📄 ৫.১ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : কথা ও কাজের উপর ভিত্তি করে কাউকে কাফির বলা যাবে না
মুরজিয়ারা বলে, “কাউকে কথা অথবা কাজের ওপর ভিত্তি করে কাফির বলা যাবে না। কেবল অন্তরের ওপর ভিত্তি করেই কাফির বলতে হবে। অতএব কেউ কুফরি বিশ্বাস না করা পর্যন্ত তাকে কাফির বলা যাবে না; যদিও সে কুফরি কালাম বলে অথবা কুফরি কাজ করে তবুও তাকে কাফির বলা হবে না।” এটা ভুল এবং কুরআন-সুন্নাহবিরোধী। তিনশোরও বেশি দলিল রয়েছে, যেগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, কথা এবং কাজের মাধ্যমেও কুফরি হয়।
যেমন কাজের মাধ্যমে কুফরি হওয়ার দলিল- আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “কেউ আল্লাহর প্রতি ইমান আনার পর তাঁর সাথে কুফরি করলে এবং কুফরির জন্য হৃদয়কে উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার অন্তর থাকে ইমানে অবিচল। এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়। আর আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।”
এখানে মজবুর (জোরজবরদস্তির শিকার এমন) ব্যক্তিকে কুফরির আওতা থেকে বাদ দিয়েছেন আল্লাহ। আর বাধ্য হওয়ার বিষয়টি কথা ও কাজের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে (কথা বলতে ও কাজ করতেই বাধ্য করা হয়)। তাহলে এ থেকে বোঝা গেল, কথা ও কাজের মাধ্যমেও কুফরি হয়। এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, যার অন্তর ইমানে অবিচল, কিন্তু সে কথা এবং কাজের মাধ্যমে কুফরি করেছে, এতে তাকে বাধ্যও করা হয়নি, তাহলে সে এর মাধ্যমে কুফরিই করেছে।
এরপরে তিনি আরও বলেছেন, “এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়। আর আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।” এ থেকে প্রমাণিত হয়, তাদের কুফরি বিশ্বাসগত নয়, অজ্ঞতাবশত নয়, দিনের প্রতি ঘৃণাবশত নয় অথবা অনুরূপ কোনো অন্তরস্থ বিষয়ের ফলেও সংঘটিত নয়। বরং আল্লাহ তাদেরকে কাফির বলেছেন তাদের কুফরি কাজের দরুন; দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দিতে গিয়ে কোনো কাফিরকারী বিষয়ের কাজ সম্পাদন করার দরুন। যদিও তাদের দিনের শুদ্ধতা বিষয়ে তাদের জ্ঞান ছিল এবং দিনের প্রতি তাদের ভালোবাসা ছিল। আর এটা (তাদের দ্বারা সংঘটিত কুফরি কাজ) কেবল বাহ্যিক আমলের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : “আর আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করলে অবশ্যই তারা বলবে, 'আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেলতামাশা করছিলাম।' বলুন, 'তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রসুলকে বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা ওজর পেশ কোরো না। তোমরা তো ইমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ। আমরা তোমাদের মধ্যে কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেব, কারণ তারা অপরাধী।”
এ থেকে প্রতীয়মান হয়, তাদের কথা কুফরি ছিল, ফলে তাদের কথার কারণেই আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে 'কাফির' সাব্যস্ত করেছেন। যদিও তারা বলেছিল, 'আমরা কুফরি কথা বলেছি কিন্তু এটা আমাদের বিশ্বাস নয়, আমরা তো স্রেফ খেলতামাশা করছিলাম,' তবুও আল্লাহ তাদেরকে 'কাফির' বলেছেন।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, “যারা বলে, 'নিশ্চয় আল্লাহই মারইয়াম পুত্র মাসিহ,' অবশ্যই তারা কাফির হয়ে গেছে।” যেমনভাবে তিনি বলেছেন, “তারা অবশ্যই কাফির হয়ে গেছে – যারা বলে, 'আল্লাহ তো তিনের মধ্যে তৃতীয়'।”
স্রেফ তাদের কথার জন্যই তাদেরকে কাফির বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেননি, 'যারা এই বিশ্বাস রাখে (তারা কাফির হয়ে গেছে)।' একটি উসুলি কায়দা বা মূলনীতি হলো, 'কোনো গুণের সাথে একটি হুকুমকে জুড়ে দেওয়া থেকে প্রতীয়মান হবে, ঐ গুণই হুকুমটির ইল্লাত তথা কারণ।' তাই উল্লিখিত কথার সাথে যেহেতু কুফরির হুকুম জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এটাই প্রমাণ বহন করে, উল্লিখিত কথাটি কুফরি হুকুম দেওয়ার কারণ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারা আল্লাহ্ শপথ করে যে, তারা কিছু বলেনি; অথচ তারা তো কুফরি কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর তারা কাফির হয়ে গেছে; আর তারা এমন কিছুর সংকল্প করেছিল, যা তারা পায়নি।” তিনি শুধু তাদের কথার জন্যই তাদেরকে কাফির বলেছেন, অথচ তারা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জিহাদ করছিল, সালাত আদায় করছিল এবং জাকাত দিচ্ছিল। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন :
“নিশ্চয় তিনি তোমাদের ওপর কিতাবে নাজিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে, আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং তা নিয়ে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত না হবে তোমরা তাদের সাথে বসবে না, নয়তো তোমরাও তাদের মতোই বিবেচিত হবে। মুনাফেক ও কাফির সবাইকে আল্লাহ জাহান্নামে একত্র করবেন।”
এখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, শ্রুত কথার মধ্যেও কুফরি রয়েছে; এখানে তিনি এই কুফরকে বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত করেননি।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “সে অস্বীকার করল এবং অহংকার করল। আর সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” আল্লাহ তায়ালা যখন ইবলিসকে সেজদা করার আদেশ দিয়েছিলেন, তখন আল্লাহর আনুগত্য করতে অসম্মতি জানানোর কারণে তিনি তাকে কাফির বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বলুন, 'তোমরা আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য কর।' তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে (জেনে রেখ) নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদেরকে পছন্দ করেন না।” আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে কাফির বলেছেন, শুধু আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে। কখনো কখনো আল্লাহর দিন থেকে বিমুখ হওয়ার মাধ্যমেও কুফরি সংঘটিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর যারা কুফরি করেছে, তাদেরকে যে বিষয়ে ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছে তা থেকে তারা বিমুখ হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “যে ব্যক্তি তার রবের আয়াতসমূহের মাধ্যমে উপদেশপ্রাপ্ত হয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে বড়ো জালেম আর কে? নিশ্চয় আমরা অপরাধীদের শাস্তিপ্রদানকারী।"
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আর সুলাইমান কাফির হননি, বরং শয়তানরাই কাফির হয়েছিল। তারা মানুষকে শিক্ষা দিত জাদু।” জাদু শিক্ষা দেওয়ার দরুন আল্লাহ তাদেরকে কাফির বলেছেন; আর জাদু একটা আমল।
কতিপয় আমলের মাধ্যমেও যে কুফরি হয়— এ ব্যাপারে একদল আলিম ইজমা বর্ণনা করেছেন। যেমন ইসহাক বিন রাহুওয়াইহ (মৃ. ২৩৮ হি.), আবু সাওর (মৃ. ২৪০ হি.), ইবনু হাজম (মৃ. ৪৫৬ হি.), ইবনুল আরাবি আল-মালিকি (মৃ. ৫৪৩ হি.), ইবনু তাইমিয়া (মৃ. ৭২৮ হি.), শাইখ আব্দুর রহমান বিন হাসান (মৃ. ১২৮৫ হি.), শাইখ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম (মৃ. ১৩৮৯ হি.)। তদ্রুপ ফাকিহগণ ‘রিদ্দাহ তথা ধর্মত্যাগ অধ্যায়ে’ যেই আলোচনা করেছেন, তা থেকেও প্রতীয়মান হয়, শরিয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত বান্দা কতিপয় আমল ও কথা উভয়ের মাধ্যমেই কাফির হতে পারে। তাঁরা এটাও উল্লেখ করেছেন যে, কিছু কথা এবং কিছু কাজ বড়ো কুফরি (যার দরুন বান্দা ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়)।
এ ব্যাপারে কতিপয় সামসময়িক ব্যক্তির কাছে সংশয় আপতিত হয়েছে। তারা যখন উলামাদের কাউকে এরকম বলতে শোনে, ‘আমরা কোনো মুসলিমকে কোনো একটি পাপের জন্য কাফির ঘোষণা করব না,’ তখন তারা ধরে নেয়, উক্ত উলামাগণের মতে এমন কোনো কথা বা কাজের অস্তিত্ব নেই যা কিনা একজন ব্যক্তিকে ইসলাম ধর্ম থেকে বের করে দিতে পারে! এটা একটা আশ্চর্যজনক ইস্তিদলাল (দলিলগ্রহণ)। কীভাবে তারা সুস্পষ্ট দলিলপ্রমাণের বিরোধিতা করে কিছু লেখকের বক্তব্য দিয়ে?!
