📄 ৫.১০ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : বড়ো কুফরের মধ্যে কোনো তারতম্য নেই
মুরজিয়ারা কুফরকে অস্বীকার ও মিথ্যা-প্রতিপন্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, সেহেতু তারা বলে, “এই কুফরের কেবল একটিমাত্র স্তর; কুফরের ক্ষেত্রে এমনটা কল্পনাও করা যায় না যে, 'দ্বীন থেকে খারিজকারী' কোনো কুফর আরেকটি 'দ্বীন থেকে খারিজকারী' কুফরের চেয়ে বড়ো হবে!”
এটি একটি ভুল মতাদর্শ। কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট দলিলসমগ্র এই মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে, যেসব দলিলে সাব্যস্ত হয়েছে, বড়ো কুফরের অনেকগুলো স্তর আছে, বড়ো কুফর স্রেফ একটি স্তরবিশিষ্ট নয়।
মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে, তারপর কাফির হয়, এরপর পুনরায় ইমান আনে, এবং আবার কাফির হয়, অনন্তর কুফরকে পরিবর্ধিত করে; আল্লাহ তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে পথপ্রদর্শন করবেন না।”
মহান আল্লাহ কাফিরদের কুফরি-বৃদ্ধি সাব্যস্ত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনার পর কাফির হয়েছে, অতঃপর কুফরকে পরিবর্ধিত করেছে, তাদের তওবা কখনোই গৃহীত হবে না এবং তারাই পথভ্রষ্ট।”
তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই (মাসগুলোর) স্থানান্তর-কুফরের মধ্যে আরও কুফরি বৃদ্ধি করা, যা দিয়ে কাফিরদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয়।” (আমাদের) এই বক্তব্যের পক্ষে আরও প্রমাণ হলো—আল্লাহ জাহান্নামের আগুনে কাফিরদের স্তরসমূহের মাঝে তারতম্য করেছেন। আবু তালিব থাকবে জাহান্নামের অগভীর ও হালকা আজাবের জায়গায়, আর মুনাফেকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে; মহান আল্লাহ উভয় স্তরের মধ্যে পার্থক্য করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেছেন, “যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে (সৃষ্টিকুলকে) বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির ওপর শাস্তি বৃদ্ধি করব।” এই উৎসের ওপর ভিত্তি করে (বিখ্যাত) মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে-শরিয়তের (শাখাগত) বিধিবিধান পালনের দায়িত্ব কাফিরদেরকে দেওয়া হয়নি। এই মূলনীতির ব্যাপারে সৃষ্ট মতবিরোধ মুরজিয়াদের আকিদা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। আর এটা ঘটেছে দুই দিক থেকে:
প্রথম দিক : মতবিরোধের কেন্দ্রবিন্দু নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মূলনীতি-নির্ধারকরা বলেছেন, “এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, কাফিরদেরকে ইমান আনয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” মুরজিয়াদের 'ইমান কেবল অন্তরের বিশ্বাস'-মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা উক্ত কথা বলেছেন। অথচ এটা সালাফদের মানহাজপরিপন্থি। এক্ষেত্রে এভাবে বললে সঠিক হতো যে, কাফিরদেরকে ইসলামের মূল তথা শাহাদাতাইন আনয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এ ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করেছেন।
দ্বিতীয় দিক : কাফিরদেরকে শরিয়তের শাখাপ্রশাখা পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিনা—এই মাসআলার পারলৌকিক ফলাফল। যেহেতু বিরোধীদের মতে বড়ো কুফরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ঘটে না, সেহেতু তারা বলে, (মূল ব্যতীত) ইসলামি শরিয়তের অন্যান্য দায়িত্ব কাফিরদের না থাকায় নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির কাফিরের পারলৌকিক শাস্তি (অন্য কাফিরদের থেকে) বেশি হবে না। কিছু উসুলবিদ উক্ত মতবিরোধের ওপর ভিত্তি করে দুনিয়াসম্পর্কিত শরয়ি বিধিবিধানের ক্ষেত্রে (আলোচ্য মাসআলার) ফলাফল নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু এই অবস্থান সঠিক নয়। কেননা বিরোধীরা স্রেফ পরকাল উদ্দেশ্য করেছে। আর (এক্ষেত্রে আলোচিত) দুনিয়ায় ধার্যকৃত বিধিবিধান কেবল এক শ্রেণির কাফিরের সাথে সম্পর্কিত। কিছু বিধান যুদ্ধরত কাফিরের সাথে সম্পর্কিত, অন্যদের সাথে নয়। আবার কিছু বিধান মুসলিম রাষ্ট্রে জিজিয়া (কর) প্রদান করে অবস্থানরত অমুসলিম নাগরিকের সাথে সম্পর্কিত। আবার কিছু বিধান স্রেফ ইসলাম ধর্ম ত্যাগকারী মুরতাদের সাথে সম্পর্কিত। আমি এই মাসআলা আমার 'আত-তাফরিক বাইনাল উসুলি ওয়াল ফুরু' কিতাবে বিশদভাবে আলোচনা করেছি।
