📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 ৫.২ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : আমল ছাড়াই ইমান বিশুদ্ধ

📄 ৫.২ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : আমল ছাড়াই ইমান বিশুদ্ধ


পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে সুবিদিত হয়ে গেল, মুরজিয়াদের একটি অন্যতম বক্তব্য-ইমানের সাথে আমল না থাকলেও ইমান বিশুদ্ধ। তাই যখন বলা হবে, 'কাউকে কাফির বলা যাবে না, সে যা-ই বলে থাকুক না কেন এবং যা-ই করে থাকুক না কেন, কেবল (কুফরি) বিশ্বাসের কারণেই কাউকে কাফির বলা যাবে,' তখন উক্ত কথার কথকের জন্য বান্দার আমলবিহীন ইমানকেও সঠিক বলা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। ইতঃপূর্বে এই মতাদর্শকে বাতিল প্রমাণ করে দলিলপ্রমাণ পেশ করা হয়েছে।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর 'আল-ইমান' গ্রন্থে এসেছে, ইমাম শাফেয়ি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২০৪ হি.) বলেন, «وَكَانَ الْإِجْمَاعُ مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ وَمَنْ أَدْرَكْنَاهُمْ أَنَّ الْإِيمَانَ قَوْلُ وَعَمَلٌ وَنِيَّةٌ، لَا يُجْزِئُ وَاحِدٌ مِنَ الثَّلَاثَةِ إِلَّا بِالْآخَرِ».
“সাহাবিবর্গ, তাঁদের পরবর্তী তাবেয়িবৃন্দ এবং যাদেরকে আমরা পেয়েছি তাঁদের সবাই এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, ইমান হলো— কথা, কাজ এবং নিয়ত। এই তিনটির কোনো একটিও ইমানের জন্য অপরটি ব্যতিরেকে যথেষ্ট হবে না।”

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বলেছেন : “আমাদের পূর্ববর্তী সালাফগণ ইমান এবং আমলের মধ্যে পার্থক্য করতেন না। আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত, আবার ইমানও আমলের অন্তর্ভুক্ত। ইমান একটি সর্বব্যাপী নাম (যা নিজের মধ্যে পুরো ইসলামকে একত্রিত করে)-যেমন এসব ধর্মের নাম পুরো ধর্মকে শামিল করে-আর এই ইমানকে সত্যায়ন করে আমল। সুতরাং যে জবান দ্বারা ইমানের স্বীকৃতি দেয়, অন্তরে তা উপলব্ধি করে এবং তা আমলে বাস্তবায়ন করে, (তখন) তার সেই ইমান হয়ে যায় এমন সুদৃঢ় হাতলে, যা কখনো ভাঙবার নয়। আর যে জবান দ্বারা স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু সে অন্তরে তা উপলব্ধি করেনি এবং আমলে বাস্তবায়ন করেনি, সে অবশ্যই আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই ব্যাপারটি অসংখ্য সালাফ ও খালাফ থেকে সুবিদিত (প্রমাণিত)।”

ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মদ বিন নাসর রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৯৪ হি.) থেকে বর্ণনা করেছেন—এই উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, কোনো ব্যক্তি যদি হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উল্লিখিত ইমানের বৈশিষ্ট্যগুলো অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর উল্লেখকৃত ইসলামের বৈশিষ্ট্যাবলির ওপর আমল না করে, তাহলে তাকে মুমিন বলা যাবে না।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এখান থেকেই জাহম এবং তার অনুসারীদের বিশ্বাস-'বাহ্যিক ইমান ব্যতিরেকে (কেবল অন্তরের) ইমানই আখেরাতে উপকার বয়ে আনবে' যে ভ্রান্ত, তা প্রতিভাত হয়। আর এটা অসম্ভবও বটে।”

টিকাঃ
১১২ ইবনু তাইমিয়া, আল-ইমান, পৃ. ১৯৭।
১১৩ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৯৬।
১১৪ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ৩৩৬।
১১৫ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ৫৫৩।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 ৫.৫ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়

📄 ৫.৫ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়


মুরজিয়াদের নবোদ্ভাবিত একটি বিদাতি আকিদা হলো-আমল তাদের মতে ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা বলে, “যদি আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে পাপীদেরকে কাফির বলা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে যায়। কেননা ইমান যদি কথা ও কাজের সমষ্টিই হত, তাহলে ইমানের কিছু অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পুরোটাই বিলুপ্ত হয়ে যেত।”

শরিয়তের অসংখ্য দলিল থেকে প্রতীয়মান হয়, আমল ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ইমানকে ব্যর্থ করে দেবেন।”

অর্থাৎ তোমাদের সালাত (ব্যর্থ করে দেবেন না)। মুসলিম সাহাবিগণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'কাবা পরিবর্তিত হওয়ার পূর্বে যারা মারা গেছেন, তাঁদের নামাজের কী হবে?” তখন এই আয়াতটি নাজিল হয়। যেমনটি সহিহ বুখারিতে বারা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন :

“মুমিন তো তারাই, আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় প্রকম্পিত হয়, তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ইমান বাড়িয়ে দেয় এবং তারা তাদের রবের ওপরই ভরসা করে। যারা (যথাযথভাবে) নামাজ আদায় করে এবং আমরা তাদেরকে যেই রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই তো প্রকৃত মুমিন। তাদের রবের কাছে তাদের জন্যই রয়েছে মর্যাদাসমষ্টি, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।”

এখানে পূর্ণ ইমানের অধিকারী মুমিনবর্গ হিসেবে আল্লাহ তাদেরকে সাব্যস্ত করেছেন, যারা এসমস্ত আমলের গুণে গুণান্বিত। মহান আল্লাহ বলেছেন :