পরন্তু আলোচ্য বক্তব্য থেকে মুরজিয়াদের মতাদর্শ প্রতীয়মান হয় না। কেননা উক্ত বক্তব্যে ইঙ্গিত করা হয়েছে - স্রেফ পাপের ফালের কাফির বলা যাবে না; পাপকাজের কারণে কাফির ফতোয়াপ্রদানকারী ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার প্রতিবাদস্বরূপ (কথাটি বলা হয়ে থাকে)।
পক্ষান্তরে কোন কোন কথা ও কাজ কাফিরকারী, উক্ত বক্তব্যে তাঁরা সেসব নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হননি। যে ব্যক্তি কাফিরকারী বিষয় সংঘটন করে, সে তো মুসলিমদেরই অন্তর্ভুক্ত নয়; সুতরাং সাধারণভাবে পূর্বোক্ত বাক্য উল্লেখ করা হলে, সে ব্যক্তি তার আওতাভুক্ত হবে না। তাদের এই সংশয়ে পড়ার কারণ হলো, তারা দেখছে, কিছু উলামা কুফরকে ভাগ করেছেন- (১) বড়ো কুফর : যা দিন থেকে বের করে দেয় এবং (২) ছোটো কুফর : যা দিন থেকে বের করে দেয় না। এটাকেই আবার কোনো কোনো উলামা নাম দিয়েছেন 'আমলগত কুফর' নামে, আর প্রথমটির নাম দিয়েছেন 'বিশ্বাসগত কুফর'। এই পরিভাষাটি ব্যক্ত করা হয়েছে অধিকাংশ সময়ের বিবেচনা করে। তথাপি এ বিষয়টিও (এই পরিভাষার দোহাই দিয়ে 'আমলগত কুফরির' মাধ্যমে কাফির হয় না বলে দাবি করা) মূলত আলিমদের কথা দিয়ে দলিলের বিরোধিতা করার অন্তর্ভুক্ত।
এই মাসআলায় এ যুগের কিছু সালাফি দাবিদার মুরজিয়ার ভুল হলো, তারা তাদের বিরোধীদের 'খারেজি' ও 'তাকফিরি' ট্যাগ লাগায়।
এতে সালাফদের বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করা হচ্ছে দুইভাবে। প্রথমত, তারা এমন আকিদা সালাফদের দিকে সম্বন্ধ করছে যা তাঁদের আকিদা নয়। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে তারা সালাফদেরকেই 'খারেজি-তাকফিরির' মতো অত্যন্ত কুৎসিত বিশেষণ দিচ্ছে। অথচ সালাফগণ আমলের কারণেও তাকফির (কাফির আখ্যা) করে এসেছেন। জাদু শিক্ষা দেওয়ার জন্যও তাঁদের অনেকে কাফির আখ্যা দিয়েছেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তারা উভয়েই (হারুত ও মারুত ফেরেশতাদ্বয়) এই কথা না বলে কাউকে (জাদু) শিক্ষা দিত না যে, 'আমরা নিছক একটি পরীক্ষা; কাজেই তুমি কাফির হয়ো না'।”
সালাফদের অনেকে নামাজ ত্যাগ করার কারণেও কাফির আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের এই মতটি শক্তিশালী; যেহেতু নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشَّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ». “বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে নামাজ ছেড়ে দেওয়া।"
তিনি আরো বলেছেন, «الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ». “আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা হলো নামাজ। অতএব যে ব্যক্তি নামাজ ত্যাগ করে, সে কুফরি করে।”
আরেকটি দলিল- নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেয়ামতের দিন তার উম্মতকে চিনতে পারবেন, তাদের অজুর স্থানের উজ্জ্বলতা দেখে। এখান থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তি নামাজের জন্য অজু করেনি, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিনতে পারবেন না, আর সে তাঁর উম্মত হিসেবেও বিবেচিত হবে না। এমতের বিরোধীদের নিকটে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো এই হাদিস : «وَمَنْ لَمْ يَأْتِ بِهِنَّ فَلَيْسَ لَهُ عِنْدَ اللهِ عَهْدٌ، إِنْ শָاءَ عَذَّبَهُ وَإِنْ শָاءَ أَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ». “(নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :) আর যে ব্যক্তি নামাজসমূহ (যথাযথভাবে) আদায় করবে না, তার জন্য আল্লাহর কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেবেন কিংবা জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।”
কিন্তু ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭ ২৮ হি.) বলেছেন, 'এ হাদিস দিয়ে (নামাজ পরিত্যাগকারী যে কাফির না, সে কথার পক্ষে) দলিল পেশ করা দুর্বল।' কেননা কোনো কিছু হেফাজত না করার মানে তা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা নয়। বরং এর মানে- নামাজ আদায় করা, কিন্তু তার ওয়াজিব বিষয়াবলিতে কিছু ত্রুটি করে ফেলা; উদাহরণস্বরূপ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা অথবা প্রশান্তচিত্তে আদায় করার মতো আবশ্যক বিষয়াদি (ত্রুটি-সহ আদায় করা)। যেমন কোনো কোনো বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে (নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন) :
«خَمْسُ صَلَوَاتٍ افْتَرَضَهُنَّ اللَّهُ تَعَالَى مَنْ أَحْسَنَ وُضُوءَهُنَّ وَصَلَّاهُنَّ لوقتهن وأتم ركوعهن خشوعهن كَانَ لَهُ عَلَى اللَّهِ عَهْدٌ أَنْ يَغْفِرَ لَهُ وَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ فَلَيْسَ لَهُ عَلَى اللَّهِ عَهْدٌ إِنْ شָاءَ غَفَرَ لَهُ وَإِنْ شָاءَ عَذَّبَهُ».
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মহান আল্লাহ ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি সেগুলোর ওজু উত্তমরূপে সম্পাদন করবে, সময়মতো নামাজগুলো আদায় করবে, সেগুলোর মধ্যকার রুকু ও বিনয়নম্রতা পূর্ণরূপে সম্পন্ন করবে, তার জন্য আল্লাহর কাছে এই প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। আর যে তা করবে না, তার জন্য আল্লাহর কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করবেন কিংবা শাস্তি দেবেন।”
এখন কেউ যদি বলে, কাদের মতাদর্শ সবচেয়ে গুরুতর— পূর্ববর্তী-মুরজিয়াদের, না পরবর্তীদের? তাহলে বলা হবে, একদিক দিয়ে পরবর্তীদের মতাদর্শ বেশি গুরুতর। কেননা তারা (পূর্ববর্তীরা) বলত, “(কুফরি) কথা ও কাজ কুফরির আলামত; এজন্য ব্যক্তির কথা ও কাজের ব্যাপারে কুফরের হুকুম প্রযোজ্য হবে দুনিয়াবি বিধিবিধানে, আখেরাতের বিধিবিধানে নয়।” কিন্তু পরবর্তী মুরজিয়ারা দুনিয়া ও আখেরাতের কোনোটিতেই কুফরির হুকুম দেয় না; যার ফলে তাদের মতানুযায়ী রিদ্দাহ তথা ধর্মত্যাগের দণ্ডবিধি বাতিল সাব্যস্ত হয়ে যায়।
আবার আরেকদিক দিয়ে পরবর্তীদের মতাদর্শ পূর্ববর্তীদের চেয়ে অধিকতর হালকা। বিষয়টি হলো, পূর্ণ ইমানের পরিচয়ের মধ্যে আমলকে প্রবিষ্ট করা। পূর্ববর্তী-মুরজিয়ারা আমলকে পূর্ণ ইমানের মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত করে না। কিন্তু পরবর্তীরা আমলকে পূর্ণ ইমানের অন্তর্ভুক্ত করে থাকে।
কেউ যদি বলে, এ যুগের মুরজিয়াদের ভুল কি অকাট্য, না অনুমাননির্ভর? আমরা বলব, যেসব দলিল থেকে প্রমাণিত হয়, তাদের মতটি বাতিল, সেগুলো সনদগত ও সমঝগত উভয় দিক দিয়েই অকাট্য। পূর্বোল্লিখিত কুরআনের দলিলগুলো থেকে একটিমাত্র দলিল বর্ণিত হলেই আমরা বিরোধীদের ভুলের ব্যাপারে সুনিশ্চিত হতাম। আর সেখানে তাদের মতাদর্শকে ভুল সাব্যস্ত করে মুতাওয়াতির পর্যায়ের অসংখ্য দলিলপ্রমাণ বর্ণিত হয়েছে!
যদি বলা হয়, এ ধরনের কথা যারা বলে- যেহেতু তারা সালাফদের মাজহাবের বিরোধিতা করেছে, সে হিসেবে তাদেরকে কি তাঁদের দিকে সম্বন্ধ করা যাবে না? এর জবাবে বলা যায়, তারা সালাফদের অনুসারী, যেসকল মাসআলায় তারা তাঁদের সাথে একমত হয়েছে। কিন্তু এই মাসআলায় তারা সালাফদের আদর্শের ওপরে নেই। মানুষ একটি বা দুটি মাসআলায় ভুল করলে আমরা তাকে নিন্দনীয় নাম দেব না, এমনকি পাপী বলার ক্ষেত্রেও (এ নিয়ম প্রযোজ্য)। কেননা যে ভুলকারীর নিকটে শরয়ি দলিল পৌঁছেনি সে পাপের হকদার হবে না, যতক্ষণ সে হকে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু পৌঁছতে পারছে না। আসলে এটাই সালাফদের রীতি। আকিদার ক্ষেত্রেও তাঁদের একই রীতি। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা আল্লাহকে যথাযথ ভয় কর।” তিনি আরো বলেছেন, “আর এ ব্যাপারে তোমরা কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তোমাদের কোনো অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা স্বেচ্ছায় করেছে (তা অপরাধ), আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” মুসলিমের অনিচ্ছাকৃত ভুলের ক্ষেত্রে অপরাধ ও পাপ হবে না বলে জানিয়েছেন আল্লাহ। উসুলবিদগণ একটা মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন, শব্দের ব্যাপকতাই ধর্তব্য হবে, (শব্দটি বর্ণিত হওয়ার) নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ধর্তব্য হবে না। সুতরাং আয়াতদ্বয়ের সম্বোধন আকিদার ভুলকেও শামিল করে।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, "আর কারও নিকটে হেদায়েত স্পষ্ট হওয়ার পর যে ব্যক্তি রসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতিরেকে অন্য পথ অনুসরণ করে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব যেদিকে সে ফিরে যায় এবং তাকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!”
