পৃক্ত' হিসেবে দেখানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর সুগভীর জ্ঞানীরা বলে, 'আমরা এগুলোর প্রতি ইমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে'।”
তিনি আরও বলেন, “মুমিনদের উক্তি তো এই, যখন তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের দিকে ডাকা হয়, তখন তারা বলে, 'আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম।' বস্তুত তারাই সফলকাম।”
অপরদিকে আরও কিছু দলিল বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে প্রতীয়মান হয়, ইমান অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের সাথে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও; যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।”
তিনি আরও বলেন, “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর, আর আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।”
হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ». “ইমানের শাখা ষাটটির কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই) এ কথা স্বীকার করা, এবং এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা ইমানের একটি (বিশেষ) শাখা।” অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা জবানের কথা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল, আর লজ্জা অন্তরের আমল।
টিকাঃ
১৫ অনুবাদকের টীকা : অধিকাংশ উসুলবিদের মতানুসারে শরিয়তে বর্ণিত শব্দগুলোকে শরিয়তে প্রদত্ত অর্থ অনুযায়ীই ব্যাখ্যা করতে হবে। যদি এমনটি সম্ভবপর না হয়, তাহলে প্রথাগত অর্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হবে। তাও সম্ভব না হলে আরবি ভাষাগত অর্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হবে। হুবহু এই ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন বিখ্যাত উসুলবিদ ইমাম ইবনুন নাজ্জার আল-ফুতুহি আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৯৭২ হি.) এবং ইমাম মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি আল-মালিকি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৩৯৩ হি.)। আর এই ক্রমধারা উল্লেখ না করে মূলনীতিটি বলেছেন ইমাম ইবনু কুদামা আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৬২০ হি.) এবং সমকালীন খ্যাতনামা উসুলবিদ শাইখ আব্দুল কারিম আন-নামলা রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪৩৫ হি.)। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: আবুল বাকা মুহাম্মাদ বিন আহমাদ ইবনুন নাজ্জার আল-ফুতুহি আল-হাম্বালি, শারহুল কাওকাবিল মুনির, তাহকিক : মুহাম্মাদ জুহাইলি ও নাজিহ হাম্মাদ (রিয়াদ : মাকতাবাতুল উবাইকান, ২য় প্রকাশ, ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ৪৩৫-৪৩৭; মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি, মুজাক্কিরাতু উসুলিল ফিকহ, (রিয়াদ : দারু আতাআতিল ইলম, ৫ম প্রকাশ, ১৪৪১ হি./২০১৯ খ্রি.), পৃ. ২৭৪; মুওয়াফফাকুদ্দিন আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ ইবনু কুদামা আল-মাকদিসি, রওদাতুন নাজির ওয়া জুন্নাতুল মুনাজির, তাহকিক : ড. শাবান মুহাম্মাদ ইসমায়িল (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রাইয়্যান, ২য় প্রকাশ, ১৪২৩ হি./২০০২ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৪৯৭; আব্দুল কারিম আন-নামলা, আল-মুহাজ্জাব ফি ইলমি উসুলিল ফিকহিল মুকারান (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রুশদ, ১ম প্রকাশ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১১৫০-১১৫১ ও ১১৫৫-১১৫৬।
১৬ অনুবাদকের টীকা: গাঢ় বর্ণে লেখা কথাটুকু বক্ষ্যমাণ পুস্তিকার লেখক শাইখ শাসরি হাফিজাহুল্লাহ কারও দিকে সম্পৃক্ত করে বলেননি। কিন্তু আমরা দেখেছি, হুবহু কথা শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭২৮ হি.) বলেছেন তাঁর বিখ্যাত 'আল-ইমান' কিতাবে। দ্রষ্টব্য : আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালিম ইবনু তাইমিয়া আল-হারানি আন-নুমাইরি, আল-ইমান, তাহকিক: মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি (আম্মান : আল-মাকতাবুল ইসলামি, ৫ম প্রকাশ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ২২৪; ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৮৬।
১৭ আল-কুরআন, ৬০ (সুরা মুমতাহিনা): ১০।
১৮ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ৯২।
