📄 ৫.৭ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : ইমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না
মুরজিয়ারা আরও বলে, “সত্তাগতভাবে ইমান কেবল একটিমাত্র বিষয়। ইমানের বৃদ্ধি ঘটে, এমনটি কল্পনাও করা যায় না। তবে ইমানের যেসব শাখা-প্রশাখার প্রতি বান্দা ইমান আনে, সেসবের দৃষ্টিকোণ থেকে ইমান বাড়ে; এবং ইমানের যে সময়কাল বৃদ্ধি হয়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ইমান বাড়ে।” এজন্য তাদের কেউ কেউ বলে, "আমার ইমান আবুবকর-ওমরের মতো, এমনকি জিবরাইল-মিকাইলের মতো!”
অথচ শরয়ি দলিলগুলো এই বিদাতি কথাকে সুস্পষ্টভাবে খণ্ডন করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, যেন তারা তাদের ইমানের সাথে ইমান বৃদ্ধি করে নেয়।” এ আয়াত অনুযায়ী প্রশান্তি অবতীর্ণ হলে কি 'যে বিষয়ের প্রতি ইমান আনা হয় এমন শাখা-প্রশাখা' বৃদ্ধি পায়, কিংবা ইমানের সময়কাল বৃদ্ধি পায়? আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আমি ফেরেশতাদেরকে করেছি জাহান্নামের প্রহরী। আমি কাফিরদেরদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ তাদের এই সংখ্যা উল্লেখ করেছি। যাতে কিতাবধারীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে এবং ইমানদারদের ইমান বেড়ে যায়।”
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, “আর যখন কোনো সুরা অবতীর্ণ করা হয়, তখন কেউ কেউ বলে, ‘এই সুরা তোমাদের মধ্যে কার ইমান বৃদ্ধি করল?’ যেসব লোক ইমান এনেছে, এই সুরা তাদের ইমানকে বৃদ্ধি করেছে এবং তারাই হয়েছে আনন্দিত।”
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের বিরুদ্ধে মানুষজন সমবেত হয়েছে, অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো।’ কিন্তু এতে তাদের ইমান বেড়ে গিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।”
এই আয়াতগুলো তাদের কথার-ইমান কেবল একটিমাত্র বিষয়-খণ্ডনে সবচেয়ে বড়ো দলিলগুলোর অন্যতম।
মহান আল্লাহ বলেন, “মুমিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, তখন তারা বলে উঠল, 'এটা তো সেই বিষয়, আল্লাহ ও তাঁর রসুল যার প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দিয়েছেন। আর আল্লাহ ও তাঁর রসুল সত্যই বলেছিলেন।' এতে তাদের ইমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল।”
মহান আল্লাহ আরও বলেন, “আর যখন ইবরাহিম বলেছিল, 'হে আমার রব, আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে প্রদর্শন করুন।' তিনি বললেন, 'তাহলে কি তুমি (এর প্রতি) ইমান রাখ না?' সে বলল, 'জি, অবশ্যই (ইমান রাখি)। কিন্তু (আমি এটা চাইছি) যাতে আমার অন্তর প্রশান্ত হয় (ইমান বৃদ্ধি পায়)।'”
বুখারি-মুসলিমে আবু সায়িদ খুদরি থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ» “জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, 'যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ইমান আছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করো'।”
বুখারি-মুসলিমে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «وَيُقَالُ لِلرَّجُلِ مَا أَعْقَلَهُ وَمَا أَطْرَفَهُ وَمَا أَجْلَدَهُ وَمَا فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ» “(কেয়ামতের আগে লোকেরা বলাবলি করবে, অমুক বংশে একজন আমানতদার লোক আছে)। সে ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হবে, সে কতইনা বুদ্ধিমান, কতইনা অবিচল, আর কতইনা বিবেকবান? অথচ তার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ ইমানও থাকবে না।”