“নিশ্চয় সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা তাদের নামাজে ভীত-বিনীত, যারা অনর্থক ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে। যারা জাকাত দানে সক্রিয়। যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। সুতরাং কেউ এদেরকে ছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। আর যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা নিজেদের নামাজে যত্নবান থাকে। তারাই হবে উত্তরাধিকারী। উত্তরাধিকারী হবে ফিরদাউসের; যাতে তারা হবে চিরস্থায়ী।”

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারাই তো মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ইমান এনেছে, তারপর সন্দেহ পোষণ করেনি এবং তাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই তো সত্যনিষ্ঠ।”

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন : “শুধু তারাই আমার আয়াতসমূহের প্রতি ইমান আনে, যারা সেসবের দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হলে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে, আর তারা অহংকার করে না। তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা হতে দূরে থাকে, তারা তাদের রবকে ডাকে শঙ্কা ও আশা নিয়ে এবং আমরা তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।”

'আস-সহিহ' গ্রন্থে এসেছে, ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল কাইস গোত্রের প্রতিনিধিদলের উদ্দেশে করেছিলেন : «آمُرُكُمْ بِالإِيْمَانِ بِاللهِ هَلْ تَدْرُونَ مَا الإِيْمَانُ بِاللَّهِ شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَقَامُ الصَّلَاةِ وَإِيْتَاءُ الزَّكَاةِ وَصَوْمُ رَمَضَانَ وَأَنْ تُعْطُوا مِنَ الْمَغَانِمِ الْخُمُسَ».
"আমি তোমাদেরকে আল্লাহর প্রতি ইমান আনার নির্দেশ দিচ্ছি। তোমরা কি জান, আল্লাহর প্রতি ইমান আনা কাকে বলে? তা হলো, 'আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই'- এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ পড়া, জাকাত দেওয়া, রমজানের রোজা রাখা এবং গনিমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ (রাষ্ট্রীয় কোষাগারে) জমা দেওয়া।” নবিজি এখানে আমলকে ইমানের পরিচয়ভুক্ত করেছেন। কেউ যেন আবার বলে না বসে, 'এখানে তো অন্তরের বিষয় উল্লেখ করা হলো না!' কেননা অন্তরের ব্যাপারটি সুবিদিত বিষয়ের অন্তর্গত, বিধায় তা (আলাদাভাবে) উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়নি

'আস-সহিহ' গ্রন্থে এসেছে, আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ».
“ইমানের শাখা সত্তরটিরও কিছু বেশি অথবা ষাটটির কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে- 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ‘সত্য উপাস্য নেই)’ এ কথা বলা এবং এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা ইমানের একটি বিশেষ শাখা। "

সুনানু আবি দাউদে উত্তম সনদে বর্ণিত হয়েছে, আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الإِيمَانَ». “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঘৃণা করবে; আর আল্লাহর জন্য দান করবে এবং দান করা থেকে বিরতও থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সে ব্যক্তি তার ইমানকে পরিপূর্ণ করেছে।”

সুনান গ্রন্থে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ». “(প্রকৃত) মুমিন তো সেই ব্যক্তি, লোকেরা তাদের জান ও মালের বিষয়ে যে ব্যক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারে।”

মুরজিয়াদের দাবি অনুযায়ী 'ইমানের মধ্যে আমলকে প্রবেশ করালে, কিছু আমল বিলুপ্ত হওয়ার দরুন পুরো ইমানেরই বিলোপসাধন অপরিহার্য হয়ে যায়'-এমন কথা সঠিক নয়। কেননা গাছের ডালপালা গাছেরই অংশ, কিন্তু সেগুলো বিলুপ্ত হলে গাছের নাম বিলুপ্ত হওয়া অপরিহার্য সাব্যস্ত হয় না।

হয়তো তারা এই দলিল পেশ করবে যে, আল্লাহ তো আমলকে ইমানের সাথে বা ইমানের ওপর আত্ফ (সংযোজন) করেছেন, তিনি বলেন, “নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে।” আর (আরবি ভাষায়) আত্ফ— ‘সংযোজনকৃত দুটি বিষয় যে আলাদা’, সেটার দাবি করে।

এর জবাব হলো, এটা খাসকে আমের সাথে আত্ফ্ফ করার অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে, ভালো আমল করেছে, নামাজ আদায় করেছে এবং জাকাত দিয়েছে।”

নিঃসন্দেহে নামাজ আদায় করা এবং জাকাত প্রদান করা ভালো কর্মাবলির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান এনেছে এবং ভালো আমল করেছে, আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের।” হকের উপদেশ দেওয়া ভালো আমলের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু খাসকে আমের সাথে আল্ফ করা আরবদের ভাষায় সিদ্ধ।

যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা নামাজসমূহকে হেফাজত করবে, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাজকে।”

তিনি আরও বলেন, “যে কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর রসুলগণ এবং জিবরিল ও মিকাইলের শত্রু হবে, (সে যেন জেনে রাখে) নিশ্চয় আল্লাহ হলেন কাফিরদের শত্রু।”

তিনি আরও বলেন, “আর স্মরণ করুন, যখন আমরা নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকেও, আর নুহ থেকেও।”

তিনি আরও বলেছেন, “সেখানে (জান্নাতে) রয়েছে ফলমূল এবং খেজুর ও আনার।”

যারা ইমান থেকে আমলকে খারিজ করে দেয়, তারা মূলত দু শ্রেণির লোক। তাদের কেউ কেউ বলে, 'ইমান এবং আমলের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।' পূর্বোদ্ধৃত দলিলগুলো সুস্পষ্টভাবে তাদের এ মতটিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বাতিল সাব্যস্ত করে। আবার তাদের কেউ কেউ বলে, 'এই দুটি বিষয় পরস্পরের জন্য অপরিহার্য।' এরাই হলো মুরজিয়াতুল ফুকাহা। আবার তাদের কেউ কেউ বলে, 'মুরজিয়াতুল ফুকাহা এবং আহলুস সুন্নাহর মধ্যকার মতপার্থক্য হলো শাব্দিক মতপার্থক্য।