২০ অনুবাদকের টীকা: অর্থাৎ মুমিন শব্দের প্রথমোক্ত অর্থ অনুযায়ী যিনি মুমিন হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন, তাঁর জানমাল হারাম, এতে কোনোরূপ ক্ষতিসাধন করা মুসলিমদের জন্য হারাম। পাশাপাশি উক্ত মুমিন ব্যক্তি একজন মুসলিম হিসেবেই নিয়মমাফিক সম্পদ পাবেন এবং মুসলিম হিসেবেই তাঁর সম্পদ বণ্টিত হবে। বলা বাহুল্য, আলোচ্য অর্থানুযায়ী যে ব্যক্তি মুমিন হিসেবে সাব্যস্ত হয়নি, তার জানমাল হালাল; এদের জান ও মাল হরণ করা বৈধ। তবে এই বিধান সব কাফিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেবল মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কাফিরের ক্ষেত্রে এ বিধানের প্রয়োগ হবে। পক্ষান্তরে মুসলিম দেশে কর দিয়ে অবস্থানরত কাফির নাগরিক, শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ কিংবা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফির ব্যক্তির জানমাল হালাল নয়। এদের বিরুদ্ধে হামলা করা না-জায়েজ, বরং কবিরা গুনাহ। পাশাপাশি ইসলাম-ত্যাগকারী মুরতাদের জানমাল হালাল হওয়া সত্ত্বেও তাকে হত্যা করা জনসাধারণের জন্য বৈধ নয়। এ কাজের দায়িত্ব শাসকের ওপর অর্পিত। দ্রষ্টব্য : আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন ইসমায়িল আল-বুখারি, আস-সহিহ আল-জামি, পরিশীলন : মুহাম্মাদ আজ-জুহাইর আন-নাসির (বৈরুত: দারু তাওকিন নাজাত, ১৩১১ হিজরিতে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের ফরমানে মিশরের আল-মাতবাআতুল কুবরা আল-আমিরিয়্যায় মুদ্রিত কপির ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত, ১ম প্রকাশ, ১৪২২ হি.), খ. ১, পৃ. ১০, হা. ৩১৬৬; হাফিজ আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি বি শারহি সহিহিল বুখারি, পরিশীলন : মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব (বৈরুত : দারিল মারিফা, আব্দুল আজিজ ইবনু বাজের টীকা-সংবলিত, প্র. ১৩৭৯ হি.), খ. ১২, পৃ. ২৫৯; বুরহানুদ্দিন ইবনু মুফলিহ আল-হাম্বালি, আল-মুবদি ফি শারহিল মুকনি (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ৭, পৃ. ৪৮২; মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, আশ-শারহুল মুমতি আলা জাদিল মুস্তাকনি (সৌদি আরব : দারু ইবনিল জাওজি, ১ম প্রকাশ, ১৪২২-১৪২৮ হিজরি), খ. ১৪, পৃ. ৪৫৫।
২১ অনুবাদকের টীকা: প্রথম প্রকারের সাথে আলোচ্য দ্বিতীয় প্রকারের পার্থক্য হচ্ছে, প্রথমোক্ত প্রকার ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হয় নেককার ইমানদার, পাপী ইমানদার এবং ধরা না পড়া মুনাফেক, যে মুসলিম সমাজে ইমানদার হিসেবে পরিচিত। পক্ষান্তরে দ্বিতীয়োক্ত প্রকার ইমানের পরিচয়ের আওতাভুক্ত হবে শুধু নেককার ইমানদার ও পাপী ইমানদার। ধরা না পড়া মুনাফেক এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে না।
২২ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১৭২।
২৩ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৭৮।
২৫ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা): ৪৩।
২৬ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তাওবা) : ৬৬।
২৭ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ১৭।
২৮ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ১৪।
২৯ অনুবাদকের টীকা: অর্থাৎ এমন ইমান থাকলেই কেবল সামনে আগত আয়াতগুলোর প্রশংসা পাওয়ার হকদার হবে এবং ওয়াদাকৃত পরকালীন পুরস্কার পাবে, অন্যথায় পাপাচারী ইমানদার শাস্তির হকদার হবে, আল্লাহ তাকে মাফ করে বিলকুল জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দিতে পারেন, আবার আল্লাহ চাইলে তাকে জাহান্নামের শাস্তিও দিতে পারেন, তথাপি একসময় ইমানের দরুন সেও জান্নাতে যাবে; পক্ষান্তরে ইমানের পরিচয়ে থাকা মুনাফেক চিরকাল থাকবে জাহান্নামে।
৩০ আল-কুরআন, ১০ (সুরা ইউনুস) : ২।
৩১ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তওবা) : ৭২।
৩২ আল-কুরআন, ৯৮ (সুরা বায়্যিনা): ৭-৮।
৩৩ আল-কুরআন, ৪০ (সুরা গাফির): ৫১।
৩৪ আল-কুরআন, ১৯ (সুরা মারইয়াম) : ৯৬।
৩৫ আল-কুরআন, ১৪ (সুরা ইবরাহিম) : ২৭।
৩৬ আল-কুরআন, ২২ (সুরা হজ): ৩৮।
৩৭ আল-কুরআন, ২২ (সুরা হজ): ৫৪।
৩৮ আল-কুরআন, ৩০ (সুরা রুম) : ৪৭।
৩৯ আল-কুরআন, ৮ (সুরা আনফাল): ২।
৪০ আল-কুরআন, ২৩ (সুরা মুমিনুন) : ১-২।
৪১ আল-কুরআন, ৩২ (সুরা সাজদা): ১৫-১৬।
৪২ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ২৪৭৫।
৪৩ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১৩।
৪৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৫০; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৯।