টিকাঃ
১৭৮ আল-কুরআন, (সুরা নিসা) : ১৩৭।
১৭৯ আল-কুরআন (সুরা আলে ইমরান) : ৯০।
১৮০ অনুবাদকের টীকা : জাহেলি যুগের আরবরা চন্দ্রবছরের চারটি হারাম মাসকে নিজেদের সুবিধামতো নির্ধারণ করত। চারটি হারাম মাসে যেহেতু যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল তাদের মধ্যে, সেহেতু যুদ্ধের প্রয়োজনে তারা হারাম মাসকে পিছিয়ে দিত। যেমন মহরম মাসকে সফর মাস বানিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ করে সফর মাসকে মহরম ধরে নিত! আয়াতে তাদের এই কাজকে কুফরের মধ্যে কুফরি-বৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রষ্টব্য : আত-তাবারি, জামিউল বায়ান, খ. ১১, পৃ. ৪৪৯-৪৫০।
১৮১ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তাওবা) : ৩৭।
১৮২ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৫৬৪; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ২১০।
১৮৩ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১৪৫।
১৮৪ আল-কুরআন, ১৬ (সুরা নাহল): ৮৮।
১৮৫ অনুবাদকের টীকা : লেখক হাফিজাহুল্লাহ উসুলবিদদের মধ্যকার ইখতিলাফের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যদি কাফিররা শরিয়তের শাখাপ্রশাখা পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে এর ফলাফল স্রেফ পরকালে সীমাবদ্ধ কিনা সে বিষয়ে উসুলবিদগণ মতভেদ করেছেন। একদলের মতে, স্রেফ পরকালে সীমাবদ্ধ; অর্থাৎ শরিয়তের শাখাগত বিধান পালন না করার কারণে পরকালে শাস্তি হবে। আরেকদলের মতে, পরকালের পাশাপাশি দুনিয়াতেও এর ফলাফল রয়েছে। অর্থাৎ দুনিয়াতেও ইসলাম গ্রহণ করলে কাফিরদের ওপর বিভিন্ন বিধান আরোপিত হবে কুফুরির সময়ে তাদের কৃত আমলের ভিত্তিতে। যেমন কিছু ফাকিহর মতে, কাফির অবস্থায় 'হারাম নয়' এমন মানত করে থাকলে মুসলিম অবস্থাতেও সেই মানত আদায় করা অপরিহার্য থাকবে, কাফির অবস্থায় পরিত্যাগকৃত নামাজ মুসলিম হয়ে কাজা আদায় করতে হবে। দ্রষ্টব্য: সাদ বিন নাসির আশ-শাসরি, আত-তাফরিক বাইনাল উসুলি ওয়াল ফুরু (রিয়াদ: দারুল মুসলিম, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৫১-৬১।
১৮৬ আশ-শাসরি, আত-তাফরিক বাইনাল উসুলি ওয়াল ফুরু, খ. ১, পৃ. ২৮০।
📄 ৫.১১ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : অন্তরের আমল ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়
মুরজিয়াদের একটি অন্যতম বিদাতি আকিদা—তাদের কেউ কেউ বলে, “অন্তরের আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়; যেমন ভালোবাসা, ঘৃণা করা, আশা করা, ভয় করা প্রভৃতি।” শরিয়তের দলিলপ্রমাণ এই বিদাতকে খণ্ডন করে।
বুখারি-মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ (পরিপূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা সে তার নিজের জন্য পছন্দ করে।”
আরও বর্ণিত হয়েছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ (পরিপূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকটে তার পিতামাতা, তার সন্তানসন্ততি ও সমগ্র মানুষ অপেক্ষা ভালোবাসার মানুষ হচ্ছি।”
আরও বর্ণিত হয়েছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ইমানের মিষ্টতা পেয়েছে : (১) আল্লাহ ও তাঁর রসুল তার নিকটে অন্য সকল কিছুর চাইতে অধিক প্রিয় হওয়া; (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা; (৩) কুফরিতে প্রত্যাবর্তন করাকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা।”