কেননা আহলুস সুন্নাহ আমলকে ইমানেরই অংশ মনে করে, আর মুরজিয়াতুল ফুকাহারা আমলকে ইমানের জন্য আবশ্যক মনে করে। কিন্তু সমকালীন মুরজিয়াদের কথা মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেননা সমকালীন মুরজিয়া গোষ্ঠী আমলের কারণে কাফির সাব্যস্ত করে না। পক্ষান্তরে মুরজিয়াতুল ফুকাহারা বলে, 'কোনো কিছুর অপরিহার্য বিষয়ের অস্তিত্ব না থাকলে তা থেকে প্রতীয়মান হয়, মূল বিষয়টিরও অস্তিত্ব নেই (انتفاء اللازم يدل على انتفاء الملزوم)। সে যাই হোক, মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের কথা সেসকল দলিলবিরোধী—ইতঃপূর্বে যেসব দলিলের কিছু উল্লিখিত হয়েছে—যে দলিলগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, আমল ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের বক্তব্য মূলত ভুল কথা; তাদের কেউ কেউ এই মতানৈক্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ফলাফলও উল্লেখ করেছেন।

টিকাঃ
১২৩ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১৪৩।
১২৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৪৪৮৬; সুনানু আবি দাউদ, হা. ৪৬৭৯।
১২৫ আল-কুরআন, ৮ (সুরা আনফাল) : ২-৪।
১২৬ আল-কুরআন, ২৩ (সুরা মুমিনুন): ১-১১।
১২৭ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত): ১৫।
১২৮ আল-কুরআন, ৩২ (সুরা সাজদা) : ১৫-১৬।
১২৯ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৪৩৬৮; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৭।
১৩০ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৯; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৩৫।
১৩১ সুনানু আবি দাউদ, হা. ৪৬৮১; সুনানুত তিরমিজি, হা. ২৫২৩, সনদ : সহিহ।
১৩২ তিরমিজি, হা. ২৬২৯, সনদ : সহিহ।
১৩৩ আল-কুরআন, ১৯ (সুরা মারিয়াম): ৯৬।
১৩৪ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৭৭।
১৩৫ আল-কুরআন, ১০৩ (সুরা আসর) : ৩।
১৩৬ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৩৮।
১৩৭ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ৯৮।
১৩৮ আল-কুরআন, ৩৩ (সুরা আহজাব) : ৭।
১৩৯ আল-কুরআন, ৫৫ (সুরা রহমান): ৬৮।
১৪০ “যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বলেছেন, যেমনটি উল্লিখিত হয়েছে 'মাজমুউল ফাতাওয়ায়' (খ. ৭; পৃ. ২৯৭ ও ৫৭৫) এবং ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি বলেছেন 'শারহুত তাহাবিয়ায়' (পৃ. ৩০৯; তাহকিক : আরনাউত)।” আমি (অনুবাদক) বলছি, শাইখ শাসরি বিরচিত বক্ষ্যমাণ ইরজা বিষয়ক আরবি বইয়ের টীকায় এভাবেই রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে, যেমনটি আমরা দ্বৈত উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতরে উল্লেখ করেছি। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি শাইখ শাসরির লেকচার থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে। উক্ত টীকা শাইখ নিজেই লিখেছেন কিনা সেটা আমরা অবগত হতে পারিনি। যাহোক, শাইখুল ইসলামের ব্যাপারে আমভাবে এরকম কথা বলা সঠিক নয়। কেননা শাইখুল ইসলাম নিজেই এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের সাথে আহলুস সুন্নাহর মতভেদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্রেফ শাব্দিক মতভেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আহলুস সুন্নাহর সাথে তাদের সমুদয় মতভেদকে শাব্দিক মতভেদ বলেননি। দ্রষ্টব্য: আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালিম ইবনু তাইমিয়া আল-হারানি, শারহুল আকিдатিল আসফাহানিয়্যা, তাহকিক : মুহাম্মাদ বিন রিয়াদ আল-আহমাদ (বৈরুত : আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৫ হি.), পৃ. ১৯১; ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৯৭। শাইখ শাসরির বইয়ের টীকায় ইবনু তাইমিয়া থেকে যেই রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে ক্রসচেক করে আমরা দেখেছি, তিনি অধিকাংশ মতভেদকে শাব্দিক বলেছেন, সকল মতভেদকে শাব্দিক বলেননি। আল্লাহুল মুস্তাআন। তদুপরি শাইখুল ইসলাম যে মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের সাথে আহলুস সুন্নাহর সকল মতভেদকে শাব্দিক বলেননি, এই বিশ্লেষণ প্রমাণ সহকারে আলোকপাত করেছেন বিশিষ্ট আকিদাবিশারদ শাইখ সুলতান আল-উমাইরি হাফিজাহুল্লাহ, আকিদাবিশারদ শাইখ মুহাম্মাদ আলু খুদাইর হাফিজাহুল্লাহ, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সায়িদ আল-কুসাইরি প্রমুখ। দ্রষ্টব্য : সুলতান বিন আব্দুর রহমান আল-উমাইরি, আল-উকুদুজ জাহাবিয়্যা আলা মাকাসিদিল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা (সৌদি আরব : দারু মাদারিজ, ২য় প্রকাশ, ১৪৪২ হি./২০২১ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৩৫২-৩৫০৩; মুহাম্মাদ বিন মাহমুদ আলু খুদাইর, আল-ইমান ইনদাস সালাফ ওয়া আলাকাতুহু বিল আমাল ওয়া কাশফু শুবুহাতিল মুআসিরিন (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রুশদি নাশিরুন, ৩য় প্রকাশ, ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ২৩৬-২৩৮; মুহাম্মাদ বিন সায়িদ আল-কুসাইরি, বারাআতু আহলিল হাদিসি ওয়াস সুন্নাহ মিন বিদআতিল মুরজিআহ (রিয়াদ: দারুল মুহাদ্দিস, ১ম প্রকাশ, ১৪২৬ হি.), পৃ. ২৫৯-২৬৪। উল্লেখ্য, শাব্দিক মতভেদ মানে উভয়পক্ষের দাবি এক ও অভিন্ন, কিন্তু দাবির শব্দচয়ন আলাদা। আর ইমাম ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি রাহিমাহুল্লাহ বাস্তবেই আহলুস সুন্নাহর সাথে মুরজিয়াতুল ফুকাহার মতভেদকে শাব্দিক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য বাস্তবতার বিপরীত এবং মুহাক্কিক উলামাগণ কর্তৃক সমালোচিত। কেননা মুরজিয়াতুল ফুকাহারা যতই আমলকে জরুরি মনে করুক না কেন, তারা আমলকে ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত বলে মানে না। এজন্য সালাফগণ সমুদয় আমল পরিত্যাগকারীকে কাফির বললেও তারা সমুদয় আমল পরিত্যাগকারীকে কাফির বলে না। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, আহলুস সুন্নাহর সাথে মুরজিয়াতুল ফুকাহার মতভেদ হাকিকি তথা প্রকৃত মতভেদ; এগুলো শাব্দিক মতভেদ নয়। এজন্য ইমাম ইবনু আবিল ইজের আলোচ্য দাবির সমালোচনা করেছেন ইমাম ইবনু বাজ রাহিমাহুল্লাহ, ইমাম আলবানি রাহিমাহুল্লাহ, আল্লামা সালিহ আলুশ শাইখ হাফিজাহুল্লাহর মতো মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম। দ্রষ্টব্য: আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজ, আত-তালিকাতুল বাজিয়্যা আলা শারহিত তাহাউয়িয়্যা (রিয়াদ : দারু ইবনিল আসার, ১ম প্রকাশ, ১৪২৯ হি./২০০৮ খ্রি.), পৃ. ৭৫১; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, আল-আকিদাতুত তাহাবিয়্যা শারহ ওয়া তালিক (রিয়াদ : মাকতাবাতুল মাআরিফ, প্র. ১৪২২ হি./২০০১ খ্রি.), পৃ. ৬৬-৬৯; সালিহ বিন আব্দুল আজিজ আলুশ শাইখ, আল-লাআলিল বাহিয়্যাহ ফি শারহিল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যাহ (রিয়াদ : দারুল আসিমাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪৩১ হি./২০১০ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৪০৫-৪০৬।
১৪১ অনুবাদকের টীকা: এটি একটি সুসাব্যস্ত মূলনীতি, যা বিশুদ্ধ আকল দ্বারা প্রমাণিত। যে বিষয়ের অপরিহার্য বিষয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই, সেই মূল বিষয়টিও তখন অস্তিত্বহীন বলে ধরে নেওয়া হবে। যেমন সূর্যোদয়ের অপরিহার্য বিষয় হলো দিনের অস্তিত্ব; যদি দিনের অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে তা থেকে প্রমাণিত হবে, সূর্য উদিত হয়নি। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : আব্দুল কারিম বিন মুরাদ আল-আসারি, তাসহিলুল মানতিক (কায়রো : দারু মিসর, প্রকাশের ক্রমধারাবিহীন, তাবি), পৃ. ৫৩; মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি, আদাবুল বাহসি ওয়াল মুনাজারা, তাহকিক : সাউদ বিন আব্দুল আজিজ আল-আরিফি (রিয়াদ : দারু আতাআতিল ইলম, ৫ম প্রকাশ, ১৪৪১ হি./২০১৯ খ্রি.), পৃ. ১৩০; জাহরান কাদা, আল-ওয়াসিত ফিল মানতিক (তিউনিস : দারুল ইমামিল মাজিরি, ২য় প্রকাশ, ১৪৪৩ হি./২০২১ খ্রি.), পৃ. ৩৯৫-৩৯৬; আবু হামিদ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আল-গাজালি, আল-মুস্তাসফা, তাহকিক : মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম আব্দুশ শাফি (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৩ হি./১৯৯৩ খ্রি.), পৃ. ৩৪ ও ১৬৩; নাজমুদ্দিন আবুর রাবি সুলাইমান বিন আব্দুল কাউয়ি আত-তুফি, শারহু মুখতাসারির রওদা, তাহকিক : আব্দুল্লাহ আত-তুর্কি (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালা, ১ম প্রকাশ, ১৪০৭ হি./১৯৮৭ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১৬৮। আলোচ্য কথার মাধ্যমে সম্মাননীয় লেখক (শাইখ শাসরি) দাবি করছেন, মুরজিয়াতুল ফুকাহারা আমলকে ইমানের অংশ মনে না করলেও আমলকে ইমানের অপরিহার্য বিষয় মনে করে; ফলে কোনো বান্দার আমল না থাকলে তার ইমানের অস্তিত্বও নাই বলে সাব্যস্ত হয়। কিন্তু মুরজিয়াতুল ফুকাহারা যে এমন আকিদা রাখত, তা সুনিশ্চিতভাবে বলার পক্ষে আমরা কোনো দলিল পাইনি। বরং আমরা দেখতে পাই, মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের অন্যতম ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর মাজহাব অনুযায়ী, সকল আমল পরিত্যাগকারী কাফির নয়। পরবর্তী যুগে আগত হানাফিদের যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (মৃ. ১৩৫২ হি.) বলেছেন, “আমাদের ইমাম আজম রাহিমাহুল্লাহ এবং অধিকাংশ ফাকিহ ও মুতাকাল্লিমের (তথাকথিত ইসলামি দার্শনিক) মতে, আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে তাঁরা সবাই (আহলুল হাদিস ও আবু হানিফার অনুসারীবৃন্দ) একমত ছিলেন, তাসদিক তথা সত্যায়ন পরিত্যাগকারী কাফির, আর সমুদয় আমল পরিত্যাগকারী ফাসিক (পাপী মুসলিম)!” দ্রষ্টব্য: মুহাম্মাদ আনওয়ার বিন মুআজ্জাম শাহ আল-কাশ্মিরি, ফাইদুল বারি আলা সহিহিল বুখারি, তাহকিক : মুহাম্মাদ বদর আলম মিরাঠী (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৬ হি./২০০৫ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫৩-৫৪। বিশিষ্ট সালাফি আকিদাবিশারদ শাইখ সুলতান আল-উমাইরি হাফিজাহুল্লাহ, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সায়িদ আল-কুসাইরি প্রমুখ মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের আকিদা নিরূপণ করার সময় এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, তারা সকল আমল পরিত্যাগ করাকে কুফর মনে করে না। দ্রষ্টব্য : আল-উমাইরি, আল-উকুদুজ জাহাবিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৫৩; আল-কুসাইরি, বারাআতু আহলিল হাদিস, পৃ. ২৬১-২৬২।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 ৫.৬ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : মানুষ মুমিন কিনা সেটা তার মৃত্যু কী হিসেবে হচ্ছে, তার ওপর নির্ভরশীল