এ আয়াতের সম্বোধন থেকে বোঝা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা কেবল তাঁকেই পাকড়াও করবেন, যার কাছে হক স্পষ্ট হয়েছে এবং দলিল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তবে যদি বান্দার কাছে এসমস্ত অকাট্য দলিল পৌঁছে যায়, ফলে তা পালন করা তার জন্য সম্ভবপর হয়, কিন্তু সে আল্লাহর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে অথবা তাঁর সীমারেখা উল্লঙ্ঘন করে দলিলগুলোর বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সে ভুলকারী, পাপী। দুনিয়া ও আখিরাতে এই কাজ আল্লাহর তরফ থেকে তার শাস্তি পাওয়ার কারণ হবে।
উসুলুল ফিকহের উলামাগণ এই মাসআলা উল্লেখ করেছেন এবং তাঁরা এর দৃষ্টান্তস্বরূপ মূর্তিকে সেজদাকারীর দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে করলে সেজদাকারী কাফির ও পাপী সাব্যস্ত হবে। অনুরূপভাবে কেউ অন্তর দিয়ে সেজদা করার উদ্দেশ্য ছাড়া করলেও কাফির ও পাপী সাব্যস্ত হবে; যে এটা কেবল দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য করেছে অথবা কাফিরদের মোসাহেবি করার জন্য অথবা অন্য কোনো কারণে করেছে। এরপর তাঁরা কিছু বিদাতির মতানৈক্য উল্লেখ করেছেন, “(তাদের মধ্যকার কতিপয় বিদাতি ভিন্নমত পোষণ করে বলেছে:) অনিচ্ছাকৃতভাবে করলে তারা পাপী হবে না।” উসুলবিদগণ তাদের খণ্ডন করতে যেয়ে এবং তাদের ভ্রষ্টতার বিবরণ দিতে যেয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরবর্তী মুরজিয়ারা তাদের মতকে ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্য হিসেবে দাবি করে। অথচ এটা তাঁর বিভিন্ন কিতাবের অন্তর্গত অসংখ্য আলোচনার স্পষ্ট খেলাপ। যেমন নামাজ পরিত্যাগকারী কাফির—এই মতকেই ইবনু তাইমিয়া প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন :
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও রসুলের প্রতি ইমান আনলাম এবং আমরা আনুগত্য করলাম।’ এরপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়; বস্তুত তারা মুমিন নয়।” (সুরা নুর: ৪৭) যে ব্যক্তি আমল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আল্লাহ তার ইমানকে নাকচ করে দিয়েছেন, যদিও সে মুখে ইমানের স্বীকৃতি দিয়েছে। যে ব্যক্তি ইমান অনুযায়ী আমল করেনি কুরআন-সুন্নাহর অনেক জায়গায় তার ইমানকে নাকচ করা হয়েছে, যেমনভাবে মুনাফেকের ইমানকে নাকচ করা হয়েছে। আর যার অন্তরে ইলম আছে, কিন্তু সে প্রকাশ্যে (ইমানের) বিরোধিতা ও শত্রুতায় লিপ্ত, তার নাম কখনো মুমিন হতে পারে না।
শরিয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত বান্দা কোনো আমলের কারণে কাফির হয় না মর্মে কতিপয় মানুষ কিছু মুতাশাবিহাত (দ্ব্যর্থবোধক) আয়াত-হাদিস দিয়ে দলিল দেয়। এগুলোকে দুই প্রকারের দলিল হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায় :
প্রথম প্রকার : যে দলিলগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়-লা ইলাহা ইল্লাহ বললে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। যেমন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ لَا يَلْقَى اللَّهَ بِهِمَا عَبْدٌ غَيْرَ شَاكٍّ فِيهِمَا إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ». “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রসুল। যে এ বিষয় দুটোর প্রতি নিঃসন্দেহ বিশ্বাস রেখে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তিনি আরও বলেছেন, «مَا مِنْ عَبْدٍ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ثُمَّ مَاتَ عَلَى ذَلِكَ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ». “যে কোনো বান্দা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং এ অবস্থার ওপরে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
এই ইস্তিদলাল (দলিলগ্রহণ) সঠিক নয়। কেননা মুস্তাদিল (দলিলগ্রহণকারী) একটি দলিলই দেখেছে, আর বাকি দলিলগুলো থেকে গাফেল থেকেছে। অথচ সেই বাকি দলিলগুলোতে এটার (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে জান্নাতে যাওয়ার) শর্তাবলি ও প্রতিবন্ধকতা উল্লিখিত হয়েছে; যেসব শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে এবং প্রতিবন্ধকতাসমূহ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। যেমন একটি শর্ত হলো-(সাক্ষ্য) খালেস অন্তরে হতে হবে; যেমনটি প্রথম হাদিসে বলা হয়েছে, 'উভয় সাক্ষ্য সন্দেহাতীতভাবে বলতে হবে'। যদিও দ্বিতীয় হাদিসে এই শর্তের কথা উল্লেখ নেই। (কিন্তু নিয়মানুযায়ী) অবশ্যই মুতলাক তথা শর্তবিহীন হাদিসকে মুকাইয়্যাদ তথা শর্তযুক্ত হাদিস দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে। তদ্রুপ প্রতিবন্ধকতাসমূহও দূরীভূত হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলল, আবার সে ইবাদতের কিয়দংশ—যা কিনা একটি আমল—গাইরুল্লাহর জন্যও ধার্য করল, তাহলে সে একজন কাফির। যেহেতু আল্লাহ বলেছেন, “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকটে কোনো প্রমাণ নেই; তার হিসাব তো তার রবের নিকটই আছে; বস্তুত কাফিররা অবশ্যই সফলকাম হবে না।”
তদুপরি ইজমা তথা সর্ববাদিসম্মত অভিমতের ভিত্তিতে সুসাব্যস্ত হয়েছে, কেউ যদি দুটো সাক্ষ্যের স্বীকৃতি দেয়, আবার পুনরুত্থানও অস্বীকার করে, তাহলে সে মুমিন হিসেবে পরিগণিত হব না। অতএব এ জাতীয় শর্তবিহীন দলিলগুলো যেহেতু কিছু জায়গায় ইজমার মাধ্যমে মুকাইয়্যাদ তথা শর্তযুক্ত করা যায়, সেহেতু কিছুপূর্বে উল্লিখিত শর্তবিহীন দলিলগুলোকেও পূর্বোক্ত সেসব দলিল দিয়ে মুকাইয়্যাদ করতে হবে, যা থেকে প্রমাণিত হয়—এমনও কিছু কাজ রয়েছে, যা কুফরি, ইমান-বিনষ্টকারী।
দ্বিতীয় প্রকার : যে দলিলগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, এমন কিছু মানুষও জান্নাতে যাবে, যারা কোনো ভালো আমল করেনি। যেমন একটি হাদিসে এসেছে, একজন ব্যক্তি নির্দেশ দেয়—যেন তাকে তার মৃত্যুর পরে পুড়িয়ে ফেলা হয়; কেননা সে কোনো ভালো আমল করেনি (لم يعمل خيرًا قط)। তার রবকে ভয় করার দরুন তার রব তার উপর দয়াপরবশ হন। এ ধরনের আরেকটি হাদিস হলো-একজন লোক নিরানব্বইটি খুন করে; (তার মৃত্যুর সময়) আজাবের ফেরেশতাগণ বলেন, 'সে কোনো ভালো আমল করেনি (لم يعمل خيرًا قط)।' এ ধরনের দলিলগুলোই (এই ফের্কার লোকেরা পেশ করে থাকে)।
কিন্তু এ জাতীয় দলিল মূলত দু ধরনের লোকের ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে।
এক. এমনসব লোক, যারা আমলের আবশ্যকতা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল এবং তারা স্রেফ সাক্ষ্য দেওয়াকেই যথেষ্ট ধরে নিয়েছিল। কারণ তাদের ধারণা ছিল-সাক্ষ্য ছাড়া অন্যকিছু তাদের জন্য অনাবশ্যক।
দুই. এমনসব লোক, যারা তাদের মৃত্যুর পূর্বে তওবা করেছে, আমল করার সুযোগ পায়নি। তাই বলা যায়, এদের ওপর মূলত কোনো আমল আবশ্যকই হয়নি।
টিকাঃ
৭৫ আল-কুরআন, ১৬ (সুরা নাহল): ১০৬-১০৭।
৭৬ আল-কুরআন, ১৬ (সুরা নাহল): ১০৭।
৭৭ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তওবা): ৬৫-৬৬।
৭৮ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা) : ৭২।
৭৯ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা): ৭৩।
৮০ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তাওবা): ৭৪।
৮১ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ১৪০।
৮২ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ৩৪।
৮৩ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান) : ৩২।
৮৪ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান): ৩২।
৮৫ আল-কুরআন, ৩২ (সুরা সাজদা): ২২।
৮৬ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১০২।
৮৭ তাজিমু কদরিস সালাত, খ. ২, পৃ. ৯৩; আস-সারিমুল মাসলুল, পৃ. ১৫২।
৮৮ লালাকায়ি, শারহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, খ. ৪, পৃ. ৮৪৯।
৮৯ আল-ফাসল ফিল মিলাল, খ. ৩, পৃ. ২৪৯।
৯০ আহকামুল কুরআন, খ. ২, পৃ. ৯৭৬।
৯১ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃ. ৫১৪।
৯২ মাজমুআতুর রাসায়িলি ওয়াল মাসায়িলিন নাজদিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৩৮০।
৯৩ শারহু কাশফিশ শুবুহাত, পৃ. ১০২।
৯৪ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১০২।
৯৫ মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৮২।
৯৬ সুনানু ইবনি মাজাহ, হা. ১০৭৯, সনদ : সহিহ।
৯৭ অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত : মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, অধ্যায় নং : ২ (কিতাবুত তাহারাত), পরিচ্ছেদ নং : ১২, খ. ১, পৃ. ১৪৯-১৫০, হা. ২৪৭-২৪৯।
৯৮ আবু দাউদ, হা. ১৪২০; নাসায়ি, হা. ৪৬১; আহমাদ, হা. ২২৭৫৬; সনদ : সহিহ।
৯৯ আবু দাউদ, হা. ৪২৫; নাসায়ি, হা. ৪৬১; ইবনু মাজাহ, হা. ১৪০১; সনদ : সহিহ।