আরও বর্ণিত হয়েছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ইমানের আলামত হচ্ছে আনসার সাহাবিদেরকে ভালোবাসা এবং মুনাফেকির আলামত হচ্ছে আনসার সাহাবিদেরকে অপছন্দ করা।”
আরও বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই লজ্জা ইমানের অন্তর্ভুক্ত।”
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, “সে ব্যক্তি ইমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসেবে ইসলামকে এবং রসুল হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে।”
টিকাঃ
১৮৭ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১৩; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৪৫।
১৮৮ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১৫; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৪৪।
১৮৯ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১৬; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৪৩।
১৯০ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১৭; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৭৪।
১৯১ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬১১৮; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৩৬।
১৯২ মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৩৪।
📄 ৫.১২ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : ইমান ও কুফরকে আমল বলা যাবে না
মুরজিয়াদের আরেকটি বিদাতি আকিদা হলো, ইমান এবং কুফরকে আমল বলা যাবে না। এটা কুরআন-সুন্নাহর সেসব দলিলের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যাত, যেগুলো প্রমাণ করে, জান্নাত লাভের মাধ্যম হলো আমল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের আমলের প্রতিদানস্বরূপ।”
মহান আল্লাহ আরও বলেন, “আর তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমরা যে (নেক) আমল করতে, তারই প্রতিদানস্বরূপ তোমাদেরকে এই জান্নাতের উত্তরাধিকারী বানানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এরাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে এরা চিরস্থায়ী হবে, তাদের আমলের প্রতিদানস্বরূপ।”
তদ্রুপ কুফরের ক্ষেত্রেও এরূপ বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “ওহে কাফির সম্প্রদায়, আজ তোমরা ওজর (excuses) পেশ করো না। তোমরা যেই আমল করতে, তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।”
মহান আল্লাহ আরও বলেন, “তোমরা যেই আমল করতে, তার জন্য তোমরা চিরস্থায়ী শান্তি ভোগ করতে থাক।”
ইমানকে আমল আখ্যা দেওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলোর অন্যতম হলো এই হাদিস—
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন আমল সর্বোত্তম?” তিনি বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ইমান আনা।”
টিকাঃ
১৯৩ আল-কুরআন, ৪৩ (সুরা জুখরুফ) : ৭২।
১৯৪ আল-কুরআন, ৭ (সুরা আরাফ): ৪৩।
১৯৫ আল-কুরআন, ৪৬ (সুরা আহকাফ): ১৪।
১৯৬ আল-কুরআন, ৬৬ (সুরা আত তাহরিম) : ৭।
১৯৭ আল-কুরআন, ৩২ (সুরা সাজদা): ১৪।
১৯৮ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১৫১৯।
📄 ৫.১৩ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : ইমানের প্রকৃত পরিচয় কেবল জবানের স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ
কতক মুরজিয়া বলে থাকে, “ইমান কেবল জবানের স্বীকৃতি।” তাদের এই বক্তব্য নিতান্তই ভুল। এভাবে বললে মুনাফেকদেরও মুমিন বলতে হয়। কেননা তারাও জবানের মাধ্যমে ইসলামের স্বীকৃতি দেয়। অথচ তারা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে-কাফিরদেরও নিচে অবস্থান করবে। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় মুনাফেকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।”
টিকাঃ
১৯৯ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১৪৫।