সমুদয় সাহাবি ইমানের ক্ষেত্রে 'বৃদ্ধি হওয়া'-শব্দ প্রয়োগ করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। আর আবু দারদা, আবু হুরাইরা ও উমাইর বিন হাবিব আল-খাতমি থেকে, 'ইমান হ্রাস পাওয়া' শীর্ষক শব্দের ব্যবহার বর্ণিত হয়েছে।
মূলত মুরজিয়ারা যে বলে, ইমানের কোনো কমবেশি হয় না; তার কারণ, তারা বিশ্বাস করে, অকাট্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের স্তর কেবল একটা। অথচ এই মতবাদ বাতিল; কুরআন-সুন্নাহ এই মতবাদকে প্রত্যাখান করে।
সহিহ বুখারিতে আম্মিজান আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «إِنَّ أَتْقَاكُمْ وَأَعْلَمَكُمْ بِاللَّهِ أَنَا». “আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখি এবং আমিই তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।” এখানে নবিজি আল্লাহসম্পর্কিত জ্ঞানের অস্তিত্বে মর্যাদাগত তারতম্য সাব্যস্ত করেছেন (সাব্যস্ত করেছেন, আল্লাহসম্পর্কিত জ্ঞান কারও কম, আবার কারও বেশি)। এখানে যেসব বিষয় সম্পর্কে জানা হয়, সেসব বিষয়ের আধিক্যের ক্ষেত্রে মর্যাদাগত তারতম্য উদ্দেশ্য করা হয়নি।
এ বিষয়ে (আমাদের কথার পক্ষে) আরও প্রমাণ হলো—আল্লাহ তায়ালা যখন মুসা আলাইহিস সালামকে জানালেন, তার কওম গোবৎস পূজা করছে, তখন তিনি সেকথা অকাট্যভাবে বিশ্বাস করলেন; কেননা এটা আল্লাহর দেওয়া সংবাদ। এরপর তিনি তার স্বজাতির কাছে ফিরে গিয়ে যখন বিষয়টি স্বচক্ষে দেখেন, তখন তাঁর ইলম বেড়ে যায় এবং আল্লাহর কথায় অকাট্যভাবে বিশ্বাস করেন। তারপর তিনি (তাঁর হাতে থাকা) ফলকসমূহ নিক্ষেপ করেন। যেমনভাবে হাদিসে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لَيْسَ الْخَبَرُ كَالْمُعَايَنَةِ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى أَخْبَرَ مُوسَى بِمَا صَنَعَ قَوْمُهُ فِي الْعِجْلِ فَلَمْ يُلْقِ الْأَلْوَاحَ فَلَمَّا عَايَنَ مَا صَنَعُوا أَلْقَى الْأَلْوَاحَ».
“খবর শোনা চাক্ষুষ দেখার মতো নয়। নিশ্চয়ই মুসা আলায়হিস সালামের সম্প্রদায়ের গোবৎস পূজা সম্পর্কে মহান আল্লাহ মুসা আলায়হিস সালামকে যে সংবাদ দিয়েছেন, এতে তিনি হাতে সংরক্ষিত তাওরাতের ফলকসমূহ ফেলে দেননি, কিন্তু যখন তাদের মধ্যে গিয়ে চাক্ষুষ তাদের কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখলেন, তখন ফলকসমূহ ছুঁড়ে ফেললেন।”
মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর যখন ইবরাহিম বলেছিল, 'হে আমার রব, আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে প্রদর্শন করুন।' তিনি বললেন, 'তাহলে কি তুমি (এর প্রতি) ইমান রাখ না?' সে বলল, 'জি, অবশ্যই (ইমান রাখি)। কিন্তু (আমি এটা চাইছি) যাতে আমার অন্তর প্রশান্ত হয় (ইমান বৃদ্ধি পায়)।”
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম অকাট্যভাবেই জানতেন, আল্লাহ মৃতকে জীবিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি নিজের ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস) বাড়াতে চেয়েছিলেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইয়াকিন বৃদ্ধি হতে পারে। এই মাসআলা আমি সূক্ষ্মভাবে আলোচনা করেছি, 'আল-কাতউ ওয়াজ জন্ম ইনদাল উসুলিয়্যিন' গ্রন্থে।
আর মুরজিয়াদের মধ্যে যারা বলে, ‘আমার ইমান জিবরাইলের ইমানের মতো,’ তাদের এই মতকে সালাফদের ইজমা (সর্ববাদিসম্মত অভিমত) বাতিল প্রমাণ করে। ইবনু আবি মুলাইকাহ বলেন, «أَدْرَكْتُ ثَلاَثِينَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ﷺ كُلُّهُمْ يَخَافُ النِّفَاقَ عَلَى نَفْسِهِ مَا مِنْهُمْ أَحَدٌ يَقُولُ: إِنَّهُ عَلَى إِيمَانِ جِبْرِيلَ وَمِيكَائِيلَ».
“আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিরিশজন সাহাবিকে পেয়েছি, যারা তাঁদের অন্তরে মুনাফেকির আশঙ্কা করতেন। তাঁদের কেউ বলেননি, আমার ইমান জিবরাইল-মিকাইলের মতো।”
টিকাঃ
১৫৭ আল-কুরআন, ৪৮ (সুরা ফাতহ): ৪।
১৫৮ আল-কুরআন, ৭৪ (সুরা মুদ্দাসসির) : ৩১।
১৫৯ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তওবা) : ১২৪।
১৬০ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান) : ১৭৩।
১৬১ আল-কুরআন, ৩৩ (সুরা আহজাব): ২২।
১৬২ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৬০।
১৬৩ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ২২; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৭৪।
১৬৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৪৯৭; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৪৩।
১৬৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ২০।
১৬৬ আহমাদ, হা. ২৭১; তাবারানি, হা. ১২৪৫১; ইবনে হিব্বান, হা. ৬২১৩; বর্ণনার মান : সহিহ।
১৬৭ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৬০।
১৬৮ আশ-শাসরি, আল-কাতউ ওয়াজ জন্ম ইনদাল উসুলিয়্যিন, খ. ১, পৃ. ২৭।
১৬৯ ইমাম বুখারি এই উক্তি সহিহুল বুখারির ইমান অধ্যায়ে কাটাসনদে বর্ণনা করেছেন, অধ্যায়ের পরিচ্ছেদ নং: ৩৬।
📄 ৫.৮ : ‘আমি মুমিন ইনশাআল্লাহ’ বলা নিয়ে মুরজিয়াদের অদ্ভুত মতবাদ
ইমানের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ বলার ব্যাপারে মুরজিয়াদের অবস্থান খুবই আশ্চর্যজনক। এক্ষেত্রে তাদের দুটি মত রয়েছে।
প্রথম মত : তাদের কেউ কেউ ইমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলা ওয়াজিব মনে করে। সুতরাং মানুষকে অবশ্যকীয়ভাবে বলতে হবে, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ।' কেননা কেউ মুমিন কিনা সেটা সাব্যস্ত হয়, মৃত্যুর সময়ের অবস্থানুযায়ী। আর সে ইমানের ওপর মরবে, না কুফরের ওপর-আল্লাহর সেই অগ্রবর্তী জ্ঞান সম্পর্কে তো মানুষ ওয়াকিবহাল নয়।
দ্বিতীয় মত : মুরজিয়াদের কেউ কেউ ইমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলা হারাম মনে করে। কেননা ইমান তাদের কাছে একটিমাত্র বিষয় (যা খণ্ডিত বা বিভাজিত হয় না)। তাই কেউ দৃঢ়ভাবে ইমান এনে থাকলে, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ'-বলার প্রয়োজন পড়ে না। কেননা এতে সংশয় প্রকাশ পায়।
উল্লিখিত দুটি মতই ভুল। সঠিক হলো, ইনশাআল্লাহ বলা এবং না-বলা উভয়টিই বৈধ। সুতরাং পরিপূর্ণ ইমানের ক্ষেত্রে 'ইনশাআল্লাহ' বলতে হয়। কেননা এক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ না বললে এরকম বুঝায় যে, বান্দা নিজের ওপর অর্পিত সকল নির্দেশ পালন করেছে। আর এতে আত্মপ্রশংসা রয়েছে। এজন্য একদল সালাফ থেকে (পরিপূর্ণ) ইমানের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ বলার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-সহ আরও অনেকে ইমানের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ বলেছেন।
আর ইনশাআল্লাহ পরিত্যাগ করতে হয় ন্যূনতম ইমানের ক্ষেত্রে।
একারণে আল্লাহ তায়ালা কিছু মুমিনের কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন; যাঁরা ইনশাআল্লাহ না বলেই তাদের নিজেদের ব্যাপারে ইমানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। আল্লাহ তাঁদের কথা বর্ণনা করে বলেন, “যারা বলে, হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমরা ইমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
আল্লাহ আরও বলেন, “(তারা বলে) হে আমাদের রব, আমরা এক আহ্বায়ককে ইমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি, 'তোমরা তোমাদের রবের ওপর ইমান আন।' কাজেই আমরা ইমান এনেছি।”
আল্লাহ আরও বলেন, “আমার বান্দাগণের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, 'হে আমাদের রব, আমরা ইমান এনেছি, অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন'। "