📄 ৫.৬ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : মানুষ মুমিন কিনা সেটা তার মৃত্যু কী হিসেবে হচ্ছে, তার ওপর নির্ভরশীল


মুরজিয়াদের কেউ কেউ বলে, “মানুষ মুমিন কিনা সেটা তার মৃত্যু কী হিসেবে হচ্ছে, তার ওপর নির্ভরশীল।” অর্থাৎ, মানুষ যে বিশ্বাসে বিশ্বাসী থাকা অবস্থায় মারা যায়, তাকে সেই বিশ্বাসের লোক হিসেবেই ধরে নেওয়া হবে। সুতরাং আল্লাহর অগ্রগামী জ্ঞান অনুযায়ী ব্যক্তি যে হিসেবে মারা যাবে, সে হিসেবেই সে মুমিন বা কাফির সাব্যস্ত হবে।

তারা বলে, যে ব্যক্তি ইমানের ওপর থাকার পরে কুফরি করে বসে এবং ওই কুফরের ওপরই মারা যায়, তার 'কুফরপূর্ব সেই ইমান' মূলত ইমানই না। যেমন নামাজ শেষ হওয়ার আগেই নামাজ-আদায়কারী স্বীয় নামাজকে নষ্ট করে ফেললে, তার ওই (নষ্ট করে ফেলা) নামাজকে 'নামাজ' বলা হয় না। এজন্য যে ব্যক্তি জীবনভর ইসলামের সাথে শত্রুতা করে, মুসলিমদের কষ্ট দেয় এবং মৃত্যুর কিছুপূর্বে সে ইসলাম গ্রহণ করে; তার ব্যাপারে তারা বলে, সে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বদাই আল্লাহর নিকটে প্রিয়ভাজন মুমিন বান্দা ছিল।

এটা সম্পূর্ণ বাতিল কথা; শরয়ি দলিলসমগ্র এই কথাকে প্রত্যাখ্যান করে। যেসব দলিল থেকে প্রতীয়মান হয়, একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময়ে মুমিন থাকলেও পরে আরেকসময় কাফিরও হতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনার পর কাফির হয়েছে, অতঃপর কুফরকে পরিবর্ধিত করেছে, তাদের তওবা কখনোই গৃহীত হবে না এবং তারাই পথভ্রষ্ট।”

তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে, তারপর কাফির হয়, এরপর পুনরায় ইমান আনে, এবং আবার কাফির হয়, অনন্তর কুফরকে পরিবর্ধিত করে; আল্লাহ তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে পথপ্রদর্শন করবেন না।”

তিনি আরও বলেন, “এটা এ জন্য যে, তারা ইমান এনেছে, এরপর কাফির হয়েছে; ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে (সেখানে হেদায়েত পৌঁছবে না)।”

তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা ইমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ।”

মুরজিয়াদের এই মতবাদ উদ্ভূত হওয়ার কারণ—তারা আল্লাহর 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়্যা' অস্বীকার করে। তারা আল্লাহর সেসব সিফাতের একককে স্বীকার করে না, যে সিফাতগুলো 'কোনো একসময় না থাকার পরে' নতুন করে সংঘটিত হয়। যেমন কথা ও শ্রবণ সিফাতের একক।

কারণ (তারা মনে করে, সিফাতে ইখতিয়ারিয়‍্যার স্বীকৃতি) আল্লাহর সত্তায় 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়াবলি' থাকাকে (حلول الحوادث) অপরিহার্য করে। এজন্য আমরা দেখি, তারা বলে থাকে, বিশ্বজগৎ হলো মুহদাস তথা নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া বিষয়; আর নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া প্রতিটি বিষয়ই সৃষ্ট। আর প্রত্যেক সৃষ্ট জিনিসের সৃষ্টিকর্তা থাকা অপরিহার্য। এই (দার্শনিক) প্রমাণই এ সম্প্রদায়ের পথভ্রষ্ট হওয়ার মূল কারণ; অথচ তাদের কারও কারও ধারণা, এই প্রমাণ ছাড়া আল্লাহকে চেনাই যায় না!