১০০ অনুবাদকের টীকা: শাইখ এখানে হুজ্জত তথা দলিল পৌঁছানোর সাথে কাউকে বিদাতি বলার বিষয়টিকে শর্তযুক্ত করেছেন। সুতরাং বিদাতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো মৌলিক বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর সাথে মতবিরোধ করেছে এমন ব্যক্তির ওপর দলিল প্রতিষ্ঠা করা হলে তিনি 'বিদাতি' সাব্যস্ত হবেন। স্রেফ একটি মূলনীতির বিপরীতে যাওয়াই বিদাতি হওয়ার জন্য যথেষ্ট, যেমনটি সাব্যস্ত করেছেন সাহাবিগণ ও তাঁদের পরবর্তী ন্যায়নিষ্ঠ সালাফগণ। সাহাবি ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা স্রেফ একটি মৌলিক ভুলের কারণে ভাগ্য-অস্বীকারকারীদের তীব্র নিন্দা এবং তাদেরকে ভ্রষ্ট আখ্যা দিয়েছিলেন। দ্রষ্টব্য : মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, কিতাবুল ইমান, পরিচ্ছেদ নং: ১, খ. ১, পৃ. ২৮, হা. ৮। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমাম শাইখুল ইসলাম আহমাদ বিন হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৪১ হি.) বলেছেন, «ومن السنة اللازمة التي من ترك منها خصلة لم يقبلها ويؤمن بها لم يكن من أهلها». "আবশ্যকীয় সুন্নাহর (মানহাজের) মধ্য থেকে যে ব্যক্তি কোনো একটি বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করবে, তা গ্রহণ করবে না এবং তার প্রতি ইমানও আনবে না, তবে সে সুন্নাহপন্থিদের তথা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয়।” দ্রষ্টব্য: আবুল কাসিম হিবাতুল্লাহ বিন হাসান আত-তাবারি আর-রাজি আল-লালাকায়ি (মৃ. ৪১৮ হি.), শারহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ, তাহকিক : আহমাদ আল-গামিদি (আলেকজান্দ্রিয়া : দারুল বাসিরা, ৮ম প্রকাশ, ১৪২৩ হি./২০০৩ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ১৭৬, বর্ণনা নং : ৩১৭। বর্তমান যুগে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমাম, যুগশ্রেষ্ঠ ফাকিহ, আশ-শাইখুল আল্লামা ড. সালিহ বিন ফাওজান আল ফাওজান হাফিজাহুল্লাহ (জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.) বলেছেন, «كل من خالف أهل السنة والجماعة ممن ينتسبون إلى الإسلام في الدعوة، أو في العقيدة، أو في شيئ من أصول الإيمان؛ فإنه يدخل في الإثنين وسبعين فرقة». “ইসলামের সাথে নিজেকে সম্পৃক্তকারী যে ব্যক্তিই দাওয়াহ কিংবা আকিদার ক্ষেত্রে অথবা ইমানের কোনো মূলনীতির ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিপরীতে যায়, সে ব্যক্তিই (পথভ্রষ্ট) বাহাত্তর ফের্কার অন্তর্ভুক্ত হবে।” দ্রষ্টব্য: সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান, আল-আজউয়িবাতুল মুফিদা আন আসয়িলাতিল মানাহিজিল জাদিদা (কায়রো : দারুল মিনহাজ, ৩য় প্রকাশ, ১৪২৪ হি.), পৃ. ৩৫।
১০১ আল-কুরআন, ৬৪ (সুরা তাগাবুন): ১৬।
১০২ আল-কুরআন, ৩৩ (সুরা আহজাব): ৫।
১০৩ অনুবাদকের টীকা: একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলে মূলনীতিটি বুঝতে সহজ হবে। যেমন জিহারের বিধান তথা স্ত্রীর কোনো অঙ্গকে চিরতরে বিবাহ হারাম এমন আত্মীয়ার অঙ্গের সাথে তুলনা করার বিধান সাহাবি আওস বিন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর স্ত্রী খাওলা বিনতু সালাবা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। দ্রষ্টব্য: আল-কুরআন, ৫৮ (সুরা মুজাদিলা) : ১-৪; আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আসআস আস-সিজিস্তানি, আস-সুনান, হা. ২২১৪, সনদ: হাসান; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, সহিহ সুনানি আবি দাউদ (কুয়েত : মুআসসাসাতু গিরাস, ১ম প্রকাশ, ১৪২৩ হি./২০০২ খ্রি.), খ. ৬, পৃ. ৪১৬-৪১৭, হা. ১৯১৮; আবু জাফার মুহাম্মাদ বিন জারির আত-তাবারি, জামিউল বায়ান আন তাবিলি আয়িল কুরআন, তাহকিক : আব্দুল্লাহ আত-তুর্কি (দারু হাজার, ১ম প্রকাশ, ১৪২২ হি./২০০১ খ্রি.), খ. ২২, পৃ. ৪৪৬। জিহারের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট উক্ত সাহাবিদ্বয়ের সাথে খাস হলেও বিধানটি সকল মুসলিমের জন্যই ব্যাপক। প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় এনে এমন দাবি করা যাবে না যে, জিহারের বিধান কেবল উক্ত সাহাবিদ্বয়ের জন্য খাস, অন্যদের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। এজন্য বলা হয়, শব্দের ব্যাপকতাই ধর্তব্য হবে, (শব্দটি বর্ণিত হওয়ার) নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ধর্তব্য হবে না। এই মূলনীতি বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন: কাদি আবু ইয়ালা মুহাম্মাদ বিন হুসাইন আল-ফারা আল-হাম্বালি, আল-উদ্দাহ ফি উসুলিল ফিকহ, তাহকিক : আহমাদ আল-মুবারাকি (প্রকাশনার নামবিহীন, ২য় প্রকাশ, ১৪১০ হি./১৯৯০ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৬০৭-৬০৮; মুহাম্মাদ বিন আলি আশ-শাওকানি, ইরশাদুল ফুহুল ইলা তাহকিকিল হাক্কি মিন ইলমিল উসুল, তাহকিক : আহমাদ ইজ্জু ইনায়া (দেমাস্ক: দারুল কিতাবিল আরাবি, ১ম প্রকাশ, ১৪১৯ হি./১৯৯৯ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৩৩২-৩৩৫; ইবনু কুদামা, রওদাতুন নাজির ওয়া জুন্নাতুল মুনাজির, খ. ২, পৃ. ৩৫-৪১; আব্দুল কারিম আন-নামলা, আল-মুহাজ্জাব ফি ইলমি উসুলিল ফিকহিল মুকারিন, খ. ৩, পৃ. ১৫৩৩-১৫৪০।
১০৪ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১১৫।
১০৫ বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : আল-কাতউ ওয়াজ জন্ম ইনদাল উসুলিয়্যিন, খ. ২, পৃ. ৪৫৮।
১০৬ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, ৬১২-৬১৬।
১০৭ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ১৪২।
১০৮ মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ২৭।
১০৯ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৫৮২৭।
১১০ আল-কুরআন, ২৩ (সুরা মুমিনুন) : ১১৭।
১১১ অনুবাদকের টীকা: উলামাগণ আলোচ্য কথাটির আরেকটি জবাব দিয়ে থাকেন, যা আমাদের কাছে খুবই যৌক্তিক ও প্রমাণসমৃদ্ধ মনে হয়। জবাবটি হলো- 'সে কোনো ভালো আমল করেনি' – কথাটি আরবি ভাষার সেসব কথার শ্রেণিভুক্ত, যেগুলোতে কোনো কিছুর নামকে নাকচ করা হয়, যদি তাতে সেই নামের অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি পূর্ণরূপে বিদ্যমান না থাকে। সুতরাং 'সে কোনো ভালো আমল করেনি' কথাটির মানে 'সে পরিপূর্ণরূপে আমল করেনি'। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখ করছি, যা দিয়ে প্রমাণ পেশ করা হয়, নামাজ পরিত্যাগকারী কাফির না, বরং পাপী মুমিন। সহিহ মুসলিমে শাফায়াতের দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : شَفَعَتْ الْمَلَائِكَةُ، وَشَفَعَ النَّبِيُّونَ، وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ، وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنْ النَّارِ فَيُخْرِجُ مِنْهَا قَوْمًا لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ». “এরপর মহান আল্লাহ বলবেন, ফেরেশতারা সুপারিশ করেছে, নবিরাও সুপারিশ করেছে এবং মুমিনরাও সুপারিশ করেছে, রয়ে গেছেন কেবল আরহামুর রাহিমিন (পরম দয়াময়)। এরপর তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুঠো তুলে আনবেন, ফলে এমন একদল লোককে মুক্তি দেবেন যারা কখনো কোনো ভালো আমল করেনি।” দ্রষ্টব্য: মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, অধ্যায় নং: ১ (কিতাবুল ইমান), পরিচ্ছেদ নং : ৮১, খ. ১, পৃ. ১১৫, হা. ১৮৩। হাদিসে উল্লিখিত কথাটির ব্যাপারে ইমাম ইবনু খুজাইমা রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩১১ হি.) বলেছেন: «هَذِهِ اللَّفْظَةُ لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ مِنَ الْجِنْسِ الَّذِي يَقُولُ الْعَرَبُ: يُنْفَى الاسْمُ عَنِ الشَّيْءِ لِنَقْصِهِ عَنِ الْكَمَالِ وَالتَّمَامِ، فَمَعْنَى هَذِهِ اللَّفْظَةِ عَلَى هَذَا الْأَصْلِ، لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ، عَلَى التَّمَامِ وَالْكَمَالِ، لَا عَلَى مَا أَوْجَبَ عَلَيْهِ وَأَمَرَ بِهِ، وَقَدْ بَيَّنْتُ هَذَا الْمَعْنَى فِي مَوَاضِعَ مِنْ كُتُبِي». ““সে কখনো ভালো আমল করেনি' কথাটি আরবদের বলা সেসব কথার শ্রেণিভুক্ত, যেখানে কোনোকিছুর নামকে নাকচ করা হয় পরিপূর্ণতার দিক থেকে তাতে কমতি থাকার কারণে। সুতরাং এই কথাটির অর্থ তার মূলের ওপরই বিদ্যমান থাকবে। অর্থাৎ সে কখনো ভালো আমল করেনি পরিপূর্ণরূপে ও পূর্ণাঙ্গভাবে; আল্লাহ তার জন্য যা আবশ্যক করেছেন এবং যা করার নির্দেশ দিয়েছেন সে অর্থে নয় (সেগুলোর বিন্দুমাত্রও বাস্তবায়ন করেনি এমন অর্থে নয়)। এই ব্যাখ্যা আমি আমার গ্রন্থাবলির বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করেছি।” দ্রষ্টব্য : আবু বকর মুহাম্মাদ বিন ইসহাক ইবনু খুজাইমা, কিতাবুত তাওহিদ ওয়া ইসবাতু সিফাতির রব, তাহকিক : আব্দুল আজিজ বিন ইবরাহিম আশ-শাহওয়ান (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রুশদ, ৫ম প্রকাশ, ১৪১৪ হি./১৯৯৪ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৭২৯। ইমাম ইবনু খুজাইমার কথার প্রমাণ আমরা আরেকটি হাদিসে পেয়ে যাই, যেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোচ্য কথা এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন, যার আমল ছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ আমলে ঘাটতি থাকা লোকের ক্ষেত্রে বলেছেন, 'সে কখনো ভালো আমল করেনি'। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : «إِنَّ رَجُلًا لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ، وَكَانَ يُدَايِنُ النَّাসَ فَيَقُولُ لِرَسُولِهِ: خُذْ مَا يَسْرَ، وَاتْرُكْ مَا عَسْرَ، وَتَجَاوَزْ؛ لَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يَتَجَاوَزَ عَنَّا، فَلَمَّا هَلَكَ قَالَ اللهُ لَهُ : عَمِلْتَ خَيْرًا قَطُّ، قَالَ: لَا ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ لِي غُلَامٌ، فَكُنْتُ أَدَايِنُ النَّাসَ، فَإِذَا بَعَثْتُهُ يَتَقَاضَى قُلْتُ لَهُ: خُذْ مَا يَسْرَ، وَاتْرُكْ مَا عَسْرَ ، وَتَجَاوَزْ لَعَلَّ اللَّهَ يَتَجَاوَزُ عَنَّا، قَالَ اللهُ تَعَالَى : قَدْ تَجَاوَزْنَا عَنْكَ». “এক লোক ছিল, যে কখনো কোনো ভালো আমল করেনি। সে মানুষকে ঋণ প্রদান করত। সে তার কর্মচারী দূতকে বলে দিত, 'যা সহজে আদায়যোগ্য তা গ্রহণ করবে, আর কষ্টসাধ্য ঋণের দাবির ছেড়ে দেবে এবং মাফ করে দেবে। হয়তো আল্লাহ এ কারণে আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।' এরপর লোকটি যখন মারা গেল, আল্লাহ তাকে বললেন, 'কখনো কোনো ভালো আমল করেছিলে?' সে বলল, 'না। তবে আমার এক ভৃত্য ছিল। আমি লোকদেরকে ঋণ দিতাম। তাকে ঋণ আদায় করতে পাঠানোর সময় বলে দিতাম, 'যা সহজে আদায়যোগ্য তা গ্রহণ করবে, আর কষ্টসাধ্য ঋণের দাবির ছেড়ে দেবে এবং মাফ করে দেবে। হয়তো আল্লাহ এ কারণে আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।' তখন মহান আল্লাহ বললেন, 'আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম'।” দ্রষ্টব্য: আবু আব্দুর রহমান আহমাদ বিন শুয়াইব আন-নাসায়ি, আস-সুনানুল কুবরা, তাহকিক : হাসান আব্দুল মুনয়িম শালাবি (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালা, ১ম প্রকাশ, ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.), খ. ৬, পৃ. ৯১, হা. ৬২৪৭; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, সহিহুত তারগিবি ওয়াত তারহিব (রিয়াদ : মাকতাবাতুল মাআরিফ, ১ম প্রকাশ, ১৪২১ হি./২০০০ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫৪০-৫৪১, হা. ৯০৫, সনদ : সহিহ। অধিকন্তু সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, নিরানব্বইজন লোককে হত্যাকারী ঘাতকও তওবা করার পরে সামান্য হলেও আমল করেছিল। সৎকর্মপরায়ণ লোকদের এলাকার উদ্দেশ্যে গমন করা এবং পদক্ষেপ ফেলে সেদিকে এগিয়ে যাওয়াও এক ধরনের আমল। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, 'সে কখনো কোনো ভালো আমল করেনি' কথাটির মানে 'সে পূর্ণরূপে আমল করেনি'।
📄 ৫.২ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : আমল ছাড়াই ইমান বিশুদ্ধ
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে সুবিদিত হয়ে গেল, মুরজিয়াদের একটি অন্যতম বক্তব্য-ইমানের সাথে আমল না থাকলেও ইমান বিশুদ্ধ। তাই যখন বলা হবে, 'কাউকে কাফির বলা যাবে না, সে যা-ই বলে থাকুক না কেন এবং যা-ই করে থাকুক না কেন, কেবল (কুফরি) বিশ্বাসের কারণেই কাউকে কাফির বলা যাবে,' তখন উক্ত কথার কথকের জন্য বান্দার আমলবিহীন ইমানকেও সঠিক বলা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। ইতঃপূর্বে এই মতাদর্শকে বাতিল প্রমাণ করে দলিলপ্রমাণ পেশ করা হয়েছে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর 'আল-ইমান' গ্রন্থে এসেছে, ইমাম শাফেয়ি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২০৪ হি.) বলেন, «وَكَانَ الْإِجْمَاعُ مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ وَمَنْ أَدْرَكْنَاهُمْ أَنَّ الْإِيمَانَ قَوْلُ وَعَمَلٌ وَنِيَّةٌ، لَا يُجْزِئُ وَاحِدٌ مِنَ الثَّلَاثَةِ إِلَّا بِالْآخَرِ».
“সাহাবিবর্গ, তাঁদের পরবর্তী তাবেয়িবৃন্দ এবং যাদেরকে আমরা পেয়েছি তাঁদের সবাই এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, ইমান হলো— কথা, কাজ এবং নিয়ত। এই তিনটির কোনো একটিও ইমানের জন্য অপরটি ব্যতিরেকে যথেষ্ট হবে না।”
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বলেছেন : “আমাদের পূর্ববর্তী সালাফগণ ইমান এবং আমলের মধ্যে পার্থক্য করতেন না। আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত, আবার ইমানও আমলের অন্তর্ভুক্ত। ইমান একটি সর্বব্যাপী নাম (যা নিজের মধ্যে পুরো ইসলামকে একত্রিত করে)-যেমন এসব ধর্মের নাম পুরো ধর্মকে শামিল করে-আর এই ইমানকে সত্যায়ন করে আমল। সুতরাং যে জবান দ্বারা ইমানের স্বীকৃতি দেয়, অন্তরে তা উপলব্ধি করে এবং তা আমলে বাস্তবায়ন করে, (তখন) তার সেই ইমান হয়ে যায় এমন সুদৃঢ় হাতলে, যা কখনো ভাঙবার নয়। আর যে জবান দ্বারা স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু সে অন্তরে তা উপলব্ধি করেনি এবং আমলে বাস্তবায়ন করেনি, সে অবশ্যই আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই ব্যাপারটি অসংখ্য সালাফ ও খালাফ থেকে সুবিদিত (প্রমাণিত)।”
ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মদ বিন নাসর রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৯৪ হি.) থেকে বর্ণনা করেছেন—এই উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, কোনো ব্যক্তি যদি হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উল্লিখিত ইমানের বৈশিষ্ট্যগুলো অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর উল্লেখকৃত ইসলামের বৈশিষ্ট্যাবলির ওপর আমল না করে, তাহলে তাকে মুমিন বলা যাবে না।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এখান থেকেই জাহম এবং তার অনুসারীদের বিশ্বাস-'বাহ্যিক ইমান ব্যতিরেকে (কেবল অন্তরের) ইমানই আখেরাতে উপকার বয়ে আনবে' যে ভ্রান্ত, তা প্রতিভাত হয়। আর এটা অসম্ভবও বটে।”
টিকাঃ
১১২ ইবনু তাইমিয়া, আল-ইমান, পৃ. ১৯৭।
১১৩ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৯৬।
১১৪ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ৩৩৬।
১১৫ মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ৫৫৩।
📄 ৫.৫ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়
মুরজিয়াদের নবোদ্ভাবিত একটি বিদাতি আকিদা হলো-আমল তাদের মতে ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা বলে, “যদি আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে পাপীদেরকে কাফির বলা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে যায়। কেননা ইমান যদি কথা ও কাজের সমষ্টিই হত, তাহলে ইমানের কিছু অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পুরোটাই বিলুপ্ত হয়ে যেত।”
শরিয়তের অসংখ্য দলিল থেকে প্রতীয়মান হয়, আমল ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ইমানকে ব্যর্থ করে দেবেন।”
অর্থাৎ তোমাদের সালাত (ব্যর্থ করে দেবেন না)। মুসলিম সাহাবিগণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'কাবা পরিবর্তিত হওয়ার পূর্বে যারা মারা গেছেন, তাঁদের নামাজের কী হবে?” তখন এই আয়াতটি নাজিল হয়। যেমনটি সহিহ বুখারিতে বারা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
“মুমিন তো তারাই, আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় প্রকম্পিত হয়, তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ইমান বাড়িয়ে দেয় এবং তারা তাদের রবের ওপরই ভরসা করে। যারা (যথাযথভাবে) নামাজ আদায় করে এবং আমরা তাদেরকে যেই রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই তো প্রকৃত মুমিন। তাদের রবের কাছে তাদের জন্যই রয়েছে মর্যাদাসমষ্টি, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।”
এখানে পূর্ণ ইমানের অধিকারী মুমিনবর্গ হিসেবে আল্লাহ তাদেরকে সাব্যস্ত করেছেন, যারা এসমস্ত আমলের গুণে গুণান্বিত। মহান আল্লাহ বলেছেন :
“নিশ্চয় সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা তাদের নামাজে ভীত-বিনীত, যারা অনর্থক ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে। যারা জাকাত দানে সক্রিয়। যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। সুতরাং কেউ এদেরকে ছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। আর যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা নিজেদের নামাজে যত্নবান থাকে। তারাই হবে উত্তরাধিকারী। উত্তরাধিকারী হবে ফিরদাউসের; যাতে তারা হবে চিরস্থায়ী।”
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারাই তো মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ইমান এনেছে, তারপর সন্দেহ পোষণ করেনি এবং তাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই তো সত্যনিষ্ঠ।”
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন : “শুধু তারাই আমার আয়াতসমূহের প্রতি ইমান আনে, যারা সেসবের দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হলে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে, আর তারা অহংকার করে না। তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা হতে দূরে থাকে, তারা তাদের রবকে ডাকে শঙ্কা ও আশা নিয়ে এবং আমরা তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।”
'আস-সহিহ' গ্রন্থে এসেছে, ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল কাইস গোত্রের প্রতিনিধিদলের উদ্দেশে করেছিলেন : «آمُرُكُمْ بِالإِيْمَانِ بِاللهِ هَلْ تَدْرُونَ مَا الإِيْمَانُ بِاللَّهِ شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَقَامُ الصَّلَاةِ وَإِيْتَاءُ الزَّكَاةِ وَصَوْمُ رَمَضَانَ وَأَنْ تُعْطُوا مِنَ الْمَغَانِمِ الْخُمُسَ».