আল্লাহ আরও বলেন, “তারা বলে, 'হে আমাদের রব, আমরা ইমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করুন।"
টিকাঃ
১৭০ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান): ১৬।
১৭১ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান) : ১৯৩।
১৭২ আল-কুরআন, ২৩ (সুরা মুমিনুন): ১০৯।
১৭৩ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা) : ৮৩।
📄 ৫.৯ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : ছোটো কুফর বলে কিছু নেই
মুরজিয়াদের বক্তব্য হলো, কুফরের প্রকার একটিই। ছোটো কুফর বলে কিছু নেই। কুফরের ছোটো-বড়ো ভাগ নেই। তারা বলে থাকে, কুফরের মানে যেহেতু অস্বীকার করা, তাই এর স্তর কেবল একটি।
এটা শরিয়তের সেই দলিলগুলোর বিরোধী, যেগুলোতে কাবিরা গুনাহকে কুফর বলা হয়েছে। বুখারি-মুসলিমে ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদিস এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ». “মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকি, আর মুসলিমের সাথে লড়াই করা কুফরি। "
মারফু সূত্রে ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَا تَرْجِعُوا بَعْدِي كُفَّارًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ». “তোমরা আমার পরে এমন কাফির হয়ে যেও না যে, একজন আরেকজনের গর্দান উড়িয়ে দিবে।” নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرُ الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ»। “লোকদের মাঝে দুই ধরনের স্বভাব আছে, যা কুফর। বংশের প্রতি কটাক্ষ করা এবং মৃতব্যক্তির জন্য উচ্চৈঃস্বরে কান্না করা।” একদল সাহাবি এই পাপগুলোকে ছোটো কুফর (কুফর দুনা কুফর) বলেছেন এবং তাঁদের যুগে কেউ এ কথার বিরোধিতা করেছেন বলে জানা যায় না।
কুফরের একটি শাখা ন্যূনতম ইমানের সাথে বিরোধপূর্ণ নয়; কখনো কখনো একজন মানুষের মাঝে 'ইমান এবং ছোটো কুফুর' উভয়টিই জমা হতে পারে। ছোটো মুনাফেকির মতো; যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «أَرْبَعُ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ». “চারটি স্বভাব যার মধ্যে রয়েছে, সে খাঁটি মুনাফেক। যার মাঝে এর মধ্যকার কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফেকের একটি স্বভাব আছে বলে বিবেচিত হবে।” তদ্রুপ ছোটো শিরকও ন্যূনতম ইমানের সাথে একত্রিত হতে পারে।
এসব জায়গায় 'কুফর' শব্দ রূপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, বলা সঠিক নয়। কেননা যাবতীয় শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল (origin) হলো, “প্রকৃত অর্থই গ্রহণ করা এবং ইঙ্গিতবহ প্রমাণ ব্যতিরেকে রূপক অর্থ গ্রহণ না করা।” যেমনভাবে তারা বলে, “শরিয়তের মুস্তাহাব বিষয় প্রকৃত অর্থেই নির্দেশিত; আর আমর তথা নির্দেশকে ইঙ্গিতবহ প্রমাণ ছাড়া মুস্তাহাব বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না।”
টিকাঃ
১৭৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৪৮; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৬৪।
১৭৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৮৬৮; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৬৬।
১৭৬ মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৬৭।
১৭৭ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৩৪; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৫৮।
📄 ৫.১০ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : বড়ো কুফরের মধ্যে কোনো তারতম্য নেই
মুরজিয়ারা কুফরকে অস্বীকার ও মিথ্যা-প্রতিপন্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, সেহেতু তারা বলে, “এই কুফরের কেবল একটিমাত্র স্তর; কুফরের ক্ষেত্রে এমনটা কল্পনাও করা যায় না যে, 'দ্বীন থেকে খারিজকারী' কোনো কুফর আরেকটি 'দ্বীন থেকে খারিজকারী' কুফরের চেয়ে বড়ো হবে!”