উক্ত প্রমাণ (দার্শনিক যুক্তি) অনুযায়ী সিফাতে ইখতিয়ারিয়‍্যার এককগুলো সৃষ্ট হওয়া জরুরি হয়ে যায়; কেননা এগুলো মুহদাস তথা নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া বিষয়। অথচ সন্দেহাতীতভাবে মহান আল্লাহ যেকোনো সময় নিজে যা ইচ্ছে করেন, সেটাই করে থাকেন। সুতরাং যখন ইচ্ছে তিনি কথা বলেন। যেমন সালাফগণ বলেছেন, “তিনি সর্বদা কথা বলার গুণে গুণান্বিত থাকেন।” কুরআনে এ বিষয়ের পক্ষে শতাধিক আয়াত রয়েছে এবং সুন্নাহয় তার কয়েকগুণ প্রমাণ রয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর সেদিন (আল্লাহ) তাদেরকে ডেকে বলবেন, তোমরা রসুলদেরকে কী জবাব দিয়েছিলে?”

মহান আল্লাহ ডাক দেওয়ার বিষয়টিকে নির্ধারিত করেছেন সুনির্দিষ্ট একটি দিনে।

তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন, সেটাই হুকুম করে থাকেন।” আল্লাহ তাঁর হুকুমকে স্বীয় ইচ্ছের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি আরও বলেন, “তাঁর ব্যাপারতো শুধু এই যে, যখন তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছে করেন, তখন বলেন, 'হও', ফলে তা হয়ে যায়।” তিনি আরও বলেন, “যখন তারা আমাকে অতিশয় ক্রোধান্বিত করল, তখন আমি তাদেরকে শাস্তি দিলাম।” তিনি আরও বলেছেন, “(হে রসুল) আল্লাহ সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করেছে।”

হাদিসে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, «هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمُ اللَّيْلَةَ».
“তোমরা কি জানো, তোমাদের প্রভু গতরাতে কি বলেছেন?”

বিরোধীরা (দর্শনভিত্তিক আকিদাচর্চাকারীরা) এই মাসআলা না বোঝার কারণে বলে, ইবনু তাইমিয়া বিশ্বজগতকে 'কদিম (সূচনাবিহীন আদি)' বলেছেন। কেননা তিনি 'হাওয়াদিস (নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া বিষয়াবলি)' সাব্যস্ত করেছেন, যেগুলোর কোনো সূচনা নেই। শাইখের (ইবনু তাইমিয়ার) এ জাতীয় বক্তব্যে উল্লিখিত 'হাওয়াদিস' কোনো সৃষ্ট জিনিস না; বরং তাঁর বক্তব্যে 'হাওয়াদিস' হলো সিফাতে ইখতিয়ারিয়‍্যা। এর ব্যাখ্যা বিস্তারিত আলোচনাসাপেক্ষ, যা এখানে করা সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

টিকাঃ
১৪২ অতএব মুরজিয়াদের আকিদা অনুযায়ী যদি মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে মনে করতে হবে, সারাজীবন সে মুমিনই ছিল; তদ্রুপ কাফির অবস্থায় মারা গেলে মনে করতে হবে, সে সারাজীবন আসলে কাফিরই ছিল। – অনুবাদক।
১৪৩ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান) : ৯০।
১৪৪ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১৩৭।
১৪৫ আল-কুরআন, ৬৩ (সুরা মুনাফিকুন): ৩।
১৪৬ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তাওবা) : ৬৬।
১৪৭ অনুবাদকের টীকা : মহান আল্লাহর ইচ্ছে ও ক্ষমতা অনুযায়ী তাঁর যেসব গুণ তাঁর সত্তায় থাকে, সেসব গুণকে 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়‍্যা' বলে। যেমন তাঁর কথা, শোনা, দেখা, ইচ্ছে করা, ভালোবাসা, সন্তুষ্ট হওয়া, অসন্তুষ্ট হওয়া, দয়া, ক্রোধ, সৃষ্টি করা, ন্যায়পরায়ণতা করা, আরশের ওপর আরোহণ, তাঁর আগমন, অবতরণ ইত্যাদি 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়‍্যা'। এসব সিফাতের একক আল্লাহর ইচ্ছে অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে হয়ে থাকে। দ্রষ্টব্য : ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৬, পৃ. ২১৭।
১৪৮ অনুবাদকের টীকা: আল্লাহর যত কর্মর্গত গুণ বা বৈশিষ্ট্য আছে, সবগুলো বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সালাফদের আকিদা ছিল, এগুলো সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (এসবের) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় এগুলো 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। এর মানে মহান আল্লাহ এসব বৈশিষ্ট্য কোনো একটা সময়ে অর্জন করেছেন, বিষয়টা এমন নয়; বরং সূচনাহীন অতীত থেকে আল্লাহ সর্বদাই এসব গুণে গুণান্বিত হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহান আল্লাহর এসব গুণ সুপ্রাচীন, যার কোনো শুরু নেই। পক্ষান্তরে আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেন, তখন এসব বৈশিষ্ট্যের একক সংঘটন করেন। যেমন আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন মুসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছেন, আবার যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন প্রিয় নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলেছেন। এভাবে তিনি অনেকের সাথে কথা বলেছেন। এগুলো একেকটি একক এবং তাঁর কথার অংশ। এসব একক তো আর সুপ্রাচীন নয়, যার কোনো শুরু নেই। বরং এসব বিষয় বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে এবং প্রত্যেকটি এককের শুরু আছে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ জাতীয় কর্মগত গুণ 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। দ্রষ্টব্য: আব্দুর রহমান বিন নাসির আলু সাদি, আত-তাম্বিহাতুল লাতিফা ফিমা ইহতাওয়াত আলাইহিল ওয়াসিতিয়্যাতু মিনাল মাবাহিসিল মুনিফা (রিয়াদ : দারু তাইবা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৪ হি.), ৪৮।
১৪৯ আল-কুরআন, ২৮ (সুরা কাসাস): ৬৫।
১৫১ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা) : ১।
১৫২ আল-কুরআন, ৩৬ (সুরা ইয়াসিন) : ৮২।
১৫৩ আল-কুরআন, ৪৩ (সুরা জুখরুফ): ৫৫।
১৫৪ আল-কুরআন, ৫৮ (সুরা মুজাদিলা) : ১।
১৫৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১০৩৮; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৭১।
১৫৬ অনুবাদকের টীকা : ইবনু তাইমিয়া বুঝিয়েছেন, মহান আল্লাহর 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়‍্যা' সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (এসবের) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় এগুলো 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। এই মূলনীতির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা কিছুপূর্বে টীকার মধ্যে আলোচিত হয়েছে।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 ৫.৭ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : ইমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না