৪৫ অনুবাদকের টীকা : এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ কথা হলো- ছয়টি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস রাখার নাম ইমান। কেননা আলোচ্য হাদিসে জিবরিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ». “ইমান হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমগ্র, তাঁর রসুলগণ, শেষ দিবস ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখা।” দ্রষ্টব্য: আল-বুখারি, আস-সহিহ, খ. ১, পৃ. ১৯, হা. ৫০; আবুল হুসাইন মুসলিম বিন হাজ্জাজ আল-কুশাইরি আন-নাইসাবুরি, আল-জামি আস-সহিহ, তাহকিক : আহমাদ বিন রিফআত, মুহাম্মাদ ইজ্জাত বিন উসমান ও মুহাম্মাদ শুকরি বিন হাসান, পরিশীলন : মুহাম্মাদ জুহাইর আন-নাসির (বৈরুত : দারু তাওকিন নাজাত, তুরস্কের দারুত তাবাআতিল আমিরায় মুদ্রিত কপির ওপর ভিত্তি করে শাইখ ফুআদ আব্দুল বাকির সংখ্যায়নে প্রকাশিত, ১ম প্রকাশ, ১৪৩৩ হি.), কিতাবুল ইমান, বাবের নামবিহীন, খ. ১, পৃ. ২৮, হা. ৯। কিন্তু অনেক মুহাক্কিক উলামা আলোচনা করার সময় পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি ইমান আনার কথা বলেছেন এবং উল্লিখিত ছয়টি বিষয়ের মধ্য থেকে তাকদিরের প্রতি ইমান আনার কথা বাদ দিয়ে বাকিগুলো উল্লেখ করেছেন। যেমন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭২৮ হি.), তাঁর ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৫১ হি.), তাঁর ছাত্র ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৯৫ হি.), ইমাম ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৯২ হি.) প্রমুখ। দ্রষ্টব্য: ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৫৯; আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা, আস-সাওয়ায়িকুল মুরসালা আলাল জাহমিয়্যাতি ওয়াল মুয়াত্তিলা, তাহকিক : হুসাইন বিন উক্কাশা বিন রমদান (রিয়াদ : দারু আতাআতিল ইলম; বৈরুত : দারু ইবনু হাজম, ১ম প্রকাশ, ১৪৪২ হি./২০২০ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ১৬১; জাইনুদ্দিন আব্দুর রহমান বিন আহমাদ ইবনু রজব আল-হাম্বালি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, তাহকিক : মাহমুদ বিন শাবান ও অন্যান্য (মদিনা : মাকতাবাতুল গুরাবায়িল আসারিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ২০৯; আলাউদ্দিন আলি বিন মুহাম্মাদ ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি, শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, তাহকিক : শুওয়াইব আল-আরনাউত ও আব্দুল্লাহ বিন মুহসিন আত-তুর্কি (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালা, ১০ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৪৮৯। কেননা তাঁরা কুরআনের দুটো আয়াতকে সামনে রেখে 'ইমানের পাঁচটি মৌলিক বিষয়' উল্লেখ করেছেন, যেই আয়াতদ্বয়ে তাকদিরের কথা নেই। [দ্রষ্টব্য : আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা) : ১৭৬ ও আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১৩৫] কিন্তু তাকদিরের কথা বিশেষভাবে বলা না হলেও উক্ত পাঁচটি বিষয় তাকদিরকেও নিজেদের মধ্যে শামিল করে। কেননা মহান আল্লাহর প্রতি ইমান আনার অন্তর্গত তাঁর গুণরাজি ও বাণীর প্রতি ইমান রাখা, আর তাকদিরের আলোচনা এগুলোর বাইরে নয়। তদ্রুপ সামগ্রিকভাবে বাকি বিষয়গুলোও তাকদিরের আলোচনা নিজেদের মধ্যে সন্নিবেশিত করে। উল্লেখ্য যে, লেখক হাফিজাহুল্লাহ পাঁচটি বিষয়ের কথা বলে হাদিসে জিবরিল থেকে দলিল দেওয়ার সময় স্রেফ তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। আর লেখক কর্তৃক উল্লিখিত 'আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও পুনরুত্থান' মূলত শেষ দিবসেরই অন্তর্গত।
৪৬ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৫০; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৯।
৪৭ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৫৩।
৪৯ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ১৪২।
৫০ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত): ১৪।
৫১ আল-কুরআন, ৫৮ (সুরা মুজাদিলা): ২২।
৫২ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা): ৪১।
৫৩ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান): ৭।
৫৪ আল-কুরআন, ২৪ (সুরা নূর): ৫১।
৫৫ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা) : ২৭৮।
৫৬ আল-কুরআন, ৮ (সুরা আনফাল) : ১।
৫৭ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৯; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৩৫।