এটি একটি ভুল মতাদর্শ। কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট দলিলসমগ্র এই মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে, যেসব দলিলে সাব্যস্ত হয়েছে, বড়ো কুফরের অনেকগুলো স্তর আছে, বড়ো কুফর স্রেফ একটি স্তরবিশিষ্ট নয়।
মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে, তারপর কাফির হয়, এরপর পুনরায় ইমান আনে, এবং আবার কাফির হয়, অনন্তর কুফরকে পরিবর্ধিত করে; আল্লাহ তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে পথপ্রদর্শন করবেন না।”
মহান আল্লাহ কাফিরদের কুফরি-বৃদ্ধি সাব্যস্ত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনার পর কাফির হয়েছে, অতঃপর কুফরকে পরিবর্ধিত করেছে, তাদের তওবা কখনোই গৃহীত হবে না এবং তারাই পথভ্রষ্ট।”
তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই (মাসগুলোর) স্থানান্তর-কুফরের মধ্যে আরও কুফরি বৃদ্ধি করা, যা দিয়ে কাফিরদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয়।” (আমাদের) এই বক্তব্যের পক্ষে আরও প্রমাণ হলো—আল্লাহ জাহান্নামের আগুনে কাফিরদের স্তরসমূহের মাঝে তারতম্য করেছেন। আবু তালিব থাকবে জাহান্নামের অগভীর ও হালকা আজাবের জায়গায়, আর মুনাফেকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে; মহান আল্লাহ উভয় স্তরের মধ্যে পার্থক্য করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেছেন, “যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে (সৃষ্টিকুলকে) বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির ওপর শাস্তি বৃদ্ধি করব।” এই উৎসের ওপর ভিত্তি করে (বিখ্যাত) মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে-শরিয়তের (শাখাগত) বিধিবিধান পালনের দায়িত্ব কাফিরদেরকে দেওয়া হয়নি। এই মূলনীতির ব্যাপারে সৃষ্ট মতবিরোধ মুরজিয়াদের আকিদা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। আর এটা ঘটেছে দুই দিক থেকে:
প্রথম দিক : মতবিরোধের কেন্দ্রবিন্দু নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মূলনীতি-নির্ধারকরা বলেছেন, “এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, কাফিরদেরকে ইমান আনয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” মুরজিয়াদের 'ইমান কেবল অন্তরের বিশ্বাস'-মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা উক্ত কথা বলেছেন। অথচ এটা সালাফদের মানহাজপরিপন্থি। এক্ষেত্রে এভাবে বললে সঠিক হতো যে, কাফিরদেরকে ইসলামের মূল তথা শাহাদাতাইন আনয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এ ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করেছেন।