📄 ৫.৭ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : ইমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না


মুরজিয়ারা আরও বলে, “সত্তাগতভাবে ইমান কেবল একটিমাত্র বিষয়। ইমানের বৃদ্ধি ঘটে, এমনটি কল্পনাও করা যায় না। তবে ইমানের যেসব শাখা-প্রশাখার প্রতি বান্দা ইমান আনে, সেসবের দৃষ্টিকোণ থেকে ইমান বাড়ে; এবং ইমানের যে সময়কাল বৃদ্ধি হয়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ইমান বাড়ে।” এজন্য তাদের কেউ কেউ বলে, "আমার ইমান আবুবকর-ওমরের মতো, এমনকি জিবরাইল-মিকাইলের মতো!”

অথচ শরয়ি দলিলগুলো এই বিদাতি কথাকে সুস্পষ্টভাবে খণ্ডন করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন, যেন তারা তাদের ইমানের সাথে ইমান বৃদ্ধি করে নেয়।” এ আয়াত অনুযায়ী প্রশান্তি অবতীর্ণ হলে কি 'যে বিষয়ের প্রতি ইমান আনা হয় এমন শাখা-প্রশাখা' বৃদ্ধি পায়, কিংবা ইমানের সময়কাল বৃদ্ধি পায়? আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আমি ফেরেশতাদেরকে করেছি জাহান্নামের প্রহরী। আমি কাফিরদেরদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ তাদের এই সংখ্যা উল্লেখ করেছি। যাতে কিতাবধারীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে এবং ইমানদারদের ইমান বেড়ে যায়।”

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, “আর যখন কোনো সুরা অবতীর্ণ করা হয়, তখন কেউ কেউ বলে, ‘এই সুরা তোমাদের মধ্যে কার ইমান বৃদ্ধি করল?’ যেসব লোক ইমান এনেছে, এই সুরা তাদের ইমানকে বৃদ্ধি করেছে এবং তারাই হয়েছে আনন্দিত।”

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের বিরুদ্ধে মানুষজন সমবেত হয়েছে, অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো।’ কিন্তু এতে তাদের ইমান বেড়ে গিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।”

এই আয়াতগুলো তাদের কথার-ইমান কেবল একটিমাত্র বিষয়-খণ্ডনে সবচেয়ে বড়ো দলিলগুলোর অন্যতম।

মহান আল্লাহ বলেন, “মুমিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, তখন তারা বলে উঠল, 'এটা তো সেই বিষয়, আল্লাহ ও তাঁর রসুল যার প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দিয়েছেন। আর আল্লাহ ও তাঁর রসুল সত্যই বলেছিলেন।' এতে তাদের ইমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল।”

মহান আল্লাহ আরও বলেন, “আর যখন ইবরাহিম বলেছিল, 'হে আমার রব, আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে প্রদর্শন করুন।' তিনি বললেন, 'তাহলে কি তুমি (এর প্রতি) ইমান রাখ না?' সে বলল, 'জি, অবশ্যই (ইমান রাখি)। কিন্তু (আমি এটা চাইছি) যাতে আমার অন্তর প্রশান্ত হয় (ইমান বৃদ্ধি পায়)।'”

বুখারি-মুসলিমে আবু সায়িদ খুদরি থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ» “জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, 'যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ইমান আছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করো'।”

বুখারি-মুসলিমে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «وَيُقَالُ لِلرَّجُلِ مَا أَعْقَلَهُ وَمَا أَطْرَفَهُ وَمَا أَجْلَدَهُ وَمَا فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ» “(কেয়ামতের আগে লোকেরা বলাবলি করবে, অমুক বংশে একজন আমানতদার লোক আছে)। সে ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হবে, সে কতইনা বুদ্ধিমান, কতইনা অবিচল, আর কতইনা বিবেকবান? অথচ তার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ ইমানও থাকবে না।”

সমুদয় সাহাবি ইমানের ক্ষেত্রে 'বৃদ্ধি হওয়া'-শব্দ প্রয়োগ করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। আর আবু দারদা, আবু হুরাইরা ও উমাইর বিন হাবিব আল-খাতমি থেকে, 'ইমান হ্রাস পাওয়া' শীর্ষক শব্দের ব্যবহার বর্ণিত হয়েছে।

মূলত মুরজিয়ারা যে বলে, ইমানের কোনো কমবেশি হয় না; তার কারণ, তারা বিশ্বাস করে, অকাট্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের স্তর কেবল একটা। অথচ এই মতবাদ বাতিল; কুরআন-সুন্নাহ এই মতবাদকে প্রত্যাখান করে।