"আমি তোমাদেরকে আল্লাহর প্রতি ইমান আনার নির্দেশ দিচ্ছি। তোমরা কি জান, আল্লাহর প্রতি ইমান আনা কাকে বলে? তা হলো, 'আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই'- এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ পড়া, জাকাত দেওয়া, রমজানের রোজা রাখা এবং গনিমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ (রাষ্ট্রীয় কোষাগারে) জমা দেওয়া।” নবিজি এখানে আমলকে ইমানের পরিচয়ভুক্ত করেছেন। কেউ যেন আবার বলে না বসে, 'এখানে তো অন্তরের বিষয় উল্লেখ করা হলো না!' কেননা অন্তরের ব্যাপারটি সুবিদিত বিষয়ের অন্তর্গত, বিধায় তা (আলাদাভাবে) উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়নি
'আস-সহিহ' গ্রন্থে এসেছে, আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ».
“ইমানের শাখা সত্তরটিরও কিছু বেশি অথবা ষাটটির কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে- 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ‘সত্য উপাস্য নেই)’ এ কথা বলা এবং এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা ইমানের একটি বিশেষ শাখা। "
সুনানু আবি দাউদে উত্তম সনদে বর্ণিত হয়েছে, আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الإِيمَانَ». “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঘৃণা করবে; আর আল্লাহর জন্য দান করবে এবং দান করা থেকে বিরতও থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সে ব্যক্তি তার ইমানকে পরিপূর্ণ করেছে।”
সুনান গ্রন্থে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ». “(প্রকৃত) মুমিন তো সেই ব্যক্তি, লোকেরা তাদের জান ও মালের বিষয়ে যে ব্যক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারে।”
মুরজিয়াদের দাবি অনুযায়ী 'ইমানের মধ্যে আমলকে প্রবেশ করালে, কিছু আমল বিলুপ্ত হওয়ার দরুন পুরো ইমানেরই বিলোপসাধন অপরিহার্য হয়ে যায়'-এমন কথা সঠিক নয়। কেননা গাছের ডালপালা গাছেরই অংশ, কিন্তু সেগুলো বিলুপ্ত হলে গাছের নাম বিলুপ্ত হওয়া অপরিহার্য সাব্যস্ত হয় না।
হয়তো তারা এই দলিল পেশ করবে যে, আল্লাহ তো আমলকে ইমানের সাথে বা ইমানের ওপর আত্ফ (সংযোজন) করেছেন, তিনি বলেন, “নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে।” আর (আরবি ভাষায়) আত্ফ— ‘সংযোজনকৃত দুটি বিষয় যে আলাদা’, সেটার দাবি করে।
এর জবাব হলো, এটা খাসকে আমের সাথে আত্ফ্ফ করার অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে, ভালো আমল করেছে, নামাজ আদায় করেছে এবং জাকাত দিয়েছে।”
নিঃসন্দেহে নামাজ আদায় করা এবং জাকাত প্রদান করা ভালো কর্মাবলির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান এনেছে এবং ভালো আমল করেছে, আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের।” হকের উপদেশ দেওয়া ভালো আমলের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু খাসকে আমের সাথে আল্ফ করা আরবদের ভাষায় সিদ্ধ।
যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা নামাজসমূহকে হেফাজত করবে, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাজকে।”
তিনি আরও বলেন, “যে কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর রসুলগণ এবং জিবরিল ও মিকাইলের শত্রু হবে, (সে যেন জেনে রাখে) নিশ্চয় আল্লাহ হলেন কাফিরদের শত্রু।”
তিনি আরও বলেন, “আর স্মরণ করুন, যখন আমরা নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকেও, আর নুহ থেকেও।”
তিনি আরও বলেছেন, “সেখানে (জান্নাতে) রয়েছে ফলমূল এবং খেজুর ও আনার।”
যারা ইমান থেকে আমলকে খারিজ করে দেয়, তারা মূলত দু শ্রেণির লোক। তাদের কেউ কেউ বলে, 'ইমান এবং আমলের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।' পূর্বোদ্ধৃত দলিলগুলো সুস্পষ্টভাবে তাদের এ মতটিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বাতিল সাব্যস্ত করে। আবার তাদের কেউ কেউ বলে, 'এই দুটি বিষয় পরস্পরের জন্য অপরিহার্য।' এরাই হলো মুরজিয়াতুল ফুকাহা। আবার তাদের কেউ কেউ বলে, 'মুরজিয়াতুল ফুকাহা এবং আহলুস সুন্নাহর মধ্যকার মতপার্থক্য হলো শাব্দিক মতপার্থক্য।
কেননা আহলুস সুন্নাহ আমলকে ইমানেরই অংশ মনে করে, আর মুরজিয়াতুল ফুকাহারা আমলকে ইমানের জন্য আবশ্যক মনে করে। কিন্তু সমকালীন মুরজিয়াদের কথা মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেননা সমকালীন মুরজিয়া গোষ্ঠী আমলের কারণে কাফির সাব্যস্ত করে না। পক্ষান্তরে মুরজিয়াতুল ফুকাহারা বলে, 'কোনো কিছুর অপরিহার্য বিষয়ের অস্তিত্ব না থাকলে তা থেকে প্রতীয়মান হয়, মূল বিষয়টিরও অস্তিত্ব নেই (انتفاء اللازم يدل على انتفاء الملزوم)। সে যাই হোক, মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের কথা সেসকল দলিলবিরোধী—ইতঃপূর্বে যেসব দলিলের কিছু উল্লিখিত হয়েছে—যে দলিলগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, আমল ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের বক্তব্য মূলত ভুল কথা; তাদের কেউ কেউ এই মতানৈক্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ফলাফলও উল্লেখ করেছেন।
টিকাঃ
১২৩ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১৪৩।
১২৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৪৪৮৬; সুনানু আবি দাউদ, হা. ৪৬৭৯।
১২৫ আল-কুরআন, ৮ (সুরা আনফাল) : ২-৪।
১২৬ আল-কুরআন, ২৩ (সুরা মুমিনুন): ১-১১।
১২৭ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত): ১৫।
১২৮ আল-কুরআন, ৩২ (সুরা সাজদা) : ১৫-১৬।
১২৯ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৪৩৬৮; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৭।
১৩০ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৯; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৩৫।
১৩১ সুনানু আবি দাউদ, হা. ৪৬৮১; সুনানুত তিরমিজি, হা. ২৫২৩, সনদ : সহিহ।
১৩২ তিরমিজি, হা. ২৬২৯, সনদ : সহিহ।
১৩৩ আল-কুরআন, ১৯ (সুরা মারিয়াম): ৯৬।
১৩৪ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৭৭।
১৩৫ আল-কুরআন, ১০৩ (সুরা আসর) : ৩।
১৩৬ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ২৩৮।
১৩৭ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ৯৮।
১৩৮ আল-কুরআন, ৩৩ (সুরা আহজাব) : ৭।
১৩৯ আল-কুরআন, ৫৫ (সুরা রহমান): ৬৮।
১৪০ “যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বলেছেন, যেমনটি উল্লিখিত হয়েছে 'মাজমুউল ফাতাওয়ায়' (খ. ৭; পৃ. ২৯৭ ও ৫৭৫) এবং ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি বলেছেন 'শারহুত তাহাবিয়ায়' (পৃ. ৩০৯; তাহকিক : আরনাউত)।” আমি (অনুবাদক) বলছি, শাইখ শাসরি বিরচিত বক্ষ্যমাণ ইরজা বিষয়ক আরবি বইয়ের টীকায় এভাবেই রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে, যেমনটি আমরা দ্বৈত উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতরে উল্লেখ করেছি। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি শাইখ শাসরির লেকচার থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে। উক্ত টীকা শাইখ নিজেই লিখেছেন কিনা সেটা আমরা অবগত হতে পারিনি। যাহোক, শাইখুল ইসলামের ব্যাপারে আমভাবে এরকম কথা বলা সঠিক নয়। কেননা শাইখুল ইসলাম নিজেই এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের সাথে আহলুস সুন্নাহর মতভেদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্রেফ শাব্দিক মতভেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আহলুস সুন্নাহর সাথে তাদের সমুদয় মতভেদকে শাব্দিক মতভেদ বলেননি। দ্রষ্টব্য: আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালিম ইবনু তাইমিয়া আল-হারানি, শারহুল আকিдатিল আসফাহানিয়্যা, তাহকিক : মুহাম্মাদ বিন রিয়াদ আল-আহমাদ (বৈরুত : আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৫ হি.), পৃ. ১৯১; ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ২৯৭। শাইখ শাসরির বইয়ের টীকায় ইবনু তাইমিয়া থেকে যেই রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে ক্রসচেক করে আমরা দেখেছি, তিনি অধিকাংশ মতভেদকে শাব্দিক বলেছেন, সকল মতভেদকে শাব্দিক বলেননি। আল্লাহুল মুস্তাআন। তদুপরি শাইখুল ইসলাম যে মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের সাথে আহলুস সুন্নাহর সকল মতভেদকে শাব্দিক বলেননি, এই বিশ্লেষণ প্রমাণ সহকারে আলোকপাত করেছেন বিশিষ্ট আকিদাবিশারদ শাইখ সুলতান আল-উমাইরি হাফিজাহুল্লাহ, আকিদাবিশারদ শাইখ মুহাম্মাদ আলু খুদাইর হাফিজাহুল্লাহ, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সায়িদ আল-কুসাইরি প্রমুখ। দ্রষ্টব্য : সুলতান বিন আব্দুর রহমান আল-উমাইরি, আল-উকুদুজ জাহাবিয়্যা আলা মাকাসিদিল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা (সৌদি আরব : দারু মাদারিজ, ২য় প্রকাশ, ১৪৪২ হি./২০২১ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৩৫২-৩৫০৩; মুহাম্মাদ বিন মাহমুদ আলু খুদাইর, আল-ইমান ইনদাস সালাফ ওয়া আলাকাতুহু বিল আমাল ওয়া কাশফু শুবুহাতিল মুআসিরিন (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রুশদি নাশিরুন, ৩য় প্রকাশ, ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ২৩৬-২৩৮; মুহাম্মাদ বিন সায়িদ আল-কুসাইরি, বারাআতু আহলিল হাদিসি ওয়াস সুন্নাহ মিন বিদআতিল মুরজিআহ (রিয়াদ: দারুল মুহাদ্দিস, ১ম প্রকাশ, ১৪২৬ হি.), পৃ. ২৫৯-২৬৪। উল্লেখ্য, শাব্দিক মতভেদ মানে উভয়পক্ষের দাবি এক ও অভিন্ন, কিন্তু দাবির শব্দচয়ন আলাদা। আর ইমাম ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি রাহিমাহুল্লাহ বাস্তবেই আহলুস সুন্নাহর সাথে মুরজিয়াতুল ফুকাহার মতভেদকে শাব্দিক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য বাস্তবতার বিপরীত এবং মুহাক্কিক উলামাগণ কর্তৃক সমালোচিত। কেননা মুরজিয়াতুল ফুকাহারা যতই আমলকে জরুরি মনে করুক না কেন, তারা আমলকে ইমানের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত বলে মানে না। এজন্য সালাফগণ সমুদয় আমল পরিত্যাগকারীকে কাফির বললেও তারা সমুদয় আমল পরিত্যাগকারীকে কাফির বলে না। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, আহলুস সুন্নাহর সাথে মুরজিয়াতুল ফুকাহার মতভেদ হাকিকি তথা প্রকৃত মতভেদ; এগুলো শাব্দিক মতভেদ নয়। এজন্য ইমাম ইবনু আবিল ইজের আলোচ্য দাবির সমালোচনা করেছেন ইমাম ইবনু বাজ রাহিমাহুল্লাহ, ইমাম আলবানি রাহিমাহুল্লাহ, আল্লামা সালিহ আলুশ শাইখ হাফিজাহুল্লাহর মতো মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম। দ্রষ্টব্য: আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজ, আত-তালিকাতুল বাজিয়্যা আলা শারহিত তাহাউয়িয়্যা (রিয়াদ : দারু ইবনিল আসার, ১ম প্রকাশ, ১৪২৯ হি./২০০৮ খ্রি.), পৃ. ৭৫১; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, আল-আকিদাতুত তাহাবিয়্যা শারহ ওয়া তালিক (রিয়াদ : মাকতাবাতুল মাআরিফ, প্র. ১৪২২ হি./২০০১ খ্রি.), পৃ. ৬৬-৬৯; সালিহ বিন আব্দুল আজিজ আলুশ শাইখ, আল-লাআলিল বাহিয়্যাহ ফি শারহিল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যাহ (রিয়াদ : দারুল আসিমাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪৩১ হি./২০১০ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৪০৫-৪০৬।
১৪১ অনুবাদকের টীকা: এটি একটি সুসাব্যস্ত মূলনীতি, যা বিশুদ্ধ আকল দ্বারা প্রমাণিত। যে বিষয়ের অপরিহার্য বিষয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই, সেই মূল বিষয়টিও তখন অস্তিত্বহীন বলে ধরে নেওয়া হবে। যেমন সূর্যোদয়ের অপরিহার্য বিষয় হলো দিনের অস্তিত্ব; যদি দিনের অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে তা থেকে প্রমাণিত হবে, সূর্য উদিত হয়নি। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : আব্দুল কারিম বিন মুরাদ আল-আসারি, তাসহিলুল মানতিক (কায়রো : দারু মিসর, প্রকাশের ক্রমধারাবিহীন, তাবি), পৃ. ৫৩; মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি, আদাবুল বাহসি ওয়াল মুনাজারা, তাহকিক : সাউদ বিন আব্দুল আজিজ আল-আরিফি (রিয়াদ : দারু আতাআতিল ইলম, ৫ম প্রকাশ, ১৪৪১ হি./২০১৯ খ্রি.), পৃ. ১৩০; জাহরান কাদা, আল-ওয়াসিত ফিল মানতিক (তিউনিস : দারুল ইমামিল মাজিরি, ২য় প্রকাশ, ১৪৪৩ হি./২০২১ খ্রি.), পৃ. ৩৯৫-৩৯৬; আবু হামিদ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আল-গাজালি, আল-মুস্তাসফা, তাহকিক : মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম আব্দুশ শাফি (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৩ হি./১৯৯৩ খ্রি.), পৃ. ৩৪ ও ১৬৩; নাজমুদ্দিন আবুর রাবি সুলাইমান বিন আব্দুল কাউয়ি আত-তুফি, শারহু মুখতাসারির রওদা, তাহকিক : আব্দুল্লাহ আত-তুর্কি (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালা, ১ম প্রকাশ, ১৪০৭ হি./১৯৮৭ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১৬৮। আলোচ্য কথার মাধ্যমে সম্মাননীয় লেখক (শাইখ শাসরি) দাবি করছেন, মুরজিয়াতুল ফুকাহারা আমলকে ইমানের অংশ মনে না করলেও আমলকে ইমানের অপরিহার্য বিষয় মনে করে; ফলে কোনো বান্দার আমল না থাকলে তার ইমানের অস্তিত্বও নাই বলে সাব্যস্ত হয়। কিন্তু মুরজিয়াতুল ফুকাহারা যে এমন আকিদা রাখত, তা সুনিশ্চিতভাবে বলার পক্ষে আমরা কোনো দলিল পাইনি। বরং আমরা দেখতে পাই, মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের অন্যতম ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর মাজহাব অনুযায়ী, সকল আমল পরিত্যাগকারী কাফির নয়। পরবর্তী যুগে আগত হানাফিদের যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (মৃ. ১৩৫২ হি.) বলেছেন, “আমাদের ইমাম আজম রাহিমাহুল্লাহ এবং অধিকাংশ ফাকিহ ও মুতাকাল্লিমের (তথাকথিত ইসলামি দার্শনিক) মতে, আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে তাঁরা সবাই (আহলুল হাদিস ও আবু হানিফার অনুসারীবৃন্দ) একমত ছিলেন, তাসদিক তথা সত্যায়ন পরিত্যাগকারী কাফির, আর সমুদয় আমল পরিত্যাগকারী ফাসিক (পাপী মুসলিম)!” দ্রষ্টব্য: মুহাম্মাদ আনওয়ার বিন মুআজ্জাম শাহ আল-কাশ্মিরি, ফাইদুল বারি আলা সহিহিল বুখারি, তাহকিক : মুহাম্মাদ বদর আলম মিরাঠী (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৬ হি./২০০৫ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫৩-৫৪। বিশিষ্ট সালাফি আকিদাবিশারদ শাইখ সুলতান আল-উমাইরি হাফিজাহুল্লাহ, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সায়িদ আল-কুসাইরি প্রমুখ মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের আকিদা নিরূপণ করার সময় এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, তারা সকল আমল পরিত্যাগ করাকে কুফর মনে করে না। দ্রষ্টব্য : আল-উমাইরি, আল-উকুদুজ জাহাবিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩৫৩; আল-কুসাইরি, বারাআতু আহলিল হাদিস, পৃ. ২৬১-২৬২।
📄 ৫.৬ : মুরজিয়াদের বক্তব্য : মানুষ মুমিন কিনা সেটা তার মৃত্যু কী হিসেবে হচ্ছে, তার ওপর নির্ভরশীল
মুরজিয়াদের কেউ কেউ বলে, “মানুষ মুমিন কিনা সেটা তার মৃত্যু কী হিসেবে হচ্ছে, তার ওপর নির্ভরশীল।” অর্থাৎ, মানুষ যে বিশ্বাসে বিশ্বাসী থাকা অবস্থায় মারা যায়, তাকে সেই বিশ্বাসের লোক হিসেবেই ধরে নেওয়া হবে। সুতরাং আল্লাহর অগ্রগামী জ্ঞান অনুযায়ী ব্যক্তি যে হিসেবে মারা যাবে, সে হিসেবেই সে মুমিন বা কাফির সাব্যস্ত হবে।
তারা বলে, যে ব্যক্তি ইমানের ওপর থাকার পরে কুফরি করে বসে এবং ওই কুফরের ওপরই মারা যায়, তার 'কুফরপূর্ব সেই ইমান' মূলত ইমানই না। যেমন নামাজ শেষ হওয়ার আগেই নামাজ-আদায়কারী স্বীয় নামাজকে নষ্ট করে ফেললে, তার ওই (নষ্ট করে ফেলা) নামাজকে 'নামাজ' বলা হয় না। এজন্য যে ব্যক্তি জীবনভর ইসলামের সাথে শত্রুতা করে, মুসলিমদের কষ্ট দেয় এবং মৃত্যুর কিছুপূর্বে সে ইসলাম গ্রহণ করে; তার ব্যাপারে তারা বলে, সে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বদাই আল্লাহর নিকটে প্রিয়ভাজন মুমিন বান্দা ছিল।