দ্বিতীয় দিক : কাফিরদেরকে শরিয়তের শাখাপ্রশাখা পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিনা—এই মাসআলার পারলৌকিক ফলাফল। যেহেতু বিরোধীদের মতে বড়ো কুফরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ঘটে না, সেহেতু তারা বলে, (মূল ব্যতীত) ইসলামি শরিয়তের অন্যান্য দায়িত্ব কাফিরদের না থাকায় নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির কাফিরের পারলৌকিক শাস্তি (অন্য কাফিরদের থেকে) বেশি হবে না। কিছু উসুলবিদ উক্ত মতবিরোধের ওপর ভিত্তি করে দুনিয়াসম্পর্কিত শরয়ি বিধিবিধানের ক্ষেত্রে (আলোচ্য মাসআলার) ফলাফল নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু এই অবস্থান সঠিক নয়। কেননা বিরোধীরা স্রেফ পরকাল উদ্দেশ্য করেছে। আর (এক্ষেত্রে আলোচিত) দুনিয়ায় ধার্যকৃত বিধিবিধান কেবল এক শ্রেণির কাফিরের সাথে সম্পর্কিত। কিছু বিধান যুদ্ধরত কাফিরের সাথে সম্পর্কিত, অন্যদের সাথে নয়। আবার কিছু বিধান মুসলিম রাষ্ট্রে জিজিয়া (কর) প্রদান করে অবস্থানরত অমুসলিম নাগরিকের সাথে সম্পর্কিত। আবার কিছু বিধান স্রেফ ইসলাম ধর্ম ত্যাগকারী মুরতাদের সাথে সম্পর্কিত। আমি এই মাসআলা আমার 'আত-তাফরিক বাইনাল উসুলি ওয়াল ফুরু' কিতাবে বিশদভাবে আলোচনা করেছি।
টিকাঃ
১৭৮ আল-কুরআন, (সুরা নিসা) : ১৩৭।
১৭৯ আল-কুরআন (সুরা আলে ইমরান) : ৯০।
১৮০ অনুবাদকের টীকা : জাহেলি যুগের আরবরা চন্দ্রবছরের চারটি হারাম মাসকে নিজেদের সুবিধামতো নির্ধারণ করত। চারটি হারাম মাসে যেহেতু যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল তাদের মধ্যে, সেহেতু যুদ্ধের প্রয়োজনে তারা হারাম মাসকে পিছিয়ে দিত। যেমন মহরম মাসকে সফর মাস বানিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ করে সফর মাসকে মহরম ধরে নিত! আয়াতে তাদের এই কাজকে কুফরের মধ্যে কুফরি-বৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রষ্টব্য : আত-তাবারি, জামিউল বায়ান, খ. ১১, পৃ. ৪৪৯-৪৫০।
১৮১ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তাওবা) : ৩৭।
১৮২ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৫৬৪; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ২১০।
১৮৩ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১৪৫।
১৮৪ আল-কুরআন, ১৬ (সুরা নাহল): ৮৮।
১৮৫ অনুবাদকের টীকা : লেখক হাফিজাহুল্লাহ উসুলবিদদের মধ্যকার ইখতিলাফের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যদি কাফিররা শরিয়তের শাখাপ্রশাখা পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে এর ফলাফল স্রেফ পরকালে সীমাবদ্ধ কিনা সে বিষয়ে উসুলবিদগণ মতভেদ করেছেন। একদলের মতে, স্রেফ পরকালে সীমাবদ্ধ; অর্থাৎ শরিয়তের শাখাগত বিধান পালন না করার কারণে পরকালে শাস্তি হবে। আরেকদলের মতে, পরকালের পাশাপাশি দুনিয়াতেও এর ফলাফল রয়েছে। অর্থাৎ দুনিয়াতেও ইসলাম গ্রহণ করলে কাফিরদের ওপর বিভিন্ন বিধান আরোপিত হবে কুফুরির সময়ে তাদের কৃত আমলের ভিত্তিতে। যেমন কিছু ফাকিহর মতে, কাফির অবস্থায় 'হারাম নয়' এমন মানত করে থাকলে মুসলিম অবস্থাতেও সেই মানত আদায় করা অপরিহার্য থাকবে, কাফির অবস্থায় পরিত্যাগকৃত নামাজ মুসলিম হয়ে কাজা আদায় করতে হবে। দ্রষ্টব্য: সাদ বিন নাসির আশ-শাসরি, আত-তাফরিক বাইনাল উসুলি ওয়াল ফুরু (রিয়াদ: দারুল মুসলিম, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৫১-৬১।
১৮৬ আশ-শাসরি, আত-তাফরিক বাইনাল উসুলি ওয়াল ফুরু, খ. ১, পৃ. ২৮০।