সহিহ বুখারিতে আম্মিজান আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «إِنَّ أَتْقَاكُمْ وَأَعْلَمَكُمْ بِاللَّهِ أَنَا». “আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখি এবং আমিই তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।” এখানে নবিজি আল্লাহসম্পর্কিত জ্ঞানের অস্তিত্বে মর্যাদাগত তারতম্য সাব্যস্ত করেছেন (সাব্যস্ত করেছেন, আল্লাহসম্পর্কিত জ্ঞান কারও কম, আবার কারও বেশি)। এখানে যেসব বিষয় সম্পর্কে জানা হয়, সেসব বিষয়ের আধিক্যের ক্ষেত্রে মর্যাদাগত তারতম্য উদ্দেশ্য করা হয়নি।

এ বিষয়ে (আমাদের কথার পক্ষে) আরও প্রমাণ হলো—আল্লাহ তায়ালা যখন মুসা আলাইহিস সালামকে জানালেন, তার কওম গোবৎস পূজা করছে, তখন তিনি সেকথা অকাট্যভাবে বিশ্বাস করলেন; কেননা এটা আল্লাহর দেওয়া সংবাদ। এরপর তিনি তার স্বজাতির কাছে ফিরে গিয়ে যখন বিষয়টি স্বচক্ষে দেখেন, তখন তাঁর ইলম বেড়ে যায় এবং আল্লাহর কথায় অকাট্যভাবে বিশ্বাস করেন। তারপর তিনি (তাঁর হাতে থাকা) ফলকসমূহ নিক্ষেপ করেন। যেমনভাবে হাদিসে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لَيْسَ الْخَبَرُ كَالْمُعَايَنَةِ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى أَخْبَرَ مُوسَى بِمَا صَنَعَ قَوْمُهُ فِي الْعِجْلِ فَلَمْ يُلْقِ الْأَلْوَاحَ فَلَمَّا عَايَنَ مَا صَنَعُوا أَلْقَى الْأَلْوَاحَ».
“খবর শোনা চাক্ষুষ দেখার মতো নয়। নিশ্চয়ই মুসা আলায়হিস সালামের সম্প্রদায়ের গোবৎস পূজা সম্পর্কে মহান আল্লাহ মুসা আলায়হিস সালামকে যে সংবাদ দিয়েছেন, এতে তিনি হাতে সংরক্ষিত তাওরাতের ফলকসমূহ ফেলে দেননি, কিন্তু যখন তাদের মধ্যে গিয়ে চাক্ষুষ তাদের কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখলেন, তখন ফলকসমূহ ছুঁড়ে ফেললেন।”

মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর যখন ইবরাহিম বলেছিল, 'হে আমার রব, আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে প্রদর্শন করুন।' তিনি বললেন, 'তাহলে কি তুমি (এর প্রতি) ইমান রাখ না?' সে বলল, 'জি, অবশ্যই (ইমান রাখি)। কিন্তু (আমি এটা চাইছি) যাতে আমার অন্তর প্রশান্ত হয় (ইমান বৃদ্ধি পায়)।”

ইবরাহিম আলাইহিস সালাম অকাট্যভাবেই জানতেন, আল্লাহ মৃতকে জীবিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি নিজের ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস) বাড়াতে চেয়েছিলেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইয়াকিন বৃদ্ধি হতে পারে। এই মাসআলা আমি সূক্ষ্মভাবে আলোচনা করেছি, 'আল-কাতউ ওয়াজ জন্ম ইনদাল উসুলিয়্যিন' গ্রন্থে।

আর মুরজিয়াদের মধ্যে যারা বলে, ‘আমার ইমান জিবরাইলের ইমানের মতো,’ তাদের এই মতকে সালাফদের ইজমা (সর্ববাদিসম্মত অভিমত) বাতিল প্রমাণ করে। ইবনু আবি মুলাইকাহ বলেন, «أَدْرَكْتُ ثَلاَثِينَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ﷺ كُلُّهُمْ يَخَافُ النِّفَاقَ عَلَى نَفْسِهِ مَا مِنْهُمْ أَحَدٌ يَقُولُ: إِنَّهُ عَلَى إِيمَانِ جِبْرِيلَ وَمِيكَائِيلَ».
“আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিরিশজন সাহাবিকে পেয়েছি, যারা তাঁদের অন্তরে মুনাফেকির আশঙ্কা করতেন। তাঁদের কেউ বলেননি, আমার ইমান জিবরাইল-মিকাইলের মতো।”

টিকাঃ
১৫৭ আল-কুরআন, ৪৮ (সুরা ফাতহ): ৪।
১৫৮ আল-কুরআন, ৭৪ (সুরা মুদ্দাসসির) : ৩১।
১৫৯ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তওবা) : ১২৪।
১৬০ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান) : ১৭৩।
১৬১ আল-কুরআন, ৩৩ (সুরা আহজাব): ২২।
১৬২ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৬০।
১৬৩ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ২২; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৭৪।
১৬৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৪৯৭; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৪৩।
১৬৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ২০।
১৬৬ আহমাদ, হা. ২৭১; তাবারানি, হা. ১২৪৫১; ইবনে হিব্বান, হা. ৬২১৩; বর্ণনার মান : সহিহ।
১৬৭ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৬০।
১৬৮ আশ-শাসরি, আল-কাতউ ওয়াজ জন্ম ইনদাল উসুলিয়্যিন, খ. ১, পৃ. ২৭।
১৬৯ ইমাম বুখারি এই উক্তি সহিহুল বুখারির ইমান অধ্যায়ে কাটাসনদে বর্ণনা করেছেন, অধ্যায়ের পরিচ্ছেদ নং: ৩৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px