এটা সম্পূর্ণ বাতিল কথা; শরয়ি দলিলসমগ্র এই কথাকে প্রত্যাখ্যান করে। যেসব দলিল থেকে প্রতীয়মান হয়, একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময়ে মুমিন থাকলেও পরে আরেকসময় কাফিরও হতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনার পর কাফির হয়েছে, অতঃপর কুফরকে পরিবর্ধিত করেছে, তাদের তওবা কখনোই গৃহীত হবে না এবং তারাই পথভ্রষ্ট।”
তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে, তারপর কাফির হয়, এরপর পুনরায় ইমান আনে, এবং আবার কাফির হয়, অনন্তর কুফরকে পরিবর্ধিত করে; আল্লাহ তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে পথপ্রদর্শন করবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “এটা এ জন্য যে, তারা ইমান এনেছে, এরপর কাফির হয়েছে; ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে (সেখানে হেদায়েত পৌঁছবে না)।”
তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা ইমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ।”
মুরজিয়াদের এই মতবাদ উদ্ভূত হওয়ার কারণ—তারা আল্লাহর 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়্যা' অস্বীকার করে। তারা আল্লাহর সেসব সিফাতের একককে স্বীকার করে না, যে সিফাতগুলো 'কোনো একসময় না থাকার পরে' নতুন করে সংঘটিত হয়। যেমন কথা ও শ্রবণ সিফাতের একক।
কারণ (তারা মনে করে, সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যার স্বীকৃতি) আল্লাহর সত্তায় 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়াবলি' থাকাকে (حلول الحوادث) অপরিহার্য করে। এজন্য আমরা দেখি, তারা বলে থাকে, বিশ্বজগৎ হলো মুহদাস তথা নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া বিষয়; আর নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া প্রতিটি বিষয়ই সৃষ্ট। আর প্রত্যেক সৃষ্ট জিনিসের সৃষ্টিকর্তা থাকা অপরিহার্য। এই (দার্শনিক) প্রমাণই এ সম্প্রদায়ের পথভ্রষ্ট হওয়ার মূল কারণ; অথচ তাদের কারও কারও ধারণা, এই প্রমাণ ছাড়া আল্লাহকে চেনাই যায় না!
উক্ত প্রমাণ (দার্শনিক যুক্তি) অনুযায়ী সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যার এককগুলো সৃষ্ট হওয়া জরুরি হয়ে যায়; কেননা এগুলো মুহদাস তথা নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া বিষয়। অথচ সন্দেহাতীতভাবে মহান আল্লাহ যেকোনো সময় নিজে যা ইচ্ছে করেন, সেটাই করে থাকেন। সুতরাং যখন ইচ্ছে তিনি কথা বলেন। যেমন সালাফগণ বলেছেন, “তিনি সর্বদা কথা বলার গুণে গুণান্বিত থাকেন।” কুরআনে এ বিষয়ের পক্ষে শতাধিক আয়াত রয়েছে এবং সুন্নাহয় তার কয়েকগুণ প্রমাণ রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর সেদিন (আল্লাহ) তাদেরকে ডেকে বলবেন, তোমরা রসুলদেরকে কী জবাব দিয়েছিলে?”
মহান আল্লাহ ডাক দেওয়ার বিষয়টিকে নির্ধারিত করেছেন সুনির্দিষ্ট একটি দিনে।
তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন, সেটাই হুকুম করে থাকেন।” আল্লাহ তাঁর হুকুমকে স্বীয় ইচ্ছের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি আরও বলেন, “তাঁর ব্যাপারতো শুধু এই যে, যখন তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছে করেন, তখন বলেন, 'হও', ফলে তা হয়ে যায়।” তিনি আরও বলেন, “যখন তারা আমাকে অতিশয় ক্রোধান্বিত করল, তখন আমি তাদেরকে শাস্তি দিলাম।” তিনি আরও বলেছেন, “(হে রসুল) আল্লাহ সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করেছে।”
হাদিসে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, «هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمُ اللَّيْلَةَ».
“তোমরা কি জানো, তোমাদের প্রভু গতরাতে কি বলেছেন?”
বিরোধীরা (দর্শনভিত্তিক আকিদাচর্চাকারীরা) এই মাসআলা না বোঝার কারণে বলে, ইবনু তাইমিয়া বিশ্বজগতকে 'কদিম (সূচনাবিহীন আদি)' বলেছেন। কেননা তিনি 'হাওয়াদিস (নতুনভাবে সংঘটিত হওয়া বিষয়াবলি)' সাব্যস্ত করেছেন, যেগুলোর কোনো সূচনা নেই। শাইখের (ইবনু তাইমিয়ার) এ জাতীয় বক্তব্যে উল্লিখিত 'হাওয়াদিস' কোনো সৃষ্ট জিনিস না; বরং তাঁর বক্তব্যে 'হাওয়াদিস' হলো সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যা। এর ব্যাখ্যা বিস্তারিত আলোচনাসাপেক্ষ, যা এখানে করা সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
টিকাঃ
১৪২ অতএব মুরজিয়াদের আকিদা অনুযায়ী যদি মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে মনে করতে হবে, সারাজীবন সে মুমিনই ছিল; তদ্রুপ কাফির অবস্থায় মারা গেলে মনে করতে হবে, সে সারাজীবন আসলে কাফিরই ছিল। – অনুবাদক।
১৪৩ আল-কুরআন, ৩ (সুরা আলে ইমরান) : ৯০।
১৪৪ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ১৩৭।
১৪৫ আল-কুরআন, ৬৩ (সুরা মুনাফিকুন): ৩।
১৪৬ আল-কুরআন, ৯ (সুরা তাওবা) : ৬৬।
১৪৭ অনুবাদকের টীকা : মহান আল্লাহর ইচ্ছে ও ক্ষমতা অনুযায়ী তাঁর যেসব গুণ তাঁর সত্তায় থাকে, সেসব গুণকে 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়্যা' বলে। যেমন তাঁর কথা, শোনা, দেখা, ইচ্ছে করা, ভালোবাসা, সন্তুষ্ট হওয়া, অসন্তুষ্ট হওয়া, দয়া, ক্রোধ, সৃষ্টি করা, ন্যায়পরায়ণতা করা, আরশের ওপর আরোহণ, তাঁর আগমন, অবতরণ ইত্যাদি 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়্যা'। এসব সিফাতের একক আল্লাহর ইচ্ছে অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে হয়ে থাকে। দ্রষ্টব্য : ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৬, পৃ. ২১৭।
১৪৮ অনুবাদকের টীকা: আল্লাহর যত কর্মর্গত গুণ বা বৈশিষ্ট্য আছে, সবগুলো বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সালাফদের আকিদা ছিল, এগুলো সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (এসবের) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় এগুলো 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। এর মানে মহান আল্লাহ এসব বৈশিষ্ট্য কোনো একটা সময়ে অর্জন করেছেন, বিষয়টা এমন নয়; বরং সূচনাহীন অতীত থেকে আল্লাহ সর্বদাই এসব গুণে গুণান্বিত হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহান আল্লাহর এসব গুণ সুপ্রাচীন, যার কোনো শুরু নেই। পক্ষান্তরে আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেন, তখন এসব বৈশিষ্ট্যের একক সংঘটন করেন। যেমন আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন মুসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছেন, আবার যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন প্রিয় নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলেছেন। এভাবে তিনি অনেকের সাথে কথা বলেছেন। এগুলো একেকটি একক এবং তাঁর কথার অংশ। এসব একক তো আর সুপ্রাচীন নয়, যার কোনো শুরু নেই। বরং এসব বিষয় বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে এবং প্রত্যেকটি এককের শুরু আছে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ জাতীয় কর্মগত গুণ 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। দ্রষ্টব্য: আব্দুর রহমান বিন নাসির আলু সাদি, আত-তাম্বিহাতুল লাতিফা ফিমা ইহতাওয়াত আলাইহিল ওয়াসিতিয়্যাতু মিনাল মাবাহিসিল মুনিফা (রিয়াদ : দারু তাইবা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৪ হি.), ৪৮।
১৪৯ আল-কুরআন, ২৮ (সুরা কাসাস): ৬৫।
১৫১ আল-কুরআন, ৫ (সুরা মায়িদা) : ১।
১৫২ আল-কুরআন, ৩৬ (সুরা ইয়াসিন) : ৮২।
১৫৩ আল-কুরআন, ৪৩ (সুরা জুখরুফ): ৫৫।
১৫৪ আল-কুরআন, ৫৮ (সুরা মুজাদিলা) : ১।
১৫৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ১০৩৮; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৭১।
১৫৬ অনুবাদকের টীকা : ইবনু তাইমিয়া বুঝিয়েছেন, মহান আল্লাহর 'আস-সিফাতুল ইখতিয়ারিয়্যা' সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (এসবের) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় এগুলো 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। এই মূলনীতির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা কিছুপূর্বে টীকার মধ্যে আলোচিত হয়েছে।